📄 ইসলামে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গোলাম আযাদ
ভূমিকা: ইসলাম এসেছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রকৃত সম্মান ফিরিয়ে দিতে। ইসলামে মানব-সন্তান সবাই সমান। তাদের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয় হবে শুধুমাত্র তাকওয়া- খোদাভীতির মাপকাঠিতে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের পর সর্বপ্রথম আর জাতীয়তাবাদের দেয়াল সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দিয়েছেন। বর্ণ-বৈষম্য পুরোপুরিভাবে দূরীভূত হওয়ার বাস্তব নমুনা দেখা যায়- যখন হযরত বেলাল ইবনে রাবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু কাবার ছাদে উঠে চিৎকার করে কালেমায়ে তাওহীদের আওয়াজ দিয়েছিলেন। আর এর পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চাচাতো ভাই হামযা এবং পালকপুত্র যায়েদকে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন।
বিদায় হজ্ব এবং সাম্য নীতিঃ বিদায় হজ্বের সময় রাসুলে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষের মাঝে সমতার ঘোষণা দিয়ে বলেন- “তোমরা সবাই আদমের সন্তান। আর আদম আলাইহিসসালাম মাটির তৈরি। অনারবীর উপর কোনো আরবীর শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্বেতাঙ্গের উপর কোনো কৃষ্ণাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোনো কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সকল শ্রেষ্ঠত্ব শুধুমাত্র তাকওয়া- খোদাভীতির ভিত্তিতে।”
এখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং গোলামি প্রথা বিলুপ্তির আহ্বান করা হয়েছে। ইসলামের মূলনীতি হলো- “সকল মানুষ স্বাধীন। কেউ পরাধীন বা গোলাম নয়। কেননা, প্রত্যেকেই এক পিতার অন্তর্ভুক্ত আর জন্মগতভাবে সবাই স্বাধীন।” ইসলাম এমন এক জামানায় এই মূলনীতি ঘোষণা করেছে, যখন মানুষকে গোলাম বানিয়ে রাখা হতো আর বিভিন্ন ধরণের অপমান-লাঞ্ছনা আর বন্দী জীবনের স্বাদ আস্বাদন করানো হতো।
ইসলাম এবং গোলাম আযাদ: ইসলাম আগমনের পূর্বে মানবজাতি এমন এক সমাজ ব্যবস্থা আর সভ্যতার ছায়ায় জীবন যাপন করেছে- যেখানে ছিলো পৌত্তলিক নাগরিক ব্যবস্থা, সংকীর্ণমনা উপজাতি তন্তু, আর শ্রেণী-বৈষম্যের জড়াজড়ি। যা গোটা মানব সভ্যতাকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করে রেখেছিলো। এর মূলে ছিলো সমাজের এলিট শ্রেণীর ঐ সমস্ত লোক, যারা নেতৃত্ব এবং কর্তৃত্বের পূর্ণ অধিকার ভোগ করতো। আর সমাজের নিম্ন শ্রেণীর লোকদের সুন্দর জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার হরণ করে নিজেদের আয়ত্তে রাখতো। কোনো রকম দয়া-মায়া তাদেরকে করা হতো না।
এরপর ইসলাম এসে মুসলমানদেরকে বললো- গোলাম আযাদ করতে, তাদের সাথে সুন্দর ব্যবহার করতে, তাদের অনুগ্রহ আর ক্ষমা করতে। সাথে সাথে গোলাম আযাদ করাকে অনেক বড় এক আমল হিসেবেও গণ্য করে দিলো। ইসলাম মুসলমানদেরকে আহ্বান করলো- তারা যেনো নিজস্ব সম্পদ ব্যয় করে গোলাম আযাদ করে। মালিক পক্ষের জন্য গোলামের সাথে জুলুম করা বা প্রহার করার কাফফারা নির্ধারণ করে দিলো- গোলাম আযাদ। গোলাম আযাদ করাকে সওয়াবের কাজ গণ্য করলো। আর ইচ্ছাকৃত হত্যা, যেহার, কসম ভঙ্গ এবং রমজানের রোজা ভঙ্গের কাফফারা নির্ধারণ করে দিলো- গোলাম আযাদ। আর ইসলাম মালিকদেরকে আদেশ করেছে, যদি কোনো গোলাম মুক্তি পাওয়ার জন্য মুকাতাবা (টাকার বিনিময়ে মুক্তির চুক্তি) করতে চায়, তাহলে তাকে সর্বাত্মক সাহায্য করবে। এমনকি গোলাম আযাদের জন্য টাকা খরচ করাকে যাকাতের মাসরাফ (যেখানে যাকাত দেওয়া যায়) বানানো হয়েছে। আর মালিকের মৃত্যুর পর উসূল ওয়ালাদাহ আযাদ ঘোষণা করা হয়েছে।
গোলামী সমস্যা সমাধানে ইসলামের ব্যবস্থাপনাঃ গোলামী সমস্যা একটি মানবতা সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে ইসলাম তিন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সংক্ষেপে যা নিম্নরূপ: ১. যুদ্ধ ব্যতীত অন্য সকল গোলামীর উৎস বন্ধ করে দিয়েছে। ২. গোলাম আযাদের অনেক দিক বর্ণনা করেছে। ৩. মুক্তির পর তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেছে।
ইসলামী শরিয়ত মুসলিম সম্প্রদায়কে গোলাম আযাদ করার ব্যাপারে সীমাহীন উৎসাহ দিয়েছে এবং পরকালে এর বিনিময়ে প্রতিদানেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “যে ব্যক্তি গোলাম আযাদ করবে, আল্লাহ তায়ালা গোলামের প্রত্যেক অঙ্গের বিনিময়ে আযাদকারীর প্রত্যেক অঙ্গকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন। এমনকি গোলামের গুপ্তাঙ্গের বিনিময়ে তার গুপ্তাঙ্গকেও।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাদী মুক্ত করা এবং তাকে বিবাহ করার ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট করে বলেন- “যে ব্যক্তির বাদী আছে, আর সে তাকে খুব ভালো শিক্ষা দিলো এবং উন্নত আখলাক ও উত্তম শিষ্টাচার শেখালো, এরপর তাকে আযাদ করে বিয়ে করে নিলো; তার জন্য রয়েছে দু’টি প্রতিদান।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সাফিয়া বিনতে হুয়াই বিন আখতাব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আযাদ করে বিবাহ করেছিলেন। আর এই আযাদীটা তার বিবাহের মহর ছিলো।
গোলামদের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহমর্মিতা এবং তাদের ব্যাপারে বিভিন্ন নসীহতই ছিলো সমাজে গোলাম আযাদ হওয়ার মূল চাবিকাঠি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোলামদের সাথে সর্বদা সদ্ব্যবহারের আদেশ দিয়েছেন। এমনকি তাদেরকে ডাকার বেলায়ও সুন্দর নামে ডাকতে বলেছেন। তিনি বলেন- “তোমাদের কেউ যেনো এভাবে না বলে- আমার দাস, আমার দাসী। কেননা, তোমরা প্রত্যেকেই আল্লাহর দাস আর প্রত্যেকেই আল্লাহর দাসী। বরং তোমরা এভাবে বলবে- আমার গোলাম, আমার বাঁদী অথবা আমার সেবক, আমার সেবিকা।”
ইসলাম মালিকের উপর ওয়াজিব করে দিয়েছে- তারা যেনো তাদের গোলামদেরকে ভালো খাবার দেয়, ভালো পোশাক দেয়, আর তাদের সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ তাদেরকে দিয়ে না করায়। হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মালিকদেরকে ভালোভাবে নসীহত করে বলতেন- “তোমরা যা খাও, তাদেরকে তা খাওয়াও। তোমরা যা পরিধান করো, তাদেরকে তা পরিধান করাও। আল্লাহর মাখলুককে তোমরা কষ্ট দিও না।”
এছাড়াও ইসলাম গোলামদেরকে এমন এমন অধিকার দিয়েছে, যার দ্বারা তারা প্রকৃত মানুষের মর্যাদা পেয়েছে; যা কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ইসলাম গোলামকে অনর্থক শাস্তি দেওয়া বা প্রহার করার কারণে শাস্তি নির্ধারণ করেছে-তাদেরকে আযাদ করে দেওয়া। যাতে বাস্তবিক অর্থেই গোলামমুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব হয়। একবার হযরত ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার এক গোলামকে ডাকলেন। তার পিঠে আঘাতের দাগ দেখতে পেয়ে বললেন, তুমি কি এতে ব্যথা অনুভব করছো? সে বললো- না। তখন তিনি গোলামকে বললেন- যাও তুমি আযাদ। এরপর তিনি এক টুকরা মাটি হাতে নিয়ে বললেন- তাকে আযাদ করে আমার এতটুকু পরিমাণ সওয়াবও মেলেনি। কেননা, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে শুনেছি- “যে ব্যক্তি বিনা অপরাধে নিজের গোলামকে শাস্তি দিলো বা প্রহার করলো, তার কাফ্ফারা হলো- গোলামকে আযাদ করে দেওয়া।”
এমনকি ইসলাম গোলাম আযাদকে এতটাই সহজ করে দিয়েছে যে, ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় গোলাম আযাদের শব্দ ব্যবহার দ্বারাই তারা সাথে সাথে আযাদ হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তিনটি বিষয় এমন আছে, যা ইচ্ছা করে বললেও প্রয়োগ হয়, আবার ঠাট্টা করে বললেও প্রয়োগ হয়। সেগুলো হলো- তালাক, বিবাহ আর গোলাম আযাদ।”
অনুরূপভাবে ইসলাম গোলাম আযাদ করাকে গুনাহ মাফের উসিলা বানিয়েছে। যাতে এর মাধ্যমে একটি বৃহৎ সংখ্যক গোলামী থেকে মুক্তি পায়। কেননা, প্রত্যেক বনী আদমই গুনাহ করে থাকে। আর গুনাহ তো অবশ্যই মাফ করাতে হয়। সুতরাং দেখা যাবে গুনাহ মাফের জন্য প্রত্যেকে গোলাম আযাদ করতে থাকলে একসময় সমাজ গোলামমুক্ত হয়ে যাবে। গোলামমুক্তির ফযীলত বর্ণনা করে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “কোনো মুসলমান অন্য কোনো মুসলমানকে আযাদ করলে সে তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় হবে। আযাদকৃত ব্যক্তির প্রত্যেকটি অঙ্গ আযাদকারী ব্যক্তির প্রত্যেকটি অঙ্গ মুক্তির জন্য যথেষ্ট হবে।”
ইসলাম গোলামদেরকে মুকাতাবার মাধ্যমে মুক্তি লাভ করার সুযোগ দিয়েছে। আর মুকাতাবা হলো- “গোলাম তার মালিকের সাথে নির্ধারিত সম্পদের বিনিময়ে মুক্তি লাভের চুক্তি করা।” অর্থাৎ চুক্তিকৃত পরিমাণ সম্পদ যখন সে মালিককে দিতে পারবে, তখন সে আযাদ। এক্ষেত্রে ইসলাম মালিককে আদেশ দিয়েছে- “যদি কোনো গোলাম মুকাতাবার চুক্তি করে, তাহলে সে যেনো এ ব্যাপারে গোলামকে যাবতীয় সাহায্য করে। কেননা, মানুষ হিসেবে সে তো মৌলিকভাবে আযাদ। গোলামী তো পরে কোনো কারণবশত হয়েছে।” স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এর বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তিনি হযরত জুয়াইরিয়া বিনতে হারেসের মুকাতাবার টাকা নিজে আদায়ে করে দিয়ে আযাদ করে দিয়েছিলেন। পরে আবার তাকে বিবাহও করেছিলেন। মুসলমানগণ যখন এই বিবাহের খবর শুনতে পেলো, তখন তারা তাদের কাছে থাকা গোলাম- বাদীনীদেরকেও আযাদ করে দিলো। সাহাবায়ে কেরাম বলেন- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই বিবাহের কারণে বনী মুসতালিকের একশ লোককে আযাদ করে দেওয়া হয়।”
শুধু তাই নয়, ইসলাম গোলাম আযাদ করার জন্য যাকাতের টাকা ব্যয় করারও অনুমতি দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- “নিশ্চয়ই সদকা (যাকাত) হচ্ছে গরীব-মিসকিনদের জন্য, এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, যাদের অন্তর (ইসলামের প্রতি) আকৃষ্ট করা হয়, তাদের জন্য এবং গোলাম আযাদ করার জন্য।”
বর্ণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনে ৬০ জন ব্যক্তিকে আযাদ করেছিলেন। হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা করেছিলেন ৬০ জন। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন অনেকজন। হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন ৭০ জন। হযরত উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন ২০ জন। হযরত হাকীম ইবনে হিযাম রাযিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন ১০০ জন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন ১০০০ জন। হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন ৩০ হাজার জন।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা গোলাম ব্যবসা কমানোর ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। বরং তা পুরোপুরিভাবে বন্ধই করে দিয়েছে। এমনকি ইসলামী যুগের শেষের দিকে ইসলাম গোলামদেরকে গোলামীর শিকলমুক্ত করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষমতা এবং সামরিক বাহিনীর উচ্চপদে আসীন করেছিলো। এর সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো- ইসলামী ইতিহাসে মুসলমানদের বিরাট এক অংশে আযাদকৃত গোলামরা প্রায় তিনশত বছর শাসন করেছে। নিঃসন্দেহে এটি বিশ্বের ইতিহাসে এক বিরল উদাহরণ।
