📘 ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নববী দর্পণে সমকালীন ধারণা > 📄 সামাজিক দক্ষতার আনুষঙ্গিক গুণগুলো কীভাবে অর্জন করা যায়

📄 সামাজিক দক্ষতার আনুষঙ্গিক গুণগুলো কীভাবে অর্জন করা যায়


সামাজিক যোগাযোগে দক্ষ হওয়ার জন্য বিশেষ কিছু ব্যাপারে আমাদের মনোযোগী হতে হবে। এগুলো হলো:
* বোঝার জন্যে কথা শুনতে হবে, জবার দেওয়ার জন্যে নয়। এভাবে একটি আন্তরিক ও কার্যকর কথোপকথনের মাধ্যমে নিজেদের মাঝে আন্তরিক বোঝাপড়া গড়ে তোলা যায়। এতে অনেক ভুল বোঝাবুঝি যেমন দূর হয় তেমনি পারস্পরিক সৌহার্দ্যও তৈরী হয় যা সামাজিক যোগাযোগে নানাভাবে সাহায্য করতে পারে。
* কার্যকর যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো কথোপকথনের সহজ পরিবেশ গড়ে তোলা। খারাপ-ভালো যেকোনো ধরনের খবর শেয়ার করার সুযোগ করে দেওয়া এবং এজন্য অন্যকে অনুপ্রাণিত করা সামাজিক দক্ষতার বিকাশকে গতিশীল করতে পারে অনায়াসে।
* বন্ধু-বান্ধব-কলিগ-পরিচিত মানুষজনের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার নতুন নতুন সুযোগ খুঁজে বের করে তা কাজে লাগানো এবং নতুন নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক তৈরী করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এমন একটা সময় আমরা পার করছি যখন কাজের মূল্যায়নের জন্য দক্ষতার চাইতে নেটওয়ার্কিং কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়。
• দ্বন্দ্ব নিরসন করতে পারা সামাজিক দক্ষতার আরেকটি চমৎকার উদাহরণ। এই দ্বন্দ্ব নিজ বাসাতে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহপাঠীদের সাথে কিংবা অফিসে বা ব্যবসায়িক কাজে সঙ্গীদের সাথেও হতে পারে। অত্যাধিক চাপের মাঝে থেকেও নিজের আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা ও অন্যদের আবেগ বোঝার চেষ্টা করা দ্বন্দ্ব নিরসনের মূলশর্ত। এরপর শান্তভাবে অন্যের যুক্তিতর্ক শোনা, ঝগড়া-বিবাদ প্রতিহত করা আর একান্তই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে গেলে ধাপে ধাপে সেগুলোর সমাধান করা ও উভয়ের মতকেই প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে সুন্দরভাবে বিষয়টির সমাধান করা-এগুলোই সামাজিক দক্ষতার পরিচায়ক।
• যুক্তিতর্ক, দর-কষাকষি ও আলাপ-আলোচনায় সবসময় সর্বজনীন কল্যাণকর উপসংহারে আসার চেষ্টা করতে হবে। এতে ক্লায়েন্টের সাথে সুসম্পর্ক ধরে রাখা সহজ হবে এবং নেটওয়ার্কিং বজায় রাখা সম্ভব হবে。
• ইসলাম যোগ্য মানুষকে দায়িত্ব নিতে উৎসাহিত করে তবে শর্ত হলো- নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়া যাবে না। কিন্তু প্রয়োজনের সময় বিনয়বশত লুকিয়ে না থেকে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসা সামাজিক দক্ষতার পরিচায়ক。
• নিজে উদাহরণ সৃষ্টির মাধ্যমে অনুসারীদেরকে কাজ শেখানো গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রেরণাদায়ক নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এর ফলে টীমের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ভালো হয়, কাজের আউটপুট বহুগুণ বেড়ে যায়, ভুল বোঝাবুঝি দূর হয় এবং টীমের সদস্যদের সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধি পায়。
• বর্তমান সময়ে খুব দ্রুত চারিদিকে পরিবর্তনের ছোঁয়া আসছে। এই পরিবর্তন থামবে না, বরং দ্রুতগতিতে বাড়তেই থাকবে। কাজেই চলমান বিশ্বের সামাজিক দক্ষতা বাড়ানোর মূল চাবিকাঠি হলো পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানো। এজন্য প্রয়োজন পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নিজে ও আশেপাশের সকলে সচেতন থাকা, নির্দিষ্ট কারও পরিবর্তনের আদর্শকে সামনে রাখা (সম্ভব হলে) এবং উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত সুযোগকে কাজে লাগানো।

📘 ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নববী দর্পণে সমকালীন ধারণা > 📄 সামাজিক দক্ষতার ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

