📄 ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও কর্তব্য
ভূমিকা: একেকটি মুসলিম পরিবার হলো মুসলিম সমাজের একেকটি ইটের মত। বরং তা সমাজের দুর্গ বা কেন্দ্র। এবং শান্তি ও নিরাপত্তার মূলকেন্দ্র। ইসলাম পরিবার রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পরিবারের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-নীতিও দিয়েছে। যেখানে প্রত্যেকের অধিকার এবং কর্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, স্ত্রীর ভরণ-পোষণ, মীমাংসা, সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষা, পিতা-মাতা অধিকার ইত্যাদি সবই বলে দেয়া হয়েছে ইসলামী আইনে। অনুরূপভাবে পরস্পরে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা-ভক্তি, স্নেহ-মমতা কেমন হওয়া উচিৎ তাও বলা হয়েছে।
কেননা, একটি পরিবার যখন শক্তিশালী হয় এবং এর প্রত্যেকটি সদস্য সঠিক পথে চলে, তখন একটি সমাজ শক্তিশালী হয় এবং তা সঠিক পথে চলতে থাকে। আর এভাবে প্রত্যেক সদস্যের মাঝে উন্নত মানবতা আর সামাজিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই ইসলাম আদর্শ ও উন্নত সমাজ গঠনে সক্ষম হয়, যার কোনো তুলনা হয় না। আর সমাজ মুক্তি পায় চারিত্রিক অধঃপতন এবং পরিবার ধ্বংসের অন্তত পরিণতি থেকে।
ইসলামী সভ্যতায় পরিবারের ভিত্তি: ইসলামী সভ্যতায় একটি পরিবার গঠন হয় দু’টি মৌলিক স্তম্ভের উপর- পুরুষ এবং মহিলা। অর্থাৎ স্বামী এবং স্ত্রী। এদের মাধ্যমে একটি পরিবার গঠন হয়, মানবসন্তান জন্ম হয় এবং মানবজনমের ধারাবাহিকতাও চালু থাকে। এখান থেকেই একসময় একটি জাতি ও সমাজ তৈরি হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন- “হে মানব সকল! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফস থেকে। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী।” তিনি আরও বলেন- “আল্লাহ তাআলা তোমাদের থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, আর তোমাদের জোড়া থেকে তোমাদের পুত্র ও নাতী সৃষ্টি করেছেন। আর তোমাদেরকে দিয়েছেন পবিত্র রিযিক।”
এই দু’টি ভিত্তি মজবুত করার জন্য ইসলামও অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে স্বামী-স্ত্রী সংক্রান্ত বহু আইন-কানুন দিয়েছে ইসলাম। নির্দিষ্ট করে দিয়েছে তাদের পরস্পরের সীমারেখা। নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রত্যেকের দায়িত্ব-কর্তব্য। যাতে সুন্দর পরিবার গঠনে প্রত্যেকে আপন আপন কর্তব্য পরিপূর্ণভাবে পালন করতে পারে। আর আদর্শ একটি মানব সমাজ গঠনে প্রত্যেকেই যথেষ্ট অবদান রাখতে পারে।
ইসলামের নিয়ম হলো- আগে আগে বিবাহ করা। যাতে মানব সম্প্রদায় টিকে থাকে। সব লোক দ্বারা সমাজ গঠন সহজ হয়। প্রতিটি ব্যক্তি এবং সমাজ থেকে দুশ্চরিত্র ও অনৈতিকতা দূর হয়ে যায়। আর তারা যাতে খলিফার চাহিদা পূরণ করে ইসলামী খেলাফতকে মজবুত ও শক্তিশালী করতে পারে। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবকদেরকে লক্ষ্য করে বলেন- “হে যুব সমাজ! তোমাদের মধ্যে যে দাম্পত্য জীবন গড়তে সক্ষম, সে যেনো বিবাহ করে। কারণ তা (বিবাহ) দৃষ্টিকে নিচু করে এবং লজ্জাস্থানকে সুরক্ষিত করে। আর যে সক্ষম নয়, সে যেনো রোজা রাখে। কেননা, এটা তার জন্য যৌনকামনা দমনকারী।”
এরপর কিছু যুবক যখন চিন্তা করলো, তারা বিবাহ করবে না; বরং পুরোটা জীবন আল্লাহ তাআলার ইবাদাতে কাটাবে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে কঠিনভাবে এটা করতে নিষেধ করে দিলেন। এ সম্পর্কে হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি ঘটনা বর্ণনা করেন- “একবার তিনজন ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীদের নিকট এসে তাঁর ইবাদাত সম্পর্কে জানতে চাইলো। যখন তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইবাদাত সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা এটাকে কম মনে করলো। আর বললো- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে আমাদের তুলনা চলবে না। কেননা, তাঁর পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্যে একজন বললো- আমি সারা জীবন রাতভর নামাজ পড়তে থাকবো। আরেকজন বললো- আমি সবসময় রোজা রাখবো কখনো ছাড়বো না। আরেকজন বললো- আমি নারীসঙ্গ ত্যাগ করবো, কখনোও বিবাহ করবো না। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে এসে বললেন- তোমরাই কি ঐসব লোক, যারা এমন এমন কথা বলেছো? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং আমি তোমাদের চেয়ে বেশি তাঁর প্রতি অনুগতও। অথচ আমি রোজা রাখি, আবার কখনোও রাখি না। নফল নামাজ কখনওও পড়ি, কখনও ঘুমাই। আবার আমি মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং বিবাহ করা আমার সুন্নাত। যারা আমার সুন্নাতের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে, তারা আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
আধুনিক যুগে বৈরাগ্যবাদঃ যারা বিবাহকে ভয় পেত এবং মানুষকে বিবাহ করতে নিষেধ করতো, কিছুটা চিন্তা-ফারত করার পর এখন তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে। এমনকি আধুনিক ইউরোপিয়ান বুদ্ধিজীবীরা যখন দেখতে পেলো- বৈরাগ্যবাদের মাধ্যমে সমাজে শুধু অনৈতিকতা আর অনিষ্ঠতাই ছড়িয়েছে। ভালো কিছু হচ্ছে না। তখন ১৮ শতাব্দীর অভিজ্ঞতার পর এসে অশান্তি আর অনৈতিকতা থেকে মুক্তির জন্য এখন বৈরাগ্যবাদকে তারাও নিষেধ করছে। কেননা, বৈরাগী পুরোহিত ও পাদ্রীদের দ্বারা খারাপ প্রভাব পরিশেষে ধর্মিত হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকাতেও বিষয়টা ব্যাপকাকার ধারণ করেছে। এমনকি এই প্রভাবে শত শত পুরোহিত ও পাদ্রী পদত্যাগ পর্যন্ত করেছে। এই যৌনবিষয়টি এবং নৈতিক পদস্খলনের ভয়াবহতা গির্জাগুলোকে বিচলিত ও আতঙ্কিত করে তুলেছে। পক্ষান্তরে আমাদের পবিত্র ধর্ম আমাদেরকে এসব থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি দিয়েছে। আমাদেরকে দুঃখজনক অভিজ্ঞতা আর তিক্ত ব্যথা থেকে মুক্তি দিয়েছে।
বিবাহের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যঃ ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য হলো, নিজের ভেতরে থাকা সুপ্ত আবেগ-অনুভূতিকে যথাযথ স্থানে কাজে লাগানোর মাধ্যমে আন্তরিক প্রশান্তি লাভ করা। বিবাহ হলো, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। যেখানে একজন অপরজনের কাছে সুখ পায়। একাধিক মূহুর্তে হয় একে অপরের একদম ঘনিষ্ঠ-অন্তরঙ্গ। আর দূর থেকে হয় একে অপরের কল্যাণকামী বন্ধু। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তার অন্যতম একটি নিদর্শন হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্যে হইতেই স্ত্রী-এর সৃষ্টি করেছেন। যাতে তোমরা তাদের কাছে গিয়ে প্রশান্তি লাভ করতে পারো। আর তিনি তোমাদের মাঝে দিয়েছেন ভালোবাসা ও দয়া।” উক্ত আয়াতে বর্ণিত এই তিনটি বিষয় তথা- প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার মাধ্যমেই বৈবাহিক সুখ-শান্তি অর্জিত হয়, যা ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য।
ইসলামে দম্পত্তি নির্বাচনের মানদণ্ডঃ ইসলাম ছেলেমেয়ে উভয়কে এই এখতিয়ার দিয়েছে যে, তারা উভয়ে উভয়ের জন্য নিজেদের পছন্দমত সঙ্গী বেছে নেবে। আল্লাহু তাআলা বলেন- “আর তোমরা তোমাদের অবিবাহিত নারী-পুরুষ এবং সৎকর্মশীল দাস-দাসীদের বিবাহ দাও।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেলেদেরকে পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ৪টি জিনিসকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন- “বিবাহের ক্ষেত্রে সাধারণত মেয়ের চারটি জিনিস লক্ষ্য করা হয়। যেমন-সম্পদ, বংশীয় আভিজাত্য, রূপ-গুন ও দ্বীনদারী। যদি তুমি দ্বীনদার মেয়ে পেয়ে যাও, তাহলে তাকেই প্রাধান্য দাও। যদি তা না করো, তাহলে তুমি হতভাগা।” অনুরূপভাবে তিনি মেয়েদেরকে পাত্র নির্বাচন করার ক্ষেত্রে দ্বীনদারী এবং আখলাকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন- “তোমরা যে ব্যক্তির দ্বীনদারী এবং নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছো, সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তার কাছে বিয়ে দিয়ে দাও। যদি এমন না করো, তাহলে পৃথিবীতে ফেতনা-ফাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।”
নিঃসন্দেহে ছেলেমেয়ের এই অধিকারটা সমাজে অনেক কল্যাণ বয়ে আনে। কেননা, এই নেককার স্বামী-স্ত্রী থেকেই তো নেককার ছেলেমেয়েদের বংশ বিস্তার হবে। যারা পারিবারিকভাবে পরস্পরকে ভালোবাসা ও মুহাব্বতের সাথে থাকবে। আর সমাজে ইসলামী নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ঠিক রেখে চলবে।
ইসলামী পরিমণ্ডলে বৈবাহিক সম্পর্কঃ ইসলামে বৈবাহিক সম্পর্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্ক। এই সম্পর্কের আগে কিছু ভূমিকা পালন করতে হয়। যা এই সম্পর্কের পথকে সুগম করে এবং সম্পর্ককে স্থায়ী ও চিরস্থায়ী করে। ইসলাম এই সম্পর্কের ভূমিকাকেই যে গুরুত্ব দিয়েছে, অন্যকোনো সম্পর্ককেও এতোটা গুরুত্ব দেয়নি। এমনকি এর জন্য বিশেষ কিছু বিধানও দিয়েছে ইসলাম। বৈবাহিক সম্পর্কের ভূমিকা হলো- বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া। এটা একে অপরকে চেনা এবং জানার প্রাথমিক পর্যায়। এ পর্যায়ে ছেলেমেয়ে উভয় পক্ষই একে অপরকে ভালোভাবে বুঝার অনুমতি দিয়ে থাকে। আর এই চেনা-জানার ভিত্তিতেই দুই পক্ষ এই বৈবাহিক সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া বা এখান থেকে সরে আসার ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
অনুরূপভাবে বৈবাহিক সম্পর্ক গ্রহণীয় হওয়ার জন্য একটি শর্ত হলো- অবশ্যই তা প্রচার করা। এর রহস্য হলো- ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এর মাধ্যমে দ্বীনি ও দুনিয়াবি অনেক কল্যাণ লাভ হয়। সুতরাং এটা প্রকাশ্যে এবং সবাইকে জানিয়ে করাই উচিত। যাতে কারও মনে কোনো খারাপ ধারণা এবং সন্দেহ না থাকে।
ইসলাম বৈবাহিক সম্পর্ককে একটি মজবুত রশি দিয়ে বেঁধেছে। যাতে স্বামী-স্ত্রী দু’জনই সুখে থাকে। আর দুই পরিবারের মাঝে শান্তি বজায় থাকে। এজন্য ইসলাম সর্বক্ষেত্রে স্বামীদের স্ত্রীদের অভিভাবক বানিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- “পুরুষরা নারীদের অভিভাবক। কেননা, আল্লাহ তাআলা তাদের এক রূপের ওপর অপরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। আর তারা নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে।"
এই অভিভাবকত্বের কারণেই ইসলাম স্বামীর ওপর মহর ওয়াজিব করেছে। আর এটাকে বানিয়েছে স্ত্রীর অধিকার। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মহর দিয়ে দাও। স্ত্রীদের আরেকটি অধিকার হলো- তাদের ভরণপোষণ অর্থাৎ প্রয়োজনীয় খাবার, কাপড়, বাসস্থান ও চিকিৎসা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। সাথে সাথে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তোমরা তাদের সাথে সৎ ভাবে বসবাস করো। যদি তোমরা তাদের অপছন্দ করো, তাহলে হয়তো তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছো, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন। "
পক্ষান্তরে ইসলাম স্বামীদেরকেও কিছু অধিকার দিয়েছে স্ত্রীদের উপর। তা হলো- স্বামীর আনুগত্য করা। বৈবাহিক জীবনে এটা হলো স্বামীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। ইসলাম স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই কিছু অধিকার এবং দায়িত্ব দিয়েছে। যার যার দায়িত্ব সে সে পালন করবে। ইসলাম তাদের থেকে এটাই কামনা করে যে- তারা পরস্পরে ভদ্র ও সংহত আচরণ করবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একে অপরের সহায়তা করবে। যদি কখনও তাদের মাঝে মতবিরোধ, ঝগড়া বা কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে সেক্ষেত্রে ইসলাম তা নিরসনের বিভিন্ন পথ ও পন্থা বলে দিয়েছে। যদি তাদের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তারা আর কিছুতেই আল্লাহ প্রদত্ত সীমারেখা রক্ষা করতে পারছে না; আর স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তাদের একত্রে থাকা সম্ভব হচ্ছে না, তখন ইসলাম তাদেরকে সর্বশেষ চিকিৎসা হিসেবে তালাক বা বিচ্ছেদের ব্যবস্থা দিয়েছে। যাতে তারা একে অপর থেকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা হয়ে যেতে পারে।