টিকাঃ
১১৪. আবু দাউদ ঈমান, হাদীস নং-৪৬২১ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২০২৩৯
১১৯. যেহার মানে হলো- নিজের স্ত্রীকে নিজের মা বা তার কোনো চিরস্থায়ী গাইর মাহরাম মহিলার কোনো অঙ্গের সাথে সাদৃশ্য দেওয়া।
১০০. উসূল ওয়ালাদাহ বলা হয় ঐ বাদীকে, মালের মালিক কর্তৃক যে কোনো সন্তানের মা হয়।
১০১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং -৬৩০৯ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৫০৯
১০২. একটি প্রতিদান আযাদ করার কারণে। অপরটি বিবাহ করার কারণে।
১০৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৮৯৫
১০৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৩৫৯৯ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৩৬৫
১০৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৫৫২ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২২৪৮
১০৬. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং -১৬৬১ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২২৪৯১
১০৭. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬৫৯ সুনানু আবু দাউদ, হাদীস নং-৫২১৬
১০৮. মুসনাদে হারেস, হাদীস নং-৩০০
১০৯. জামে তিরমিযী, হাদীস নং-১৫৪৬ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৫০৯
১১০. সীরাত ইবনুল হিশাম, ইবনে কাসীর:৩/৫
১১১. সুরা তাওবাহ, আয়াত নং-৬০
📄 ইসলামে মালিকানার স্বাধীনতা
কমিউনিজম ও পুঁজিবাদের মালিকানার স্বাধীনতাঃ কোনো বস্তুর মালিকানা এবং সার্বিক অধিকারের বিষয়ে অতীত বিশ্ব ও বর্তমান বিশ্ব খুবই পেরেশান। আজ পর্যন্ত তারা এ বিষয়ে মীমাংসিত ও সর্বসম্মত কোনো পথ ও পন্থা বের করতে পারেনি। ফলে তৈরি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ আর নানান ধরনের মতামত।
এর মধ্যে একটি হলো- 'কমিউনিজম'। যা ব্যক্তির মূল্য এবং স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণরূপে শেষ করে দেয়। কারণ কমিউনিজমের মূল বক্তব্য হলো- “কোনো ব্যক্তি ভূমি, ফ্যাক্টরি, স্থাবর সম্পদ এবং উৎপাদনশীল কোনো বস্তুরই মালিক হতে পারবে না। বরং ব্যক্তির কাজ হলো, শ্রমিক হিসেবে রাষ্ট্রের কাজ করা। রাষ্ট্রই সকল কিছুর মালিকানা এবং হস্তক্ষেপের পূর্ণ অধিকার রাখে। একজন শ্রমিকের জন্য পুঁজি সংরক্ষণ করা সম্পূর্ণ হারাম। যদিও তা বৈধ উপায়ে হয়।"
অনুরূপ আরেকটি মতবাদ হলো- 'পুঁজিবাদ'। যা একজন ব্যক্তির প্রতি সম্মান রেখে তাকে পূর্ণ মালিকানা এবং স্বাধীনতা দিয়েছে। সে যা ইচ্ছা তা অর্জন করতে পারে। যেভাবে ইচ্ছা তা ব্যয় করতে পারে। মনমতো সম্পদ উপার্জন, সম্পদ বৃদ্ধি এবং সম্পদ ব্যয় করার ব্যাপারে কারও কোনো বাধা নেই। এ ব্যাপারে সমাজেরও হস্তক্ষেপের কোনো অধিকার নেই। ফলে বৈধ-অবৈধ, হালাল-হারাম কোনো কিছু চিন্তা না করেই যার যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই সে সম্পদ উপার্জন করতে থাকে।
ইসলাম ও স্বাধীন মালিকানাঃ ব্যক্তি মালিকানা বৃদ্ধির ব্যাপারে পুঁজিবাদের মূলনীতি; আর ব্যক্তি মালিকানা হ্রাস করার ক্ষেত্রে কমিউনিজমের সংকীর্ণনীতি- এ দুই মতবাদের সকল সুবিধা-অসুবিধা আর ভালো-মন্দের মাঝখানে হলো ইসলামের মধ্যমপন্থা। যা ব্যক্তি মালিকানার সার্বিক কল্যাণকে সম্পূর্ণরূপে সমন্বিত করে। কেননা, ইসলাম অন্যের অধিকার রক্ষা করে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতির ভিত্তিতে ব্যক্তি মালিকানার স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। সাথে সাথে অন্যের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে ব্যক্তি মালিকানাকে হারাম সাব্যস্ত করেছে। আর সেটাকে সামষ্টিক মালিকানায় রূপান্তরিত করেছে। সুতরাং দেখা যায় ইসলাম ভারসাম্যতা আর পরিমিতিবোধ ঠিক রেখে ব্যক্তি মালিকানার স্বাধীনতাকে যেমন নিশ্চিত করেছে; সামষ্টিক মালিকানার স্বাধীনতাকেও নিশ্চিত করেছে।
ইসলামে ব্যক্তি মালিকানাঃ ইসলামে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কোনো বস্তুর মালিকানা লাভ এবং তা থেকে ফায়দা নেয়ার অধিকার একজন ব্যক্তিকে দিয়েছে। কেননা, এটা জীবনের অন্যতম প্রয়োজনীয়তা এবং স্বাধীনতার বৈশিষ্ট্য; বরং তা মানবতার বৈশিষ্ট্য। সাথে সাথে এটা হলো উৎপাদনশীল সমাজ এবং উন্নত রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম হাতিয়ার।
ইসলামী শরিয়ত এই অধিকারকে ইসলামী অর্থনীতির একটি মৌলিক বুনিয়াদ হিসেবে বলে থাকে। এরপর এর ভিত্তিতে আরও অনেক আইন-কানুন ও বিধি-বিধান আরোপ করেছে। যেমন: মালিকের জন্য মাল হেফাজতের বিধান। চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারীর জন্য জরিমানার বিধান। সাথে সাথে মালিকের অধিকার রক্ষা করা এবং অন্যের মালে অন্যায় হস্তক্ষেপ দূর করার জন্য তাদের কঠোর শাস্তির বিধান। অনুরূপভাবে এই অধিকারের উপর ভিত্তি করে ইসলাম আরও কিছু বিধি-বিধান দিয়েছে। যেমন: নিজের মাল ক্রয়-বিক্রয়, ভাড়া, বন্ধক, দান, ওসিয়ত ইত্যাদি সব বৈধ লেনদেনে পূর্ণ স্বাধীনতা।
এতদসত্ত্বেও ইসলাম ব্যক্তি মালিকানাকে একেবারে অবাধ স্বাধীনতা দিয়ে দেয়নি; বরং এতটুকু শর্ত সাপেক্ষে দিয়েছে, যাতে কোনোভাবে অন্যের অধিকারের বিন্দুমাত্র খর্ব না হয়। এজন্য ইসলামে সুদ, ঘুষ, ধোকা এবং মজুদদারি ইত্যাদি- যা সামষ্টিক কল্যাণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক; সেগুলোকে নিষেধ করা হয়েছে। ব্যক্তি মালিকানার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে পুরুষ-মহিলা সবাই সমান। এ বিষয়ে তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন- “পুরুষরা যা উপার্জন করবে তা তাদের, আর মহিলারা যা উপার্জন করবে তা তাদের।”
ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- যার কাছে সম্পদ আছে, সে এই সম্পদকে কাজে লাগাবে। কেননা, যদি সম্পদ কাজে না লাগায়, তাহলে এই সম্পদ দ্বারা মালিকের কোনো ফায়দা হয় না। সমাজও এর দ্বারা কোনো লাভবান হয় না। সম্পদ কাজে লাগানোর পর যখন সম্পদ বৃদ্ধি পেয়ে নেসাব (যতটুকু হলে যাকাত ওয়াজিব হয়) পরিমাণ হবে এবং তা এক বছর অতিক্রান্ত হবে, তখন এই সম্পদের যাকাত দিতে হবে।
ইসলামে সামষ্টিক মালিকানাঃ ইসলামে সামষ্টিক মালিকানা এমন একটি বিষয়, মানব সমাজের বিরাট এক অংশ যার উপর অধিকার রাখে। আর সমাজের প্রত্যেক মানুষের জন্য এর ফায়দা ব্যাপক হয়। সমাজের একজন সদস্য হিসেবে প্রত্যেকেই এর ফায়দা ভোগ করতে পারে। কারও একক কর্তৃত্ব এখানে চলে না। যেমন: মসজিদ, সরকারি হাসপাতাল, রাস্তা, নদ-নদী, সাগর ইত্যাদি। এগুলোর মালিকানা সামষ্টিক। সমাজের সবার কল্যাণেই এগুলো ব্যবহার হবে। সরকার বা সরকারি প্রতিনিধির একক অধিকার এসব ক্ষেত্রে চলে না; বরং তারা এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল হিসেবে থাকতে পারে এবং এগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে। যাতে সমাজের প্রত্যেক সদস্য এখান থেকে উপকৃত হতে পারে।
ব্যক্তি মালিকানার উৎসসমূহঃ ব্যক্তি মালিকানা অর্জনের জন্য ইসলাম কিছু পথ ও পন্থা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। এ ছাড়া অন্য পন্থায় মালিকানা অর্জন করা বৈধ নয়। ইসলামে ব্যক্তি মালিকানা অর্জনের যেসব উৎস রয়েছে, সেগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম উৎস: নিজের মালিকানাধীন সম্পদ। অর্থাৎ যা কোনো ব্যক্তির নিজস্ব মালিকানায় আসে। যেমন: মিরাস, ওসিয়ত, ক্রয়-বিক্রয়, দান, সদকা ইত্যাদি। দ্বিতীয় উৎস: বৈধ পন্থায় অর্জিত সম্পদ। অর্থাৎ যা পূর্ব্বে কোনো ব্যক্তির মালিকানায় থাকে না, বরং সে কোনো কাজের মাধ্যমে তার মালিকানা অর্জন করে। যেমন: পতিত জমি চাষ করা, শিকার করা, জমিন থেকে কোনো পরিত্যক্ত সম্পদ পাওয়া এবং সরকারের পক্ষ থেকে কোনো জায়গা পাওয়া ইত্যাদি।
সামষ্টিক মালিকানার উৎসসমূহঃ ইসলামে সামষ্টিক মালিকানার কয়েকটি উৎস রয়েছে। এর মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো: প্রথম উৎস: সাধারণ প্রাকৃতিক সম্পদ। রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষ কোনো রকম কাজকর্ম না করেও এগুলো ভোগ করার পূর্ণ অধিকার রাখে। যেমন- পানি, ঘাস, আগুন ইত্যাদি। দ্বিতীয় উৎস: সংরক্ষিত বিভিন্ন স্থান ও সম্পদ। রাষ্ট্র যেগুলোকে মুসলমান এবং জনসাধারণের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করে রাখে। যেমন- কবরস্থান, ওয়াকফকৃত জমি, যাকাত, সরকারি বিভিন্ন বিভাগ ইত্যাদি। তৃতীয় উৎস: ঐ সকল জায়গা, যেগুলাে কারও মালিকানাধীন না। দীর্ঘকাল যাবত এভাবেই পড়ে আছে। কেউ তাতে হস্তক্ষেপ করেনি। যেমন- পতিত জমি।
সম্পদের হেফাজতের জন্য আল্লাহ তাআলা সম্পদকে ঠিকমতোন দেখাশোনা ও সংরক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সাথে সাথে অন্যের স্বাধীন মালিকানায় অন্যায় হস্তক্ষেপকারীদের জন্য ইসলামী শরিয়ত বিভিন্ন শাস্তির ব্যবস্থাও রেখেছে। যেমন- চোরের জন্য হাত কাটা।
অবৈধ মালিকানাঃ মালিকানা অর্জন করতে হবে হালাল এবং বৈধ পন্থায়। অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ নেয়া বৈধ নয়। সুতরাং এতিমদেরকে ধোকা দিয়ে তাদের সম্পদ আত্মসাৎ করা যাবে না। গরিবের দরিদ্রতার সুযোগ নিয়ে তার সম্পদ কেড়ে নেওয়া যাবে না। অভাবীদের অভাব পূরণ করতে গিয়ে তার থেকে সুদ নেয়া যাবে না। জুয়া খেলা যাবে না। কেননা, এটা সমাজে মানুষের মাঝে শত্রুতা তৈরি করে এবং সমাজে ঐক্য নষ্ট করে পরস্পরের মাঝে দূরত্ব তৈরি করে। এজন্য আল্লাহ তাআলা বলেন- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ খেয়ো না। তবে পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা।”
যদি কেউ অবৈধ এবং নাজায়েয পন্থায় সম্পদ অর্জন করে, তাহলে ইসলাম তার এই সম্পদকে স্বীকৃতি দেয় না এবং এই সম্পদ সংরক্ষণও করতে বলে না। বরং তাকে এই আদেশ করে যে, সে যেন এই সম্পদ তার আসল মালিকের নিকট পৌঁছে দেয়। যেমন: চুরিষ্কৃত সম্পদ বা ছিনতাইকৃত সম্পদ। এগুলোর ক্ষেত্রে হুকুম হলো- এই সম্পদকে তার মালিকের নিকট পৌঁছে দিবে। যদি মালিক পাওয়া না যায়, তাহলে বাইতুল মাল তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিবে।
সম্পদ বৃদ্ধির জন্য ইসলাম বিভিন্ন পদ্ধতি ও বৈধ লেনদেন নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। এ পদ্ধতিগুলো ছাড়া অন্য কোনো হারাম পন্থায় লেনদেন করে সম্পদ বৃদ্ধি করা ইসলাম একদম সমর্থন করে না। যেমন: সুদের ভিত্তিতে লেনদেন করা, মদ বিক্রি করা, নেশাদ্রব্য বিক্রি করা, জুয়ার ক্লাব খোলা ইত্যাদি। সাথে সাথে ইসলাম প্রত্যেককে ব্যক্তি মালিকানার নির্দিষ্ট একটা অংশ সমাজের কল্যাণে ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছে। যেমন: যাকাত, দান, সদকা এবং এবং সামাজিক বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে অর্থ ব্যয় করা। ওয়ারিসদের সম্পদের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে সম্পদের এক তৃতীয়াংশের বেশি ওসিয়ত করতে নিষেধ করেছে ইসলাম। অনুরূপভাবে ইসলাম মানুষকে ভারসাম্য বজায় রেখে ব্যয় করার প্রতি উৎসাহ দিয়েছে। আর অপচয়-অপব্যয় থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপচয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না; বরং মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে।” তিনি আরও বলেন- “তোমরা খাও, পান করো তবে অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়কারীদের পছন্দ করেন না।”
