📘 ইসলামই দিয়েছে সবার অধিকার > 📄 ইসলামী সমাজে সহযোগিতা-সহমর্মিতা

📄 ইসলামী সমাজে সহযোগিতা-সহমর্মিতা


ভূমিকাঃ ইসলামী শরীয়ত যেখানে তার মুসলিম অনুসারীদেরকে সুখে-দুঃখে এবং কষ্ট-বেদনায় একে অপরের সহমর্মিতা এবং সহানুভূতি নির্দেশ দিয়েছে, সেখানে প্রয়োজন এবং অভাবের মুহূর্তেও একে অপরের সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। ইসলাম মনে করে- সমস্ত মুসলমান হলো ইঁট দ্বারা গঠিত একটি প্রাসাদের মত। যেখানে একটি ইঁট আরেকটা ইঁটকে শক্তিশালী করে। এজন্য হযরত আবু মূসা আশআরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “এক মুসলিম আরেক মুসলিমের জন্য প্রাসাদের মত। যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে।”১১৮

আবার এভাবেও বলা যায় যে, সমস্ত মুসলমান একটি দেহের মত। যখন তার একটি অঙ্গ আক্রান্ত হয়, তখন সারা দেহটাই ব্যথিত হয়ে পড়ে। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “পরস্পর ভালোবাসা, দয়াদ্ৰতা এবং সহানুভূতির ক্ষেত্রে সমস্ত মুসলমান একটি দেহের মত। যখন তার একটি অঙ্গ আক্রান্ত হয় তখন তার সমস্ত দেহ ব্যাথা ও অনিদ্রায় ছেয়ে যায়।”১১৯

ইসলামে ব্যাপক সহযোগিতা: ইসলামে সামাজিক সহযোগিতা শুধু জাগতিক কল্যাণের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়- যদিও এটা সহযোগিতার মূল ক্ষেত্র- বরং ব্যক্তি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সমাজের সকল প্রয়োজনেই রয়েছে ইসলামে সহযোগিতার বিধান। চাই সে প্রয়োজনীয়তা হোক জাগতিক বা নৈতিক অথবা বুদ্ধিবৃত্তিক। কেননা ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীর সমস্ত মৌলিক অধিকারগুলো এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে থাকে। ইসলামে সহযোগিতামূলক সকল শিক্ষা মুসলমানদের মাঝে ব্যাপক সহযোগিতাকেই বুঝায়। এজন্য দেখা যায় ইসলামী সমাজে নেই কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থবাদ এবং সংকীর্ণ মনোভাব। বরং ইসলামী সমাজে রয়েছে আন্তরিক ভ্রাতৃত্ব, উদার দানশীলতা আর সর্বদা সৎ কাজে সহযোগিতা।

ইসলামে সার্বজনীন সহযোগিতা: ইসলামে এই সামাজিক সহযোগিতা শুধু মুসলমানরাই ভোগ করবে না; বরং ভিন্ন মতাবলম্বী বিভিন্ন ধর্মের প্রত্যেক মানুষ এই সহযোগিতার ভোগ করার অধিকার রাখে। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন- “দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়িঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালোবাসেন।”১২০

কেননা, সহযোগিতা-সহমর্মিতার মূল কারণ হলো- মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের মর্যাদা রক্ষা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আমি আদম সন্তানদেরকে সম্মানিত করেছি এবং তাদেরকে জলস্থলে চলাচলের জন্য বাহন দান করেছি। তাদেরেকে উত্তম রিযিক দান করেছি। আর আমার সকল সৃষ্টির মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।”১২১

ইসলামী সমাজে মানুষের পরস্পর সহযোগিতা-সহমর্মিতার ব্যাপারে যে সকল নীতিমালা রয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম হলো এই আয়াতটি। যেখানে আল্লাহ তাআলা বলেন- “ভালো কাজ এবং খোদাভীতির ক্ষেত্রে তোমরা একে অপরের সহযোগিতা করো। মন্দকাজ এবং সীমালঙ্ঘনে একে অপরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা কঠিন শাস্তি প্রদানকারী।”১২২

ইমাম কুরতুবী১২৩ রহ: বলেন- “এ আয়াতে সকল মানুষকে ভালো কাজে সহযোগিতা আদেশ করা হয়েছে। অর্থাৎ তারা সবাই একে অপরকে সহযোগিতা করবে।”১২৪

ইমাম মাওয়ার্দী১২৫ রহ: বলেন- “আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াতে মানুষের সহযোগিতার সাথে সাথে খোদাভীতিও সম্পর্ক করে দিয়েছেন। কেননা, খোদাভীতিতে রয়েছে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি। আর সহযোগিতায় রয়েছে মানুষের সন্তুষ্টি। যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি এবং মানুষের সন্তুষ্টি- দুটিই পেলো, সেই প্রকৃত সফলকাম এবং পরম সৌভাগ্যবান।”১২৬

ইসলামে যাকাতের গুরুত্ব: পবিত্র কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণা- ধনীদের সম্পদে একটা নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে- অভাবী ও গরীবদের জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন- “যাদের সম্পদে রয়েছে নির্ধারিত অধিকার- অভাবী এবং বঞ্চিতদের জন্য।”১২৭

“যাদের সম্পদে নির্ধারিত পরিমাণ অন্যের অধিকার রয়েছে, শরীয়ত নিজেই সেই পরিমাণের কথা স্পষ্ট বর্ণনা করে দিয়েছে। আর এই নির্ধারিত পরিমাণ দানে রয়েছে- ধনীদের দানশীলতা, নেককারদের বদান্যতা, গরীবের প্রতি দয়াদ্ৰতা, পরস্পরে ভালোবাসা, দানশীলতায় উদ্বুদ্ধ করা আর ভালো কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদানের এক অনুপম শিক্ষা।”১২৮

শরীয়ত কর্তৃক এই নির্ধারিত পরিমাণে উপযুক্ত কারা, সেটাও পবিত্র কুরআনেই বলে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- “নিশ্চয়ই সাদাকা হচ্ছে গরীব-মিসকিনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য। আর যাদের অন্তর (ইসলামের প্রতি) আকৃষ্ট করা হয় তাদের জন্য। এই অর্থ ব্যয় করা যায়- গোলাম আযাদ করার ক্ষেত্রে। ঋণগ্রস্তদের মধ্যে। আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ তাআলা মহা জ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।”১২৯

ইসলামে যাকাতের গুরুত্ব অনেক বেশি। কেননা, সমাজের বিরাট এক অংশ এর মাধ্যমে উপকৃত হয়। যাকাত এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার মূল কারণ হলো- এর মাধ্যমে অন্যের সহযোগিতা এবং সহায়তা করা হয়। যাকাত ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। এটা ছাড়া ইসলামই পূর্ণতা লাভ করে না। যাকাত যাকাতদাতার অন্তরকে পবিত্র ও পরিছন্ন করে। সুতরাং যাকাতগ্রহীতার উপকারের আগেই যাকাতদাতার উপকার হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন- “তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা (যাকাত) নাও। এর মাধ্যমে তাদেরকে তুমি পবিত্র ও পরিছন্ন করবে।”১৩০

