📄 রাসূলগণের Self-motivation : কুরআন কী বলে?
এ নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় নূহ এর কথা। আমরা জানি, নূহ ৯৫০ বছর আল্লাহর পথে তাঁর জাতিকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু এই সুদীর্ঘ সময়ে খুব কম মানুষই আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল। কিন্তু তিনি দমে যাননি। একইরকম অধ্যবসায় ও মানসিক জোর এর দ্বারা ৯৫০ বছর মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন। তাঁর জাতি এই দাওয়াতকে সবরকমভাবে প্রত্যাখান করেছিল। এমনকি নূহ এর কথা যেন তাদের কানে না ঢোকে সেজন্য তারা কানে আঙ্গুল গুঁজে দিয়েছিল, নূহ এর চেহারা যেন দেখতে না হয় সেজন্য নিজেদের মুখের ওপর কাপড় দিয়ে ঢেকে নিয়েছিল। তথাপিও নূহ তাদেরকে দাওয়াত দিয়ে গেছেন বিভিন্ন পন্থায় ও কৌশলে। কুরআনের ভাষায়-
قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلًا وَنَهَارًا فَلَمْ يَزِدْهُمْ دُعَاءِ إِلَّا فِرَارًا وَ إِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا ثُمَّ إِنِّي دَعَوْتُهُمْ جِهَارًا مِّن ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا )
সে (নূহ) বললঃ হে আমার পালনকর্তা! আমি আমার সম্প্রদায়কে দিবারাত্রি দাওয়াত দিয়েছি: কিন্তু আমার দাওয়াত তাদের পলায়নকেই বৃদ্ধি করেছে। আমি যতবারই তাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি, যাতে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, ততবারই তারা নিজদের কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিয়েছে, নিজদেরকে পোশাকে আবৃত করেছে, (অবাধ্যতায়) অনড় থেকেছে এবং দম্ভভরে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছে। অতঃপর আমি তাদেরকে প্রকাশ্যে দাওয়াত দিয়েছি, অতঃপর আমি ঘোষণা সহকারে প্রচার করেছি এবং গোপনে চুপিসারে বলেছি।”[১৫২]
আমাদের কি কখনো মনে হয়েছে যে, কোন বিষয়টা নূহ কে দাওয়াতের পথে এমন অটল, অবিচল রেখেছিল? নিজ জাতির শত গোঁয়ার্তুনি সত্ত্বেও ঠাণ্ডা মাথায় তিনি তাঁর অভীষ্ট মিশন চালিয়ে গিয়েছিলেন। যে মহান দায়িত্ব ও উম্মতের হিদায়াতের মিশন নিয়ে আল্লাহ তাঁকে পাঠিয়েছিলেন তাই তাঁকে প্রতিনিয়ত মোটিভেট করেছে নিজের কাজ আঞ্জাম দিতে। নূহ এর 'সোর্স অব মোটিভেশন' কী ছিল তাও আল্লাহ কুরআনে বলে দিয়েছেন-
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَى قَوْمِةٍ إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مُّبِينٌ أَنْ لَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ أَلِيمٍ فَقَالَ الْمَلَأُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ مَا نَرْبكَ إِلَّا بَشَرًا مِثْلَنَا وَ مَا نَرْبكَ اتَّبَعَكَ إِلَّا الَّذِينَ هُمْ أَرَا ذِلُنَا بَادِيَ الرَّأْيِ وَمَا نَرَى لَكُمْ عَلَيْنَا مِنْ فَضْلٍ بَلْ نَظُنُّكُمْ كَذِبِينَ قَالَ يُقَوْمِ أَرَعَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّنْ رَّبِّي وَاتْنِي رَحْمَةً مِّنْ عِنْدِهِ فَعُمِيَتْ عَلَيْكُمْ أَنُلْزِمُكُمُوهَا وَأَنْتُمْ لَهَا كَرِهُونَ وَيَقَوْمِ لَا أَسْتَلُكُمْ عَلَيْهِ مَالًا إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى اللَّهِ وَمَا أَنَا بِطَارِدِ الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّهُمْ مُّلْقُوا رَبِّهِمْ وَلَكِنِّي أَرَبِّكُمْ قَوْمًا تَجْهَلُونَ وَيُقَوْمِ مَنْ يَنْصُرُ نِي مِنَ اللَّهِ إِنْ طَرَدْتُهُمْ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ
“আর অবশ্যই আমি নূহকে তাঁর জাতির প্রতি প্রেরণ করেছি। (তিনি বললেন,) নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য প্রকাশ্য সতর্ককারী। তোমরা আল্লাহ ব্যতীত কারো ইবাদত করবে না। