📘 ইসলামই দিয়েছে সবার অধিকার > 📄 ইসলামী সভ্যতায় সংখ্যালঘুদের অধিকার

📄 ইসলামী সভ্যতায় সংখ্যালঘুদের অধিকার


ভূমিকা:

ইসলামী শরীয়তের অধীনে মুসলিম সমাজে অমুসলিম সংখ্যালঘুদেরকে বিভিন্ন অধিকার ও বৈশিষ্ট্য দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে। যা পূর্বে কোনো দেশে, কোনো ধর্মে এমনকি কোনো মানবগোষ্ঠির আইনেও ছিলো না। এ অধিকারের মাধ্যমে মুসলিম সমাজ আর অমুসলিম সংখ্যালঘুদের মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। স্বয়ং আল্লাহ্ তা’আলা এ সম্পর্কে নীতি নির্ধারণ করে দিয়ে বলেন- “মারামারি করার ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করোনি, এবং তোমাদের ঘর-বাড়ী থেকে তোমাদের বের করে দেয়নি, তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করো ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। আল্লাহ্ তা’আলা ন্যায়পরায়ণদেরকে পছন্দ করেন।”৮৩

এই আয়াতটি এমন মৌলিক নৈতিকতা ও নীতিমালার ধারণা দিয়েছে, যার ভিত্তিতে মুসলিমগণ অমুসলিমদের সাথে আচার-ব্যবহার ও লেনদেন করে। আর তা হলো- ঐ সকল সংখ্যালঘুদের সাথে সদয় ব্যবহার ও ন্যায়বিচার করা, যারা তাদের শত্রু নয়। এগুলো এমন নীতিমালা- ইসলামের পূর্বে মানবসমাজ যা জানতই না। ফলে যুগযুগ ধরে সংখ্যালঘুরা হতাশায় আর চরম মানবেতর জীবন যাপন করেছে। তাদের সাথে ছিলো না কোনো ভালো ব্যবহার, ছিলো না কোনো ন্যায়বিচার। অধুনা আধুনিক সমাজব্যবস্থাতেও সংখ্যালঘুদের অধিকার বাস্তবায়নের জোর চেষ্টা চলছে; কিন্তু প্রবৃত্তি, পক্ষপাত আর সাম্প্রদায়িকতার কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠছে না।

সংখ্যালঘুদের বিশ্বাসের স্বাধীনতা:

ইসলামী শরীয়ত অমুসলিম সংখ্যালঘুদেরকে অসংখ্য অধিকার আর সুবিধা প্রদান করেছে। এর মধ্যে অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হলো- “তাদের স্বাধীন বিশ্বাসের অধিকার।” এক্ষেত্রে স্বয়ং আল্লাহ্ তা’আলা বলেন- “ধর্মের ক্ষেত্রে কোনো জবরদস্তি নেই।”৮৪

এ বাস্তবতা প্রকাশ পেয়েছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ চিঠিতে, যা তিনি ইয়ামানে আহলে কিতাবদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন। এ চিঠিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন- “... যে ইহুদী বা খৃষ্টান ইসলাম গ্রহণ করবে, সে মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। তাদের যা আছে, সব তাদেরই থাকবে। তারা নিজেদের মত করেই বাঁচবে। আর যারা ইহুদী বা খৃষ্টবাদের উপরই বহাল থাকবে, তাদেরকে সেখান থেকে সরে আসতে বাধ্য করা হবে না।”৮৫

ইসলামী শরীয়ত অমুসলিমদেরকে একদিকে বিশ্বাসের স্বাধীনতা উপভোগ করতে দিয়ে অপরদিকে তাদের জীবনের অধিকার বিন্দুমাত্রও হরণ করে দেয়নি; বরং মানুষ হিসেবে তাদেরও জীবন ধারণ ও বেঁচে থাকার পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করেছে। এক্ষেত্রে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “যে ব্যক্তি চুক্তি৮৬ দ্বারা কাউকে হত্যা করবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।”৮৭

অমুসলিমদের অত্যাচারে সতর্কীকরণ:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অমুসলিমদের উপর জুলুম এবং তাদের অধিকার খর্ব করার ব্যাপারে মুসলমানদেরকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। আর নিজেকে তিনি এসব জুলুমকারীদের বিপক্ষে দণ্ডায়মান বলেছেন। তিনি বলেন- “যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিভুক্ত লোকের প্রতি জুলুম করবে, তাদের অধিকার খর্ব করবে, সাধ্যের বাইরে তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিবে, অথবা জোরপূর্বক তাদের মাল কেড়ে নিবে; কিয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষে দাঁড়াবো।”৮৮