এতে সন্দেহ নেই যে, যাকাত যেমনভাবে যাকাতদাতার অন্তর থেকে লোভ, কৃপণতা ও আত্মস্বার্থকে বের করে দেয়; তেমনিভাবে গরীব, অভাবী এবং যাকাতের উপযুক্ত ব্যক্তির অন্তর থেকে বের করে দেয়- বিদ্বেষ, ঘৃণা এবং ধনী ও বিত্তবানদের সাথে শত্রুতা। আর এই ফরযটি আদায় করার মাধ্যমে সমাজে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা-মুহাব্বাত, দয়া-মেহেরবানি ও সহায়তা-সহনশীলতা কয়েকগুণে বৃদ্ধি পায়।

ইসলামী শরীয়ত শাসকের এই অনুমতি দিয়েছে যে, তারা ধনীদের থেকে যাকাতের মাল সংগ্রহ করবে এবং তা গরীবদের মাঝে প্রত্যেকের প্রয়োজন অনুযায়ী পৌঁছে দিবে। মুসলমানদের সমাজে এটা মেনে নেওয়া যায় না যে, কেউ পেট ভরে খাবে পূর্ণ তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলবে, আর তার প্রতিবেশি কেউ না খেয়ে কষ্টে থাকবে। বরং ইসলামের আদর্শ হলো- সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বাচ্ছন্দ্য জীবন যাপন করবে। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “সেই ব্যক্তি আমার উপর ঈমান আনেনি, যে পরিতৃপ্ত হয়ে রাত যাপন করে, আর তার পাশের প্রতিবেশি ক্ষুধার্ত থাকে, যা সে জানে।”১৩১

ইমাম ইবনে হাযাম২২৫ রহ: বলেন- "প্রত্যেক শহরের ধনীদের উপর এটা ওয়াজিব যে, তারা গরীবদের নিকট যাকাতের মাল পৌঁছে দিবে। যদি তারা গরীবদেরকে যাকাত না দেয়, তাহলে সরকার তাদেরকে এ কাজে বাধ্য করবে। কেননা, মুসলমানদের সকল মালের ক্ষেত্রেই তাদের অধিকার রয়েছে। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের ব্যবস্থা করবে। শীত ও গরমের প্রয়োজনীয় পোশাকের ব্যবস্থা করবে। রোদ, বৃষ্টি, গরম আর মানুষের দৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য তাদের থাকার ব্যবস্থা করবে।"২২৬

জাতিগত সহযোগিতার ব্যাপারে ইসলামে দৃঢ়ভক্তি হলো- অভাবীদেরকে নির্দিষ্ট পরিমাণ দান করে দিয়ে দান বন্ধ করা যাবে না; বরং তাদেরকে নির্দিষ্ট পরিমাণ দান করার পরও অতিরিক্ত আরও দান করে যাবে। যা আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা দ্বারা স্পষ্ট হয়। তিনি বলেন- "তোমরা গরীবদেরকে বারবার দান করতে থাকো, যদিও তাদের কারও একশত উট হয়ে যায়।"২২৭

সাহায্য-সহযোগিতার ফযিলত সংক্রান্ত কিছু হাদীসঃ মুসলিম সমাজে একে অপরের প্রতি সহযোগিতা, সহানুভূতিও ফযিলত-উৎসাহ এবং ইসলামে এর অবস্থান সম্পর্কে অনেক হাদীসে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। হযরত আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- "আশআরী গোত্রের লোকেরা যখন জিহাদে গিয়ে অভাবগ্রস্ত হয়ে যায়, অথবা মদীনাতেই তাদের পরিবার-পরিজনদের খাবার- ঘাটতি দেখা দেয়, তখন তারা নিজেদের কাছে থাকা সমস্ত সম্পদকে একত্রিত করে একটি কাপড়ে জমা করে। এরপর একটি পাত্র দ্বারা মেপে প্রত্যেকে সমানভাগে বন্টন করে নেয়। সুতরাং তারা আমার (দলভুক্ত) আর আমিও তাদের (দলভুক্ত)।"২২৮

ইবনে হাজার রহ: তার বিখ্যাত কিতাব ফাতহুল বারী'তে লিখেন- "অর্থাৎ তারা আমার সাথে সম্পৃক্ত। আর এটা একজন মুসলমানের জন্য কতবড় মর্যাদার বিষয়।"২২৯

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- "এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সুতরাং কেউ কাউকে অত্যাচার করবে না এবং দুশমনের হাতে সোপর্দ করবে না। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের অভাব-অনটন দূর করবে, আল্লাহ তায়ালা তার অভাব-অনটন দূর করে দিবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তায়ালা তার প্রতিদানস্বরূপ কিয়ামতের দিন তাকে সমস্ত বিপদ থেকে মুক্তি দান করবেন। আর যে মুসলমানের দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবে, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তার দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবেন।"২৩০

ইমাম নববী রহ: বলেন- "এই হাদীসে মুসলমানের সাহায্য করা, তার বিপদ দূর করা এবং তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখার ফযিলত বলা হয়েছে। যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ দ্বারা বা ক্ষমতা দ্বারা বা সহযোগিতার দ্বারা; এমনকি যে ব্যক্তি ইশারায় বা চিন্তা-ফিকির করে এমনকি খবর দেয়ার মাধ্যমেও কাউকে সাহায্য করে, সেও এই ফযিলতের অন্তর্ভুক্ত।"২৩১

এই হলো মুসলিম সমাজে পরস্পর সহযোগিতার এক উত্তম চিত্র। সমাজের প্রত্যেকটি মানুষই চেষ্টা করবে, সমাজে যথেষ্ট পরিমাণ সাহায্য করতে। প্রত্যেক সামর্থবান এবং ক্ষমতাবানের দায়িত্ব হলো- "সমাজের প্রতিটি ভালো কাজেই সমাজকে সাহায্য করবে। আর সমাজের প্রতিটি মানবশক্তি মানুষের কল্যাণ সংরক্ষণে করবে এবং সমাজকে বিপদমুক্ত রাখার চেষ্টা করবে। সমাজ বিনির্মাণ এবং সমাজকে একটি মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে, ক্ষতিকর দিকগুলোকে প্রতিহত করার মাধ্যমে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ সমাজের প্রতিটি মানুষ একে অপরের সাথে হাসি-খুশি, সহানুভূতি আর সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলবে। আর প্রত্যেকে প্রত্যেককে নিজ ভাই মনে করবে।"২৪২

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভাবীদের সাহায্য করতে বলেছেন এবং সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের অনুভূতিকে সম্মান করতে বলেছেন। তিনি বলেন- "সূর্য উদিত হয় এমন প্রত্যেক দিন, প্রত্যেক ব্যক্তির উপর নিজের পক্ষ থেকে সদকা করতে হবে। এক সাহাবী বললেন- হে আল্লাহর রাসূল! আমার তো এতো সম্পদ নেই, আমি কিভাবে সদকা করবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- অন্ধকে পথ দেখে দেয়া, বোবা ও বধিরকে এমনভাবে পথ দেখানো, যাতে তারা বুঝতে পারে, প্রত্যেকের সম্মান বজায় রেখে তাকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া, কোনো সাহায্যপ্রার্থীর প্রয়োজন পূরণে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয় করা এবং পূর্ণ শক্তি দিয়ে দুর্বলকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা; এসবই তোমার পক্ষ থেকে সদকার অন্তর্ভুক্ত।"২৪৩

