📄 ইসলামে আত্মীয়তার গুরুত্ব ও অধিকার
ভূমিকাঃ ইসলামের দৃষ্টিতে একটি পরিবার শুধু পিতা-মাতা আর সন্তান-সন্ততির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং ভাই-বোন, চাচা-ফুফু, মামা-খালা এবং চাচাতো, ফুফাতো, মামাতো, খালাতো ভাইবোন সবাই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। তাদের সবার সাথেই সদ্ব্যবহার এবং সম্পর্ক বজায় রাখার জোর নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। আত্মীয়তা রক্ষা করা এক মহৎ গুণ। এটা রক্ষা করলে অনেক সওয়াব। আর ছিন্ন করলে রয়েছে তার জন্য কঠিন শাস্তি। যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখবে, আল্লাহ তাআলা তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবেন। আর যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আল্লাহ তাআলা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। আত্মীয়তা নামক এই বিশাল পরিবারের স্থায়ী সম্পর্ককে মজবুত রাখার জন্য ইসলাম অনেক হুকুম-আহকাম এবং নীতিমালা প্রদান করেছে। যেমন: পরস্পর সম্পর্ক বজায় রাখা। সবার প্রতি সবার খেয়াল রাখা। খোঁজ-খবর নেয়া। এক অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসা। অনুরূপভাবে ইসলাম দিয়েছে আত্মীয়দের উপর খরচ করার বিধান। তাদের মাঝে সম্পদ বণ্টনের বিধান। আকিকার বিধান। অর্থাৎ যদি কেউ ভুলক্রমে অথবা অকর্তব্যবশত কাউকে হত্যা করে ফেলে, তাহলে এই হত্যাকারীর পরিবার এবং তার আত্মীয়স্বজন মিলে এ হত্যার ক্ষতিপূরণ আদায় করবে।
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্কঃ আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ হলো- তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা। তাদের উপকার করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা। তাদের কোনো ক্ষতি না করা। তাদের দেখাশোনা করা। খোঁজখবর নেয়া। সময় করে তাদেরকে দেখতে যাওয়া। কিছু হাদিয়া-তোহফা দেয়া। গরীব আত্মীয়দেরকে বেশি বেশি দান করা। কেউ অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া। দাওয়াত দিলে কবুল করা। মাঝেমধ্যে তাদেরকে দাওয়াত করা। তাদেরকে সম্মান করা। তাদের মান-মর্যাদা রক্ষা করা। তাদের খুশিতে নিজেরাও খুশি হওয়া। আর তাদের দুঃখে দুঃখী হয়ে তাদেরকে সান্ত্বনা দেয়া। মোটকথা, সার্বিকভাবে তাদের প্রতি খেয়াল রাখা এবং খোঁজখবর নেয়া।
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা হলো- ইসলামী সমাজের ঐক্য ও সংহতি ঠিক রাখার এক অন্যতম মাধ্যম। এর দ্বারা সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তি অধিক শান্তি ও স্বস্তিতে জীবন যাপন করতে পারে। প্রত্যেকে নিঃস্বার্থতা ও বিচ্ছিন্নতামুক্ত থাকে। একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও মুহাব্বত বৃদ্ধি পায়। আর প্রয়োজনের মুহূর্তে একে অপরের সহায়তায় এগিয়ে আসে। আত্মীয়তার সম্পর্ক এমন একটি সম্পর্ক, যা টিকিয়ে রাখা প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব। এজন্য আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহারের আদেশ দিয়ে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তোমরা আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করো। তার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না। আর সদ্ব্যবহার করো মাতা-পিতার সাথে, নিকটাত্মীয়দের সাথে, এতিম, মিসকিন, আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের সাথে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না তাদেরকে, যারা দাম্ভিক-অহংকারী।”
কেউ যদি আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখতে চায়, তাহলে তার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখতে হবে। তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে হবে। তাদের কল্যাণ কামনা করতে হবে এবং তাদেরকে দান-সদকা করতে হবে। হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে কুদসীতে এ বিষয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, “আল্লাহ তাআলা বলেন- আমি রহমান। আত্মীয়তার বন্ধন হচ্ছে রহিম (رحم)। যা আমি আমার নাম (رحم) থেকে নির্মিত করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখব। আর যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব।”
যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখবে, তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ত বরকতময় জীবনের সুসংবাদ দিয়েছেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি- “যে ব্যক্তি এটা পছন্দ করে যে, তার রিযিকে বৃদ্ধি পাক এবং মৃত্যুর পরও তার সুনাম-সুখ্যাতি বজায় থাকুক, সে যেন আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করে।” এই হাদীসের ব্যাখ্যায় উলামায়ে কেরাম বলেন- “দুনিয়াতে এই ব্যক্তির জীবনে বরকত হবে। নেক আমল বেশি বেশি করতে পারবে। তার মূল্যবান সময়গুলো কাজে লাগাতে পারবে, যা তার আখেরাতে কাজে আসবে। আর অনর্থক-বেহুদা কাজ থেকে সে বিরত থাকতে পারবে।”
পক্ষান্তরে যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাদের ব্যাপারে কুরআন হাদীসে বহু সতর্কবাণী এসেছে এবং এটাকে বিরাট অন্যায় সাব্যস্ত করা হয়েছে। কেননা, আত্মীয়তা ছিন্ন করার মাধ্যমে সমাজের ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতি নষ্ট হয়। পরস্পরে শত্রুতা ও বিদ্বেষ তৈরি হয়। এজন্য আল্লাহ তাআলা অন্ধ দৃষ্টি, বধির হৃদয় আর আল্লাহ লা'নত সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে তাদেরকে বলেন- “তবে কি তোমরা এই প্রত্যাশা করছো যে, যদি তোমরা শাসন কর্তৃত্ব পাও, তাহলে জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে? এরাই ঐ সকল লোক, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা লা'নত করেছেন। ফলে তাদেরকে বধির করে দিয়েছেন, আর দৃষ্টিকে করেছেন অন্ধ।”
হযরত জুবাইর ইবনে মুতইম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” সম্পর্ক ছিন্ন করার অর্থ হলো- তাদের সাথে ভালো ব্যবহার না করা। তাদের প্রতি অনুগ্রহ না করা। তাদের থেকে দূরে দূরে থাকা। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা যে অনেক বড় গুনাহ, এ সম্পর্কে কুরআন-হাদীসে অনেক বক্তব্য এসেছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে এমন একটি সমাজ গঠন হবে, যারা পরস্পরে সুসংহত থাকবে, ঐক্যবদ্ধ থাকবে এবং একে অপরের সহায়তায় এগিয়ে আসবে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়াদ্ৰতা এবং সহানুভূতির দিক থেকে তাদের উদাহরণ হলো- একটি মানব দেহের ন্যায়। যখন তার একটি অঙ্গ আক্রান্ত হয়, তখন তার সারা দেহে ছেয়ে যায় ব্যাথা আর অনিদ্রা।”
টিকাঃ
১৮০. সূরা নিসা, আয়াত নং- ৩৬
১৮১. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং- ১৬৯৪ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ১৬৯০
১৮২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১৯৯৯
১৮৩. সূরা মুসনাদ, আয়াত নং- ১৬৯৯