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক্ষেত্রে এক চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যার দ্বারা আনসারী সাহাবীর হত্যার বিচার করাকে। হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে সাহাল আনসারী রাযিয়াল্লাহু আনহু খায়বারে ইহুদী অধ্যুষিত এক এলাকায় নিহত হন। ফলে প্রবল ধারণা হলো যে, এই হত্যা কোনো ইহুদীই করেছে। কিন্তু তাদের এই ধারণার পেছনে কোনো প্রমাণ ছিলনা। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো ইহুদীকে বিন্দুমাত্র শাস্তি দিলেন না। বরং তাদের থেকে শুধু এই কসম চেয়েছিলেন যে- তারা হত্যা করেনি। হযরত সাহল বিন আবী হাসমা রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন- “তার গোত্রের একদল লোক খায়বারে গেলো। সেখানে গিয়ে তারা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়লো। পরে তাদের একজনকে সেখানে নিহত অবস্থায় পাওয়া গেলো। তারা ঐ এলাকাবাসীদেরকে বললো- তোমরা আমাদের সঙ্গীকে হত্যা করেছো। এলাকাবাসীরা বললো- আমরা তাকে হত্যা করিনি, আর কে তাকে হত্যা করেছে, তাও আমরা জানিনা।

পরে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট গিয়ে বললো- হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা খায়বারে গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের একজন সঙ্গীকে হত্যা করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- তোমাদের মধ্যে যে বড়, তাকে কথা বলতে দাও। পরে তিনি বললেন- তাকে কে হত্যা করেছে, এ বিষয়ে তোমাদের কাছে কোনো প্রমাণ থাকলে পেশ করো। তারা বললো- আমাদের কাছে তো এ ব্যাপারে কোনো প্রমাণ নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- তাহলে ইহুদীরা এ বিষয়ে কসম করবে যে- তারা এই হত্যা করেনি। তারা বললো- আমরা ইহুদীদের কসমের উপর আস্থা রাখছি না। পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নিহতের রক্ত বৃথা যাওয়াকে পছন্দ করলেন না। তাই তাদের রক্তপণস্বরূপ সরকার একশত উট দিয়ে দিলেন।”৮৯

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে যে দৃষ্টান্ত দেখালেন, তা কেউ কোনোদিন কল্পনাও করতে পারবে না। তিনি নিজ জিম্মায় মুসলমানদের মাল থেকে রক্তপণ আদায় করে দিলেন। যাতে আনসারীদের দিল শান্ত হয়। আর ইহুদীদের উপরও কোনো প্রকার জুলুম না হয়। অতএব ইসলামী রাষ্ট্রগুলোকে এমনভাবে বিচারকার্য চালানাো হবে, যাতে শুধু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কোনো ইহুদীর উপর শাস্তি প্রয়োগ করা না হয়।

অমুসলিমদের সম্পদ রক্ষা করাঃ

ইসলামী শরীয়ত অমুসলিমদের সম্পদ হেফাজত করার পূর্ণ জিম্মাদারী নিয়েছে। এজন্য অন্যায্যভাবে তাদের সম্পদ গ্রহণ করা এবং তাদের উপর জবরদখল করাকে ইসলাম সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করেছে। তাদের সম্পদ অন্যায্যভাবে দখল করাকে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ইত্যাদির মত জুলুম সাব্যস্ত করা হয়েছে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যমানায় নাজরানবাসীদের ক্ষেত্রে এর বাস্তব প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয়। তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে- “নাজরান ও তার আশপাশের লোকদের ধন-সম্পদ, ধর্ম ও উপাসনাগৃহের উপর আল্লাহ তাআলার নিরাপত্তা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দায়িত্ব রয়েছে। তাদের কমবেশী যা কিছু আছে সব তাদেরই থাকবে।”৯২

অমুসলিমদের অধিকার আরও বেশী স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে যখন- যখন দেখা যায় ইসলামী রাষ্ট্র তাদেরকে অক্ষম, বয়স্ক ও গরীব অবস্থায় বাইতুল মাল তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করে। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “তোমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। আর তোমাদের প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”৯৩

সুতরাং বুঝা গেলো, মুসলমানদের মত তাদের প্রতিও পরিপূর্ণভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। আর তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে।

তাদেরকে দান-সদকা করার ব্যাপারে হযরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদী পরিবারকে দান করতেন। আর তা ইহুদীদের কাছেও পৌঁছে দেয়া হতো।”৯৪

অমুসলিমদের ব্যাপারে ইসলাম যে মানবতা দেখিয়েছে, তা নজীরবিহীন। শুধুমাএ ইসলামী সভ্যতায় এটা সম্ভব হয়েছে। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লাশের নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় সেখানে দাঁড়ালেন। তাকে বলা হলো- “হে আল্লাহর রাসূল, এটা এক ইহুদীর লাশ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- সে কি মানুষ নয়?”৯৫

এভাবেই ইসলাম ও ইসলামী সভ্যতায় অমুসলিম সংখ্যালঘুদেরকে সব ধরণের অধিকার দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি হলো- “প্রত্যেকটি মানুষকে সম্মান করাই হলো প্রকৃত মানবতা; যতক্ষণ না সে তোমার উপর কোনো অন্যায় বা জুলুম করে।”

