📄 ইসলামী সভ্যতায় মানবাধিকার
ভূমিকাঃ
পশ্চিমা দার্শনিক 'ফ্রেডরিক নিত্শে' বলেন- "দুর্বল-অসহায় মানুষগুলো একসময় অস্থায়ী মৃত্যুবরণ করবে, এটাই হলো আমাদের মানবতার প্রতি ভালোবাসার মৌলিক কারণ।"৩৪
কিন্তু ইসলামী শরিয়ত ও দর্শন কখনও নৈতিকতা ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়নি। ভাষা-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সমগ্র মানব জাতির মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম কখনও পিছিয়ে থাকেনি। পিছু হটেনি পারিপার্শ্বিক অন্যান্য বিষয় থেকেও। বরং ইসলামী শরীয়তের মাধ্যমেই এই সমস্ত অধিকারগুলো রক্ষা করা হয়েছে এবং এর বাস্তবতা নিশ্চিত করা হয়েছে। আর যারা সীমালঙ্ঘন করবে, তাদের জন্য রাখা হয়েছে শাস্তির বিধান।
ইসলামের দৃষ্টিতে মানবতাঃ
ইসলাম মানবতাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে। স্বয়ং আল্লাহ তাআলার বাণী থেকেই একথা সুস্পষ্ট। তিনি বলেন- "আমি মানবজাতিকে সম্মানিত করেছি। তাদেরকে জলস্থলে চলাচলের বাহন দান করেছি। তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি। আর আমার সকল সৃষ্টির মাঝে তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।"৩৫
এই দৃষ্টিভঙ্গিটি ইসলামে মানবাধিকার রক্ষায় বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব রাখে। বিশেষ করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সকল অধিকারকেই সন্নিবেশিত করে। মুসলিম-অমুসলিম-ভাষা-বর্ণ-জাতি-নির্বিশেষে প্রত্যেকটি মানুষের অধিকার ইসলাম দিয়েছে। এই অধিকার কেউ বাতিল বা পরিবর্তন করতে পারবে না। কেননা, স্বয়ং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই দেয়া হয়েছে এই অধিকার।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্বের ভাষণে এ বিষয়টিকে আরও মজবুত করেছেন। তাঁর সেই ভাষণটি ছিল মানবাধিকারের পক্ষে এক বলিষ্ঠ উচ্চারণ। সেদিন তিনি বলেছিলেন- "তোমাদের এই শহরে, তোমাদের এই মাসে তোমাদের এই দিন যেমন পবিত্র; কেয়ামত পর্যন্তও তোমাদের জান-মাল তেমন পবিত্র।"৩৬
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই ভাষণের মাঝে মানুষের জান, মাল ও ইজ্জত-সম্মানসহ সমস্ত অধিকারকে নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি মানুষের সর্বোচ্চ অধিকার- জীবনের অধিকারকে নিশ্চিত করতে গিয়ে বলেন- "সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো, আল্লাহ তাআলার সাথে কাউকে শরীক করা....এবং নিজের জীবন নিয়ে শেষ করা।"৩৭
উক্ত হাদীসে জীবন শব্দ দ্বারা বিনা অপরাধে শেষ করা প্রত্যেকটি জীবনকেই বুঝানো হয়েছে। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবজীবন রক্ষার প্রতি একটু বেশিই গুরুত্ব দিয়েছেন। এজন্য তিনি আত্মহত্যা নিষিদ্ধ করে আত্মরক্ষাকে ওয়াজিব করেছেন। তিনি বলেন- "যে ব্যক্তি পাহাড় থেকে পড়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামী। চিরকাল সে জাহান্নামে পাহাড় থেকে পড়তে থাকবে। যে ব্যক্তি বিষ পান করে আত্মহত্যা করবে, তার হাতে বিষ দেয়া থাকবে, চিরকাল সে জাহান্নামে বিষ পান করতে থাকবে। যে ব্যক্তি লোহার মাধ্যমে আত্মহত্যা করবে, তার হাতে লোহা দেয়া থাকবে, চিরকাল সে জাহান্নামে লোহা দিয়ে পেট আঘাত করতে থাকবে।"৩৮
এছাড়াও ইসলাম এ সমস্ত কাজকে হারাম ঘোষণা করেছে, যা মানবজীবনে কোনো রকম ক্ষতি সাধন করে। চাই সে কাজটি ভয় দেখানোর জন্য হোক বা অদ্ভূত করার জন্য হোক অথবা অনর্থক শাস্তি দেয়ার জন্য হোক। হযরত হিশাম ইবনে হাকেম রাজিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একথা বলতে শুনেছি- "আল্লাহ তাআলা ঐসকল ব্যক্তিকে শাস্তি দেবেন, যারা দুনিয়াতে মানুষকে (অনর্থক) শাস্তি দেয়।"৩৯
সকল মানুষ সমানঃ
ইসলাম মানুষকে ব্যাপকতাকে সম্মানীত করেছে। মানুষের জান, মাল ও সম্মানের উপর আঘাত করাকে হারাম ঘোষণা করেছে। জীবনের সর্বোচ্চ অধিকার বাস্তবায়ন করেছে। এরপর সকল মানুষের সম্মান অধিকার নিশ্চিত করেছে। ইসলামে ব্যক্তি-গোষ্ঠী, জাত-বংশ, রাজা-প্রজা, ধনী-গরীব বণিক-শ্রমিক সবাই সমান। এদের মাঝে কোনো উঁচুনিচু শ্রেণিভেদ নেই। শরীয়তের হুকুম-আহকামে আরব-অনারব, সাদা-কালো ও রাজা-প্রজা মাঝে কোনো তফাত নেই। বরং মানুষ হিসেবে আল্লাহ তাআলার কাছে সবাই সমান। তবে এক থেকে তুলনায় শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করার মাপকাঠি হলো শুধুমাত্র- ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- "হে মানব সকল! তোমাদের রব একজন। তোমাদের পিতা একজন। তোমরা প্রত্যেকেই আদমের সন্তান। আর আদম আলাইহিসসালাম মাটির তৈরি। তোমাদের মাঝে যে বেশি খোদাভীরু, সেই তোমাদের চেয়ে বেশি সম্মানিত। কোনো অনারবীর উপর আরবীয়ের একমাত্র মাপকাঠি হলো- ‘তাকওয়া’।"৪০
যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাস্তব জীবনে এ প্রতি লক্ষ্য করা হয়, তাহলে সেখানেও আমরা সমান অধিকার বাস্তবায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। হযরত আবু উমামাহ রাজিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন- "একবার হযরত আবু যর রাজিয়াল্লাহু আনহুমা হযরত বেলাল রাজিয়াল্লাহু আনহুমা কে তাঁর মায়ের নাম নিয়ে তিরস্কার করে বলেন- ‘হে কালোর বেটা!’ একথা শুনে হযরত বেলাল রাজিয়াল্লাহু আনহুমা রাগ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বিচার দিলেন। কিছুক্ষণ পর হযরত আবু যর রাজিয়াল্লাহু আনহুমা আসলেন। তিনি এটা বুঝতে পারেননি যে, তার নামে ইতিপূর্বেই বিচার দেওয়া হয়েছে। তাঁকে দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চেহারা ঘুরিয়ে নিলেন। আবু যর রাজিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমার নামে আপনি কিছু শুনেছেন, তাই আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি বেলালকে তার মায়ের নাম নিয়ে তিরস্কার করেছো? শুনে রেখো, ঐ সত্তার কসম! যিনি মুহাম্মাদের উপর কিতাব নাযিল করেছেন- প্রত্যেক ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব হয় তার আমলের মাধ্যমে। আর তোমরা হল সা৪১ এর কিনারার মত।"৪২