টিকাঃ
১৪৭. সূরা নিসা, আয়াত নং-১
১৪৮. সূরা নাহল, আয়াত নং-৭২
১৪৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৬৬৯ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪০০
১৫০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৬৭৭ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪০১
১৫১. রূহুল ইনসান ফীল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ: ২৩৪
১৫২. সূরা রূম, আয়াত নং-২১
১৫৩. সূরা নূর, আয়াত নং-৩২
১৫৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৮০২ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৬৬
১২৫৩. জামে তিরমিযী, হাদীস নং- ১০০১ সুনানু ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৮৬৯
১২৫৪. সুরা নিসা, আয়াত নং-৩৪
১২৫৫. সুরা নিসা, আয়াত নং-৪
১২৫৬. সুরা নিসা, আয়াত নং-১৯
ভূমিকা: একেকটি মুসলিম পরিবার হলো মুসলিম সমাজের একেকটি ইটের মত। বরং তা সমাজের দুর্গ বা কেন্দ্র এবং শান্তি ও নিরাপত্তার মূলকেন্দ্র। ইসলাম পরিবার রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পরিবারের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-নীতিও দিয়েছে। যেখানে প্রত্যেকের অধিকার এবং কর্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, স্ত্রীর ভরণ-পোষণ, মীমাংসা, সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষা, পিতা-মাতা অধিকার ইত্যাদি সবই বলে দেয়া হয়েছে ইসলামী আইনে। অনুরূপভাবে পরস্পরে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা-ভক্তি, স্নেহ-মমতা কেমন হওয়া উচিৎ তাও বলা হয়েছে।
কেননা, একটি পরিবার যখন শক্তিশালী হয় এবং এর প্রত্যেকটি সদস্য সঠিক পথে চলে, তখন একটি সমাজ শক্তিশালী হয় এবং তা সঠিক পথে চলতে থাকে। আর এভাবে প্রত্যেক সদস্যের মাঝে উন্নত মানবতা আর সামাজিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই ইসলাম আদর্শ ও উন্নত সমাজ গঠনে সক্ষম হয়, যার কোনো তুলনা হয় না। আর সমাজ মুক্তি পায় চারিত্রিক অধঃপতন এবং পরিবার ধ্বংসের অন্তত পরিণতি থেকে।
ইসলামী সভ্যতায় পরিবারের ভিত্তি: ইসলামী সভ্যতায় একটি পরিবার গঠন হয় দু’টি মৌলিক স্তম্ভের উপর- পুরুষ এবং মহিলা। অর্থাৎ স্বামী এবং স্ত্রী। এদের মাধ্যমে একটি পরিবার গঠন হয়, মানবসন্তান জন্ম হয় এবং মানবজনমের ধারাবাহিকতাও চালু থাকে। এখান থেকেই একসময় একটি জাতি ও সমাজ তৈরি হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন- “হে মানব সকল! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফস থেকে। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী।”১৪৭
তিনি আরও বলেন- “আল্লাহ তাআলা তোমাদের থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, আর তোমাদের জোড়া থেকে তোমাদের পুত্র ও নাতী সৃষ্টি করেছেন। আর তোমাদেরকে দিয়েছেন পবিত্র রিযিক।”১৪৮
এই দু’টি ভিত্তি মজবুত করার জন্য ইসলামও অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে স্বামী-স্ত্রী সংক্রান্ত বহু আইন-কানুন দিয়েছে ইসলাম। নির্দিষ্ট করে দিয়েছে তাদের পরস্পরের সীমারেখা। নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রত্যেকের দায়িত্ব-কর্তব্য। যাতে সুন্দর পরিবার গঠনে প্রত্যেকে আপন আপন কর্তব্য পরিপূর্ণভাবে পালন করতে পারে। আর আদর্শ একটি মানব সমাজ গঠনে প্রত্যেকেই যথেষ্ট অবদান রাখতে পারে।
ইসলামের নিয়ম হলো- আগে আগে বিবাহ করা। যাতে মানব সম্প্রদায় টিকে থাকে। সব লোক দ্বারা সমাজ গঠন সহজ হয়। প্রতিটি ব্যক্তি এবং সমাজ থেকে দুশ্চরিত্র ও অনৈতিকতা দূর হয়ে যায়। আর তারা যাতে খলিফার চাহিদা পূরণ করে ইসলামী খেলাফতকে মজবুত ও শক্তিশালী করতে পারে। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবকদেরকে লক্ষ্য করে বলেন- “হে যুব সমাজ! তোমাদের মধ্যে যে দাম্পত্য জীবন গড়তে সক্ষম, সে যেনো বিবাহ করে। কারণ তা (বিবাহ) দৃষ্টিকে নিচু করে এবং লজ্জাস্থানকে সুরক্ষিত করে। আর যে সক্ষম নয়, সে যেনো রোজা রাখে। কেননা, এটা তার জন্য যৌনকামনা দমনকারী।”১৪৯
এরপর কিছু যুবক যখন চিন্তা করলো, তারা বিবাহ করবে না; বরং পুরোটা জীবন আল্লাহ তাআলার ইবাদাতে কাটাবে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে কঠিনভাবে এটা করতে নিষেধ করে দিলেন। এ সম্পর্কে হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি ঘটনা বর্ণনা করেন- “একবার তিনজন ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীদের নিকট এসে তাঁর ইবাদাত সম্পর্কে জানতে চাইলো। যখন তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইবাদাত সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা এটাকে কম মনে করলো। আর বললো- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে আমাদের তুলনা চলবে না। কেননা, তাঁর পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্যে একজন বললো- আমি সারা জীবন রাতভর নামাজ পড়তে থাকবো। আরেকজন বললো- আমি সবসময় রোজা রাখবো কখনো ছাড়বো না। আরেকজন বললো- আমি নারীসঙ্গ ত্যাগ করবো, কখনোও বিবাহ করবো না। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে এসে বললেন- তোমরাই কি ঐসব লোক, যারা এমন এমন কথা বলেছো? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং আমি তোমাদের চেয়ে বেশি তাঁর প্রতি অনুগতও। অথচ আমি রোজা রাখি, আবার কখনোও রাখি না। নফল নামাজ কখনওও পড়ি, কখনও ঘুমাই। আবার আমি মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং বিবাহ করা আমার সুন্নাত। যারা আমার সুন্নাতের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে, তারা আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।”১৫০
আধুনিক যুগে বৈরাগ্যবাদঃ যারা বিবাহকে ভয় পেত এবং মানুষকে বিবাহ করতে নিষেধ করতো, কিছুটা চিন্তা-ভাবনা করার পর এখন তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে। এমনকি আধুনিক ইউরোপিয়ান বুদ্ধিজীবীরা যখন দেখতে পেলো- বৈরাগ্যবাদের মাধ্যমে সমাজে শুধু অনৈতিকতা আর অনিষ্ঠতাই ছড়িয়েছে। ভালো কিছু হচ্ছে না। তখন ১৮ শতাব্দীর অভিজ্ঞতার পর এসে অশান্তি আর অনৈতিকতা থেকে মুক্তির জন্য এখন বৈরাগ্যবাদকে তারাও নিষেধ করছে। কেননা, বৈরাগী পুরোহিত ও পাদ্রীদের দ্বারা খারাপ প্রভাব পরিশেষে ধর্মিত হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকাতেও বিষয়টা ব্যাপকাকার ধারণ করেছে। এমনকি এই প্রভাবে শত শত পুরোহিত ও পাদ্রী পদত্যাগ পর্যন্ত করেছে। এই যৌনবিষয়টি এবং নৈতিক পদস্খলনের ভয়াবহতা গির্জাগুলোকে বিচলিত ও আতঙ্কিত করে তুলেছে। পক্ষান্তরে আমাদের পবিত্র ধর্ম আমাদেরকে এসব থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি দিয়েছে। আমাদেরকে দুঃখজনক অভিজ্ঞতা আর তিক্ত ব্যথা থেকে মুক্তি দিয়েছে।১৫১
বিবাহের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যঃ ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য হলো, নিজের ভেতরে থাকা সুপ্ত আবেগ-অনুভূতিকে যথাযথ স্থানে কাজে লাগানোর মাধ্যমে আন্তরিক প্রশান্তি লাভ করা। বিবাহ হলো, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। যেখানে একজন অপরজনের কাছে সুখ পায়। একাধিক মূহুর্তে হয় একে অপরের একদম ঘনিষ্ঠ-অন্তরঙ্গ। আর দূর থেকে হয় একে অপরের কল্যাণকামী বন্ধু। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তার অন্যতম একটি নিদর্শন হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্যে হইতেই স্ত্রী-এর সৃষ্টি করেছেন। যাতে তোমরা তাদের কাছে গিয়ে প্রশান্তি লাভ করতে পারো। আর তিনি তোমাদের মাঝে দিয়েছেন ভালোবাসা ও দয়া।”১৫২
উক্ত আয়াতে বর্ণিত এই তিনটি বিষয় তথা- প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার মাধ্যমেই বৈবাহিক সুখ-শান্তি অর্জিত হয়, যা ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য।
ইসলামে দম্পত্তি নির্বাচনের মানদণ্ডঃ ইসলাম ছেলেমেয়ে উভয়কে এই এখতিয়ার দিয়েছে যে, তারা উভয়ে উভয়ের জন্য নিজেদের পছন্দমত সঙ্গী বেছে নেবে। আল্লাহু তাআলা বলেন- “আর তোমরা তোমাদের অবিবাহিত নারী-পুরুষ এবং সৎকর্মশীল দাস-দাসীদের বিবাহ দাও।”১৫৩
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেলেদেরকে পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ৪টি জিনিসকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন- “বিবাহের ক্ষেত্রে সাধারণত মেয়ের চারটি জিনিস লক্ষ্য করা হয়। যেমন-সম্পদ, বংশীয় আভিজাত্য, রূপ-গুন ও দ্বীনদারী। যদি তুমি দ্বীনদার মেয়ে পেয়ে যাও, তাহলে তাকেই প্রাধান্য দাও। যদি তা না করো, তাহলে তুমি হতভাগা।”১৫৪
অনুরূপভাবে তিনি মেয়েদেরকে পাত্র নির্বাচন করার ক্ষেত্রে দ্বীনদারী এবং আখলাকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন- “তোমরা যে ব্যক্তির দ্বীনদারী এবং নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছো, সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তার কাছে বিয়ে দিয়ে দাও। যদি এমন না করো, তাহলে পৃথিবীতে ফেতনা-ফাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।”১২৫৩
নিঃসন্দেহে ছেলেমেয়ের এই অধিকারটা সমাজে অনেক কল্যাণ বয়ে আনে। কেননা, এই নেককার স্বামী-স্ত্রী থেকেই তো নেককার ছেলেমেয়েদের বংশ বিস্তার হবে। যারা পারিবারিকভাবে পরস্পরকে ভালোবাসা ও মুহাব্বতের সাথে থাকবে। আর সমাজে ইসলামী নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ঠিক রেখে চলবে।
ইসলামী পরিমণ্ডলে বৈবাহিক সম্পর্কঃ ইসলামে বৈবাহিক সম্পর্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্ক। এই সম্পর্কের আগে কিছু ভূমিকা পালন করতে হয়। যা এই সম্পর্কের পথকে সুগম করে এবং সম্পর্ককে স্থায়ী ও চিরস্থায়ী করে। ইসলাম এই সম্পর্কের ভূমিকাকেই যে গুরুত্ব দিয়েছে, অন্যকোনো সম্পর্ককেও এতোটা গুরুত্ব দেয়নি। এমনকি এর জন্য বিশেষ কিছু বিধানও দিয়েছে ইসলাম। বৈবাহিক সম্পর্কের ভূমিকা হলো- বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া। এটা একে অপরকে চেনা এবং জানার প্রাথমিক পর্যায়। এ পর্যায়ে ছেলেমেয়ে উভয় পক্ষই একে অপরকে ভালোভাবে বুঝার অনুমতি দিয়ে থাকে। আর এই চেনা-জানার ভিত্তিতেই দুই পক্ষ এই বৈবাহিক সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া বা এখান থেকে সরে আসার ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অনুরূপভাবে বৈবাহিক সম্পর্ক গ্রহণীয় হওয়ার জন্য একটি শর্ত হলো- অবশ্যই তা প্রচার করা। এর রহস্য হলো- ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এর মাধ্যমে দ্বীনি ও দুনিয়াবি অনেক কল্যাণ লাভ হয়। সুতরাং এটা প্রকাশ্যে এবং সবাইকে জানিয়ে করাই উচিত। যাতে কারও মনে কোনো খারাপ ধারণা এবং সন্দেহ না থাকে।
ইসলাম বৈবাহিক সম্পর্ককে একটি মজবুত রশি দিয়ে বেঁধেছে। যাতে স্বামী-স্ত্রী দু’জনই সুখে থাকে। আর দুই পরিবারের মাঝে শান্তি বজায় থাকে। এজন্য ইসলাম সর্বক্ষেত্রে স্বামীদের স্ত্রীদের অভিভাবক বানিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- “পুরুষরা নারীদের অভিভাবক। কেননা, আল্লাহ তাআলা তাদের এক রূপের ওপর অপরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। আর তারা নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে।”১২৫৪
এই অভিভাবকত্বের কারণেই ইসলাম স্বামীর ওপর মহর ওয়াজিব করেছে। আর এটাকে বানিয়েছে স্ত্রীর অধিকার। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মহর দিয়ে দাও।”১২৫৫