ইসলামী শরীয়ত যেসব বিষয়কে হারাম বা নিষিদ্ধ করেছে, সেসব ক্ষেত্রে টাকা ব্যয় করাকেও হারাম করে দিয়েছে। কিন্তু প্রয়োজন হলে জনস্বার্থে নিজের সম্পদের অধিকার ছেড়ে দেওয়াকে বৈধ করা হয়েছে। যদিও এতে মালিকের কিছু ক্ষয়-ক্ষতি হয়। যেমন: জনসাধারণের চলাচলের জন্য নিজের জমি ছেড়ে দেওয়া।
অমুসলিমদের মালিকানা: এটা এমন এক অধিকার, যার ফলে ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী মুসলিম-অমুসলিম প্রত্যেক ব্যক্তিই এর ফায়দা ভোগ করে। তারা যত পারে তত বেশি সম্পদ অর্জন করতে পারে। এর একটি বাস্তব নমুনা- “১০ম শতাব্দীর খলিফার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিল এক খৃষ্টান- জিবরাইল ইবনে বখতিশো। খলীফা তাকে অনেক মুহাব্বত করতেন। সে পোষাক-পরিচ্ছদ, চালচলন আর ধন-সম্পদে ছিলো খলীফার সমতুল্য।” সর্বসাধারণের জন্য যে ব্যয় বা বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেখান থেকেও অমুসলিমরা উপকৃত হয়।
এই হলো ইসলামে স্বাধীন মালিকানার অধিকার। যা মুসলিম-অমুসলিম, ধনী-গরিব সবাইকেই দেয়া হয়েছে। তবে শর্ত হলো- নিজের অধিকার আদায় করতে গিয়ে জনসাধারনের অধিকারে কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আর অন্য কোনো ব্যক্তির অধিকারও বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
টিকাঃ
১৪২. সুরা নিসা, আয়াত নং-৩২
১৪৩. সুরা নিসা, আয়াত নং-২৯
১৪৪. সুরা ফুরকান, আয়াত নং-৬৭
১৪৫. সূরা আরাফ, আয়াত নং-৩১
১৪৬. 'মিন রজবায়ে' রাজারাতিনা-৬৯
📄 ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও কর্তব্য
ভূমিকা: একেকটি মুসলিম পরিবার হলো মুসলিম সমাজের একেকটি ইটের মত। বরং তা সমাজের দুর্গ বা কেন্দ্র। এবং শান্তি ও নিরাপত্তার মূলকেন্দ্র। ইসলাম পরিবার রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পরিবারের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-নীতিও দিয়েছে। যেখানে প্রত্যেকের অধিকার এবং কর্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, স্ত্রীর ভরণ-পোষণ, মীমাংসা, সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষা, পিতা-মাতা অধিকার ইত্যাদি সবই বলে দেয়া হয়েছে ইসলামী আইনে। অনুরূপভাবে পরস্পরে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা-ভক্তি, স্নেহ-মমতা কেমন হওয়া উচিৎ তাও বলা হয়েছে।
কেননা, একটি পরিবার যখন শক্তিশালী হয় এবং এর প্রত্যেকটি সদস্য সঠিক পথে চলে, তখন একটি সমাজ শক্তিশালী হয় এবং তা সঠিক পথে চলতে থাকে। আর এভাবে প্রত্যেক সদস্যের মাঝে উন্নত মানবতা আর সামাজিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই ইসলাম আদর্শ ও উন্নত সমাজ গঠনে সক্ষম হয়, যার কোনো তুলনা হয় না। আর সমাজ মুক্তি পায় চারিত্রিক অধঃপতন এবং পরিবার ধ্বংসের অন্তত পরিণতি থেকে।
ইসলামী সভ্যতায় পরিবারের ভিত্তি: ইসলামী সভ্যতায় একটি পরিবার গঠন হয় দু’টি মৌলিক স্তম্ভের উপর- পুরুষ এবং মহিলা। অর্থাৎ স্বামী এবং স্ত্রী। এদের মাধ্যমে একটি পরিবার গঠন হয়, মানবসন্তান জন্ম হয় এবং মানবজনমের ধারাবাহিকতাও চালু থাকে। এখান থেকেই একসময় একটি জাতি ও সমাজ তৈরি হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন- “হে মানব সকল! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফস থেকে। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী।” তিনি আরও বলেন- “আল্লাহ তাআলা তোমাদের থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, আর তোমাদের জোড়া থেকে তোমাদের পুত্র ও নাতী সৃষ্টি করেছেন। আর তোমাদেরকে দিয়েছেন পবিত্র রিযিক।”
এই দু’টি ভিত্তি মজবুত করার জন্য ইসলামও অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে স্বামী-স্ত্রী সংক্রান্ত বহু আইন-কানুন দিয়েছে ইসলাম। নির্দিষ্ট করে দিয়েছে তাদের পরস্পরের সীমারেখা। নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রত্যেকের দায়িত্ব-কর্তব্য। যাতে সুন্দর পরিবার গঠনে প্রত্যেকে আপন আপন কর্তব্য পরিপূর্ণভাবে পালন করতে পারে। আর আদর্শ একটি মানব সমাজ গঠনে প্রত্যেকেই যথেষ্ট অবদান রাখতে পারে।
ইসলামের নিয়ম হলো- আগে আগে বিবাহ করা। যাতে মানব সম্প্রদায় টিকে থাকে। সব লোক দ্বারা সমাজ গঠন সহজ হয়। প্রতিটি ব্যক্তি এবং সমাজ থেকে দুশ্চরিত্র ও অনৈতিকতা দূর হয়ে যায়। আর তারা যাতে খলিফার চাহিদা পূরণ করে ইসলামী খেলাফতকে মজবুত ও শক্তিশালী করতে পারে। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবকদেরকে লক্ষ্য করে বলেন- “হে যুব সমাজ! তোমাদের মধ্যে যে দাম্পত্য জীবন গড়তে সক্ষম, সে যেনো বিবাহ করে। কারণ তা (বিবাহ) দৃষ্টিকে নিচু করে এবং লজ্জাস্থানকে সুরক্ষিত করে। আর যে সক্ষম নয়, সে যেনো রোজা রাখে। কেননা, এটা তার জন্য যৌনকামনা দমনকারী।”
এরপর কিছু যুবক যখন চিন্তা করলো, তারা বিবাহ করবে না; বরং পুরোটা জীবন আল্লাহ তাআলার ইবাদাতে কাটাবে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে কঠিনভাবে এটা করতে নিষেধ করে দিলেন। এ সম্পর্কে হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি ঘটনা বর্ণনা করেন- “একবার তিনজন ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীদের নিকট এসে তাঁর ইবাদাত সম্পর্কে জানতে চাইলো। যখন তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইবাদাত সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা এটাকে কম মনে করলো। আর বললো- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে আমাদের তুলনা চলবে না। কেননা, তাঁর পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্যে একজন বললো- আমি সারা জীবন রাতভর নামাজ পড়তে থাকবো। আরেকজন বললো- আমি সবসময় রোজা রাখবো কখনো ছাড়বো না। আরেকজন বললো- আমি নারীসঙ্গ ত্যাগ করবো, কখনোও বিবাহ করবো না। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে এসে বললেন- তোমরাই কি ঐসব লোক, যারা এমন এমন কথা বলেছো? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং আমি তোমাদের চেয়ে বেশি তাঁর প্রতি অনুগতও। অথচ আমি রোজা রাখি, আবার কখনোও রাখি না। নফল নামাজ কখনওও পড়ি, কখনও ঘুমাই। আবার আমি মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং বিবাহ করা আমার সুন্নাত। যারা আমার সুন্নাতের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে, তারা আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
আধুনিক যুগে বৈরাগ্যবাদঃ যারা বিবাহকে ভয় পেত এবং মানুষকে বিবাহ করতে নিষেধ করতো, কিছুটা চিন্তা-ফারত করার পর এখন তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে। এমনকি আধুনিক ইউরোপিয়ান বুদ্ধিজীবীরা যখন দেখতে পেলো- বৈরাগ্যবাদের মাধ্যমে সমাজে শুধু অনৈতিকতা আর অনিষ্ঠতাই ছড়িয়েছে। ভালো কিছু হচ্ছে না। তখন ১৮ শতাব্দীর অভিজ্ঞতার পর এসে অশান্তি আর অনৈতিকতা থেকে মুক্তির জন্য এখন বৈরাগ্যবাদকে তারাও নিষেধ করছে। কেননা, বৈরাগী পুরোহিত ও পাদ্রীদের দ্বারা খারাপ প্রভাব পরিশেষে ধর্মিত হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকাতেও বিষয়টা ব্যাপকাকার ধারণ করেছে। এমনকি এই প্রভাবে শত শত পুরোহিত ও পাদ্রী পদত্যাগ পর্যন্ত করেছে। এই যৌনবিষয়টি এবং নৈতিক পদস্খলনের ভয়াবহতা গির্জাগুলোকে বিচলিত ও আতঙ্কিত করে তুলেছে। পক্ষান্তরে আমাদের পবিত্র ধর্ম আমাদেরকে এসব থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি দিয়েছে। আমাদেরকে দুঃখজনক অভিজ্ঞতা আর তিক্ত ব্যথা থেকে মুক্তি দিয়েছে।
বিবাহের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যঃ ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য হলো, নিজের ভেতরে থাকা সুপ্ত আবেগ-অনুভূতিকে যথাযথ স্থানে কাজে লাগানোর মাধ্যমে আন্তরিক প্রশান্তি লাভ করা। বিবাহ হলো, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। যেখানে একজন অপরজনের কাছে সুখ পায়। একাধিক মূহুর্তে হয় একে অপরের একদম ঘনিষ্ঠ-অন্তরঙ্গ। আর দূর থেকে হয় একে অপরের কল্যাণকামী বন্ধু। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তার অন্যতম একটি নিদর্শন হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্যে হইতেই স্ত্রী-এর সৃষ্টি করেছেন। যাতে তোমরা তাদের কাছে গিয়ে প্রশান্তি লাভ করতে পারো। আর তিনি তোমাদের মাঝে দিয়েছেন ভালোবাসা ও দয়া।” উক্ত আয়াতে বর্ণিত এই তিনটি বিষয় তথা- প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার মাধ্যমেই বৈবাহিক সুখ-শান্তি অর্জিত হয়, যা ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য।
ইসলামে দম্পত্তি নির্বাচনের মানদণ্ডঃ ইসলাম ছেলেমেয়ে উভয়কে এই এখতিয়ার দিয়েছে যে, তারা উভয়ে উভয়ের জন্য নিজেদের পছন্দমত সঙ্গী বেছে নেবে। আল্লাহু তাআলা বলেন- “আর তোমরা তোমাদের অবিবাহিত নারী-পুরুষ এবং সৎকর্মশীল দাস-দাসীদের বিবাহ দাও।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেলেদেরকে পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ৪টি জিনিসকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন- “বিবাহের ক্ষেত্রে সাধারণত মেয়ের চারটি জিনিস লক্ষ্য করা হয়। যেমন-সম্পদ, বংশীয় আভিজাত্য, রূপ-গুন ও দ্বীনদারী। যদি তুমি দ্বীনদার মেয়ে পেয়ে যাও, তাহলে তাকেই প্রাধান্য দাও। যদি তা না করো, তাহলে তুমি হতভাগা।” অনুরূপভাবে তিনি মেয়েদেরকে পাত্র নির্বাচন করার ক্ষেত্রে দ্বীনদারী এবং আখলাকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন- “তোমরা যে ব্যক্তির দ্বীনদারী এবং নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছো, সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তার কাছে বিয়ে দিয়ে দাও। যদি এমন না করো, তাহলে পৃথিবীতে ফেতনা-ফাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।”
নিঃসন্দেহে ছেলেমেয়ের এই অধিকারটা সমাজে অনেক কল্যাণ বয়ে আনে। কেননা, এই নেককার স্বামী-স্ত্রী থেকেই তো নেককার ছেলেমেয়েদের বংশ বিস্তার হবে। যারা পারিবারিকভাবে পরস্পরকে ভালোবাসা ও মুহাব্বতের সাথে থাকবে। আর সমাজে ইসলামী নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ঠিক রেখে চলবে।
ইসলামী পরিমণ্ডলে বৈবাহিক সম্পর্কঃ ইসলামে বৈবাহিক সম্পর্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্ক। এই সম্পর্কের আগে কিছু ভূমিকা পালন করতে হয়। যা এই সম্পর্কের পথকে সুগম করে এবং সম্পর্ককে স্থায়ী ও চিরস্থায়ী করে। ইসলাম এই সম্পর্কের ভূমিকাকেই যে গুরুত্ব দিয়েছে, অন্যকোনো সম্পর্ককেও এতোটা গুরুত্ব দেয়নি। এমনকি এর জন্য বিশেষ কিছু বিধানও দিয়েছে ইসলাম। বৈবাহিক সম্পর্কের ভূমিকা হলো- বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া। এটা একে অপরকে চেনা এবং জানার প্রাথমিক পর্যায়। এ পর্যায়ে ছেলেমেয়ে উভয় পক্ষই একে অপরকে ভালোভাবে বুঝার অনুমতি দিয়ে থাকে। আর এই চেনা-জানার ভিত্তিতেই দুই পক্ষ এই বৈবাহিক সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া বা এখান থেকে সরে আসার ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