ইসলামে ন্যায়বিচারঃ
মানবাধিকারের সাথে সম্পূর্ণ আরেকটি অধিকার হলো- ‘ন্যায়বিচার’। এ বিষয়ে সবচেয়ে প্রকট উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করা যায় এই ঘটনাটি- একবার এক মানুষী মহিলা চুরি করেছিল। হযরত উসামা বিন যায়েদ রাজিয়াল্লাহু আনহুমা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলেন তাঁর হাত না-কাটার সুপারিশ নিয়ে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে দিলেন- "ঐ সত্তার কসম! যার হাতে মুহাম্মাদের জান। যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতেমাও চুরি করতো, তাহলে আমি তার হাতও কেটে ফেলতাম!"৪৩
কারও দ্বারা যেনো কেউ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়, সবাই যেনো ন্যায়বিচারের পূর্ণ অধিকার বুঝে পায়; এদিকে লক্ষ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেকেও বাঁচাতে গিয়েও অন্যের অধিকার বিন্দুমাত্র খর্ব করতে নিষেধ দিয়েছেন। একবার এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পাওনা আদায়ে করে এতে খুব খারাপ ভাষায় কথা বলতে লাগলো। সাহাবায়ে কেরাম বললেন- হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দিন, আমরা এই লোককেও শাস্তি করে দেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- "না, এই লোককে ছেড়ে দাও। কেননা, পাওনাদারের কথা বলার অধিকার আছে।"৪৪
যারা মানুষের মাঝে বিচার-সালিশ করেন, তারা যাতে ন্যায়বিচার ঠিক রাখতে পারে, এজন্য তাদের প্রতিও লক্ষ্য করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- "যখন বাদী-বিবাদী দু’ পক্ষ তোমার সামনে আসবে, তখন তুমি এক পক্ষের কথা শুনে অপর পক্ষের কথা না শুনে কোনো ফায়সালা করো না। এটা তোমার জন্য সঠিক রায় দিতে সহায়ক হবে।"৪৫
ইসলামে পর্যাপ্ত জীবনোপকরণের অধিকারঃ
ইসলামী শরীয়তের সাথে সম্পর্ক এমন একটি অধিকার রয়েছে, যে বিষয়ে আজ পর্যন্ত কোনো মানবনীতিও আইনগতভাবে কিছু বলা হয়নি। মানবাধিকার বিষয়ে যত চুক্তি-সনদ, দলিল-দস্তাবেজ আর আইন-কানুন রচিত হয়েছে- এ ব্যাপারে সবকিছুই একদম চুপ। সেই অধিকারটি হলো- ‘মানুষের পর্যাপ্ত জীবনোপকরণের অধিকার’। অর্থাৎ ইসলামী রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি ব্যক্তিই তার পর্যাপ্ত জীবনোপকরণ নিয়ে বসবাস করবে। যাতে সে স্বচ্ছন্দভাবে বাঁচতে পারে, এবং তার জন্য সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন যাত্রার ব্যবস্থা হয়। এ বিষয়টি মানবচরিত্রে জীবনব্যবস্থার দেওয়া নিম্নমানের জীবনব্যবস্থা থেকে একটু আলাদা।৪৬
পর্যাপ্ত জীবনোপকরণের অধিকার বাস্তবায়িত হয় কাজের মাধ্যমে। যখন কোনো ব্যক্তি কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়বে, তখন তার জন্য যাকাতের ব্যবস্থা করা হবে। যদি যাকাতের মাধ্যমেও অভাবীদের প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের জন্য আলাদা বাজেট ঘোষণা করা হবে। এবং তাদের সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়টিকে এভাবে বলেছেন- "যে ব্যক্তি কোনো ঋণ বা অসহায় সন্তান রেখে মারা গেলো, তার ঋণ আদায় করা এবং সন্তানদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব আমার।"৪৭
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অধিকারের উপর আরও গুরুত্বারোপ করে বলেন- “ঐ ব্যক্তি আমার উপর ঈমান আনেনি, যে তৃপ্তি ভরে খায়, আর তার পাশে প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে; যা সে জানে।”২৬
পশ্চাৎকেও যারা অন্যের খেয়াল রাখে, খোঁজ-খবর রাখে; তাদের প্রতি খুশি হয়ে তাদের প্রশংসা করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “আশআরী গোত্রের লোকেরা যখন জিহাদে গিয়ে অভাবগ্রস্ত হয়ে যায়, অথবা মদীনাতেই তাদের পরিবার-পরিজনকে খাবার-ঘাটতি দেখা দেয়, তখন তারা নিজেদের কাছে থাকা সমস্ত সম্পদকে একত্রিত করে একটি কাপড়ে জমা করে। এরপর একটি পাত্র দ্বারা মেপে প্রত্যেকে সমানভাগে বন্টন করে নেয়। সুতরাং তারা আমার (দলভুক্ত) আর আমিও তাদের (দলভুক্ত)।”২৭
নাগরিক ও পারিবারিক অধিকারঃ
ইসলাম তো স্বাভাবিকভাবে সকলের পূর্ণ অধিকার দিয়েছে; যুদ্ধক্ষেত্রেও নাগরিক ও পারিবারিক অধিকারের প্রতি পরিপূর্ণ লক্ষ্য রেখেছে। যুদ্ধে সাধারণতঃ সবাই প্রতিশোধ আর লড়াই নিয়ে ব্যস্ত থাকে। মানবতা আর দয়ার সবক তখন কারও মাথায় থাকে না। কিন্তু ইসলাম এমন এক কঠিন মুহুর্তেও মানবতার কথা ভুলে যায় নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তোমরা শিশু, নারী আর বয়স্কদেরকে হত্যা করো না।”২৮
অনুরূপভাবে ইসলামে আরও কিছু নীতি-আদর্শ রয়েছে, যার মাধ্যমে এই অমানবিক পৃথিবীর বুকে মানবাধিকারের যাত্রা সমুন্নত করে এক সুন্দর পৃথিবী উপহার দিয়েছে। আর সামষ্টিকভাবেও ইসলাম মানবতার কল্যাণের প্রতি সদা সজাগ দৃষ্টি রেখেছে। কেননা, এই মানবতাই তো মূলত মুসলিম সভ্যতার প্রাণ।
টিকাঃ
৩৪. বুখারী ঈমান বাইনাল আক্বলি ওয়াল ক্বলব: ০১৮
৩৫. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত নং-৭০
৩৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১৩৮৪ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৩৭৬
৩৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৮১০ সুনানুস নাসাই, হাদীস নং-৪০০৪ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৬৬৪৫
৩৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৪৪২ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১০৪