স্ত্রীদের আরেকটি অধিকার হলো- তাদের ভরণপোষণ অর্থাৎ প্রয়োজনীয় খাবার, কাপড়, বাসস্থান ও চিকিৎসা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। সাথে সাথে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তোমরা তাদের সাথে সৎ ভাবে বসবাস করো। যদি তোমরা তাদের অপছন্দ করো, তাহলে হয়তো তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছো, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন।”১২৫৬
পক্ষান্তরে ইসলাম স্বামীদেরকেও কিছু অধিকার দিয়েছে স্ত্রীদের উপর। তা হলো- স্বামীর আনুগত্য করা। বৈবাহিক জীবনে এটা হলো স্বামীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার।
ইসলাম স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই কিছু অধিকার এবং দায়িত্ব দিয়েছে। যার যার দায়িত্ব সে সে পালন করবে। ইসলাম তাদের থেকে এটাই কামনা করে যে- তারা পরস্পরে ভদ্র ও সংহত আচরণ করবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একে অপরের সহায়তা করবে। যদি কখনও তাদের মাঝে মতবিরোধ, ঝগড়া বা কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে সেক্ষেত্রে ইসলাম তা নিরসনের বিভিন্ন পথ ও পন্থা বলে দিয়েছে। যদি তাদের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তারা আর কিছুতেই আল্লাহ প্রদত্ত সীমারেখা রক্ষা করতে পারছে না; আর স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তাদের একত্রে থাকা সম্ভব হচ্ছে না, তখন ইসলাম তাদেরকে সর্বশেষ চিকিৎসা হিসেবে তালাক বা বিচ্ছেদের ব্যবস্থা দিয়েছে। যাতে তারা একে অপর থেকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা হয়ে যেতে পারে।
টিকাঃ
১৪৭. সূরা নিসা, আয়াত নং-১
১৪৮. সূরা নাহল, আয়াত নং-৭২
১৪৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৬৬৯ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪০০
১৫০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৬৭৭ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪০১
১৫১. রূহুল ইনসান ফীল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ: ২৩৪
১৫২. সূরা রূম, আয়াত নং-২১
১৫৩. সূরা নূর, আয়াত নং-৩২
১৫৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৮০২ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৬৬
১২৫৩. জামে তিরমিযী, হাদীস নং- ১০০১ সুনানু ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৮৬৯
১২৫৪. সুরা নিসা, আয়াত নং-৩৪
১২৫৫. সুরা নিসা, আয়াত নং-৪
১২৫৬. সুরা নিসা, আয়াত নং-১৯
📄 ইসলামে সন্তানের অধিকার ও কর্তব্য
শিশুর জীবনে পরিবেশের প্রভাবঃ ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুরা হলো জীবনের ফল এবং সৌন্দর্য। তারা হৃদয়ের প্রফুল্লতা আর চোখের শীতলতা। এজন্য ইসলাম শিশুদের প্রতি অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলামী শরিয়ত পিতা-মাতার উপর শিশুদের অনেক অধিকার এবং দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে। একজন শিশু সর্বপ্রথম তার পিতা-মাতার পরিবেশ দ্বারা ই প্রভাবিত হয়। যেমনটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “প্রতিটি শিশু স্বভাবজাতভাবে ইসলাম নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। পরে তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী বানায় বা খৃষ্টান বানায় অথবা অগ্নিপূজারী বানায়। ”
একটি শিশুর দ্বীন-ধর্ম এবং চরিত্র গঠনে পিতা-মাতার বিরাট ভূমিকা থাকে। এজন্য যদি পিতা-মাতা সৎ আদর্শবান ও ভালো হয়, তাহলে তার সন্তান- সন্ততি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও ভালো হওয়ার আশা করা যায়। এজন্য জন্মের পূর্বেই সন্তানের কিছু অধিকার আদায় করতে হয়। যা শুধু আদর্শ পিতা- মাতারাই করে থাকেন।
জন্মপূর্ব সন্তানের কিছু অধিকারঃ শয়তান থেকে তাকে রক্ষা করা: স্বামী-স্ত্রী যখন পরস্পর মিলিত হয়, তখন এর সাথে সন্তানেরও একটি অধিকার সম্পৃক্ত হয়ে যায়। তা হলো- বাবার পিঠ থেকে মায়ের রেহেমে যাওয়ার সময় সন্তানকে শয়তানের স্পর্শমুক্ত রাখা। এটা তখনই সম্ভব হবে, যখন পিতা-মাতা উভয়ে সুন্নত তরীকা য় মিলিত হবে আর শয়তান থেকে রক্ষা পাওয়ার ঐ দুআ পড়বে, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তোমাদের মধ্যে যখন কেউ তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়, তখন যদি এই দুআ পড়ে- بِسْمِ اللهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبْ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا (বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশশাইতানা ওয়া জান্নিবিশ শাইতানা মা রযাকতানা) অর্থাৎ, বিসমিল্লাহ, হে আল্লাহ! আমাদেরকে শয়তান থেকে রক্ষা করুন। আর আমাদেরকে আপনি যা দান করবেন, তাকেও শয়তান থেকে দূরে রাখুন। তাহলে এই মিলনে যদি তাদের সন্তান হয়, তো এই সন্তানকে শয়তান কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। ”
শিশুর জীবনের অধিকার:- মাতৃগর্ভে যখন শিশু ভ্রূণ তৈরি হয়, তখনই ইসলাম তাকে জীবনের অধিকার প্রদান করে। এ অবস্থায় ইসলামী শরিয়ত মায়ের জন্য গর্ভপাত নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। কেননা, এটা এমন এক আমানত, যা আল্লাহ তাআলা মায়ের গর্ভে রেখেছেন। আর এ ভ্রূণের জন্য জীবনের অধিকার দিয়েছেন। এজন্য ভ্রূণের কোনো ক্ষতি করা বা নষ্ট করা জায়েয নেই। এরপর যখন এই ভ্রূণটির চার মাস হয়ে যায়, আর তার মধ্যে রুহ চলে আসে, তখন ইসলামী শরিয়ত তাকে একটি জীবন্ত মানুষের মর্যাদা দিয়েছে। এ অবস্থায় তাকে হত্যা করা কিছুতেই জায়েয নয়। যদি কেউ হত্যা করে, তাহলে হত্যাকারীর উপর দিয়ত তথা ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হয়ে যায়। হযরত মুগীরা ইবনে শু'বা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “এক মহিলার দ্বারা সন্তানকে কুঁড়ে ঘরের খুঁটি দ্বারা আঘাত করে ফেলেলো। ঐ মহিলার পেটে বাচ্চা ছিলো, সে বাচ্চাটিও মারা গেলো। পরে নিহত মহিলার পরিবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে এর বিচার চাইলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হত্যাকারী মহিলার ওয়ারিসদেরকে নিহত মহিলার হত্যার দিয়ত (ক্ষতিপূরণ) প্রদানের নির্দেশ দিলেন। আর গর্ভে নিহত সন্তানের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি গোলাম প্রদানের হুকুম দিলেন। হত্যাকারী মহিলার পরিবারের এক ব্যক্তি বললো- আমরা এমন শিশুর ক্ষতিপূরণ দিবো, যে খায়নি, পান করেনি এবং কোনো শব্দও করেনি! সে তো ছিলো আর গেলো শুধু। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- সে যেনো বেদুইনের মত ছন্দযুক্ত বাক্যে কথা বললো! বর্ণনাকারী বলেন- এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হত্যাকারীর ওয়ারিসদের উপর দিয়ত (ক্ষতিপূরণ) আদায়ের নির্দেশ দিলেন। ”
এমনকি ইসলামী শরিয়ত গর্ভবতী মহিলাকে রমজানের রোজা ভাঙ্গারও অনুমতি দিয়েছে- যাতে গর্ভস্থ সন্তানের কোন রকম ক্ষতি না হয়। যদি কোনো গর্ভবতী মহিলা ব্যভিচার করে, তাহলে তার সন্তান জন্মগ্রহণ করে দুধ ছাড়া পর্যন্ত শাস্তি বিলম্ব করারও অনুমতি দিয়েছে ইসলাম- যাতে সন্তানটা বেঁচে যায়।
জন্মের পর সন্তানের কিছু অধিকারঃ সন্তান জন্মগ্রহণ করার পর কী কী করতে হবে, এ বিষয়েও ইসলাম কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। নিম্নে কয়েকটি আলোচনা করা হলো। সন্তান জন্মের সংবাদে খুশি হওয়াঃ- পবিত্র কুরআনে হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালামের ছেলে হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামের জন্মের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন- “সে (হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম) যখন মেহরাবে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলো, তখন ফেরেশতারা তাকে ডেকে বললো- নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আপনাকে ইয়াহইয়া এর (জন্মের) সুসংবাদ দিচ্ছেন। যে হবে আল্লাহর বাণী সত্যয়নকারী, নেতা, নারী সংযমশীল এবং একজন নেককার নবী। ” ছেলেমেয়ে সবার জমানার আনন্দিত হওয়া মুস্তাহাব। দু'জনের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি।
সন্তানের দুই কানে আযান-ইকামত দেওয়াঃ- সন্তান জন্মের পর সাথে সাথে তার ডান কানে আযান আর বাম কানে ইকামত দেওয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান ইবনে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্মের পর তার কানে আযান দিয়েছিলেন। হযরত আবূ রাফে’ রাজিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন- “হযরত ফাতেমা রাজিয়াল্লাহু আনহা যখন হাসান রাজিয়াল্লাহু আনহুকে প্রসব করলেন, তখন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তার কানে নামাযের আযানের মত আযান দিতে দেখেছি।”
খেজুর দ্বারা তাহনীক করা:- সন্তানদের একটি অধিকার হলো- জন্মের পর তাদেরকে খেজুর দ্বারা তাহনীক করা। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহনীক করেছেন। হযরত আবূ মূসা আশআরী রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “আমার একটি ছেলে জন্ম নিলে তাকে নিয়ে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলাম। তিনি আমার ছেলের নাম রাখলেন ইব্রাহীম। এরপর তাকে খেজুর দ্বারা তাহনীক করলেন এবং তার জন্য বরকতের দুআ করলেন। পরে আমার কাছে দিয়ে দিলেন।”
সন্তানের মাথার চুল ফেলে তার ওজন বরাবর সদকা করা:- সন্তানদের আরেকটি অধিকার হলো- তার মাথার চুল ফেলে তার ওজন বরাবর রূপা সদকা করা। এতে সন্তানের শারীরিক উপকার লাভ হয়। সাথে সাথে সমাজেরও হয় কল্যাণ। শারীরিক উপকার হলো- চুলের ছিদ্রগুলো খুলে যায়। ময়লা দূর হয়। দুর্বল চুলগুলো দূর হয়ে যায়; আর তার স্থলে শক্ত চুল গজায়। আর সামাজিক কল্যাণ হলো- তার চুলের ওজন বরাবর যে সদকা করা হয়, তার মাধ্যমে সমাজের অনেক লোকের সহায়তা হয়। গরীবের প্রচুর খুশি হয়। এক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মেয়ে ফাতেমা রাজিয়াল্লাহু আনহা হযরত হাসান ও হুসাইনের চুল ওজন করে তার ওজন বরাবর রূপা সদকা করেছেন।”
সুন্দর নাম রাখা:- সন্তান জন্মের পর তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অধিকার হলো- তার সুন্দর একটি নাম। সুতরাং পিতা-মাতার কর্তব্য হলো, তাদের সন্তানের জন্য এমন একটি সুন্দর নাম রাখা, যে নামে তাকে সবাই চিনবে। আর সে নিজেও উক্ত নামে আনন্দবোধ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুপম নাম পছন্দ করতেন না। হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় নাম হলো- আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান। সবচেয়ে বিস্তৃত নাম হলো- হারিস ও হাম্মাম। আর সবচেয়ে অপছন্দনীয় নাম হলো- হারব ও মুররাহ।
হযরত আলী রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “আমার ছেলে হাসান জন্মগ্রহণ করার পর আমি তার নাম রাখলাম- হারব। এরপর তাকে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বললেন- আমার সন্তানকে দেখাও; আর তার নাম কী রেখেছো? আমি বললাম- হারব। তিনি বললেন- না, তার নাম হুসাইন। এরপর যখন আমার দ্বিতীয় ছেলে জন্মগ্রহণ করলো, আমি তার নাম রাখলাম- হারব। পরে তাকে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বললেন- আমার সন্তানকে দেখাও; আর তার নাম কী রেখেছো? আমি বললাম- হারব। তিনি বললেন- না, তার নাম হুসাইন। এরপর যখন আমার তৃতীয় ছেলে জন্মগ্রহণ করলো, আমি তার নাম রাখলাম- হারব। পরে তাকে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বললেন- আমার সন্তানকে দেখাও; আর তার নাম কী রেখেছো? আমি বললাম- হারব। তিনি বললেন- না, তার নাম মুহাসিন। এরপর তিনি বললেন- আমি হযরত হারুন আলাইহিস সালামের ছেলেদের নামের মত তাদের নাম রাখলাম। হযরত হারুন আলাইহিস সালামের ছেলেদের নাম ছিলো- শাকির, শারিব ও মুবাশির।”
