📄 অনুবাদকের আরজ
আলহামদুলিল্লাহ! ছুম্মা আলহামদুলিল্লাহ!! বহু অপেক্ষা ও প্রতীক্ষার পর ড. রাগেব সারজানির সাড়া জাগানো কিতাব ‘আল আখলাকু ওয়াল কাযিম ফিল হাজারাতিল ইসলামিয়্যাহ্’ এর বাংলা অনুবাদ ‘ইসলামই দিয়েছে সবার অধিকার’ এখন পাঠকের হাতে পৌঁছার দ্বারপ্রান্তে। এমতাবস্থায় আমি আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করা ছাড়া আর কিছুই মনে করতে পারছি না। তাই আবারও বলছি আলহামদুলিল্লাহ্!!
ড. রাগেব সারজানি। পেশায় একজন ডাক্তার হলেও তার পরিচিতি এখন ইতিহাসবিদ, গবেষক ও একজন খ্যাতিমান আরব লেখক হিসেবে। পাঠক সমাজে তার নতুন করে পরিচয় দেয়া- অথবা কথা বাড়ানোর নামান্তর। তিনি প্রচণ্ড ভালোবাসেন ইসলামকে। গবেষণা করেন ইসলামী ইতিহাস নিয়ে। তিনি স্বপ্ন দেখেন মুসলিম উম্মাহর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে। পছন্দ করেন ইসলামের পয়গাম বিশ্বের দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে। সর্বোপরি মহান আল্লাহর দ্বীন, প্রিয় নবীর দাওয়াত, ইসলামের অনন্য সৌন্দর্য আর শরীয়তের বিধি-বিধানের প্রতি প্রতিটি মানব হৃদয়ে, মন ও মস্তিস্কে- এটাই তার একান্ত কামনা।
বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটিতেও তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে সংক্ষিপ্তাকারে কুরআন-সুন্নাহর দলিলের আলোকে ফুটিয়ে তুলেছেন ইসলামের আসল সাম্য-সৌন্দর্য-নীতি-আদর্শ। ইসলামের প্রকৃত রূপ জানতে হলে একজন পাঠককে অবশ্যই বইটি পড়তে হবে। আর না হয় ইসলামের আসল সৌন্দর্যই বুঝতে পারবে না। সীমিত কিছু বিধি-বিধানকেই পূর্ণাঙ্গ ইসলাম মনে করতে থাকবে।
অকপটে একটি কথা বলে রাখি, আমি নিয়মিত কোনো লেখক নই, সাহিত্যিকও নই- এটাই আমার প্রথম অনুবাদকর্ম। চেষ্টা করেছি, মূল কিতাবের শব্দ-মর্ম ঠিক রেখে একদম সহজ-সরল শব্দে-বাক্যে একটি সাবলীল অনুবাদ উপহার দেয়ার জন্য- যাতে ছোট-বড় সবাই সহজে বুঝতে পারে। কতটুকু হয়েছে সেটা বিজ্ঞ পাঠকই বলতে পারবেন। তবে যতটুকু সুন্দর- সঠিক, সবটুকুই আল্লাহ তাআলার দয়া ও মেহেরবানী। আর যতটুকু অসুন্দর ও ভুল-ত্রুটিসম্পন্ন, সম্পূর্ণটাই আমার অযোগ্যতা আর অসচেতনতার ফল।
আমি বিশ্বাস করি, অবশ্যই আমার লেখায় ভুল আছে। তবে আশা রাখি, বিজ্ঞ পাঠক তা শুধরে দিয়ে অনলাইনে বা অফলাইনে আমাকে একটু অবহিত করে আমার প্রতি ইহসান করবেন। আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো।
আমি জাযাকাল্লাহ জানাই তাঁদেরকে, যারা আমাকে ক্ষণে-ক্ষণে তাগাদা আর উৎসাহ দিয়ে দ্রুত অনুবাদ শেষ করতে সাহায্য করেছেন। বিশেষ করে জীবনসঙ্গিনী বিন্তে আমান ও ছোট ভাই সাইফুরুল্লাহর কথা না বললে বড় অকৃতজ্ঞতার পরিচয় হবে। আল্লাহ তাআলা সবাইকে উত্তম প্রতিদানে ধন্য করুন।
বিনীত
আব্দুল্লাহ কামাল
কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা
০৪-০৭-২০ ইং
abdullahkamal24@gmail.com
📄 মাওলানা মুফতী আমানুল হক সাহেবের ভূমিকা
সকল প্রশংসা ঐ আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি আমাদেরকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। লাখো-কোটি দরুদ ও সালাম আখেরি নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর, যাকে তিনি সমস্ত নবীগণের সরদার বানিয়েছেন।
দুনিয়ার প্রতিটি মানুষ তথা কাফের-মুশরিক, সাদা-কালো, ধনী-গরীব, ছোট-বড়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই চায়- শান্তি-সফলতা-মুক্তি। মূলত এগুলো হাসিল করার জন্যই মানুষের দিনরাত কতশত মেহনত আর চেষ্টা- প্রচেষ্টা।
যদি প্রশ্ন করা হয়, প্রকৃত সফল কে? তাহলে আমাদের পক্ষ থেকে এর উত্তর আসবে- যে ধনী সে সফল। যে ক্ষমতাবান সে সফল। যে সম্মানিত সে সফল। ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন- “যে ব্যক্তি আখিরাতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে গেলো আর জান্নাতে প্রবেশ করতে পারলো, সেই প্রকৃতপক্ষে সফলতা লাভ করলো।”১