৩৯. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৩৬৩ সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং-৩০৪৩ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৬০৬৯
৪০. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৩২০৪ আল মু’জামুল কাবীর, হাদীস নং-১৪৪৪৪
৪১. ‘সা’ হলো এক প্রকার পাত্র। যা দ্বারা বিভিন্ন জিনিস মাপা হয়। এখানে বুঝানো হয়েছে- তোমরা প্রত্যেকেই ‘সা’ এর কিনারা পর্যন্ত সমান সমান। কেউ কারও চেয়ে শ্রেষ্ঠ নও। তবে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো তোমাদের আমল ও খোদাভীতি।
৪২. সুনানুল ইবন মাজাহ, হাদীস নং-৩২৪৫
৪৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৬৪৩ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৮৬
৪৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৫৮৭ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১০৮
৪৫. সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং-৬৪৮২ জামি তিরমিজি, হাদীস নং-১০০১ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৪৮২
৪৬. মাওসুয়াতুল ফিকহিল ইসলাম ফিল ইসলাম: ৫০৩,৫০৯
৪৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৬০০
২৬. আল মু’জামুল কাবীর, হাদীস নং-৭৫০ শুআবুল ঈমান, হাদীস নং-৩২০৮ -আল মুসতাদরাক লিল হাকেম, হাদীস নং-৭৩০৭
২৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৩৪৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৫০০
২৮. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ১৭৩১ আল মু’জামুল আওসাত, হাদীস নং-৪৫১৩
📄 ইসলামী সভ্যতায় নারীর অধিকার
ভূমিকাঃ
ইসলাম নারীকে যোগ্য আর তত্ত্বাবধানে বেড়ায় অবদান করেছে। তাদেরকে সম্মানের উচ্চাসন দিয়েছে এবং বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেছে। আর তাদেরকে মেয়ে, স্ত্রী, বোন ও মা হিসেবে দিয়েছে বিশেষ মর্যাদা। ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো- “নারী-পুরুষ সবাই একই ব্যক্তি থেকে তৈরি। সুতরাং মানবিক বিবেচনায় নারী-পুরুষ সবাই সমান।” আল্লাহ তায়ালা বলেন- “হে মানব সকল! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। যিনি তোমাদেরকে একজন মানুষ থেকে সৃষ্টি করেছেন। (প্রথমে) তার থেকে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাদের দু’জন থেকে আরও অনেক অনেক নারী-পুরুষ সৃষ্টি করে এ পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন।”২৯
এ বিষয়ে আরও অনেক আয়াত রয়েছে, যেখানে সমস্ত মানুষের মাঝে কোনোরূপ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সবাই সমান, আর কোন কোন্ ক্ষেত্রে তাদের মাঝে ভিন্নতা রয়েছে- এ ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করা হয়েছে।
ইসলামে নারীর অবস্থানঃ
ইসলামের পূর্বে অন্যান্য ধর্মে জাহিলী যামানায় নারীরা যে নিম্ন অবস্থানে ছিলো, ইসলাম এসে নারীদেরকে সেখান থেকে মুক্তি দিয়ে এমন এক উচ্চস্থানে এনেছে; যে পর্যন্ত কোনো যামানায়ই নারীরা পৌঁছতে পারেনি, আর ভবিষ্যতেও পারবে না। কেননা, ইসলাম চৌদ্দ শতাব্দী যাবত নারীকে মা, বোন, স্ত্রী ও মেয়ে হিসেবে এসব অধিকার দিয়েছে আদতে, যেগুলো লাভ করার জন্য পশ্চিমা বিশ্বের নারীরা দীর্ঘকাল যাবত একের পর এক সংগ্রাম করে আসছে; কিন্তু আজও তাদের জোটেনি সেসব অধিকার।
অথচ ইসলাম সেই শুরু থেকেই এ কথা স্বীকার করে আসছে যে, সম্মান ও মর্যাদার ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদেরই মতো। নারী হওয়ার কারণে কখনোই তাদের সম্মান বিন্দুমাত্র কম হবে না। এ বিষয়ে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ করে দিয়ে বলেন- “নারীরা হলো পুরুষদের বোন।”৩০
তিনি নিজে সর্বদা নারীদের সাথে ভালো ব্যবহার করতেন আর সাহাবীদেরকে এ ব্যাপারে জোর নির্দেশ দিয়ে বলতেন- “তোমরা নারীদের সাথে ভালো ব্যবহার করো।”৩১
বিদায় হজ্জে লক্ষাধিক সাহাবীর সামনেও তিনি এই নসিহতটি বারবার করেছেন।
জাহিলী যামানায় নারীর অবস্থানঃ
যদি আমরা আরও স্পষ্টভাবে জানতে চাই যে, নারীদের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান কী এবং তাদের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইসলাম কী কী নীতি অবলম্বন করেছে, তাহলে আমাদেরকে আগে জাহিলী যামানায় এবং বর্তমান যুগের নারীদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে হবে।
আমরা দেখতে পাই- জাহিলী যামানায় ছিল ঘোর-অন্ধকার। নারীরা ছিল অবহেলিত-অপদস্থ। সমাজে তাদের মূল্য বলতে কিছুই ছিল না। আর বর্তমানেও ইসলামী সভ্যতাকে অবমূল্যায়নের কারণে সেই অন্ধকারই ছেয়ে যাচ্ছে গোটা দুনিয়া। ধীরে ধীরে সেই জাহিলী যামানার দিকেই চলছে পৃথিবী। জাহিলী যামানা এবং বর্তমান সভ্যতা- এই দু’টি অবস্থাকে একসাথে রাখলে ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতায় নারীদের মর্যাদা ও অবস্থানের বিষয়টা আমাদের নিকট একদম স্পষ্ট হয়ে যায়।
কেননা, যখন আরবের লোকেরা তাদের মেয়েদেরকে জ্যান্ত কবর দিতো এবং তাদেরকে জীবনের অধিকার থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত করতো, তখন এই কাজকে মহাঅন্যায় সাব্যস্ত করে তা হারাম ঘোষণা দিয়ে পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- “আর যখন জ্যান্ত প্রোথিত মেয়েদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে?”৩২
সাথে সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও এই কাজটিকে অনেক বড় গুনাহ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। “হযরত ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম- সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটা? তিনি বললেন- আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা। যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম, এরপর কোনটা? তিনি বললেন- এই ভয়ে তোমার সন্তানকে হত্যা করা যে, সে তোমার সাথে খাবে। আমি আবার বললাম, এরপর কোনটা? তিনি বললেন- তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করা।”৩৩
