📄 ইসলামে ন্যায়বিচারের গুরুত্ব ও বাস্তবতা
ন্যায়বিচারের গুরুত্ব: ন্যায়বিচার হলো মানবিক মূল্যবোধের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলাম যার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছে। ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন এবং রাষ্ট্রীয় জীবন- সর্বক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এজন্য পবিত্র কুরআনে ন্যায়বিচারকে নবী-রাসূল পাঠানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- "নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে স্পষ্ট দলিল-প্রমাণসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ড দিয়েছি। যাতে মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।"২৯৪
"ন্যায়বিচার বা ইনসাফের গুরুত্ব এরচেয়ে বেশি আর কী হতে পারে, আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন, আর তাদের যত কিতাব দিয়েছেন, সবকিছুর প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো দুনিয়াতে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। সুতরাং বলা যায়, ন্যায়বিচার বা ইনসাফের জন্যই কিতাব নাযিল হয়েছে। ইনসাফের জন্যই নবী-রাসূল প্রেরিত হয়েছে। আর এই ইনসাফ দ্বারাই আসমান-জমিন টিকে আছে।"২৯৫
পবিত্র কুরআন আমাদেরকেও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সর্বদা ন্যায়ের উপর থাকতে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আদেশ দিয়েছে। যদিও তা আমাদের কাছে অপছন্দ লাগে বা আমাদের বিরুদ্ধে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- "হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান করো, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনের যদি ক্ষতিও হয় তবুও।"২৯৬
তিনি আরও বলেন- "হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে অবিচল থাকো। কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণেও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করবে না। সুবিচার করো, এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবগত।"২৩৭
আল্লামা ইবনে কাসীর রহঃ বলেন- "কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যাতে করে তোমাদেরকে তাদের সাথে ন্যায়বিচার করা থেকে বিরত না রাখে। বরং প্রত্যেকের সাথেই তোমরা ন্যায়বিচার করো, চাই সে বন্ধু হোক বা শত্রু।"২৩৮
সুতরাং ইসলামে ন্যায়বিচারের বেলায় কারও প্রতি ভালোবাসা এবং শত্রুতার কোনো প্রভাব নেই। জাত-বংশের কোনো পার্থক্য নেই। অর্থ-বিত্তেরও কোনো দখল নেই। পার্থক্য করা হয় না কোনো মুসলিম-অমুসলিমদের মাঝেও। বরং রাষ্ট্রে বসবাসকারী মুসলমান-অমুসলমান সবাই ন্যায়বিচার ভোগ করার পূর্ণ অধিকার রাখে। চাই তাদের মধ্যে শত্রুতা থাক অথবা ভালোবাসা।
ইসলামে ন্যায়বিচারের অবস্থানঃ এক মাখযুমী মহিলার ক্ষেত্রে হযরত উসামা ইবনে যায়েদের সুপারিশের ঘটনা দ্বারাই ইসলামে ন্যায়বিচারের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়। হযরত উসামা বিন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বনী মাখযুম গোত্রের এক মহিলার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। যাতে চুরির অপরাধে তার হাত না কাটা হয়। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রচণ্ড রাগাম্বিত হয়ে গেলেন। এরপর ইসলামের নীতি-আদর্শ, ন্যায়বিচার এবং সমাজের ধনী-গরীব বিচারের কাঠগড়ায় সবাই সমান- এসব বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিলেন। ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বললেন- "হে লোকসকল! নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণ ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে, তাদের মধ্যে যখন কোনো সম্ভ্রান্ত লোক চুরি করতো, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিতো। আর যদি কোনো দুর্বল লোক চুরি করতো, তবে তারা তার উপর শাস্তি প্রয়োগ করতো। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতেমাও চুরি করতো, তবুও আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।"২৪০
হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে খায়বারের বিজয় দান করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারবাসীদেরকে আপন অবস্থায় সেখানেই থাকতে দিলেন। এবং খায়বারের সমস্ত ফসল খায়বারবাসী ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাঝে অর্ধেক অর্ধেক করে ভাগ করে নিলেন। পরে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রওয়াহাকে খায়বারে পাঠালেন অনুমান করে অর্ধেক ফসল নিয়ে আসতে। তিনি এসে ইহুদীদেরকে বললেন- "হে ইহুদীর দল! আমি মনে করি তোমরা হলে সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রাণী। তোমরা আল্লাহর নবীদেরকে হত্যা করেছো। আর আল্লাহকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছো। তোমাদের প্রতি এই ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও আমি তোমাদের উপর জুলুম করবো না। আমার ধারণা অনুযায়ী খায়বারে বিশ হাজার ওয়াসা খেজুর আছে। এখন তোমরা যদি চাও তাহলে তোমাদের জন্যও একটা অংশ রেখে দেবো। আর যদি না চাও, তাহলে সম্পূর্ণটাই আমি নিয়ে নেবো। ইহুদীরা বললো- এভাবেই তো আসমান এবং জমিনে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা আমাদের অংশ গ্রহণ করবো।"২৪২