কাফেরদের কথা তো বাদই দিলাম, অনেক মুসলমানের ধারণা এমন- আখিরাতে সফলতার জন্য তো দ্বীন মানতে হবে, কিন্তু দুনিয়ার শান্তি-সফলতা দ্বীন দিয়ে হবে না; বরং এর জন্য প্রয়োজন- পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ, সম্পদ, সম্মান, সৌন্দর্য, বংশ, ক্ষমতা ও শক্তি ইত্যাদি। এগুলো ছাড়া দুনিয়াতে সফলতা অসম্ভব। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের সফল জিন্দেগী এ কথার বাস্তব প্রমাণ- দুনিয়ার সফলতা অর্থ, সম্পদ, সম্মান, সৌন্দর্য, বংশ, ক্ষমতা ও শক্তি ইত্যাদির উপর নির্ভর করে না; বরং দুনিয়া ও আখিরাত- উভয় জগতের শান্তি-সফলতা ও মুক্তির একমাত্র পথ হলো- পরিপূর্ণভাবে দ্বীন ইসলামের উপর চলা। কেননা, “আল্লাহ তাআলার নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন বা ধর্মই হলো ইসলাম।”২ “যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্যকোনো দ্বীন পালন করে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না; বরং আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।”৩
দ্বীন আসলে কী জিনিস এটাই আমাদের ভালোভাবে জানা নেই। তাই সবাই দ্বীনটাকে যার যার মতো বুঝতে চেষ্টা করি। কেউ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, আর মনে করি এটাই দ্বীন। কেউ রবিউল আউয়াল এলে মিলাদ পড়ে থাকি, আর মনে করি এটাই দ্বীন। কেউ বছর বছর হজ করি আর মনে করি এটাই দ্বীন। আবার কেউ মাথায় টুপি-পাগড়ী আর গায়ে লম্বা জুব্বা লাগিয়ে মনে করি আমিই বড় দ্বীনদার। আসলে আমরা দ্বীনের কিছু বিধি-বিধান আর আমলের মধ্যে দ্বীনকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি।
অথচ প্রকৃতপক্ষে দ্বীন সীমিত কিছু আমলের নাম নয়। ইসলাম কোনো সীমাবদ্ধ ধর্ম নয়। গুটিকয়েক আমল আর রেওয়াজ-রুসমের নাম দ্বীন ইসলাম নয়। দ্বীন হলো- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত লাভ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ২৩ বছরের গোটা জিন্দেগীর নাম। ইস্তিন্যায় গিয়ে বেজোড় সংখ্যক ঢিলা নেওয়াও দ্বীনের অন্তর্ভূক্ত। পশ্চিমদিকে পা দিয়ে না বসাও দ্বীনের অন্তর্ভূক্ত। আবার ইসলামী আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনাও দ্বীনের অন্তর্ভূক্ত। মোটকথা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ ও প্রতিটি অবস্থাই দ্বীনের অংশ। সুতরাং দ্বীন একটি ব্যাপক বিষয়। ইস্তিন্যায় ঢিলা ব্যবহার করা থেকে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত সকল কিছুই দ্বীনের অন্তর্ভূক্ত হবে, যদি তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ২৩ বছরের নবুওয়াতী জিন্দেগীর সাথে মিল থাকে।
মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র, প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি অবস্থার বিধান দ্বীনে ইসলামে রয়েছে। ব্যক্তিগতজীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, বিচার ব্যবস্থা, সামরিক ব্যবস্থা, শ্রমনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসায়নীতি, অমুসলিমদের সাথে ব্যবহার, আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক, সমাজ সংস্কার, দুঃস্থ মানবতার সেবা, শিশুর প্রতি ভালোবাসা, এতিমের দেখাশোনা, সম্পদ বণ্টন, উত্তরাধিকারী আইন, যাকাত ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, আদমশুমারী ব্যবস্থা, দাওয়াত ও তাবলীগ ইত্যাদি- সবকিছুই রয়েছে ইসলাম ধর্মে। এজন্যই তো বলা হয়- ISLAM IS THE COMPLETE CODE OF LIFE অর্থাৎ ইসলাম হলো পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। সুতরাং কোনো সীমাবদ্ধ ধর্মের নাম ইসলাম নয় বা ইসলামে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। এ ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন- “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামতকে সম্পূর্ণ করে দিলাম। আর ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবেই পছন্দ করলাম।”৪ হযরত ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “যদি আমার উটের রশিটিও হারিয়ে যায়, তবুও আমি তা পাওয়ার ব্যবস্থা এই দ্বীনের মধ্যেই পাই।”৫