১৮৪. সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত নং- ২০-২২
১৮৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫৯৮৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৫৯
১৮৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫৬৬৪ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৫৮
ভূমিকাঃ ইসলামের দৃষ্টিতে একটি পরিবার শুধু পিতা-মাতা আর সন্তান-সন্ততির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং ভাই-বোন, চাচা-ফুফু, মামা-খালা এবং চাচাতো, ফুফাতো, মামাতো, খালাতো ভাইবোন সবাই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। তাদের সবার সাথেই সদ্ব্যবহার এবং সম্পর্ক বজায় রাখার জোর নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। আত্মীয়তা রক্ষা করা এক মহৎ গুণ। এটা রক্ষা করলে অনেক সওয়াব। আর ছিন্ন করলে রয়েছে তার জন্য কঠিন শাস্তি। যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখবে, আল্লাহ তাআলা তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবেন। আর যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আল্লাহ তাআলা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। আত্মীয়তা নামক এই বিশাল পরিবারের স্থায়ী সম্পর্ককে মজবুত রাখার জন্য ইসলাম অনেক হুকুম-আহকাম এবং নীতিমালা প্রদান করেছে। যেমন: পরস্পর সম্পর্ক বজায় রাখা। সবার প্রতি সবার খেয়াল রাখা। খোঁজ-খবর নেয়া। এক অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসা। অনুরূপভাবে ইসলাম দিয়েছে আত্মীয়দের উপর খরচ করার বিধান। তাদের মাঝে সম্পদ বণ্টনের বিধান। আকিকার বিধান। অর্থাৎ যদি কেউ ভুলক্রমে অথবা অকর্তব্যবশত কাউকে হত্যা করে ফেলে, তাহলে এই হত্যাকারীর পরিবার এবং তার আত্মীয়স্বজন মিলে এ হত্যার ক্ষতিপূরণ আদায় করবে।
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্কঃ আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ হলো- তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা। তাদের উপকার করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা। তাদের কোনো ক্ষতি না করা। তাদের দেখাশোনা করা। খোঁজখবর নেয়া। সময় করে তাদেরকে দেখতে যাওয়া। কিছু হাদিয়া-তোহফা দেয়া। গরীব আত্মীয়দেরকে বেশি বেশি দান করা। কেউ অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া। দাওয়াত দিলে কবুল করা। মাঝেমধ্যে তাদেরকে দাওয়াত করা। তাদেরকে সম্মান করা। তাদের মান-মর্যাদা রক্ষা করা। তাদের খুশিতে নিজেরাও খুশি হওয়া। আর তাদের দুঃখে দুঃখী হয়ে তাদেরকে সান্ত্বনা দেয়া। মোটকথা, সার্বিকভাবে তাদের প্রতি খেয়াল রাখা এবং খোঁজখবর নেয়া।
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা হলো- ইসলামী সমাজের ঐক্য ও সংহতি ঠিক রাখার এক অন্যতম মাধ্যম। এর দ্বারা সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তি অধিক শান্তি ও স্বস্তিতে জীবন যাপন করতে পারে। প্রত্যেকে নিঃস্বার্থতা ও বিচ্ছিন্নতামুক্ত থাকে। একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও মুহাব্বত বৃদ্ধি পায়। আর প্রয়োজনের মুহূর্তে একে অপরের সহায়তায় এগিয়ে আসে। আত্মীয়তার সম্পর্ক এমন একটি সম্পর্ক, যা টিকিয়ে রাখা প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব। এজন্য আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহারের আদেশ দিয়ে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তোমরা আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করো। তার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না। আর সদ্ব্যবহার করো মাতা-পিতার সাথে, নিকটাত্মীয়দের সাথে, এতিম, মিসকিন, আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের সাথে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না তাদেরকে, যারা দাম্ভিক-অহংকারী।”১৮০
কেউ যদি আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখতে চায়, তাহলে তার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখতে হবে। তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে হবে। তাদের কল্যাণ কামনা করতে হবে এবং তাদেরকে দান-সদকা করতে হবে। হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে কুদসীতে এ বিষয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, “আল্লাহ তাআলা বলেন- আমি রহমান। আত্মীয়তার বন্ধন হচ্ছে রহিম (رحم)। যা আমি আমার নাম (رحম) থেকে নির্মিত করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখব। আর যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব।”১৮১
যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখবে, তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ত বরকতময় জীবনের সুসংবাদ দিয়েছেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি- “যে ব্যক্তি এটা পছন্দ করে যে, তার রিযিকে বৃদ্ধি পাক এবং মৃত্যুর পরও তার সুনাম-সুখ্যাতি বজায় থাকুক, সে যেন আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করে।”১৮২
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় উলামায়ে কেরাম বলেন- “দুনিয়াতে এই ব্যক্তির জীবনে বরকত হবে। নেক আমল বেশি বেশি করতে পারবে। তার মূল্যবান সময়গুলো কাজে লাগাতে পারবে, যা তার আখেরাতে কাজে আসবে। আর অনর্থক-বেহুদা কাজ থেকে সে বিরত থাকতে পারবে।”১৮৩
পক্ষান্তরে যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাদের ব্যাপারে কুরআন হাদীসে বহু সতর্কবাণী এসেছে এবং এটাকে বিরাট অন্যায় সাব্যস্ত করা হয়েছে। কেননা, আত্মীয়তা ছিন্ন করার মাধ্যমে সমাজের ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতি নষ্ট হয়। পরস্পরে শত্রুতা ও বিদ্বেষ তৈরি হয়। এজন্য আল্লাহ তাআলা অন্ধ দৃষ্টি, বধির হৃদয় আর আল্লাহ লা'নত সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে তাদেরকে বলেন- “তবে কি তোমরা এই প্রত্যাশা করছো যে, যদি তোমরা শাসন কর্তৃত্ব পাও, তাহলে জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে? এরাই ঐ সকল লোক, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা লা'নত করেছেন। ফলে তাদেরকে বধির করে দিয়েছেন, আর দৃষ্টিকে করেছেন অন্ধ।”১৮৪
হযরত জুবাইর ইবনে মুতইম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”১৮৫
সম্পর্ক ছিন্ন করার অর্থ হলো- তাদের সাথে ভালো ব্যবহার না করা। তাদের প্রতি অনুগ্রহ না করা। তাদের থেকে দূরে দূরে থাকা। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা যে অনেক বড় গুনাহ, এ সম্পর্কে কুরআন-হাদীসে অনেক বক্তব্য এসেছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে এমন একটি সমাজ গঠন হবে, যারা পরস্পরে সুসংহত থাকবে, ঐক্যবদ্ধ থাকবে এবং একে অপরের সহায়তায় এগিয়ে আসবে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়াদ্রতা এবং সহানুভূতির দিক থেকে তাদের উদাহরণ হলো- একটি মানব দেহের ন্যায়। যখন তার একটি অঙ্গ আক্রান্ত হয়, তখন তার সারা দেহে ছেয়ে যায় ব্যাথা আর অনিদ্রা।”১৮৬