উক্ত হাদীসে এটা স্পষ্ট যে, ইহুদীদের প্রতি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রওয়াহার প্রচণ্ড ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রতি জুলুম করেননি। বরং স্পষ্ট ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, তিনি তাদের প্রতি কোনো জুলুম করবেন না। আর দুই ভাগের মধ্য থেকে তারা যে ভাগ চাবে, সেটাই তাদেরকে দিয়ে দিবেন।
ইসলামে ন্যায়বিচারের রহস্যঃ ইসলামে ন্যায়বিচারের রহস্য হলো- ইনসাফ বা ন্যায়বিচার, এই জমিনে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি দাদিপাল্লা। এ দ্বারা মেপে মেপে দুনিয়ার অধিকার আদায় করা হবে। জালেম এবং মাজলুমের মাঝে ন্যায়বিচার করা হবে এবং এর মাধ্যমে হকদারকে সহজভাবে সঠিক জায়গা থেকে তার হক আদায় করে দেওয়া হবে। ন্যায়বিচার হলো ইসলাম ধর্মের এমন একটি হুকুম, যা সমাজের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ। সুতরাং সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের ন্যায়বিচার এবং এর মাধ্যমে শান্তি লাভের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। ইসলাম যেহেতু দয়া-মায়া এবং সহানুভূতি দেখিয়েছে মুসলিম-অমুসলিম, ধনী-গরীব সকল মানুষের সাথেই ন্যায়বিচারের আদেশ দিয়েছে, সুতরাং এক্ষেত্রে ভালোবাসার কোনো দখল চলবে না, শত্রুতাও কোনো প্রভাব ফেলবে না।
আল্লাহ তাআলা সবার আগে নিজের সাথে ন্যায়বিচারের আদেশ দিয়েছেন। তিনি মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তারা নিজের হক, তার রবের হক এবং অন্যদের হকের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করে। হযরত আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন তার স্ত্রীর প্রতি খেয়াল না রেখে সারাদিন রোজা আর সারারাত নামাজ পড়ে স্ত্রীর হক খর্ব করতে লাগলেন, তখন হযরত সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেছিলেন- "তোমার উপর তোমার রবের কিছু হক আছে। তোমার নিজের কিছু হক আছে এবং তোমার পরিবারেরও কিছু হক আছে। প্রত্যেককে প্রত্যেকের হক আদায় করো।"২৪৩
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান ফারসীর এ কথাকে সমর্থন করেছিলেন। ইসলাম কথা বলার ক্ষেত্রে ইনসাফ করার আদেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- "তোমরা যখন কথা বলো, তখন ইনসাফ করো। যদিও তারা তোমাদের নিকটাত্মীয় হয়।"২৪৪
ইসলাম বিচারের ক্ষেত্রে ইনসাফের আদেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে। আর যখন মানুষের মধ্যে ফায়সালা করবে, তখন ইনসাফের সাথে ফায়সালা করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কতইনা সুন্দর উপদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।"২৪৫
পরস্পরের মাঝে মীমাংসা করার ক্ষেত্রেও ইসলাম ইনসাফের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- "আর যদি মুমিনদের দু'দল বিবাদে লিপ্ত হয়, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর বাড়াবাড়ি করে, তাহলে যে দলটি বাড়াবাড়ি করবে তার বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করো। যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। তারপর যদি দলটি ফিরে আসে, তাহলে তাদের মধ্যে ইনসাফের সাথে মীমাংসা করো এবং ন্যায়বিচার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।"২৪৬
ইসলামে জুলুম-অত্যাচার হারামঃ ইসলাম ন্যায়বিচারের প্রতি যতটা আদেশ দিয়েছে এবং এর প্রতি উৎসাহ দিয়েছে, তারচেয়ে অনেক কঠিনভাবে জুলুমকে নিষেধ করেছে এবং চরমভাবে ইসলামে জুলুম বিরোধিতা করেছে। চাই জুলুম মানুষের সাথে হোক বা অন্যের সাথে। বিশেষত শক্তিশালীরা জুলুম করে থাকে দুর্বলদের উপর। ধনীরা জুলুম করে গরীবদের উপর। শাসকরা জুলুম করে জনগণের উপর। সবার সাথে সব ধরণের জুলুমই হারাম করে দিয়েছে ইসলাম। যে যত দুর্বল, তার সাথে জুলুম করলে গুনাহও তত প্রবল।২৪৭
হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা বলেন- "হে আমার বান্দারা! আমি আমার উপর জুলুমকে হারাম করেছি। আর তোমাদের মাঝেও জুলুমকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছি। সুতরাং তোমরা একে অপরের সাথে জুলুম করো না।"২৪৮
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুআয রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলতেন- "মাজলুমের বদদোয়াকে ভয় করো। কেননা, এর মাঝে এবং আল্লাহ তাআলার মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।"২৪৯
তিনি আরও বলেন- "তিন ব্যক্তির দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। ১. রোজাদারের দুআ, যখন সে ইফতার করে। ২. ন্যায়বিচারক শাসকের দুআ। ৩. মাজলুমের বদদোয়া। আল্লাহ তাআলা এগুলোকে মেঘের উপর উঠিয়ে নেন এবং আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেন। আর আল্লাহ তাআলা বলেন- আমার ইজ্জতের কসম! আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করবো, যদিও তা কিছুটা বিলম্বে হয়।"২৫০
এই হলো ইনসাফ এবং ন্যায়বিচারের সংক্ষিপ্ত আলোচনা। ইসলামী সমাজে যা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসা দাদিপাল্লা।
টিকাঃ
২৯৪. সূরা হাদীদ, আয়াত নং-২৫
২৯৫. মাআ'রিফুল কুরআনুল মুসলিমিন: ২৯০
২৯৬. সূরা নিসা, আয়াত নং-১৩৫
২৩৭. সুরা মাইদাহ, আয়াত নং-৮
২৩৮. আল্লামা ইবনে কাসীর রহঃ। তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাবগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- তাফসীরে ইবনে কাসীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ইত্যাদি।