একজন মুসলমানকে অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ দ্বীন মানতে হবে। পরিপূর্ণ মুমিন- মুসলমান হতে হবে। জীবনের প্রতিটি কর্মে ইসলামকে ফলো করতে হবে। তবেই সে হবে পরিপূর্ণ মুসলমান ও পূর্ণাঙ্গ মুমিন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণরূপে ইসলামে দাখিল হয়ে যাও।”৬ অর্থাৎ ইসলামের প্রতিটি বিধি-বিধান তোমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে তোমরা পরিপূর্ণ মুসলমান হয়ে যাও। অপর এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে দিয়ে বলেন- “পরিপূর্ণ মুসলমান না হয়ে তোমরা মৃত্যুবরণ করো না।”৭ অর্থাৎ মৃত্যুর আগেই পরিপূর্ণ মুসলমান হয়ে যাও। আর না হয় তুমি সফল হতে পারবে না। কবরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন শাস্তি।
পরিপূর্ণ মুসলমান হওয়ার জন্য ঈমান আনার পর যে কাজটি করতে হবে সেটা হলো- প্রত্যেকের হক আদায় করা। হক আদায় করার অর্থ হলো- যে যেটা প্রাপ্য তাকে সেটা আদায় করা। অথবা এভাবেও বলা যায়- যার সাথে যেমন ব্যবহার করা দরকার, তার সাথে তেমন করা মানেই হক আদায় করা।
hক সাধারণত দুই প্রকার- (১) হুকুকুল্লাহ- আল্লাহ তাআলার হক। (২) হুকুকুল ইবাদ- বান্দার হক। এ দুই প্রকার হক আদায় করার মাধ্যমেই পরিপূর্ণ দ্বীন মেনে পূর্ণাঙ্গ মুসলমান হওয়া সম্ভব। এজন্য বলা যায়- হক আদায় করার নামই হলো ইসলাম।
আমরা নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতসহ আরও যত ইবাদাত করি, এগুলো হুকুকুল্লাহ বা আল্লাহ তাআলার হক। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার হযরত মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, হে মুআয! বলো তো, বান্দার উপর আল্লাহ তাআলার কী হক আর আল্লাহ তাআলার উপর বান্দার কী হক? উত্তরে হযরত মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এ সম্পর্কে ভালো জানেন। পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- বান্দাদের উপর আল্লাহ তাআলার হক হলো- বান্দারা তাঁর ইবাদাত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর আল্লাহ তাআলার উপর বান্দাদের হক হলো- তারা যখন আল্লাহ তাআলার হক পুরা করবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শাস্তি দিবেন না।”৮
আমরা সবাই জানি; বরং এটাই চিরসত্য কথা- পরিপূর্ণ দ্বীনের উপর চললে দুনিয়াতেও শান্তি, সফলতা ও কল্যাণ লাভ হয়; আর আখিরাতেও শান্তি, মুক্তি ও নাজাতের ফায়সালা হয়। কিন্তু আমরা নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, হজ করি, যাকাত দেই, এ ছাড়াও আরও কত ইবাদাত করি, তবুও দেখা যায় আমাদের শান্তি নেই, সফলতা নেই, জীবনের কোনো উন্নতি নেই। ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন- সবখানিই শুধু অশান্তি, অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা আর নানান সমস্যায় ভরপুর।
এসবের মূল কারণ হলো- আমরা নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ইত্যাদির মাধ্যমে শুধু আল্লাহ তাআলার হক আদায় করছি আর মনে করছি আমি তো পরিপূর্ণ দ্বীনদার। কারণ আমি পূর্ণ দ্বীন মেনে চলি। অথচ বাস্তবতা হলো- আমরা দ্বীনের শুধু একটা অংশ তথা হুকুকুল্লাহ বা আল্লাহ তাআলার হক আদায় করছি কিন্তু দ্বীনের আরেকটা বিরাট অংশ তথা হুকুকুল ইবাদ বা বান্দার হকের ক্ষেত্রে আমি সম্পূর্ণ উদাসীন। আমি জানি না- হুকুকুল ইবাদ কী জিনিস এবং এটা দ্বীনের কত বড় অংশ! কোনো কোনো বুযুর্গ তো বলেন- দ্বীনের এক চতুর্থাংশ হলো হুকুকুল্লাহ বা আল্লাহ তাআলার হক। আর বাকি তিন চতুর্থাংশই হলো হুকুকুল ইবাদ বা বান্দার হক। কারণ ইসলামী আইনের বিখ্যাত কিতাব হেদায়ায় মোট চার খণ্ড লিখিত। এরমধ্যে শুধু এক খণ্ডে হুকুকুল্লাহ সংক্রান্ত আলোচনা। আর বাকি তিন খণ্ডই হুকুকুল ইবাদ সংক্রান্ত