ইসলামে নারীর অধিকারঃ
ইসলাম শুধু নারীর জীবন রক্ষার অধিকারের কথা বলেই চুপ থাকেনি; বরং একদম ছোট বেলা থেকেই তাদের বিভিন্ন অধিকারের কথা। তাদেরকে দয়া করার প্রতি উৎসাহ দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “থাকে কন্যা সন্তান দান করা হয়, আর সে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে, এ কন্যারা তার জাহান্নামের আগুনের প্রতিবন্ধক হবে।”৩৪
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে শিক্ষা-দীক্ষা দেয়ার প্রতিও গুরুত্বারোপ করে বলেন- “যে ব্যক্তির একটি কন্যা শিশু হলো, আর এ শিশুটিকে সে উত্তম শিক্ষা দিলো এবং তার আদর্শবান বানালো, –তার জন্য দু’টি প্রতিদান।”৩৫
এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমাজে একদিন বিশেষভাবে নারীদেরকে ওয়ায-নসিহত করতেন এবং তাদেরকে দ্বীনি হুকুম-আহকাম শিক্ষা দিতেন। আর তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্যের নির্দেশ দিতেন।৩৬
এরপর যখন মেয়েটার বয়স একটু বাড়ে এবং সে পূর্ণ যুবতিত্বে পরিণত হয়, তখন ইসলাম তার ব্যক্তিগত যেকোনো বিষয়ে তাকে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও প্রত্যাখ্যান করার অধিকার প্রদান করে। ফলে যাকে সে চায় না, তার সাথে জোর করে তাকে বিবাহ দেওয়া জায়েজ থাকে না। এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “বিধবা নারী (তার বিবাহের ক্ষেত্রে) অভিভাবকের তুলনায় নিজের উপর বেশি অধিকার রাখে। কুমারী নারীর কাছ থেকেও বিবাহের সম্মতি নিতে হবে। আর চুপ থাকাটাও তার সম্মতি।”৩৭
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন- “বিধবা নারীকে তার অনুমতি ছাড়া বিবাহ দেওয়া যাবে না। আর কুমারী মেয়েকেও তার অনুমতি ছাড়া বিবাহ দেওয়া যাবে না। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তার অনুমতি কিভাবে নেওয়া হবে? তিনি বললেন- তার চুপ থাকাটাই তার অনুমতি।”৩৮
কিছুদিন পর এই মেয়েটি যখন একজনের স্ত্রী হয়, তখন এই সত্য শরীয়ত তার স্বামীকে তার সাথে ভালো ব্যবহার ও কল্যাণকামিতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। কেননা, নারীদের সাথে ভালো ব্যবহার করাটা একজন পুরুষের দৃঢ়তা ও উত্তম আখলাকের পরিচয় বহন করে। এ বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উৎসাহ প্রদান করে বলেন- “কোনো ব্যক্তি যখন তার স্ত্রীকে পানি পান করায়, তখন তার বিনিময়েও তাও সওয়াব দেওয়া হয়।”৩৯
নারীদের অধিকারের ব্যাপারে আন্তরিক হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বলেন- “হে আল্লাহ! এতিম এবং নারী- এই দুই দুর্বলের অধিকারের ব্যাপারে আমার ভয় হয়।”৪০
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু মুখেই বলেননি, এসব ব্যাপারে তিনি নিজে আমল করে এর বাস্তব-উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তিনি স্ত্রীর প্রতি ছিলেন অত্যন্ত সুদক্ষ ও পরম দয়ালু। হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন- “তিনি ঘরে এসে তার স্ত্রীদেরকে বিভিন্ন কাজে সহায়তা করতেন। এরপর যখন নামাজের সময় হতো; নামাজে চলে যেতেন।”৪৩
নারী যদি কোনো কারণে তার স্বামীকে অপছন্দ করে; তার সাথে জীবন-যাপন করা সম্ভব না হয়, তখন ইসলাম এই নারীকে খুলা’র৪৪ মাধ্যমে উক্ত স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অধিকারও দিয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “হযরত সাবেত ইবনে কায়েসের স্ত্রী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেন- হে আল্লাহ্র রাসুল! আমি সাবেতের দ্বীন ও চরিত্রের ব্যাপারে কোনো দোষ দিচ্ছি না, তবে আমি তার কুফুরির ব্যাপারে আশংকা করছি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন- তুমি কি তাকে ঐ বাগানটি ফিরিয়ে দিতে রাজি আছো, যা তোমাকে বিয়ের মহর হিসেবে দেয়া হয়েছিলো? সে বললো, হ্যাঁ, আমি রাজি আছি। পরে সে ঐ বাগানটি ফিরিয়ে দিল। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্বামীকে নির্দেশ দিলেন, যাতে এই মহিলাকে ছেড়ে দেয়। তার স্বামী তাকে ছেড়ে দিলো।”৪৫
এছাড়াও ইসলাম নারীকে তার সম্পদের উপর পুরুষের মতই পূর্ণ অধিকার প্রদান করেছে। ফলে নারী বেচা-কেনা করতে পারে। ভাড়া দিতে পারে; নিতে পারে। কাউকে তার সম্পদের উকিল বানাতে পারে; আবার ইচ্ছা করলে কাউকে সদকা দিতে পারে। নারী যদি সম্পূর্ণা বুঝমান হয়, তাহলে এসব ক্ষেত্রে তার উপর কেউ কোনো রকম হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এদিকে ইঙ্গিত করে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন- “তোমরা যখন তাদের বুঝমান হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হও, তখন তাদের সম্পদ তাদের কাছে হস্তান্তর করে দাও।”৪৬
একবার হযরত উম্মে হানী বিনতে আবী তালেব রাযিয়াল্লাহু আনহা এক মুশরিক ব্যক্তিকে আশ্রয় দিলেন। এতে তার ভাই হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু চরম অসন্তুষ্ট হলেন এবং ঐ মুশরিককে হত্যা করতে চাইলেন। পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বিচার চাওয়া হলে তিনি রায় দিয়ে বললেন- “হে উম্মে হানী, তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছো, আমিও তাকে আশ্রয় দিলাম।”৪৭
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এই অধিকার প্রদান করলেন- সে মুক্তাবস্থায় বা নিরাপদ অবস্থায় যেকোনো অমুসলিমকে নিরাপত্তা ও আশ্রয় দিতে পারবে।