টিকাঃ
১৮০. সূরা নিসা, আয়াত নং- ৩৬
১৮১. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং- ১৬৯৪ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ১৬৯০
১৮২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১৯৯৯
১৮৩. সূরা মুসনাদ, আয়াত নং- ১৬৯৯
১৮৪. সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত নং- ২০-২২
১৮৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫৯৮৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৫৯
১৮৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫৬৬৪ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৫৮
📄 মুসলিম সমাজে ভ্রাতৃত্বের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
ভূমিকা: একটি মুসলিম সমাজ এমন একটি বড় পরিবার, যার ভিত্তি হলো– পরস্পর ভালোবাসা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা আর দয়া-মায়ার উপর। এদের দ্বারাই তো কায়েম হবে খোদাভীরু, মানবতাবাদী, নীতিজ্ঞান ও ভারসাম্যপূর্ণ এক আদর্শ সমাজ। যেখানে প্রত্যেকটি মানুষ হবে উত্তম চরিত্রের অধিকারী। তাদের সকল কাজ পরিচালিত হবে ন্যায়-ইনসাফ ও পরামর্শের ভিত্তিতে। যেখানে বড়রা দয়া করবে ছোটদেরকে। ধনীরা রহম করবে গরীবদেরকে। শক্তিশালীরা সাহায্য করবে দুর্বলদেরকে। এভাবে সমাজের সবাই মিলে হবে এমন একটি দেহ, যখন তার একটি অঙ্গ আক্রান্ত হবে, তখন পুরো দেহটাই ব্যথিত হবে। অথবা তারা হবে এমন কতগুলো ইঁটের মত, যার একটা অপরটার সাথে একদম ভালো করে জড়িয়ে আছে।
ইসলামে ভ্রাতৃত্ববোধঃ রেগান২৯০ প্রশাসনের অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন– ‘লী অ্যাটওয়াটার’২৯১। তিনি Life পত্রিকার ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯ ইং সংখ্যায় লিখেছিলেন– “আমার অসুস্থতা আমাকে এ বিষয়টা বুঝতে সহায়তা করেছিলো যে, সমাজে যে বিষয়টা অনুপস্থিত, সেটা আমার মধ্যেও অনুপস্থিত। আর তা হলো– পরস্পরে ভালোবাসা ও সুহৃদ্যতার কমতি এবং ভ্রাতৃত্ববোধের অবক্ষয়...।” ইসলাম একটি আদর্শ সমাজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যে বিস্ময়কর মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করেছে, তার মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব ও ঐক্য হলো অন্যতম। যা একটি সমাজকে ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত করে তোলে। এটা এমন এক দুর্লভ বিষয়, যা ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো সমাজে পাওয়া যায় না; অতীতও না, বর্তমানেও না। “কোথাও এমন পাওয়া যায় না যে, সমাজের প্রত্যেকটা মানুষ এক অপরকে ভালোবাসবে। পরস্পরে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে। সাহায্য-সহযোগিতা করবে। সবাই নিজেদেরকে একই পরিবারের সদস্য মনে করে এক অপরকে ভালোবাসবে। তাদেরকে শক্তিশালী করবে। প্রত্যেকে তার ভাইয়ের শক্তিকে নিজের শক্তি মনে করবে। তার ভাইয়ের দুর্বলতাকে নিজের দুর্বলতা মনে করবে। নিজের চাহিদাকে পেছনে রেখে তার ভাইকে প্রাধান্য দিবে।”২৯২
মুসলিম সমাজে ভ্রাতৃত্বের অবস্থান: ইসলামী সমাজে ভ্রাতৃত্বের অবস্থান এবং মুসলিম সমাজে এর প্রভাব সম্পর্কে বহু আয়াত এবং হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যেসব বিষয় ভ্রাতৃত্ববোধকে জাগ্রত করে সেসব বিষয়ে প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। আর যেসব বিষয় ভ্রাতৃত্ববোধে ফাটল সৃষ্টি করে সেসব বিষয়কে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ঈমানের সাথে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক কায়েম করে দিয়ে বলেন– “সমস্ত মুমিন ভাই ভাই।”২৯৩
এখানে জাতি, বংশ আর বর্ণার ভিত্তিতে ভ্রাতৃত্ব কায়েম করা হয়নি; বরং ভ্রাতৃত্ব হবে শুধুমাত্র ঈমানের ভিত্তিতে। হযরত সালমান ফারসী, বেলাল হাবশী আর সুহাইব রুমীদেরকেও আরবদের সাথে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করা হয়েছিলো শুধুমাত্র ঈমানের ভিত্তিতেই। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে– ঈমানের ভিত্তিতে এই ভ্রাতৃত্ববোধ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক বিশেষ নিয়ামত। আল্লাহ তাআলা বলেন– “আর তোমরা সেই নেয়ামতের কথা স্মরণ করো, যা আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে। অতপর আল্লাহ তাআলা তোমাদের অন্তরে ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছেন। ফলে এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছো।”২৯৪
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরত করে মদীনায় এলেন, তখন মসজিদ নির্মাণ করার পরপরই আনসার এবং মুহাজির সাহাবীদের মাঝে ভ্রাতৃত্ববন্ধন আবদ্ধ করে দিলেন। ভালোবাসা এবং স্বার্থত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে এই ভ্রাতৃত্বের কথা পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা চিরকালের জন্য সংরক্ষণ করে দিয়ে বলেন– “আর মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মদীনায় বসবাস করছিলো এবং ঈমান এনেছিলো, তারা মুহাজিরদেরকে ভালোবাসে। মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে, এর জন্য তারা ঈর্ষা পোষণ করে না। তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও মুহাজিরদেরকে অগ্রাধিকার প্রদান করে। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।”২৯৫
এই ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে আনসারী সাহাবায়ে কেরাম ভালোবাসা এবং স্বার্থত্যাগের যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন, বিশ্ব ইতিহাসে কোথাও এর কোনো নজীর নেই। আনসারী সাহাবীগণ তাদের মুহাজির ভাইদের জন্য নিজের অর্ধেক সম্পদ দিয়ে দিয়েছেন। নিজেদের দুই স্ত্রী থাকলে একজনকে তালাক দিয়ে মুহাজির ভাইয়ের সাথে তার বিবাহ দিয়েছেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন– হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাজিয়াল্লাহু আনহু যখন মদীনায় আসলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাঝে এবং সা’দ ইবনে রবী’ আনসারী রাজিয়াল্লাহু আনহুর মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দিলেন। হযরত সা’দ রাজিয়াল্লাহু আনহু তার সমস্ত সম্পদ ভাগ করে অর্ধেক সম্পদ তার ভাইজান স্ত্রীর মধ্য হতে যেকোনো একজনকে নিয়ে যাওয়ার জন্য হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাজিয়াল্লাহু আনহুকে অনুরোধ জানালেন। তিনি উত্তরে বলেন– “আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবার ও সম্পদে বরকত দান করুন। আপনি শুধু আমাকে এখানকার বাজারের রাস্তাটি দেখিয়ে দিন...।”২৯৬