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের ব্যাপারে এক যন্ত্রণাদায়ক দিনের আযাবের ভয় করছি। তখন তাঁর কওমের কাফের প্রধানরা বলল, আমরা তো আপনাকে আমাদের মতো একজন মানুষ ব্যতীত আর কিছু মনে করি না: আর আমাদের মধ্যে যারা ইতর ও স্কুল-বুদ্ধিসম্পন্ন তারা ব্যতীত কাউকে তো আপনার আনুগত্য করতে দেখি না, এবং আমাদের ওপর আপনাদের কেন প্রাধান্য দেখি না। বরং আপনারা সবাই মিথ্যাবাদী বলে আমারা মনে করি। নূহ বললেন, হে আমার জাতি! দেখ তো আমি যদি আমার পালনকর্তার পক্ষ হতে স্পষ্ট দলীলের ওপর থাক, আর তিনি যদি তাঁর পক্ষ হতে আমাকে রহমত দান করে থাকেন, তারপরেও তা তোমাদের চোখে না পড়ে, তাহলে আমি কি উহা তোমাদের ওপর তোমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই চাপিয়ে দিতে পারি? আর হে আমার জাতি! আমি তো এজন্য তোমাদের কাছে কোন অর্থসম্পদ চাই না; আমার পারিশ্রমিক তো আল্লাহর জিম্মায় রয়েছে। আমি কিন্তু ঈমানদারদের তাড়িয়ে দিতে পারি না। তারা অবশ্যই তাদের পালনকর্তার সাক্ষাত লাভ করবে। বরঞ্চ তোমাদেরই আমি অজ্ঞ সম্প্রদায় দেখছি। আর হে আমার জাতি! আমি যদি তাদের তাড়িয়ে দেই তাহলে আমাকে আল্লাহ হতে রেহাই দেবে কে? তোমরা কি চিন্তা করে দেখ না? আর আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ধন-ভান্ডার রয়েছে এবং একথাও বলি না যে, আমি গায়েবি খবর জানি; একথাও বলি না যে, আমি একজন ফেরেশতা; আর তোমাদের দৃষ্টিতে যারা লাঞ্ছিত আল্লাহ তাদের কোন কল্যাণ দান করবেন না। তাদের মনের কথা আল্লাহ ভাল করেই জানেন। সুতরাং এমন কথা বললে আমি অন্যায়কারী হয়ে যাব।”[১৫৩]
এখানে আমরা দেখছি, নূহ কে দাওয়াতের পথে অটল অবিচল রাখার পেছনে কোনো অর্থসম্পদ কিংবা দুনিয়াবী লোভ কাজ করেনি। বরং আল্লাহর ওপর অবিচল ঈমান ও রিসালাতের দায়িত্বই তাঁকে এই পথে সাহস, উদ্দীপনা ও উৎসাহ যুগিয়েছে।
শুধু নূহ নয়, তাঁর পরবর্তী সকল রাসূলগণও দাওয়াতের পথে নিজেদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করেছেন এবং অনেকে দাওয়াতের স্বার্থে জীবনও দিয়েছেন। সমগ্র সূরা হুদে আল্লাহ একের পর এক হৃদ, সালিহ, ভূত, শু'আইব এ, মূসা এর বৃত্তান্ত বর্ণনা করেছেন। সূরা হূদ পড়লে তাই আমরা দেখব- রাসূলগণের সোর্স অব মোটিভেশন ছিল একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পরকালীন জীবনের সাফল্য তথা জান্নাত।
হুদ তাঁর জাতিকে বলেছিলেন-
يَقَوْمِ لَا أَسْتَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى الَّذِي فَطَرَنِي أَفَلَا تَعْقِلُونَ
“হে আমার কওম, আমি তোমাদের কাছে এর বিনিময়ে কোনো প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান তো কেবল তাঁরই কাছে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। এরপরও কি তোমরা বুঝবে না?”[১৫৪]
সালিহ তাঁর জাতিকে বলেছিলেন-
قَالَ يَقَوْمِ أَرَعَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّنْ رَّبِّي وَأتْنِي مِنْهُ رَحْمَةً فَمَنْ يَنْصُرُنِي مِنَ اللَّهِ إِنْ عَصَيْتُهُ فَمَا تَزِيدُونَنِي غَيْرَ تَخْسِيرٍ
“সে বলল, হে আমার কওম, তোমরা কী মনে কর, যদি আমি আমার রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণের উপর থাকি এবং তিনি আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে রহমত দান করেন, তাহলে কে আমাকে আল্লাহর (আযাব) থেকে সাহায্য করবে, যদি আমি তাঁর অবাধ্য হই? তোমরা তো কেবল আমার ক্ষতিই বাড়িয়ে দিতে চাও।”[১৫৫]
শুয়াইব তাঁর কওমকে বলেছিলেন,
قَالَ يَقَوْمِ أَرَعَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّنْ رَّبِّي وَرَزَقَنِي مِنْهُ رِزْقًا حَسَنًا وَمَا أُرِيدُ أَنْ أُخَالِفَكُمْ إِلَى مَا أَنْهُكُمْ عَنْهُ إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ
“সে বলল, হে আমার কওম, তোমরা কী মনে কর, আমি যদি আমার রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণের উপর থাকি এবং তিনি আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে উত্তম রিযিক দান করে থাকেন (তাহলে কী করে আমি আমার দায়িত্ব পরিত্যাগ করব)! যে কাজ থেকে আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি, তোমাদের বিরোধিতা করে সে কাজটি আমি করতে চাই না। আমি আমার সাধ্যমতো সংশোধন চাই। আল্লাহর সহায়তা ছাড়া আমার কোনো তাওফীক নেই। আমি তাঁরই ওপর তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই কাছে ফিরে যাই।”[১৫৬]
মূসা এর সমগ্র নবুওয়াতী জীবনের পরতে পরতে সেলফ মোটিভেশনের নমুনা ছড়িয়ে রয়েছে। বনী ইসরাইল তাঁকে কতটা কষ্ট দিয়েছিল এবং তিনি কীভাবে সবর করেছিলেন তা সচেতন কুরআন পাঠক মাত্রই জানেন। নবিজি মুহাম্মাদ এ এর জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। মুসলিম হিসেবে আমরাও আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত। আমাদের দায়িত্ব হলো- সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা এবং আল্লাহর প্রতি যথার্থ ঈমান নিয়ে আসা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।”[১৫৭]