সন্তানের পক্ষ থেকে আকীকা করা:- সন্তান জন্মের পর তার আরেকটি অধিকার হলো- তার পক্ষ থেকে আকীকা করা। অর্থাৎ সন্তান জন্মের সাতদিন পর তার পক্ষ থেকে বকরি জবাই করা। এটা মূলত একদিকে সুন্নাতে মুআক্কাদা অপরদিকে সন্তান জন্মের উপর খুশি ও আনন্দ প্রকাশ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আকীকা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন- “আল্লাহ তাআলা কত বড় অনুগ্রহ ও দয়া করেছেন। যে ব্যক্তির ছেলে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, সে যেনো তার ছেলের পক্ষ থেকে দু’টি বকরি জবাই করে। আর যে ব্যক্তির মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, সে যেনো তার মেয়ের পক্ষ থেকে একটি বকরি জবাই করে দেয়।”
সন্তানকে দুধ পান করানো:- সন্তান জন্মের পর তার আরেকটি অধিকার হলো- দুধ পান করানো। বুকের দুধ একটি শিশুর শারীরিক প্রবৃদ্ধি, মেধাবিকাশ, সহজ আবেগ- অনুভূতি আর উন্নত সমাজ গঠনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। এজন্য ইসলামী শরীয়তের নিয়ম হলো- একজন মা পূর্ণ দুই বছর তার সন্তানকে দুধ পান করাবে। এটা একটি সন্তানের অধিকার। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে, যে তার সন্তানকে দুধ পান করানোর সময় পূর্ণ করতে চায়। আর পিতার উপর কর্তব্য হলো- প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মা’দেরকে খাবার ও পোষাক প্রদান করা।”
আধুনিক স্বাস্থ্য ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা এ কথা প্রমাণ করেছে যে- একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য দুধ বছর সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইদানিং আধুনিক বিজ্ঞানী ও গবেষকদের গবেষণা ও অভিজ্ঞতায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, মুসলিম জাতির উপর আল্লাহ তাআলা কত বড় অনুগ্রহ ও দয়া করেছেন। অথচ এই দুধ ও অনুগ্রহ তো চলে আসছে সেই অনেক আগে থেকেই। ইসলামী শরীয়ত সন্তানের দুধ পান করানোর সময়কালকে অনেক গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছে। আর দুধ পান করাকে সন্তানের অধিকার সাব্যস্ত করেছে। সন্তানের এই অধিকারটা শুধু তার মায়ের উপরই চাপিয়ে দেয়নি; বরং একটা দায়িত্ব তার বাবার কাছেও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা হলো- মা’র খাবার এবং পোষাকের ব্যবস্থা করা। যাতে তার সন্তানের ভালোভাবে যত্ন নিতে পারে এবং দুধ পান করাতে পারে।
এভাবে ইসলামী শরীয়ত পিতা-মাতা উভয়কেই ভারসাম্যপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করে। যাতে শিশুটির সার্বিক যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে তার কল্যাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়। আর তারা উভয়েই যাতে যার যার সাধ্যমত চেষ্টা ও মেহনত দ্বারা এ দায়িত্বটি পালন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন- “কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেয়া হয় না।”
সন্তানের লালন-পালন ও ভরণপোষণ:- পিতা-মাতার উপর সন্তানের আরেকটি অধিকার হলো- সন্তানকে ভালোভাবে লালন-পালন করা এবং তাদের উত্তম খাবার ব্যবস্থা করা। ইসলামী শরীয়ত পিতা-মাতার উপর এটা ওয়াজিব করে দিয়েছে যে, তারা সন্তানের সুন্দর জীবন, সুস্থ দেহ, আর উত্তম খাবার দাবারের যথাসাধ্য ব্যবস্থা করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল; সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল; সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘর এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল; সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর গোলাম তার মুনিবের সম্পদের দায়িত্বশীল; সে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে।”
আদর্শ শিক্ষা দেওয়া:- সন্তানের আরেকটি অধিকার হলো- তাদেরকে উত্তম আদর্শ এবং প্রয়োজনীয় দ্বীন শিক্ষা দেওয়া। সন্তানদেরকে শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতি শেখাতে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “সাত বছর বয়সে তোমরা সন্তানদেরকে নামাজের আদেশ করো। দশ বছর বয়সে এসেও যদি নামাজ না পড়ে, তাহলে তাদেরকে হালকা প্রহার করো। আর এ বয়সে ছেলেমেয়ের বিছানা আলাদা করে দাও।” আল্লাহ তাআলা যেমন আমাদের নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে বলেছেন, সাথে সাথে আমাদের সন্তানদেরকেও বাঁচাতে বলেছেন। তিনি বলেন- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। যার জ্বালানি হবে মানুষ আর পাথর।”
তাদেরকে স্নেহ-মমতার লালন-পালন করা:- সন্তানদেরকে যত্ন করে লালন-পালনের পাশাপাশি তাদেরকে আদর-সোহাগ করতে হবে। স্নেহ-মমতার জড়িয়ে রাখতে হবে। মাঝে মাঝে তাদের সাথে তাদের মত করে দুষ্টুমি, হাসি, মজা আর খেলাধুলাও করতে হবে। যাতে তাদের মন হাসিখুশি আর প্রফুল্ল থাকে। “একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান রাজিয়াল্লাহু আনহুকে চুম্বন করলেন। হযরত আক্বরা’ ইবনে হাসেস রাজিয়াল্লাহু আনহু এটা দেখে বললেন- আমার দশজন সন্তান আছে। কিন্তু আমি কখনও তাদের কাউকে এভাবে চুম্বন করিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে বললেন- যে দয়া করে না; তাকেও দয়া করা হয় না।”
হযরত শাদ্দাদ ইবনে হাদ্দাদ রাজিয়াল্লাহু আনহু তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন এশার নামাজের সময় আমাদের নিকট আসলেন। তখন তার কাধে ছিলো হযরত হাসান রাজিয়াল্লাহু আনহু বা হুসাইন রাজিয়াল্লাহু আনহু। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটু সামনে এসে তাঁকে নিচে নামিয়ে রাখলেন। এরপর নামাজের তাকবীর বলে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামাজ আদায় করলেন। নামাজের মধ্যে একটি সিজদা অনেক লম্বা করলেন। (শাদ্দাদ বলেন) আমার পিতা বলেন, তখন আমি আমার মাথা উঠালাম আর দেখলাম, ঐ ছেলেটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিঠে উঠে আছে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদাহতেই আছেন। এরপর আবার আমি আমার সিজদায় গেলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ শেষ করার পর লোকেরা বললো- হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আজকের নামাজের মধ্যে একটি সিজদা অনেক লম্বা করেছেন। ফলে আমরা মনে করেছি- আপনার কিছু হয়ে গেছে অথবা আপনার উপর ওহী নাযিল হচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আসলে ওগুলোর কোনোটিই আমার হয়নি। বরং আমার এ সন্তান আমাকে সওয়ারি বানিয়েছিলো। এজন্য তাড়াতাড়ি উঠে যাওয়াটা আমার ভালো লাগেনি। যাতে সে তার কাজ শেষ করতে পারে।
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “আমি নামাজ শুরু করে দীর্ঘক্ষণ নামাজ পড়ার ইচ্ছা করি, কিন্তু শিশুদের কান্না আর তাদের মায়েদের বিচলিত হওয়ার কারণে নামাজকে সংক্ষিপ্ত করে ফেলি।”
মেয়েদেরকে আদর্শ শিক্ষা দেওয়া:- মেয়েদেরকে আদর্শ শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যারা মেয়েদেরকে আদর্শ শিক্ষা দেয় এবং তাদেরকে বিশেষ গুণে গুণান্বিতা করে, তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন। তিনি বলেন- “যে ব্যক্তি দুটি মেয়েকে সাবালক হওয়া পর্যন্ত উত্তমরূপে প্রতিপালন করে, কিয়ামতের দিন সে এবং আমি এমন পাশাপাশি অবস্থায় থাকবো। এটা বলে তিনি তার হাতের আঙ্গুলগুলোকে মিলিয়ে ফেললেন।”
এভাবে ইসলাম পিতা-মাতার উপর সন্তানদের এমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধিকার দিয়েছে, যা ইতিপূর্বে কোনো মানবতার আইন-কানুন আর সংবিধান দিতে পারেনি। ইসলাম সন্তানের জীবনের প্রতিটি ধাপেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। একটি সন্তানের জন্ম, দুধকাল, শৈশাবকাল, কৈশোরকাল এমনকি যৌবনকাল পর্যন্ত প্রত্যেক ধাপে ধাপেই রয়েছে ইসলামের ভিন্ন ভিন্ন দিকনির্দেশনা। শুধু তাই না, ভ্রুণ তৈরি হওয়ারও আগে থেকেই ইসলাম সন্তানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পিতা-মাতাকে উত্তম তরীকায মেলামেশার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। যাতে শয়তান ভ্রূণ থেকেই তাকে কোনো ধরণের স্পর্শ করতে না পারে।
সন্তানের এসব অধিকারের প্রতি ইসলামের এতো গুরুত্ব দেওয়ার মূল কারণ হলো, যাতে সমাজের প্রত্যেকটি নারী-পুরুষ উত্তম আদর্শ ও নীতিবান মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। আর তাদের মাধ্যমে একটি সম্ভ্রান্ত ও সভ্য সমাজ তৈরি হয়।
টিকাঃ
১২৫৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১৩৫৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৬৫৮
১২৬০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৩৪৭ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৩৪
১২৬১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৯২৭ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬৮২
১২৬২. সুরা আলে ইমরান, আয়াত নং-৩৯
৩৩৭. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৫১০৭
৩৩৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪০৫৬ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৬৯৬৭
১৭৭. মুআত্বা মালেক, হাদীস নং-১৬৪০
১৭৮. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৪৮১০ সুনানু নাসায়ী, হাদীস নং-৬৭৩৮
১৩০. মুসলিম জামে তিরমিযী, হাদীস নং-২৭১৪ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৬৯৮৮
১৩১. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৮৪৪ মুসলিম, হাদীস নং-৩৯২
১৩২. সূরা বাকারা, আয়াত নং-২৩৩
১৩৩. বুখারী দ্বারা, আদাব নং-২৫০
১৩৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৪১৩ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৮২৯
১৩৫. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৪৯৬৯ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৫৭৮৮
১৩৬. সূরা তাহরীম, আয়াত নং-৬
১৩৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৬৫১১ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২০৬৮
১১৮. সুনান নাসাঈ, হাদীস নং- ১১৪১ মুসলিমের আহমাদ, হাদীস নং-২৭৮৮
১১৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৯৭ মুসলিম ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-২৮৮
১২০. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৩১ আবু আদাবুল মুফরাদ: ৮৪৬
শিশুর জীবনে পরিবেশের প্রভাবঃ ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুরা হলো জীবনের ফল এবং সৌন্দর্য। তারা হৃদয়ের প্রফুল্লতা আর চোখের শীতলতা। এজন্য ইসলাম শিশুদের প্রতি অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলামী শরিয়ত পিতা-মাতার উপর শিশুদের অনেক অধিকার এবং দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে। একজন শিশু সর্বপ্রথম তার পিতা-মাতার পরিবেশ দ্বারা ই প্রভাবিত হয়। যেমনটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “প্রতিটি শিশু স্বভাবজাতভাবে ইসলাম নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। পরে তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী বানায় বা খৃষ্টান বানায় অথবা অগ্নিপূজারী বানায়।”১২৫৯
একটি শিশুর দ্বীন-ধর্ম এবং চরিত্র গঠনে পিতা-মাতার বিরাট ভূমিকা থাকে। এজন্য যদি পিতা-মাতা সৎ আদর্শবান ও ভালো হয়, তাহলে তার সন্তান- সন্ততি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও ভালো হওয়ার আশা করা যায়। এজন্য জন্মের পূর্বেই সন্তানের কিছু অধিকার আদায় করতে হয়। যা শুধু আদর্শ পিতা- মাতারাই করে থাকেন।
জন্মপূর্ব সন্তানের কিছু অধিকারঃ