বর্তমানে এ জাতীয় মূল্যবোধগুলিকে উন্নত সভ্যতার নিদর্শন বিবেচনা করা হয়। অথচ বহু আগে থেকেই ইসলাম এগুলোকে আইন-কানুন বানিয়ে রেখেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাসককেও এ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন যে, তারা দ্রুত জনগণের চাহিদা পূরণ করবে। হযরত আমর ইবনে মুররাহ্ হযরত মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন- আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি- “যে শাসক গরীব, মিসকীন এবং সাহায্যপ্রার্থীর আগমনের জন্য নিজের দরজা বন্ধ রাখে, এ ধরনের লোকের দায়িত্ব, অভাব এবং প্রয়োজনের সময় আল্লাহ তায়ালাও আকাশের দরজা বন্ধ রাখবেন। একথা শোনার পর হযরত মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু মানুষের প্রয়োজনের খোঁজখবর নেয়ার জন্য আলাদা এক লোককে নিযুক্ত করে দিলেন।"২৪৪

হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত আবু তালহা আনসারী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- "যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন স্থানে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকে; যেখানে (সাহায্য না পেলে) তার মান-ইজ্জত নষ্ট হয়, আল্লাহ তায়ালাও তাকে এমন স্থানে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকেন, যেখানে সে সাহায্য কামনা করে। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের মান-ইজ্জত রক্ষার্থে তাকে সাহায্য করে, আল্লাহ তায়ালা তাকে এমন স্থানে সাহায্য করবেন, যেখানে সে সাহায্য কামনা করে।"২৪৫

অন্যের সাহায্য করা যে কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এ সম্পর্কে মুসলিম পণ্ডিতগণের বক্তব্য শুনলে আশ্চর্য হতে হয়। তারা বলেন- "অন্যকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ওয়াজিব। কেউ নামাজে দাঁড়ালো, এমতাবস্থায় অপর একজন কোনো কঠিন বিপদে পড়ে তার কাছে সাহায্য চাইলো বা পানিতে পড়ে গেলো বা আগুনে পড়ে গেলো বা কোনো শ্বাপদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে; এমতাবস্থায় এই ব্যক্তির নামাজ ছেড়ে দেয়া ওয়াজিব। এই মুহূর্তে যদি সে ছাড়া অন্য কেউ না থাকে, তাহলে তার জন্য এদেরকে সাহায্য করা ফরজে আইন বা অবশ্য কর্তব্য। আর যদি সে ছাড়া অন্য কেউ থাকে সাহায্য করার মত, তাহলে তার জন্য সাহায্য করা ফরজে কেফায়া। এটা ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।"২৪৬

মোটকথা, পরস্পর সাহায্য-সহযোগিতা হলো ইসলামী সভ্যতার একটি মৌলিক গুণ। এর রয়েছে অনেক শাখা-প্রশাখা। যেমন: কারও বিপদে সাহায্য করা। সহযোগিতা করা। কারও দুঃখে সহমর্মী হওয়া। কেউ অভাবে পড়লে তার অভাব দূর করার জন্য এগিয়ে আসা। অন্যের কষ্টে সান্ত্বনা দেওয়া। সর্বাবস্থায় একে অপরের খোঁজখবর রাখা।

টিকাঃ
১১৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫৮৯০ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৫৮৫
১১৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬০০১ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৬৭৭১
১২০. সূরা মুমতাহিনাহ, আয়াত নং-৮
১২১. সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত নং-৭০
১২২. সূরা মায়েদাহ, আয়াত নং-২
১২৩. ইমাম কুরতুবী রহ:। তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব হলো- আল আহকাম’ ফি আকবামিল কুরআন।
১২৪. তাফসিরে কুরতুবী:৪/৮৭/১
১২৫. ইমাম মাওয়ার্দী রহ:। তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব- আদাবুদুনিয়া ওয়াদদীন। আল আহকামুস সুলতানিয়াহ।
১২৬. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদদীন: ২৮-২৯
১২৭. সূরা মাআরিজ, আয়াত নং-২৪-২৫
১২৮. আবু তাহলুবুল ইজতিমা'ঈ: ৭
১২৯. সূরা তাওবাহ, আয়াত নং-৬০
১৩০. সূরা তাওবাহ, আয়াত নং-১০৩
১৩১. সহীহুল ইবনু ঈমান, হাদীস নং-৬২০৮ আল আদাবুল মুফরাদ:১১২
২২৫. ইবনে হাযাম আন্দালুসী। তিনি ছিলেন ইসলামের একজন বড় ইমাম এবং ইলমে ফিকহের বড় পণ্ডিত।
২২৬. আল্ মুহাল্লা: ৪২/৬
২২৭. আল্ মুহাল্লা: ৪২/৬
২২৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৪০৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৫০০
২২৯. ফাতহুল বারী: ৬০০/৫
২৩০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৪৪৩ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৫৮০
২৩১. আল্ মিনহাজ: ২৪/১৬
২৪২. আবু বাকাতাবুল ইজতিয়াতী: ১০
২৪৩. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৩৩৭৭ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৫৯৯২
২৪৪. জামে তিরমিযী, হাদীস নং- ১৩৩২ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৬০১২
২৪৫. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৪৮৮৪ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৬৪৮৯
২৪৬. আল্ মুনাযীরী: ২০২/৫-২০৩/৫

📘 ইসলামই দিয়েছে সবার অধিকার > 📄 ইসলামে ন্যায়বিচারের গুরুত্ব ও বাস্তবতা

📄 ইসলামে ন্যায়বিচারের গুরুত্ব ও বাস্তবতা


ন্যায়বিচারের গুরুত্ব: ন্যায়বিচার হলো মানবিক মূল্যবোধের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলাম যার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছে। ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন এবং রাষ্ট্রীয় জীবন- সর্বক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এজন্য পবিত্র কুরআনে ন্যায়বিচারকে নবী-রাসূল পাঠানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- "নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে স্পষ্ট দলিল-প্রমাণসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ড দিয়েছি। যাতে মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।"২৯৪

"ন্যায়বিচার বা ইনসাফের গুরুত্ব এরচেয়ে বেশি আর কী হতে পারে, আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন, আর তাদের যত কিতাব দিয়েছেন, সবকিছুর প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো দুনিয়াতে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। সুতরাং বলা যায়, ন্যায়বিচার বা ইনসাফের জন্যই কিতাব নাযিল হয়েছে। ইনসাফের জন্যই নবী-রাসূল প্রেরিত হয়েছে। আর এই ইনসাফ দ্বারাই আসমান-জমিন টিকে আছে।"২৯৫

পবিত্র কুরআন আমাদেরকেও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সর্বদা ন্যায়ের উপর থাকতে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আদেশ দিয়েছে। যদিও তা আমাদের কাছে অপছন্দ লাগে বা আমাদের বিরুদ্ধে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- "হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান করো, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনের যদি ক্ষতিও হয় তবুও।"২৯৬