একটি শান্তিপূর্ণ ঐক্যবদ্ধ আদর্শ সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় ইসলামী ভ্রাতৃত্বকে দুর্বল করে দেয় এবং পরস্পরে বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে, ইসলাম সেসব বিষয় থেকে সম্পূর্ণরূণে বিরত থাকতে বলেছে। কাউকে উপহাস আর বিদ্রুপ করাকে হারাম করে দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন– “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কেউ যেনো কাউকে উপহাস না করে। কেননা, হতে পারে যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারীর চেয়ে উত্তম। আর কোনো নারীও যেনো অন্য নারীকে উপহাস না করে। কেননা, হতে পারে যাকে উপহাস করা হয়, সে উপহাসকারিণীইয়ের চেয়ে উত্তম।”২৯৭
অন্যকে তুচ্ছ করা আর নিজ বংশের গর্ব করাকে নিষেধ করে আল্লাহ তাআলা বলেন– “আর তোমরা এক অপরের নিন্দা করো না এবং এক অপরের মন্দ নামে ডেকো না। ঈমানের পর মন্দ উপনাম কতইনা নিকৃষ্ট বিষয়! আর যারা তাওবা করে না, তারাই তো জালিম।”২৯৮
অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলা হারাম করে দিয়েছেন– গীবত, অন্যের দোষ চর্চা আর মানুষের প্রতি খারাপ ধারণা করাকেও। কেননা, এসব নিম্ন মানের নিকৃষ্ট কাজের মাধ্যমে একটি সুন্দর সমাজ ধ্বংস হয়ে যায়। এজন্য আল্লাহ তাআলা বলেন– “হে মুমিনগণ! তোমরা অনেক ধারণা করা থেকে বিরত থাকো। নিশ্চয়ই কিছু ধারণাও গুনাহ। আর তোমরা অন্যের গোপন বিষয় তালাশ করো না। এবং এক অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তাঁর মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাকো। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা অধিক তাওবা কবুলকারী, অসীম দয়ালু।”২৯৯
সমাজে যখন পরস্পরে ঝগড়া-বিবাদ এবং দূরত্ব সৃষ্টি হবে, তখন ইসলামের শিক্ষা হলো– তাদেরকে দয়া-মায়া এবং আন্তরিকতার সাথে বুঝিয়ে পরস্পরে মিশিয়ে দেয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজের প্রতি আগ্রহ এবং উৎসাহ প্রদান করে বলেন– “আমি কি তোমাদেরকে নামাজ, রোজা এবং দান-সদকা থেকেও উত্তম আমল বলে দিবো! সাহাবায়ে কেরাম বললেন, অবশ্যই হে আল্লাহ্র রাসূল। তিনি বললেন– তা হলো পরস্পরের মাঝে মীমাংসা করে দেয়। আর মানুষের মাঝে ঝগড়া বাড়ানো ধ্বংসের কারণ।”৩০০
একদিকে পরস্পরে মাঝে মীমাংসা করার ক্ষেত্রে ইসলাম প্রয়োজনে কৌশল মিথ্যা বলারও অনুমতি দিয়েছে। কেননা, ঝগড়া-বিবাদ একটি ইসলামী সমাজকে সম্পূর্ণরূণে ধ্বংস করে ছাড়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন– “ঐ ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয়, যে (মিথ্যা বলে) পরস্পরের মাঝে মীমাংসা করে দেয়। কেননা, সে কল্যাণের জন্যই মিথ্যা বলে। আর কল্যাণের জন্যই গন্ডগোল মেটায়।”৩০১
ভ্রাতৃত্বের অধিকার এবং কর্তব্যঃ ভ্রাতৃত্বের গুরুত্ব বেশি হওয়ার কারণে ইসলাম এ সংক্রান্ত এমন কিছু অধিকার এবং কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা প্রত্যেকটি মুসলমানকে মেনে চলতে হয়। এ গুলোকে দ্বীনের অংশ বানানো হয়েছে, পরকালে যার হিসাব নেয়া হবে। আর এগুলোকে এমন আমানত বানানো হয়েছে, যা অবশ্যই আদায় করতে হবে। এ বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন– “তোমরা পরস্পর হিংসা করো না। পরস্পর ধোঁকাবাজি করো না। পরস্পর বিদ্বেষ পোষণ করো না। এক অপরের প্রতি ফন্দির উদ্দেশ্যে তার অগোচরে শত্রুতা করো না। এবং এক অপরের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর ক্রয়-বিক্রয়ের চেষ্টা করো না। তোমরা সবাই আল্লাহ্র বান্দা হিসাবে ভাই ভাই হয়ে থাকো। এক মুসলিম আরেক মুসলিমের ভাই। সুতরাং কেউ কাউকে অত্যাচার করবে না, অপদস্ত করবে না এবং হেয় প্রতিপন্ন করবে না। ...একজন মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার ভাইকে হেয় প্রতিপন্ন করে। একজন মুসলিমের উপর প্রত্যেক মুসলিমের জান-মাল-ইজ্জত-আবরু (হারাম)।”৩০২
উক্ত হাদীসে ‘অপদস্থ না করা’র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উলামায়ে কেরাম বলেন– “অপদস্থ করা মানে তাকে সাহায্য-সহযোগিতা না করা। সুতরাং যদি কেউ জুলুম-অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য কারো কাছে সাহায্য কামনা করে, তাহলে তাকে সাহায্য করা তার জন্য ওয়াজিব, যদি তার পক্ষে সম্ভব হয় এবং শরিয়তের পক্ষ থেকে কোনো বাধা না থাকে।”১১৬
হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তোমার ভাইকে সাহায্য কর। চাই সে জালেম হোক অথবা মাজলুম। এক লোক বলল হে আল্লাহ্র রাসূল! মাজলুম হলে তাকে সাহায্য করব বুঝলাম; কিন্তু জালেম হলে তাকে কিভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেন- তাকে অত্যাচার থেকে বিরত রাখবে। এটাই তার সাহায্য।”১১৭
পৃথিবীতে একমাত্র ইসলামী সমাজ ছাড়া এমন মানবতাবাদী আর কোন সমাজ আছে, যেখানে একজন ব্যক্তি অভাবে পড়লে তার প্রয়োজন পূরণ করা, মাজলুম হলে তাকে সাহায্য করা, আর যদি জালেম হয় তাহলে তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখা প্রত্যেকের জন্য অবশ্য কর্তব্য?!
এটা শুধুমাত্র ইসলামী সমাজেই আছে। কেননা, ইসলামে রয়েছে উন্নত ভ্রাতৃত্ব এবং ঐক্যবদ্ধ চেতনা। যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি তার অপর ভাইয়ের বিপদ-আপদে পাশে দাঁড়ায় এবং তাকে যথাসাধ্য সাহায্য-সহযোগিতা করে। যেখানে পরস্পরে কোন হিংসা নেই, বিদ্বেষ নেই, নেই কোন শত্রুতা। আপসে মিলে-মিশে থাকাটা যেখানে অবশ্য কর্তব্য। আর এভাবেই হয় সহিষ্ণুপূর্ণ ঐক্যবদ্ধ এক সুন্দর সুষ্ঠু ও আদর্শ সমাজ।
টিকাঃ
২৯০. রোলান্ড রেগান। তিনি ছিলেন আমেরিকার ৪০ তম রাষ্ট্রপতি।
২৯১. লী অ্যাটওয়াটার। তিনি ছিলেন আমেরিকান রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক উপদেষ্টা।
২৯২. মাসামিমুল মুজতাবেল মুসলিমিন: ১৩৯
২৯৩. সূরা হুজুরাত, আয়াত নং–১০
২৯৪. সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং–১০৩
২৯৫. সূরা হাশর, আয়াত নং–৯
২৯৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং– ৩৭২২ জামে তিরমিযী, হাদীস নং–১৯৩৩
২৯৭. সূরা হুজুরাত, আয়াত নং–১১
২৯৮. সূরা হুজুরাত, আয়াত নং–১১
২৯৯. সূরা হুজুরাত, আয়াত নং–১২
৩০০. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং–৪৬৯৯ জামে তিরমিযী, হাদীস নং–২৫০৪
৩০১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং–২৫৪৯ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং–২৬০৫
৩০২. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং–২৫৬৪ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং–৭৭৯৩
১১৬. আল মিনহাজ১/১৫৯
১১৭. জামে তিরমিযী, হাদীস নং-২২৫৫ সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৯৫২
📄 ইসলামী সমাজে সহযোগিতা-সহমর্মিতা
ভূমিকাঃ ইসলামী শরীয়ত যেখানে তার মুসলিম অনুসারীদেরকে সুখে-দুঃখে এবং কষ্ট-বেদনায় একে অপরের সহমর্মিতা এবং সহানুভূতি নির্দেশ দিয়েছে, সেখানে প্রয়োজন এবং অভাবের মুহূর্তেও একে অপরের সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। ইসলাম মনে করে- সমস্ত মুসলমান হলো ইঁট দ্বারা গঠিত একটি প্রাসাদের মত। যেখানে একটি ইঁট আরেকটা ইঁটকে শক্তিশালী করে। এজন্য হযরত আবু মূসা আশআরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “এক মুসলিম আরেক মুসলিমের জন্য প্রাসাদের মত। যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে।”১১৮