📄 সামাজিক দক্ষতার ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি


মানুষের সাথে মেশার তথা সামাজিক দক্ষতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ও নম্রতা। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ রাসুলুল্লাহ কে বলেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الأمْر فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
"সুতরাং আল্লাহর পরম অনুগ্রহ যে তুমি তাদের ওপর দয়ার্দ্র রয়েছ। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের, কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। অতঃপর যখন সংকল্প করবে তখন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ভরসাকারীদেরকে ভালবাসেন।" [১৫৯]
সামাজিক দক্ষতা অর্জনের আরেকটি উপায় হলো, কল্যাণকর কথা বলা অথবা চুপ থাকা। শুধু কথা বলার জন্যই না বলা। কেননা এতে গীবত ও মিথ্যা কথা বলার সম্ভাবনা বেড়ে যায়。
রাসূল বলেছেন, - “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের ওপর ঈমান আনে, সে যেন ভাল কথা বলে নতুবা চুপ থাকে। - তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের ওপর ঈমান আনে, সে যেন প্রতিবেশির সাথে ভাল আচরণ করে। - তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের ওপর ঈমান আনে, সে যেন অতিথির সাথে ভাল আচরণ করে।" [১৬০]
এভাবে ইসলাম আমাদেরকে শেখায় সামাজিক দক্ষতা যেন সামাজিক ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক ভালোবাসার অপর নাম। একটি আদর্শ সমাজ গঠনের প্রধান উপাদানও তাই সামাজিক দক্ষতা। কারণ, সামাজিক দক্ষতাবিহীন সমাজব্যবস্থা এমন এক সমাজব্যবস্থা যেখানে সমাজের মূল গাঁথুনি অর্থাৎ পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ অনুপস্থিত।
রাসূল যখন হিজরত করে মদীনায় চলে গেলেন তখন তিনি এই সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধের দিকেই সর্বাধিক নজর দিয়েছিলেন। আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে তিনি এক নতুন সমাজের গোড়াপত্তন করেন।
এই সমাজের সদস্যদের পারস্পরিক রসায়ন কেমন হবে তাও তিনি নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন:

* সমগ্র মুসলিম উম্মাহ একটি শরীরের মতো। একটি অঙ্গ আহত হলে অন্যান্য অঙ্গেও ব্যথা অনুভূত হবে。
* একজন মুসলিমের সম্পদ, সম্মান ও রক্ত পবিত্র। কেউ অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ, সম্মান ও রক্তের পবিত্রতা নষ্ট করতে পারবে না。
* সেই ব্যক্তি প্রকৃত মুমিন নয় যার হাত, পা ও মুখ থেকে অপর মুমিন নিরাপদ থাকে না。

টিকাঃ
[১৫৯] সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫৯
[১৬০] বুখারী: ৬০১৮; মুসলিম: ৪৭

📘 ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নববী দর্পণে সমকালীন ধারণা > 📄 ইয়াকুব-এর সামাজিক দক্ষতা

📄 ইয়াকুব-এর সামাজিক দক্ষতা


ইউসুফ যখন তাঁর স্বপ্নের কথা তাঁর বাবা নবি ইয়াকুব কে বললেন তখন ইয়াকুব তাঁকে বললেন,
قَالَ يُبْنَى لَا تَقْصُصْ رُعْيَاكَ عَلَى إِخْوَتِكَ فَيَكِيدُوا لَكَ كَيْدًا إِنَّ الشَّيْطَنَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
"ছেলে আমার, তোমার ভাইদের সামনে এ স্বপ্ন বর্ণনা করো না। তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।" [১৬১]

ইউসুফ এর ভাইয়েরা স্বপ্নের বাখ্যা করতে জানত না। তাহলে ইয়াকুব কেন ইউসুফকে নিষেধ করেছিলেন এই স্বপ্নের কথা তার ভাইদের বলতে? কারণ, কিছু মানুষ আছে যারা সর্বদা প্রচণ্ড নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। অন্যের মধ্যে ভালোর কোনো লক্ষণ দেখলেই তাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়, শত্রুতা ও ক্ষতি করার চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই বিষয়টা ইয়াকুব ধরতে পেরেছিলেন। অর্থাৎ, ছেলেদের গ্রুপ ডাইনামিক্সের সম্ভাব্য পরিণতি তিনি দেখতে পেয়েছিলেন। এটা হলো, ইয়াকুব এর আল্লাহ-প্রদত্ত দক্ষতা।