তিনি আরও বলেন- "হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে অবিচল থাকো। কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণেও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করবে না। সুবিচার করো, এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবগত।"২৩৭

আল্লামা ইবনে কাসীর রহঃ বলেন- "কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যাতে করে তোমাদেরকে তাদের সাথে ন্যায়বিচার করা থেকে বিরত না রাখে। বরং প্রত্যেকের সাথেই তোমরা ন্যায়বিচার করো, চাই সে বন্ধু হোক বা শত্রু।"২৩৮

সুতরাং ইসলামে ন্যায়বিচারের বেলায় কারও প্রতি ভালোবাসা এবং শত্রুতার কোনো প্রভাব নেই। জাত-বংশের কোনো পার্থক্য নেই। অর্থ-বিত্তেরও কোনো দখল নেই। পার্থক্য করা হয় না কোনো মুসলিম-অমুসলিমদের মাঝেও। বরং রাষ্ট্রে বসবাসকারী মুসলমান-অমুসলমান সবাই ন্যায়বিচার ভোগ করার পূর্ণ অধিকার রাখে। চাই তাদের মধ্যে শত্রুতা থাক অথবা ভালোবাসা।

ইসলামে ন্যায়বিচারের অবস্থানঃ এক মাখযুমী মহিলার ক্ষেত্রে হযরত উসামা ইবনে যায়েদের সুপারিশের ঘটনা দ্বারাই ইসলামে ন্যায়বিচারের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়। হযরত উসামা বিন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বনী মাখযুম গোত্রের এক মহিলার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। যাতে চুরির অপরাধে তার হাত না কাটা হয়। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রচণ্ড রাগাম্বিত হয়ে গেলেন। এরপর ইসলামের নীতি-আদর্শ, ন্যায়বিচার এবং সমাজের ধনী-গরীব বিচারের কাঠগড়ায় সবাই সমান- এসব বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিলেন। ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বললেন- "হে লোকসকল! নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণ ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে, তাদের মধ্যে যখন কোনো সম্ভ্রান্ত লোক চুরি করতো, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিতো। আর যদি কোনো দুর্বল লোক চুরি করতো, তবে তারা তার উপর শাস্তি প্রয়োগ করতো। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতেমাও চুরি করতো, তবুও আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।"২৪০

হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে খায়বারের বিজয় দান করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারবাসীদেরকে আপন অবস্থায় সেখানেই থাকতে দিলেন। এবং খায়বারের সমস্ত ফসল খায়বারবাসী ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাঝে অর্ধেক অর্ধেক করে ভাগ করে নিলেন। পরে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রওয়াহাকে খায়বারে পাঠালেন অনুমান করে অর্ধেক ফসল নিয়ে আসতে। তিনি এসে ইহুদীদেরকে বললেন- "হে ইহুদীর দল! আমি মনে করি তোমরা হলে সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রাণী। তোমরা আল্লাহর নবীদেরকে হত্যা করেছো। আর আল্লাহকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছো। তোমাদের প্রতি এই ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও আমি তোমাদের উপর জুলুম করবো না। আমার ধারণা অনুযায়ী খায়বারে বিশ হাজার ওয়াসা খেজুর আছে। এখন তোমরা যদি চাও তাহলে তোমাদের জন্যও একটা অংশ রেখে দেবো। আর যদি না চাও, তাহলে সম্পূর্ণটাই আমি নিয়ে নেবো। ইহুদীরা বললো- এভাবেই তো আসমান এবং জমিনে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা আমাদের অংশ গ্রহণ করবো।"২৪২

উক্ত হাদীসে এটা স্পষ্ট যে, ইহুদীদের প্রতি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রওয়াহার প্রচণ্ড ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রতি জুলুম করেননি। বরং স্পষ্ট ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, তিনি তাদের প্রতি কোনো জুলুম করবেন না। আর দুই ভাগের মধ্য থেকে তারা যে ভাগ চাবে, সেটাই তাদেরকে দিয়ে দিবেন।

ইসলামে ন্যায়বিচারের রহস্যঃ ইসলামে ন্যায়বিচারের রহস্য হলো- ইনসাফ বা ন্যায়বিচার, এই জমিনে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি দাদিপাল্লা। এ দ্বারা মেপে মেপে দুনিয়ার অধিকার আদায় করা হবে। জালেম এবং মাজলুমের মাঝে ন্যায়বিচার করা হবে এবং এর মাধ্যমে হকদারকে সহজভাবে সঠিক জায়গা থেকে তার হক আদায় করে দেওয়া হবে। ন্যায়বিচার হলো ইসলাম ধর্মের এমন একটি হুকুম, যা সমাজের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ। সুতরাং সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের ন্যায়বিচার এবং এর মাধ্যমে শান্তি লাভের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। ইসলাম যেহেতু দয়া-মায়া এবং সহানুভূতি দেখিয়েছে মুসলিম-অমুসলিম, ধনী-গরীব সকল মানুষের সাথেই ন্যায়বিচারের আদেশ দিয়েছে, সুতরাং এক্ষেত্রে ভালোবাসার কোনো দখল চলবে না, শত্রুতাও কোনো প্রভাব ফেলবে না।

আল্লাহ তাআলা সবার আগে নিজের সাথে ন্যায়বিচারের আদেশ দিয়েছেন। তিনি মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তারা নিজের হক, তার রবের হক এবং অন্যদের হকের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করে। হযরত আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন তার স্ত্রীর প্রতি খেয়াল না রেখে সারাদিন রোজা আর সারারাত নামাজ পড়ে স্ত্রীর হক খর্ব করতে লাগলেন, তখন হযরত সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেছিলেন- "তোমার উপর তোমার রবের কিছু হক আছে। তোমার নিজের কিছু হক আছে এবং তোমার পরিবারেরও কিছু হক আছে। প্রত্যেককে প্রত্যেকের হক আদায় করো।"২৪৩

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান ফারসীর এ কথাকে সমর্থন করেছিলেন। ইসলাম কথা বলার ক্ষেত্রে ইনসাফ করার আদেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- "তোমরা যখন কথা বলো, তখন ইনসাফ করো। যদিও তারা তোমাদের নিকটাত্মীয় হয়।"২৪৪

ইসলাম বিচারের ক্ষেত্রে ইনসাফের আদেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে। আর যখন মানুষের মধ্যে ফায়সালা করবে, তখন ইনসাফের সাথে ফায়সালা করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কতইনা সুন্দর উপদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।"২৪৫

পরস্পরের মাঝে মীমাংসা করার ক্ষেত্রেও ইসলাম ইনসাফের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- "আর যদি মুমিনদের দু'দল বিবাদে লিপ্ত হয়, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর বাড়াবাড়ি করে, তাহলে যে দলটি বাড়াবাড়ি করবে তার বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করো। যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। তারপর যদি দলটি ফিরে আসে, তাহলে তাদের মধ্যে ইনসাফের সাথে মীমাংসা করো এবং ন্যায়বিচার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।"২৪৬