২৪০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৩৪৮৬ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬৮৮
২৪২. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ২৮৮৮৬ সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৬৩০৬
২৪৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১৯০২ জামে তিরমিযী, হাদীস নং-২৮১৩
২৪৪. সুরা আনআম, আয়াত নং-১৫২
২৪৫. সুরা নিসা, আয়াত নং-৫৮
২৪৬. সুরা হুজুরাত, আয়াত নং-৯
২৪৭. মুহাম্মাদ মুস্তফা জামীল জুনাইদিয়: ১০৫
২৪৮. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২২৪৮৬ আবুআউ ইমান, হাদীস নং-৭০০৮
২৪৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৪০০০
২৫০. জামে তিরমিযী, হাদীস নং- ৩৫৯৮ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৮০৩০
📄 ইসলামে মমতাবোধ: গুরুত্ব ও কয়েকটি নমুনা
ইসলামী শরীয়তে মানবতাবোধের গুরুত্ব:
প্রথমত যদি আমরা আল্লাহ প্রদত্ত কিতাব পবিত্র কুরআন—যা সমস্ত মুসলমানের সর্ববিধান এবং ইসলামী শরীয়তের মূল উৎস—এর দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখা যায়, সূরা তাওবা ছাড়া প্রতিটি সূরাই শুরু হয়েছে বিসমিল্লাহ দ্বারা। বিসমিল্লাহ'র মধ্যে 'রহমান' (করুণাময়) এবং ‘রহীম’ (দয়ালু) নামক আল্লাহ তাআলার দুটি সিফাত রয়েছে। সুতরাং এটা স্পষ্ট, যেহেতু পবিত্র কুরআনের প্রত্যেকটি সূরা শুরু করা হয়েছে এই দুটি সিফাতের মাধ্যমে, তাহলে ইসলামী শরীয়তে করুণা ও দয়ার গুরুত্ব অনেক বেশি। আরবিতে রহমান এবং রহীম এ দুটি শব্দের অর্থ প্রায় কাছাকাছি। উলামায়ে কেরাম এ দুটি শব্দের পার্থক্য করতে গিয়ে অনেক ব্যাখ্যা এবং মতামত পেশ করেছেন।
আল্লাহ তাআলা দয়ার গুণের সাথে তার অন্যান্য গুণবাচক নামও উল্লেখ করতে পারতেন। যেমন: আযীম (অনেক বড়), হাকীম (অনেক জ্ঞানী), সামী’ (অধিক শ্রবণকারী), বাসীর (সর্বদ্রষ্টা) ইত্যাদি। আবার চাইলে দয়ার গুণের সাথে এমন কঠিন কোনো গুণবাচক নাম উল্লেখ করতে পারতেন, যার মাধ্যমে দয়া এবং কঠোরতা—এ দুটির মাঝে ভারসাম্য বজায় থাকত। যেমন: জাব্বার (প্রতাপশালী), মুতাকাব্বির (শ্রেষ্ঠদাতা), কাহহার (পরাক্রান্ত) ইত্যাদি। কিন্তু আল্লাহ তাআলা প্রত্যেকটি সূরার শুরুতে দয়া-মায়ার অর্থবোধক কাছাকাছি দু'টি শব্দ এনে আমাদের নিকট এটা অত্যন্ত স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে—নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলার অন্যান্য সকল গুণের আগে হলো দয়া-মায়া এবং রহমতের গুণ। আর দয়া-মায়ার সাথে কোনো কাজ করলে এটার প্রভাব বেশি পড়ে। পরস্পরে শত্রুতা তৈরি হয় না।
এ বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়, যদি আমরা পবিত্র কুরআনের দিকে তাকাই। আমরা দেখতে পাই, পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম সূরা হলো সূরা ফাতেহা। অন্যান্য সূরার মত এ সুরাটিও শুরু হয়েছে বিসমিল্লাহ দ্বারা। যার মধ্যে 'রহমান' ও ‘রহীম’ দু'টি সিফাতও রয়েছে। এরপর আমরা দেখি যে, সূরা ফাতেহার আয়াতের মধ্যে এ দু'টি সিফাত আরও রয়েছে। পবিত্র কুরআন শুরুও হয়েছে এ সূরার মাধ্যমেই। আর সূরা ফাতেহা এমন একটি সূরা, যা প্রত্যেক মুসলমানকে প্রত্যেকদিন নামাজের প্রত্যেক রাকাতওে পড়তে হয়। অর্থাৎ একজন মুসলমান এক রাকাত নামাজে রহমান শব্দটি কমপক্ষে দুইবার পড়ে। আর রহীম শব্দটিও পড়ে কমপক্ষে দুইবার। সুতরাং একজন বান্দা প্রত্যেক রাকাতে কমপক্ষে চারবার তার রবের রহমতের কথা স্মরণ করে। এভাবে একজন মুসলমান দৈনিক সতেরো রাকাত ফরজ নামাজে কমপক্ষে আটত্রিশবার রহমত এবং দয়া-মায়ার কথা বলে। দেখা গেলো, নামাজের মত এমন গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র অবস্থায়ও সবচেয়ে বেশি যে চিন্তাটা আসে, সেটা হলো—দয়া-মায়ার চিন্তা।
রহমতের নবী, দয়ার নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও আল্লাহ তাআলার অসীম দয়ার কথা বলেছেন। হযরত আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— “আল্লাহ তাআলা বিশ্ব-জাগৎ সৃষ্টির পূর্বেই লিখে রেখেছেন—আমার দয়া আমার ক্রোধের উপর অগ্রগামী। এই লেখাটা আল্লাহ তাআলার আরশে লেখা আছে।” এই হাদীসে এটা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, দয়া ক্রোধের উপর অগ্রগামী হবে।
মহান রাব্বুল আলামীন তার প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন বিশ্ব মানবতার এবং সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপ। আল্লাহ তাআলা বলেন— “আর আমি তো আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।” এ বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে যায়, যদি আমরা তার ব্যক্তি জীবনের দিকে তাকাই। দেখা যায়, তিনি সাহাবায়ে কেরাম এবং তার শত্রু- মিত্র সবার সাথেই দয়ার আচরণ করতেন। শুধু তাই নয়, তিনি তার উম্মতকেও এই মূল্যবান উপদেশে উৎসাহিত করে বলেন— “যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি দয়া করবেন না।” হাদীসের মধ্যে সমস্ত মানুষের প্রতি দয়া করার কথা বলা হয়েছে। এখানে কোনো জাতি বা ধর্মের কথা বিবেচনা করা হয়নি। এজন্য উলামায়ে কেরাম বলেন— “এই হাদীসটি ব্যাপক অর্থবোধক। এখানে শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ—সবাই অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং সবাইকে দয়া করতে হবে।”
