📘 ইসলামই দিয়েছে সবার অধিকার > 📄 ইসলামী সভ্যতায় ধর্মের স্বাধীনতা

📄 ইসলামী সভ্যতায় ধর্মের স্বাধীনতা


ধর্মের স্বাধীনতায় ইসলামের মৌলিক নীতিঃ ইসলামে ধর্মের স্বাধীনতার বা বিশ্বাসের স্বাধীনতা নিয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও মৌলিক নীতিমালা বর্ণনা করে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা বলেন- “দ্বীন বা ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে কারও কোনো জবরদস্তি নেই। নিশ্চয়ই হেদায়াত আর ভ্রষ্টতা স্পষ্ট হয়ে গেছে।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার পরবর্তী মুসলমানগণ কাউকেই জোর করে মুসলিম হতে বাধ্য করেননি। আবার যারা মৃত্যুর ভয়ে বা শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য ইসলাম গ্রহণের ভান ধরেছে, তাদেরকেও প্রশ্রয় দেননি। আর এটা তাঁরা কিভাবে করবেন? কেননা, তারা তো জানেন যে, বাধ্য হয়ে লোক দেখানো ইসলাম গ্রহণের পরকালে কোনোই মূল্য নেই। অথচ এই আখেরাতের জন্যই তো মুসলমানের সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টা!

পূর্বোক্ত আয়াতের প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছে- হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, জাহিলী যুগে যদি কোনো মহিলার সন্তান বেঁচে না থাকতো, তাহলে সে এভাবে মানত করতো- “যদি এবার তার সন্তান বাঁচে, তাহলে তাকে ইহুদী ধর্মে দীক্ষিত করাবো।” পরে যখন ইহুদী গোত্র বনু নাজিরের উচ্ছেদ করা হয়, তখন তাদের মধ্যে আনসারদের এমন ইহুদী সন্তানরাও ছিলো। ফলে আনসাররা বললো- আমরা আমাদের সন্তানদেরকে ইহুদিদের সাথে ছাড়বো না। পরে আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন- “দ্বীন বা ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে কারও কোনো জবরদস্তি নেই। নিশ্চয়ই হেদায়াত আর ভ্রষ্টতা স্পষ্ট হয়ে গেছে।”

ঈমান ও মানুষের ইচ্ছাঃ ইসলামে ঈমান আনা এবং না আনাকে মানুষের ইচ্ছা ও আন্তরিক অভিপ্রায়ের উপর ছেড়ে দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন- “যে চায় সে ঈমান আনুক, আর যে চায় সে কুফরী করুক।”

পবিত্র কুরআনও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দৃষ্টিকে এই বাস্তবতার দিকেই ফিরিয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে স্পষ্ট বলা হয়েছে- “তার দায়িত্ব শুধু পৌঁছে দেয়া। মানুষকে জোরপূর্বক ইসলামে দাখিল করা তার দায়িত্ব না।” পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- “আপনি কি মানুষকে বাধ্য করবেন, যাতে তারা মুমিন হন?” আরও বলা হয়েছে- “আপনি তাদের উপর বলপ্রয়োগকারী নন।” আরও বলা হয়েছে- “আর যদি তারা ঈমান আনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আমি তো আপনাকে তাদের রক্ষক হিসেবে পাঠাইনি। (বরং শুধু) দাওয়াত পৌঁছে দেওয়াই আপনার দায়িত্ব।”

এগুলোর দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, মুসলিম সংবিধান ‘বিশ্বাসের স্বাধীনতা’ বা ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’কে নিশ্চিত করেছে। আর কাউকে জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করাকে কঠিনভাবে নিষেধ করেছে।

ইসলামে ধর্মীয় সহনশীলতাঃ ধর্মীয় স্বাধীনতার অর্থ হলো ধর্মীয় সহনশীলতাকে স্বীকৃতি প্রদান করা। মদীনার প্রথম সংবিধানে ধর্মীয় সহনশীলতাকে স্বীকৃতি দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাস্তব নমুনা পেশ করেছেন। তিনি ইহুদীদেরকে এমন স্বাধীনতা দিয়েছিলেন যে, তারা মুসলমানদের সাথে এক জাতি হিসেবে বসবাস করতো। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি শক্তিশালী এবং বিজয় লাভ করা সত্ত্বেও কুরাইশদেরকে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করেননি। বরং তিনি তাদেরকে বলেছেন- “যাও তোমরা আজকে স্বাধীন।”

তার পদাঙ্কে অনুসরণ করে দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুও জেরুজালেমের খৃষ্টানদেরকে তাদের জীবন, গির্জা এবং ক্রুশের নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। তাদের কারও কোনো ক্ষতি করা হয়নি। তাদের ধর্মের কারণেও তাদেরকে কোনো রকম জবরদস্তি করা হয়নি।”