একইসাথে, এখান থেকে শেখা যায় যে, সন্তানদেরকে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সম্ভাব্য বিপদ থেকেও হেফাযত করা ও সতর্ক করা অত্যন্ত জরুরি। এমনকি অন্যেরা আপন ভাই হলেও। এটাও বাবা-মায়ের সামাজিক দক্ষতার অংশ。

টিকাঃ
[১৬১] সূরা ইউসুফ, ১২:৫

📘 ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নববী দর্পণে সমকালীন ধারণা > 📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সামাজিক দক্ষতা

📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সামাজিক দক্ষতা


সীরাতে নববির গভীর অধ্যায়ন রাসূল ﷺ এর সামাজিক দক্ষতা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের নতুন নতুন দুয়ার খুলে দেয়। এই ঘটনাগুলো একইসাথে রাসূল ﷺ এর নেতৃত্বগুণও আমাদের সামনে পরিষ্কার করে দেয়। চলুন দেখে নেওয়া যাক সীরাত থেকে নবি ﷺ-এর সামাজিক দক্ষতার কিছু নমুনা।

আকাবার দ্বিতীয় শপথের সময় রাসূল ﷺ যখন আনসারদের কাছে চুক্তির শর্তগুলো বলেছিলেন, তখন আনসারদের প্রশ্ন ছিল: আমরা এর বিনিময়ে কী পাব? রাসূল ﷺ শুধু এক শব্দে উত্তর দিয়েছিলেন "জান্নাত"। এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি- রাসূল ﷺ আনসারদের চাহিদা বুঝতে পেরেছিলেন এবং তাদেরকে দুনিয়ার সামান্য বিনিময়ের পরিবর্তে আখিরাতের চিরস্থায়ী ও চিরকল্যাণকর প্রতিদানের দিকে ধাবিত করেছিলেন। একই সাথে চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য তিনি খোলাখুলিভাবে সাহাবিদের সামনে প্রকাশ করেছিলেন, কোনো রাখঢাক করেননি। এখান থেকে সামাজিক দক্ষতার যে কৌশলটি জানতে পারি আমরা তা হলো:

» একজন নেতাকে তার অনুসারী ও দলের কাছে নিজের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও স্বপ্ন পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। কোনো রাখঢাক রাখা চলবে না। দলের সকলেই যখন লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মপন্থা সম্পর্কে অবগত থাকে তখন কাজের গতি বেড়ে যায় এবং দ্রুত লক্ষ্যে পৌঁছানো সহজ হয়।

আকাবার দ্বিতীয় শপথের সময় বাইয়াত গ্রহণ করা মাত্রই রাসূল ﷺ তাদেরকে বারো জন নেতা মনোনীত করতে বললেন। এরপর তিনি নিজেই তাদেরকে ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে প্রতিটি দলের জন্য একজন করে নেতা নিযুক্ত করে দিলেন। তাঁরা ছিলেন এক ধরনের প্রতিনিধি যারা রাসূল ﷺ এর কাছে নিয়মিত রিপোর্ট করবেন এবং রাসূল ﷺ তাদের মাধ্যমে ইয়াসরিবের মুসলিমদের কাছে নির্দেশনাবলী পাঠাবেন।

» অর্থাৎ, উপযুক্ত ব্যক্তির হাতে প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব অর্পণ করে দিলে উদ্দেশ্য সাধন ও লক্ষ্যে পৌঁছানো সহজ হয়। একটি দলের কাজে সফলতার জন্য নেতৃত্ব নির্বাচনের গুরুত্বও এখান থেকে বোঝা যায়।

আকাবার দ্বিতীয় শপথের প্রাক্কালে ইসলাম গ্রহণের পরপরই আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন হারামকে আনসারদের নেতা নির্বাচন করা হয়। তিনি তখনো ইসলামে নতুন, কিন্তু বয়োজ্যোষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের যোগ্যতার কারণে আনসারগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁকে নেতা হিসেবে মেনে নেয়।

» কোনো প্রজেক্ট সফলভাবে শেষ হতে হলে উপযুক্ত নেতৃত্ব নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেতৃত্বের দায়িত্ব সবসময় বড় আবেদ কিংবা বুজুর্গকে দিতে হবে এমন কথা নেই। বরং অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের গুণাবলি যার মাঝে আছে তাঁকেই নেতা বানাতে হবে, যদিও তার আমলে কিছু ঘাটতি থাকে। কারণ, তার আমলের ঘাটতির কারণে সে একাই সাওয়াব কম পাবে কিন্তু তার নেতৃত্বের গুণাবলির কারণে পুরো টীম উপকৃত হবে। অন্যদিকে, অনেক আমল করেন কিন্তু নেতৃত্বের গুণ নেই এমন কাউকে নেতা বানানো হলে তার আমল তাকে ব্যক্তিগতভাবে উপকৃত করবে কিন্তু তার পুরো টীম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