আল্লাহ ইবনে বাতাল রঃ বলেন— “এই হাদীসের মধ্যে সমস্ত সৃষ্টির প্রতি দয়ার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং মুসলমান, কাফের, পশু-পাখি, গোলাম স্বাধীন—সবার প্রতিই দয়া করতে হবে। আর দয়া মানে—তাদেরকে খাওয়ানো, পান করানো, তাদের বোঝা হালকা করা এবং তাদেরকে কোনো রকম প্রহার না করা ইত্যাদি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে কসম খেয়ে বলেন— “ঐ সত্তার কসম! যার হাতে আমার জান। আল্লাহ তাআলা শুধুমাত্র দয়ালু ব্যক্তির উপরই দয়া করেন। সাহাবায়ে কেরাম বললেন—হে আল্লাহ রাসূল! আমরা প্রত্যেকেই তো দয়া করি। তিনি বললেন—তোমাদের একজন আরেকজনের উপর দয়া করলে হবে না শুধু, বরং সকল মানুষকেই দয়া করতে হবে।”
সুতরাং একজন মুসলমানকে শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ, মুসলিম, অমুসলিম—নির্বিশেষে সকল মানুষের উপরই দয়া করতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন— “তোমরা দুনিয়াবাসীর উপর দয়া করো। তাহলে আসমানে যিনি আছেন, তিনি তোমাদের উপর দয়া করবেন।” এখানেও দুনিয়াবাসী দ্বারা সমস্ত মানুষকেই বুঝানো হয়েছে।
মুসলিম সমাজের এই দয়া-মায়াটি হলো এমন একটি ব্যবহারিক নৈতিক মূল্যবোধ, যা একজন মানুষকে আরেকজন মানুষের সাথে সদা দয়ার প্রতি আহ্বান জানায়। এমনকি বিভিন্ন জাতি-ধর্ম-বর্ণ থেকে শুরু করে অবলা প্রাণী, চতুষ্পদ জন্তু, পশু-পাখি এবং কীট-পতঙ্গের প্রতিও দয়া করতে বলা হয়েছে। এক মহিলা একটি বিড়ালের প্রতিও দয়া না করে তার সাথে নিষ্ঠুর ব্যবহার করার কারণেই জাহান্নামী হয়ে গেছে। তার ব্যাপারে ঘোষণা দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— “এক মহিলা জাহান্নামে গিয়েছিল এই কারণে যে, সে একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখেছিল। তাকে কোনো খাবার- পানি দিতো না। আবার বিড়ালটি ছেড়েও দিতো না। ছাড়লে হয়তো সে জমিনের পোকা-মাকড় খেয়ে বেঁচে থাকতে পারতো।”
পশু-পাখির ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক ব্যক্তির কথা বলেন, যাকে আল্লাহ তাআলা মাফ করে দিয়েছিলেন এই জন্য যে, সে তৃষ্ণার্ত একটি কুকুরকে পানি পান করিয়েছিলো। তিনি বলেন— “এক লোক রাস্তায় চলতে চলতে তার ভীষণ পিপাসা লাগলো। সে একটি কুপে নেমে পানি পান করলো। এরপর সে বের হয়ে দেখতে পেলো, একটি কুকুর হাঁপাচ্ছে এবং পিপাসায় কাতর হয়ে সে মাটি চাটছে। লোকটি ভাবলো, কুকুরটাও আমার মতো পিপাসা লেগেছে। সে কূপের মধ্যে নামলো। এরপর নিজের মোজা ভরে পানি নিয়ে মুখ দিয়ে ধরে উপর উঠে আসলো এবং কুকুরটিকে পানি পান করিয়ে দিলো। আল্লাহ তাআলা তার এই আমলকে কবুল করে তার জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিলেন। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন—হে আল্লাহর রাসূল! চতুষ্পদ জন্তুর উপকার করলেও কি আমাদের সওয়াব হবে? তিনি বললেন—প্রত্যেক প্রাণীর উপকার করাতেই সওয়াব রয়েছে।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদেরকে এই ঘটনাগুলো শুনিয়েছেন যে, এক ব্যভিচারিণী মহিলাও জান্নাতের সকল দরজা খুলে দিয়েছে তার অজান্তে কুকুরের মত একটি প্রাণীর প্রতি দয়ার উদ্রেক হওয়ার কারণে। তিনি বলেন— “একটি কুকুর পিপাসায় যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে এক কুপের পাশ দিয়ে ঘুরছিল। বনী ইসরাঈলের এক ব্যভিচারিণী মহিলাও এই অবস্থা দেখে তার মোজা খুলে সেটা দিয়ে কুপ থেকে পানি উঠিয়ে কুকুরকে পান করালো। আল্লাহ তাআলা তাকে মাফ করে দিলেন।”
অবলা প্রাণী এবং ক্ষুদ্র প্রাণীর প্রতি দয়া:
ইসলামে যে দয়া-মায়ার কথা বলা হয়েছে, এটা শুধু মানুষের প্রতিই না; বরং অবলা প্রাণীর প্রতিও দয়া করতে হবে। তাদেরকে ক্ষুধার্ত রাখা যাবে না এবং তাদের পিঠে সাধ্যাতীত বোঝা দেওয়া যাবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক দুর্বল উটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেন— “এইসব পশুর পিঠের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। সুস্থ-সবল পশুর পিঠে আরোহণ করো এবং তাদেরকে ভালোভাবে আহার করাও।” এক ব্যক্তি বললো— “হে আল্লাহর রাসূল! আমি বকরি জবাই করার সময়ও কি তার প্রতি দয়া করবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—যদি তুমি বকরির উপর দয়া করো, তাহলে আল্লাহ তাআলা তোমার উপর দয়া করবেন।”
ইসলাম বড় প্রাণীদেরকে তো দয়া করতে বলেছেই, সাথে সাথে ঐ সমস্ত ছোট ছোট পাখিদের প্রতিও দয়া করতে বলেছে, যেগুলো বড় প্রাণীর মত মানুষের তেমন উল্লেখযোগ্য কাজে আসে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক ছোট পাখি দেখে বললেন— “যে ব্যক্তি কোনো ছোট পাখি হত্যা করলো, কিয়ামতের দিন তা আল্লাহ তাআলার কাছে উচ্চ স্বরে ফরিয়াদ করে বলবে—হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমাকে অযথা হত্যা করেছিলো। সে কোনো উপকারার্থে আমাকে হত্যা করেনি।”
ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেন—মিশর বিজয়ের সময় হযরত আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুর তাবুর কাছে একটি কবুতর নামলো এবং তাবুর উপর বাসা বানালো। হযরত আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন সেখান থেকে চলে যাওয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন তিনি এই পাখির বাসাটি দেখলেন। তিনি আর এই বাসাটা ধ্বংস করলেন না। তাবু এভাবেই রেখে গেলেন। পরে এর আশপাশে আরও পাখির বাসা হতে হতে একসময় ঐ তাঁবুটা একটা পাখির নগরে পরিণত হলো।