অনুরূপভাবে বৈবাহিক সম্পর্ক গ্রহণীয় হওয়ার জন্য একটি শর্ত হলো- অবশ্যই তা প্রচার করা। এর রহস্য হলো- ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এর মাধ্যমে দ্বীনি ও দুনিয়াবি অনেক কল্যাণ লাভ হয়। সুতরাং এটা প্রকাশ্যে এবং সবাইকে জানিয়ে করাই উচিত। যাতে কারও মনে কোনো খারাপ ধারণা এবং সন্দেহ না থাকে।
ইসলাম বৈবাহিক সম্পর্ককে একটি মজবুত রশি দিয়ে বেঁধেছে। যাতে স্বামী-স্ত্রী দু’জনই সুখে থাকে। আর দুই পরিবারের মাঝে শান্তি বজায় থাকে। এজন্য ইসলাম সর্বক্ষেত্রে স্বামীদের স্ত্রীদের অভিভাবক বানিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- “পুরুষরা নারীদের অভিভাবক। কেননা, আল্লাহ তাআলা তাদের এক রূপের ওপর অপরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। আর তারা নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে।"
এই অভিভাবকত্বের কারণেই ইসলাম স্বামীর ওপর মহর ওয়াজিব করেছে। আর এটাকে বানিয়েছে স্ত্রীর অধিকার। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মহর দিয়ে দাও। স্ত্রীদের আরেকটি অধিকার হলো- তাদের ভরণপোষণ অর্থাৎ প্রয়োজনীয় খাবার, কাপড়, বাসস্থান ও চিকিৎসা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। সাথে সাথে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তোমরা তাদের সাথে সৎ ভাবে বসবাস করো। যদি তোমরা তাদের অপছন্দ করো, তাহলে হয়তো তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছো, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন। "
পক্ষান্তরে ইসলাম স্বামীদেরকেও কিছু অধিকার দিয়েছে স্ত্রীদের উপর। তা হলো- স্বামীর আনুগত্য করা। বৈবাহিক জীবনে এটা হলো স্বামীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। ইসলাম স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই কিছু অধিকার এবং দায়িত্ব দিয়েছে। যার যার দায়িত্ব সে সে পালন করবে। ইসলাম তাদের থেকে এটাই কামনা করে যে- তারা পরস্পরে ভদ্র ও সংহত আচরণ করবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একে অপরের সহায়তা করবে। যদি কখনও তাদের মাঝে মতবিরোধ, ঝগড়া বা কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে সেক্ষেত্রে ইসলাম তা নিরসনের বিভিন্ন পথ ও পন্থা বলে দিয়েছে। যদি তাদের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তারা আর কিছুতেই আল্লাহ প্রদত্ত সীমারেখা রক্ষা করতে পারছে না; আর স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তাদের একত্রে থাকা সম্ভব হচ্ছে না, তখন ইসলাম তাদেরকে সর্বশেষ চিকিৎসা হিসেবে তালাক বা বিচ্ছেদের ব্যবস্থা দিয়েছে। যাতে তারা একে অপর থেকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা হয়ে যেতে পারে।
টিকাঃ
১৪৭. সূরা নিসা, আয়াত নং-১
১৪৮. সূরা নাহল, আয়াত নং-৭২
১৪৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৬৬৯ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪০০
১৫০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৬৭৭ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪০১
১৫১. রূহুল ইনসান ফীল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ: ২৩৪
১৫২. সূরা রূম, আয়াত নং-২১
১৫৩. সূরা নূর, আয়াত নং-৩২
১৫৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৮০২ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৬৬
১২৫৩. জামে তিরমিযী, হাদীস নং- ১০০১ সুনানু ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৮৬৯
১২৫৪. সুরা নিসা, আয়াত নং-৩৪
১২৫৫. সুরা নিসা, আয়াত নং-৪
১২৫৬. সুরা নিসা, আয়াত নং-১৯
ভূমিকা: একেকটি মুসলিম পরিবার হলো মুসলিম সমাজের একেকটি ইটের মত। বরং তা সমাজের দুর্গ বা কেন্দ্র এবং শান্তি ও নিরাপত্তার মূলকেন্দ্র। ইসলাম পরিবার রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পরিবারের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-নীতিও দিয়েছে। যেখানে প্রত্যেকের অধিকার এবং কর্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, স্ত্রীর ভরণ-পোষণ, মীমাংসা, সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষা, পিতা-মাতা অধিকার ইত্যাদি সবই বলে দেয়া হয়েছে ইসলামী আইনে। অনুরূপভাবে পরস্পরে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা-ভক্তি, স্নেহ-মমতা কেমন হওয়া উচিৎ তাও বলা হয়েছে।
কেননা, একটি পরিবার যখন শক্তিশালী হয় এবং এর প্রত্যেকটি সদস্য সঠিক পথে চলে, তখন একটি সমাজ শক্তিশালী হয় এবং তা সঠিক পথে চলতে থাকে। আর এভাবে প্রত্যেক সদস্যের মাঝে উন্নত মানবতা আর সামাজিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই ইসলাম আদর্শ ও উন্নত সমাজ গঠনে সক্ষম হয়, যার কোনো তুলনা হয় না। আর সমাজ মুক্তি পায় চারিত্রিক অধঃপতন এবং পরিবার ধ্বংসের অন্তত পরিণতি থেকে।
ইসলামী সভ্যতায় পরিবারের ভিত্তি: ইসলামী সভ্যতায় একটি পরিবার গঠন হয় দু’টি মৌলিক স্তম্ভের উপর- পুরুষ এবং মহিলা। অর্থাৎ স্বামী এবং স্ত্রী। এদের মাধ্যমে একটি পরিবার গঠন হয়, মানবসন্তান জন্ম হয় এবং মানবজনমের ধারাবাহিকতাও চালু থাকে। এখান থেকেই একসময় একটি জাতি ও সমাজ তৈরি হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন- “হে মানব সকল! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফস থেকে। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী।”১৪৭
তিনি আরও বলেন- “আল্লাহ তাআলা তোমাদের থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, আর তোমাদের জোড়া থেকে তোমাদের পুত্র ও নাতী সৃষ্টি করেছেন। আর তোমাদেরকে দিয়েছেন পবিত্র রিযিক।”১৪৮
এই দু’টি ভিত্তি মজবুত করার জন্য ইসলামও অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে স্বামী-স্ত্রী সংক্রান্ত বহু আইন-কানুন দিয়েছে ইসলাম। নির্দিষ্ট করে দিয়েছে তাদের পরস্পরের সীমারেখা। নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রত্যেকের দায়িত্ব-কর্তব্য। যাতে সুন্দর পরিবার গঠনে প্রত্যেকে আপন আপন কর্তব্য পরিপূর্ণভাবে পালন করতে পারে। আর আদর্শ একটি মানব সমাজ গঠনে প্রত্যেকেই যথেষ্ট অবদান রাখতে পারে।
ইসলামের নিয়ম হলো- আগে আগে বিবাহ করা। যাতে মানব সম্প্রদায় টিকে থাকে। সব লোক দ্বারা সমাজ গঠন সহজ হয়। প্রতিটি ব্যক্তি এবং সমাজ থেকে দুশ্চরিত্র ও অনৈতিকতা দূর হয়ে যায়। আর তারা যাতে খলিফার চাহিদা পূরণ করে ইসলামী খেলাফতকে মজবুত ও শক্তিশালী করতে পারে। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবকদেরকে লক্ষ্য করে বলেন- “হে যুব সমাজ! তোমাদের মধ্যে যে দাম্পত্য জীবন গড়তে সক্ষম, সে যেনো বিবাহ করে। কারণ তা (বিবাহ) দৃষ্টিকে নিচু করে এবং লজ্জাস্থানকে সুরক্ষিত করে। আর যে সক্ষম নয়, সে যেনো রোজা রাখে। কেননা, এটা তার জন্য যৌনকামনা দমনকারী।”১৪৯
এরপর কিছু যুবক যখন চিন্তা করলো, তারা বিবাহ করবে না; বরং পুরোটা জীবন আল্লাহ তাআলার ইবাদাতে কাটাবে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে কঠিনভাবে এটা করতে নিষেধ করে দিলেন। এ সম্পর্কে হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি ঘটনা বর্ণনা করেন- “একবার তিনজন ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীদের নিকট এসে তাঁর ইবাদাত সম্পর্কে জানতে চাইলো। যখন তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইবাদাত সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা এটাকে কম মনে করলো। আর বললো- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে আমাদের তুলনা চলবে না। কেননা, তাঁর পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্যে একজন বললো- আমি সারা জীবন রাতভর নামাজ পড়তে থাকবো। আরেকজন বললো- আমি সবসময় রোজা রাখবো কখনো ছাড়বো না। আরেকজন বললো- আমি নারীসঙ্গ ত্যাগ করবো, কখনোও বিবাহ করবো না। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে এসে বললেন- তোমরাই কি ঐসব লোক, যারা এমন এমন কথা বলেছো? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং আমি তোমাদের চেয়ে বেশি তাঁর প্রতি অনুগতও। অথচ আমি রোজা রাখি, আবার কখনোও রাখি না। নফল নামাজ কখনওও পড়ি, কখনও ঘুমাই। আবার আমি মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং বিবাহ করা আমার সুন্নাত। যারা আমার সুন্নাতের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে, তারা আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।”১৫০
আধুনিক যুগে বৈরাগ্যবাদঃ যারা বিবাহকে ভয় পেত এবং মানুষকে বিবাহ করতে নিষেধ করতো, কিছুটা চিন্তা-ভাবনা করার পর এখন তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে। এমনকি আধুনিক ইউরোপিয়ান বুদ্ধিজীবীরা যখন দেখতে পেলো- বৈরাগ্যবাদের মাধ্যমে সমাজে শুধু অনৈতিকতা আর অনিষ্ঠতাই ছড়িয়েছে। ভালো কিছু হচ্ছে না। তখন ১৮ শতাব্দীর অভিজ্ঞতার পর এসে অশান্তি আর অনৈতিকতা থেকে মুক্তির জন্য এখন বৈরাগ্যবাদকে তারাও নিষেধ করছে। কেননা, বৈরাগী পুরোহিত ও পাদ্রীদের দ্বারা খারাপ প্রভাব পরিশেষে ধর্মিত হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকাতেও বিষয়টা ব্যাপকাকার ধারণ করেছে। এমনকি এই প্রভাবে শত শত পুরোহিত ও পাদ্রী পদত্যাগ পর্যন্ত করেছে। এই যৌনবিষয়টি এবং নৈতিক পদস্খলনের ভয়াবহতা গির্জাগুলোকে বিচলিত ও আতঙ্কিত করে তুলেছে। পক্ষান্তরে আমাদের পবিত্র ধর্ম আমাদেরকে এসব থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি দিয়েছে। আমাদেরকে দুঃখজনক অভিজ্ঞতা আর তিক্ত ব্যথা থেকে মুক্তি দিয়েছে।১৫১
বিবাহের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যঃ ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য হলো, নিজের ভেতরে থাকা সুপ্ত আবেগ-অনুভূতিকে যথাযথ স্থানে কাজে লাগানোর মাধ্যমে আন্তরিক প্রশান্তি লাভ করা। বিবাহ হলো, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। যেখানে একজন অপরজনের কাছে সুখ পায়। একাধিক মূহুর্তে হয় একে অপরের একদম ঘনিষ্ঠ-অন্তরঙ্গ। আর দূর থেকে হয় একে অপরের কল্যাণকামী বন্ধু। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তার অন্যতম একটি নিদর্শন হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্যে হইতেই স্ত্রী-এর সৃষ্টি করেছেন। যাতে তোমরা তাদের কাছে গিয়ে প্রশান্তি লাভ করতে পারো। আর তিনি তোমাদের মাঝে দিয়েছেন ভালোবাসা ও দয়া।”১৫২
উক্ত আয়াতে বর্ণিত এই তিনটি বিষয় তথা- প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার মাধ্যমেই বৈবাহিক সুখ-শান্তি অর্জিত হয়, যা ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য।
ইসলামে দম্পত্তি নির্বাচনের মানদণ্ডঃ ইসলাম ছেলেমেয়ে উভয়কে এই এখতিয়ার দিয়েছে যে, তারা উভয়ে উভয়ের জন্য নিজেদের পছন্দমত সঙ্গী বেছে নেবে। আল্লাহু তাআলা বলেন- “আর তোমরা তোমাদের অবিবাহিত নারী-পুরুষ এবং সৎকর্মশীল দাস-দাসীদের বিবাহ দাও।”১৫৩
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেলেদেরকে পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ৪টি জিনিসকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন- “বিবাহের ক্ষেত্রে সাধারণত মেয়ের চারটি জিনিস লক্ষ্য করা হয়। যেমন-সম্পদ, বংশীয় আভিজাত্য, রূপ-গুন ও দ্বীনদারী। যদি তুমি দ্বীনদার মেয়ে পেয়ে যাও, তাহলে তাকেই প্রাধান্য দাও। যদি তা না করো, তাহলে তুমি হতভাগা।”১৫৪