• ইসলাম রাতারাতি মানুষের মাঝে সকল পরিবর্তন আশা করে না। আর তা আশা করতে শিক্ষাও দেয় না। বরং পর্যায়ক্রমে মানুষকে পূর্ণ ইসলামের দিকে নিয়ে আসাই ইসলামের শিক্ষা। এতে যেমন ইসলাম মানুষের কাছে কঠিন বলে প্রতীয়মান হয় না, তেমনি ইসলামের প্রতি ভালোবাসাও তার অন্তরে গেড়ে বসার সুযোগ পায়। এজন্যই আমরা দেখেছি, প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণকারী খাজরাজ ও আওসের লোকদের অনুপাত ছিল ৫:১। অর্থাৎ তখনো আওস ও খাজরাজ পুরোপুরি এক হতে পারেনি, কিন্তু তা নিয়ে রাসূল বিন্দুমাত্র আপত্তি করেননি। এমনকি মুস'আব বিন উমায়ের তাঁর দাওয়াতী কাজেও কখনো প্রকাশ্যে এ নিয়ে কথা তোলেননি। তিনি নীরবে আওসকে ইসলামের পথে আনার জন্য তাদের এলাকায় গিয়ে তালিম ও হালাকা করেছেন। আবার আওস ও খাজরাজের লোকেরা একে অপরের ইমামতি মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল না, তাই মুসআব তাঁদের সালাতে ইমামতি করতেন। এখানেও রাসূল ﷺ ধৈর্যের সাথে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য সময় দিয়েছেন। আওস ও খাজরাজকে একে অপরের পিছনে সালাত আদায় করার জন্য পীড়াপীড়ি করেননি। পরবর্তীকালে ঠিকই ইসলাম তাদেরকে পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ করে দিয়েছিল। অর্থাৎ-

» ব্যক্তির ও দলের পরিবর্তনের জন্য তাড়াহুড়ো করা যাবে না। অনুসারীদের নিয়ে ধৈর্যের সাথে দাওয়াতের কাজ করে যেতে হবে। একই কথা সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রাতারাতি পরিবর্তন আশা করা কেবল আমাদের হতাশাই বাড়াবে।

মসজিদে কুবা ও মসজিদে নববি নির্মাণে রাসূল প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন। মসজিদে কুবার ভিত্তিপ্রস্তর তিনি নিজে পাথর বহন করে এনে স্থাপন করেন। মসজিদে নববি নির্মাণের সময় তিনি ইট বহন করে ধূলিধূসরিত হয়েছেন। আহযাব যুদ্ধের সময় নিজ তত্ত্বাবধানে পরিখা খনন করিয়েছেন, প্রয়োজনে সাহাবিদের সাথে কোদাল চালিয়েছেন।

» একজন আদর্শ নেতা শুধু মানুষকে নির্দেশনা দিয়েই ক্ষান্ত থাকে না, বরং নিজে সেই কাজে অংশ নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ইসলামে নেতৃত্ব মানে অন্যকে আদেশ করা নয়, ইসলামে নেতৃত্ব হলো অন্যের সেবা করার মাধ্যমে অনুসারীদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। এটাই একজন নেতার সামাজিক দক্ষতার নমুনা।

মসজিদে নববির নির্মাণকাজে সাহাবিদের সাথে বনু নাজদের এক লোক অংশ নিয়েছিলেন। তিনি পেশায় মিস্ত্রী ছিলেন। তিনি সাহাবিদের সাথে ইট বহনের কাজ করতে চাইলে রাসূল তাঁকে বালি ও চুনার কাদার মিশ্রণ তৈরী করতে বললেন। কারণ, সে এই কাজে পারদর্শী ছিল। অর্থাৎ সবাইকে একই কাজ করতে হবে কিংবা একই কাজে দক্ষ হতে হবে তা নয়। সুতরাং-

» অনুসারী বা দলের সদস্যদের প্রত্যেকের দক্ষতা সম্পর্কে নেতাকে জানতে হবে এবং সেই অনুযায়ী দক্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে। সবাইকে একই কাজে লাগানো কিংবা যে যেটা চায় তাকে সেই কাজ করতে দেওয়া উচিত নয়। বরং যে ব্যক্তি যে কাজে বিশেষ দক্ষ, তাকে সেই কাজের দায়িত্ব দেওয়া উচিত।