আবার এভাবেও বলা যায় যে, সমস্ত মুসলমান একটি দেহের মত। যখন তার একটি অঙ্গ আক্রান্ত হয়, তখন সারা দেহটাই ব্যথিত হয়ে পড়ে। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “পরস্পর ভালোবাসা, দয়াদ্ৰতা এবং সহানুভূতির ক্ষেত্রে সমস্ত মুসলমান একটি দেহের মত। যখন তার একটি অঙ্গ আক্রান্ত হয় তখন তার সমস্ত দেহ ব্যাথা ও অনিদ্রায় ছেয়ে যায়।”১১৯
ইসলামে ব্যাপক সহযোগিতা: ইসলামে সামাজিক সহযোগিতা শুধু জাগতিক কল্যাণের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়- যদিও এটা সহযোগিতার মূল ক্ষেত্র- বরং ব্যক্তি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সমাজের সকল প্রয়োজনেই রয়েছে ইসলামে সহযোগিতার বিধান। চাই সে প্রয়োজনীয়তা হোক জাগতিক বা নৈতিক অথবা বুদ্ধিবৃত্তিক। কেননা ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীর সমস্ত মৌলিক অধিকারগুলো এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে থাকে। ইসলামে সহযোগিতামূলক সকল শিক্ষা মুসলমানদের মাঝে ব্যাপক সহযোগিতাকেই বুঝায়। এজন্য দেখা যায় ইসলামী সমাজে নেই কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থবাদ এবং সংকীর্ণ মনোভাব। বরং ইসলামী সমাজে রয়েছে আন্তরিক ভ্রাতৃত্ব, উদার দানশীলতা আর সর্বদা সৎ কাজে সহযোগিতা।
ইসলামে সার্বজনীন সহযোগিতা: ইসলামে এই সামাজিক সহযোগিতা শুধু মুসলমানরাই ভোগ করবে না; বরং ভিন্ন মতাবলম্বী বিভিন্ন ধর্মের প্রত্যেক মানুষ এই সহযোগিতার ভোগ করার অধিকার রাখে। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন- “দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়িঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালোবাসেন।”১২০
কেননা, সহযোগিতা-সহমর্মিতার মূল কারণ হলো- মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের মর্যাদা রক্ষা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আমি আদম সন্তানদেরকে সম্মানিত করেছি এবং তাদেরকে জলস্থলে চলাচলের জন্য বাহন দান করেছি। তাদেরেকে উত্তম রিযিক দান করেছি। আর আমার সকল সৃষ্টির মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।”১২১
ইসলামী সমাজে মানুষের পরস্পর সহযোগিতা-সহমর্মিতার ব্যাপারে যে সকল নীতিমালা রয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম হলো এই আয়াতটি। যেখানে আল্লাহ তাআলা বলেন- “ভালো কাজ এবং খোদাভীতির ক্ষেত্রে তোমরা একে অপরের সহযোগিতা করো। মন্দকাজ এবং সীমালঙ্ঘনে একে অপরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা কঠিন শাস্তি প্রদানকারী।”১২২
ইমাম কুরতুবী১২৩ রহ: বলেন- “এ আয়াতে সকল মানুষকে ভালো কাজে সহযোগিতা আদেশ করা হয়েছে। অর্থাৎ তারা সবাই একে অপরকে সহযোগিতা করবে।”১২৪
ইমাম মাওয়ার্দী১২৫ রহ: বলেন- “আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াতে মানুষের সহযোগিতার সাথে সাথে খোদাভীতিও সম্পর্ক করে দিয়েছেন। কেননা, খোদাভীতিতে রয়েছে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি। আর সহযোগিতায় রয়েছে মানুষের সন্তুষ্টি। যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি এবং মানুষের সন্তুষ্টি- দুটিই পেলো, সেই প্রকৃত সফলকাম এবং পরম সৌভাগ্যবান।”১২৬
ইসলামে যাকাতের গুরুত্ব: পবিত্র কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণা- ধনীদের সম্পদে একটা নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে- অভাবী ও গরীবদের জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন- “যাদের সম্পদে রয়েছে নির্ধারিত অধিকার- অভাবী এবং বঞ্চিতদের জন্য।”১২৭
“যাদের সম্পদে নির্ধারিত পরিমাণ অন্যের অধিকার রয়েছে, শরীয়ত নিজেই সেই পরিমাণের কথা স্পষ্ট বর্ণনা করে দিয়েছে। আর এই নির্ধারিত পরিমাণ দানে রয়েছে- ধনীদের দানশীলতা, নেককারদের বদান্যতা, গরীবের প্রতি দয়াদ্ৰতা, পরস্পরে ভালোবাসা, দানশীলতায় উদ্বুদ্ধ করা আর ভালো কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদানের এক অনুপম শিক্ষা।”১২৮
শরীয়ত কর্তৃক এই নির্ধারিত পরিমাণে উপযুক্ত কারা, সেটাও পবিত্র কুরআনেই বলে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- “নিশ্চয়ই সাদাকা হচ্ছে গরীব-মিসকিনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য। আর যাদের অন্তর (ইসলামের প্রতি) আকৃষ্ট করা হয় তাদের জন্য। এই অর্থ ব্যয় করা যায়- গোলাম আযাদ করার ক্ষেত্রে। ঋণগ্রস্তদের মধ্যে। আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ তাআলা মহা জ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।”১২৯
ইসলামে যাকাতের গুরুত্ব অনেক বেশি। কেননা, সমাজের বিরাট এক অংশ এর মাধ্যমে উপকৃত হয়। যাকাত এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার মূল কারণ হলো- এর মাধ্যমে অন্যের সহযোগিতা এবং সহায়তা করা হয়। যাকাত ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। এটা ছাড়া ইসলামই পূর্ণতা লাভ করে না। যাকাত যাকাতদাতার অন্তরকে পবিত্র ও পরিছন্ন করে। সুতরাং যাকাতগ্রহীতার উপকারের আগেই যাকাতদাতার উপকার হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন- “তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা (যাকাত) নাও। এর মাধ্যমে তাদেরকে তুমি পবিত্র ও পরিছন্ন করবে।”১৩০
এতে সন্দেহ নেই যে, যাকাত যেমনভাবে যাকাতদাতার অন্তর থেকে লোভ, কৃপণতা ও আত্মস্বার্থকে বের করে দেয়; তেমনিভাবে গরীব, অভাবী এবং যাকাতের উপযুক্ত ব্যক্তির অন্তর থেকে বের করে দেয়- বিদ্বেষ, ঘৃণা এবং ধনী ও বিত্তবানদের সাথে শত্রুতা। আর এই ফরযটি আদায় করার মাধ্যমে সমাজে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা-মুহাব্বাত, দয়া-মেহেরবানি ও সহায়তা-সহনশীলতা কয়েকগুণে বৃদ্ধি পায়।
ইসলামী শরীয়ত শাসকের এই অনুমতি দিয়েছে যে, তারা ধনীদের থেকে যাকাতের মাল সংগ্রহ করবে এবং তা গরীবদের মাঝে প্রত্যেকের প্রয়োজন অনুযায়ী পৌঁছে দিবে। মুসলমানদের সমাজে এটা মেনে নেওয়া যায় না যে, কেউ পেট ভরে খাবে পূর্ণ তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলবে, আর তার প্রতিবেশি কেউ না খেয়ে কষ্টে থাকবে। বরং ইসলামের আদর্শ হলো- সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বাচ্ছন্দ্য জীবন যাপন করবে। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “সেই ব্যক্তি আমার উপর ঈমান আনেনি, যে পরিতৃপ্ত হয়ে রাত যাপন করে, আর তার পাশের প্রতিবেশি ক্ষুধার্ত থাকে, যা সে জানে।”১৩১
ইমাম ইবনে হাযাম২২৫ রহ: বলেন- "প্রত্যেক শহরের ধনীদের উপর এটা ওয়াজিব যে, তারা গরীবদের নিকট যাকাতের মাল পৌঁছে দিবে। যদি তারা গরীবদেরকে যাকাত না দেয়, তাহলে সরকার তাদেরকে এ কাজে বাধ্য করবে। কেননা, মুসলমানদের সকল মালের ক্ষেত্রেই তাদের অধিকার রয়েছে। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের ব্যবস্থা করবে। শীত ও গরমের প্রয়োজনীয় পোশাকের ব্যবস্থা করবে। রোদ, বৃষ্টি, গরম আর মানুষের দৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য তাদের থাকার ব্যবস্থা করবে।"২২৬