অনুরূপভাবে তিনি মেয়েদেরকে পাত্র নির্বাচন করার ক্ষেত্রে দ্বীনদারী এবং আখলাকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন- “তোমরা যে ব্যক্তির দ্বীনদারী এবং নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছো, সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তার কাছে বিয়ে দিয়ে দাও। যদি এমন না করো, তাহলে পৃথিবীতে ফেতনা-ফাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।”১২৫৩
নিঃসন্দেহে ছেলেমেয়ের এই অধিকারটা সমাজে অনেক কল্যাণ বয়ে আনে। কেননা, এই নেককার স্বামী-স্ত্রী থেকেই তো নেককার ছেলেমেয়েদের বংশ বিস্তার হবে। যারা পারিবারিকভাবে পরস্পরকে ভালোবাসা ও মুহাব্বতের সাথে থাকবে। আর সমাজে ইসলামী নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ঠিক রেখে চলবে।
ইসলামী পরিমণ্ডলে বৈবাহিক সম্পর্কঃ ইসলামে বৈবাহিক সম্পর্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্ক। এই সম্পর্কের আগে কিছু ভূমিকা পালন করতে হয়। যা এই সম্পর্কের পথকে সুগম করে এবং সম্পর্ককে স্থায়ী ও চিরস্থায়ী করে। ইসলাম এই সম্পর্কের ভূমিকাকেই যে গুরুত্ব দিয়েছে, অন্যকোনো সম্পর্ককেও এতোটা গুরুত্ব দেয়নি। এমনকি এর জন্য বিশেষ কিছু বিধানও দিয়েছে ইসলাম। বৈবাহিক সম্পর্কের ভূমিকা হলো- বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া। এটা একে অপরকে চেনা এবং জানার প্রাথমিক পর্যায়। এ পর্যায়ে ছেলেমেয়ে উভয় পক্ষই একে অপরকে ভালোভাবে বুঝার অনুমতি দিয়ে থাকে। আর এই চেনা-জানার ভিত্তিতেই দুই পক্ষ এই বৈবাহিক সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া বা এখান থেকে সরে আসার ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অনুরূপভাবে বৈবাহিক সম্পর্ক গ্রহণীয় হওয়ার জন্য একটি শর্ত হলো- অবশ্যই তা প্রচার করা। এর রহস্য হলো- ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এর মাধ্যমে দ্বীনি ও দুনিয়াবি অনেক কল্যাণ লাভ হয়। সুতরাং এটা প্রকাশ্যে এবং সবাইকে জানিয়ে করাই উচিত। যাতে কারও মনে কোনো খারাপ ধারণা এবং সন্দেহ না থাকে।
ইসলাম বৈবাহিক সম্পর্ককে একটি মজবুত রশি দিয়ে বেঁধেছে। যাতে স্বামী-স্ত্রী দু’জনই সুখে থাকে। আর দুই পরিবারের মাঝে শান্তি বজায় থাকে। এজন্য ইসলাম সর্বক্ষেত্রে স্বামীদের স্ত্রীদের অভিভাবক বানিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- “পুরুষরা নারীদের অভিভাবক। কেননা, আল্লাহ তাআলা তাদের এক রূপের ওপর অপরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। আর তারা নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে।”১২৫৪
এই অভিভাবকত্বের কারণেই ইসলাম স্বামীর ওপর মহর ওয়াজিব করেছে। আর এটাকে বানিয়েছে স্ত্রীর অধিকার। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মহর দিয়ে দাও।”১২৫৫
স্ত্রীদের আরেকটি অধিকার হলো- তাদের ভরণপোষণ অর্থাৎ প্রয়োজনীয় খাবার, কাপড়, বাসস্থান ও চিকিৎসা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। সাথে সাথে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর তোমরা তাদের সাথে সৎ ভাবে বসবাস করো। যদি তোমরা তাদের অপছন্দ করো, তাহলে হয়তো তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছো, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন।”১২৫৬
পক্ষান্তরে ইসলাম স্বামীদেরকেও কিছু অধিকার দিয়েছে স্ত্রীদের উপর। তা হলো- স্বামীর আনুগত্য করা। বৈবাহিক জীবনে এটা হলো স্বামীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার।
ইসলাম স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই কিছু অধিকার এবং দায়িত্ব দিয়েছে। যার যার দায়িত্ব সে সে পালন করবে। ইসলাম তাদের থেকে এটাই কামনা করে যে- তারা পরস্পরে ভদ্র ও সংহত আচরণ করবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একে অপরের সহায়তা করবে। যদি কখনও তাদের মাঝে মতবিরোধ, ঝগড়া বা কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে সেক্ষেত্রে ইসলাম তা নিরসনের বিভিন্ন পথ ও পন্থা বলে দিয়েছে। যদি তাদের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তারা আর কিছুতেই আল্লাহ প্রদত্ত সীমারেখা রক্ষা করতে পারছে না; আর স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তাদের একত্রে থাকা সম্ভব হচ্ছে না, তখন ইসলাম তাদেরকে সর্বশেষ চিকিৎসা হিসেবে তালাক বা বিচ্ছেদের ব্যবস্থা দিয়েছে। যাতে তারা একে অপর থেকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা হয়ে যেতে পারে।
টিকাঃ
১৪৭. সূরা নিসা, আয়াত নং-১
১৪৮. সূরা নাহল, আয়াত নং-৭২
১৪৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৬৬৯ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪০০
১৫০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৬৭৭ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪০১
১৫১. রূহুল ইনসান ফীল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ: ২৩৪
১৫২. সূরা রূম, আয়াত নং-২১
১৫৩. সূরা নূর, আয়াত নং-৩২
১৫৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৮০২ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৬৬
১২৫৩. জামে তিরমিযী, হাদীস নং- ১০০১ সুনানু ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৮৬৯
১২৫৪. সুরা নিসা, আয়াত নং-৩৪
১২৫৫. সুরা নিসা, আয়াত নং-৪
১২৫৬. সুরা নিসা, আয়াত নং-১৯
📄 ইসলামে সন্তানের অধিকার ও কর্তব্য
শিশুর জীবনে পরিবেশের প্রভাবঃ ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুরা হলো জীবনের ফল এবং সৌন্দর্য। তারা হৃদয়ের প্রফুল্লতা আর চোখের শীতলতা। এজন্য ইসলাম শিশুদের প্রতি অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলামী শরিয়ত পিতা-মাতার উপর শিশুদের অনেক অধিকার এবং দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে। একজন শিশু সর্বপ্রথম তার পিতা-মাতার পরিবেশ দ্বারা ই প্রভাবিত হয়। যেমনটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “প্রতিটি শিশু স্বভাবজাতভাবে ইসলাম নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। পরে তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী বানায় বা খৃষ্টান বানায় অথবা অগ্নিপূজারী বানায়। ”
একটি শিশুর দ্বীন-ধর্ম এবং চরিত্র গঠনে পিতা-মাতার বিরাট ভূমিকা থাকে। এজন্য যদি পিতা-মাতা সৎ আদর্শবান ও ভালো হয়, তাহলে তার সন্তান- সন্ততি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও ভালো হওয়ার আশা করা যায়। এজন্য জন্মের পূর্বেই সন্তানের কিছু অধিকার আদায় করতে হয়। যা শুধু আদর্শ পিতা- মাতারাই করে থাকেন।
জন্মপূর্ব সন্তানের কিছু অধিকারঃ শয়তান থেকে তাকে রক্ষা করা: স্বামী-স্ত্রী যখন পরস্পর মিলিত হয়, তখন এর সাথে সন্তানেরও একটি অধিকার সম্পৃক্ত হয়ে যায়। তা হলো- বাবার পিঠ থেকে মায়ের রেহেমে যাওয়ার সময় সন্তানকে শয়তানের স্পর্শমুক্ত রাখা। এটা তখনই সম্ভব হবে, যখন পিতা-মাতা উভয়ে সুন্নত তরীকা য় মিলিত হবে আর শয়তান থেকে রক্ষা পাওয়ার ঐ দুআ পড়বে, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তোমাদের মধ্যে যখন কেউ তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়, তখন যদি এই দুআ পড়ে- بِسْمِ اللهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبْ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا (বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশশাইতানা ওয়া জান্নিবিশ শাইতানা মা রযাকতানা) অর্থাৎ, বিসমিল্লাহ, হে আল্লাহ! আমাদেরকে শয়তান থেকে রক্ষা করুন। আর আমাদেরকে আপনি যা দান করবেন, তাকেও শয়তান থেকে দূরে রাখুন। তাহলে এই মিলনে যদি তাদের সন্তান হয়, তো এই সন্তানকে শয়তান কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। ”
শিশুর জীবনের অধিকার:- মাতৃগর্ভে যখন শিশু ভ্রূণ তৈরি হয়, তখনই ইসলাম তাকে জীবনের অধিকার প্রদান করে। এ অবস্থায় ইসলামী শরিয়ত মায়ের জন্য গর্ভপাত নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। কেননা, এটা এমন এক আমানত, যা আল্লাহ তাআলা মায়ের গর্ভে রেখেছেন। আর এ ভ্রূণের জন্য জীবনের অধিকার দিয়েছেন। এজন্য ভ্রূণের কোনো ক্ষতি করা বা নষ্ট করা জায়েয নেই। এরপর যখন এই ভ্রূণটির চার মাস হয়ে যায়, আর তার মধ্যে রুহ চলে আসে, তখন ইসলামী শরিয়ত তাকে একটি জীবন্ত মানুষের মর্যাদা দিয়েছে। এ অবস্থায় তাকে হত্যা করা কিছুতেই জায়েয নয়। যদি কেউ হত্যা করে, তাহলে হত্যাকারীর উপর দিয়ত তথা ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হয়ে যায়। হযরত মুগীরা ইবনে শু'বা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “এক মহিলার দ্বারা সন্তানকে কুঁড়ে ঘরের খুঁটি দ্বারা আঘাত করে ফেলেলো। ঐ মহিলার পেটে বাচ্চা ছিলো, সে বাচ্চাটিও মারা গেলো। পরে নিহত মহিলার পরিবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে এর বিচার চাইলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হত্যাকারী মহিলার ওয়ারিসদেরকে নিহত মহিলার হত্যার দিয়ত (ক্ষতিপূরণ) প্রদানের নির্দেশ দিলেন। আর গর্ভে নিহত সন্তানের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি গোলাম প্রদানের হুকুম দিলেন। হত্যাকারী মহিলার পরিবারের এক ব্যক্তি বললো- আমরা এমন শিশুর ক্ষতিপূরণ দিবো, যে খায়নি, পান করেনি এবং কোনো শব্দও করেনি! সে তো ছিলো আর গেলো শুধু। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- সে যেনো বেদুইনের মত ছন্দযুক্ত বাক্যে কথা বললো! বর্ণনাকারী বলেন- এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হত্যাকারীর ওয়ারিসদের উপর দিয়ত (ক্ষতিপূরণ) আদায়ের নির্দেশ দিলেন। ”
এমনকি ইসলামী শরিয়ত গর্ভবতী মহিলাকে রমজানের রোজা ভাঙ্গারও অনুমতি দিয়েছে- যাতে গর্ভস্থ সন্তানের কোন রকম ক্ষতি না হয়। যদি কোনো গর্ভবতী মহিলা ব্যভিচার করে, তাহলে তার সন্তান জন্মগ্রহণ করে দুধ ছাড়া পর্যন্ত শাস্তি বিলম্ব করারও অনুমতি দিয়েছে ইসলাম- যাতে সন্তানটা বেঁচে যায়।
জন্মের পর সন্তানের কিছু অধিকারঃ সন্তান জন্মগ্রহণ করার পর কী কী করতে হবে, এ বিষয়েও ইসলাম কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। নিম্নে কয়েকটি আলোচনা করা হলো। সন্তান জন্মের সংবাদে খুশি হওয়াঃ- পবিত্র কুরআনে হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালামের ছেলে হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামের জন্মের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন- “সে (হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম) যখন মেহরাবে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলো, তখন ফেরেশতারা তাকে ডেকে বললো- নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আপনাকে ইয়াহইয়া এর (জন্মের) সুসংবাদ দিচ্ছেন। যে হবে আল্লাহর বাণী সত্যয়নকারী, নেতা, নারী সংযমশীল এবং একজন নেককার নবী। ” ছেলেমেয়ে সবার জমানার আনন্দিত হওয়া মুস্তাহাব। দু'জনের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি।