হযরত ইবনে আবুল হাকাম হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয রাদিয়াল্লাহু আনহুর জীবনীতে লেখেন—হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয রাদিয়াল্লাহু আনহু বিনা প্রয়োজনে ঘোড়াকে পদাঘাত করতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। তিনি ঘোড়ার মালিকদের নিকট চিঠি লিখেছিলেন যে, তারা যাতে ভারী জিন দ্বারা ঘোড়াকে না বাঁধে। আর এমন চাবুক দ্বারা খোঁচা না দেয়, যার নিচে লোহার পাত লাগানো থাকে। তিনি মিসরের গভর্নরদের নিকট চিঠি লিখে বলেন— “আমার নিকট খবর এসেছে যে, মিশরে বোঝাবাহী উটের উপর এক হাজার রিভল ওজনের বোঝা দেখা যায়। তোমাদের কাছে আমার এই চিঠি পৌঁছার পর থেকে কেউ যেনো ছ'হাজার রিভলের বেশি ওজনের বোঝা উটের পিঠে না দেয়।”
এই হলো ইসলামী সমাজে দয়া-মায়ার চিত্র। যখন সমাজের প্রত্যেকটা মানুষের অন্তরে দয়া থাকবে, তখন দেখা যাবে—তারা দুর্বলদের সাহায্য করছে। দুঃখীদের ব্যথায় ব্যথিত হচ্ছে। অসুস্থদের সেবা করছে। অভাবীদের অভাব পূরণের চেষ্টা করছে। যদিও এগুলো হয় বোবা প্রাণী বা পশু-পাখি। এসব হৃদয়বান দয়ালু মানুষগুলোর মাধ্যমেই সমাজ সুন্দর হয়। অন্যায় দূর হয়। চারিদিকে শান্তি, সাম্য আর কল্যাণ ছড়িয়ে পড়ে।
টিকাঃ
২০২. রহমান ও রহীম এ দুটি শব্দের পার্থক্য করতে গিয়ে উলামায়ে কেরাম অনেক ব্যাখ্যা এবং মতামত পেশ করেছেন।
২০৩. পবিত্র কুরআনের সূরাসমূহের ক্রমবিন্যাস আল্লাহ প্রদত্ত।
২০৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৭১৯৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৭৫১।
২০৫. সূরা আম্বিয়া, আয়াত নং- ১০৭।
২০৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৯৪১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৩১৯।
২০৭. আল মিনহাজ: ৯৭/১৮।
২০৮. ইবনে বাতাল রহ.। তাঁর নাম: আবু আল হাসান খলফ ইবনে আব্দুল মালিক ইবনে বাতাল।
২০৯. মফাতীহুল আওতাঈ: ৪/৪২।
২১০. মুসলিম শরিফ, হাদীস নং- ৪২৮৮; বুখারী, হাদীস নং- ১১০৪০।
২১১. জামে তিরমিযী, হাদীস নং- ১৮২৬; মুসনাদে আহমাদ।
২১২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৩২৮০।
২১৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬১২৪।
২১৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২২৩৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২২৪৮।
২১৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৩২৮০।
২১৬. সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং- ২১৪৮; মুসনাদে আহমাদ।
২১৭. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ১৬৯৯০।
১৮৯. সুনানুন নাসাঈ, হাদীস নং- ৪৪৪৩; মুসনাদ আহ্মাদ, হাদীস নং-১৮৪৬৮।
১৯০. রিভল ওজনের পরিমাপ।
১৯১. সীরাতু উমর ইবনে আব্দুল আযীয:১/১৮১।
📄 ইসলামে মুসলিম-অমুসলিম সম্পর্ক
ভূমিকা: একটি মুসলিম রাষ্ট্রে কিভাবে মুসলিম এবং অমুসলিমরা শৃঙ্খলা বজায় রেখে থাকতে পারে, ইসলামী সভ্যতা শুধু এই নীতিমালা বলেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং মুসলিমরা কিভাবে অমুসলিম সম্প্রদায় এবং অমুসলিম বিশ্বের সাথে মিলেমিশে থাকতে পারে, এই বিষয়টিও অনেক গুরুত্বসহ আমলে নিয়েছে ইসলাম। এজন্য ইসলাম এমন এমন নীতিমালা এবং দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে, যার মাধ্যমে সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলা সম্ভব হয়। এর দ্বারা ইসলামী সভ্যতার মাহাত্ম্য এবং উদার মানবতা স্পষ্ট ফুটে ওঠে।
ইসলাম শান্তির ধর্মঃ শান্তিই হলো ইসলাম ধর্মের মূলমন্ত্র। যারা আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান এনেছে এবং তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নবী হিসেবে মেনে নিয়েছে; অর্থাৎ যারা পরিপূর্ণ মুসলমান, তাদেরকে লক্ষ্য করেই আল্লাহ তাআলা বলেন— “হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখিল হয়ে যাও। তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।”
উক্ত আয়াতে ইসলাম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—শান্তি। এটা এমন এক শান্তির ধর্ম, যদি কারও জীবনে তা থাকে, তাহলে তার জীবনে শান্তি। যদি কোনো ঘরে থাকে, তাহলে ঐ ঘরে শান্তি। যদি কোনো সমাজে থাকে, তাহলে ঐ সমাজে শান্তি। যদি কোনো রাষ্ট্রে থাকে, তাহলে ঐ রাষ্ট্রে শান্তি। এর নামই হলো ইসলাম।
ইসলাম ধর্ম যে শান্তির ধর্ম, এটা অত্যন্ত স্পষ্ট বিষয়। কেননা, আমরা দেখি—আরবীতে ইসলাম (الإسلام) শব্দটির মূল উৎস হলো سَلَم (সিলমুন)—যার অর্থ—শান্তি। আর শান্তি হলো ইসলামের অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যদি শান্তিকে ইসলামের বিশেষ বৈশিষ্ট্য নাও মানা হয়, তবুও শাব্দিক অর্থে ইসলামের মূল অর্থ হলো—শান্তি।
সুতরাং শান্তি হলো ইসলাম ধর্মের মূলমন্ত্র। যা একটা মানুষকে অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা, সদ্ভাবহার এবং সমাজে শৃঙ্খলা আর পরোপকারে উদ্বুদ্ধ করে। অমুসলিমরা যখন কোনো বিশৃঙ্খলা না করে শান্তিপূর্ণভাবে থাকে, তখন ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলিম-অমুসলিম সবাই মানুষ হিসেবে নিরাপদ।
মুসলিম-অমুসলিমদের মাঝে সর্বদা শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় থাকবে। শান্তির জন্য আলাদা কোনো চুক্তির প্রয়োজন নেই। যতদিন পর্যন্ত অমুসলিমরা মুসলমানদের সাথে যেকোনো ধরণের শত্রুতায় লিপ্ত না হবে, ততোদিন পর্যন্ত তারা কোনো রকম চুক্তি ছাড়াই শান্তি ও নিরাপত্তা ভোগ করবে।