শয়তান থেকে তাকে রক্ষা করা: স্বামী-স্ত্রী যখন পরস্পর মিলিত হয়, তখন এর সাথে সন্তানেরও একটি অধিকার সম্পৃক্ত হয়ে যায়। তা হলো- বাবার পিঠ থেকে মায়ের রেহেমে যাওয়ার সময় সন্তানকে শয়তানের স্পর্শমুক্ত রাখা। এটা তখনই সম্ভব হবে, যখন পিতা-মাতা উভয়ে সুন্নত তরীকায় মিলিত হবে আর শয়তান থেকে রক্ষা পাওয়ার ঐ দুআ পড়বে, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তোমাদের মধ্যে যখন কেউ তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়, তখন যদি এই দুআ পড়ে- بِسْمِ اللهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبْ الشَّيْطَانَ مَا রযাকতানা (বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশশাইতানা ওয়া জান্নিবিশ শাইতানা মা রযাকতানা) অর্থাৎ, বিসমিল্লাহ, হে আল্লাহ! আমাদেরকে শয়তান থেকে রক্ষা করুন। আর আমাদেরকে আপনি যা দান করবেন, তাকেও শয়তান থেকে দূরে রাখুন। তাহলে এই মিলনে যদি তাদের সন্তান হয়, তো এই সন্তানকে শয়তান কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”১২৬০
শিশুর জীবনের অধিকার:- মাতৃগর্ভে যখন শিশু ভ্রূণ তৈরি হয়, তখনই ইসলাম তাকে জীবনের অধিকার প্রদান করে। এ অবস্থায় ইসলামী শরিয়ত মায়ের জন্য গর্ভপাত নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। কেননা, এটা এমন এক আমানত, যা আল্লাহ তাআলা মায়ের গর্ভে রেখেছেন। আর এ ভ্রূণের জন্য জীবনের অধিকার দিয়েছেন। এজন্য ভ্রূণের কোনো ক্ষতি করা বা নষ্ট করা জায়েয নেই।
এরপর যখন এই ভ্রূণটির চার মাস হয়ে যায়, আর তার মধ্যে রুহ চলে আসে, তখন ইসলামী শরিয়ত তাকে একটি জীবন্ত মানুষের মর্যাদা দিয়েছে। এ অবস্থায় তাকে হত্যা করা কিছুতেই জায়েয নয়। যদি কেউ হত্যা করে, তাহলে হত্যাকারীর উপর দিয়ত তথা ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হয়ে যায়। হযরত মুগীরা ইবনে শু'বা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “এক মহিলার দ্বারা সন্তানকে কুঁড়ে ঘরের খুঁটি দ্বারা আঘাত করে ফেলেলো। ঐ মহিলার পেটে বাচ্চা ছিলো, সে বাচ্চাটিও মারা গেলো। পরে নিহত মহিলার পরিবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে এর বিচার চাইলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হত্যাকারী মহিলার ওয়ারিসদেরকে নিহত মহিলার হত্যার দিয়ত (ক্ষতিপূরণ) প্রদানের নির্দেশ দিলেন। আর গর্ভে নিহত সন্তানের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি গোলাম প্রদানের হুকুম দিলেন। হত্যাকারী মহিলার পরিবারের এক ব্যক্তি বললো- আমরা এমন শিশুর ক্ষতিপূরণ দিবো, যে খায়নি, পান করেনি এবং কোনো শব্দও করেনি! সে তো ছিলো আর গেলো শুধু। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- সে যেনো বেদুইনের মত ছন্দযুক্ত বাক্যে কথা বললো! বর্ণনাকারী বলেন- এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হত্যাকারীর ওয়ারিসদের উপর দিয়ত (ক্ষতিপূরণ) আদায়ের নির্দেশ দিলেন।”১২৬১
এমনকি ইসলামী শরিয়ত গর্ভবতী মহিলাকে রমজানের রোজা ভাঙ্গারও অনুমতি দিয়েছে- যাতে গর্ভস্থ সন্তানের কোন রকম ক্ষতি না হয়। যদি কোনো গর্ভবতী মহিলা ব্যভিচার করে, তাহলে তার সন্তান জন্মগ্রহণ করে দুধ ছাড়া পর্যন্ত শাস্তি বিলম্ব করারও অনুমতি দিয়েছে ইসলাম- যাতে সন্তানটা বেঁচে যায়।
জন্মের পর সন্তানের কিছু অধিকারঃ
সন্তান জন্মগ্রহণ করার পর কী কী করতে হবে, এ বিষয়েও ইসলাম কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। নিম্নে কয়েকটি আলোচনা করা হলো।
সন্তান জন্মের সংবাদে খুশি হওয়াঃ- পবিত্র কুরআনে হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালামের ছেলে হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামের জন্মের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন- “সে (হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম) যখন মেহরাবে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলো, তখন ফেরেশতারা তাকে ডেকে বললো- নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আপনাকে ইয়াহইয়া এর (জন্মের) সুসংবাদ দিচ্ছেন। যে হবে আল্লাহর বাণী সত্যয়নকারী, নেতা, নারী সংযমশীল এবং একজন নেককার নবী।”১২৬২
ছেলেমেয়ে সবার জন্মের আনন্দিত হওয়া মুস্তাহাব। দু'জনের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি।
সন্তানের দুই কানে আযান-ইকামত দেওয়াঃ- সন্তান জন্মের পর সাথে সাথে তার ডান কানে আযান আর বাম কানে ইকামত দেওয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান ইবনে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্মের পর তার কানে আযান দিয়েছিলেন। হযরত আবূ রাফে’ রাজিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন- “হযরত ফাতেমা রাজিয়াল্লাহু আনহা যখন হাসান রাজিয়াল্লাহু আনহুকে প্রসব করলেন, তখন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তার কানে নামাযের আযানের মত আযান দিতে দেখেছি।”৩৩৭
খেজুর দ্বারা তাহনীক করা:- সন্তানদের একটি অধিকার হলো- জন্মের পর তাদেরকে খেজুর দ্বারা তাহনীক করা। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহনীক করেছেন। হযরত আবূ মূসা আশআরী রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “আমার একটি ছেলে জন্ম নিলে তাকে নিয়ে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলাম। তিনি আমার ছেলের নাম রাখলেন ইব্রাহীম। এরপর তাকে খেজুর দ্বারা তাহনীক করলেন এবং তার জন্য বরকতের দুআ করলেন। পরে আমার কাছে দিয়ে দিলেন।”৩৩৮
সন্তানের মাথার চুল ফেলে তার ওজন বরাবর সদকা করা:- সন্তানদের আরেকটি অধিকার হলো- তার মাথার চুল ফেলে তার ওজন বরাবর রূপা সদকা করা। এতে সন্তানের শারীরিক উপকার লাভ হয়। সাথে সাথে সমাজেরও হয় কল্যাণ। শারীরিক উপকার হলো- চুলের ছিদ্রগুলো খুলে যায়। ময়লা দূর হয়। দুর্বল চুলগুলো দূর হয়ে যায়; আর তার স্থলে শক্ত চুল গজায়। আর সামাজিক কল্যাণ হলো- তার চুলের ওজন বরাবর যে সদকা করা হয়, তার মাধ্যমে সমাজের অনেক লোকের সহায়তা হয়। গরীবের প্রচুর খুশি হয়। এক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মেয়ে ফাতেমা রাজিয়াল্লাহু আনহা হযরত হাসান ও হুসাইনের চুল ওজন করে তার ওজন বরাবর রূপা সদকা করেছেন।”১৭৭
সুন্দর নাম রাখা:- সন্তান জন্মের পর তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অধিকার হলো- তার সুন্দর একটি নাম। সুতরাং পিতা-মাতার কর্তব্য হলো, তাদের সন্তানের জন্য এমন একটি সুন্দর নাম রাখা, যে নামে তাকে সবাই চিনবে। আর সে নিজেও উক্ত নামে আনন্দবোধ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুপম নাম পছন্দ করতেন না। হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় নাম হলো- আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান। সবচেয়ে বিস্তৃত নাম হলো- হারিস ও হাম্মাম। আর সবচেয়ে অপছন্দনীয় নাম হলো- হারব ও মুররাহ।১৭৮
হযরত আলী রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “আমার ছেলে হাসান জন্মগ্রহণ করার পর আমি তার নাম রাখলাম- হারব। এরপর তাকে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বললেন- আমার সন্তানকে দেখাও; আর তার নাম কী রেখেছো? আমি বললাম- হারব। তিনি বললেন- না, তার নাম হুসাইন। এরপর যখন আমার দ্বিতীয় ছেলে জন্মগ্রহণ করলো, আমি তার নাম রাখলাম- হারব। পরে তাকে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বললেন- আমার সন্তানকে দেখাও; আর তার নাম কী রেখেছো? আমি বললাম- হারব। তিনি বললেন- না, তার নাম হুসাইন। এরপর যখন আমার তৃতীয় ছেলে জন্মগ্রহণ করলো, আমি তার নাম রাখলাম- হারব। পরে তাকে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বললেন- আমার সন্তানকে দেখাও; আর তার নাম কী রেখেছো? আমি বললাম- হারব। তিনি বললেন- না, তার নাম মুহাসিন। এরপর তিনি বললেন- আমি হযরত হারুন আলাইহিস সালামের ছেলেদের নামের মত তাদের নাম রাখলাম। হযরত হারুন আলাইহিস সালামের ছেলেদের নাম ছিলো- শাকির, শারিব ও মুবাশির।”১৩০
সন্তানের পক্ষ থেকে আকীকা করা:- সন্তান জন্মের পর তার আরেকটি অধিকার হলো- তার পক্ষ থেকে আকীকা করা। অর্থাৎ সন্তান জন্মের সাতদিন পর তার পক্ষ থেকে বকরি জবাই করা। এটা মূলত একদিকে সুন্নাতে মুআক্কাদা অপরদিকে সন্তান জন্মের উপর খুশি ও আনন্দ প্রকাশ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আকীকা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন- “আল্লাহ তাআলা কত বড় অনুগ্রহ ও দয়া করেছেন। যে ব্যক্তির ছেলে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, সে যেনো তার ছেলের পক্ষ থেকে দু’টি বকরি জবাই করে। আর যে ব্যক্তির মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, সে যেনো তার মেয়ের পক্ষ থেকে একটি বকরি জবাই করে দেয়।”১৩১
সন্তানকে দুধ পান করানো:- সন্তান জন্মের পর তার আরেকটি অধিকার হলো- দুধ পান করানো। বুকের দুধ একটি শিশুর শারীরিক প্রবৃদ্ধি, মেধাবিকাশ, সহজ আবেগ- অনুভূতি আর উন্নত সমাজ গঠনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। এজন্য ইসলামী শরীয়তের নিয়ম হলো- একজন মা পূর্ণ দুই বছর তার সন্তানকে দুধ পান করাবে। এটা একটি সন্তানের অধিকার। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে, যে তার সন্তানকে দুধ পান করানোর সময় পূর্ণ করতে চায়। আর পিতার উপর কর্তব্য হলো- প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মা’দেরকে খাবার ও পোষাক প্রদান করা।”১৩২
আধুনিক স্বাস্থ্য ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা এ কথা প্রমাণ করেছে যে- একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য দুধ বছর সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইদানিং আধুনিক বিজ্ঞানী ও গবেষকদের গবেষণা ও অভিজ্ঞতায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, মুসলিম জাতির উপর আল্লাহ তাআলা কত বড় অনুগ্রহ ও দয়া করেছেন। অথচ এই দুধ ও অনুগ্রহ তো চলে আসছে সেই অনেক আগে থেকেই। ইসলামী শরীয়ত সন্তানের দুধ পান করানোর সময়কালকে অনেক গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছে। আর দুধ পান করাকে সন্তানের অধিকার সাব্যস্ত করেছে। সন্তানের এই অধিকারটা শুধু তার মায়ের উপরই চাপিয়ে দেয়নি; বরং একটা দায়িত্ব তার বাবার কাছেও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা হলো- মা’র খাবার এবং পোষাকের ব্যবস্থা করা। যাতে তার সন্তানের ভালোভাবে যত্ন নিতে পারে এবং দুধ পান করাতে পারে।
এভাবে ইসলামী শরীয়ত পিতা-মাতা উভয়কেই ভারসাম্যপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করে। যাতে শিশুটির সার্বিক যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে তার কল্যাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়। আর তারা উভয়েই যাতে যার যার সাধ্যমত চেষ্টা ও মেহনত দ্বারা এ দায়িত্বটি পালন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন- “কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেয়া হয় না।”১৩৩
সন্তানের লালন-পালন ও ভরণপোষণ:- পিতা-মাতার উপর সন্তানের আরেকটি অধিকার হলো- সন্তানকে ভালোভাবে লালন-পালন করা এবং তাদের উত্তম খাবার ব্যবস্থা করা। ইসলামী শরীয়ত পিতা-মাতার উপর এটা ওয়াজিব করে দিয়েছে যে, তারা সন্তানের সুন্দর জীবন, সুস্থ দেহ, আর উত্তম খাবার দাবারের যথাসাধ্য ব্যবস্থা করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল; সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল; সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘর এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল; সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর গোলাম তার মুনিবের সম্পদের দায়িত্বশীল; সে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে।”১৩৪
আদর্শ শিক্ষা দেওয়া:- সন্তানের আরেকটি অধিকার হলো- তাদেরকে উত্তম আদর্শ এবং প্রয়োজনীয় দ্বীন শিক্ষা দেওয়া। সন্তানদেরকে শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতি শেখাতে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “সাত বছর বয়সে তোমরা সন্তানদেরকে নামাজের আদেশ করো। দশ বছর বয়সে এসেও যদি নামাজ না পড়ে, তাহলে তাদেরকে হালকা প্রহার করো। আর এ বয়সে ছেলেমেয়ের বিছানা আলাদা করে দাও।”১৩৫