টিকাঃ
৮৩. সুরা মুমতাহিনাহ, আয়াত নং-৯
৮৪. সুরা বাক্বারাহ, আয়াত নং-২৫৬
৮৫. সীরাতে ইবনে হিশাম: -৬৬/২ সীরাতুননাবাবিয়্যাহ, ইবনে কাসীর:১৪৪/৫
৮৬. চুক্তিভুক্ত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- জিম্মী অর্থাৎ মুসলিম সমাজে সংখ্যালঘু অমুসলিম। অথবা ঐ সকল অমুসলিম, যারা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে আবদ্ধ।
৮৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২১৯৫ সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৭৬০
৮৮. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৩০২২ সুনানে বাইহাক্বী, হাদীস নং-১৬৫১
৮৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৭০২ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬৯৯
৯২. দালায়েলুন নবুওয়াত- ৪৪৫/৫ আত তাওরাতুল কুবরা:২৮৮/১
৯৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৪৯৩ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৮২৬
৯৪. আল আদাবুল লি আবি উবাইদা:৬৩০
৯৫. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২৬৬১ মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং-২০৬৯৩

📘 ইসলামই দিয়েছে সবার অধিকার > 📄 ইসলামী সভ্যতায় প্রাণীদের অধিকার

📄 ইসলামী সভ্যতায় প্রাণীদের অধিকার


ভূমিকাঃ

ইসলাম সামষ্টিকভাবে বাস্তবতার নিরিখে প্রাণীদের প্রতিও বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছে। কেননা, জীবনধারণ ও মানবকল্যাণে তাদের গুরুত্ব অপরিসীম। আর মহাবিশ্বের সুন্দর-সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় তাদেরও রয়েছে অসামান্য অবদান। এজন্য দেখা যায় আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন প্রাণীর নামে পবিত্র কুরআনের অনেক সুরার নামকরণ করেছেন। যেমন সুরা বাকারা– গাভীর নামে। সুরা আনআম– চতুষ্পদ জন্তুর নামে। সুরা নাহল– মৌমাছির নামে। সুরা আনকাবুত– মাকড়সার নামে। ইত্যাদি।

পবিত্র কুরআনে প্রাণীদের গুরুত্ব, বাসস্থান এবং মানুষের পাশে তাদের অবস্থান সম্পর্কে অনেক আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- “আর চতুষ্পদ প্রাণীগুলোকে তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাতে রয়েছে উষ্ণতা লাভের উপকরণ এবং বিভিন্ন রকম উপকারিতা। আর তোমাদের জন্য তাতে রয়েছে সৌন্দর্য; যখন সন্ধ্যায় তা ফিরিয়ে আনো এবং সকালে চারণে নিয়ে যাও। এগুলো তোমাদের বোঝা বহন করে এমন দেশে নিয়ে যায়, ভীষণ কষ্ট ছাড়া যেখানে পৌঁছা তোমাদের জন্য সম্ভব না। নিশ্চয়ই তোমাদের রব অতি দয়ালশীল ও পরম দয়ালু।”৯৫

ইসলামী শরিয়তে প্রাণীদের কিছু অধিকার:

ইসলামী শরিয়ত প্রাণীদের যেসকল অধিকার দিয়েছে, এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হলো- “তাদেরকে কষ্ট না দেয়া।” হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক গাধার নিকট দিয়ে অতিক্রম করলেন। ঐ গাধাটির মুখে দাগ দেয়া হয়েছিলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- “যে এই গাধাকে দাগ দিয়েছে, তার উপর আল্লাহর লানত বা অভিসাপ।”৯৬

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তিকে অভিশাপ দিয়েছেন, যে কোনো প্রাণীর অঙ্গছেদন করে।”৯৭

আর এ বিষয়টি অর্থাৎ প্রাণীদেরকে কষ্ট দেয়া, শাস্তি দেয়া এবং তাদের সাথে নির্মম ব্যবহার করা ইসলামী আইনে মারাত্মক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।

অনুরূপভাবে ইসলামী শরীয়ত প্রাণীদের অধিকার রক্ষার্থে তাদেরকে বন্দী রাখা এবং অনাহারে রাখার ব্যাপারেও বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছে। এক্ষেত্রে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “বিড়ালের কারণে এক মহিলাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। ঐ মহিলা বিড়ালকে খাবার দিত না, পানি দিত না। আর তাকে ছেড়েও দিত না যে, সে জমিনে কিছু কীটপতঙ্গ খেয়ে বাঁচে।”৯৮

হযরত সাহল ইবনে হানজালিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক উটের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন; যার পেট পিঠের সাথে লেগে গিয়েছিলো। পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- “তোমরা এর সেবা করা প্রাণীদের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। সুস্থ-সবল পশু পিঠে আরোহণ করো এবং তাদেরকে ঠিকমতো খাবার দাও।”৯৯

অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করেছেন- যে প্রাণীকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে, তাকে যেনো সে কাজেই ব্যবহার করা হয়। এরপর তিনি প্রাণী সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য বর্ণনা করে বলেন- “তোমরা তোমাদের পশুর পিঠকে মিম্বার বানানো হতে বিরত থাকো। কেননা, আল্লাহ পশুকে তোমাদের অনুগত করেছেন তোমাদের এক জনপদ থেকে আরেক জনপদ পৌঁছার জন্য। যেখানে তোমরা ভীষণ কষ্ট ছাড়া পৌঁছাতে সক্ষম হতে না।”৯৬