সন্তানের দুই কানে আযান-ইকামত দেওয়াঃ- সন্তান জন্মের পর সাথে সাথে তার ডান কানে আযান আর বাম কানে ইকামত দেওয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান ইবনে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্মের পর তার কানে আযান দিয়েছিলেন। হযরত আবূ রাফে’ রাজিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন- “হযরত ফাতেমা রাজিয়াল্লাহু আনহা যখন হাসান রাজিয়াল্লাহু আনহুকে প্রসব করলেন, তখন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তার কানে নামাযের আযানের মত আযান দিতে দেখেছি।”
খেজুর দ্বারা তাহনীক করা:- সন্তানদের একটি অধিকার হলো- জন্মের পর তাদেরকে খেজুর দ্বারা তাহনীক করা। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহনীক করেছেন। হযরত আবূ মূসা আশআরী রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “আমার একটি ছেলে জন্ম নিলে তাকে নিয়ে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলাম। তিনি আমার ছেলের নাম রাখলেন ইব্রাহীম। এরপর তাকে খেজুর দ্বারা তাহনীক করলেন এবং তার জন্য বরকতের দুআ করলেন। পরে আমার কাছে দিয়ে দিলেন।”
সন্তানের মাথার চুল ফেলে তার ওজন বরাবর সদকা করা:- সন্তানদের আরেকটি অধিকার হলো- তার মাথার চুল ফেলে তার ওজন বরাবর রূপা সদকা করা। এতে সন্তানের শারীরিক উপকার লাভ হয়। সাথে সাথে সমাজেরও হয় কল্যাণ। শারীরিক উপকার হলো- চুলের ছিদ্রগুলো খুলে যায়। ময়লা দূর হয়। দুর্বল চুলগুলো দূর হয়ে যায়; আর তার স্থলে শক্ত চুল গজায়। আর সামাজিক কল্যাণ হলো- তার চুলের ওজন বরাবর যে সদকা করা হয়, তার মাধ্যমে সমাজের অনেক লোকের সহায়তা হয়। গরীবের প্রচুর খুশি হয়। এক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মেয়ে ফাতেমা রাজিয়াল্লাহু আনহা হযরত হাসান ও হুসাইনের চুল ওজন করে তার ওজন বরাবর রূপা সদকা করেছেন।”
সুন্দর নাম রাখা:- সন্তান জন্মের পর তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অধিকার হলো- তার সুন্দর একটি নাম। সুতরাং পিতা-মাতার কর্তব্য হলো, তাদের সন্তানের জন্য এমন একটি সুন্দর নাম রাখা, যে নামে তাকে সবাই চিনবে। আর সে নিজেও উক্ত নামে আনন্দবোধ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুপম নাম পছন্দ করতেন না। হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় নাম হলো- আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান। সবচেয়ে বিস্তৃত নাম হলো- হারিস ও হাম্মাম। আর সবচেয়ে অপছন্দনীয় নাম হলো- হারব ও মুররাহ।
হযরত আলী রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “আমার ছেলে হাসান জন্মগ্রহণ করার পর আমি তার নাম রাখলাম- হারব। এরপর তাকে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বললেন- আমার সন্তানকে দেখাও; আর তার নাম কী রেখেছো? আমি বললাম- হারব। তিনি বললেন- না, তার নাম হুসাইন। এরপর যখন আমার দ্বিতীয় ছেলে জন্মগ্রহণ করলো, আমি তার নাম রাখলাম- হারব। পরে তাকে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বললেন- আমার সন্তানকে দেখাও; আর তার নাম কী রেখেছো? আমি বললাম- হারব। তিনি বললেন- না, তার নাম হুসাইন। এরপর যখন আমার তৃতীয় ছেলে জন্মগ্রহণ করলো, আমি তার নাম রাখলাম- হারব। পরে তাকে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বললেন- আমার সন্তানকে দেখাও; আর তার নাম কী রেখেছো? আমি বললাম- হারব। তিনি বললেন- না, তার নাম মুহাসিন। এরপর তিনি বললেন- আমি হযরত হারুন আলাইহিস সালামের ছেলেদের নামের মত তাদের নাম রাখলাম। হযরত হারুন আলাইহিস সালামের ছেলেদের নাম ছিলো- শাকির, শারিব ও মুবাশির।”
সন্তানের পক্ষ থেকে আকীকা করা:- সন্তান জন্মের পর তার আরেকটি অধিকার হলো- তার পক্ষ থেকে আকীকা করা। অর্থাৎ সন্তান জন্মের সাতদিন পর তার পক্ষ থেকে বকরি জবাই করা। এটা মূলত একদিকে সুন্নাতে মুআক্কাদা অপরদিকে সন্তান জন্মের উপর খুশি ও আনন্দ প্রকাশ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আকীকা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন- “আল্লাহ তাআলা কত বড় অনুগ্রহ ও দয়া করেছেন। যে ব্যক্তির ছেলে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, সে যেনো তার ছেলের পক্ষ থেকে দু’টি বকরি জবাই করে। আর যে ব্যক্তির মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, সে যেনো তার মেয়ের পক্ষ থেকে একটি বকরি জবাই করে দেয়।”
সন্তানকে দুধ পান করানো:- সন্তান জন্মের পর তার আরেকটি অধিকার হলো- দুধ পান করানো। বুকের দুধ একটি শিশুর শারীরিক প্রবৃদ্ধি, মেধাবিকাশ, সহজ আবেগ- অনুভূতি আর উন্নত সমাজ গঠনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। এজন্য ইসলামী শরীয়তের নিয়ম হলো- একজন মা পূর্ণ দুই বছর তার সন্তানকে দুধ পান করাবে। এটা একটি সন্তানের অধিকার। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে, যে তার সন্তানকে দুধ পান করানোর সময় পূর্ণ করতে চায়। আর পিতার উপর কর্তব্য হলো- প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মা’দেরকে খাবার ও পোষাক প্রদান করা।”
আধুনিক স্বাস্থ্য ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা এ কথা প্রমাণ করেছে যে- একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য দুধ বছর সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইদানিং আধুনিক বিজ্ঞানী ও গবেষকদের গবেষণা ও অভিজ্ঞতায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, মুসলিম জাতির উপর আল্লাহ তাআলা কত বড় অনুগ্রহ ও দয়া করেছেন। অথচ এই দুধ ও অনুগ্রহ তো চলে আসছে সেই অনেক আগে থেকেই। ইসলামী শরীয়ত সন্তানের দুধ পান করানোর সময়কালকে অনেক গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছে। আর দুধ পান করাকে সন্তানের অধিকার সাব্যস্ত করেছে। সন্তানের এই অধিকারটা শুধু তার মায়ের উপরই চাপিয়ে দেয়নি; বরং একটা দায়িত্ব তার বাবার কাছেও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা হলো- মা’র খাবার এবং পোষাকের ব্যবস্থা করা। যাতে তার সন্তানের ভালোভাবে যত্ন নিতে পারে এবং দুধ পান করাতে পারে।
এভাবে ইসলামী শরীয়ত পিতা-মাতা উভয়কেই ভারসাম্যপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করে। যাতে শিশুটির সার্বিক যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে তার কল্যাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়। আর তারা উভয়েই যাতে যার যার সাধ্যমত চেষ্টা ও মেহনত দ্বারা এ দায়িত্বটি পালন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন- “কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেয়া হয় না।”
সন্তানের লালন-পালন ও ভরণপোষণ:- পিতা-মাতার উপর সন্তানের আরেকটি অধিকার হলো- সন্তানকে ভালোভাবে লালন-পালন করা এবং তাদের উত্তম খাবার ব্যবস্থা করা। ইসলামী শরীয়ত পিতা-মাতার উপর এটা ওয়াজিব করে দিয়েছে যে, তারা সন্তানের সুন্দর জীবন, সুস্থ দেহ, আর উত্তম খাবার দাবারের যথাসাধ্য ব্যবস্থা করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল; সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল; সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘর এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল; সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর গোলাম তার মুনিবের সম্পদের দায়িত্বশীল; সে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে।”
আদর্শ শিক্ষা দেওয়া:- সন্তানের আরেকটি অধিকার হলো- তাদেরকে উত্তম আদর্শ এবং প্রয়োজনীয় দ্বীন শিক্ষা দেওয়া। সন্তানদেরকে শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতি শেখাতে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “সাত বছর বয়সে তোমরা সন্তানদেরকে নামাজের আদেশ করো। দশ বছর বয়সে এসেও যদি নামাজ না পড়ে, তাহলে তাদেরকে হালকা প্রহার করো। আর এ বয়সে ছেলেমেয়ের বিছানা আলাদা করে দাও।” আল্লাহ তাআলা যেমন আমাদের নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে বলেছেন, সাথে সাথে আমাদের সন্তানদেরকেও বাঁচাতে বলেছেন। তিনি বলেন- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। যার জ্বালানি হবে মানুষ আর পাথর।”
তাদেরকে স্নেহ-মমতার লালন-পালন করা:- সন্তানদেরকে যত্ন করে লালন-পালনের পাশাপাশি তাদেরকে আদর-সোহাগ করতে হবে। স্নেহ-মমতার জড়িয়ে রাখতে হবে। মাঝে মাঝে তাদের সাথে তাদের মত করে দুষ্টুমি, হাসি, মজা আর খেলাধুলাও করতে হবে। যাতে তাদের মন হাসিখুশি আর প্রফুল্ল থাকে। “একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান রাজিয়াল্লাহু আনহুকে চুম্বন করলেন। হযরত আক্বরা’ ইবনে হাসেস রাজিয়াল্লাহু আনহু এটা দেখে বললেন- আমার দশজন সন্তান আছে। কিন্তু আমি কখনও তাদের কাউকে এভাবে চুম্বন করিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে বললেন- যে দয়া করে না; তাকেও দয়া করা হয় না।”
হযরত শাদ্দাদ ইবনে হাদ্দাদ রাজিয়াল্লাহু আনহু তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন এশার নামাজের সময় আমাদের নিকট আসলেন। তখন তার কাধে ছিলো হযরত হাসান রাজিয়াল্লাহু আনহু বা হুসাইন রাজিয়াল্লাহু আনহু। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটু সামনে এসে তাঁকে নিচে নামিয়ে রাখলেন। এরপর নামাজের তাকবীর বলে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামাজ আদায় করলেন। নামাজের মধ্যে একটি সিজদা অনেক লম্বা করলেন। (শাদ্দাদ বলেন) আমার পিতা বলেন, তখন আমি আমার মাথা উঠালাম আর দেখলাম, ঐ ছেলেটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিঠে উঠে আছে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদাহতেই আছেন। এরপর আবার আমি আমার সিজদায় গেলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ শেষ করার পর লোকেরা বললো- হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আজকের নামাজের মধ্যে একটি সিজদা অনেক লম্বা করেছেন। ফলে আমরা মনে করেছি- আপনার কিছু হয়ে গেছে অথবা আপনার উপর ওহী নাযিল হচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আসলে ওগুলোর কোনোটিই আমার হয়নি। বরং আমার এ সন্তান আমাকে সওয়ারি বানিয়েছিলো। এজন্য তাড়াতাড়ি উঠে যাওয়াটা আমার ভালো লাগেনি। যাতে সে তার কাজ শেষ করতে পারে।
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “আমি নামাজ শুরু করে দীর্ঘক্ষণ নামাজ পড়ার ইচ্ছা করি, কিন্তু শিশুদের কান্না আর তাদের মায়েদের বিচলিত হওয়ার কারণে নামাজকে সংক্ষিপ্ত করে ফেলি।”
মেয়েদেরকে আদর্শ শিক্ষা দেওয়া:- মেয়েদেরকে আদর্শ শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যারা মেয়েদেরকে আদর্শ শিক্ষা দেয় এবং তাদেরকে বিশেষ গুণে গুণান্বিতা করে, তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন। তিনি বলেন- “যে ব্যক্তি দুটি মেয়েকে সাবালক হওয়া পর্যন্ত উত্তমরূপে প্রতিপালন করে, কিয়ামতের দিন সে এবং আমি এমন পাশাপাশি অবস্থায় থাকবো। এটা বলে তিনি তার হাতের আঙ্গুলগুলোকে মিলিয়ে ফেললেন।”