কিন্তু আজ আমাদের সেই দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠা নেই। এজন্যই আমাদের ঈমানের দুর্বলতা যেমন আমাদেরকে লজ্জায় ফেলে দেয়। তেমনি তা সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার দায়িত্ব পালনেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এর মূল কারণ হলো- আমরা নিজেদের সৃষ্টি ও জীবনের উদ্দেশ্য আজ ভুলে গেছি। আল্লাহর দাসত্ব বাদ দিয়ে পুঁজিবাদ ও ভোগবাদের দাসত্বে লিপ্ত হয়ে গেছি। তাই আজ পাপ ও আল্লাহর নাফরমানির সাগরে ডুবে থেকে মাঝে মাঝে কিছু ভাল কাজ করতে চাইলে আমাদেরকে মোটিভেশন খুঁজতে হয় পাশ্চাত্যের মোটিভেশনাল স্পিকারদের কাছ থেকে। যারা মূলত কিছু অন্তঃসারশূণ্য গৎবাঁধা কথা আউড়ে যায়-যার প্রয়োগ তাদের নিজেদের জীবনেই নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো- তারা তাদের বক্তব্যে ও লেখনীতে মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সোর্স অব মোটিভেশনকে উপেক্ষা করে যায়। যা হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের আশা এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচার আকুতি।
টিকাঃ
[১৫২] সূরা নূহ, ৭১:৫-৯
[১৫৩] সূরা হুদ, ১১:২৫-৩০
[১৫৪] সূরা হুদ, ১১:৫১
[১৫৫] সূরা হুদ, ১১:৬৩
[১৫৬] সূরা হুদ, ১১:৮৮
[১৫৭] সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০
এ নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় নূহ এর কথা। আমরা জানি, নূহ ৯৫০ বছর আল্লাহর পথে তাঁর জাতিকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু এই সুদীর্ঘ সময়ে খুব কম মানুষই আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল। কিন্তু তিনি দমে যাননি। একইরকম অধ্যবসায় ও মানসিক জোর এর দ্বারা ৯৫০ বছর মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন। তাঁর জাতি এই দাওয়াতকে সবরকমভাবে প্রত্যাখান করেছিল। এমনকি নূহ এর কথা যেন তাদের কানে না ঢোকে সেজন্য তারা কানে আঙ্গুল গুঁজে দিয়েছিল, নূহ এর চেহারা যেন দেখতে না হয় সেজন্য নিজেদের মুখের ওপর কাপড় দিয়ে ঢেকে নিয়েছিল। তথাপিও নূহ তাদেরকে দাওয়াত দিয়ে গেছেন বিভিন্ন পন্থায় ও কৌশলে। কুরআনের ভাষায়-
قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلًا وَنَهَارًا فَلَمْ يَزِدْهُمْ دُعَاءِ إِلَّا فِرَارًا وَ إِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا ثُمَّ إِنِّي دَعَوْتُهُمْ جِهَارًا مِّن ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا )
"সে (নূহ) বললঃ হে আমার পালনকর্তা! আমি আমার সম্প্রদায়কে দিবারাত্রি দাওয়াত দিয়েছি: কিন্তু আমার দাওয়াত তাদের পলায়নকেই বৃদ্ধি করেছে। আমি যতবারই তাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি, যাতে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, ততবারই তারা নিজদের কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিয়েছে, নিজদেরকে পোশাকে আবৃত করেছে, (অবাধ্যতায়) অনড় থেকেছে এবং দম্ভভরে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছে। অতঃপর আমি তাদেরকে প্রকাশ্যে দাওয়াত দিয়েছি, অতঃপর আমি ঘোষণা সহকারে প্রচার করেছি এবং গোপনে চুপিসারে বলেছি।”[১৫২]
আমাদের কি কখনো মনে হয়েছে যে, কোন বিষয়টা নূহ কে দাওয়াতের পথে এমন অটল, অবিচল রেখেছিল? নিজ জাতির শত গোঁয়ার্তুনি সত্ত্বেও ঠাণ্ডা মাথায় তিনি তাঁর অভীষ্ট মিশন চালিয়ে গিয়েছিলেন। যে মহান দায়িত্ব ও উম্মতের হিদায়াতের মিশন নিয়ে আল্লাহ তাঁকে পাঠিয়েছিলেন তাই তাঁকে প্রতিনিয়ত মোটিভেট করেছে নিজের কাজ আঞ্জাম দিতে। নূহ এর 'সোর্স অব মোটিভেশন' কী ছিল তাও আল্লাহ কুরআনে বলে দিয়েছেন-