ইসলামী শরিয়ত প্রাণীদের অধিকার বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যা করেছে, তার মধ্যে আরেকটি হলো- “প্রাণীদেরকে অযথা হত্যায় লক্ষ্যস্থল বানানো যাবে না।” হযরত ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার কিছু কুরাইশ যুবকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা একটি পাখি বেঁধে তার উপর নিক্ষেপ করছিলো। পরে তিনি বললেন- “যারা এরূপ করবে, তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ সকল লোকদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন- যারা কোনো প্রাণীকে লক্ষ্যস্থল বানায়।”৯৭

ইসলামী শরিয়ত প্রাণীদের অধিকার রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে নীতিটি অবলম্বন করেছে, তা হলো- “প্রাণীদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করা।” এ একটি বাস্তব নমুনা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জাবানে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন- “একজন লোক রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে তার ভীষণ পিপাসা লাগলো। সে একটি কূপে নেমে পানি পান করলো। সে কূপ থেকে বের হয়ে দেখতে পেলো- একটি কুকুর হাঁপাচ্ছে এবং পিপাসায় কাতর হয়ে মাটি চাটছে। সে ভাবলো, কুকুরটাও আমার মত প্রচণ্ড পিপাসায় লেগেছে। সে কূপের ভেতর নামলো, এবং নিজের মোজা ভরে পানি নিয়ে মুখ দিয়ে ধরে উপরে এসে কুকুরকে পানি পান করালো। আল্লাহ তাআলা তার এই আমল কবুল করলেন এবং তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিলেন। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন- হে আল্লাহর রাসূল! চতুষ্পদ জন্তুর উপকার করলেও কি আমাদের সওয়াব হয়? তিনি বললেন- প্রত্যেক প্রাণীর উপকার করাতেই সওয়াব রয়েছে।”৯৮

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “এক সফরে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ছিলাম। তিনি কোনো প্রয়োজনে একটু দূরে গেলেন। আমরা তখন দুটি বাছসহ একটি পাখি দেখতে পেয়ে বাচ্চা দুটিকে ধরে নিলাম। মা পাখিটি সাথে সাথে আসলো এবং পাখা ঝাপটিয়ে বাচ্চার জন্য অস্থিরতা প্রকাশ করতে লাগলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে বললেন- কে এই পাখিটার বাচ্চা নিয়ে এসে তাকে অস্থিরতায় ফেলেছে? বাচ্চাগুলোকে তাদের মায়ের কাছে ফিরিয়ে দাও।''৬৭

অনুরূপভাবে ইসলাম প্রাণীদের অধিকার রক্ষার্থে তাদেরকে উর্বর ভূমিতে চারণোর নির্দেশ দিয়েছে। যদি নিজ এলাকায় উর্বর ভূমি না থাকে, তাহলে অন্য কোনো এলাকার উর্বর ভূমিতে পাঠিয়ে দিতে হবে, যাতে তাদের খাবারের কোনো কষ্ট না হয়। এক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “আল্লাহ তায়ালা নম্র। তিনি নম্রতাকে পছন্দ করেন। নম্রতায় তিনি সন্তুষ্ট হন। নম্রতার ক্ষেত্রে তিনি সাহায্য করেন, কিন্তু কঠোরতার ক্ষেত্রে করেন না। যখন তোমরা এসব বোবা প্রাণীর উপর আরোহণ করবে, তখন তোমরা এদের স্বাভাবিক মনজিলে নামাও। (অর্থাৎ স্বাভাবিক দূরত্বের বেশি চালিয়ে তাদেরকে কষ্ট দিও না।) আর যেখানে বিশ্রাম করাবে, সেখানকার জমিন যদি পরিষ্কার হয়- ঘাস-পাতা না থাকে, তাহলে শীঘ্রই সেখান থেকে অন্যস্থানে নিয়ে যাও। আর না হয় তা খেয়ে তাদের হাড় শুকিয়ে যাবে।”৬৮

প্রাণীদের সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসলামী শরিয়াত শুধু দয়া আর নম্রতার কথা বলেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং এরচেয়েও উপরূহ আরেকটি অধিকার তাদেরকে দিয়েছে। সেটা হলো- “ইহসান বা তাদের কল্যাণ কামনা করা এবং তাদের অনুভূতিকে সম্মান করা।”

এই উত্তম আবদারকে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে তখন, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোশত খাওয়ার জন্য প্রাণী জবাই করার সময়েও তাদেরকে সব ধরনের কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। চাই কষ্টটা হোক শারীরিকভাবে; ভুলভাবে ছুরি চালানোর মাধ্যমে বা ছুরিতে ধার না থাকার কারণে। অথবা কষ্টটা হোক মনের দিক দিয়ে; তাদেরকে ছুরি দেখানোর মাধ্যমে। কেননা, এসব বিষয় তাদের মৃত্যুর কষ্টটাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।

হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আমি দুটি জিনিস মনে রেখেছি। তিনি বলেন- “আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকটি বিষয়ে তোমাদের উপর ইহসানকে আবশ্যক করেছেন। সুতরাং যখন তোমরা (জিহাদের ময়দানে শত্রুকে বা কিসাসস্বরূপ কাউকে) হত্যা করবে, তখন দয়ার সাথে হত্যা করো। যখন কোনো প্রাণীকে জবাই করবে, তখন দয়ার সাথে জবাই করো। তোমাদের সবাই যেনো ছুরি ভালোভাবে ধার দিয়ে নেয়, আর তার পশুকে যেনো কষ্ট না ফেলে।”৬৯