বরং ইসলাম প্রতিপক্ষকে ধোঁকা ও অবজ্ঞা না করে বস্তুনিষ্ঠভাবে তাদের সাথে দ্বীন বিষয়ে আলোচনা করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। এক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা বলেন- “হে নবী! আপনি আপনার রবের দিকে মানুষকে আহ্বান করুন হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে। আর তাদের সাথে বিতর্ক করুন সুন্দরতম পন্থায়।”

সুতরাং এই সহনশীল নীতির ভিত্তিতে মুসলমান ও অমুসলমানদের মাঝে কথাবার্তা হওয়া উচিত। আহলে কিতাবদের সাথে কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রেও পবিত্র কুরআন এই আয়াতের দিকেই আহ্বান করেছে। কুরআনে বলা হয়েছে- “হে নবী আপনি বলুন, হে আহলে কিতাবগণ! তোমরা এমন কথার দিকে আসো, যা আমাদের মাঝে এবং তোমাদের মাঝে সমান। তা হলো- আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবো না। তার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবো না। আর আল্লাহ ছাড়া আমরা কেউ কাউকে রব হিসেবে গ্রহণ করবো না। তারপর যদি তারা বিমুখ হয়, তবে বলে দেন- তোমরা সাক্ষী থাকো যে আমরা মুসলমান।”

এর অর্থ হলো- অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দিয়ে যখন কোনো ফল পাওয়া যায় না, তখন তাদেরকে আপন ধর্মের উপরেই ছেড়ে দেওয়া হবে। যা নিয়ে তারা সন্তুষ্ট থাকে। আর এই বিষয়গুলিকেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে সূরা কাফিরুনের শেষ আয়াতে। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যে কথার মাধ্যমে মুশরিকদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার পরিসমাপ্তি ঘটেছে, তা হলো- “তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম, আর আমার জন্য আমার ধর্ম।”

টিকাঃ
১৬৭. সূরা বাকারাহ, আয়াত নং-২৫৬
১৬৮. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৬৪৮
১৬৯. সূরা কাহাফ, আয়াত নং-২৯
১৬৯. সূরা ইউনুস, আয়াত নং-৯৯
২০০. সূরা গাশিয়াহ, আয়াত নং-২২
২০১. সূরা শুরা, আয়াত নং-৪৮
২০২. সীরাতে ইবনে হিশাম: -৪৬১/২ আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ:৩৩৯/৪
২০৩. তাফসিরুল উলামি মুফরাহঃ ৩/১৫৫
২০৪. সূরা নাহল, আয়াত নং-১২৫
২০৫. সূরা আল ইমরান, আয়াত নং-৬৪
২০৬. সূরা কাফিরুন, আয়াত নং-৬

📘 ইসলামই দিয়েছে সবার অধিকার > 📄 ইসলামী সভ্যতায় চিন্তার স্বাধীনতা

📄 ইসলামী সভ্যতায় চিন্তার স্বাধীনতা


ইসলামে চিন্তার মূল্যায়ন: ইসলামে চিন্তার স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করেছে এবং একে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেছে। স্বয়ং ইসলামী সভ্যতাই এর বাস্তব সাক্ষী। এ বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয় তখন, যখন দেখা যায় ইসলাম সমগ্র বিশ্ব এবং আসমান-জমিন নিয়ে চিন্তার আহ্বান জানিয়েছে এবং এর উপর খুব উৎসাহ প্রদান করেছে। এক্ষেত্রে স্বয়ং আল্লাহ তাআলার বাণী– “আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি, তোমরা আল্লাহর জন্য দুজন অথবা একজন করে দাঁড়িয়ে যাও, অতঃপর চিন্তা করে দেখ…”

তিনি আরও বলেন- “তারা কি জমিনে ভ্রমণ করেন? (যদি করতো) তাহলে তাদের হতো এমন হৃদয়, যা দ্বারা তারা উপলব্ধি করতে পারতো এবং হতো এমন কান, যা দ্বারা তারা শুনতে পারতো। মূলত চোখ তো অন্ধ হয় না, অন্ধ হয় বুকের মধ্যে থাকা হৃদয়।”

ইসলাম বিবেক ও যৌক্তিক প্রমাণে উৎসাহিত করে: ইসলাম ঐ সমস্ত লোকদেরকে দোষী সাব্যস্ত করেছে, যারা তাদের বিবেক এবং অনুভূতিশক্তিকে কাজে না লাগিয়ে অলস বানিয়ে রেখেছে। ইসলাম তাদের মর্যাদাকে চতুষ্পদ প্রাণীর চেয়েও নিচে নামিয়ে দিয়েছে। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন- “তাদের অন্তর আছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা বুঝে না। চোখ আছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা দেখে না। কান আছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তারা অধিক পথভ্রষ্ট। আর তারাই হচ্ছে গাফেল।”

ইসলামে চিন্তার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছে, যারা শুধু ধারণা আর অনুমান নিয়ে পড়ে থাকে। তাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা বলেন- “তারা তো কেবল ধারণারই অনুসরণ করে। আর নিশ্চয়ই ধারণা সত্যের মোকাবেলা কোনোই কাজে আসে না।”