আলোচনার পরিপূর্ণ। সুতরাং স্পষ্টই বুঝা যায়- ইসলামে বান্দার হক আদায় করা কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যদি দুনিয়ায় কোনো কেউ হক নষ্ট করে, তাহলে এটা কিছুতেই মাফ হবে না; তার এই হক আদায় করতেই হবে। দুনিয়াতে না করলে আখিরাতেও হলেও তার এই হক আদায় করতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “যদি কেউ দুনিয়াতে কারও হক নষ্ট করে, আর দুনিয়াতে তা আদায় না করে, তাহলে কিয়ামতের দিন এই হক আদায় করতে হবে। এমনকি দুনিয়াতে যদি কোনো শিং বিশিষ্ট প্রাণী শিং ছাড়া প্রাণীর উপর অন্যায়ভাবে আক্রমণ করে তার হক নষ্ট করে থাকে, তাহলে আখিরাতে এটাও তার কাছ থেকে আদায় করে নেয়া হবে।"১৯
যারা দ্বারা বান্দার হক নষ্ট হবে, সে তো কিছুতেই পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারে না। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে- "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বললেন- আল্লাহর কসম, ঐ ব্যক্তি মুমিন না! আল্লাহর কসম, ঐ ব্যক্তি মুমিন না! আল্লাহর কসম, ঐ ব্যক্তি মুমিন না! সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন ব্যক্তি? তিনি বললেন- যার প্রতিবেশী তার অনিষ্টতা থেকে নিরাপদ না, সেই ব্যক্তি।"২০
এই হাদীস দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায়- বান্দার হক নষ্ট করে কেউ পরিপূর্ণ দ্বীনদার কিছুতেই হতে পারে না। অথচ দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি, সফলতা, কামিয়াবি, নাজাত ও মুক্তি পেতে হলে পরিপূর্ণ দ্বীন মেনে চলতে হবে। সুতরাং স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, আমরা মূলত পরিপূর্ণ দ্বীন না মানার কারণেই পরিপূর্ণ শান্তি-সফলতা লাভ করতে পারি না। আর আখিরাতেও নাজাত ও মুক্তির আশা করা যায় না। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যার প্রতিবেশী তার অনিষ্টতা থেকে নিরাপদ থাকতে পারে না।"২১
বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি বান্দার হক সম্পর্কে লিখিত। এই সংক্ষিপ্ত গ্রন্থে বান্দার সমস্ত হকের ব্যাপারে আলোচনা করা হয় নাই, তবে গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো হক সম্পর্কে সুন্দর আলোচনা করা হয়েছে। গ্রন্থটি সবার জন্যই বেশ উপকারী। একবার হলেও সবার পড়া উচিৎ। তাহলে বান্দার হক সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পাওয়া যাবে। আমি দুয়া করি, আল্লাহ তাআলা যেনো এই গ্রন্থটিকে হেদায়েতের মাধ্যম হিসেবে কবুল করেন এবং যারা এর পেছনে মেহনত করেছে, তাদের মেহনতকে কবুল করেন। আমীন।
মুফতি আমানুল হক দা: বা:
খতীব: ভিক্টোরিয়া পার্ক জামে মসজিদ
সদরঘাট, ঢাকা
টিকাঃ
১. সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫
২. সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯
৩. সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮৫
৪. সুরা মায়েদাহ, আয়াত: ৩
৫. তাফসীরে কুরআন মাজীদ, খন্ড: ১৪/৮৮
৬. সুরা বাক্বারাহ, আয়াত: ২০৮
৭. সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০২
৮. সুনানে ইবনে মাজাহ। হাদীস নং-৩৫৬৭
১৯. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৪৮০৭
২০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৬০১৬
২১. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৪৬
📄 ইসলামে নৈতিকতা মূল্যবোধের গুরুত্ব
ইসলামী সভ্যতায় নৈতিকতা ও মূল্যবোধ হলো একটি আধ্যাত্মিক বা অভ্যন্তরীণ বিষয়। সাথে সাথে এটা এমন একটি মৌলিক বিষয়, যার উপর ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। শতশত বছর জুড়ে ইসলামী সভ্যতা টিকে থাকার মূল রহস্যও এই নৈতিকতা ও মূল্যবোধ। এটা এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যেদিন তা হারিয়ে যাবে; সেদিন মানুষের আধ্যাত্মিক সক্ষমতা ও বিবেকবোধ লোপ পাবে। ফলে অবস্থা এমন হবে যে, মানুষের অন্তর থেকে মায়া-মমতা, স্নেহ-প্রীতিও চলে যাবে। অনুভূতি দুর্বল হয়ে পড়বে। আর সে হবে কর্তব্যবিমুখ। এভাবে এক সময় সে তার অস্তিত্বকে চিনবে না, নিজেকে চেনা তো দূরের কথা। ধীরে ধীরে সে এমন বসবাসের জিনিসের আবদ্ধ হবে, যার থেকে মুক্তি লাভের আর কোনো পথ পাবে না।