এভাবেই ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও উন্নত সভ্যতার অধীনে একজন মুসলিম নারী পরিপূর্ণ সম্মান, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার সাথে সুন্দর জীবন নিয়ে বাঁচতে পারে।
টিকাঃ
২৯. সূরা নিসা, আয়াত নং-১
৩০. জামে তিরমিযী, হাদীস নং-১১০ সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-২০৬৬মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৬১৯
৩১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৮৫০ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৬৮
৩২. সূরা তাকভীর, আয়াত নং-৮-৯
৩৩. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৪২৩৭
৩৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৮৬৯ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৬২৯
৩৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৮৯৪ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৬৩০
৩৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৯০১ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৬০০
৩৭. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪২১
৩৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৬৯৬৪
৩৯. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৮৬৭
৪০. সুনানু ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৯৬৯৬ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৪৬৮
৪৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৬৪৪ মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং-২৪২৭২ জামে তিরমিযী, হাদীস নং-২৪৪৯
৪৪. ‘খুলা’ অর্থ হলো- যদি স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মিল-মুহাব্বাত না হয় এবং একসাথে সংসার করা কিছুতেই সম্ভব না হয়, আর স্বামীও তালাক দিতে না চায়; তখন স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীকে কিছু প্রদান করে তালাক নিয়ে নেয়া।
৪৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫২৯৩ মুসনাদ আহমদ, হাদীস নং-৬৯৬৯
৪৬. সূরা নিসা, আয়াত নং-৫
৪৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩০০৩ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৩০৩
📄 ইসলামী সভ্যতায় শ্রমিকের অধিকার
ইসলাম শ্রমিক, কর্মচারী এবং কাজের লোকদেরকে সম্মানিত করেছে। তাদের প্রতি সদয় দৃষ্টি দিয়েছে। এমনকি ইতিহাসে সর্বপ্রথম তাদের অধিকারের কথা স্বীকার করেছে। পূর্ববর্তী কোনো কোনো ধর্মের শ্রমিক হওয়ার অর্থ ছিলো- “নিজের স্বকীয়তা-স্বাধীনতা শেষ করে দিয়ে অন্যের গোলাম বা পরাধীন হয়ে যাওয়া।” আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্রমিক হওয়ার মানে ছিলো- “নিন্দা, লাঞ্ছনা আর অপমান।”
পরবর্তীতে ইসলাম এসে সামাজিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের এই লাঞ্ছনাময় নিপীড়িত জীবন থেকে উদ্ধার করে এনে এক শৃঙ্খলময় সুন্দর জীবন উপহার দিয়েছে। স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার শ্রমিক অধিকারের কথা বলেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উজ্জ্বল জীবনটাই ছিলো- ইসলামী সভ্যতার শ্রমিকদের উপর দয়া-মায়া ও অধিকার বাস্তবায়নের এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় মালিক পক্ষকে বলে দিয়েছেন- তারা যাতে কর্মচারী ও শ্রমিকদের সাথে শালীনতার সাথে মানবিক আচরণ করে। তাদের প্রতি রহম করে। তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে। আর তাদের সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ দিয়ে তাদেরকে কোনো কষ্ট না দেয়। তিনি বলেন- “তোমাদের কর্মচারী ও শ্রমিকরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তোমাদের অধীন করেছেন। সুতরাং যার অধীনে তার ভাই থাকে, সে যেনো তার ভাইকে তাই খাওয়ায়, যা সে নিজে খায়। তাই যেনো পরায়, যা সে নিজে পরে। আর তাদের সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ দিয়ে যাতে তাদেরকে কষ্ট না দেয়। যদি তাদের দ্বারা কোনো ভারী কাজ করাতে হয়, তাহলে সে নিজেও যেনো তাদের সাথে সাহায্য করে।”৪৮
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তোমাদের কর্মচারী ও শ্রমিকরা তোমাদের ভাই। এর মাধ্যমে তিনি শ্রমিকদেরকে শ্রমিকের স্তর থেকে তুলে এনে ভাইয়ের মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আজ পর্যন্ত ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো সভ্যতায় এর কোনো নজীর পাওয়া যায় না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মালিক পক্ষকে আরও আদেশ দিয়েছেন- তারা যেনো শ্রমিকদের সাথে কোনো রকম জুলুম-নির্যাতন ও টালবাহানা না করে শ্রমিকদেরকে তাদের ন্যায্য পাওনা আদায় করে দেয়। এ ক্ষেত্রে তিনি বলেন- “শ্রমিকদের ঘাম শুকানোর আগেই তাদের কাজের পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।”৪৯
শ্রমিকদের সাথে জুলুম করার ব্যাপারে ইসলাম অত্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। এক হাদীসে কুদসীতে৫০ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “আল্লাহ তাআলা বলেছেন- কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে লড়বো। একজন ঐ ব্যক্তি, যে আমার নামে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করলো। আরেকজন ঐ ব্যক্তি, যে কোনো স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করলো। আরেকজন হলো ঐ ব্যক্তি, যে কোনো শ্রমিক নিয়ে তার দ্বারা নিজের কাজ পূর্ণ করে নিলো, কিন্তু সে তার পারিশ্রমিক আদায় করলো না।”৫১
সুতরাং যারা কর্মচারী ও শ্রমিকদের সাথে জুলুম করে, তারা যেনো এটা জেনে রাখে- আল্লাহ তাআলা সব দেখছেন, এবং কিয়ামতের দিন তিনি তার বিরুদ্ধে লড়বেন।
অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মালিকদেরকে এই নির্দেশনা প্রদান করেছেন- তারা যাতে শ্রমিকদেরকে এমন কষ্টকর কোনো কাজ না দেয়, যার দ্বারা তাদের স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হয়। আর তারা কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে তিনি বলেন- “তুমি তোমার কর্মচারী বা শ্রমিক থেকে যে পরিমাণ কাজ হালকা করে দিবে, এর বিনিময়ে তোমাকে সে পরিমাণ সওয়াব দেয়া হবে।”৫২
ইসলামী শরীয়তে যে অধিকারকে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করা হয়, সেটা হলো- শ্রমিকের সাথে বিনয় ও নম্রতার অধিকার। এক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মাতকে উৎসাহ প্রদান করে বলেন- “সেই ব্যক্তির কোনো অহংকার নেই, যে তার কর্মচারী ও শ্রমিকের সাথে বসে খায়। যে গাধার পিঠে আরোহণ করে বাজারে যায় এবং বকরি বেচে তার দুধ দোহন করে।”৫৩
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন, স্বীয় জীবনেও তিনি তা পালন করেছেন। কখনও এর ব্যতিক্রম করেননি। হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও নিজ হাতে কাউকে প্রহার করেননি। না কোনো স্ত্রীকে, আর না কোনো কর্মচারী বা শ্রমিককে।”৫৪
একবার হযরত আবু মাসউদ আনসারী রাযিয়াল্লাহু আনহু তার গোলামকে প্রহার করেন। পেছন থেকে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- “হে আবু মাসউদ! জেনে রেখো, তুমি তার উপর যেমন ক্ষমতাবান, আল্লাহ তাআলা তোমার উপর এরচেয়ে বেশি ক্ষমতাবান। তিনি বলেন, হঠাৎ এই কথা শুনে আমি চমকে যাই। পেছন তাকিয়ে দেখি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে আছেন। পরে আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসুল! আমি আল্লাহ্র জন্য তাকে (গোলামকে) আযাদ করে দিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- হ্যাঁ, যদি তুমি এটা না করতে, তাহলে জাহান্নামের আগুন তোমাকে গ্রাস করে নিতো।৯৩
সুতরাং প্রহার করা, গাল মারা, থাপ্পড় মারা, লাথি দেয়া- এগুলো হলো কর্মচারী বা শ্রমিকদেরকে লাঞ্ছিত, অপমানিত ও অপদস্ত করা। আল্লাহ এবং তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলো করতে একদম নিষেধ করে দিয়েছেন। এজন্য জুলুমবাজ মালিকের সেরা শাস্তি হলো- যার সাথে এসব আচরণ করবে, সাথে সাথে সে তার মালিকানা থেকে বের হয়ে যাবে। এটাই ইসলামের মাহাত্ম্য এবং ইসলামী সভ্যতার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খাদেম হযরত আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু একটি বাস্তব সাক্ষ্য দিয়ে বলেন- “রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বোত্তম আখলাকের অধিকারী। তিনি একদিন আমাকে এক কাজে পাঠালেন। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমি যাবো না। কিন্তু বাস্তবে আমার অন্তরে ছিলো, আমি তার আদেশ করা কাজে যাবো। পরে আমি বের হয়ে গেলাম। বাজারে কিছু শিশু খেলা করছিলো। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে গেলাম। পেছন থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে আমার ঘাড়ে আলতোভাবে হাত রাখলেন। আমি তার দিকে তাকাতেই তিনি হেসে ফেললেন। অতঃপর বললেন- হে কাজ করতে বলেছি, সে কাজে যাও। আমি বললাম, আমি যাচ্ছি হে আল্লাহর রাসুল। হযরত আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন- আমি সাত বছর বা নয় বছর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমত করেছি, কিন্তু আমি বলতে পারবো না যে তিনি কোনোদিন একথা আমাকে বলেছেন- তুমি এ কাজটা এভাবে কেনো করলে? আর এ কাজটা এভাবে কেনো করলে না?৯৪
বরং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার খাদেমদের প্রতি এ পরিমাণ খেয়াল রাখতেন যে, সময় হলে নিজ দায়িত্বে তাদেরকে বিবাহও করিয়ে দিতেন। হযরত রবীআ বিন কা'ব আসলামী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমত করতাম। একদিন তিনি আমাকে বললেন, হে রবীআ! তুমি কি বিবাহ করবে না? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমার বিবাহ করার কোনো ইচ্ছা নেই। বিবাহ করার মত মহরও আমার কাছে নেই। আর আপনাকে ছেড়ে গিয়ে অন্য কিছু করাটা আমার কাছে একদমই ভালো লাগে না। এ কথা শুনে তিনি বারবার আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কিছুক্ষণ পর আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এসে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন- হে রবীআ! তুমি কি বিবাহ করবে না? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমার বিবাহ করার কোনো ইচ্ছা নেই। বিবাহ করার মত মহরও আমার কাছে নেই। আর আপনাকে ছেড়ে গিয়ে অন্য কিছু করাটা আমার কাছে একদমই ভালো লাগে না। এ কথা শুনে তিনি আবারও আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। অতঃপর আমি নিজেই বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! দুনিয়া ও আখেরাতে কোনটা আমার জন্য ভালো হবে, তা আমার চেয়ে আপনিই ভালো জানেন। আর আমি মনে মনে বললাম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি তৃতীয়বার আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তাহলে আমি আর না করবো না। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন, হে রবীআ, তুমি কি বিবাহ করবে না? আমি বললাম, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল! আপনার যা ইচ্ছা আমাকে তাই আদেশ করুন। আর আমার ব্যাপারে যা পছন্দ করবেন, আমি তাই করবো। অতঃপর তিনি বললেন, তুমি আসামী মহল্লার অমুক পরিবারে যাও...।৯৫