ইসলাম তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ঐ সমস্ত লোকদেরকেও, যারা তাদের বাপ-দাদা এবং পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করে। কিন্তু চিন্তা করে না যে, তারা কি হকের উপর আছে, না বাতিলের উপর। পবিত্র কুরআনে তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে- “(কিয়ামতের দিন) তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমরা তো আমাদের সর্দার এবং বড়দের অনুসরণ করেছি। আর তারাই আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে।”

ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস প্রমাণ করার ক্ষেত্রে ইসলাম যৌক্তিক প্রমাণের অনুমোদন দিয়েছে। এজন্য ইসলামী চিন্তাবিদগণ বলেন- আক্বল বা বিবেক হলো নকলের (কুরআন-হাদীস) ভিত্তি। সুতরাং আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের বিষয়টি প্রমাণ হয় আক্বলের মাধ্যমে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুয়তের বিষয়টিও প্রথমে প্রমাণ হয়েছে আক্বলের মাধ্যমে। এরপর বিভিন্ন মোজেজা তার সত্য নবী হওয়ার উপর প্রমাণ হিসেবে এসেছে। এই হলো ইসলামে চিন্তা বা আক্বলের মর্যাদা।

ইসলামে চিন্তার মূল্যায়ন: ইসলামে দৃষ্টিভঙ্গি চিন্তাভাবনা হলো দ্বীনের একটি অংশ। সর্ববিষয় চিন্তামুক্ত থাকা একজন মুসলমানের জন্য ভালো নয়। দ্বীনি বিষয়ে চিন্তা-ফিকির করার জন্য ইসলামে এক বিশাল দিগন্ত খুলে দিয়েছে। কেননা, জীবন-ঘনিষ্ট নতুন নতুন বিষয়ের শরয়ী সমাধান বের করার জন্য চিন্তা ও গবেষণা করতে হয়। ইসলামী চিন্তাবিদগণ এর নাম দিয়েছেন- ইজতিহাদ অর্থাৎ শরয়ী হুকুম উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে গবেষণামুলক চিন্তা-ভাবনা।

ইজতিহাদের মূলনীতি-যা ইসলামে চিন্তার স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করে-মুসলমানদের আইনশাস্ত্রে এর বিরাট প্রভাব রয়েছে। আর তা ঐ সকল মাসআলা-মাসায়েলের দ্রুত সমাধান দেয়, যা ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিলো না। এখান থেকে কয়েকটি প্রসিদ্ধ ফিকহী মাযহাবও তৈরি হয়েছে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম বিশ্ব তাদের অনুসরণ করে আসছে। এভাবে মুসলমানদেরকে তাদের দুনিয়া এবং দ্বীনের এ সকল বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যে সকল বিষয়ে কুরআন-হাদীসে স্পষ্ট কিছু নেই। এটা হলো ইসলামের সুদৃঢ় যৌক্তিক অবস্থানের প্রথম স্তম্ভ। এই অবস্থানটি সেই ভিত্তির মতো, যার মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাস জুড়ে মুসলমানগণ তাদের সমৃদ্ধ সভ্যতা গড়ে তুলেছিলো।

টিকাঃ
১১৯. সূরা সাবা, আয়াত নং-৪৬
১২০. সূরা নাহল, আয়াত নং-৪৩
১২১. সূরা আ'রাফ, আয়াত নং-১৮৬
১২২. সূরা নাজম, আয়াত নং-২৮
১২৩. সূরা আহযাব, আয়াত নং-৬৭

📘 ইসলামই দিয়েছে সবার অধিকার > 📄 ইসলামী সভ্যতায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা

📄 ইসলামী সভ্যতায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা


ভূমিকা: ইসলামী সভ্যতায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা বলতে বুঝায়- “প্রত্যেক ব্যক্তি সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো বিষয়ে তার পছন্দমত মতামত গ্রহণ করতে পারে, এবং জনসম্মুখে তা প্রচার করতে পারে। এটা তার নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা এবং অনুভূতি প্রকাশের ব্যক্তিগত অধিকার। যতক্ষণ পর্যন্ত এর মাধ্যমে অন্য কারও অধিকারে বিঘ্নতা সৃষ্টি না হবে।”

মত প্রকাশের স্বাধীনতা মুসলমানের অধিকার: ইসলামী সভ্যতায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা হলো একজন মুসলমানের নিশ্চিত অধিকার। কেননা, ইসলামী শরীয়ত এ অধিকারকে শুধু মুসলমানদের জন্যই নিশ্চিত করেছে। আর ইসলামী শরীয়ত যখন কারও জন্য কোনো বিষয় নির্দিষ্ট করে, তখন অন্য কেউ তা হ্রাস করা, দূর করা বা অস্বীকার করার কোনো অধিকার রাখে না। শুধু তাই নয়, বরং স্বাধীন মত প্রকাশ করা একজন মুসলমানের জন্য ওয়াজিব। এর থেকে বিরত থাকা তার জন্য জায়েয নেই। কেননা, আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের উপর ওয়াজিব করেছেন- অন্যের কল্যাণ কামনা করা, সৎ কাজের আদেশ করা এবং অসৎ কাজের নিষেধ করা। আর এই ওয়াজিবগুলো পালন করা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মুসলমান পূর্ণ মত প্রকাশের স্বাধীনতা না পাবে। সুতরাং মত প্রকাশের স্বাধীনতা হলো এসব ওয়াজিব আদায়ের অন্যতম একটি মাধ্যম। আর যে জিনিস ব্যতীত ওয়াজিব আদায়ে করা সম্ভব হয় না, সে জিনিসটাও ওয়াজিব হয়ে যায়। সে হিসেবে মত প্রকাশের স্বাধীনতাও ওয়াজিব।