পূর্ববর্তী সভ্যতায় নৈতিকতা:
নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সভ্যতা এবং আধুনিক যুগের তেমন কোনো কৃতিত্ব নেই। নেই কোনো বিশেষ ভূমিকাও। একথা স্বীকার করেছেন খোদ পশ্চিমা বিশ্বের পণ্ডিতব্যক্তি বর্গ এবং গবেষকগণ। এক ইংরেজ লেখক চেম্বারস বলেছেন- "আধুনিক সভ্যতায় ব্যবহারিক শান্তি শক্তি ও আভ্যন্তরীণ নৈতিকতার মাঝে কোনো পার্থক্য করা হয় না। ফলে নৈতিকতার অবস্থান জ্ঞান থেকে অনেক দূরে। পাশর্্ব বিজ্ঞান বা প্রাকৃতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান আমাদেরকে তাঁর শক্তি উপহার দিয়েছে। কিন্তু আমরা তা শিশুসুলভ আকল আর পশুসুলভ বিবেক দিয়ে কাজে লাগাই।... মানুষের নৈতিক অবনতি বলতে বুঝায়- তার অস্তিত্বের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে না-জানা এবং মূল্যবোধের জগতকে অস্বীকার করে বসা। অথচ এই মূল্যবোধেই রয়েছে- সত্যতা, সৌন্দর্য, আদর্শ আর প্রকৃত কল্যাণকামিতা।"২২
আরেক পশ্চিমা দার্শনিক 'অ্যালেনক্রিস কার্লাইল' বলেন- "আধুনিক শহরে আমরা এমন লোক খুব কমই দেখতে পাই, যারা নৈতিকতার মত মূল্যবান বিষয়ের অনুসরণ করে। অথচ একটি সভ্যতার মূল ভিত্তি হিসেবে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সৌন্দর্য সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানকে ছাড়িয়ে গেছে।"২৩
প্রকৃত বাস্তবতা হলো- নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বিষয়টি শুধুমাত্র মুসলিম সভ্যতায় পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যায়; বরং এ সভ্যতার মূল ভিত্তিই হলো এই নৈতিকতা ও মূল্যবোধ। বিভিন্ন জাতি ও সভ্যতার মাঝে অনৈতিকতা, অরাজকতা আর বর্বরতার সরলাবের পর যখন তারা পরস্পর ছিন্নবিচ্ছিন্ন, শতধা বিভক্ত; ঠিক তখনই ইসলাম ধর্মীয় নৈতিকতা পাঠানো হয়েছে তাদেরকে উত্তম আদর্শ ও নৈতিকতা পরিপূর্ণভাবে শিক্ষা দেয়ার জন্য।
ইসলামের পূর্বে এই নৈতিকতা ও মূল্যবোধ যুগযুগ ধরে বিশ্বমানবতায় তেমন মানবিক কোনো ফসল বয়ে আনতে পারেনি; বরং আল্লাহ প্রদত্ত ওই আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দেখানো পথই একে পূর্ণতা দান করেছে। সুতরাং দীর্ঘ প্রায় পনেরো শতাব্দী যাবত ইসলামী শরিয়তেই হচ্ছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের একমাত্র মশালধারী।
টিকাঃ
২২. মুকাদ্দামাতুল উসুল ওয়া মানাহিজি: ৪/৭৭০
২৩. আল ইনসানু ফালিকাল মায়দান: ১০০
📄 ইসলামী সভ্যতায় মানবাধিকার
ভূমিকাঃ
পশ্চিমা দার্শনিক 'ফ্রেডরিক নিত্শে' বলেন- "দুর্বল-অসহায় মানুষগুলো একসময় অস্থায়ী মৃত্যুবরণ করবে, এটাই হলো আমাদের মানবতার প্রতি ভালোবাসার মৌলিক কারণ।"৩৪
কিন্তু ইসলামী শরিয়ত ও দর্শন কখনও নৈতিকতা ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়নি। ভাষা-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সমগ্র মানব জাতির মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম কখনও পিছিয়ে থাকেনি। পিছু হটেনি পারিপার্শ্বিক অন্যান্য বিষয় থেকেও। বরং ইসলামী শরীয়তের মাধ্যমেই এই সমস্ত অধিকারগুলো রক্ষা করা হয়েছে এবং এর বাস্তবতা নিশ্চিত করা হয়েছে। আর যারা সীমালঙ্ঘন করবে, তাদের জন্য রাখা হয়েছে শাস্তির বিধান।
ইসলামের দৃষ্টিতে মানবতাঃ
ইসলাম মানবতাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে। স্বয়ং আল্লাহ তাআলার বাণী থেকেই একথা সুস্পষ্ট। তিনি বলেন- "আমি মানবজাতিকে সম্মানিত করেছি। তাদেরকে জলস্থলে চলাচলের বাহন দান করেছি। তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি। আর আমার সকল সৃষ্টির মাঝে তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।"৩৫