ইসলামে জুলুম-অত্যাচার হারামঃ ইসলাম ন্যায়বিচারের প্রতি যতটা আদেশ দিয়েছে এবং এর প্রতি উৎসাহ দিয়েছে, তারচেয়ে অনেক কঠিনভাবে জুলুমকে নিষেধ করেছে এবং চরমভাবে ইসলামে জুলুম বিরোধিতা করেছে। চাই জুলুম মানুষের সাথে হোক বা অন্যের সাথে। বিশেষত শক্তিশালীরা জুলুম করে থাকে দুর্বলদের উপর। ধনীরা জুলুম করে গরীবদের উপর। শাসকরা জুলুম করে জনগণের উপর। সবার সাথে সব ধরণের জুলুমই হারাম করে দিয়েছে ইসলাম। যে যত দুর্বল, তার সাথে জুলুম করলে গুনাহও তত প্রবল।২৪৭

হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা বলেন- "হে আমার বান্দারা! আমি আমার উপর জুলুমকে হারাম করেছি। আর তোমাদের মাঝেও জুলুমকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছি। সুতরাং তোমরা একে অপরের সাথে জুলুম করো না।"২৪৮

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুআয রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলতেন- "মাজলুমের বদদোয়াকে ভয় করো। কেননা, এর মাঝে এবং আল্লাহ তাআলার মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।"২৪৯

তিনি আরও বলেন- "তিন ব্যক্তির দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। ১. রোজাদারের দুআ, যখন সে ইফতার করে। ২. ন্যায়বিচারক শাসকের দুআ। ৩. মাজলুমের বদদোয়া। আল্লাহ তাআলা এগুলোকে মেঘের উপর উঠিয়ে নেন এবং আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেন। আর আল্লাহ তাআলা বলেন- আমার ইজ্জতের কসম! আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করবো, যদিও তা কিছুটা বিলম্বে হয়।"২৫০

এই হলো ইনসাফ এবং ন্যায়বিচারের সংক্ষিপ্ত আলোচনা। ইসলামী সমাজে যা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসা দাদিপাল্লা।

টিকাঃ
২৯৪. সূরা হাদীদ, আয়াত নং-২৫
২৯৫. মাআ'রিফুল কুরআনুল মুসলিমিন: ২৯০
২৯৬. সূরা নিসা, আয়াত নং-১৩৫
২৩৭. সুরা মাইদাহ, আয়াত নং-৮
২৩৮. আল্লামা ইবনে কাসীর রহঃ। তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাবগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- তাফসীরে ইবনে কাসীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ইত্যাদি।
২৪০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৩৪৮৬ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬৮৮
২৪২. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ২৮৮৮৬ সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৬৩০৬
২৪৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১৯০২ জামে তিরমিযী, হাদীস নং-২৮১৩
২৪৪. সুরা আনআম, আয়াত নং-১৫২
২৪৫. সুরা নিসা, আয়াত নং-৫৮
২৪৬. সুরা হুজুরাত, আয়াত নং-৯
২৪৭. মুহাম্মাদ মুস্তফা জামীল জুনাইদিয়: ১০৫
২৪৮. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২২৪৮৬ আবুআউ ইমান, হাদীস নং-৭০০৮
২৪৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৪০০০
২৫০. জামে তিরমিযী, হাদীস নং- ৩৫৯৮ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৮০৩০

📘 ইসলামই দিয়েছে সবার অধিকার > 📄 ইসলামে মমতাবোধ: গুরুত্ব ও কয়েকটি নমুনা

📄 ইসলামে মমতাবোধ: গুরুত্ব ও কয়েকটি নমুনা


ইসলামী শরীয়তে মানবতাবোধের গুরুত্ব:
প্রথমত যদি আমরা আল্লাহ প্রদত্ত কিতাব পবিত্র কুরআন—যা সমস্ত মুসলমানের সর্ববিধান এবং ইসলামী শরীয়তের মূল উৎস—এর দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখা যায়, সূরা তাওবা ছাড়া প্রতিটি সূরাই শুরু হয়েছে বিসমিল্লাহ দ্বারা। বিসমিল্লাহ'র মধ্যে 'রহমান' (করুণাময়) এবং ‘রহীম’ (দয়ালু) নামক আল্লাহ তাআলার দুটি সিফাত রয়েছে। সুতরাং এটা স্পষ্ট, যেহেতু পবিত্র কুরআনের প্রত্যেকটি সূরা শুরু করা হয়েছে এই দুটি সিফাতের মাধ্যমে, তাহলে ইসলামী শরীয়তে করুণা ও দয়ার গুরুত্ব অনেক বেশি। আরবিতে রহমান এবং রহীম এ দুটি শব্দের অর্থ প্রায় কাছাকাছি। উলামায়ে কেরাম এ দুটি শব্দের পার্থক্য করতে গিয়ে অনেক ব্যাখ্যা এবং মতামত পেশ করেছেন।

আল্লাহ তাআলা দয়ার গুণের সাথে তার অন্যান্য গুণবাচক নামও উল্লেখ করতে পারতেন। যেমন: আযীম (অনেক বড়), হাকীম (অনেক জ্ঞানী), সামী’ (অধিক শ্রবণকারী), বাসীর (সর্বদ্রষ্টা) ইত্যাদি। আবার চাইলে দয়ার গুণের সাথে এমন কঠিন কোনো গুণবাচক নাম উল্লেখ করতে পারতেন, যার মাধ্যমে দয়া এবং কঠোরতা—এ দুটির মাঝে ভারসাম্য বজায় থাকত। যেমন: জাব্বার (প্রতাপশালী), মুতাকাব্বির (শ্রেষ্ঠদাতা), কাহহার (পরাক্রান্ত) ইত্যাদি। কিন্তু আল্লাহ তাআলা প্রত্যেকটি সূরার শুরুতে দয়া-মায়ার অর্থবোধক কাছাকাছি দু'টি শব্দ এনে আমাদের নিকট এটা অত্যন্ত স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে—নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলার অন্যান্য সকল গুণের আগে হলো দয়া-মায়া এবং রহমতের গুণ। আর দয়া-মায়ার সাথে কোনো কাজ করলে এটার প্রভাব বেশি পড়ে। পরস্পরে শত্রুতা তৈরি হয় না।

এ বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়, যদি আমরা পবিত্র কুরআনের দিকে তাকাই। আমরা দেখতে পাই, পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম সূরা হলো সূরা ফাতেহা। অন্যান্য সূরার মত এ সুরাটিও শুরু হয়েছে বিসমিল্লাহ দ্বারা। যার মধ্যে 'রহমান' ও ‘রহীম’ দু'টি সিফাতও রয়েছে। এরপর আমরা দেখি যে, সূরা ফাতেহার আয়াতের মধ্যে এ দু'টি সিফাত আরও রয়েছে। পবিত্র কুরআন শুরুও হয়েছে এ সূরার মাধ্যমেই। আর সূরা ফাতেহা এমন একটি সূরা, যা প্রত্যেক মুসলমানকে প্রত্যেকদিন নামাজের প্রত্যেক রাকাতওে পড়তে হয়। অর্থাৎ একজন মুসলমান এক রাকাত নামাজে রহমান শব্দটি কমপক্ষে দুইবার পড়ে। আর রহীম শব্দটিও পড়ে কমপক্ষে দুইবার। সুতরাং একজন বান্দা প্রত্যেক রাকাতে কমপক্ষে চারবার তার রবের রহমতের কথা স্মরণ করে। এভাবে একজন মুসলমান দৈনিক সতেরো রাকাত ফরজ নামাজে কমপক্ষে আটত্রিশবার রহমত এবং দয়া-মায়ার কথা বলে। দেখা গেলো, নামাজের মত এমন গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র অবস্থায়ও সবচেয়ে বেশি যে চিন্তাটা আসে, সেটা হলো—দয়া-মায়ার চিন্তা।