অমুসলিমদের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক: ইসলাম ধর্ম সমস্ত মুসলমানদের উপর এটা ওয়াজিব বা আবশ্যক যে, তারা অন্য বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী অমুসলিমদের সাথে সদ্ভাব ও সম্প্রীতির সম্পর্ক রাখবে। এই মানবতাপূর্ণ ভ্রাতৃত্বের প্রতি ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তাআলা বলেন— “হে মানবসকল! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও।”
উক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা যায়— “পরস্পর বিচ্ছিন্নতা-বিদ্বেষের জন্য আল্লাহ তাআলা জাতি-গোত্র ভাগ করেননি। বরং তাদের পরস্পর পরিচিতি, ভালোবাসা আর সদ্ভাব বৃদ্ধির জন্যই এই বিভক্তি।” এই আয়াতটি আরও স্পষ্ট হয় পবিত্র কুরআনের ঐ সকল আয়াত দ্বারা, যেখানে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে—যদি কাফেররা তোমাদের সাথে শান্তিরীতি সম্পন্ন হতে চায়, তবে তাদের সাথে মিলেমিশে শান্তিতে থাকার ব্যবস্থা করো। আল্লাহ তাআলা বলেন— “আর যদি তারা সন্ধি করতে আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে তুমিও সেদিকেই আগ্রহী হও। আর আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা করো।”
এই আয়াতটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অমুসলিমদের প্রতি মুসলমানদের সহিষ্ণুতা এবং সদ্ভাবপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করে। শত্রু পক্ষ যখন শান্তিপূর্ণভাবে থাকার আগ্রহ দেখাবে, তখন এতে যদি মুসলমানদের কোনো রকম ক্ষতির আশংকা না থাকে এবং যেকোনো ধরণের ক্ষতি না হয়, তাহলে তারা এই শান্তিপূর্ণ চুক্তির আহ্বানে সাড়া দিবে। ইমাম যুহরী এবং ইবনে যায়েদ রহ. বলেন— “এই আয়াতের অর্থ হলো—যদি তারা তোমাকে সন্ধির আহ্বান করে, তাহলে তুমিও তাতে সাড়া দাও।”
এই আয়াতের পরবর্তী আয়াতে মুসলমানদেরকে উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে—যাতে তারা সর্বদা শান্তি বজায় রাখে। এমনকি শত্রুপক্ষ যদি মুখে শান্তির বাণী বলে আর ভেতরে ভেতরে শত্রুতা পোষণ করে, সেক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অভয় দিয়ে বলেন— “পক্ষান্তরে তারা যদি তোমার সাথে প্রতারণা করতে চায়, তবে তোমার জন্য আল্লাহ তাআলাই যথেষ্ট। তিনিই তোমাকে শক্তি যুগিয়েছেন স্বীয় সাহায্যে আর মুসলমানদের মাধ্যমে।” অর্থাৎ আল্লাহ তাআলাই তোমাকে হেফাজত এবং সুরক্ষা দান করবেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের সকল কাজে শান্তির কথা বিবেচনা করে তাদেরকে শান্তির পথ দেখিয়েছেন এবং সর্বদা শান্তিতে থাকার জন্য দুআ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি দুআর মধ্যে বলতেন— اللهم اني أسئلك العافية في الدنيا والآخرة (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি ও নিরাপত্তা চাই)। একবার তিনি সাহাবায়ে কেরামের মাঝে বক্তৃতা দানকালে বলেন— “তোমরা শত্রুর সাথে সাক্ষাৎ কামনা করো না। বরং তোমরা শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করো। আর যখন তোমরা তাদের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন তোমরা ধৈর্যের পরিচয় দাও।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হারব (যুদ্ধ) শব্দটাও অপছন্দ ছিলো। তিনি বলেন— “আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় নাম—আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান। সবচেয়ে বিশ্বস্ত নাম—হারেস ও হাম্মাম। আর সবচেয়ে অপছন্দনীয় নাম হলো—হারব ও মুররাহ।”
টিকাঃ
২৯৮. সূরা বাক্বারাাহ, আয়াত নং-২০৮।
২৯৯. আল ইসলামু ওয়াল আলাকাতুদ দুয়ালিয়্যাহ:৩০৬।
৩০০. ইবনুল ইসলামু আক্বাইদুল্লু ওয়া শারিয়াতিহি:৪৫৩।
৩০১. আল নাব্যুমুল ইসলামিয়্যাহ লান্নাহওয়া ওয়া তাত্মিয়াতিহা:৯৪০।
৩০২. সূরা হুজুরাত, আয়াত নং-১৩।
৩০৩. জান্নাতুল হাক্ব:১৮।
৩০৪. সূরা আনফাল, আয়াত নং-৬১।
৩০৫. ইসমাইল ইবনে আব্দুর রহমান আল-যুহরী। তিনি ছিলেন একজন তাবেঈ।
৩০৬. আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম। তিনি একজন ফকীহ ও মুফাস্সির।
৩০৭. তাফসীরে কুরতুবী:৮/৮৮-৪।
৩০৮. সূরা আনফাল, আয়াত নং-৬২।
৩০৯. তাফসীরে কুরতুবী: ৪/৬০০।
১৩১. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৫০৭৪।
১৩২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২১০৪।
১৩৩. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৪৬৫০।
📄 মুসলিম-অমুসলিম সন্ধি-চুক্তি
ভূমিকাঃ মুসলমানদের সাথে অমুসলিমদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সন্ধি-চুক্তির বিধান ইসলামে আছে। এর মাধ্যমে সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা কায়েম হয়। আর মুসলিম-অমুসলিম এক ছায়াতলে এসে জমা হয়। মুসলমানদের সাথে অমুসলিমদের সম্পর্কের মূল উদ্দেশ্য হলো—সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা। এজন্য চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে স্থায়ীভাবে শান্তিচুক্তি করা হয়ে থাকে। অথবা এমন মজবুত স্থায়ী শান্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়ে থাকে, যাতে চুক্তি বহাল থাকা পর্যন্ত নতুন করে আর কোনো শত্রুতা তৈরি না হয় এবং দু'পক্ষই যুদ্ধ থেকে বিরত থাকে। যুগযুগ ধরে ইসলামী রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন অমুসলিম রাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন সন্ধি-চুক্তি করে আসছে।