এই দৃষ্টিভঙ্গিটি ইসলামে মানবাধিকার রক্ষায় বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব রাখে। বিশেষ করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সকল অধিকারকেই সন্নিবেশিত করে। মুসলিম-অমুসলিম-ভাষা-বর্ণ-জাতি-নির্বিশেষে প্রত্যেকটি মানুষের অধিকার ইসলাম দিয়েছে। এই অধিকার কেউ বাতিল বা পরিবর্তন করতে পারবে না। কেননা, স্বয়ং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই দেয়া হয়েছে এই অধিকার।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্বের ভাষণে এ বিষয়টিকে আরও মজবুত করেছেন। তাঁর সেই ভাষণটি ছিল মানবাধিকারের পক্ষে এক বলিষ্ঠ উচ্চারণ। সেদিন তিনি বলেছিলেন- "তোমাদের এই শহরে, তোমাদের এই মাসে তোমাদের এই দিন যেমন পবিত্র; কেয়ামত পর্যন্তও তোমাদের জান-মাল তেমন পবিত্র।"৩৬
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই ভাষণের মাঝে মানুষের জান, মাল ও ইজ্জত-সম্মানসহ সমস্ত অধিকারকে নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি মানুষের সর্বোচ্চ অধিকার- জীবনের অধিকারকে নিশ্চিত করতে গিয়ে বলেন- "সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো, আল্লাহ তাআলার সাথে কাউকে শরীক করা....এবং নিজের জীবন নিয়ে শেষ করা।"৩৭
উক্ত হাদীসে জীবন শব্দ দ্বারা বিনা অপরাধে শেষ করা প্রত্যেকটি জীবনকেই বুঝানো হয়েছে। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবজীবন রক্ষার প্রতি একটু বেশিই গুরুত্ব দিয়েছেন। এজন্য তিনি আত্মহত্যা নিষিদ্ধ করে আত্মরক্ষাকে ওয়াজিব করেছেন। তিনি বলেন- "যে ব্যক্তি পাহাড় থেকে পড়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামী। চিরকাল সে জাহান্নামে পাহাড় থেকে পড়তে থাকবে। যে ব্যক্তি বিষ পান করে আত্মহত্যা করবে, তার হাতে বিষ দেয়া থাকবে, চিরকাল সে জাহান্নামে বিষ পান করতে থাকবে। যে ব্যক্তি লোহার মাধ্যমে আত্মহত্যা করবে, তার হাতে লোহা দেয়া থাকবে, চিরকাল সে জাহান্নামে লোহা দিয়ে পেট আঘাত করতে থাকবে।"৩৮
এছাড়াও ইসলাম এ সমস্ত কাজকে হারাম ঘোষণা করেছে, যা মানবজীবনে কোনো রকম ক্ষতি সাধন করে। চাই সে কাজটি ভয় দেখানোর জন্য হোক বা অদ্ভূত করার জন্য হোক অথবা অনর্থক শাস্তি দেয়ার জন্য হোক। হযরত হিশাম ইবনে হাকেম রাজিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একথা বলতে শুনেছি- "আল্লাহ তাআলা ঐসকল ব্যক্তিকে শাস্তি দেবেন, যারা দুনিয়াতে মানুষকে (অনর্থক) শাস্তি দেয়।"৩৯
সকল মানুষ সমানঃ
ইসলাম মানুষকে ব্যাপকতাকে সম্মানীত করেছে। মানুষের জান, মাল ও সম্মানের উপর আঘাত করাকে হারাম ঘোষণা করেছে। জীবনের সর্বোচ্চ অধিকার বাস্তবায়ন করেছে। এরপর সকল মানুষের সম্মান অধিকার নিশ্চিত করেছে। ইসলামে ব্যক্তি-গোষ্ঠী, জাত-বংশ, রাজা-প্রজা, ধনী-গরীব বণিক-শ্রমিক সবাই সমান। এদের মাঝে কোনো উঁচুনিচু শ্রেণিভেদ নেই। শরীয়তের হুকুম-আহকামে আরব-অনারব, সাদা-কালো ও রাজা-প্রজা মাঝে কোনো তফাত নেই। বরং মানুষ হিসেবে আল্লাহ তাআলার কাছে সবাই সমান। তবে এক থেকে তুলনায় শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করার মাপকাঠি হলো শুধুমাত্র- ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- "হে মানব সকল! তোমাদের রব একজন। তোমাদের পিতা একজন। তোমরা প্রত্যেকেই আদমের সন্তান। আর আদম আলাইহিসসালাম মাটির তৈরি। তোমাদের মাঝে যে বেশি খোদাভীরু, সেই তোমাদের চেয়ে বেশি সম্মানিত। কোনো অনারবীর উপর আরবীয়ের একমাত্র মাপকাঠি হলো- ‘তাকওয়া’।"৪০
যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাস্তব জীবনে এ প্রতি লক্ষ্য করা হয়, তাহলে সেখানেও আমরা সমান অধিকার বাস্তবায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। হযরত আবু উমামাহ রাজিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন- "একবার হযরত আবু যর রাজিয়াল্লাহু আনহুমা হযরত বেলাল রাজিয়াল্লাহু আনহুমা কে তাঁর মায়ের নাম নিয়ে তিরস্কার করে বলেন- ‘হে কালোর বেটা!’ একথা শুনে হযরত বেলাল রাজিয়াল্লাহু আনহুমা রাগ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বিচার দিলেন। কিছুক্ষণ পর হযরত আবু যর রাজিয়াল্লাহু আনহুমা আসলেন। তিনি এটা বুঝতে পারেননি যে, তার নামে ইতিপূর্বেই বিচার দেওয়া হয়েছে। তাঁকে দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চেহারা ঘুরিয়ে নিলেন। আবু যর রাজিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমার নামে আপনি কিছু শুনেছেন, তাই আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি বেলালকে তার মায়ের নাম নিয়ে তিরস্কার করেছো? শুনে রেখো, ঐ সত্তার কসম! যিনি মুহাম্মাদের উপর কিতাব নাযিল করেছেন- প্রত্যেক ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব হয় তার আমলের মাধ্যমে। আর তোমরা হল সা৪১ এর কিনারার মত।"৪২
ইসলামে ন্যায়বিচারঃ
মানবাধিকারের সাথে সম্পূর্ণ আরেকটি অধিকার হলো- ‘ন্যায়বিচার’। এ বিষয়ে সবচেয়ে প্রকট উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করা যায় এই ঘটনাটি- একবার এক মানুষী মহিলা চুরি করেছিল। হযরত উসামা বিন যায়েদ রাজিয়াল্লাহু আনহুমা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলেন তাঁর হাত না-কাটার সুপারিশ নিয়ে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে দিলেন- "ঐ সত্তার কসম! যার হাতে মুহাম্মাদের জান। যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতেমাও চুরি করতো, তাহলে আমি তার হাতও কেটে ফেলতাম!"৪৩
কারও দ্বারা যেনো কেউ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়, সবাই যেনো ন্যায়বিচারের পূর্ণ অধিকার বুঝে পায়; এদিকে লক্ষ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেকেও বাঁচাতে গিয়েও অন্যের অধিকার বিন্দুমাত্র খর্ব করতে নিষেধ দিয়েছেন। একবার এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পাওনা আদায়ে করে এতে খুব খারাপ ভাষায় কথা বলতে লাগলো। সাহাবায়ে কেরাম বললেন- হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দিন, আমরা এই লোককেও শাস্তি করে দেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- "না, এই লোককে ছেড়ে দাও। কেননা, পাওনাদারের কথা বলার অধিকার আছে।"৪৪
যারা মানুষের মাঝে বিচার-সালিশ করেন, তারা যাতে ন্যায়বিচার ঠিক রাখতে পারে, এজন্য তাদের প্রতিও লক্ষ্য করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- "যখন বাদী-বিবাদী দু’ পক্ষ তোমার সামনে আসবে, তখন তুমি এক পক্ষের কথা শুনে অপর পক্ষের কথা না শুনে কোনো ফায়সালা করো না। এটা তোমার জন্য সঠিক রায় দিতে সহায়ক হবে।"৪৫
ইসলামে পর্যাপ্ত জীবনোপকরণের অধিকারঃ
ইসলামী শরীয়তের সাথে সম্পর্ক এমন একটি অধিকার রয়েছে, যে বিষয়ে আজ পর্যন্ত কোনো মানবনীতিও আইনগতভাবে কিছু বলা হয়নি। মানবাধিকার বিষয়ে যত চুক্তি-সনদ, দলিল-দস্তাবেজ আর আইন-কানুন রচিত হয়েছে- এ ব্যাপারে সবকিছুই একদম চুপ। সেই অধিকারটি হলো- ‘মানুষের পর্যাপ্ত জীবনোপকরণের অধিকার’। অর্থাৎ ইসলামী রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি ব্যক্তিই তার পর্যাপ্ত জীবনোপকরণ নিয়ে বসবাস করবে। যাতে সে স্বচ্ছন্দভাবে বাঁচতে পারে, এবং তার জন্য সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন যাত্রার ব্যবস্থা হয়। এ বিষয়টি মানবচরিত্রে জীবনব্যবস্থার দেওয়া নিম্নমানের জীবনব্যবস্থা থেকে একটু আলাদা।৪৬
পর্যাপ্ত জীবনোপকরণের অধিকার বাস্তবায়িত হয় কাজের মাধ্যমে। যখন কোনো ব্যক্তি কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়বে, তখন তার জন্য যাকাতের ব্যবস্থা করা হবে। যদি যাকাতের মাধ্যমেও অভাবীদের প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের জন্য আলাদা বাজেট ঘোষণা করা হবে। এবং তাদের সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়টিকে এভাবে বলেছেন- "যে ব্যক্তি কোনো ঋণ বা অসহায় সন্তান রেখে মারা গেলো, তার ঋণ আদায় করা এবং সন্তানদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব আমার।"৪৭