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়সহ দুনিয়াবী সকল বিষয়ে মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে ইসলাম। এ বিষয়ে একটি বাস্তব নমুনা- খন্দকের যুদ্ধের পূর্বে মদীনার এক তৃতীয়াংশ খেজুরের বিনিময়ে গাতফানীদের সাথে সন্ধি করার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সাদ বিন মুয়ায ও হযরত সাদ বিন উবাদাহর সাথে পরামর্শ করেছিলেন। এ ব্যাপারে হযরত আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “একবার হারেস গাতফানী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললো, হে মুহাম্মাদ! মদীনার খেজুর আমাদের সাথে ভাগাভাগি করে নাও। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- আমি সাদদের সাথে পরামর্শ করে নেই। এরপর তিনি হযরত সাদ ইবনে মুয়ায, সাদ ইবনে উবাদাহ, সাদ ইবনে রাবী, সাদ ইবনে খেসাম এবং সাদ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুমের নিকট লোক পাঠিয়ে বললেন- আমি জানি যে আরব তোমাদেরকে এক ধনুক থেকে বের করে দিয়েছেন। এখন হারেস গাতফানী চায় তোমরা মদীনার খেজুরগুলোকে তার সাথে ভাগাভাগি করে নাও। এখন তোমরা যদি এই বছরেই তাকে দিতে চাও, তাহলে তা ভেবে দেখতে পারো। জবাবে তারা বললো- হে আল্লাহর রাসূল, এটা কি আসমান থেকে আসা ওহী; যা আমাদেরকে মানতেই হবে, না আপনার নিজস্ব কোনো মতামত; যা আমাদেরকে অনুসরণ করতে হবে? আপনি যদি আমাদের মতামতের উপর বিষয়টি ছেড়ে দেন, তাহলে আল্লাহর কসম করে বলছি, এ ব্যাপারে আমাদের মতামত হলো- তারা আতিথেয়তা আর অনুগ্রহ ছাড়া আমাদের কাছ থেকে একটি খেজুরও পাবে না।”

কল্যাণ কামনা, সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ: অপরের কল্যাণ কামনা করা, সৎ কাজে আদেশ করা এবং অসৎ কাজে নিষেধ করার ব্যাপারে কুরআন-হাদীসে অনেক বক্তব্য এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু। তারা সৎ কাজের আদেশ করে আর অসৎ কাজের নিষেধ করে।” রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “প্রকৃত দ্বীন হলো- অন্যের কল্যাণ কামনা করা। সাহাবায়ে কেরাম বলেন, আমরা বললাম- হে আল্লাহর রাসূল! কার জন্য কল্যাণ কামনা করা? তিনি বললেন- আল্লাহ তাআলার জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলিম ইমামদের জন্য এবং জনসাধারণের জন্য।”

এই হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী রহ: বলেন- “মুসলিম ইমামদের কল্যাণকামিতার অর্থ হলো- তাদের ভুল শোধরাতে সহায়তা করা, তাদের আনুগত্য করা, অন্যায়ে বাধা দেয়া, তাদের বিরোধিতা করতে নিষেধ করা, সুরুচির সাথে তাদের আলোচনা করা, আর মুসলমানদের যেসব অধিকার আদায়ে তারা গাফেল হয়ে যায়, সেসব ক্ষেত্রে তাদের অবগত করা।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “কোনো মানুষের ভয় যেনো কাউকে জেনে-বুঝে সত্য বলা থেকে বিরত না রাখে।” তিনি আরও বলেন- “অত্যাচারী বাদশাহর সামনে হক কথা বলা উত্তম সংগ্রাম।”

সৎ কাজে আদেশ আর অসৎ কাজে নিষেধ করার আবশ্যকতা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে আবশ্যিক করে দেয়। আর আল্লাহ তাআলা সৎ কাজে আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ করাকে ওয়াজিব করেছেন। এর মানে তিনি মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন। অনুরূপভাবে আমীরের জন্য মাশওয়ারা বা পরামর্শ করা ওয়াজিব হওয়ার বিষয়টি, যাদের সাথে পরামর্শ করবে, তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ওয়াজিব করে। কেননা, তারা যদি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে না পারে, তাহলে আমীর তাদের সাথে কী পরামর্শ করবে!