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَى قَوْمِةٍ إِنِّي لَكُمْ نَذِيرٌ مُّبِينٌ أَنْ لَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ أَلِيمٍ فَقَالَ الْمَلَأُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ مَا نَرْبكَ إِلَّا بَشَرًا مِثْلَنَا وَ مَا نَرْبكَ اتَّبَعَكَ إِلَّا الَّذِينَ هُمْ أَرَا ذِلُنَا بَادِيَ الرَّأْيِ وَمَا نَرَى لَكُمْ عَلَيْنَا مِنْ فَضْلٍ بَلْ نَظُنُّكُمْ كَذِبِينَ قَالَ يُقَوْمِ أَرَعَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّنْ رَّبِّي وَاتْنِي رَحْمَةً مِّنْ عِنْدِهِ فَعُمِيَتْ عَلَيْكُمْ أَنُلْزِمُكُمُوهَا وَأَنْتُمْ لَهَا كَرِهُونَ وَيَقَوْمِ لَا أَسْتَلُكُمْ عَلَيْهِ مَالًا إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى اللَّهِ وَمَا أَنَا بِطَارِدِ الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّهُمْ مُّلْقُوا رَبِّهِمْ وَلَكِنِّي أَرَبِّكُمْ قَوْمًا تَجْهَلُونَ وَيُقَوْمِ مَنْ يَنْصُرُ نِي مِنَ اللَّهِ إِنْ طَرَدْتُهُمْ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ
“আর অবশ্যই আমি নূহকে তাঁর জাতির প্রতি প্রেরণ করেছি। (তিনি বললেন,) নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য প্রকাশ্য সতর্ককারী। তোমরা আল্লাহ ব্যতীত কারো ইবাদত করবে না। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের ব্যাপারে এক যন্ত্রণাদায়ক দিনের আযাবের ভয় করছি। তখন তাঁর কওমের কাফের প্রধানরা বলল, আমরা তো আপনাকে আমাদের মতো একজন মানুষ ব্যতীত আর কিছু মনে করি না: আর আমাদের মধ্যে যারা ইতর ও স্কুল-বুদ্ধিসম্পন্ন তারা ব্যতীত কাউকে তো আপনার আনুগত্য করতে দেখি না, এবং আমাদের ওপর আপনাদের কেন প্রাধান্য দেখি না। বরং আপনারা সবাই মিথ্যাবাদী বলে আমারা মনে করি। নূহ বললেন, হে আমার জাতি! দেখ তো আমি যদি আমার পালনকর্তার পক্ষ হতে স্পষ্ট দলীলের ওপর থাক, আর তিনি যদি তাঁর পক্ষ হতে আমাকে রহমত দান করে থাকেন, তারপরেও তা তোমাদের চোখে না পড়ে, তাহলে আমি কি উহা তোমাদের ওপর তোমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই চাপিয়ে দিতে পারি? আর হে আমার জাতি! আমি তো এজন্য তোমাদের কাছে কোন অর্থসম্পদ চাই না; আমার পারিশ্রমিক তো আল্লাহর জিম্মায় রয়েছে। আমি কিন্তু ঈমানদারদের তাড়িয়ে দিতে পারি না। তারা অবশ্যই তাদের পালনকর্তার সাক্ষাত লাভ করবে। বরঞ্চ তোমাদেরই আমি অজ্ঞ সম্প্রদায় দেখছি। আর হে আমার জাতি! আমি যদি তাদের তাড়িয়ে দেই তাহলে আমাকে আল্লাহ হতে রেহাই দেবে কে? তোমরা কি চিন্তা করে দেখ না? আর আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ধন-ভান্ডার রয়েছে এবং একথাও বলি না যে, আমি গায়েবি খবর জানি; একথাও বলি না যে, আমি একজন ফেরেশতা; আর তোমাদের দৃষ্টিতে যারা লাঞ্ছিত আল্লাহ তাদের কোন কল্যাণ দান করবেন না। তাদের মনের কথা আল্লাহ ভাল করেই জানেন। সুতরাং এমন কথা বললে আমি অন্যায়কারী হয়ে যাব।”[১৫৩]
এখানে আমরা দেখছি, নূহ কে দাওয়াতের পথে অটল অবিচল রাখার পেছনে কোনো অর্থসম্পদ কিংবা দুনিয়াবী লোভ কাজ করেনি। বরং আল্লাহর ওপর অবিচল ঈমান ও রিসালাতের দায়িত্বই তাঁকে এই পথে সাহস, উদ্দীপনা ও উৎসাহ যুগিয়েছে।
শুধু নূহ নয়, তাঁর পরবর্তী সকল রাসূলগণও দাওয়াতের পথে নিজেদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করেছেন এবং অনেকে দাওয়াতের স্বার্থে জীবনও দিয়েছেন। সমগ্র সূরা হুদে আল্লাহ একের পর এক হৃদ, সালিহ, ভূত, শু'আইব এ, মূসা এর বৃত্তান্ত বর্ণনা করেছেন। সূরা হূদ পড়লে তাই আমরা দেখব- রাসূলগণের সোর্স অব মোটিভেশন ছিল একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পরকালীন জীবনের সাফল্য তথা জান্নাত।
হুদ তাঁর জাতিকে বলেছিলেন-
يَقَوْمِ لَا أَسْتَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى الَّذِي فَطَرَنِي أَفَلَا تَعْقِلُونَ
“হে আমার কওম, আমি তোমাদের কাছে এর বিনিময়ে কোনো প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান তো কেবল তাঁরই কাছে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। এরপরও কি তোমরা বুঝবে না?”[১৫৪]
সালিহ তাঁর জাতিকে বলেছিলেন-
قَالَ يَقَوْمِ أَرَعَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّنْ رَّبِّي وَأتْنِي مِنْهُ رَحْمَةً فَمَنْ يَنْصُرُنِي مِنَ اللَّهِ إِنْ عَصَيْتُهُ فَمَا تَزِيدُونَنِي غَيْرَ تَخْسِيرٍ