মদীনা সনদের ভিত্তিতে মদীনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ইয়াহুদিদের জন্য শর্ত সাপেক্ষে সমস্ত নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করলেও রাসূলুল্লাহ সাহাবিদেরকে নির্দেশ দিলেন, সকল ক্ষেত্রে ইয়াহুদিদের বিপরীত করতে। যেমন, মদিনার ইহুদীরা ইবাদতের সময় চামড়ার মোজা পরত না, তাই তিনি সাহাবিদের চামড়ার মোজা পরার নির্দেশ দিলেন। তিনি সাহাবিদেরকে মেহেদি দিয়ে চুল রং করার নির্দেশ দিলেন; এটি ছিল পুরুষদের জন্য। মদিনার ইহুদীরা শুধুমাত্র মুহাররমের দশ তারিখে রোজা রাখত। রাসূল এই দিনের সাথে আরও একদিন যুক্ত করে রোজা রাখার জন্য বললেন। এভাবে সকল ক্ষেত্রেই ইয়াহুদিদের চাইতে পৃথক ধর্মবিশ্বাস এবং বাহ্যিক আচার-আচরণে মুসলিমদের জন্য আলাদা করণীয় নির্ধারণ করে দিলেন। তিনি যেন এই উম্মাহকে শিখিয়ে

» বহু সংস্কৃতির মিশেলের মধ্যে গিয়ে নিজস্ব পরিচয় ও স্বকীয়তাকে ভুলে গেলে চলবে না। বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে কাজ করার ক্ষেত্রে Peer pressure অনেকক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তখন নিজস্ব সংস্কৃতিতে অটল থাকা সামাজিক দক্ষতার পরিচায়ক। মুসলিমদের জন্য বিষয়টা আরও গুরুতর। বাহারি সাংস্কৃতিক পরিবেশে অনেক সময় এমন অনেক সাংস্কৃতিক বিষয় চলে আসে, যা ইসলামের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। টীমের বাকিদের সাথে ভুল বোঝাবুঝি ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়িয়ে ওই সমস্ত বিষয় পরিহার করা সামাজিক দক্ষতার নমুনা।

• বিভিন্ন যুদ্ধে রাসূল এর সৈন্যবিন্যাস কৌশল থেকে তাঁর সামরিক ও সামাজিক দক্ষতা উপলব্ধি করা যায়। বদরের যুদ্ধে তিনি সকল আনসারকে এক পতাকাতলে, সকল মুহাজিরকে পৃথক একটি পতাকাতলে রেখেছিলেন এবং সামনের সারিতে মুস'আব বিন উমায়েরকে রেখেছিলেন। কারণ, মুস'আব বিন উমায়ের ছিলেন আনসারদের প্রথম শিক্ষক এবং তাঁকে মান্য করার ব্যাপারে আওস ও খাজরাজের মধ্যে কোনো মতভেদ ছিল না। আবার মুহাজির ও আনসারদের ছিল স্বতন্ত্র রণ-কৌশল এবং সামরিক সংস্কৃতি। বদরের যুদ্ধের সময় মুহাজির ও আনসারদের মেলামেশার বয়স পূর্ণ ২ বছরও হয়নি। তাই আনসার ও মুহাজিরদের পারস্পরিক স্বতন্ত্র রণ-কৌশল এবং সামরিক সংস্কৃতি বজায় রেখেই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য রাসূল তাঁদেরকে আলাদা আলাদা গ্রুপে রেখেছিলেন। একজন নেতা হিসেবে বহুজাতিক পরিবেশে কীভাবে অনুসারীদের নেতৃত্ব দিতে হয়, তা রাসূল আমাদেরকে দেখিয়ে দিলেন।

» একটি টীমে বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউণ্ডের মানুষ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কাজের গতিশীলতার স্বার্থে তাদের সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে মেনে নিতে হবে, যতক্ষণ না তা টীমের জন্য ক্ষতিকর ও ইসলামি শারীয়ার সাথে সাংঘর্ষিক হয়।

আলী বর্ণনা করেছেন, "বদর যুদ্ধের পূর্বরাত্রে আমরা সকলেই শুয়ে পড়েছিলাম, কেউ শোয়া থেকে বিরত থাকেনি। কেবল ব্যতিক্রম ছিলেন রাসূলুল্লাহ। তিনি রাতভর নামায, দুআ ও আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটিতে রত থাকেন।" (সহিহ ইবনু খুযায়মা)। এখান থেকে একজন আদর্শ মুসলিম নেতার গুনাবলী শেখা যায়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁর অনুসারীগণ বিশ্রাম নিলেও

একজন দরদি নেতার বিশ্রামের সময় নেই। তিনি হয় কৌশলী পরিকল্পনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখবেন অথবা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুতিতে নিজেকে উজাড় করে দিবেন。