ইসলামী ইতিহাসজুড়ে মত প্রকাশে স্বাধীনতার অনেক বাস্তব নমুনা পাওয়া যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন বিশিষ্ট সাহাবী হযরত হাব্বাব বিন মুনযির রাদি আল্লাহু আনহু বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের অবস্থানের ব্যাপারে নিজস্ব মতামত পেশ করেছিলেন, যা ছিলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মতামতের বিপরীত। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মতামতকেই গ্রহণ করলেন। অনুরূপভাবে ইফকের ঘটনার সময় কিছু সাহাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মতামত দিয়েছিলেন- যাতে তিনি হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে তালাক দিয়ে দেন। পরে পবিত্র কুরআন হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নির্দোষ সাব্যস্ত করেছে। এছাড়াও আরও অনেক ঘটনা এমন আছে, যেখানে দেখা যায়, হযরত সাহাবায়ে কেরাম এবং তাদের পরবর্তী লোকগণ স্বাধীনভাবে নিজস্ব মতামত পেশ করেছেন।

এমন আলোচনার দ্বারা এটা স্পষ্ট যে, ইসলামী শরীয়তে স্বাধীনভাবে নিজস্ব মতামত পেশ করাটা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অধিকার। সুতরাং স্বাধীন মত প্রকাশের কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়া জায়েয নেই। কেননা, এই অধিকার তাকে শরীয়তই দিয়েছে। হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার মসজিদের মিম্বারে বসে মহিলাদের মহর নিয়ে আলোচনা করলেন। এক মহিলা তা প্রত্যাখ্যান করে বসলো। হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন- “তাকে কিছু বলো না। এর দ্বারা তিনি স্বীকার করে নিলেন, এই মহিলাই সঠিক বলেছে। এরপর তিনি বললেন- এই মহিলা সঠিক মাসআলা বলেছে আর উমর ভুল করেছে।”

মত প্রকাশে আমানতদারী ও সততাঃ প্রত্যেক মুসলমানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- মত প্রকাশে ক্ষেত্রে আমানতদারী এবং সততাকে ঠিক রাখবে। যা তিনি সঠিক মনে করেন, তাই বলবেন। যদিও সঠিক বলাটা তার জন্য অনেক কষ্টকর হয়। কেননা, স্বাধীন মত প্রকাশের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- সত্য ও সঠিক বিষয়টা সামনে আসা এবং শ্রোতা এর থেকে উপকার লাভ করা। ধোকা, প্রতারণা এবং সত্য গোপন করা স্বাধীন মত প্রকাশের উদ্দেশ্য নয়। মত প্রকাশের সময় কল্যাণের প্রতি খেয়াল রাখবে। শুধু নিজের সুনাম-সুখ্যাতি, সঠিক ক্ষেত্রে ঝামেলা সৃষ্টি করা, বাতেলকে হকের চাদরে ঢেকে দেওয়া, মানুষের অধিকারের অবমূল্যায়ন করা, আমীরদের খারাপ বিষয়কে বড় করা, আর তাদের ভালো বিষয়গুলোকে ছোট করা, তাদের ব্যক্তিত্বকে খাটো করা, তাদের সুখ্যাতিকে কমিয়ে দেওয়া এবং মানুষকে তাদের বিরুদ্ধে উস্কে দেওয়ার জন্য মত প্রকাশ করবে না। এসব শর্তের ভিত্তিতেই ইসলামী শরীয়ত মত প্রকাশে স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। এটি হলো একটি সভ্যতার উন্নতির এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সাথে সাথে এটা নিজের ব্যক্তিত্ব প্রকাশেরও অন্যতম হাতিয়ার।

টিকাঃ
১২৫. আবূ দাঊদ, মুসতাদরাক আল হাকিম, হাদিস নং-৪৫৬৮; মাজমাউজ জাওয়াইদ, হাদিস নং-১১৯/৬
১২৬. সুরা তাওবাহ, আয়াত নং-৭১
১২৭. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-৯২; সুনানু আবী দাউদ, হাদিস নং-৪৯৪৪; সুনানুন নাসাঈ, হাদিস নং-৪১৫৭
৭১৩. তাঁর নাম- মুহিউদ্দীন আবু জাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে শারফ আন-নববী। তার অন্যতম প্রসিদ্ধ কিতাব হলো- আল মিনহাজ ও রিয়াজুস সালেহীন।
৭১৪. আল মিনহাজ-৩/২
৭১৫. ইবনে হিশামী, হাদীস নং- ২১৬৯ সুনানু ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৪০৯৭
৭১৬. ইবনে হিশামী, হাদীস নং- ২১৯৪ সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৪৩৪৪
৭১৯. তাফসীরে কুরতুবী: ৯৬/৫

📘 ইসলামই দিয়েছে সবার অধিকার > 📄 ইসলামে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গোলাম আযাদ