রহমতের নবী, দয়ার নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও আল্লাহ তাআলার অসীম দয়ার কথা বলেছেন। হযরত আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— “আল্লাহ তাআলা বিশ্ব-জাগৎ সৃষ্টির পূর্বেই লিখে রেখেছেন—আমার দয়া আমার ক্রোধের উপর অগ্রগামী। এই লেখাটা আল্লাহ তাআলার আরশে লেখা আছে।” এই হাদীসে এটা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, দয়া ক্রোধের উপর অগ্রগামী হবে।

মহান রাব্বুল আলামীন তার প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন বিশ্ব মানবতার এবং সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপ। আল্লাহ তাআলা বলেন— “আর আমি তো আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।” এ বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে যায়, যদি আমরা তার ব্যক্তি জীবনের দিকে তাকাই। দেখা যায়, তিনি সাহাবায়ে কেরাম এবং তার শত্রু- মিত্র সবার সাথেই দয়ার আচরণ করতেন। শুধু তাই নয়, তিনি তার উম্মতকেও এই মূল্যবান উপদেশে উৎসাহিত করে বলেন— “যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি দয়া করবেন না।” হাদীসের মধ্যে সমস্ত মানুষের প্রতি দয়া করার কথা বলা হয়েছে। এখানে কোনো জাতি বা ধর্মের কথা বিবেচনা করা হয়নি। এজন্য উলামায়ে কেরাম বলেন— “এই হাদীসটি ব্যাপক অর্থবোধক। এখানে শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ—সবাই অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং সবাইকে দয়া করতে হবে।”

আল্লাহ ইবনে বাতাল রঃ বলেন— “এই হাদীসের মধ্যে সমস্ত সৃষ্টির প্রতি দয়ার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং মুসলমান, কাফের, পশু-পাখি, গোলাম স্বাধীন—সবার প্রতিই দয়া করতে হবে। আর দয়া মানে—তাদেরকে খাওয়ানো, পান করানো, তাদের বোঝা হালকা করা এবং তাদেরকে কোনো রকম প্রহার না করা ইত্যাদি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে কসম খেয়ে বলেন— “ঐ সত্তার কসম! যার হাতে আমার জান। আল্লাহ তাআলা শুধুমাত্র দয়ালু ব্যক্তির উপরই দয়া করেন। সাহাবায়ে কেরাম বললেন—হে আল্লাহ রাসূল! আমরা প্রত্যেকেই তো দয়া করি। তিনি বললেন—তোমাদের একজন আরেকজনের উপর দয়া করলে হবে না শুধু, বরং সকল মানুষকেই দয়া করতে হবে।”

সুতরাং একজন মুসলমানকে শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ, মুসলিম, অমুসলিম—নির্বিশেষে সকল মানুষের উপরই দয়া করতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন— “তোমরা দুনিয়াবাসীর উপর দয়া করো। তাহলে আসমানে যিনি আছেন, তিনি তোমাদের উপর দয়া করবেন।” এখানেও দুনিয়াবাসী দ্বারা সমস্ত মানুষকেই বুঝানো হয়েছে।

মুসলিম সমাজের এই দয়া-মায়াটি হলো এমন একটি ব্যবহারিক নৈতিক মূল্যবোধ, যা একজন মানুষকে আরেকজন মানুষের সাথে সদা দয়ার প্রতি আহ্বান জানায়। এমনকি বিভিন্ন জাতি-ধর্ম-বর্ণ থেকে শুরু করে অবলা প্রাণী, চতুষ্পদ জন্তু, পশু-পাখি এবং কীট-পতঙ্গের প্রতিও দয়া করতে বলা হয়েছে। এক মহিলা একটি বিড়ালের প্রতিও দয়া না করে তার সাথে নিষ্ঠুর ব্যবহার করার কারণেই জাহান্নামী হয়ে গেছে। তার ব্যাপারে ঘোষণা দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— “এক মহিলা জাহান্নামে গিয়েছিল এই কারণে যে, সে একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখেছিল। তাকে কোনো খাবার- পানি দিতো না। আবার বিড়ালটি ছেড়েও দিতো না। ছাড়লে হয়তো সে জমিনের পোকা-মাকড় খেয়ে বেঁচে থাকতে পারতো।”

পশু-পাখির ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক ব্যক্তির কথা বলেন, যাকে আল্লাহ তাআলা মাফ করে দিয়েছিলেন এই জন্য যে, সে তৃষ্ণার্ত একটি কুকুরকে পানি পান করিয়েছিলো। তিনি বলেন— “এক লোক রাস্তায় চলতে চলতে তার ভীষণ পিপাসা লাগলো। সে একটি কুপে নেমে পানি পান করলো। এরপর সে বের হয়ে দেখতে পেলো, একটি কুকুর হাঁপাচ্ছে এবং পিপাসায় কাতর হয়ে সে মাটি চাটছে। লোকটি ভাবলো, কুকুরটাও আমার মতো পিপাসা লেগেছে। সে কূপের মধ্যে নামলো। এরপর নিজের মোজা ভরে পানি নিয়ে মুখ দিয়ে ধরে উপর উঠে আসলো এবং কুকুরটিকে পানি পান করিয়ে দিলো। আল্লাহ তাআলা তার এই আমলকে কবুল করে তার জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিলেন। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন—হে আল্লাহর রাসূল! চতুষ্পদ জন্তুর উপকার করলেও কি আমাদের সওয়াব হবে? তিনি বললেন—প্রত্যেক প্রাণীর উপকার করাতেই সওয়াব রয়েছে।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদেরকে এই ঘটনাগুলো শুনিয়েছেন যে, এক ব্যভিচারিণী মহিলাও জান্নাতের সকল দরজা খুলে দিয়েছে তার অজান্তে কুকুরের মত একটি প্রাণীর প্রতি দয়ার উদ্রেক হওয়ার কারণে। তিনি বলেন— “একটি কুকুর পিপাসায় যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে এক কুপের পাশ দিয়ে ঘুরছিল। বনী ইসরাঈলের এক ব্যভিচারিণী মহিলাও এই অবস্থা দেখে তার মোজা খুলে সেটা দিয়ে কুপ থেকে পানি উঠিয়ে কুকুরকে পান করালো। আল্লাহ তাআলা তাকে মাফ করে দিলেন।”