“সে বলল, হে আমার কওম, তোমরা কী মনে কর, যদি আমি আমার রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণের উপর থাকি এবং তিনি আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে রহমত দান করেন, তাহলে কে আমাকে আল্লাহর (আযাব) থেকে সাহায্য করবে, যদি আমি তাঁর অবাধ্য হই? তোমরা তো কেবল আমার ক্ষতিই বাড়িয়ে দিতে চাও।”[১৫৫]
শুয়াইব তাঁর কওমকে বলেছিলেন,
قَالَ يَقَوْمِ أَرَعَيْتُمْ إِنْ كُنْتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّنْ رَّبِّي وَرَزَقَنِي مِنْهُ رِزْقًا حَسَنًا وَمَا أُرِيدُ أَنْ أُخَالِفَكُمْ إِلَى مَا أَنْهُكُمْ عَنْهُ إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ
“সে বলল, হে আমার কওম, তোমরা কী মনে কর, আমি যদি আমার রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণের উপর থাকি এবং তিনি আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে উত্তম রিযিক দান করে থাকেন (তাহলে কী করে আমি আমার দায়িত্ব পরিত্যাগ করব)! যে কাজ থেকে আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি, তোমাদের বিরোধিতা করে সে কাজটি আমি করতে চাই না। আমি আমার সাধ্যমতো সংশোধন চাই। আল্লাহর সহায়তা ছাড়া আমার কোনো তাওফীক নেই। আমি তাঁরই ওপর তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই কাছে ফিরে যাই।”[১৫৬]
মূসা এর সমগ্র নবুওয়াতী জীবনের পরতে পরতে সেলফ মোটিভেশনের নমুনা ছড়িয়ে রয়েছে। বনী ইসরাইল তাঁকে কতটা কষ্ট দিয়েছিল এবং তিনি কীভাবে সবর করেছিলেন তা সচেতন কুরআন পাঠক মাত্রই জানেন। নবিজি মুহাম্মাদ এ এর জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। মুসলিম হিসেবে আমরাও আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত। আমাদের দায়িত্ব হলো- সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা এবং আল্লাহর প্রতি যথার্থ ঈমান নিয়ে আসা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।”[১৫৭]
কিন্তু আজ আমাদের সেই দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠা নেই। এজন্যই আমাদের ঈমানের দুর্বলতা যেমন আমাদেরকে লজ্জায় ফেলে দেয়। তেমনি তা সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার দায়িত্ব পালনেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এর মূল কারণ হলো- আমরা নিজেদের সৃষ্টি ও জীবনের উদ্দেশ্য আজ ভুলে গেছি। আল্লাহর দাসত্ব বাদ দিয়ে পুঁজিবাদ ও ভোগবাদের দাসত্বে লিপ্ত হয়ে গেছি। তাই আজ পাপ ও আল্লাহর নাফরমানির সাগরে ডুবে থেকে মাঝে মাঝে কিছু ভাল কাজ করতে চাইলে আমাদেরকে মোটিভেশন খুঁজতে হয় পাশ্চাত্যের মোটিভেশনাল স্পিকারদের কাছ থেকে। যারা মূলত কিছু অন্তঃসারশূণ্য গৎবাঁধা কথা আউড়ে যায়-যার প্রয়োগ তাদের নিজেদের জীবনেই নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো- তারা তাদের বক্তব্যে ও লেখনীতে মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সোর্স অব মোটিভেশনকে উপেক্ষা করে যায়। যা হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের আশা এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচার আকুতি।
টিকাঃ
[১৫২] সূরা নূহ, ৭১:৫-৯
[১৫৩] সূরা হুদ, ১১:২৫-৩০
[১৫৪] সূরা হুদ, ১১:৫১
[১৫৫] সূরা হুদ, ১১:৬৩
[১৫৬] সূরা হুদ, ১১:৮৮
[১৫৭] সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০
📄 রাসূল ﷺ-এর জীবন থেকে সেলফ মোটিভেশনের শিক্ষা
অন্যান্য রাসূলগণের জীবনের দাওয়াতি পরীক্ষা ও কষ্ট-বিপর্যয়ের থেকে আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ এর জীবনের কষ্ট ও বিপর্যয় কোনো অংশে কম নয়। বরং রাসূল এর জীবনের পুরোটাই এক মহাসংগ্রামের ঐতিহাসিক কাব্য। এখানে আমরা সীরাতের কিছু ঘটনার দিকে তাকাব যেখান থেকে নবি -এর জীবনে আয়- অনুপ্রেরণার প্রয়োগ ও এর কলাকৌশল সম্পর্কে আমরা ধারণা পাব।
১। আহযাব যুদ্ধের সময় পরিখা খননের কাজে রাসূল ﷺ নিজে সাহাবিদের সাথে অংশগ্রহণ করেন। বারা ইবনু আযেব বলেন, "যুদ্ধে পরিখা খননকালে আমি রাসূল ﷺ কে মাটি বহন করতে দেখেছি। রাসূল ﷺ এর অনেক কষ্ট হচ্ছিল। মাটি বহন করতে গিয়ে শরীরে মাটি লেগে যাওয়ায় রাসূল এর পেটের চামড়া দেখা যাচ্ছিল না"। এখন প্রশ্ন আসতে পারে: কোন বিষয়টি রাসূল কে ক্ষুৎপিপাসার মধ্যেও অনুপ্রাণিত করেছিল মাটি বহন করতে? সাহাবিদের সাথে একই কাতারে নেমে এসে তিনি ধূলি-ধূসরিত হয়ে মাটি বহন করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন কেন?