📄 ইসলামে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গোলাম আযাদ


ভূমিকা: ইসলাম এসেছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রকৃত সম্মান ফিরিয়ে দিতে। ইসলামে মানব-সন্তান সবাই সমান। তাদের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয় হবে শুধুমাত্র তাকওয়া- খোদাভীতির মাপকাঠিতে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের পর সর্বপ্রথম আর জাতীয়তাবাদের দেয়াল সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দিয়েছেন। বর্ণ-বৈষম্য পুরোপুরিভাবে দূরীভূত হওয়ার বাস্তব নমুনা দেখা যায়- যখন হযরত বেলাল ইবনে রাবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু কাবার ছাদে উঠে চিৎকার করে কালেমায়ে তাওহীদের আওয়াজ দিয়েছিলেন। আর এর পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চাচাতো ভাই হামযা এবং পালকপুত্র যায়েদকে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন।

বিদায় হজ্ব এবং সাম্য নীতিঃ বিদায় হজ্বের সময় রাসুলে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষের মাঝে সমতার ঘোষণা দিয়ে বলেন- “তোমরা সবাই আদমের সন্তান। আর আদম আলাইহিসসালাম মাটির তৈরি। অনারবীর উপর কোনো আরবীর শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্বেতাঙ্গের উপর কোনো কৃষ্ণাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোনো কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সকল শ্রেষ্ঠত্ব শুধুমাত্র তাকওয়া- খোদাভীতির ভিত্তিতে।”

এখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং গোলামি প্রথা বিলুপ্তির আহ্বান করা হয়েছে। ইসলামের মূলনীতি হলো- “সকল মানুষ স্বাধীন। কেউ পরাধীন বা গোলাম নয়। কেননা, প্রত্যেকেই এক পিতার অন্তর্ভুক্ত আর জন্মগতভাবে সবাই স্বাধীন।” ইসলাম এমন এক জামানায় এই মূলনীতি ঘোষণা করেছে, যখন মানুষকে গোলাম বানিয়ে রাখা হতো আর বিভিন্ন ধরণের অপমান-লাঞ্ছনা আর বন্দী জীবনের স্বাদ আস্বাদন করানো হতো।

ইসলাম এবং গোলাম আযাদ: ইসলাম আগমনের পূর্বে মানবজাতি এমন এক সমাজ ব্যবস্থা আর সভ্যতার ছায়ায় জীবন যাপন করেছে- যেখানে ছিলো পৌত্তলিক নাগরিক ব্যবস্থা, সংকীর্ণমনা উপজাতি তন্তু, আর শ্রেণী-বৈষম্যের জড়াজড়ি। যা গোটা মানব সভ্যতাকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করে রেখেছিলো। এর মূলে ছিলো সমাজের এলিট শ্রেণীর ঐ সমস্ত লোক, যারা নেতৃত্ব এবং কর্তৃত্বের পূর্ণ অধিকার ভোগ করতো। আর সমাজের নিম্ন শ্রেণীর লোকদের সুন্দর জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার হরণ করে নিজেদের আয়ত্তে রাখতো। কোনো রকম দয়া-মায়া তাদেরকে করা হতো না।

এরপর ইসলাম এসে মুসলমানদেরকে বললো- গোলাম আযাদ করতে, তাদের সাথে সুন্দর ব্যবহার করতে, তাদের অনুগ্রহ আর ক্ষমা করতে। সাথে সাথে গোলাম আযাদ করাকে অনেক বড় এক আমল হিসেবেও গণ্য করে দিলো। ইসলাম মুসলমানদেরকে আহ্বান করলো- তারা যেনো নিজস্ব সম্পদ ব্যয় করে গোলাম আযাদ করে। মালিক পক্ষের জন্য গোলামের সাথে জুলুম করা বা প্রহার করার কাফফারা নির্ধারণ করে দিলো- গোলাম আযাদ। গোলাম আযাদ করাকে সওয়াবের কাজ গণ্য করলো। আর ইচ্ছাকৃত হত্যা, যেহার, কসম ভঙ্গ এবং রমজানের রোজা ভঙ্গের কাফফারা নির্ধারণ করে দিলো- গোলাম আযাদ। আর ইসলাম মালিকদেরকে আদেশ করেছে, যদি কোনো গোলাম মুক্তি পাওয়ার জন্য মুকাতাবা (টাকার বিনিময়ে মুক্তির চুক্তি) করতে চায়, তাহলে তাকে সর্বাত্মক সাহায্য করবে। এমনকি গোলাম আযাদের জন্য টাকা খরচ করাকে যাকাতের মাসরাফ (যেখানে যাকাত দেওয়া যায়) বানানো হয়েছে। আর মালিকের মৃত্যুর পর উসূল ওয়ালাদাহ আযাদ ঘোষণা করা হয়েছে।

গোলামী সমস্যা সমাধানে ইসলামের ব্যবস্থাপনাঃ গোলামী সমস্যা একটি মানবতা সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে ইসলাম তিন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সংক্ষেপে যা নিম্নরূপ: ১. যুদ্ধ ব্যতীত অন্য সকল গোলামীর উৎস বন্ধ করে দিয়েছে। ২. গোলাম আযাদের অনেক দিক বর্ণনা করেছে। ৩. মুক্তির পর তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেছে।