> নেতার কোনো বিশ্রাম নেই। হয় তিনি কৌশলগত পরিকল্পনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখবেন অথবা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুতিকরণে নিবেদিত থাকবেন (অবসর সময়ে)। দলের সবাই যখন নিশ্চিন্ত থাকবে তখন তিনি আল্লাহর সাথে সম্পর্কোন্নয়নে ব্যস্ত থাকবেন। বিপদ ও দুঃসময়ে সবাই যখন পেরেশান থাকবে তখন তিনি সামনে থেকে তার দলকে নেতৃত্ব দিবেন।

রাসূল বলেছিলেন যেন বদর যুদ্ধে বনু হাশিমের কাউকে হত্যা করা না হয়। কারণ, বনু হাশিমকে জোরপূর্বক যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। একথা শুনে আবু হুজাইফা বলে ফেলেছিলেন, “ও আচ্ছা! আমাদের বাপ-চাচা-ভাইদের শুধু হত্যা করা হবে আর রাসূল -এর বংশের কাউকে হত্যা করা যাবে না? আল্লাহর কসম! আমি আব্বাসকে হত্যা করবই"। আবু হুজাইফা একথা বলেছিলেন কারণ, বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে তাঁর আপন ভাই, বাবা ও চাচা মুসলিমদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন এবং এই দৃশ্য তিনি প্রত্যক্ষ করেন। তাঁর একথা রাসূল এর কানে গেলে তিনি উমর কে বললেন, "হে আবু হাফসা! রাসূল-এর চাচার মুখও কি তরবারির আঘাতপ্রাপ্ত হবে?” উমর বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয়ই সে মুনাফিক হয়ে গেছে। আপনি আমাকে তার গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার অনুমতি দিন"। রাসূল উমরকে নিষেধ করলেন। পরবর্তীকালে আবু হুজাইফা বলতেন, "সেদিন আমি যা বলেছিলাম অনুশোচনায় তা থেকে কখনো আমার মন শান্ত হতে পারেনি। একমাত্র শাহাদাতের মাধ্যমেই আমার তাওবা পূরণ হতে পারে"। তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন এবং তাঁর ইচ্ছা পূরণ হয়। এখানে রাসূল আমাদেরকে শেখালেন:

> মানুষের সকল ভুল তাৎক্ষণিক ধরিয়ে দিতে নেই। কখনো কখনো মানুষকে সময় দেওয়া উচিত নিজের ভুল বুঝতে পারার জন্য। কারণ, মানুষ যখন নিজের ভুল নিজে অনুধাবন করতে পারে তখন সেই অনুশোচনা হয় গভীর ও স্থায়ী।

» কেবলমাত্র নবি-রাসূলগণ ব্যতীত কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধে নয়। তাই বাহ্যিকভাবে কোনো ভুলের জন্য মানুষের সকল ভাল কাজ মূল্যহীন হয়ে যায় না। বরং আমাদের উচিত কোনো ব্যক্তির ভুলের জন্য শুধুমাত্র তার ওই ভুল কাজকে দোষারোপ করা এবং তার বাকি ভালো কাজগুলো থেকে উপকৃত
হওয়া ও সেগুলোর জন্য তার অবদানকে স্বীকার করা।

বদর যুদ্ধের পর যখন বন্দীদের থেকে মুক্তিপণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো তখন আনসারদের কেউ কেউ রাসূল ﷺ এর কাছে আব্বাসকে ‘নিজেদের ভাগিনা' বলে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্তি দেওয়ার অনুরোধ জানালেন। রাসূল ﷺ তাদের বললেন, “আল্লাহর শপথ, তার মুক্তিপণ থেকে এক মুদ্রাও হ্রাস করবে না"। আব্বাসকে আনসার সাহাবিগণ রাসূল - নিজের চাচা না বলে নিজেদের ভাগিনা বলেছেন। কারণ, 'রাসূল ﷺ এর চাচা' বললে মনে হত তারা রাসূল * এর চাচা বলে তার ওপর অনুগ্রহ করতে চাচ্ছেন। একথা থেকে সাহাবিদের বুদ্ধিমত্তা ও সুরুচি প্রকাশ পায়। কিন্তু সাহাবিদের এই প্রস্তাবে রাসূল রাজি হলেন না। যেন দ্বীনের মধ্যে কোনো স্বজনপ্রীতি জায়গা না পায়। বরং উল্টোটা করে নিজের চাচার মুক্তিপণ আরও বাড়িয়ে দেন।

» একজন নেতা কখনো অন্যায়ভাবে পক্ষপাতিত্ব করবেন না। তিনি অনুসারীদের সাথে ইনসাফের সম্পর্ক বজায় রাখবেন।