সন্ধি বা চুক্তি কাকে বলে? সন্ধি বা চুক্তি হলো—এমন কিছু প্রতিশ্রুতি বা প্রতিজ্ঞা বা শপথ অথবা ওয়াদা, যা যুদ্ধকালীন বা শান্তিকালীন সময়ে কোনো মুসলিম দেশ অমুসলিম দেশের সাথে করে থাকে। সাধারণত যুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধ বিরতি দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার চুক্তিকে সন্ধি বলা হয়ে থাকে। মুসলমানদেরকে যুদ্ধ বিরতি দিয়ে সন্ধি-চুক্তি করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন— “যদি তারা সন্ধি করতে আগ্রহী হয়, তাহলে তোমরা তাদের আহ্বানে সাড়া দাও।”
ইসলামে সন্ধি-চুক্তির কিছু নমুনাঃ
মদীনার ইহুদীদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সন্ধি:-
অমুসলিমদের সাথে মুসলিম রাষ্ট্রের যেসকল সন্ধি হয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম সন্ধি হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মদীনায় আগমনের পর মদীনার ইহুদীদের সাথে সন্ধি। এ সন্ধিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন— “ইহুদীরা মুসলমানদের সাথে বসবাস করতে থাকবে, যতক্ষণ না তারা মুসলমানদের সাথে কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। বনী আওফের ইহুদীরা মুসলমানদের সাথে একই উম্মত বলে গণ্য হবে। ইহুদীরা তাদের ধর্ম পালন করবে। মুসলমানরা মুসলমানদের ধর্ম পালন করবে। তারা নিজেরা এবং তাদের মিত্ররাও এই অধিকার ভোগ করবে। তবে যে জুলুম করবে এবং কোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত হবে, সে তার নিজের এবং পরিবারের শুধু ধ্বংসই ডেকে আনবে। বনু নাজ্জার, বনু হারেস, বনু সায়েদা, বনু জুশাম, বনু আউস এবং বনু শাতিবা’র ইহুদীরাও বনু আওফের ইহুদীদের মত সব অধিকার ভোগ করবে।
ইহুদীদের আভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো তাদের জীবনের মতই সম্মানযোগ্য। ইহুদীদের ব্যয়ভার ইহুদীরাই বহন করবে। আর মুসলমানদের ব্যয়ভার মুসলমানরাই বহন করতে হবে। কারও কোনো সমস্যা থাকলে তাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করতে হবে। আর পরস্পরের মাঝে কল্যাণকামনা, সদুপদেশ ও মহানুভবতার সম্পর্ক থাকবে। কোনো অন্যায় কাজে একে অপরের শরীক হবে না। মজলুমের সাহায্য করা প্রত্যেকের কর্তব্য।
প্রতিবেশি যদি অপরাধী না হয় এবং কোনো ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত না হয়, তাহলে তার জান, মাল ও ইজ্জত নিজের জান, মাল ও ইজ্জতের মতই পূর্ণ নিরাপত্তার অধিকারী। এই সন্ধির অন্তর্ভুক্ত যারা আছে, তাদের মাঝে যেকোনো ধরণের ঝগড়া-বিবাদ ঘটুক না কেনো, এর ফায়সালার জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলের শরণাপন্ন হতে হবে। মদীনায় কেউ আক্রমণ করতে এসে এই সন্ধির অন্তর্ভুক্ত সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে তা প্রতিরোধ করবে। যখন সন্ধি ও মৈত্রী স্থাপনের আহ্বান জানানো হবে, তখন তারা আহ্বানকারীদের সাথে সন্ধি করবে। আল্লাহ তায়ালা এই সন্ধির আনুগত্যের ব্যাপারে সর্বাধিক সততা ও সত্যবাদিতা দেখতে চান। এই সন্ধিপত্র কোনো অত্যাচারী বা অপরাধীর জন্য রক্ষাকবচ নয়। আর জুলুম কিংবা অপরাধে লিপ্ত না হলে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা নির্ভয়ে বসে থাকা লোকও মদীনার সীমানার ভেতরে নিরাপত্তা লাভ করবে।”
নাজরানের খৃষ্টানদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সন্ধি:-
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজরানের খৃষ্টানদের সাথে সন্ধি করেছিলেন। এ ব্যাপারে বলা হয়েছে— “নাজরান ও তার আশপাশের অধিবাসীদের জান, মাল, ধর্ম, জমিন, পরিবার, বংশ এবং তাদের অধীন কমবেশি সবকিছুই আল্লাহ ও তার রাসূলের জিম্মাদারিতে ছিলো।”
বনু জুমারার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সন্ধি:-
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু জুমারার সাথে সন্ধি করেছিলেন। তাদের সর্দার ছিলো—মাখশি’ ইবনে আমর আল-জমীরী। তিনি বনু মুদাদাজের সাথেও সন্ধি করেছিলেন। তিনি আরও সন্ধি করেছিলেন জুহাইনার বিভিন্ন গোত্রের সাথে।
উমরী সন্ধি:-
ইসলামী সংবিধানের মধ্যে অন্যতম একটি সন্ধি হলো—ইলিয়া (বাইতুল মাকদিস) এর অধিবাসীদের সাথে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর সন্ধি। ইতিহাসে এটাকে বলা হয়—উমরী সন্ধি।
ইসলামের এসব সন্ধির দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, মুসলমানগণ সর্বদা তাদের প্রতিবেশিদের সাথে শান্তি, নিরাপত্তা এবং সমঝোতামূলক পরিবেশ বজায় রেখে চলার চেষ্টা করেছেন। শুধু শুধু অন্যের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েননি; বরং সর্বদা যুদ্ধের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন শান্তিকে।
ইসলামে সন্ধির বিভিন্ন শর্ত এবং নীতিমালাঃ
শাইখ মাহমুদ শালতূত রহ. বলেন—ইসলাম মুসলমানদেরকে যে সন্ধি করার অধিকার দিয়েছে, এই সন্ধি সহীহ হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত মানতে হবে।
এক. সন্ধির শর্তগুলো কোনো ব্যক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সাধারণ আইন এবং শরীয়তের কোনো আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না। এক্ষেত্রে মূলনীতি হলো— “যেসকল শর্ত আল্লাহ তাআলার কিতাবের বিপরীত, সেগুলো বাতিল।”
দুই. সন্ধিটি দুই পক্ষের সম্মতিতে হতেই হবে। সুতরাং যেসব সন্ধি নির্যাতন, নিপীড়ন এবং জবরদস্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, ইসলামে এসব সন্ধি গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন— “কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে যে ব্যবসা করা হয়, তা বৈধ।”