জাতিগত সহযোগিতার ব্যাপারে ইসলামে দৃঢ়ভক্তি হলো- অভাবীদেরকে নির্দিষ্ট পরিমাণ দান করে দিয়ে দান বন্ধ করা যাবে না; বরং তাদেরকে নির্দিষ্ট পরিমাণ দান করার পরও অতিরিক্ত আরও দান করে যাবে। যা আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা দ্বারা স্পষ্ট হয়। তিনি বলেন- "তোমরা গরীবদেরকে বারবার দান করতে থাকো, যদিও তাদের কারও একশত উট হয়ে যায়।"২২৭
সাহায্য-সহযোগিতার ফযিলত সংক্রান্ত কিছু হাদীসঃ মুসলিম সমাজে একে অপরের প্রতি সহযোগিতা, সহানুভূতিও ফযিলত-উৎসাহ এবং ইসলামে এর অবস্থান সম্পর্কে অনেক হাদীসে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। হযরত আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- "আশআরী গোত্রের লোকেরা যখন জিহাদে গিয়ে অভাবগ্রস্ত হয়ে যায়, অথবা মদীনাতেই তাদের পরিবার-পরিজনদের খাবার- ঘাটতি দেখা দেয়, তখন তারা নিজেদের কাছে থাকা সমস্ত সম্পদকে একত্রিত করে একটি কাপড়ে জমা করে। এরপর একটি পাত্র দ্বারা মেপে প্রত্যেকে সমানভাগে বন্টন করে নেয়। সুতরাং তারা আমার (দলভুক্ত) আর আমিও তাদের (দলভুক্ত)।"২২৮
ইবনে হাজার রহ: তার বিখ্যাত কিতাব ফাতহুল বারী'তে লিখেন- "অর্থাৎ তারা আমার সাথে সম্পৃক্ত। আর এটা একজন মুসলমানের জন্য কতবড় মর্যাদার বিষয়।"২২৯
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- "এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সুতরাং কেউ কাউকে অত্যাচার করবে না এবং দুশমনের হাতে সোপর্দ করবে না। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের অভাব-অনটন দূর করবে, আল্লাহ তায়ালা তার অভাব-অনটন দূর করে দিবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তায়ালা তার প্রতিদানস্বরূপ কিয়ামতের দিন তাকে সমস্ত বিপদ থেকে মুক্তি দান করবেন। আর যে মুসলমানের দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবে, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তার দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবেন।"২৩০
ইমাম নববী রহ: বলেন- "এই হাদীসে মুসলমানের সাহায্য করা, তার বিপদ দূর করা এবং তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখার ফযিলত বলা হয়েছে। যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ দ্বারা বা ক্ষমতা দ্বারা বা সহযোগিতার দ্বারা; এমনকি যে ব্যক্তি ইশারায় বা চিন্তা-ফিকির করে এমনকি খবর দেয়ার মাধ্যমেও কাউকে সাহায্য করে, সেও এই ফযিলতের অন্তর্ভুক্ত।"২৩১
এই হলো মুসলিম সমাজে পরস্পর সহযোগিতার এক উত্তম চিত্র। সমাজের প্রত্যেকটি মানুষই চেষ্টা করবে, সমাজে যথেষ্ট পরিমাণ সাহায্য করতে। প্রত্যেক সামর্থবান এবং ক্ষমতাবানের দায়িত্ব হলো- "সমাজের প্রতিটি ভালো কাজেই সমাজকে সাহায্য করবে। আর সমাজের প্রতিটি মানবশক্তি মানুষের কল্যাণ সংরক্ষণে করবে এবং সমাজকে বিপদমুক্ত রাখার চেষ্টা করবে। সমাজ বিনির্মাণ এবং সমাজকে একটি মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে, ক্ষতিকর দিকগুলোকে প্রতিহত করার মাধ্যমে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ সমাজের প্রতিটি মানুষ একে অপরের সাথে হাসি-খুশি, সহানুভূতি আর সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলবে। আর প্রত্যেকে প্রত্যেককে নিজ ভাই মনে করবে।"২৪২
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভাবীদের সাহায্য করতে বলেছেন এবং সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের অনুভূতিকে সম্মান করতে বলেছেন। তিনি বলেন- "সূর্য উদিত হয় এমন প্রত্যেক দিন, প্রত্যেক ব্যক্তির উপর নিজের পক্ষ থেকে সদকা করতে হবে। এক সাহাবী বললেন- হে আল্লাহর রাসূল! আমার তো এতো সম্পদ নেই, আমি কিভাবে সদকা করবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- অন্ধকে পথ দেখে দেয়া, বোবা ও বধিরকে এমনভাবে পথ দেখানো, যাতে তারা বুঝতে পারে, প্রত্যেকের সম্মান বজায় রেখে তাকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া, কোনো সাহায্যপ্রার্থীর প্রয়োজন পূরণে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয় করা এবং পূর্ণ শক্তি দিয়ে দুর্বলকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা; এসবই তোমার পক্ষ থেকে সদকার অন্তর্ভুক্ত।"২৪৩
বর্তমানে এ জাতীয় মূল্যবোধগুলিকে উন্নত সভ্যতার নিদর্শন বিবেচনা করা হয়। অথচ বহু আগে থেকেই ইসলাম এগুলোকে আইন-কানুন বানিয়ে রেখেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাসককেও এ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন যে, তারা দ্রুত জনগণের চাহিদা পূরণ করবে। হযরত আমর ইবনে মুররাহ্ হযরত মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন- আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি- “যে শাসক গরীব, মিসকীন এবং সাহায্যপ্রার্থীর আগমনের জন্য নিজের দরজা বন্ধ রাখে, এ ধরনের লোকের দায়িত্ব, অভাব এবং প্রয়োজনের সময় আল্লাহ তায়ালাও আকাশের দরজা বন্ধ রাখবেন। একথা শোনার পর হযরত মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু মানুষের প্রয়োজনের খোঁজখবর নেয়ার জন্য আলাদা এক লোককে নিযুক্ত করে দিলেন।"২৪৪
হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত আবু তালহা আনসারী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- "যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন স্থানে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকে; যেখানে (সাহায্য না পেলে) তার মান-ইজ্জত নষ্ট হয়, আল্লাহ তায়ালাও তাকে এমন স্থানে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকেন, যেখানে সে সাহায্য কামনা করে। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের মান-ইজ্জত রক্ষার্থে তাকে সাহায্য করে, আল্লাহ তায়ালা তাকে এমন স্থানে সাহায্য করবেন, যেখানে সে সাহায্য কামনা করে।"২৪৫
অন্যের সাহায্য করা যে কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এ সম্পর্কে মুসলিম পণ্ডিতগণের বক্তব্য শুনলে আশ্চর্য হতে হয়। তারা বলেন- "অন্যকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ওয়াজিব। কেউ নামাজে দাঁড়ালো, এমতাবস্থায় অপর একজন কোনো কঠিন বিপদে পড়ে তার কাছে সাহায্য চাইলো বা পানিতে পড়ে গেলো বা আগুনে পড়ে গেলো বা কোনো শ্বাপদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে; এমতাবস্থায় এই ব্যক্তির নামাজ ছেড়ে দেয়া ওয়াজিব। এই মুহূর্তে যদি সে ছাড়া অন্য কেউ না থাকে, তাহলে তার জন্য এদেরকে সাহায্য করা ফরজে আইন বা অবশ্য কর্তব্য। আর যদি সে ছাড়া অন্য কেউ থাকে সাহায্য করার মত, তাহলে তার জন্য সাহায্য করা ফরজে কেফায়া। এটা ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।"২৪৬