অবলা প্রাণী এবং ক্ষুদ্র প্রাণীর প্রতি দয়া:
ইসলামে যে দয়া-মায়ার কথা বলা হয়েছে, এটা শুধু মানুষের প্রতিই না; বরং অবলা প্রাণীর প্রতিও দয়া করতে হবে। তাদেরকে ক্ষুধার্ত রাখা যাবে না এবং তাদের পিঠে সাধ্যাতীত বোঝা দেওয়া যাবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক দুর্বল উটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেন— “এইসব পশুর পিঠের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। সুস্থ-সবল পশুর পিঠে আরোহণ করো এবং তাদেরকে ভালোভাবে আহার করাও।” এক ব্যক্তি বললো— “হে আল্লাহর রাসূল! আমি বকরি জবাই করার সময়ও কি তার প্রতি দয়া করবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—যদি তুমি বকরির উপর দয়া করো, তাহলে আল্লাহ তাআলা তোমার উপর দয়া করবেন।”

ইসলাম বড় প্রাণীদেরকে তো দয়া করতে বলেছেই, সাথে সাথে ঐ সমস্ত ছোট ছোট পাখিদের প্রতিও দয়া করতে বলেছে, যেগুলো বড় প্রাণীর মত মানুষের তেমন উল্লেখযোগ্য কাজে আসে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক ছোট পাখি দেখে বললেন— “যে ব্যক্তি কোনো ছোট পাখি হত্যা করলো, কিয়ামতের দিন তা আল্লাহ তাআলার কাছে উচ্চ স্বরে ফরিয়াদ করে বলবে—হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমাকে অযথা হত্যা করেছিলো। সে কোনো উপকারার্থে আমাকে হত্যা করেনি।”

ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেন—মিশর বিজয়ের সময় হযরত আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুর তাবুর কাছে একটি কবুতর নামলো এবং তাবুর উপর বাসা বানালো। হযরত আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন সেখান থেকে চলে যাওয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন তিনি এই পাখির বাসাটি দেখলেন। তিনি আর এই বাসাটা ধ্বংস করলেন না। তাবু এভাবেই রেখে গেলেন। পরে এর আশপাশে আরও পাখির বাসা হতে হতে একসময় ঐ তাঁবুটা একটা পাখির নগরে পরিণত হলো।

হযরত ইবনে আবুল হাকাম হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয রাদিয়াল্লাহু আনহুর জীবনীতে লেখেন—হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয রাদিয়াল্লাহু আনহু বিনা প্রয়োজনে ঘোড়াকে পদাঘাত করতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। তিনি ঘোড়ার মালিকদের নিকট চিঠি লিখেছিলেন যে, তারা যাতে ভারী জিন দ্বারা ঘোড়াকে না বাঁধে। আর এমন চাবুক দ্বারা খোঁচা না দেয়, যার নিচে লোহার পাত লাগানো থাকে। তিনি মিসরের গভর্নরদের নিকট চিঠি লিখে বলেন— “আমার নিকট খবর এসেছে যে, মিশরে বোঝাবাহী উটের উপর এক হাজার রিভল ওজনের বোঝা দেখা যায়। তোমাদের কাছে আমার এই চিঠি পৌঁছার পর থেকে কেউ যেনো ছ'হাজার রিভলের বেশি ওজনের বোঝা উটের পিঠে না দেয়।”

এই হলো ইসলামী সমাজে দয়া-মায়ার চিত্র। যখন সমাজের প্রত্যেকটা মানুষের অন্তরে দয়া থাকবে, তখন দেখা যাবে—তারা দুর্বলদের সাহায্য করছে। দুঃখীদের ব্যথায় ব্যথিত হচ্ছে। অসুস্থদের সেবা করছে। অভাবীদের অভাব পূরণের চেষ্টা করছে। যদিও এগুলো হয় বোবা প্রাণী বা পশু-পাখি। এসব হৃদয়বান দয়ালু মানুষগুলোর মাধ্যমেই সমাজ সুন্দর হয়। অন্যায় দূর হয়। চারিদিকে শান্তি, সাম্য আর কল্যাণ ছড়িয়ে পড়ে।

টিকাঃ
২০২. রহমান ও রহীম এ দুটি শব্দের পার্থক্য করতে গিয়ে উলামায়ে কেরাম অনেক ব্যাখ্যা এবং মতামত পেশ করেছেন।
২০৩. পবিত্র কুরআনের সূরাসমূহের ক্রমবিন্যাস আল্লাহ প্রদত্ত।
২০৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৭১৯৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৭৫১।
২০৫. সূরা আম্বিয়া, আয়াত নং- ১০৭।
২০৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৯৪১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৩১৯।
২০৭. আল মিনহাজ: ৯৭/১৮।
২০৮. ইবনে বাতাল রহ.। তাঁর নাম: আবু আল হাসান খলফ ইবনে আব্দুল মালিক ইবনে বাতাল।
২০৯. মফাতীহুল আওতাঈ: ৪/৪২।
২১০. মুসলিম শরিফ, হাদীস নং- ৪২৮৮; বুখারী, হাদীস নং- ১১০৪০।
২১১. জামে তিরমিযী, হাদীস নং- ১৮২৬; মুসনাদে আহমাদ।
২১২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৩২৮০।
২১৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬১২৪।
২১৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২২৩৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২২৪৮।
২১৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৩২৮০।
২১৬. সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং- ২১৪৮; মুসনাদে আহমাদ।
২১৭. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ১৬৯৯০।
১৮৯. সুনানুন নাসাঈ, হাদীস নং- ৪৪৪৩; মুসনাদ আহ্‌মাদ, হাদীস নং-১৮৪৬৮।
১৯০. রিভল ওজনের পরিমাপ।
১৯১. সীরাতু উমর ইবনে আব্দুল আযীয:১/১৮১।

📘 ইসলামই দিয়েছে সবার অধিকার > 📄 ইসলামে মুসলিম-অমুসলিম সম্পর্ক

📄 ইসলামে মুসলিম-অমুসলিম সম্পর্ক


ভূমিকা: একটি মুসলিম রাষ্ট্রে কিভাবে মুসলিম এবং অমুসলিমরা শৃঙ্খলা বজায় রেখে থাকতে পারে, ইসলামী সভ্যতা শুধু এই নীতিমালা বলেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং মুসলিমরা কিভাবে অমুসলিম সম্প্রদায় এবং অমুসলিম বিশ্বের সাথে মিলেমিশে থাকতে পারে, এই বিষয়টিও অনেক গুরুত্বসহ আমলে নিয়েছে ইসলাম। এজন্য ইসলাম এমন এমন নীতিমালা এবং দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে, যার মাধ্যমে সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলা সম্ভব হয়। এর দ্বারা ইসলামী সভ্যতার মাহাত্ম্য এবং উদার মানবতা স্পষ্ট ফুটে ওঠে।

ইসলাম শান্তির ধর্মঃ শান্তিই হলো ইসলাম ধর্মের মূলমন্ত্র। যারা আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান এনেছে এবং তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নবী হিসেবে মেনে নিয়েছে; অর্থাৎ যারা পরিপূর্ণ মুসলমান, তাদেরকে লক্ষ্য করেই আল্লাহ তাআলা বলেন— “হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখিল হয়ে যাও। তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।”