অনুরূপভাবে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- এক ব্যক্তি একটি বকরি জবাই করার জন্য তাকে শুইয়ে দিয়ে ছুরি ধার দিচ্ছিলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখে বললেন- “তুমি কি এই প্রাণীকে কয়েকবার মারতে চাও? তুমি কেনো একে শোয়ানোর পূর্বেই ছুরি ধার দিলে না?”৭০

এই হলো ইসলামে প্রাণীদের অধিকার। যদি তারা ইসলামী সভ্যতার অধীনে আশ্রয় লাভ করে, তাহলে তাদের জন্য রয়েছে- শান্তি, নিরাপত্তা, আনন্দ ও স্বাধীন জীবনযাত্রা।

টিকাঃ
৯৫. সুরা নাহল, আয়াত নং-৫-৬
৯৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২১১৯
৯৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২১৬৯ সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং-৪৪৩৪
৯৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২২৩৪ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২২৪৮
৯৯. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং- ২৯৬৯ মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং-১৭৭৬২
৯৬. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৬৬৭ সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী, হাদীস নং-১০১১০
৯৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫৯৬৬ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২২৪৬
৯৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২২৩৪ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২২৪৮
৬৭. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৩২৫৮
৬৮. মুআত্তা মালেক, হাদীস নং-১৭৬৭
৬৯. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ১৯৫৫ সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৮১৫
৭০. কিতাবুল আযাহী, হাদীস নং- ৫৬১০

📘 ইসলামই দিয়েছে সবার অধিকার > 📄 ইসলামী সভ্যতায় পরিবেশের অধিকার

📄 ইসলামী সভ্যতায় পরিবেশের অধিকার


আল্লাহ তায়ালা এই দুনিয়াতে নির্মল-কোমল, কল্যাণকর ও পবিত্র এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। আর তা মানুষের অনুকূল করে দিয়েছেন এবং তা হেফাজতের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও তিনি নিয়েছেন। অনুরূপভাবে তিনি এই মহাজাগতিক সুন্দরের সৃষ্টির বিষয়ে চিন্তা-ভাবনাও করতে বলেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- “তারা কি তাদের উপরে আসমানের দিকে তাকিয়ে দেখে না, কিভাবে আমি তা সৃষ্টি করেছি এবং তা সুশোভিত করেছি? তাতে কোনো চিহ্নও নেই। আর আমি জমিনকে বিস্তৃত করেছি, তাতে পর্বতমালার ভার স্থাপন করেছি এবং তাতে প্রত্যেক প্রকারের নয়নাভিরাম উদ্ভিদ উদগত করেছি।”

মানুষ এবং পরিবেশ: এভাবে একজন সুস্থ রুচির মানুষ ও তার চারপাশের সজীব ও জীবন্ত পরিবেশের সাথে এক মায়া-মুহাব্বত ও সখ্যতা গড়ে ওঠে। মানুষকে যথাযথ পরিবেশ সংরক্ষণ করতে হয়। কেননা, এটা দুনিয়াতে তাদের জন্যই উপকারী। এর মাধ্যমে একটি সাচ্ছন্দ্যকর সুন্দর জীবন লাভ করা যায়। আর আখিরাতেও তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বিশেষ প্রতিদান। পরিবেশ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা মহাবিশ্বের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও নিশ্চিত করে। যা মানুষ এবং প্রকৃতির মাঝে পারিবারিক সম্পর্ক ও মৌলিক বন্ধন তৈরী করেছে। আর এ বন্ধনের মূল ভিত্তি হলো ঈমান। যদি কোন ব্যক্তি প্রকৃতির কোন উপাদানকে অপব্যবহার করে বা তা ধ্বংস করে ফেলে, তাহলে এর দ্বারা সেই বিশ্বই সন্ত্রাসীর ক্ষতিগ্রস্থ হবে, যেখানে সে বসবাস করছে।

পরিবেশ রক্ষায় ইসলামী শরীয়তের কিছু নমুনা: ইসলামী শরীয়ত এই পৃথিবীতে অবস্থিত প্রত্যেকটি মানুষের জন্য একটি ব্যাপক নীতিমালা ঘোষণা করেছে, তা হলো- “এই মহাবিশ্বের কোন ধরণের ক্ষতি না করা।” যেমন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “ইসলাম কারো ক্ষতি হওয়া এবং কারো ক্ষতি করা কোন কোনটাকই পছন্দ করে না।”

ইসলামী শরীয়ত পরিবেশ নষ্ট করা এবং দূষিত করার ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার নির্দেশ প্রদান করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তোমরা তিনটি অভিশপ্ত কাজ হতে বিরত থাকো। সেগুলো হলো- ১. পানির ঘাটে ২. চলার পথে ৩. কোনো কিছুর ছায়ায় পায়খানা করা।”