এভাবে ইসলাম পিতা-মাতার উপর সন্তানদের এমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধিকার দিয়েছে, যা ইতিপূর্বে কোনো মানবতার আইন-কানুন আর সংবিধান দিতে পারেনি। ইসলাম সন্তানের জীবনের প্রতিটি ধাপেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। একটি সন্তানের জন্ম, দুধকাল, শৈশাবকাল, কৈশোরকাল এমনকি যৌবনকাল পর্যন্ত প্রত্যেক ধাপে ধাপেই রয়েছে ইসলামের ভিন্ন ভিন্ন দিকনির্দেশনা। শুধু তাই না, ভ্রুণ তৈরি হওয়ারও আগে থেকেই ইসলাম সন্তানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পিতা-মাতাকে উত্তম তরীকায মেলামেশার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। যাতে শয়তান ভ্রূণ থেকেই তাকে কোনো ধরণের স্পর্শ করতে না পারে।
সন্তানের এসব অধিকারের প্রতি ইসলামের এতো গুরুত্ব দেওয়ার মূল কারণ হলো, যাতে সমাজের প্রত্যেকটি নারী-পুরুষ উত্তম আদর্শ ও নীতিবান মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। আর তাদের মাধ্যমে একটি সম্ভ্রান্ত ও সভ্য সমাজ তৈরি হয়।
টিকাঃ
১২৫৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১৩৫৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৬৫৮
১২৬০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৩৪৭ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৩৪
১২৬১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৯২৭ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬৮২
১২৬২. সুরা আলে ইমরান, আয়াত নং-৩৯
৩৩৭. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৫১০৭
৩৩৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪০৫৬ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৬৯৬৭
১৭৭. মুআত্বা মালেক, হাদীস নং-১৬৪০
১৭৮. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৪৮১০ সুনানু নাসায়ী, হাদীস নং-৬৭৩৮
১৩০. মুসলিম জামে তিরমিযী, হাদীস নং-২৭১৪ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৬৯৮৮
১৩১. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৮৪৪ মুসলিম, হাদীস নং-৩৯২
১৩২. সূরা বাকারা, আয়াত নং-২৩৩
১৩৩. বুখারী দ্বারা, আদাব নং-২৫০
১৩৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৪১৩ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৮২৯
১৩৫. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৪৯৬৯ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৫৭৮৮
১৩৬. সূরা তাহরীম, আয়াত নং-৬
১৩৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৬৫১১ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২০৬৮
১১৮. সুনান নাসাঈ, হাদীস নং- ১১৪১ মুসলিমের আহমাদ, হাদীস নং-২৭৮৮
১১৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৯৭ মুসলিম ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-২৮৮
১২০. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৩১ আবু আদাবুল মুফরাদ: ৮৪৬
শিশুর জীবনে পরিবেশের প্রভাবঃ ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুরা হলো জীবনের ফল এবং সৌন্দর্য। তারা হৃদয়ের প্রফুল্লতা আর চোখের শীতলতা। এজন্য ইসলাম শিশুদের প্রতি অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলামী শরিয়ত পিতা-মাতার উপর শিশুদের অনেক অধিকার এবং দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে। একজন শিশু সর্বপ্রথম তার পিতা-মাতার পরিবেশ দ্বারা ই প্রভাবিত হয়। যেমনটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “প্রতিটি শিশু স্বভাবজাতভাবে ইসলাম নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। পরে তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী বানায় বা খৃষ্টান বানায় অথবা অগ্নিপূজারী বানায়।”১২৫৯
একটি শিশুর দ্বীন-ধর্ম এবং চরিত্র গঠনে পিতা-মাতার বিরাট ভূমিকা থাকে। এজন্য যদি পিতা-মাতা সৎ আদর্শবান ও ভালো হয়, তাহলে তার সন্তান- সন্ততি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও ভালো হওয়ার আশা করা যায়। এজন্য জন্মের পূর্বেই সন্তানের কিছু অধিকার আদায় করতে হয়। যা শুধু আদর্শ পিতা- মাতারাই করে থাকেন।
জন্মপূর্ব সন্তানের কিছু অধিকারঃ
শয়তান থেকে তাকে রক্ষা করা: স্বামী-স্ত্রী যখন পরস্পর মিলিত হয়, তখন এর সাথে সন্তানেরও একটি অধিকার সম্পৃক্ত হয়ে যায়। তা হলো- বাবার পিঠ থেকে মায়ের রেহেমে যাওয়ার সময় সন্তানকে শয়তানের স্পর্শমুক্ত রাখা। এটা তখনই সম্ভব হবে, যখন পিতা-মাতা উভয়ে সুন্নত তরীকায় মিলিত হবে আর শয়তান থেকে রক্ষা পাওয়ার ঐ দুআ পড়বে, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তোমাদের মধ্যে যখন কেউ তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়, তখন যদি এই দুআ পড়ে- بِسْمِ اللهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبْ الشَّيْطَانَ مَا রযাকতানা (বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশশাইতানা ওয়া জান্নিবিশ শাইতানা মা রযাকতানা) অর্থাৎ, বিসমিল্লাহ, হে আল্লাহ! আমাদেরকে শয়তান থেকে রক্ষা করুন। আর আমাদেরকে আপনি যা দান করবেন, তাকেও শয়তান থেকে দূরে রাখুন। তাহলে এই মিলনে যদি তাদের সন্তান হয়, তো এই সন্তানকে শয়তান কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”১২৬০
শিশুর জীবনের অধিকার:- মাতৃগর্ভে যখন শিশু ভ্রূণ তৈরি হয়, তখনই ইসলাম তাকে জীবনের অধিকার প্রদান করে। এ অবস্থায় ইসলামী শরিয়ত মায়ের জন্য গর্ভপাত নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। কেননা, এটা এমন এক আমানত, যা আল্লাহ তাআলা মায়ের গর্ভে রেখেছেন। আর এ ভ্রূণের জন্য জীবনের অধিকার দিয়েছেন। এজন্য ভ্রূণের কোনো ক্ষতি করা বা নষ্ট করা জায়েয নেই।
এরপর যখন এই ভ্রূণটির চার মাস হয়ে যায়, আর তার মধ্যে রুহ চলে আসে, তখন ইসলামী শরিয়ত তাকে একটি জীবন্ত মানুষের মর্যাদা দিয়েছে। এ অবস্থায় তাকে হত্যা করা কিছুতেই জায়েয নয়। যদি কেউ হত্যা করে, তাহলে হত্যাকারীর উপর দিয়ত তথা ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব হয়ে যায়। হযরত মুগীরা ইবনে শু'বা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “এক মহিলার দ্বারা সন্তানকে কুঁড়ে ঘরের খুঁটি দ্বারা আঘাত করে ফেলেলো। ঐ মহিলার পেটে বাচ্চা ছিলো, সে বাচ্চাটিও মারা গেলো। পরে নিহত মহিলার পরিবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে এর বিচার চাইলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হত্যাকারী মহিলার ওয়ারিসদেরকে নিহত মহিলার হত্যার দিয়ত (ক্ষতিপূরণ) প্রদানের নির্দেশ দিলেন। আর গর্ভে নিহত সন্তানের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি গোলাম প্রদানের হুকুম দিলেন। হত্যাকারী মহিলার পরিবারের এক ব্যক্তি বললো- আমরা এমন শিশুর ক্ষতিপূরণ দিবো, যে খায়নি, পান করেনি এবং কোনো শব্দও করেনি! সে তো ছিলো আর গেলো শুধু। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- সে যেনো বেদুইনের মত ছন্দযুক্ত বাক্যে কথা বললো! বর্ণনাকারী বলেন- এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হত্যাকারীর ওয়ারিসদের উপর দিয়ত (ক্ষতিপূরণ) আদায়ের নির্দেশ দিলেন।”১২৬১
এমনকি ইসলামী শরিয়ত গর্ভবতী মহিলাকে রমজানের রোজা ভাঙ্গারও অনুমতি দিয়েছে- যাতে গর্ভস্থ সন্তানের কোন রকম ক্ষতি না হয়। যদি কোনো গর্ভবতী মহিলা ব্যভিচার করে, তাহলে তার সন্তান জন্মগ্রহণ করে দুধ ছাড়া পর্যন্ত শাস্তি বিলম্ব করারও অনুমতি দিয়েছে ইসলাম- যাতে সন্তানটা বেঁচে যায়।
জন্মের পর সন্তানের কিছু অধিকারঃ
সন্তান জন্মগ্রহণ করার পর কী কী করতে হবে, এ বিষয়েও ইসলাম কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। নিম্নে কয়েকটি আলোচনা করা হলো।
সন্তান জন্মের সংবাদে খুশি হওয়াঃ- পবিত্র কুরআনে হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালামের ছেলে হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামের জন্মের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন- “সে (হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম) যখন মেহরাবে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলো, তখন ফেরেশতারা তাকে ডেকে বললো- নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আপনাকে ইয়াহইয়া এর (জন্মের) সুসংবাদ দিচ্ছেন। যে হবে আল্লাহর বাণী সত্যয়নকারী, নেতা, নারী সংযমশীল এবং একজন নেককার নবী।”১২৬২
ছেলেমেয়ে সবার জন্মের আনন্দিত হওয়া মুস্তাহাব। দু'জনের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি।
সন্তানের দুই কানে আযান-ইকামত দেওয়াঃ- সন্তান জন্মের পর সাথে সাথে তার ডান কানে আযান আর বাম কানে ইকামত দেওয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান ইবনে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্মের পর তার কানে আযান দিয়েছিলেন। হযরত আবূ রাফে’ রাজিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন- “হযরত ফাতেমা রাজিয়াল্লাহু আনহা যখন হাসান রাজিয়াল্লাহু আনহুকে প্রসব করলেন, তখন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তার কানে নামাযের আযানের মত আযান দিতে দেখেছি।”৩৩৭
খেজুর দ্বারা তাহনীক করা:- সন্তানদের একটি অধিকার হলো- জন্মের পর তাদেরকে খেজুর দ্বারা তাহনীক করা। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহনীক করেছেন। হযরত আবূ মূসা আশআরী রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “আমার একটি ছেলে জন্ম নিলে তাকে নিয়ে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলাম। তিনি আমার ছেলের নাম রাখলেন ইব্রাহীম। এরপর তাকে খেজুর দ্বারা তাহনীক করলেন এবং তার জন্য বরকতের দুআ করলেন। পরে আমার কাছে দিয়ে দিলেন।”৩৩৮
সন্তানের মাথার চুল ফেলে তার ওজন বরাবর সদকা করা:- সন্তানদের আরেকটি অধিকার হলো- তার মাথার চুল ফেলে তার ওজন বরাবর রূপা সদকা করা। এতে সন্তানের শারীরিক উপকার লাভ হয়। সাথে সাথে সমাজেরও হয় কল্যাণ। শারীরিক উপকার হলো- চুলের ছিদ্রগুলো খুলে যায়। ময়লা দূর হয়। দুর্বল চুলগুলো দূর হয়ে যায়; আর তার স্থলে শক্ত চুল গজায়। আর সামাজিক কল্যাণ হলো- তার চুলের ওজন বরাবর যে সদকা করা হয়, তার মাধ্যমে সমাজের অনেক লোকের সহায়তা হয়। গরীবের প্রচুর খুশি হয়। এক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মেয়ে ফাতেমা রাজিয়াল্লাহু আনহা হযরত হাসান ও হুসাইনের চুল ওজন করে তার ওজন বরাবর রূপা সদকা করেছেন।”১৭৭
সুন্দর নাম রাখা:- সন্তান জন্মের পর তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অধিকার হলো- তার সুন্দর একটি নাম। সুতরাং পিতা-মাতার কর্তব্য হলো, তাদের সন্তানের জন্য এমন একটি সুন্দর নাম রাখা, যে নামে তাকে সবাই চিনবে। আর সে নিজেও উক্ত নামে আনন্দবোধ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুপম নাম পছন্দ করতেন না। হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় নাম হলো- আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান। সবচেয়ে বিস্তৃত নাম হলো- হারিস ও হাম্মাম। আর সবচেয়ে অপছন্দনীয় নাম হলো- হারব ও মুররাহ।১৭৮