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অধিকারের উপর আরও গুরুত্বারোপ করে বলেন- “ঐ ব্যক্তি আমার উপর ঈমান আনেনি, যে তৃপ্তি ভরে খায়, আর তার পাশে প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে; যা সে জানে।”২৬
পশ্চাৎকেও যারা অন্যের খেয়াল রাখে, খোঁজ-খবর রাখে; তাদের প্রতি খুশি হয়ে তাদের প্রশংসা করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “আশআরী গোত্রের লোকেরা যখন জিহাদে গিয়ে অভাবগ্রস্ত হয়ে যায়, অথবা মদীনাতেই তাদের পরিবার-পরিজনকে খাবার-ঘাটতি দেখা দেয়, তখন তারা নিজেদের কাছে থাকা সমস্ত সম্পদকে একত্রিত করে একটি কাপড়ে জমা করে। এরপর একটি পাত্র দ্বারা মেপে প্রত্যেকে সমানভাগে বন্টন করে নেয়। সুতরাং তারা আমার (দলভুক্ত) আর আমিও তাদের (দলভুক্ত)।”২৭
নাগরিক ও পারিবারিক অধিকারঃ
ইসলাম তো স্বাভাবিকভাবে সকলের পূর্ণ অধিকার দিয়েছে; যুদ্ধক্ষেত্রেও নাগরিক ও পারিবারিক অধিকারের প্রতি পরিপূর্ণ লক্ষ্য রেখেছে। যুদ্ধে সাধারণতঃ সবাই প্রতিশোধ আর লড়াই নিয়ে ব্যস্ত থাকে। মানবতা আর দয়ার সবক তখন কারও মাথায় থাকে না। কিন্তু ইসলাম এমন এক কঠিন মুহুর্তেও মানবতার কথা ভুলে যায় নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “তোমরা শিশু, নারী আর বয়স্কদেরকে হত্যা করো না।”২৮
অনুরূপভাবে ইসলামে আরও কিছু নীতি-আদর্শ রয়েছে, যার মাধ্যমে এই অমানবিক পৃথিবীর বুকে মানবাধিকারের যাত্রা সমুন্নত করে এক সুন্দর পৃথিবী উপহার দিয়েছে। আর সামষ্টিকভাবেও ইসলাম মানবতার কল্যাণের প্রতি সদা সজাগ দৃষ্টি রেখেছে। কেননা, এই মানবতাই তো মূলত মুসলিম সভ্যতার প্রাণ।
টিকাঃ
৩৪. বুখারী ঈমান বাইনাল আক্বলি ওয়াল ক্বলব: ০১৮
৩৫. সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত নং-৭০
৩৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১৩৮৪ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৩৭৬
৩৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৮১০ সুনানুস নাসাই, হাদীস নং-৪০০৪ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৬৬৪৫
৩৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৪৪২ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১০৪
৩৯. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৩৬৩ সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং-৩০৪৩ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৬০৬৯
৪০. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৩২০৪ আল মু’জামুল কাবীর, হাদীস নং-১৪৪৪৪
৪১. ‘সা’ হলো এক প্রকার পাত্র। যা দ্বারা বিভিন্ন জিনিস মাপা হয়। এখানে বুঝানো হয়েছে- তোমরা প্রত্যেকেই ‘সা’ এর কিনারা পর্যন্ত সমান সমান। কেউ কারও চেয়ে শ্রেষ্ঠ নও। তবে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো তোমাদের আমল ও খোদাভীতি।
৪২. সুনানুল ইবন মাজাহ, হাদীস নং-৩২৪৫
৪৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৬৪৩ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৮৬
৪৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-২৫৮৭ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১০৮
৪৫. সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং-৬৪৮২ জামি তিরমিজি, হাদীস নং-১০০১ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৪৮২
৪৬. মাওসুয়াতুল ফিকহিল ইসলাম ফিল ইসলাম: ৫০৩,৫০৯
৪৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৬০০
২৬. আল মু’জামুল কাবীর, হাদীস নং-৭৫০ শুআবুল ঈমান, হাদীস নং-৩২০৮ -আল মুসতাদরাক লিল হাকেম, হাদীস নং-৭৩০৭
২৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৩৪৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৫০০
২৮. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ১৭৩১ আল মু’জামুল আওসাত, হাদীস নং-৪৫১৩