উক্ত আয়াতে ইসলাম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—শান্তি। এটা এমন এক শান্তির ধর্ম, যদি কারও জীবনে তা থাকে, তাহলে তার জীবনে শান্তি। যদি কোনো ঘরে থাকে, তাহলে ঐ ঘরে শান্তি। যদি কোনো সমাজে থাকে, তাহলে ঐ সমাজে শান্তি। যদি কোনো রাষ্ট্রে থাকে, তাহলে ঐ রাষ্ট্রে শান্তি। এর নামই হলো ইসলাম।

ইসলাম ধর্ম যে শান্তির ধর্ম, এটা অত্যন্ত স্পষ্ট বিষয়। কেননা, আমরা দেখি—আরবীতে ইসলাম (الإسلام) শব্দটির মূল উৎস হলো سَلَم (সিলমুন)—যার অর্থ—শান্তি। আর শান্তি হলো ইসলামের অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যদি শান্তিকে ইসলামের বিশেষ বৈশিষ্ট্য নাও মানা হয়, তবুও শাব্দিক অর্থে ইসলামের মূল অর্থ হলো—শান্তি।

সুতরাং শান্তি হলো ইসলাম ধর্মের মূলমন্ত্র। যা একটা মানুষকে অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা, সদ্ভাবহার এবং সমাজে শৃঙ্খলা আর পরোপকারে উদ্বুদ্ধ করে। অমুসলিমরা যখন কোনো বিশৃঙ্খলা না করে শান্তিপূর্ণভাবে থাকে, তখন ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলিম-অমুসলিম সবাই মানুষ হিসেবে নিরাপদ।

মুসলিম-অমুসলিমদের মাঝে সর্বদা শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় থাকবে। শান্তির জন্য আলাদা কোনো চুক্তির প্রয়োজন নেই। যতদিন পর্যন্ত অমুসলিমরা মুসলমানদের সাথে যেকোনো ধরণের শত্রুতায় লিপ্ত না হবে, ততোদিন পর্যন্ত তারা কোনো রকম চুক্তি ছাড়াই শান্তি ও নিরাপত্তা ভোগ করবে।

অমুসলিমদের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক: ইসলাম ধর্ম সমস্ত মুসলমানদের উপর এটা ওয়াজিব বা আবশ্যক যে, তারা অন্য বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী অমুসলিমদের সাথে সদ্ভাব ও সম্প্রীতির সম্পর্ক রাখবে। এই মানবতাপূর্ণ ভ্রাতৃত্বের প্রতি ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তাআলা বলেন— “হে মানবসকল! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও।”

উক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা যায়— “পরস্পর বিচ্ছিন্নতা-বিদ্বেষের জন্য আল্লাহ তাআলা জাতি-গোত্র ভাগ করেননি। বরং তাদের পরস্পর পরিচিতি, ভালোবাসা আর সদ্ভাব বৃদ্ধির জন্যই এই বিভক্তি।” এই আয়াতটি আরও স্পষ্ট হয় পবিত্র কুরআনের ঐ সকল আয়াত দ্বারা, যেখানে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে—যদি কাফেররা তোমাদের সাথে শান্তিরীতি সম্পন্ন হতে চায়, তবে তাদের সাথে মিলেমিশে শান্তিতে থাকার ব্যবস্থা করো। আল্লাহ তাআলা বলেন— “আর যদি তারা সন্ধি করতে আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে তুমিও সেদিকেই আগ্রহী হও। আর আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা করো।”

এই আয়াতটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অমুসলিমদের প্রতি মুসলমানদের সহিষ্ণুতা এবং সদ্ভাবপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করে। শত্রু পক্ষ যখন শান্তিপূর্ণভাবে থাকার আগ্রহ দেখাবে, তখন এতে যদি মুসলমানদের কোনো রকম ক্ষতির আশংকা না থাকে এবং যেকোনো ধরণের ক্ষতি না হয়, তাহলে তারা এই শান্তিপূর্ণ চুক্তির আহ্বানে সাড়া দিবে। ইমাম যুহরী এবং ইবনে যায়েদ রহ. বলেন— “এই আয়াতের অর্থ হলো—যদি তারা তোমাকে সন্ধির আহ্বান করে, তাহলে তুমিও তাতে সাড়া দাও।”

এই আয়াতের পরবর্তী আয়াতে মুসলমানদেরকে উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে—যাতে তারা সর্বদা শান্তি বজায় রাখে। এমনকি শত্রুপক্ষ যদি মুখে শান্তির বাণী বলে আর ভেতরে ভেতরে শত্রুতা পোষণ করে, সেক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অভয় দিয়ে বলেন— “পক্ষান্তরে তারা যদি তোমার সাথে প্রতারণা করতে চায়, তবে তোমার জন্য আল্লাহ তাআলাই যথেষ্ট। তিনিই তোমাকে শক্তি যুগিয়েছেন স্বীয় সাহায্যে আর মুসলমানদের মাধ্যমে।” অর্থাৎ আল্লাহ তাআলাই তোমাকে হেফাজত এবং সুরক্ষা দান করবেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের সকল কাজে শান্তির কথা বিবেচনা করে তাদেরকে শান্তির পথ দেখিয়েছেন এবং সর্বদা শান্তিতে থাকার জন্য দুআ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি দুআর মধ্যে বলতেন— اللهم اني أسئلك العافية في الدنيا والآخرة (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি ও নিরাপত্তা চাই)। একবার তিনি সাহাবায়ে কেরামের মাঝে বক্তৃতা দানকালে বলেন— “তোমরা শত্রুর সাথে সাক্ষাৎ কামনা করো না। বরং তোমরা শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করো। আর যখন তোমরা তাদের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন তোমরা ধৈর্যের পরিচয় দাও।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হারব (যুদ্ধ) শব্দটাও অপছন্দ ছিলো। তিনি বলেন— “আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় নাম—আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান। সবচেয়ে বিশ্বস্ত নাম—হারেস ও হাম্মাম। আর সবচেয়ে অপছন্দনীয় নাম হলো—হারব ও মুররাহ।”

টিকাঃ
২৯৮. সূরা বাক্বারাাহ, আয়াত নং-২০৮।
২৯৯. আল ইসলামু ওয়াল আলাকাতুদ দুয়ালিয়্যাহ:৩০৬।
৩০০. ইবনুল ইসলামু আক্বাইদুল্লু ওয়া শারিয়াতিহি:৪৫৩।
৩০১. আল নাব্যুমুল ইসলামিয়্যাহ লান্নাহওয়া ওয়া তাত্মিয়াতিহা:৯৪০।
৩০২. সূরা হুজুরাত, আয়াত নং-১৩।
৩০৩. জান্নাতুল হাক্ব:১৮।
৩০৪. সূরা আনফাল, আয়াত নং-৬১।
৩০৫. ইসমাইল ইবনে আব্দুর রহমান আল-যুহরী। তিনি ছিলেন একজন তাবেঈ।
৩০৬. আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম। তিনি একজন ফকীহ ও মুফাস্সির।
৩০৭. তাফসীরে কুরতুবী:৮/৮৮-৪।
৩০৮. সূরা আনফাল, আয়াত নং-৬২।
৩০৯. তাফসীরে কুরতুবী: ৪/৬০০।
১৩১. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৫০৭৪।
১৩২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২১০৪।
১৩৩. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৪৬৫০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00