আল্লাহ তাআলা যেমন আমাদের নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে বলেছেন, সাথে সাথে আমাদের সন্তানদেরকেও বাঁচাতে বলেছেন। তিনি বলেন- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। যার জ্বালানি হবে মানুষ আর পাথর।”১৩৬
তাদেরকে স্নেহ-মমতার লালন-পালন করা:- সন্তানদেরকে যত্ন করে লালন-পালনের পাশাপাশি তাদেরকে আদর-সোহাগ করতে হবে। স্নেহ-মমতার জড়িয়ে রাখতে হবে। মাঝে মাঝে তাদের সাথে তাদের মত করে দুষ্টুমি, হাসি, মজা আর খেলাধুলাও করতে হবে। যাতে তাদের মন হাসিখুশি আর প্রফুল্ল থাকে। “একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান রাজিয়াল্লাহু আনহুকে চুম্বন করলেন। হযরত আক্বরা’ ইবনে হাসেস রাজিয়াল্লাহু আনহু এটা দেখে বললেন- আমার দশজন সন্তান আছে। কিন্তু আমি কখনও তাদের কাউকে এভাবে চুম্বন করিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে বললেন- যে দয়া করে না; তাকেও দয়া করা হয় না।”১৩৭
হযরত শাদ্দাদ ইবনে হাদ্দাদ রাজিয়াল্লাহু আনহু তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন এশার নামাজের সময় আমাদের নিকট আসলেন। তখন তার কাধে ছিলো হযরত হাসান রাজিয়াল্লাহু আনহু বা হুসাইন রাজিয়াল্লাহু আনহু। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটু সামনে এসে তাঁকে নিচে নামিয়ে রাখলেন। এরপর নামাজের তাকবীর বলে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামাজ আদায় করলেন। নামাজের মধ্যে একটি সিজদা অনেক লম্বা করলেন। (শাদ্দাদ বলেন) আমার পিতা বলেন, তখন আমি আমার মাথা উঠালাম আর দেখলাম, ঐ ছেলেটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিঠে উঠে আছে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদাহতেই আছেন। এরপর আবার আমি আমার সিজদায় গেলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ শেষ করার পর লোকেরা বললো- হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আজকের নামাজের মধ্যে একটি সিজদা অনেক লম্বা করেছেন। ফলে আমরা মনে করেছি- আপনার কিছু হয়ে গেছে অথবা আপনার উপর ওহী নাযিল হচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আসলে ওগুলোর কোনোটিই আমার হয়নি। বরং আমার এ সন্তান আমাকে সওয়ারি বানিয়েছিলো। এজন্য তাড়াতাড়ি উঠে যাওয়াটা আমার ভালো লাগেনি। যাতে সে তার কাজ শেষ করতে পারে।১১৮
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “আমি নামাজ শুরু করে দীর্ঘক্ষণ নামাজ পড়ার ইচ্ছা করি, কিন্তু শিশুদের কান্না আর তাদের মায়েদের বিচলিত হওয়ার কারণে নামাজকে সংক্ষিপ্ত করে ফেলি।”১১৯
মেয়েদেরকে আদর্শ শিক্ষা দেওয়া:- মেয়েদেরকে আদর্শ শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যারা মেয়েদেরকে আদর্শ শিক্ষা দেয় এবং তাদেরকে বিশেষ গুণে গুণান্বিতা করে, তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন। তিনি বলেন- “যে ব্যক্তি দুটি মেয়েকে সাবালক হওয়া পর্যন্ত উত্তমরূপে প্রতিপালন করে, কিয়ামতের দিন সে এবং আমি এমন পাশাপাশি অবস্থায় থাকবো। এটা বলে তিনি তার হাতের আঙ্গুলগুলোকে মিলিয়ে ফেললেন।”১২০
এভাবে ইসলাম পিতা-মাতার উপর সন্তানদের এমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধিকার দিয়েছে, যা ইতিপূর্বে কোনো মানবতার আইন-কানুন আর সংবিধান দিতে পারেনি। ইসলাম সন্তানের জীবনের প্রতিটি ধাপেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। একটি সন্তানের জন্ম, দুধকাল, শৈশবকাল, কৈশোরকাল এমনকি যৌবনকাল পর্যন্ত প্রত্যেক ধাপে ধাপেই রয়েছে ইসলামের ভিন্ন ভিন্ন দিকনির্দেশনা। শুধু তাই না, ভ্রুণ তৈরি হওয়ারও আগে থেকেই ইসলাম সন্তানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পিতা-মাতাকে উত্তম তরীকার মেলামেশার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। যাতে শয়তান ভ্রূণ থেকেই তাকে কোনো ধরণের স্পর্শ করতে না পারে।
সন্তানের এসব অধিকারের প্রতি ইসলামের এতো গুরুত্ব দেওয়ার মূল কারণ হলো, যাতে সমাজের প্রত্যেকটি নারী-পুরুষ উত্তম আদর্শ ও নীতিবান মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। আর তাদের মাধ্যমে একটি সম্ভ্রান্ত ও সভ্য সমাজ তৈরি হয়।
টিকাঃ
১২৫৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১৩৫৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৬৫৮
১২৬০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৩৪৭ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৩৪
১২৬১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৯২৭ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬৮২
১২৬২. সুরা আলে ইমরান, আয়াত নং-৩৯
৩৩৭. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৫১০৭
৩৩৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪০৫৬ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৬৯৬৭
১৭৭. মুআত্বা মালেক, হাদীস নং-১৬৪০
১৭৮. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৪৮১০ সুনানু নাসায়ী, হাদীস নং-৬৭৩৮
১৩০. মুসলিম জামে তিরমিযী, হাদীস নং-২৭১৪ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৬৯৮৮
১৩১. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৮৪৪ মুসলিম, হাদীস নং-৩৯২
১৩২. সূরা বাকারা, আয়াত নং-২৩৩
১৩৩. বুখারী দ্বারা, আদাব নং-২৫০
১৩৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৪১৩ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৮২৯
১৩৫. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৪৯৬৯ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৫৭৮৮
১৩৬. সূরা তাহরীম, আয়াত নং-৬
১৩৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৬৫১১ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২০৬৮
১১৮. সুনান নাসাঈ, হাদীস নং- ১১৪১ মুসলিমের আহমাদ, হাদীস নং-২৭৮৮
১১৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৯৭ মুসলিম ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-২৮৮
১২০. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৩১ আবু আদাবুল মুফরাদ: ৮৪৬
📄 ইসলামে পিতা-মাতার অধিকার
ভূমিকা: এখানে পিতা-মাতা বলতে ঐ দুই জন স্বামী-স্ত্রী, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা সন্তান-সন্তুতি দান করেন। এরপর তারা ভালোভাবে এই সন্তানদের যত্ন নেন। তাদের আরামের প্রতি খেয়াল রাখেন। তাদের অধিকারগুলো আদায় করেন। আর তাদের ভবিষ্যৎ গড়নে যথাযথ চেষ্টা করেন। যা পূর্ববর্তী আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সন্তানের উপর পিতা-মাতার অধিকারঃ ইসলাম সন্তানদের উপর পিতা-মাতার এই অধিকার ওয়াজিব করেছে যে, সন্তানরা পিতা-মাতার ভালো কাজের স্বীকৃতি দিবে। তাদের মন্দকাজে বাধা দিবে। তাদের সাথে সর্বদা সদ্ব্যবহার করবে। তাদেরকে সীমাহীন ভক্তি-শ্রদ্ধা করবে। তাদের প্রতি অনুগ্রহ করবে। বিশেষ করে যখন তারা বৃদ্ধ বয়সে চলে যায় এবং দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তাদের সাথে ইহসান, অনুগ্রহ আর সদ্ব্যবহার করার প্রতি ইসলাম বিশেষভাবে গুরুত্ব প্রদান করেছে। যেমনভাবে ছোটবেলায় পিতা-মাতা সন্তানের উপর অনুগ্রহ করেছে।
আল্লাহ তাআলার পর একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে সম্মানিত এবং সবচেয়ে বেশি সদ্ব্যবহার ও দয়া পাওয়ার উপযুক্ত হলো তার পিতা এবং মাতা। এজন্য আল্লাহ তায়ালা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং তাদের উপর অনুগ্রহ করাকে তাঁর নিজের ইবাদাতের সাথে সম্পৃক্ত করে বলেন- “আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের কোনো একজন অথবা উভয়ই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উহ্’ পর্যন্তও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মান দিয়ে কথা বলো। তাদের উভয়ের জন্য দয়াপরবশ হয়ে বিনয়ের ডানা নত করে দাও। আর বলো- হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া করুণ। যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছে।”
এখানে সন্তানদেরকে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের আদেশ আর অসদ্ব্যবহারের নিষেধ করা হয়েছে। এমনকি তাদের প্রতি সামান্য বিরক্তি বাক্য নিয়ে ‘উহ্’ বলে তাদের অনুভূতিতে আঘাত করাও নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার প্রতি বিনয়ের যে পরিমাণ প্রশংসা করেছেন, তা অন্য কারও বিনয়ের ক্ষেত্রে করেননি। এমনকি তিনি অন্য কারও প্রতি এতো চূড়ান্ত পর্যায়ের বিনয়ও বলেননি। যেমনটি তিনি উক্ত আয়াতের শেষের দিকে বলেছেন- “তাদের উভয়ের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের বিনয়ের ডানা নত করে দাও।” পিতা-মাতা যখন বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছে যায়, তখন তাদের সাথে আরও বেশি সদ্ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। কেননা, এ অবস্থায় তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। কখনও কখনও একদম অক্ষম হয়ে পড়ে। এজন্য আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমরা যেনো তাদের সাথে ভালো কথা বলি। তাদের সাথে নম্র ভাষায় কথা বলি। তাদেরকে সাহায্য করি। তাদের প্রতি অনুগ্রহ করি এবং তাদের জন্য রহমতের দুআ করি। যেমনভাবে আমাদের ছোট বেলা অবস্থায় তারা আমাদের প্রতি রহম করেছেন।
এরপর আল্লাহ তাআলা বেশি বেশি পিতা-মাতার প্রশংসা করতে বলেছেন। আল্লাহ তাআলা নিজের প্রশংসার সাথে পিতা-মাতার প্রশংসাকে জুড়ে দিয়ে বলেন- “আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু’ বছর। সুতরাং আমার ও তোমার পিতা-মাতা সবার শুকরিয়া আদায় করো। সবশেষে ফিরে আসতে হবে আমার কাছেই।”
পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার হলো একটি অন্যতম সর্বোত্তম নেক আমল। এক্ষেত্রে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে- “একবার হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন- আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল কোনটি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- সময়মত নামাজ পড়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন- এরপর কোনটি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন- এরপর কোনটি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।
হযরত আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললো- আমি আল্লাহ তাআলার নিকট পুরস্কার ও বিনিময়ের আশায় আপনার কাছে হিজরত ও জিহাদের বাইআত হতে চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- তোমার পিতা-মাতা কেউ কি জীবিত আছে? সে বললো- হ্যাঁ, দু’জনই জীবিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- সত্যিই কি তুমি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রতিদানের আশা করো? সে বললো- হ্যাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- তাহলে তুমি তোমার পিতা-মাতার নিকট ফিরে যাও এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করো।” অন্য এক বর্ণনায় এসেছে- তাহলে তাদের খেদমতের মাধ্যমে জিহাদ (এর সওয়াব অর্জন) করো।
ইসলামী শরীয়ত সন্তানের উপর পিতা-মাতার কী অধিকার দিয়েছে, আর কতটুকু অধিকার দিয়েছে, এটা বুঝা যায় হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস থেকে। তিনি বর্ণনা করেন- “এক ব্যক্তি এসে বললো- হে আল্লাহর রাসূল! আমার মালও আছে, সন্তানও আছে। কিন্তু আমার পিতা আমার কাছে আমার মাল চায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- তুমি এবং তোমার মাল, সবই তো তোমার পিতার।”
উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় হযরত ইমাম ইবনে হিব্বান রহঃ বলেন- “এই ব্যক্তি তার পিতার সাথে অপরিচিতের মত ব্যবহার করতো। পিতার সাথে তার সম্পর্ক বেশি ভালো ছিলো না। তাই তাকে ধমকস্বরূপ এটা বলা হয়েছে। আর সে যেন সর্বদা তার পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করে এবং প্রয়োজনে নিজের ধন-সম্পদ সবকিছু দিয়েও তাকে সাহায্য করে ও তার প্রতি অনুগ্রহ করে- এই আদেশ দিয়েই মূলত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- 'তুমি এবং তোমার মাল সবই তোমার পিতার।' এর অর্থ এই নয় যে, পিতা তার সন্তানের মালের উপর অন্যায় হস্তক্ষেপ করবে। মন চাইলেই তার সন্তানের মাল ছিনিয়ে নিয়ে সে মালের মালিক হয়ে যাবে।"
অসংখ্য হাদীস এবং আসারে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার ও অনুগ্রহের আদেশ করা হয়েছে। আর অসদ্ব্যবহারের নিষেধ ও সতর্ক করা হয়েছে। কারণ ইসলামী শরিয়ত সমাজ থেকে সকল পঙ্কিলতা ও অসম্পূর্ণতা দূর করে মূল্যবোধসম্পন্ন একটি আদর্শ সমাজ গঠনের পথ প্রদর্শন করে।
টিকাঃ
১১৯. সুরা বানী ইসরাঈল, আয়াত নং-২৩-২৪
১২০. সুরা লুকমান, আয়াত নং-১৪
১২১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫৯৭০ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১০৭
১২২. সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং- ২৫২৫ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৬৪৮০
১২৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৬৮২ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৫৪৯
১২৪. সুনান ইবনে মাজাহ, হাদীস নং- ২২৯১ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৪৩২
১৭৯. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং- ১৮২/২
ভূমিকা: এখানে পিতা-মাতা বলতে ঐ দুই জন স্বামী-স্ত্রী, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা সন্তান-সন্তুতি দান করেন। এরপর তারা ভালোভাবে এই সন্তানদের যত্ন নেন। তাদের আরামের প্রতি খেয়াল রাখেন। তাদের অধিকারগুলো আদায় করেন। আর তাদের ভবিষ্যৎ গড়নে যথাযথ চেষ্টা করেন। যা পূর্ববর্তী আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সন্তানের উপর পিতা-মাতার অধিকারঃ ইসলাম সন্তানদের উপর পিতা-মাতার এই অধিকার ওয়াজিব করেছে যে, সন্তানরা পিতা-মাতার ভালো কাজের স্বীকৃতি দিবে। তাদের মন্দকাজে বাধা দিবে। তাদের সাথে সর্বদা সদ্ব্যবহার করবে। তাদেরকে সীমাহীন ভক্তি-শ্রদ্ধা করবে। তাদের প্রতি অনুগ্রহ করবে। বিশেষ করে যখন তারা বৃদ্ধ বয়সে চলে যায় এবং দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তাদের সাথে ইহসান, অনুগ্রহ আর সদ্ব্যবহার করার প্রতি ইসলাম বিশেষভাবে গুরুত্ব প্রদান করেছে। যেমনভাবে ছোটবেলায় পিতা-মাতা সন্তানের উপর অনুগ্রহ করেছে।
আল্লাহ তাআলার পর একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে সম্মানিত এবং সবচেয়ে বেশি সদ্ব্যবহার ও দয়া পাওয়ার উপযুক্ত হলো তার পিতা এবং মাতা। এজন্য আল্লাহ তায়ালা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং তাদের উপর অনুগ্রহ করাকে তাঁর নিজের ইবাদাতের সাথে সম্পৃক্ত করে বলেন- “আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের কোনো একজন অথবা উভয়ই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উহ্’ পর্যন্তও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মান দিয়ে কথা বলো। তাদের উভয়ের জন্য দয়াপরবশ হয়ে বিনয়ের ডানা নত করে দাও। আর বলো- হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া করুণ। যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছে।”১১৯
এখানে সন্তানদেরকে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের আদেশ আর অসদ্ব্যবহারের নিষেধ করা হয়েছে। এমনকি তাদের প্রতি সামান্য বিরক্তি বাক্য নিয়ে ‘উহ্’ বলে তাদের অনুভূতিতে আঘাত করাও নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার প্রতি বিনয়ের যে পরিমাণ প্রশংসা করেছেন, তা অন্য কারও বিনয়ের ক্ষেত্রে করেননি। এমনকি তিনি অন্য কারও প্রতি এতো চূড়ান্ত পর্যায়ের বিনয়ও বলেননি। যেমনটি তিনি উক্ত আয়াতের শেষের দিকে বলেছেন- “তাদের উভয়ের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের বিনয়ের ডানা নত করে দাও।”
পিতা-মাতা যখন বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছে যায়, তখন তাদের সাথে আরও বেশি সদ্ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। কেননা, এ অবস্থায় তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। কখনও কখনও একদম অক্ষম হয়ে পড়ে। এজন্য আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমরা যেনো তাদের সাথে ভালো কথা বলি। তাদের সাথে নম্র ভাষায় কথা বলি। তাদেরকে সাহায্য করি। তাদের প্রতি অনুগ্রহ করি এবং তাদের জন্য রহমতের দুআ করি। যেমনভাবে আমাদের ছোট বেলা অবস্থায় তারা আমাদের প্রতি রহম করেছেন।
এরপর আল্লাহ তাআলা বেশি বেশি পিতা-মাতার প্রশংসা করতে বলেছেন। আল্লাহ তাআলা নিজের প্রশংসার সাথে পিতা-মাতার প্রশংসাকে জুড়ে দিয়ে বলেন- “আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু’ বছর। সুতরাং আমার ও তোমার পিতা-মাতা সবার শুকরিয়া আদায় করো। সবশেষে ফিরে আসতে হবে আমার কাছেই।”১২০
পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার হলো একটি অন্যতম সর্বোত্তম নেক আমল। এক্ষেত্রে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে- “একবার হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন- আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল কোনটি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- সময়মত নামাজ পড়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন- এরপর কোনটি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন- এরপর কোনটি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।১২১
হযরত আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললো- আমি আল্লাহ তাআলার নিকট পুরস্কার ও বিনিময়ের আশায় আপনার কাছে হিজরত ও জিহাদের বাইআত হতে চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- তোমার পিতা-মাতা কেউ কি জীবিত আছে? সে বললো- হ্যাঁ, দু’জনই জীবিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- সত্যিই কি তুমি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রতিদানের আশা করো? সে বললো- হ্যাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- তাহলে তুমি তোমার পিতা-মাতার নিকট ফিরে যাও এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করো।”১২২
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে- তাহলে তাদের খেদমতের মাধ্যমে জিহাদ (এর সওয়াব অর্জন) করো।১২৩
ইসলামী শরীয়ত সন্তানের উপর পিতা-মাতার কী অধিকার দিয়েছে, আর কতটুকু অধিকার দিয়েছে, এটা বুঝা যায় হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস থেকে। তিনি বর্ণনা করেন- “এক ব্যক্তি এসে বললো- হে আল্লাহর রাসূল! আমার মালও আছে, সন্তানও আছে। কিন্তু আমার পিতা আমার কাছে আমার মাল চায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- তুমি এবং তোমার মাল, সবই তো তোমার পিতার।”১২৪
উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় হযরত ইমাম ইবনে হিব্বান রহঃ বলেন- “এই ব্যক্তি তার পিতার সাথে অপরিচিতের মত ব্যবহার করতো। পিতার সাথে তার সম্পর্ক বেশি ভালো ছিলো না। তাই তাকে ধমকস্বরূপ এটা বলা হয়েছে। আর সে যেন সর্বদা তার পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করে এবং প্রয়োজনে নিজের ধন-সম্পদ সবকিছু দিয়েও তাকে সাহায্য করে ও তার প্রতি অনুগ্রহ করে- এই আদেশ দিয়েই মূলত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- 'তুমি এবং তোমার মাল সবই তোমার পিতার।' এর অর্থ এই নয় যে, পিতা তার সন্তানের মালের উপর অন্যায় হস্তক্ষেপ করবে। মন চাইলেই তার সন্তানের মাল ছিনিয়ে নিয়ে সে মালের মালিক হয়ে যাবে।"১৭৯
অসংখ্য হাদীস এবং আসারে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার ও অনুগ্রহের আদেশ করা হয়েছে। আর অসদ্ব্যবহারের নিষেধ ও সতর্ক করা হয়েছে। কারণ ইসলামী শরিয়ত সমাজ থেকে সকল পঙ্কিলতা ও অসম্পূর্ণতা দূর করে মূল্যবোধসম্পন্ন একটি আদর্শ সমাজ গঠনের পথ প্রদর্শন করে।
টিকাঃ
১১৯. সুরা বানী ইসরাঈল, আয়াত নং-২৩-২৪
১২০. সুরা লুকমান, আয়াত নং-১৪
১২১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫৯৭০ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১০৭
১২২. সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং- ২৫২৫ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৬৪৮০
১২৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৬৮২ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৫৪৯
১২৪. সুনান ইবনে মাজাহ, হাদীস নং- ২২৯১ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৪৩২
১৭৯. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং- ১৮২/২
📄 ইসলামে আত্মীয়তার গুরুত্ব ও অধিকার
ভূমিকাঃ ইসলামের দৃষ্টিতে একটি পরিবার শুধু পিতা-মাতা আর সন্তান-সন্ততির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং ভাই-বোন, চাচা-ফুফু, মামা-খালা এবং চাচাতো, ফুফাতো, মামাতো, খালাতো ভাইবোন সবাই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। তাদের সবার সাথেই সদ্ব্যবহার এবং সম্পর্ক বজায় রাখার জোর নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। আত্মীয়তা রক্ষা করা এক মহৎ গুণ। এটা রক্ষা করলে অনেক সওয়াব। আর ছিন্ন করলে রয়েছে তার জন্য কঠিন শাস্তি। যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখবে, আল্লাহ তাআলা তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবেন। আর যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আল্লাহ তাআলা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। আত্মীয়তা নামক এই বিশাল পরিবারের স্থায়ী সম্পর্ককে মজবুত রাখার জন্য ইসলাম অনেক হুকুম-আহকাম এবং নীতিমালা প্রদান করেছে। যেমন: পরস্পর সম্পর্ক বজায় রাখা। সবার প্রতি সবার খেয়াল রাখা। খোঁজ-খবর নেয়া। এক অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসা। অনুরূপভাবে ইসলাম দিয়েছে আত্মীয়দের উপর খরচ করার বিধান। তাদের মাঝে সম্পদ বণ্টনের বিধান। আকিকার বিধান। অর্থাৎ যদি কেউ ভুলক্রমে অথবা অকর্তব্যবশত কাউকে হত্যা করে ফেলে, তাহলে এই হত্যাকারীর পরিবার এবং তার আত্মীয়স্বজন মিলে এ হত্যার ক্ষতিপূরণ আদায় করবে।
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্কঃ আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ হলো- তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা। তাদের উপকার করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা। তাদের কোনো ক্ষতি না করা। তাদের দেখাশোনা করা। খোঁজখবর নেয়া। সময় করে তাদেরকে দেখতে যাওয়া। কিছু হাদিয়া-তোহফা দেয়া। গরীব আত্মীয়দেরকে বেশি বেশি দান করা। কেউ অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া। দাওয়াত দিলে কবুল করা। মাঝেমধ্যে তাদেরকে দাওয়াত করা। তাদেরকে সম্মান করা। তাদের মান-মর্যাদা রক্ষা করা। তাদের খুশিতে নিজেরাও খুশি হওয়া। আর তাদের দুঃখে দুঃখী হয়ে তাদেরকে সান্ত্বনা দেয়া। মোটকথা, সার্বিকভাবে তাদের প্রতি খেয়াল রাখা এবং খোঁজখবর নেয়া।