ইসলামী শরিয়ত মুসলিম সম্প্রদায়কে গোলাম আযাদ করার ব্যাপারে সীমাহীন উৎসাহ দিয়েছে এবং পরকালে এর বিনিময়ে প্রতিদানেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “যে ব্যক্তি গোলাম আযাদ করবে, আল্লাহ তায়ালা গোলামের প্রত্যেক অঙ্গের বিনিময়ে আযাদকারীর প্রত্যেক অঙ্গকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন। এমনকি গোলামের গুপ্তাঙ্গের বিনিময়ে তার গুপ্তাঙ্গকেও।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাদী মুক্ত করা এবং তাকে বিবাহ করার ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট করে বলেন- “যে ব্যক্তির বাদী আছে, আর সে তাকে খুব ভালো শিক্ষা দিলো এবং উন্নত আখলাক ও উত্তম শিষ্টাচার শেখালো, এরপর তাকে আযাদ করে বিয়ে করে নিলো; তার জন্য রয়েছে দু’টি প্রতিদান।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সাফিয়া বিনতে হুয়াই বিন আখতাব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আযাদ করে বিবাহ করেছিলেন। আর এই আযাদীটা তার বিবাহের মহর ছিলো।

গোলামদের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহমর্মিতা এবং তাদের ব্যাপারে বিভিন্ন নসীহতই ছিলো সমাজে গোলাম আযাদ হওয়ার মূল চাবিকাঠি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোলামদের সাথে সর্বদা সদ্ব্যবহারের আদেশ দিয়েছেন। এমনকি তাদেরকে ডাকার বেলায়ও সুন্দর নামে ডাকতে বলেছেন। তিনি বলেন- “তোমাদের কেউ যেনো এভাবে না বলে- আমার দাস, আমার দাসী। কেননা, তোমরা প্রত্যেকেই আল্লাহর দাস আর প্রত্যেকেই আল্লাহর দাসী। বরং তোমরা এভাবে বলবে- আমার গোলাম, আমার বাঁদী অথবা আমার সেবক, আমার সেবিকা।”

ইসলাম মালিকের উপর ওয়াজিব করে দিয়েছে- তারা যেনো তাদের গোলামদেরকে ভালো খাবার দেয়, ভালো পোশাক দেয়, আর তাদের সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ তাদেরকে দিয়ে না করায়। হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মালিকদেরকে ভালোভাবে নসীহত করে বলতেন- “তোমরা যা খাও, তাদেরকে তা খাওয়াও। তোমরা যা পরিধান করো, তাদেরকে তা পরিধান করাও। আল্লাহর মাখলুককে তোমরা কষ্ট দিও না।”

এছাড়াও ইসলাম গোলামদেরকে এমন এমন অধিকার দিয়েছে, যার দ্বারা তারা প্রকৃত মানুষের মর্যাদা পেয়েছে; যা কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ইসলাম গোলামকে অনর্থক শাস্তি দেওয়া বা প্রহার করার কারণে শাস্তি নির্ধারণ করেছে-তাদেরকে আযাদ করে দেওয়া। যাতে বাস্তবিক অর্থেই গোলামমুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব হয়। একবার হযরত ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার এক গোলামকে ডাকলেন। তার পিঠে আঘাতের দাগ দেখতে পেয়ে বললেন, তুমি কি এতে ব্যথা অনুভব করছো? সে বললো- না। তখন তিনি গোলামকে বললেন- যাও তুমি আযাদ। এরপর তিনি এক টুকরা মাটি হাতে নিয়ে বললেন- তাকে আযাদ করে আমার এতটুকু পরিমাণ সওয়াবও মেলেনি। কেননা, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে শুনেছি- “যে ব্যক্তি বিনা অপরাধে নিজের গোলামকে শাস্তি দিলো বা প্রহার করলো, তার কাফ্ফারা হলো- গোলামকে আযাদ করে দেওয়া।”

এমনকি ইসলাম গোলাম আযাদকে এতটাই সহজ করে দিয়েছে যে, ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় গোলাম আযাদের শব্দ ব্যবহার দ্বারাই তারা সাথে সাথে আযাদ হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তিনটি বিষয় এমন আছে, যা ইচ্ছা করে বললেও প্রয়োগ হয়, আবার ঠাট্টা করে বললেও প্রয়োগ হয়। সেগুলো হলো- তালাক, বিবাহ আর গোলাম আযাদ।”