পরিবেশ রক্ষার্থে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাস্তা থেকে কদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলারও অধিকার সাব্যস্ত করেছেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তোমরা রাস্তার উপর বসা থেকে বিরত থাকো। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, এছাড়া তো আমাদের কোনো উপায় নেই। কেননা, এটা আমাদের উঠাবসার জায়গা। এখানে বসে আমরা কথাবার্তা বলে থাকি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- তোমাদের যদি রাস্তার উপর বসতেই হয়, তাহলে রাস্তার অধিকার আদায় করে বসবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, রাস্তার অধিকার কী? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-... কদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা।” এখানে কদায়ক বস্তু দ্বারা এ সকল বস্তুকেই বুঝানো হয়েছে, রাস্তায় চলাচলের সময় যা মানুষের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এবং কষ্টের কারণ হয়।

আরেকটি আগে বেড়ে পরিবেশ রক্ষায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিদান লাভের সুসংবাদও দিয়েছেন। তিনি বলেন- “আমার নিকট আমার উম্মতের ভালো-মন্দ সব আমল পেশ করা হয়েছে। আমি তাদের ভালো আমলগুলোর মধ্যে দেখলাম, অন্যতম একটি ভালো আমল হলো- রাস্তা থেকে কদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর মন্দ আমলগুলোর মধ্যে দেখলাম, অন্যতম একটি মন্দ আমল হলো- মসজিদে শুধু ফেলে পা পরিষ্কার না করা।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদ্বীপের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়ে বলেন- “আল্লাহ তায়ালা পবিত্র; তিনি পবিত্রতাকে ভালোবাসেন। তিনি পরিষ্কার; পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন। ... অতএব তোমরা তোমাদের ঘরবাড়ীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখো। আর তোমরা ইহুদীদের সাদৃশ অবলম্বন করোনা।”

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত ইসলামী শরীয়তের এতসব চমৎকার নীতিমালা এবং উত্তম শিক্ষা মানুষকে সব ধরণের অপরিচ্ছন্নতা থেকে বেঁচে থাকতে উৎসাহ প্রদান করে। আর এর মাধ্যমে মানুষ শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তিদায়ক সুন্দর একটি জীবন লাভ করতে পারে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনেক বক্তব্যে পরিবেশ সুন্দর রাখা এবং সর্বদা পরিপাটি হয়ে থাকার উপর উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। একবার এক সাহাবী এসে জিজ্ঞেস করলেন- হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি সুন্দর জামা আর সুন্দর জুতা পরি, তাহলে এটা কি অহংকার হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন- “আল্লাহ তায়ালা সুন্দর; তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন। আর অহংকার তো হলো দম্ভ করে সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে তুচ্ছ করা।” আল্লাহ তায়ালা যে চমৎকার এবং নির্মল পরিবেশ দান করেছেন, এ পরিবেশের যত্ন নেয়া নিঃসন্দেহে সৌন্দর্যের অন্তর্ভুক্ত। যে সৌন্দর্যকে আল্লাহ তায়ালা ভালোবাসেন।

অনুরূপভাবে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বক্তব্যে দেখতে পাই- সুগন্ধিসমূহ পছন্দ করা, মানুষের মাঝে তা ছড়িয়ে দেয়া, পরস্পরকে তা উপহার দেয়া এর মাধ্যমে পরিবেশকে মোহিত করা এবং দুর্গন্ধ দূর করা খুবই উৎকৃষ্ট কাজ। তিনি বলেন- “যার নিকট কোনো সুগন্ধি ফুল পেশ করা হয়, সে যেনো তা ফিরিয়ে না দেয়। কেননা, তা ওজনে হালকা আর ঘ্রাণে উত্তম।”

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-কানুনগুলো ইসলামী শরীয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জমিতে চারা রোপণ করা এবং জমি চাষাবাদ করার উপর ইসলাম বিশেষভাবে উৎসাহ প্রদান করেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “কোনো মুসলমান একটি ফলের চারা রোপণ করলো, এরপর এই গাছ থেকে যেসব ফল খাওয়া হবে, এগুলো তার পক্ষ হতে সদকা। এই গাছ থেকে যা চুরি হবে, সেগুলোও সদকা। বন্য পশুরা যা খাবে, তাও সদকা। পাখিরা যা খাবে, তাও সদকা। কেউ এসে অন্যায়ভাবে যা নিবে, তাও তার পক্ষ থেকে সদকা।” অন্য এক বর্ণনায় আছে, এই সদকা কিয়ামত পর্যন্ত চলবে।”

ইসলামের অন্যতম একটি মাহাত্ম্য হলো- পরিবেশ রক্ষার্থে যেসব চারা রোপণ করা হয়, যতদিন পর্যন্ত এসব চারা থেকে উপকার লাভ হয়, ততদিন পর্যন্ত তার সওয়াব হতে থাকবে। যদিও এর মালিকানা এই রোপণকারীর হাত থেকে অন্য কারও হাতে চলে যায় অথবা এই রোপণকারী বা চাষাবাদকারী মারা যায়। কোনো ব্যক্তি যদি গাছ রোপণ করে, বীজ ফেলে বা পানি সিঞ্চন ইত্যাদির মাধ্যমে কোনো অনাবাদী জমিতে আবাদ করে তোলে, তাহলে এ ব্যাপারেও রয়েছে ইসলামী শরীয়তের উত্তম দিকনির্দেশনা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “যদি কেউ অনাবাদী জমিনকে আবাদ করে, তাহলে সে জমিন তার। আর পশু-পাখি সেখান থেকে যা খাবে, এটা হবে তার পক্ষ থেকে সদকা।”