তিন. সন্ধির প্রতিটি বিষয় হতে হবে অত্যন্ত স্পষ্ট। যেখানে প্রতিটি নীতিমালা, অধিকার এবং কর্তব্য ব্যাখ্যাসহ স্পষ্ট উল্লেখ করা থাকবে। যাতে সেখানে কোনো অপব্যাখ্যা বা ধোঁকার কোনো রকম সুযোগ না থাকে। দিকনির্দেশনা দিয়ে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন— “তোমরা স্বীয় কসমসমূহকে পারস্পরিক ধোঁকা-বাহানা বানিয়েও না। তাহলে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আবার পা ফসকে যাবে।”
সন্ধি পূরণের বাধ্যকতাঃ
পবিত্র কুরআনের বহু আয়াত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বহু হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, সন্ধি পূরণ করা ওয়াজিব বা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেন— “হে ঈমানদারগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহকে পূর্ণ করো।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— “চারটি স্বভাব যার মধ্যে পাওয়া যাবে, সে খাঁটি মুনাফিক বলে গণ্য হবে। ১. যে ব্যক্তি কথা বলার সময় মিথ্যা বলে। ২. যে অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে। ৩. যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে। ৪. যে কথায় কথায় ঝগড়া ও গালাগালি করে।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন— “যদি কারও সাথে কোনো চুক্তির সন্ধি থাকে, তাহলে সন্ধির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তা নবায়ন করা যাবে না, আবার ভঙ্গও করা যাবে না। যখন সন্ধির মেয়াদ শেষ হবে, তখন ঘোষণা দিয়ে তা শেষ করতে হবে।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন— “সাবধান! যে ব্যক্তি চুক্তিবিদ্ধ সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির উপর জুলুম করবে, বা তার প্রাপ্য কম দিবে, কিয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষ বাদী হবো।”
ইসলামী ইতিহাসে এ জাতীয় আরও বহু উদাহরণ পাওয়া যায়। পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং জাতীয় স্বার্থ পরিবর্তনের লক্ষ্যে কোনো সন্ধি-চুক্তি ভঙ্গ করাকে ইসলাম সমর্থন করে না। অনৈসলামিক রাষ্ট্রের সাথে যেসব চুক্তি করা হবে, মুসলমানরা কোনো চুক্তি ভঙ্গ করবে না; বরং তা পুরোপুরিভাবে পালন করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত শত্রুপক্ষ তা ভঙ্গ না করে। শাইখ মাহমুদ শালতূত রহ. বলেন— “চুক্তি পূরণ করা একটি ধর্মীয় দায়িত্ব। এটি লঙ্ঘন করা ধোঁকা এবং বিশ্বাসঘাতকতা।”
ইসলামে দূতের নিরাপত্তা:
দূতের নিরাপত্তার বিষয়ে ইসলামী শরীয়তে চূড়ান্ত পর্যায়ের সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো দূতকে হত্যা করা অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন। ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ ফুকাহায়ে কেরাম মুসলিম শাসকদেরকেও স্পষ্ট বলে দিয়েছেন— দূতদেরকে পূর্ণ সহায়তা এবং নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে।
হযরত আবু রাফে' রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন— “মক্কার কুরাইশরা আমাকে দূত হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পাঠালো। আমি তাকে দেখা মাত্রই আমার অন্তরে ইসলাম গ্রহণের প্রচণ্ড আগ্রহ জাগলো। আমি বললাম—হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি আর কখনও তাদের কাছে ফিরে যাবো না। তিনি বললেন—আমি চুক্তি ভঙ্গ করি না। দূতকে আটকে রাখি না। তুমি তাদের কাছে ফিরে যাও।”
ইমাম হাইছামী রহ. তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব— ‘মাজমাউয যাওয়ায়েদ’ এ জাতীয় হাদীসসমূহ নিয়ে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন যার নাম ‘দূত হত্যায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিষেধাজ্ঞা’। সেখানে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূতদের বলেছিলেন— “আমি যদি দূতদেরকে হত্যা করতাম, তাহলে এখন তোমাদের গর্দান উড়িয়ে দিতাম।” এভাবেই ইসলামী সভ্যতা দূতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
টিকাঃ
১৩৪. আল আলাকাতুল দুওয়ালিয়্যাহ ফিল ইসলাম: ৭৮।
১৩৫. সূরা আনফাল, আয়াত নং-৬১।
১৩৬. সীরাতে ইবনে হিশাম:৫০৪-৫০৬/১।
১৩৭. আল আলাকাতুদ দুওয়ালিয়্যাহ ফিল ইসলাম:৮৪।
১৩৮. সীরাতুন নববিয়্যাহ:৬/৪৮৫।
১৩৯. সীরাতে ইবনে হিশাম:১/১৮৫।
১৪০. তাবারী তাবারী:২/৪৪৩-৪৫০।
১১২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৩৪৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৫৩৪।
১১৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৩৪৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৫৩৪।
১১৪. সূরা নিসা, আয়াত নং-২৯।
১১৫. সূরা নাহল, আয়াত নং-৯৪।
১১৬. সূরা মাইদাহ, আয়াত নং-১।
১১৭. সূরা আনআম, আয়াত নং-১৫২।
১১৮. সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত নং-৩৪।
১১৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩০৫৭।
১২০. শরহু মুসলিম লিন নববী:৪/৪৭।
১২১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩০২৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৭৩৭।
১২২. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৭৯৪।
১২৩. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৪৬৪।
১২৪. সূরা নাহল, আয়াত নং-৯১।
১২৫. সূরা তাওবাহ, আয়াত নং-৪।
১২৬. আল ইসলামু আকীদাতুহু ওয়া শরীয়াতুহু:৪৮৭।
০০৭. আল মুয়াত্তা: ৪/০০৭।
০০৮. আল শরহুল ইসলামিয়্যাহ ওয়াল ক্বানুনুদ দুওয়ালিল আ’ম: ১২৪।
০০৯. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং- ২৭৬২; মুসনাদে আহমাদ; মাজমাউয যাওয়ায়েদ।