ইসলামী সভ্যতায় শ্রমিক ও কর্মচারীদের ব্যাপক মর্যাদার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে তখন, যখন আমরা দেখি- রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম-অমুসলিম সকল শ্রমিকদের প্রতিই সীমাহীন দয়া করতেন। এক্ষেত্রে তিনি মুসলিম-অমুসলিম কোনো পার্থক্য করতেন না। এক ইহুদী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোলাম হিসেবে তার খেদমত করতো। একবার এই গোলামটি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়লো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে গেলেন। গিয়ে দেখলেন সে মৃত্যুমুখে শায়িত। তার মাথার কাছে বসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ইসলামের দাওয়াতও দিলেন। গোলামটি তার পিতার দিকে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকালো। পিতা বললো, তুমি আবুল কাসেমের (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কথা মেনে নাও। তখন গোলামটি ইসলাম গ্রহণ করলো। এরপর তার প্রাণপাখি উড়ে গেলো। পরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলে সেখান থেকে চলে আসলেন- “সমস্ত প্রশংসা ঐ মহান সত্তার, যিনি তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিয়েছেন।”৯৬
টিকাঃ
৪৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬০ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬৬১
৪৯. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং- ২৪৪৫ মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং-২৪৪৯
৫০. হাদীসে কুদসী হলো ঐ হাদীস যার মূল বক্তব্য সরাসরি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত। কুরআন ও হাদীসে কুদসীর মধ্যে পার্থক্য হলো- কুরআনের ভাব ও ভাষা উভয়টাই সরাসরি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। পক্ষান্তরে হাদীসে কুদসীর ভাব আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আর ভাষা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজের।
৫১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২২২২ মুসনাদ আহমদ, হাদীস নং-৬৯৬৯
৫২. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৪০৪৯ মুসনাদে আবী ইয়া’লা, হাদীস নং-১৪৭২
৫৩. আল আদাবুল মুফরাদ:৫৯৬ শুয়াবুল ইমান, হাদীস নং-৮৯৮
৫৪. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২০৬ সুনানে আবী দাউদ, হাদীস নং- ৪৮৭৬ সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৪৬৪
৯৩. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ১৬৬১ সুন্নাতু আবী দাউদ, হাদীস নং- ৫১৬৪ জামে তিরমিযী, হাদীস নং- ১৮১৮
৯৪. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২০১০ সুন্নাতু আবী দাউদ, হাদীস নং- ৪৭৭৩
৯৫. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং- ১৬৬২৭ আল মুসতাদরাক লিল হাকেম, হাদীস নং- ২৭২৮
৯৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১২৯০
📄 ইসলামে রোগী ও অভাবীদের অধিকার
ভূমিকাঃ
ইসলাম ও ইসলামী সভ্যতায় রোগী ও অসুস্থদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের অসুবিধার প্রতি লক্ষ্য রেখে শরীয়তের অনেক হুকুম-আহকাম তাদের জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- “অন্ধের কোনো দোষ নেই। লেংড়ার কোনো দোষ নেই। আর অসুস্থ ব্যক্তির কোনো দোষ নেই।”৯৭
উক্ত আয়াতের মাধ্যমে তাদের মনের হতাশা দূর করা হয়েছে এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক অধিকার রক্ষা করা হয়েছে।
রোগীদের সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আচরণঃ
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কারও অসুস্থতার খবর পেতেন, সাথে সাথে তার খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য তার বাড়ীতে গিয়ে হাজির হতেন। তিনি অনেক চিন্তিত ও পেরেশান হয়ে পড়তেন। রোগী দেখতে যেতে কেউ তাকে বাধ্য করতো না; বরং তিনি মনে করতেন, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ-খবর নেওয়া তার অবশ্য কর্তব্য। আর এমনটা কেনই বা হবে না; তিনিই তো অসুস্থ রোগীকে দেখতে যাওয়া রোগীর অধিকার বলে সাব্যস্ত করেছেন। তিনি বলেন- “মুসলমানের উপর মুসলমানের পাঁচটি অধিকার রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো- অসুস্থ রোগীর সেবা করা।”৯৮
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগীর অসুস্থতা ও বিপদকে হালকা করার চেষ্টা করতেন। তার সহমর্মিতা প্রকাশ করতেন। তাকে আশার বাণী শোনাতেন। তাকে মুগ্ধ করতেন। সাথে সাথে রোগী ও তার পরিবারকে সহায়তা করতেন। এক্ষেত্রে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “একবার হযরত সা'দ বিন উবাদা রাযিয়াল্লাহু আনহু অসুস্থ হয়ে পড়লেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস ও আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকে রাযিয়াল্লাহু আনহুম সাথে নিয়ে দেখতে গেলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করে দেখলেন, পরিবারের সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন- তার কি মৃত্যু হয়ে গেছে? তারা বললো, না, হে আল্লাহর রাসুল। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেঁদে ফেললেন। তাকে কাঁদতে দেখে পরিবারের লোকেরাও কেঁদে ফেললো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- তোমরা কি শুনোনি? আল্লাহ তাআলা চোখের পানি আর অন্তরের ব্যথার কারণে শাস্তি দেন না। তিনি শাস্তি দিবেন এই জিনিসের কারণে-একথা বলে তিনি জিহ্বার দিকে ইশারা করলেন-অথবা এর কারণেই তিনি রক্ষা করবেন। আর নিশ্চয়ই পরিবারের লোকদের বিলাপ করার কারণে মৃত ব্যক্তিকে আযাব দেওয়া হয়।”৯৯
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগীর জন্য খুব দুআ করতেন। আর অসুস্থ হলে কী কী প্রতিদান বা সওয়াব পাওয়া যায়, এগুলো শোনাতেন। এগুলো শুনে রোগীরা নিজেকে অনেক হালকা মনে করতো এবং খুশি হতো। হযরত উম্মে আলা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন- একবার আমি অসুস্থ হলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখতে এলেন। এসে বললেন- “হে উম্মে আলা! সুসংবাদ শোনো! কোনো মুসলমান অসুস্থ হলে আল্লাহ তাআলা এর দ্বারা তার গুনাহগুলোকে এভাবে দূর করে দেন, যেভাবে আগুন স্বর্ণ-রুপার ময়লাকে দূর করে দেয়।”১০০