আব্দুল্লাহ ইবনু উবাইকে হত্যা না করা ছিল রাসূল ﷺ এর সামাজিক দক্ষতার অন্যতম চূড়ান্ত উদাহরণ। বদর যুদ্ধের অব্যবহিত পর থেকে দীর্ঘ প্রায় ৮ বছর তিনি ইসলাম, মুসলিম ও রাসূল ﷺ এর শত্রুতায় নিজের সর্বস্ব নিয়োজিত করেছিলেন। কিন্তু তিনি নির্লজ্জভাবে মুসলিম বেশ ধরে থাকতেন। রাসূল এর পেছনে সালাতেও শরীক হতেন এবং সাহাবিদের মজলিসেও বসতেন। তার মুনাফিকীর কারণে সাহাবিগণ একাধিকবার তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু রাসূল প্রতিবারই বলেছিলেন- "আমি চাই না মানুষ বলুক যে, মুহাম্মাদ তার সঙ্গী সাথীদের হত্যা করে”। আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই এর নেতৃত্বের কথা আরবের অনেকেই জানত। রাসূল ﷺ এর মদীনায় আগমনের পর তার নেতৃত্ব হারিয়ে যায়। আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই এর নেতৃত্ব হারিয়ে যাওয়ার ও ইসলাম গ্রহণের কথা অনেকেই জানত কিন্তু তার মুনাফিকীর কথা মদীনার দূরবর্তী এলাকার অনেকেই জানত না। তাই মুনাফিকীর কারণে আব্দুল্লাহ ইবনু উবাইকে হত্যা করলে মানুষের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছত।

মানুষকে অযথা বিতর্কের/সমালোচনার সুযোগ না দেওয়া একজন নেতার অন্যতম গুণ। নেতৃত্ব ছাড়াও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। অযথা বিতর্কের সুযোগ দিয়ে নিজের প্রোডাকটিভিটি ও সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কোনো লাভ হয় না।

উহুদ যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসূল মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলেন। এজন্য তিনি আসরের সালাত শেষে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেন এবং তিনি উপরে ও নিচে দুটি লৌহ বর্ম পরে তরবারি ধারণ করে অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মানুষের সামনে আসলেন। তখন সা'দ বিন মুয়াজ ও উসায়েদ বিন হুজায়ের রাসূল এর ওপর মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধের জন্য এমন জোরাজুরি করার কারণে লোকদেরকে তিরষ্কার করলেন। তখন সকলেই রাসূল -এর উপরে নিজেদের মত নিয়ে জোরাজুরি করার জন্য লজ্জিত হলেন এবং রাসূল কে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আপনার বিরোধিতা করা আমাদের মোটেই উচিত ছিল না। সুতরাং আপনি যা পছন্দ করেন! তাই করুন। যদি মদিনার ভেতরে থাকা আপনি পছন্দ করেন! তবে সেখানেই থাকুন। আমরা কোনো আপত্তি করব না।” রাসূল বললেন, "কোনো নবি যখন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে যায় তখন তার জন্য অস্ত্র খুলে ফেলা সমীচীন নয়; যে পর্যন্ত আল্লাহ তাঁর ও শত্রুদের মধ্যে ফয়সালা করে না দেন!"

> নেতার সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা উচিত নয়। যখন তখন সিদ্ধান্ত বদল করা চলবে না কিংবা কারো কথায় বা চাপাচাপিতে ক্ষণে ক্ষণে দোলাচলে থাকা যাবে না। একজন আদর্শ নেতা সকলের মতামত শুনবে, আলোচনা করবে এবং তারপর চিন্তা করে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হবে। অতঃপর সেটাই হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। যদি নতুন তথ্য আসে অথবা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাহলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা যেতে পারে। কিন্তু কেবলমাত্র দোলাচলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা আদর্শ নেতার সামাজিক দক্ষতার পরিচায়ক নয়।
> মাশোয়ারার কারণে যদি নেতার পছন্দনীয় মতের বিরুদ্ধ মতও গ্রহণ করতে হয়, তবুও নেতার উচিত নয় এজন্য তার অনুসারীদের কটাক্ষ করা কিংবা খোঁটা দেওয়া, যদিও অনুসারীদের মত ভুল হয়। শরীয়ার নির্ধারিত সীমার ভেতরে হলে, সম্মিলিত সিদ্ধান্তে শ্রদ্ধা প্রকাশ করাই আদর্শ নেতার সামাজিক দক্ষতার পরিচায়ক।