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা হলো- ইসলামী সমাজের ঐক্য ও সংহতি ঠিক রাখার এক অন্যতম মাধ্যম। এর দ্বারা সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তি অধিক শান্তি ও স্বস্তিতে জীবন যাপন করতে পারে। প্রত্যেকে নিঃস্বার্থতা ও বিচ্ছিন্নতামুক্ত থাকে। একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও মুহাব্বত বৃদ্ধি পায়। আর প্রয়োজনের মুহূর্তে একে অপরের সহায়তায় এগিয়ে আসে। আত্মীয়তার সম্পর্ক এমন একটি সম্পর্ক, যা টিকিয়ে রাখা প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব। এজন্য আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহারের আদেশ দিয়ে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তোমরা আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করো। তার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না। আর সদ্ব্যবহার করো মাতা-পিতার সাথে, নিকটাত্মীয়দের সাথে, এতিম, মিসকিন, আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের সাথে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না তাদেরকে, যারা দাম্ভিক-অহংকারী।”
কেউ যদি আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখতে চায়, তাহলে তার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখতে হবে। তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে হবে। তাদের কল্যাণ কামনা করতে হবে এবং তাদেরকে দান-সদকা করতে হবে। হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে কুদসীতে এ বিষয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, “আল্লাহ তাআলা বলেন- আমি রহমান। আত্মীয়তার বন্ধন হচ্ছে রহিম (رحم)। যা আমি আমার নাম (رحم) থেকে নির্মিত করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখব। আর যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব।”
যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখবে, তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ত বরকতময় জীবনের সুসংবাদ দিয়েছেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি- “যে ব্যক্তি এটা পছন্দ করে যে, তার রিযিকে বৃদ্ধি পাক এবং মৃত্যুর পরও তার সুনাম-সুখ্যাতি বজায় থাকুক, সে যেন আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করে।” এই হাদীসের ব্যাখ্যায় উলামায়ে কেরাম বলেন- “দুনিয়াতে এই ব্যক্তির জীবনে বরকত হবে। নেক আমল বেশি বেশি করতে পারবে। তার মূল্যবান সময়গুলো কাজে লাগাতে পারবে, যা তার আখেরাতে কাজে আসবে। আর অনর্থক-বেহুদা কাজ থেকে সে বিরত থাকতে পারবে।”
পক্ষান্তরে যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাদের ব্যাপারে কুরআন হাদীসে বহু সতর্কবাণী এসেছে এবং এটাকে বিরাট অন্যায় সাব্যস্ত করা হয়েছে। কেননা, আত্মীয়তা ছিন্ন করার মাধ্যমে সমাজের ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতি নষ্ট হয়। পরস্পরে শত্রুতা ও বিদ্বেষ তৈরি হয়। এজন্য আল্লাহ তাআলা অন্ধ দৃষ্টি, বধির হৃদয় আর আল্লাহ লা'নত সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে তাদেরকে বলেন- “তবে কি তোমরা এই প্রত্যাশা করছো যে, যদি তোমরা শাসন কর্তৃত্ব পাও, তাহলে জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে? এরাই ঐ সকল লোক, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা লা'নত করেছেন। ফলে তাদেরকে বধির করে দিয়েছেন, আর দৃষ্টিকে করেছেন অন্ধ।”
হযরত জুবাইর ইবনে মুতইম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” সম্পর্ক ছিন্ন করার অর্থ হলো- তাদের সাথে ভালো ব্যবহার না করা। তাদের প্রতি অনুগ্রহ না করা। তাদের থেকে দূরে দূরে থাকা। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা যে অনেক বড় গুনাহ, এ সম্পর্কে কুরআন-হাদীসে অনেক বক্তব্য এসেছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে এমন একটি সমাজ গঠন হবে, যারা পরস্পরে সুসংহত থাকবে, ঐক্যবদ্ধ থাকবে এবং একে অপরের সহায়তায় এগিয়ে আসবে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়াদ্ৰতা এবং সহানুভূতির দিক থেকে তাদের উদাহরণ হলো- একটি মানব দেহের ন্যায়। যখন তার একটি অঙ্গ আক্রান্ত হয়, তখন তার সারা দেহে ছেয়ে যায় ব্যাথা আর অনিদ্রা।”
টিকাঃ
১৮০. সূরা নিসা, আয়াত নং- ৩৬
১৮১. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং- ১৬৯৪ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ১৬৯০
১৮২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১৯৯৯
১৮৩. সূরা মুসনাদ, আয়াত নং- ১৬৯৯
১৮৪. সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত নং- ২০-২২
১৮৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫৯৮৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৫৯
১৮৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫৬৬৪ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৫৮
ভূমিকাঃ ইসলামের দৃষ্টিতে একটি পরিবার শুধু পিতা-মাতা আর সন্তান-সন্ততির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং ভাই-বোন, চাচা-ফুফু, মামা-খালা এবং চাচাতো, ফুফাতো, মামাতো, খালাতো ভাইবোন সবাই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। তাদের সবার সাথেই সদ্ব্যবহার এবং সম্পর্ক বজায় রাখার জোর নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। আত্মীয়তা রক্ষা করা এক মহৎ গুণ। এটা রক্ষা করলে অনেক সওয়াব। আর ছিন্ন করলে রয়েছে তার জন্য কঠিন শাস্তি। যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখবে, আল্লাহ তাআলা তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবেন। আর যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আল্লাহ তাআলা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। আত্মীয়তা নামক এই বিশাল পরিবারের স্থায়ী সম্পর্ককে মজবুত রাখার জন্য ইসলাম অনেক হুকুম-আহকাম এবং নীতিমালা প্রদান করেছে। যেমন: পরস্পর সম্পর্ক বজায় রাখা। সবার প্রতি সবার খেয়াল রাখা। খোঁজ-খবর নেয়া। এক অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসা। অনুরূপভাবে ইসলাম দিয়েছে আত্মীয়দের উপর খরচ করার বিধান। তাদের মাঝে সম্পদ বণ্টনের বিধান। আকিকার বিধান। অর্থাৎ যদি কেউ ভুলক্রমে অথবা অকর্তব্যবশত কাউকে হত্যা করে ফেলে, তাহলে এই হত্যাকারীর পরিবার এবং তার আত্মীয়স্বজন মিলে এ হত্যার ক্ষতিপূরণ আদায় করবে।
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্কঃ আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ হলো- তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা। তাদের উপকার করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা। তাদের কোনো ক্ষতি না করা। তাদের দেখাশোনা করা। খোঁজখবর নেয়া। সময় করে তাদেরকে দেখতে যাওয়া। কিছু হাদিয়া-তোহফা দেয়া। গরীব আত্মীয়দেরকে বেশি বেশি দান করা। কেউ অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া। দাওয়াত দিলে কবুল করা। মাঝেমধ্যে তাদেরকে দাওয়াত করা। তাদেরকে সম্মান করা। তাদের মান-মর্যাদা রক্ষা করা। তাদের খুশিতে নিজেরাও খুশি হওয়া। আর তাদের দুঃখে দুঃখী হয়ে তাদেরকে সান্ত্বনা দেয়া। মোটকথা, সার্বিকভাবে তাদের প্রতি খেয়াল রাখা এবং খোঁজখবর নেয়া।
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা হলো- ইসলামী সমাজের ঐক্য ও সংহতি ঠিক রাখার এক অন্যতম মাধ্যম। এর দ্বারা সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তি অধিক শান্তি ও স্বস্তিতে জীবন যাপন করতে পারে। প্রত্যেকে নিঃস্বার্থতা ও বিচ্ছিন্নতামুক্ত থাকে। একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও মুহাব্বত বৃদ্ধি পায়। আর প্রয়োজনের মুহূর্তে একে অপরের সহায়তায় এগিয়ে আসে। আত্মীয়তার সম্পর্ক এমন একটি সম্পর্ক, যা টিকিয়ে রাখা প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব। এজন্য আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহারের আদেশ দিয়ে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তোমরা আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করো। তার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না। আর সদ্ব্যবহার করো মাতা-পিতার সাথে, নিকটাত্মীয়দের সাথে, এতিম, মিসকিন, আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের সাথে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না তাদেরকে, যারা দাম্ভিক-অহংকারী।”১৮০
কেউ যদি আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখতে চায়, তাহলে তার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখতে হবে। তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে হবে। তাদের কল্যাণ কামনা করতে হবে এবং তাদেরকে দান-সদকা করতে হবে। হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে কুদসীতে এ বিষয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, “আল্লাহ তাআলা বলেন- আমি রহমান। আত্মীয়তার বন্ধন হচ্ছে রহিম (رحم)। যা আমি আমার নাম (رحম) থেকে নির্মিত করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখব। আর যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব।”১৮১
যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখবে, তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ত বরকতময় জীবনের সুসংবাদ দিয়েছেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি- “যে ব্যক্তি এটা পছন্দ করে যে, তার রিযিকে বৃদ্ধি পাক এবং মৃত্যুর পরও তার সুনাম-সুখ্যাতি বজায় থাকুক, সে যেন আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করে।”১৮২
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় উলামায়ে কেরাম বলেন- “দুনিয়াতে এই ব্যক্তির জীবনে বরকত হবে। নেক আমল বেশি বেশি করতে পারবে। তার মূল্যবান সময়গুলো কাজে লাগাতে পারবে, যা তার আখেরাতে কাজে আসবে। আর অনর্থক-বেহুদা কাজ থেকে সে বিরত থাকতে পারবে।”১৮৩
পক্ষান্তরে যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাদের ব্যাপারে কুরআন হাদীসে বহু সতর্কবাণী এসেছে এবং এটাকে বিরাট অন্যায় সাব্যস্ত করা হয়েছে। কেননা, আত্মীয়তা ছিন্ন করার মাধ্যমে সমাজের ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতি নষ্ট হয়। পরস্পরে শত্রুতা ও বিদ্বেষ তৈরি হয়। এজন্য আল্লাহ তাআলা অন্ধ দৃষ্টি, বধির হৃদয় আর আল্লাহ লা'নত সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে তাদেরকে বলেন- “তবে কি তোমরা এই প্রত্যাশা করছো যে, যদি তোমরা শাসন কর্তৃত্ব পাও, তাহলে জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে? এরাই ঐ সকল লোক, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা লা'নত করেছেন। ফলে তাদেরকে বধির করে দিয়েছেন, আর দৃষ্টিকে করেছেন অন্ধ।”১৮৪
হযরত জুবাইর ইবনে মুতইম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”১৮৫
সম্পর্ক ছিন্ন করার অর্থ হলো- তাদের সাথে ভালো ব্যবহার না করা। তাদের প্রতি অনুগ্রহ না করা। তাদের থেকে দূরে দূরে থাকা। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা যে অনেক বড় গুনাহ, এ সম্পর্কে কুরআন-হাদীসে অনেক বক্তব্য এসেছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে এমন একটি সমাজ গঠন হবে, যারা পরস্পরে সুসংহত থাকবে, ঐক্যবদ্ধ থাকবে এবং একে অপরের সহায়তায় এগিয়ে আসবে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়াদ্রতা এবং সহানুভূতির দিক থেকে তাদের উদাহরণ হলো- একটি মানব দেহের ন্যায়। যখন তার একটি অঙ্গ আক্রান্ত হয়, তখন তার সারা দেহে ছেয়ে যায় ব্যাথা আর অনিদ্রা।”১৮৬
টিকাঃ
১৮০. সূরা নিসা, আয়াত নং- ৩৬
১৮১. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং- ১৬৯৪ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ১৬৯০
১৮২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১৯৯৯
১৮৩. সূরা মুসনাদ, আয়াত নং- ১৬৯৯
১৮৪. সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত নং- ২০-২২
১৮৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫৯৮৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৫৯
১৮৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫৬৬৪ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৫৮