অনুরূপভাবে ইসলাম গোলাম আযাদ করাকে গুনাহ মাফের উসিলা বানিয়েছে। যাতে এর মাধ্যমে একটি বৃহৎ সংখ্যক গোলামী থেকে মুক্তি পায়। কেননা, প্রত্যেক বনী আদমই গুনাহ করে থাকে। আর গুনাহ তো অবশ্যই মাফ করাতে হয়। সুতরাং দেখা যাবে গুনাহ মাফের জন্য প্রত্যেকে গোলাম আযাদ করতে থাকলে একসময় সমাজ গোলামমুক্ত হয়ে যাবে। গোলামমুক্তির ফযীলত বর্ণনা করে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “কোনো মুসলমান অন্য কোনো মুসলমানকে আযাদ করলে সে তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় হবে। আযাদকৃত ব্যক্তির প্রত্যেকটি অঙ্গ আযাদকারী ব্যক্তির প্রত্যেকটি অঙ্গ মুক্তির জন্য যথেষ্ট হবে।”

ইসলাম গোলামদেরকে মুকাতাবার মাধ্যমে মুক্তি লাভ করার সুযোগ দিয়েছে। আর মুকাতাবা হলো- “গোলাম তার মালিকের সাথে নির্ধারিত সম্পদের বিনিময়ে মুক্তি লাভের চুক্তি করা।” অর্থাৎ চুক্তিকৃত পরিমাণ সম্পদ যখন সে মালিককে দিতে পারবে, তখন সে আযাদ। এক্ষেত্রে ইসলাম মালিককে আদেশ দিয়েছে- “যদি কোনো গোলাম মুকাতাবার চুক্তি করে, তাহলে সে যেনো এ ব্যাপারে গোলামকে যাবতীয় সাহায্য করে। কেননা, মানুষ হিসেবে সে তো মৌলিকভাবে আযাদ। গোলামী তো পরে কোনো কারণবশত হয়েছে।” স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এর বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তিনি হযরত জুয়াইরিয়া বিনতে হারেসের মুকাতাবার টাকা নিজে আদায়ে করে দিয়ে আযাদ করে দিয়েছিলেন। পরে আবার তাকে বিবাহও করেছিলেন। মুসলমানগণ যখন এই বিবাহের খবর শুনতে পেলো, তখন তারা তাদের কাছে থাকা গোলাম- বাদীনীদেরকেও আযাদ করে দিলো। সাহাবায়ে কেরাম বলেন- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই বিবাহের কারণে বনী মুসতালিকের একশ লোককে আযাদ করে দেওয়া হয়।”

শুধু তাই নয়, ইসলাম গোলাম আযাদ করার জন্য যাকাতের টাকা ব্যয় করারও অনুমতি দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- “নিশ্চয়ই সদকা (যাকাত) হচ্ছে গরীব-মিসকিনদের জন্য, এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, যাদের অন্তর (ইসলামের প্রতি) আকৃষ্ট করা হয়, তাদের জন্য এবং গোলাম আযাদ করার জন্য।”

বর্ণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনে ৬০ জন ব্যক্তিকে আযাদ করেছিলেন। হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা করেছিলেন ৬০ জন। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন অনেকজন। হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন ৭০ জন। হযরত উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন ২০ জন। হযরত হাকীম ইবনে হিযাম রাযিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন ১০০ জন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন ১০০০ জন। হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন ৩০ হাজার জন।

ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা গোলাম ব্যবসা কমানোর ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। বরং তা পুরোপুরিভাবে বন্ধই করে দিয়েছে। এমনকি ইসলামী যুগের শেষের দিকে ইসলাম গোলামদেরকে গোলামীর শিকলমুক্ত করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষমতা এবং সামরিক বাহিনীর উচ্চপদে আসীন করেছিলো। এর সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো- ইসলামী ইতিহাসে মুসলমানদের বিরাট এক অংশে আযাদকৃত গোলামরা প্রায় তিনশত বছর শাসন করেছে। নিঃসন্দেহে এটি বিশ্বের ইতিহাসে এক বিরল উদাহরণ।

টিকাঃ
১১৪. আবু দাউদ ঈমান, হাদীস নং-৪৬২১ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২০২৩৯
১১৯. যেহার মানে হলো- নিজের স্ত্রীকে নিজের মা বা তার কোনো চিরস্থায়ী গাইর মাহরাম মহিলার কোনো অঙ্গের সাথে সাদৃশ্য দেওয়া।
১০০. উসূল ওয়ালাদাহ বলা হয় ঐ বাদীকে, মালের মালিক কর্তৃক যে কোনো সন্তানের মা হয়।
১০১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং -৬৩০৯ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৫০৯
১০২. একটি প্রতিদান আযাদ করার কারণে। অপরটি বিবাহ করার কারণে।
১০৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৮৯৫
১০৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৩৫৯৯ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৩৬৫
১০৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৫৫২ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২২৪৮
১০৬. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং -১৬৬১ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২২৪৯১
১০৭. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬৫৯ সুনানু আবু দাউদ, হাদীস নং-৫২১৬
১০৮. মুসনাদে হারেস, হাদীস নং-৩০০
১০৯. জামে তিরমিযী, হাদীস নং-১৫৪৬ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৫০৯
১১০. সীরাত ইবনুল হিশাম, ইবনে কাসীর:৩/৫
১১১. সুরা তাওবাহ, আয়াত নং-৬০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00