পানি হলো প্রাকৃতিক পরিবেশের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই পানিকে পরিমিত ব্যয় করা এবং তা সংরক্ষণ করা ইসলামের দু'টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পানি যদি প্রচুর পরিমাণেও মজুদ থাকে, তবুও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে পরিমিতভাবে ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার হযরত সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন- যখন তিনি ওযু করছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “হে সাদ! এই অপচয় কেনো? সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন- পানির মধ্যেও অপচয় আছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- হ্যাঁ, যদিও তুমি প্রবাহিত নদীতে ওযু করো।”

অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদ্ধ পানিতে পেশাব করে পানি নষ্ট করতেও নিষেধ করেছেন। এই ছিলো পরিবেশ রক্ষায় ইসলামী সভ্যতার সংক্ষিপ্ত দৃষ্টিভঙ্গি। যে দৃষ্টিভঙ্গিটি পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে সুস্বাস্থ্য-সুন্দর ও নিরাপদ রাখতে সহায়তা করে। আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি সুন্দরের পৃথিবী এবং সুন্দর পরিবেশ বজায় থাকে পৃথিবীতে পরস্পরে পরস্পরের প্রতি সাহায্য-সহযোগিতা এবং সহমতের মাধ্যমে। আর এই সুন্দর পরিবেশ রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ওয়াজিব করা হয়েছে।

টিকাঃ
৭১. সূরা কাফ, আয়াত নং-৬-৭
৭২. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ২৭২৯ আবূ মুকাদ্দামাক হিল হাকেম, হাদীস নং-২৫৪৬
৭৩. আবূ মুকাদ্দামাক হিল হাকেম, হাদীস নং- ৫৯৪
৭৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২০০০ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২১২১
৭৫. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৫৫০ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৭৯৮
৭৬. জামে তিরমিযী, হাদীস নং-২৭৯৮
৭৭. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৮৯ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৭৯৮
১৬৬. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২২৯৩ জামে তিরমিযী, হাদীস নং-২৭১৯
১৬৭. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৫৫২ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৫৪০১
২০০. সুনানুন নাসায়ী, হাদীস নং-৫৭৯৬ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৮৬১০
১৬৪. তাঁর পুরা নাম- সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস ইবনে উহাইব আয় যুহরী। তিনি ছিলেন আশারা মুবাবশারার একজন। (উসদুল গাবাহঃ২/৪৩০)
১৬৫. সুনানু ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৪২৩ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৭০৬৫
২০০. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৮১ সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৬৯

📘 ইসলামই দিয়েছে সবার অধিকার > 📄 ইসলামী সভ্যতায় ধর্মের স্বাধীনতা

📄 ইসলামী সভ্যতায় ধর্মের স্বাধীনতা


ধর্মের স্বাধীনতায় ইসলামের মৌলিক নীতিঃ ইসলামে ধর্মের স্বাধীনতার বা বিশ্বাসের স্বাধীনতা নিয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও মৌলিক নীতিমালা বর্ণনা করে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা বলেন- “দ্বীন বা ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে কারও কোনো জবরদস্তি নেই। নিশ্চয়ই হেদায়াত আর ভ্রষ্টতা স্পষ্ট হয়ে গেছে।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার পরবর্তী মুসলমানগণ কাউকেই জোর করে মুসলিম হতে বাধ্য করেননি। আবার যারা মৃত্যুর ভয়ে বা শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য ইসলাম গ্রহণের ভান ধরেছে, তাদেরকেও প্রশ্রয় দেননি। আর এটা তাঁরা কিভাবে করবেন? কেননা, তারা তো জানেন যে, বাধ্য হয়ে লোক দেখানো ইসলাম গ্রহণের পরকালে কোনোই মূল্য নেই। অথচ এই আখেরাতের জন্যই তো মুসলমানের সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টা!

পূর্বোক্ত আয়াতের প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছে- হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, জাহিলী যুগে যদি কোনো মহিলার সন্তান বেঁচে না থাকতো, তাহলে সে এভাবে মানত করতো- “যদি এবার তার সন্তান বাঁচে, তাহলে তাকে ইহুদী ধর্মে দীক্ষিত করাবো।” পরে যখন ইহুদী গোত্র বনু নাজিরের উচ্ছেদ করা হয়, তখন তাদের মধ্যে আনসারদের এমন ইহুদী সন্তানরাও ছিলো। ফলে আনসাররা বললো- আমরা আমাদের সন্তানদেরকে ইহুদিদের সাথে ছাড়বো না। পরে আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেন- “দ্বীন বা ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে কারও কোনো জবরদস্তি নেই। নিশ্চয়ই হেদায়াত আর ভ্রষ্টতা স্পষ্ট হয়ে গেছে।”