হযরত আলী রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “আমার ছেলে হাসান জন্মগ্রহণ করার পর আমি তার নাম রাখলাম- হারব। এরপর তাকে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বললেন- আমার সন্তানকে দেখাও; আর তার নাম কী রেখেছো? আমি বললাম- হারব। তিনি বললেন- না, তার নাম হুসাইন। এরপর যখন আমার দ্বিতীয় ছেলে জন্মগ্রহণ করলো, আমি তার নাম রাখলাম- হারব। পরে তাকে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বললেন- আমার সন্তানকে দেখাও; আর তার নাম কী রেখেছো? আমি বললাম- হারব। তিনি বললেন- না, তার নাম হুসাইন। এরপর যখন আমার তৃতীয় ছেলে জন্মগ্রহণ করলো, আমি তার নাম রাখলাম- হারব। পরে তাকে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বললেন- আমার সন্তানকে দেখাও; আর তার নাম কী রেখেছো? আমি বললাম- হারব। তিনি বললেন- না, তার নাম মুহাসিন। এরপর তিনি বললেন- আমি হযরত হারুন আলাইহিস সালামের ছেলেদের নামের মত তাদের নাম রাখলাম। হযরত হারুন আলাইহিস সালামের ছেলেদের নাম ছিলো- শাকির, শারিব ও মুবাশির।”১৩০
সন্তানের পক্ষ থেকে আকীকা করা:- সন্তান জন্মের পর তার আরেকটি অধিকার হলো- তার পক্ষ থেকে আকীকা করা। অর্থাৎ সন্তান জন্মের সাতদিন পর তার পক্ষ থেকে বকরি জবাই করা। এটা মূলত একদিকে সুন্নাতে মুআক্কাদা অপরদিকে সন্তান জন্মের উপর খুশি ও আনন্দ প্রকাশ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আকীকা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন- “আল্লাহ তাআলা কত বড় অনুগ্রহ ও দয়া করেছেন। যে ব্যক্তির ছেলে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, সে যেনো তার ছেলের পক্ষ থেকে দু’টি বকরি জবাই করে। আর যে ব্যক্তির মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, সে যেনো তার মেয়ের পক্ষ থেকে একটি বকরি জবাই করে দেয়।”১৩১
সন্তানকে দুধ পান করানো:- সন্তান জন্মের পর তার আরেকটি অধিকার হলো- দুধ পান করানো। বুকের দুধ একটি শিশুর শারীরিক প্রবৃদ্ধি, মেধাবিকাশ, সহজ আবেগ- অনুভূতি আর উন্নত সমাজ গঠনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। এজন্য ইসলামী শরীয়তের নিয়ম হলো- একজন মা পূর্ণ দুই বছর তার সন্তানকে দুধ পান করাবে। এটা একটি সন্তানের অধিকার। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে, যে তার সন্তানকে দুধ পান করানোর সময় পূর্ণ করতে চায়। আর পিতার উপর কর্তব্য হলো- প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মা’দেরকে খাবার ও পোষাক প্রদান করা।”১৩২
আধুনিক স্বাস্থ্য ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা এ কথা প্রমাণ করেছে যে- একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য দুধ বছর সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইদানিং আধুনিক বিজ্ঞানী ও গবেষকদের গবেষণা ও অভিজ্ঞতায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, মুসলিম জাতির উপর আল্লাহ তাআলা কত বড় অনুগ্রহ ও দয়া করেছেন। অথচ এই দুধ ও অনুগ্রহ তো চলে আসছে সেই অনেক আগে থেকেই। ইসলামী শরীয়ত সন্তানের দুধ পান করানোর সময়কালকে অনেক গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছে। আর দুধ পান করাকে সন্তানের অধিকার সাব্যস্ত করেছে। সন্তানের এই অধিকারটা শুধু তার মায়ের উপরই চাপিয়ে দেয়নি; বরং একটা দায়িত্ব তার বাবার কাছেও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা হলো- মা’র খাবার এবং পোষাকের ব্যবস্থা করা। যাতে তার সন্তানের ভালোভাবে যত্ন নিতে পারে এবং দুধ পান করাতে পারে।
এভাবে ইসলামী শরীয়ত পিতা-মাতা উভয়কেই ভারসাম্যপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করে। যাতে শিশুটির সার্বিক যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে তার কল্যাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়। আর তারা উভয়েই যাতে যার যার সাধ্যমত চেষ্টা ও মেহনত দ্বারা এ দায়িত্বটি পালন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন- “কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেয়া হয় না।”১৩৩
সন্তানের লালন-পালন ও ভরণপোষণ:- পিতা-মাতার উপর সন্তানের আরেকটি অধিকার হলো- সন্তানকে ভালোভাবে লালন-পালন করা এবং তাদের উত্তম খাবার ব্যবস্থা করা। ইসলামী শরীয়ত পিতা-মাতার উপর এটা ওয়াজিব করে দিয়েছে যে, তারা সন্তানের সুন্দর জীবন, সুস্থ দেহ, আর উত্তম খাবার দাবারের যথাসাধ্য ব্যবস্থা করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল; সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল; সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘর এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল; সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর গোলাম তার মুনিবের সম্পদের দায়িত্বশীল; সে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে।”১৩৪
আদর্শ শিক্ষা দেওয়া:- সন্তানের আরেকটি অধিকার হলো- তাদেরকে উত্তম আদর্শ এবং প্রয়োজনীয় দ্বীন শিক্ষা দেওয়া। সন্তানদেরকে শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতি শেখাতে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “সাত বছর বয়সে তোমরা সন্তানদেরকে নামাজের আদেশ করো। দশ বছর বয়সে এসেও যদি নামাজ না পড়ে, তাহলে তাদেরকে হালকা প্রহার করো। আর এ বয়সে ছেলেমেয়ের বিছানা আলাদা করে দাও।”১৩৫
আল্লাহ তাআলা যেমন আমাদের নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে বলেছেন, সাথে সাথে আমাদের সন্তানদেরকেও বাঁচাতে বলেছেন। তিনি বলেন- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। যার জ্বালানি হবে মানুষ আর পাথর।”১৩৬
তাদেরকে স্নেহ-মমতার লালন-পালন করা:- সন্তানদেরকে যত্ন করে লালন-পালনের পাশাপাশি তাদেরকে আদর-সোহাগ করতে হবে। স্নেহ-মমতার জড়িয়ে রাখতে হবে। মাঝে মাঝে তাদের সাথে তাদের মত করে দুষ্টুমি, হাসি, মজা আর খেলাধুলাও করতে হবে। যাতে তাদের মন হাসিখুশি আর প্রফুল্ল থাকে। “একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান রাজিয়াল্লাহু আনহুকে চুম্বন করলেন। হযরত আক্বরা’ ইবনে হাসেস রাজিয়াল্লাহু আনহু এটা দেখে বললেন- আমার দশজন সন্তান আছে। কিন্তু আমি কখনও তাদের কাউকে এভাবে চুম্বন করিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে বললেন- যে দয়া করে না; তাকেও দয়া করা হয় না।”১৩৭
হযরত শাদ্দাদ ইবনে হাদ্দাদ রাজিয়াল্লাহু আনহু তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন এশার নামাজের সময় আমাদের নিকট আসলেন। তখন তার কাধে ছিলো হযরত হাসান রাজিয়াল্লাহু আনহু বা হুসাইন রাজিয়াল্লাহু আনহু। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটু সামনে এসে তাঁকে নিচে নামিয়ে রাখলেন। এরপর নামাজের তাকবীর বলে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামাজ আদায় করলেন। নামাজের মধ্যে একটি সিজদা অনেক লম্বা করলেন। (শাদ্দাদ বলেন) আমার পিতা বলেন, তখন আমি আমার মাথা উঠালাম আর দেখলাম, ঐ ছেলেটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিঠে উঠে আছে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদাহতেই আছেন। এরপর আবার আমি আমার সিজদায় গেলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ শেষ করার পর লোকেরা বললো- হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আজকের নামাজের মধ্যে একটি সিজদা অনেক লম্বা করেছেন। ফলে আমরা মনে করেছি- আপনার কিছু হয়ে গেছে অথবা আপনার উপর ওহী নাযিল হচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আসলে ওগুলোর কোনোটিই আমার হয়নি। বরং আমার এ সন্তান আমাকে সওয়ারি বানিয়েছিলো। এজন্য তাড়াতাড়ি উঠে যাওয়াটা আমার ভালো লাগেনি। যাতে সে তার কাজ শেষ করতে পারে।১১৮
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “আমি নামাজ শুরু করে দীর্ঘক্ষণ নামাজ পড়ার ইচ্ছা করি, কিন্তু শিশুদের কান্না আর তাদের মায়েদের বিচলিত হওয়ার কারণে নামাজকে সংক্ষিপ্ত করে ফেলি।”১১৯
মেয়েদেরকে আদর্শ শিক্ষা দেওয়া:- মেয়েদেরকে আদর্শ শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যারা মেয়েদেরকে আদর্শ শিক্ষা দেয় এবং তাদেরকে বিশেষ গুণে গুণান্বিতা করে, তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন। তিনি বলেন- “যে ব্যক্তি দুটি মেয়েকে সাবালক হওয়া পর্যন্ত উত্তমরূপে প্রতিপালন করে, কিয়ামতের দিন সে এবং আমি এমন পাশাপাশি অবস্থায় থাকবো। এটা বলে তিনি তার হাতের আঙ্গুলগুলোকে মিলিয়ে ফেললেন।”১২০
এভাবে ইসলাম পিতা-মাতার উপর সন্তানদের এমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধিকার দিয়েছে, যা ইতিপূর্বে কোনো মানবতার আইন-কানুন আর সংবিধান দিতে পারেনি। ইসলাম সন্তানের জীবনের প্রতিটি ধাপেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। একটি সন্তানের জন্ম, দুধকাল, শৈশবকাল, কৈশোরকাল এমনকি যৌবনকাল পর্যন্ত প্রত্যেক ধাপে ধাপেই রয়েছে ইসলামের ভিন্ন ভিন্ন দিকনির্দেশনা। শুধু তাই না, ভ্রুণ তৈরি হওয়ারও আগে থেকেই ইসলাম সন্তানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পিতা-মাতাকে উত্তম তরীকার মেলামেশার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। যাতে শয়তান ভ্রূণ থেকেই তাকে কোনো ধরণের স্পর্শ করতে না পারে।
সন্তানের এসব অধিকারের প্রতি ইসলামের এতো গুরুত্ব দেওয়ার মূল কারণ হলো, যাতে সমাজের প্রত্যেকটি নারী-পুরুষ উত্তম আদর্শ ও নীতিবান মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। আর তাদের মাধ্যমে একটি সম্ভ্রান্ত ও সভ্য সমাজ তৈরি হয়।
টিকাঃ
১২৫৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১৩৫৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৬৫৮
১২৬০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৩৪৭ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৩৪
১২৬১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৯২৭ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬৮২
১২৬২. সুরা আলে ইমরান, আয়াত নং-৩৯
৩৩৭. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৫১০৭
৩৩৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪০৫৬ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৬৯৬৭
১৭৭. মুআত্বা মালেক, হাদীস নং-১৬৪০
১৭৮. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৪৮১০ সুনানু নাসায়ী, হাদীস নং-৬৭৩৮
১৩০. মুসলিম জামে তিরমিযী, হাদীস নং-২৭১৪ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৬৯৮৮
১৩১. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৮৪৪ মুসলিম, হাদীস নং-৩৯২
১৩২. সূরা বাকারা, আয়াত নং-২৩৩
১৩৩. বুখারী দ্বারা, আদাব নং-২৫০
১৩৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৪১৩ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৮২৯
১৩৫. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৪৯৬৯ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৫৭৮৮
১৩৬. সূরা তাহরীম, আয়াত নং-৬
১৩৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৬৫১১ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২০৬৮
১১৮. সুনান নাসাঈ, হাদীস নং- ১১৪১ মুসলিমের আহমাদ, হাদীস নং-২৭৮৮
১১৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৯৭ মুসলিম ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-২৮৮
১২০. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৩১ আবু আদাবুল মুফরাদ: ৮৪৬