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগীকে কষ্ট না দিয়ে তার আরামের প্রতি গুরুত্ব দিতেন। এক্ষেত্রে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “আমরা কয়েকজন একবার এক সফরে বের হলাম। আমাদের একজনের পাথরের আঘাতে মাথা ফেটে গেলো। এরপর তার গোসল ফরয হলো। এ ব্যাপারে সে তার সাথীদেরকে জিজ্ঞেস করলো- আমি কি এখন তায়াম্মুম করতে পারবো? জবাবে তারা বললো- তুমি যেহেতু পানি ব্যবহার করতে সক্ষম, তাই তোমার জন্য তায়াম্মুমের সুযোগ নেই। অতঃপর সে গোসল করলো এবং মারা গেলো। পরে আমরা যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে উপস্থিত হলাম, তখন তাকে এ ঘটনার কথা জানানো হলে তিনি বললেন- ঐ ব্যক্তিকে যারা হত্যা করেছে, আল্লাহ তাদেকে হত্যা করুন। তারা যেহেতু জানে না, তাহলে কেনো তারা এ ব্যাপারে কাউকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেয়নি! কেননা, অজ্ঞতার চিকিৎসাই তো হলো জিজ্ঞেস করা। আর ঐ ব্যক্তির জন্য তায়াম্মুম করা যথেষ্ট ছিলো। তার জখমের উপর পট্টি বেঁধে তার উপর মাসাহ করে শরীরের অন্যান্য স্থান ধুয়ে নিলেই যথেষ্ট হতো।”৭৮
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগীর যেকোনো প্রয়োজন সাড়া দিতেন এবং প্রয়োজন পুরা হওয়া পর্যন্ত তার সাথেই থাকতেন। একবার তার নিকট এক মহিলা আসলো। মহিলা মাথায় একটু সমস্যা ছিলো। সে বললো- হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনাকে আমার একটি প্রয়োজন পুরা করে দিতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- “হে অমুকের মা, তুমি যেখানে চাও অপেক্ষা করো, আমি তোমার প্রয়োজন পূরণ করে দিচ্ছি। অত:পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কিছু সময় দিয়ে তার প্রয়োজন পূরণ করে দিলেন।”৭৯
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগী ও অভাবীদের জন্য চিকিৎসার অধিকার দিয়েছেন। কেননা, দেহ ও মনের সুস্থতা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির চিকিৎসা সংক্রান্ত জিজ্ঞাসার জবাবে বলেছিলেন- “হে আল্লাহ্র বান্দারা, তোমরা চিকিৎসা করো। কেননা, আল্লাহ্ তা’আলা যত রোগ দিয়েছেন, তার সাথে সাথে চিকিৎসাও দিয়েছেন। শুধুমাত্র মৃত্যু ছাড়া।”৮০
অনুরূপভাবে তিনি কোনো মহিলা চিকিৎসককে কোনো মুসলিম পুরুষের চিকিৎসা করতে নিষেধ করতেন না। তিনি নিজেই খন্দকের যুদ্ধে আসলাম গোত্রের এক মহিলা- হযরত রুফাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে হযরত সা’দ ইবনে মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু এর চিকিৎসায় নিযুক্ত করেছিলেন। এই মহিলা সাহাবী জখমের চিকিৎসা খুব ভালো করতে পারতেন, এবং আহত মুসলমানদের চিকিৎসার জন্যই নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।৮১
অভাবীদের অধিকার রক্ষার একটি বাস্তব নমুনা হলো— হযরত আমর ইবনুল জামুহ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উৎকৃষ্ট ব্যবহার। হযরত আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন খুব অভাবগ্রস্ত। তার পায়ে সমস্যা থাকার কারণে তিনি ভালো করে হাঁটতে পারতেন না। তাঁর চার ছেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ করতো। কিন্তু তাঁর পায়ে সমস্যা থাকায় উহুদের যুদ্ধে ছেলেরা তাঁকে রেখে যেতে চাইলো। হযরত আমর ইবনুল জামুহ রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেন- আমার পায়ে সমস্যা থাকার কারণে ছেলেরা আমাকে জিহাদে যেতে নিষেধ করছে। অথচ তারা আপনার সাথে জিহাদে যাচ্ছে। আল্লাহ্র কসম! আমি আমার এই খোঁড়া পা নিয়েই জান্নাতে যেতে চাই। অত:পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমরকে বললেন- “আল্লাহ্ তা’আলা তোমাকে এ অসুস্থতা দিয়েছেন, এর কারণে তোমার উপর জিহাদ ওয়াজিব নয়। আর তাঁর ছেলেদেরকে বললেন- তোমরা তাকে জিহাদ থেকে নিষেধ করো না। হয়তো আল্লাহ্ তা’আলা তাকে শাহাদাত নসীব করবেন।” এরপর তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে জিহাদে শরীক হলেন, এবং উহুদের দিন শহীদ হয়ে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে বললেন- “ঐ সত্তার কসম! যার হাতে আমার জান, তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি আল্লাহ্র নামে কসম করে, তাহলে আল্লাহ্ তা’আলা অবশ্যই তা পুরা করেন। যখন আমর ইবনুল জামুহ্। আমি তাকে দেখেছি যে, সে খোঁড়া পা নিয়েই এখন জান্নাতে হাঁটছে।”৮২
টিকাঃ
৯৭. সূরা নুর, আয়াত নং- ৬১ সূরা ফাতহ, আয়াত নং- ১৭
৯৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১২৪০ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২১৬২
৯৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১২৪২ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৯২৮
১০০. সুন্নাতু আবী দাউদ, হাদীস নং- ৩০৯২
৭৮. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৩৩১ সুনানু ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৫৭১ মুসনাডে আহমাদ, হাদীস নং-৫০৩৭
৭৯. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২০২৩মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৪০৭৬ সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৪৫২৭
৮০. সুনানু আবী দাউদ, হাদীস নং-৩৪৮০ জামে তিরমিযী, হাদীস নং-২০০৮ সুনানু ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৩৪০১
৮১. আল আদাবুল মুফরাদ: -১২৪ সিরাতে ইবনে হিশাম:২০৮/২
৮২. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৩০২৪