২। খন্দকের দিন রাসূল ﷺ সাহাবিদের চাইতেও অধিক ক্ষুধার তাড়নায় ভুগেছিলেন। সাহাবিগণ তাঁকে নিজেদের পেটে পাথর বাধা অবস্থায় ক্ষুধার কথা জানালে, তিনি কাপড় তুলে দেখালেন যে, তাঁর পেটে দুটি পাথর বাঁধা রয়েছে। একনাগাড়ে তিনদিন প্রচন্ড ক্ষুধার যন্ত্রণা ভোগ করার পর সামান্য কিছু খাদ্যের ব্যবস্থা হলেও তিনি সাহাবিদেরকে বাদ দিয়ে একাকী খাননি বরং সকলকে নিয়েই খেয়েছিলেন। সাহাবিগণ এসময় অবর্ণনীয় ক্ষুধার কষ্ট ভোগ করছিলেন। আনাস বলেন, পরিখা খননরত মুসলিমদের জন্য যে সামান্য খাদ্য আনা হয়েছিল তা ছিল অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত। এই দুর্গন্ধযুক্ত খাদ্যই তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন।
৩। পরিখা খননকালে রাসূল ﷺ সাহাবিদের জন্য হালাল বিনোদনের ব্যবস্থা করেন। মানসিকভাবে তাদেরকে চাঙা রাখার জন্য তিনি নিজে কবিতা আবৃত্তি করতেন, সাহাবিরা তাঁর কবিতার জবাব দিতেন। আবার সাহাবিদের কবিতার জবাব রাসূল ﷺ কবিতার মাধ্যমে দিতেন। এভাবে পারস্পরিক কবিতা চর্চার মাধ্যমে সাহাবিদের মানসিক শক্তিও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। মাটি বহন করার সময় রাসূল আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা এর এই কবিতাটি আবৃত্তি করছিলেন- হে আল্লাহ, তোমার অনুগ্রহ পেতাম না, পেতাম না হিদায়াত, করতাম না দান খয়রাত, পড়তাম না সালাত। এ বান্দাদের ওপর তোমার প্রশান্তি করো বর্ষণ, কাফিরদের মোকাবিলায় যেন করি মোরা ধৈর্য ধারণ। মোদের বিরুদ্ধে ফিতনা সৃষ্টিতে যদি দেয় কেহ প্ররোচনা শির নত না করার কাব্য মোরা করব যে রচনা।
এ দল এভাবে খন্দক যুদ্ধের প্রাক্কালে যুদ্ধের প্রস্তুতিস্বরূপ পরিখা খনন করার সময়টা পুরোটাই রাসূল ﷺ সেলফ মোটিভেশনের মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
৪। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম দিন ছিল তায়িফের দিন। মক্কার বাইরে পৃথক একটি ইসলামি ভূমি গঠনের চিন্তা থেকেই তিনি তায়িফের মানুষের হিদায়াতের জন্য গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁকে অবর্ণনীয় নির্যাতন সইতে হয়। পাথরের আঘাতে তাঁর শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। তিনি রক্তাক্ত শরীরে আল্লাহর কাছে দুআ করেন এই বলে-
“হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে স্বীয় দুর্বলতা, (মানুষকে বোঝাতে) আমার কলাকৌশলের স্বল্পতা এবং মানুষের কাছে আমার মূল্যহীনতার অভিযোগ করছি। হে সর্বাধিক দয়ালু! তুমি দুর্বলদের প্রভু, আমারও প্রভু। তুমি আমাকে কার কাছে ন্যস্ত করছ? তুমি কি আমাকে দূরের এমন অচেনা কারও হাতে ন্যস্ত করছ, যে আমার সাথে কঠোর ব্যবহার করবে? নাকি কোনো শত্রুর হাতে সোপর্দ করছ, যাকে তুমি আমার বিষয়ের মালিক করে দিয়েছ? তুমি যদি আমার ওপর রাগান্বিত না হও তাহলে আমি কোনো কিছুই পরোয়া করি না। তবে নিঃসন্দেহে তোমার ক্ষমা আমার জন্য সর্বাধিক প্রশস্ত ও প্রসারিত। আমি তোমার সেই চেহারার জ্যোতির আশ্রয় চাই, যা দ্বারা অন্ধকার দূরীভূত হয়ে যায় এবং যা দ্বারা দুনিয়া ও আখিরাতের সকল বিষয় সংশোধন হয়। এই কথার মাধ্যমে আমার ওপর তেমার ক্রোধ নেমে আসা হতে অথবা আমার ওপর তোমার অসন্তুষ্টি নাযিল হওয়া থেকে তোমার আশ্রয় চাই। তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই আমার সকল প্রচেষ্টা। তোমার সাহায্য ব্যতীত অন্যায় কাজ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব নয় এবং তোমার তাওফীক ও শক্তি ছাড়া তোমার আনুগত্য করা অসম্ভব'
এই দুআর মধ্যে আমরা রাসূল এর সোৎসাহের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস খুঁজে পাই:
* একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি।
* আল্লাহর ক্ষমার আশা।
* একমাত্র আল্লাহর শক্তির কাছেই আশ্রয় চাওয়া।
অন্যান্য রাসূলগণের জীবনের দাওয়াতি পরীক্ষা ও কষ্ট-বিপর্যয়ের থেকে আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ এর জীবনের কষ্ট ও বিপর্যয় কোনো অংশে কম নয়। বরং রাসূল এর জীবনের পুরোটাই এক মহাসংগ্রামের ঐতিহাসিক কাব্য। এখানে আমরা সীরাতের কিছু ঘটনার দিকে তাকাব যেখান থেকে নবি -এর জীবনে আয়- অনুপ্রেরণার প্রয়োগ ও এর কলাকৌশল সম্পর্কে আমরা ধারণা পাব।
১। আহযাব যুদ্ধের সময় পরিখা খননের কাজে রাসূল নিজে সাহাবিদের সাথে অংশগ্রহণ করেন। বারা ইবনু আযেব বলেন, "যুদ্ধে পরিখা খননকালে আমি রাসূল কে মাটি বহন করতে দেখেছি। রাসূল এর অনেক কষ্ট হচ্ছিল। মাটি বহন করতে গিয়ে শরীরে মাটি লেগে যাওয়ায় রাসূল এর পেটের চামড়া দেখা যাচ্ছিল না"। এখন প্রশ্ন আসতে পারে: কোন বিষয়টি রাসূল কে ক্ষুৎপিপাসার মধ্যেও অনুপ্রাণিত করেছিল মাটি বহন করতে? সাহাবিদের সাথে একই কাতারে নেমে এসে তিনি ধূলি-ধূসরিত হয়ে মাটি বহন করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন কেন?