মোটকথা, পরস্পর সাহায্য-সহযোগিতা হলো ইসলামী সভ্যতার একটি মৌলিক গুণ। এর রয়েছে অনেক শাখা-প্রশাখা। যেমন: কারও বিপদে সাহায্য করা। সহযোগিতা করা। কারও দুঃখে সহমর্মী হওয়া। কেউ অভাবে পড়লে তার অভাব দূর করার জন্য এগিয়ে আসা। অন্যের কষ্টে সান্ত্বনা দেওয়া। সর্বাবস্থায় একে অপরের খোঁজখবর রাখা।
টিকাঃ
১১৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫৮৯০ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৫৮৫
১১৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬০০১ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৬৭৭১
১২০. সূরা মুমতাহিনাহ, আয়াত নং-৮
১২১. সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত নং-৭০
১২২. সূরা মায়েদাহ, আয়াত নং-২
১২৩. ইমাম কুরতুবী রহ:। তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব হলো- আল আহকাম’ ফি আকবামিল কুরআন।
১২৪. তাফসিরে কুরতুবী:৪/৮৭/১
১২৫. ইমাম মাওয়ার্দী রহ:। তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব- আদাবুদুনিয়া ওয়াদদীন। আল আহকামুস সুলতানিয়াহ।
১২৬. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদদীন: ২৮-২৯
১২৭. সূরা মাআরিজ, আয়াত নং-২৪-২৫
১২৮. আবু তাহলুবুল ইজতিমা'ঈ: ৭
১২৯. সূরা তাওবাহ, আয়াত নং-৬০
১৩০. সূরা তাওবাহ, আয়াত নং-১০৩
১৩১. সহীহুল ইবনু ঈমান, হাদীস নং-৬২০৮ আল আদাবুল মুফরাদ:১১২
২২৫. ইবনে হাযাম আন্দালুসী। তিনি ছিলেন ইসলামের একজন বড় ইমাম এবং ইলমে ফিকহের বড় পণ্ডিত।
২২৬. আল্ মুহাল্লা: ৪২/৬
২২৭. আল্ মুহাল্লা: ৪২/৬
২২৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৪০৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৫০০
২২৯. ফাতহুল বারী: ৬০০/৫
২৩০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৪৪৩ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৫৮০
২৩১. আল্ মিনহাজ: ২৪/১৬
২৪২. আবু বাকাতাবুল ইজতিয়াতী: ১০
২৪৩. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৩৩৭৭ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৫৯৯২
২৪৪. জামে তিরমিযী, হাদীস নং- ১৩৩২ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৬০১২
২৪৫. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৪৮৮৪ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৬৪৮৯
২৪৬. আল্ মুনাযীরী: ২০২/৫-২০৩/৫
📄 ইসলামে ন্যায়বিচারের গুরুত্ব ও বাস্তবতা
ন্যায়বিচারের গুরুত্ব: ন্যায়বিচার হলো মানবিক মূল্যবোধের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলাম যার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছে। ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন এবং রাষ্ট্রীয় জীবন- সর্বক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এজন্য পবিত্র কুরআনে ন্যায়বিচারকে নবী-রাসূল পাঠানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- "নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে স্পষ্ট দলিল-প্রমাণসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ড দিয়েছি। যাতে মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।"২৯৪
"ন্যায়বিচার বা ইনসাফের গুরুত্ব এরচেয়ে বেশি আর কী হতে পারে, আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন, আর তাদের যত কিতাব দিয়েছেন, সবকিছুর প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো দুনিয়াতে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। সুতরাং বলা যায়, ন্যায়বিচার বা ইনসাফের জন্যই কিতাব নাযিল হয়েছে। ইনসাফের জন্যই নবী-রাসূল প্রেরিত হয়েছে। আর এই ইনসাফ দ্বারাই আসমান-জমিন টিকে আছে।"২৯৫
পবিত্র কুরআন আমাদেরকেও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সর্বদা ন্যায়ের উপর থাকতে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আদেশ দিয়েছে। যদিও তা আমাদের কাছে অপছন্দ লাগে বা আমাদের বিরুদ্ধে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- "হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান করো, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনের যদি ক্ষতিও হয় তবুও।"২৯৬
তিনি আরও বলেন- "হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে অবিচল থাকো। কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণেও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করবে না। সুবিচার করো, এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবগত।"২৩৭
আল্লামা ইবনে কাসীর রহঃ বলেন- "কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যাতে করে তোমাদেরকে তাদের সাথে ন্যায়বিচার করা থেকে বিরত না রাখে। বরং প্রত্যেকের সাথেই তোমরা ন্যায়বিচার করো, চাই সে বন্ধু হোক বা শত্রু।"২৩৮
সুতরাং ইসলামে ন্যায়বিচারের বেলায় কারও প্রতি ভালোবাসা এবং শত্রুতার কোনো প্রভাব নেই। জাত-বংশের কোনো পার্থক্য নেই। অর্থ-বিত্তেরও কোনো দখল নেই। পার্থক্য করা হয় না কোনো মুসলিম-অমুসলিমদের মাঝেও। বরং রাষ্ট্রে বসবাসকারী মুসলমান-অমুসলমান সবাই ন্যায়বিচার ভোগ করার পূর্ণ অধিকার রাখে। চাই তাদের মধ্যে শত্রুতা থাক অথবা ভালোবাসা।
ইসলামে ন্যায়বিচারের অবস্থানঃ এক মাখযুমী মহিলার ক্ষেত্রে হযরত উসামা ইবনে যায়েদের সুপারিশের ঘটনা দ্বারাই ইসলামে ন্যায়বিচারের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়। হযরত উসামা বিন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বনী মাখযুম গোত্রের এক মহিলার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। যাতে চুরির অপরাধে তার হাত না কাটা হয়। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রচণ্ড রাগাম্বিত হয়ে গেলেন। এরপর ইসলামের নীতি-আদর্শ, ন্যায়বিচার এবং সমাজের ধনী-গরীব বিচারের কাঠগড়ায় সবাই সমান- এসব বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিলেন। ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বললেন- "হে লোকসকল! নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণ ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে, তাদের মধ্যে যখন কোনো সম্ভ্রান্ত লোক চুরি করতো, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিতো। আর যদি কোনো দুর্বল লোক চুরি করতো, তবে তারা তার উপর শাস্তি প্রয়োগ করতো। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতেমাও চুরি করতো, তবুও আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।"২৪০
হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে খায়বারের বিজয় দান করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারবাসীদেরকে আপন অবস্থায় সেখানেই থাকতে দিলেন। এবং খায়বারের সমস্ত ফসল খায়বারবাসী ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাঝে অর্ধেক অর্ধেক করে ভাগ করে নিলেন। পরে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রওয়াহাকে খায়বারে পাঠালেন অনুমান করে অর্ধেক ফসল নিয়ে আসতে। তিনি এসে ইহুদীদেরকে বললেন- "হে ইহুদীর দল! আমি মনে করি তোমরা হলে সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রাণী। তোমরা আল্লাহর নবীদেরকে হত্যা করেছো। আর আল্লাহকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছো। তোমাদের প্রতি এই ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও আমি তোমাদের উপর জুলুম করবো না। আমার ধারণা অনুযায়ী খায়বারে বিশ হাজার ওয়াসা খেজুর আছে। এখন তোমরা যদি চাও তাহলে তোমাদের জন্যও একটা অংশ রেখে দেবো। আর যদি না চাও, তাহলে সম্পূর্ণটাই আমি নিয়ে নেবো। ইহুদীরা বললো- এভাবেই তো আসমান এবং জমিনে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা আমাদের অংশ গ্রহণ করবো।"২৪২