ঈমান ও মানুষের ইচ্ছাঃ ইসলামে ঈমান আনা এবং না আনাকে মানুষের ইচ্ছা ও আন্তরিক অভিপ্রায়ের উপর ছেড়ে দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন- “যে চায় সে ঈমান আনুক, আর যে চায় সে কুফরী করুক।”

পবিত্র কুরআনও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দৃষ্টিকে এই বাস্তবতার দিকেই ফিরিয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে স্পষ্ট বলা হয়েছে- “তার দায়িত্ব শুধু পৌঁছে দেয়া। মানুষকে জোরপূর্বক ইসলামে দাখিল করা তার দায়িত্ব না।” পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- “আপনি কি মানুষকে বাধ্য করবেন, যাতে তারা মুমিন হন?” আরও বলা হয়েছে- “আপনি তাদের উপর বলপ্রয়োগকারী নন।” আরও বলা হয়েছে- “আর যদি তারা ঈমান আনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আমি তো আপনাকে তাদের রক্ষক হিসেবে পাঠাইনি। (বরং শুধু) দাওয়াত পৌঁছে দেওয়াই আপনার দায়িত্ব।”

এগুলোর দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, মুসলিম সংবিধান ‘বিশ্বাসের স্বাধীনতা’ বা ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’কে নিশ্চিত করেছে। আর কাউকে জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করাকে কঠিনভাবে নিষেধ করেছে।

ইসলামে ধর্মীয় সহনশীলতাঃ ধর্মীয় স্বাধীনতার অর্থ হলো ধর্মীয় সহনশীলতাকে স্বীকৃতি প্রদান করা। মদীনার প্রথম সংবিধানে ধর্মীয় সহনশীলতাকে স্বীকৃতি দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাস্তব নমুনা পেশ করেছেন। তিনি ইহুদীদেরকে এমন স্বাধীনতা দিয়েছিলেন যে, তারা মুসলমানদের সাথে এক জাতি হিসেবে বসবাস করতো। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি শক্তিশালী এবং বিজয় লাভ করা সত্ত্বেও কুরাইশদেরকে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করেননি। বরং তিনি তাদেরকে বলেছেন- “যাও তোমরা আজকে স্বাধীন।”

তার পদাঙ্কে অনুসরণ করে দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুও জেরুজালেমের খৃষ্টানদেরকে তাদের জীবন, গির্জা এবং ক্রুশের নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। তাদের কারও কোনো ক্ষতি করা হয়নি। তাদের ধর্মের কারণেও তাদেরকে কোনো রকম জবরদস্তি করা হয়নি।”

বরং ইসলাম প্রতিপক্ষকে ধোঁকা ও অবজ্ঞা না করে বস্তুনিষ্ঠভাবে তাদের সাথে দ্বীন বিষয়ে আলোচনা করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। এক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা বলেন- “হে নবী! আপনি আপনার রবের দিকে মানুষকে আহ্বান করুন হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে। আর তাদের সাথে বিতর্ক করুন সুন্দরতম পন্থায়।”

সুতরাং এই সহনশীল নীতির ভিত্তিতে মুসলমান ও অমুসলমানদের মাঝে কথাবার্তা হওয়া উচিত। আহলে কিতাবদের সাথে কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রেও পবিত্র কুরআন এই আয়াতের দিকেই আহ্বান করেছে। কুরআনে বলা হয়েছে- “হে নবী আপনি বলুন, হে আহলে কিতাবগণ! তোমরা এমন কথার দিকে আসো, যা আমাদের মাঝে এবং তোমাদের মাঝে সমান। তা হলো- আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবো না। তার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবো না। আর আল্লাহ ছাড়া আমরা কেউ কাউকে রব হিসেবে গ্রহণ করবো না। তারপর যদি তারা বিমুখ হয়, তবে বলে দেন- তোমরা সাক্ষী থাকো যে আমরা মুসলমান।”

এর অর্থ হলো- অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দিয়ে যখন কোনো ফল পাওয়া যায় না, তখন তাদেরকে আপন ধর্মের উপরেই ছেড়ে দেওয়া হবে। যা নিয়ে তারা সন্তুষ্ট থাকে। আর এই বিষয়গুলিকেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে সূরা কাফিরুনের শেষ আয়াতে। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যে কথার মাধ্যমে মুশরিকদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার পরিসমাপ্তি ঘটেছে, তা হলো- “তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম, আর আমার জন্য আমার ধর্ম।”

টিকাঃ
১৬৭. সূরা বাকারাহ, আয়াত নং-২৫৬
১৬৮. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২৬৪৮
১৬৯. সূরা কাহাফ, আয়াত নং-২৯
১৬৯. সূরা ইউনুস, আয়াত নং-৯৯
২০০. সূরা গাশিয়াহ, আয়াত নং-২২
২০১. সূরা শুরা, আয়াত নং-৪৮
২০২. সীরাতে ইবনে হিশাম: -৪৬১/২ আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ:৩৩৯/৪
২০৩. তাফসিরুল উলামি মুফরাহঃ ৩/১৫৫
২০৪. সূরা নাহল, আয়াত নং-১২৫
২০৫. সূরা আল ইমরান, আয়াত নং-৬৪
২০৬. সূরা কাফিরুন, আয়াত নং-৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00