২। খন্দকের দিন রাসূল ﷺ সাহাবিদের চাইতেও অধিক ক্ষুধার তাড়নায় ভুগেছিলেন। সাহাবিগণ তাঁকে নিজেদের পেটে পাথর বাধা অবস্থায় ক্ষুধার কথা জানালে, তিনি কাপড় তুলে দেখালেন যে, তাঁর পেটে দুটি পাথর বাঁধা রয়েছে। একনাগাড়ে তিনদিন প্রচন্ড ক্ষুধার যন্ত্রণা ভোগ করার পর সামান্য কিছু খাদ্যের ব্যবস্থা হলেও তিনি সাহাবিদেরকে বাদ দিয়ে একাকী খাননি বরং সকলকে নিয়েই খেয়েছিলেন। সাহাবিগণ এসময় অবর্ণনীয় ক্ষুধার কষ্ট ভোগ করছিলেন। আনাস বলেন, পরিখা খননরত মুসলিমদের জন্য যে সামান্য খাদ্য আনা হয়েছিল তা ছিল অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত। এই দুর্গন্ধযুক্ত খাদ্যই তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন।
৩। পরিখা খননকালে রাসূল ﷺ সাহাবিদের জন্য হালাল বিনোদনের ব্যবস্থা করেন। মানসিকভাবে তাদেরকে চাঙা রাখার জন্য তিনি নিজে কবিতা আবৃত্তি করতেন, সাহাবিরা তাঁর কবিতার জবাব দিতেন। আবার সাহাবিদের কবিতার জবাব রাসূল ﷺ কবিতার মাধ্যমে দিতেন। এভাবে পারস্পরিক কবিতা চর্চার মাধ্যমে সাহাবিদের মানসিক শক্তিও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। মাটি বহন করার সময় রাসূল আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা এর এই কবিতাটি আবৃত্তি করছিলেন-
হে আল্লাহ, তোমার অনুগ্রহ পেতাম না, পেতাম না হিদায়াত,
করতাম না দান খয়রাত, পড়তাম না সালাত।
এ বান্দাদের ওপর তোমার প্রশান্তি করো বর্ষণ,
কাফিরদের মোকাবিলায় যেন করি মোরা ধৈর্য ধারণ।
মোদের বিরুদ্ধে ফিতনা সৃষ্টিতে যদি দেয় কেহ প্ররোচনা
শির নত না করার কাব্য মোরা করব যে রচনা।
এ দল এভাবে খন্দক যুদ্ধের প্রাক্কালে যুদ্ধের প্রস্তুতিস্বরূপ পরিখা খনন করার সময়টা পুরোটাই রাসূল ﷺ সেলফ মোটিভেশনের মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
৪। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম দিন ছিল তায়িফের দিন। মক্কার বাইরে পৃথক একটি ইসলামি ভূমি গঠনের চিন্তা থেকেই তিনি তায়িফের মানুষের হিদায়াতের জন্য গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁকে অবর্ণনীয় নির্যাতন সইতে হয়। পাথরের আঘাতে তাঁর শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। তিনি রক্তাক্ত শরীরে আল্লাহর কাছে দুআ করেন এই বলে-
“হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে স্বীয় দুর্বলতা, (মানুষকে বোঝাতে) আমার কলাকৌশলের স্বল্পতা এবং মানুষের কাছে আমার মূল্যহীনতার অভিযোগ করছি। হে সর্বাধিক দয়ালু! তুমি দুর্বলদের প্রভু, আমারও প্রভু। তুমি আমাকে কার কাছে ন্যস্ত করছ? তুমি কি আমাকে দূরের এমন অচেনা কারও হাতে ন্যস্ত করছ, যে আমার সাথে কঠোর ব্যবহার করবে? নাকি কোনো শত্রুর হাতে সোপর্দ করছ, যাকে তুমি আমার বিষয়ের মালিক করে দিয়েছ? তুমি যদি আমার ওপর রাগান্বিত না হও তাহলে আমি কোনো কিছুই পরোয়া করি না। তবে নিঃসন্দেহে তোমার ক্ষমা আমার জন্য সর্বাধিক প্রশস্ত ও প্রসারিত। আমি তোমার সেই চেহারার জ্যোতির আশ্রয় চাই, যা দ্বারা অন্ধকার দূরীভূত হয়ে যায় এবং যা দ্বারা দুনিয়া ও আখিরাতের সকল বিষয় সংশোধন হয়। এই কথার মাধ্যমে আমার ওপর তেমার ক্রোধ নেমে আসা হতে অথবা আমার ওপর তোমার অসন্তুষ্টি নাযিল হওয়া থেকে তোমার আশ্রয় চাই। তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই আমার সকল প্রচেষ্টা। তোমার সাহায্য ব্যতীত অন্যায় কাজ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব নয় এবং তোমার তাওফীক ও শক্তি ছাড়া তোমার আনুগত্য করা অসম্ভব'
এই দুআর মধ্যে আমরা রাসূল এর সোৎসাহের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস খুঁজে পাই:
* একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি।
* আল্লাহর ক্ষমার আশা।
* একমাত্র আল্লাহর শক্তির কাছেই আশ্রয় চাওয়া।
📄 আত্ম-অনুপ্রেরণার চেকলিস্ট
এখানে আমরা কুরআন ও হাদীসের আলোকে সোৎসাহের একটি চেকলিস্ট দিচ্ছি। আল্লাহ আমাদেরকে সহমর্মিতার যেসকল গুণগুলো অর্জন করতে বলেছেন, সেগুলো আমরা অর্জন করতে পেরেছি কি না; অথবা পারলেও তাতে ঠিক কতটা সফল হয়েছি-তা সম্পর্কে ধারণা পেতে এই চেকলিস্টটি আমাদের সাহায্য করবে。