উক্ত হাদীসে এটা স্পষ্ট যে, ইহুদীদের প্রতি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রওয়াহার প্রচণ্ড ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রতি জুলুম করেননি। বরং স্পষ্ট ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, তিনি তাদের প্রতি কোনো জুলুম করবেন না। আর দুই ভাগের মধ্য থেকে তারা যে ভাগ চাবে, সেটাই তাদেরকে দিয়ে দিবেন।
ইসলামে ন্যায়বিচারের রহস্যঃ ইসলামে ন্যায়বিচারের রহস্য হলো- ইনসাফ বা ন্যায়বিচার, এই জমিনে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি দাদিপাল্লা। এ দ্বারা মেপে মেপে দুনিয়ার অধিকার আদায় করা হবে। জালেম এবং মাজলুমের মাঝে ন্যায়বিচার করা হবে এবং এর মাধ্যমে হকদারকে সহজভাবে সঠিক জায়গা থেকে তার হক আদায় করে দেওয়া হবে। ন্যায়বিচার হলো ইসলাম ধর্মের এমন একটি হুকুম, যা সমাজের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ। সুতরাং সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের ন্যায়বিচার এবং এর মাধ্যমে শান্তি লাভের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। ইসলাম যেহেতু দয়া-মায়া এবং সহানুভূতি দেখিয়েছে মুসলিম-অমুসলিম, ধনী-গরীব সকল মানুষের সাথেই ন্যায়বিচারের আদেশ দিয়েছে, সুতরাং এক্ষেত্রে ভালোবাসার কোনো দখল চলবে না, শত্রুতাও কোনো প্রভাব ফেলবে না।
আল্লাহ তাআলা সবার আগে নিজের সাথে ন্যায়বিচারের আদেশ দিয়েছেন। তিনি মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তারা নিজের হক, তার রবের হক এবং অন্যদের হকের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করে। হযরত আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন তার স্ত্রীর প্রতি খেয়াল না রেখে সারাদিন রোজা আর সারারাত নামাজ পড়ে স্ত্রীর হক খর্ব করতে লাগলেন, তখন হযরত সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেছিলেন- "তোমার উপর তোমার রবের কিছু হক আছে। তোমার নিজের কিছু হক আছে এবং তোমার পরিবারেরও কিছু হক আছে। প্রত্যেককে প্রত্যেকের হক আদায় করো।"২৪৩
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান ফারসীর এ কথাকে সমর্থন করেছিলেন। ইসলাম কথা বলার ক্ষেত্রে ইনসাফ করার আদেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- "তোমরা যখন কথা বলো, তখন ইনসাফ করো। যদিও তারা তোমাদের নিকটাত্মীয় হয়।"২৪৪
ইসলাম বিচারের ক্ষেত্রে ইনসাফের আদেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে। আর যখন মানুষের মধ্যে ফায়সালা করবে, তখন ইনসাফের সাথে ফায়সালা করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কতইনা সুন্দর উপদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।"২৪৫
পরস্পরের মাঝে মীমাংসা করার ক্ষেত্রেও ইসলাম ইনসাফের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- "আর যদি মুমিনদের দু'দল বিবাদে লিপ্ত হয়, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর বাড়াবাড়ি করে, তাহলে যে দলটি বাড়াবাড়ি করবে তার বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করো। যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। তারপর যদি দলটি ফিরে আসে, তাহলে তাদের মধ্যে ইনসাফের সাথে মীমাংসা করো এবং ন্যায়বিচার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।"২৪৬
ইসলামে জুলুম-অত্যাচার হারামঃ ইসলাম ন্যায়বিচারের প্রতি যতটা আদেশ দিয়েছে এবং এর প্রতি উৎসাহ দিয়েছে, তারচেয়ে অনেক কঠিনভাবে জুলুমকে নিষেধ করেছে এবং চরমভাবে ইসলামে জুলুম বিরোধিতা করেছে। চাই জুলুম মানুষের সাথে হোক বা অন্যের সাথে। বিশেষত শক্তিশালীরা জুলুম করে থাকে দুর্বলদের উপর। ধনীরা জুলুম করে গরীবদের উপর। শাসকরা জুলুম করে জনগণের উপর। সবার সাথে সব ধরণের জুলুমই হারাম করে দিয়েছে ইসলাম। যে যত দুর্বল, তার সাথে জুলুম করলে গুনাহও তত প্রবল।২৪৭
হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা বলেন- "হে আমার বান্দারা! আমি আমার উপর জুলুমকে হারাম করেছি। আর তোমাদের মাঝেও জুলুমকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছি। সুতরাং তোমরা একে অপরের সাথে জুলুম করো না।"২৪৮
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুআয রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলতেন- "মাজলুমের বদদোয়াকে ভয় করো। কেননা, এর মাঝে এবং আল্লাহ তাআলার মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।"২৪৯
তিনি আরও বলেন- "তিন ব্যক্তির দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। ১. রোজাদারের দুআ, যখন সে ইফতার করে। ২. ন্যায়বিচারক শাসকের দুআ। ৩. মাজলুমের বদদোয়া। আল্লাহ তাআলা এগুলোকে মেঘের উপর উঠিয়ে নেন এবং আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেন। আর আল্লাহ তাআলা বলেন- আমার ইজ্জতের কসম! আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করবো, যদিও তা কিছুটা বিলম্বে হয়।"২৫০
এই হলো ইনসাফ এবং ন্যায়বিচারের সংক্ষিপ্ত আলোচনা। ইসলামী সমাজে যা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসা দাদিপাল্লা।
টিকাঃ
২৯৪. সূরা হাদীদ, আয়াত নং-২৫
২৯৫. মাআ'রিফুল কুরআনুল মুসলিমিন: ২৯০
২৯৬. সূরা নিসা, আয়াত নং-১৩৫
২৩৭. সুরা মাইদাহ, আয়াত নং-৮
২৩৮. আল্লামা ইবনে কাসীর রহঃ। তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাবগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- তাফসীরে ইবনে কাসীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ইত্যাদি।
২৪০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৩৪৮৬ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬৮৮
২৪২. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ২৮৮৮৬ সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৬৩০৬
২৪৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১৯০২ জামে তিরমিযী, হাদীস নং-২৮১৩
২৪৪. সুরা আনআম, আয়াত নং-১৫২
২৪৫. সুরা নিসা, আয়াত নং-৫৮
২৪৬. সুরা হুজুরাত, আয়াত নং-৯
২৪৭. মুহাম্মাদ মুস্তফা জামীল জুনাইদিয়: ১০৫
২৪৮. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২২৪৮৬ আবুআউ ইমান, হাদীস নং-৭০০৮
২৪৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৪০০০
২৫০. জামে তিরমিযী, হাদীস নং- ৩৫৯৮ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৮০৩০