একবার এক লোক রাসূল ও সাহাবিগণের মজলিসে কিছু আঙ্গুর হাদিয়া হিসেবে নিয়ে আসেন। রাসূল আঙ্গুর মুখে দিয়েই দেখেন যে সেগুলো টক। তিনি সাথে সাথে বুঝে ফেলেন যে, সাহাবিগণ সেগুলো মুখে দিয়ে এমন কোনো মন্তব্য করে বসতে পারেন যা শুনে হাদিয়া নিয়ে আসা ব্যক্তির মনে আঘাত লাগতে পারে। এজন্য তিনি হাসিমুখে দ্রুত আঙ্গুরগুলো একাই খেয়ে ফেলেন। এখানে আমরা দেখলাম-

» রাসূল ﷺ তাঁর অনুসারীদের মানসিক অবস্থার গতিপ্রকৃতি আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। এভাবেই তিনি আগন্তুক ব্যক্তিকে অপ্রস্তুত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন। টীমের বাকিদের মানসিক অবস্থা সচেতন থাকা সামাজিক দক্ষতার পরিচায়ক।

• হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় বুদাইল বিন ওয়ারাকা তার গোত্র বনু খুযায়ার লোকজনকে নিয়ে রাসূল ﷺ এর খিদমতে উপস্থিত হলেন। তারা ছিলো মুসলিমদের শুভাকাঙ্ক্ষী। রাসূল ﷺ বললেন, “কারো সাথে যুদ্ধ করার জন্য আমরা এখানে আসিনি। অতীতের যুদ্ধসমূহ কুরাইশদের সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত করে ফেলেছে। এতে তাদের সামান্য ক্ষতি হয়েছে। তাই যদি তারা চায় তাহলে আমি তাদের সাথে একটি সময় নির্ধারণ করব। যে সময় তারা আমার ও অন্যান্য লোকজনের পথ থেকে সরে দাঁড়াবে। এতে বড় আকারের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর সম্ভব হবে। অন্যথায় তারা যদি যুদ্ধ চায় তাহলে তাদের ঔদ্ধত্যজনিত কৃতকার্যের শাস্তি অবশ্যই ভোগ করতে হবে। আর যদি যুদ্ধ তাদের একমাত্র কাম্য হয়ে থাকে তবে সেই সত্তার কসম যার হাতে রয়েছে আমার প্রাণ, আমি আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তাদের সাথে ওই সময় পর্যন্ত যুদ্ধ করে যাব যতক্ষণ পর্যন্ত আমার শরীরে আত্মা থাকে। কিংবা যতক্ষণ আল্লাহ দ্বীনের ব্যাপারে একটা চূড়ান্ত ফয়সালা করে না দেন।"

রাসূল ﷺ এর এই কথা বুদাইল কুরাইশদের মাঝে গিয়ে বর্ণনা করলো। এরপর তারা প্রতিনিধি হিসেবে মুকরিয ইবনু হাফসকে রাসূল ﷺ এর নিকট পাঠাল। তাকে দেখেই রাসূল ﷺ বললেন, “এই ব্যক্তি অঙ্গীকার ভঙ্গকারী”। এরপর কুরাইশদের পক্ষ থেকে বনু কিনানা গোত্রের হালিস ইবনু আলকামা রাসূল ﷺ এর দরবারে আসলেন। তাকে দেখেই রাসূল ﷺ বললেন, “এই ব্যক্তি এমন এক সম্প্রদায়ের লোক যারা হাদইর (হাজ্জ/উমরাহ-তে কুরবানির জন্য নিয়ে আসা পশু) পশুকে খুব বেশি সম্মান করে। অতএব পশুগুলোকে দাঁড় করিয়ে দাও”। একথা শুনে সাহাবিগণ তাঁদের সাথে নিয়ে আসা কুরবানির পশুগুলোকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে দিলেন এবং পশুগুলোকে দেখেই হালিস ইবনু আলকামা বুঝে ফেলল যে মুসলিমগণ যুদ্ধের জন্য আসেননি বরং সত্যিকার অর্থেই উমরাহ করতে এসেছেন। সে কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে মুসলিমদের কথার সত্যতার সাক্ষ্য দিল। এখানে রাসূল ﷺ এর কয়েকটি সামাজিক দক্ষতার পরিচয় আমরা পাই-

» জামাতের সকল সদস্যদের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকা। মুকরিয ইবনু হাফস এবং হালিস ইবনু আলকামা-উভয়ের ব্যাপারেই রাসূল ﷺ এর পরিষ্কার ধারণা ছিল।

» জামাতের ভাল মানুষদের প্রকাশ্যে প্রশংসা করা যাতে সে মোটিভেটেড হয়, তবে প্রশংসার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করা ইসলামি আদবের খেলাফ।

এভাবেই রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবনভর সামাজিক দক্ষতার উত্তম নমুনা তাঁর জীবনে প্রয়োগ করে আমাদের শিখিয়েছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00