| | আমি এমন মানুষদের সান্নিধ্যে থাকতে পছন্দ করি, যারা আমাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবনের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে ভাবতে সাহায্য করে এবং ভালো কাজে প্রেরণা দেয়। | | আয-যুখরুফ, ৪৩: ৬৭ আল-কাহফ, ১৮:২৮ | জানি' আত-তিরমিযী - ২৩৭৮ (সহিহ বুখারী- ৫৫৩৪, সহিহ মুসলিম - ২৬২৮) |
|---|---|---|---|---|
| | যেসব পরিস্থিতি আমাকে বিষণ্ণ করে সেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। | | আন-নিসা, ৪:৩১ | সুনান ইবনু মাজাহ- ৩৯৭৬ |
| | যেকোনো কাজের আগে আল্লাহর কাছে সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার চেষ্টা করি। | | আল-বাকারা, ২: ৪২ আল-বাকারা, ২: ১৫৩ | রিয়াদুস সালেহীন - ১৫০১ |
| | আল্লাহর দেওয়া সুযোগ গুলো আমার জীবনে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। | | আত-তালাক, ৬৫: ৩ | আল-আদাবুল মুফরাদ -৪৭৯ |
| | দুনিয়ার কাজগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করার চেষ্টা করি। | | আল-মায়িদাহ, ৫: ১৬ | জামি' আত-তিরমিযী - ২৫২১ |
| | নিজের দুর্বলতাকে কাটিয়ে উঠার সক্রিয় চেষ্টা করি। | | আর-রা'দ, ১৩:১১ | সহিহ বুখারী - ৪২ |
| | কষ্টের মুহূর্তে নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেই যে আল্লাহ্ সবরকারীদের সাথে থাকে এবং কষ্টের পরেই শান্তি আসে। | | ইনশিরাহ, ৯৪:৬ | রিয়াদুস সালেহীন - ২৭ |
| | কাজের শুরুতে বৃহত্তর পুরস্কারের কথা স্মরণ করি। | | আস-সিজদাহ, ৩২: ১৭ আন-নাহল, ১৬:৯৭ | সহিহ বুখারী -৫৬ |
ওপরের চেকলিস্টের ৮টি গুণাবলির ওপর-
কেউ যদি গড় এ ৪-৫ পায় তখন ধারণা করা যায় তার স্ব-প্রণোদনার লেভেল খুব ভালো।
কেউ যদি গড় এ ৩ পায় তখন ধারণা করা যায় তার আত্মবিশ্বাসের বিষয়ে কিছুটা অগ্রগতি প্রয়োজন।
কেউ যদি গড় এ ১-২ পায় তখন ধারণা করা যায় তার আত্ম-অনুপ্রেরণার লেভেল ভালো নয় এবং তার অনেক বেশি অগ্রগতি প্রয়োজন।
৬. আত্ম- অনুপ্রেরণার চেকলিস্ট
এখানে আমরা কুরআন ও হাদীসের আলোকে সোৎসাহের একটি চেকলিস্ট দিচ্ছি। আল্লাহ আমাদেরকে সহমর্মিতার যেসকল গুণগুলো অর্জন করতে বলেছেন, সেগুলো আমরা অর্জন করতে পেরেছি কি না; অথবা পারলেও তাতে ঠিক কতটা সফল হয়েছি-তা সম্পর্কে ধারণা পেতে এই চেকলিস্টটি আমাদের সাহায্য করবে。
আমি এমন মানুষদের সান্নিধ্যে থাকতে পছন্দ করি, যারা আমাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবনের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে ভাবতে সাহায্য করে এবং ভালো কাজে প্রেরণা দেয়।
যেকোনো কাজের আগে আল্লাহর কাছে সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার চেষ্টা করি।
আল্লাহর দেওয়া সুযোগ গুলো আমার জীবনে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করি।
দুনিয়ার কাজগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করার চেষ্টা করি।
নিজের দুর্বলতাকে কাটিয়ে উঠার সক্রিয় চেষ্টা করি।
কষ্টের মুহূর্তে নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেই যে আল্লাহ্ সবরকারীদের সাথে থাকে এবং কষ্টের পরেই শান্তি আসে।
কাজের শুরুতে বৃহত্তর পুরস্কারের কথা স্মরণ করি。
(সহিহ বুখারী- ৫৫৩৪, সহিহ মুসলিম - ২৬২৮) আয-যুখরুফ, ৪৩: ৬৭ আল-কাহফ, ১৮:২৮ জানি' আত-তিরমিযী - ২৩৭৮
আন-নিসা, ৪:৩১ সুনান ইবনু মাজাহ- ৩৯৭৬
আল-বাকারা, ২: ৪২ আল-বাকারা, ২: ১৫৩ রিয়াদুস সালেহীন - ১৫০১
আত-তালাক, ৬৫: ৩ আল-আদাবুল মুফরাদ -৪৭৯
আল-মায়িদাহ, ৫: ১৬ জামি' আত-তিরমিযী - ২৫২১
আর-রা'দ, ১৩:১১ সহিহ বুখারী - ৪২.
ইনশিরাহ, ৯৪:৬ রিয়াদুস সালেহীন - ২৭
আস-সিজদাহ, ৩২: ১৭ আন-নাহল, ১৬:৯৭ সহিহ বুখারী -৫৬
ওপরের চেকলিস্টের ৮টি গুণাবলির ওপর-
* কেউ যদি গড় এ ৪-৫ পায় তখন ধারণা করা যায় তার স্ব-প্রণোদনার লেভেল খুব ভালো।
* কেউ যদি গড় এ ৩ পায় তখন ধারণা করা যায় তার আত্মবিশ্বাসের বিষয়ে কিছুটা অগ্রগতি প্রয়োজন।
* কেউ যদি গড় এ ১-২ পায় তখন ধারণা করা যায় তার আত্ম-অনুপ্রেরণার লেভেল ভালো নয় এবং তার অনেক বেশি অগ্রগতি প্রয়োজন।