📄 Mirroring
ধরুন, কেউ আপনাকে ১০ টি বড়সড় মেসেজ লিখে পাঠালো আর আপনি তার প্রতিউত্তরে এক লাইনের ছোট একটা উত্তর করলেন। একটি স্বতস্ফূর্ত কথোপকথন বন্ধ হওয়ার জন্যে এটুকুই যথেষ্ট। একই বিষয় ঘটে, যখন আপনি অত্যন্ত ব্যক্তিগত কোনো ম্যাসেজের উত্তরে এক কথায় লিখে দেন, "বুঝতে পেরেছি" বা, "ঠিক আছে" বা "হুম"। অপর ব্যক্তি আপনাকে অনেককিছু বলতে চাচ্ছিলো অথচ আপনি তাকে আপনার উত্তর দিয়ে দমিয়ে দিলেন। সে যে আগ্রহ নিয়ে তার কথাগুলো শুরু করেছিলো, আপনি তার সেই আগ্রহকে বিন্দুমাত্র মূল্যায়ন করলেন না। ঠিক এই 'জায়গাতে Mirroring এর বিষয়টি আসে। এর অর্থ হলো, কারও অব্যক্ত কথার ধরন, অঙ্গভঙ্গি বা আচার-আচরণ বুঝতে চেষ্টা করা। এগুলোর মাধ্যমে তার সাথে একটি সংযোগ স্থাপন করা।
কাজেই, আপনার বন্ধু যখন আপনার কাছে কোনো ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলতে আসে তখন তার প্রতিউত্তরে আপনার জীবনের প্রাসঙ্গিক কোনো ঘটনার কথা তাকে বলুন। সে যদি আপনার চোখের দিকে তাকায়, তবে আপনিও তার চোখের দিকে তাকান। সে যদি দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় তবে আপনিও তা-ই করুন। সে চাইলে, তাকে নিজের মতো করে সামলিয়ে ওঠার সুযোগ দিন। তাদের প্রতিটি দেহভঙ্গি অনুকরণ করতে যাবেন না। বরং তাদের কন্ঠস্বর ও মানসিক অবস্থার সাথে নিজের আচরণকে মানিয়ে নিন।
ঘ. Mirroring:
ধরুন, কেউ আপনাকে ১০ টি বড়সড় মেসেজ লিখে পাঠালো আর আপনি তার প্রতিউত্তরে এক লাইনের ছোট একটা উত্তর করলেন। একটি স্বতস্ফূর্ত কথোপকথন বন্ধ হওয়ার জন্যে এটুকুই যথেষ্ট। একই বিষয় ঘটে, যখন আপনি অত্যন্ত ব্যক্তিগত কোনো ম্যাসেজের উত্তরে এক কথায় লিখে দেন, "বুঝতে পেরেছি" বা, "ঠিক আছে" বা "হুম"। অপর ব্যক্তি আপনাকে অনেককিছু বলতে চাচ্ছিলো অথচ আপনি তাকে আপনার উত্তর দিয়ে দমিয়ে দিলেন। সে যে আগ্রহ নিয়ে তার কথাগুলো শুরু করেছিলো, আপনি তার সেই আগ্রহকে বিন্দুমাত্র মূল্যায়ন করলেন না। ঠিক এই 'জায়গাতে Mirroring এর বিষয়টি আসে। এর অর্থ হলো, কারও অব্যক্ত কথার ধরন, অঙ্গভঙ্গি বা আচার-আচরণ বুঝতে চেষ্টা করা। এগুলোর মাধ্যমে তার সাথে একটি সংযোগ স্থাপন করা।
কাজেই, আপনার বন্ধু যখন আপনার কাছে কোনো ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলতে আসে তখন তার প্রতিউত্তরে আপনার জীবনের প্রাসঙ্গিক কোনো ঘটনার কথা তাকে বলুন। সে যদি আপনার চোখের দিকে তাকায়, তবে আপনিও তার চোখের দিকে তাকান। সে যদি দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় তবে আপনিও তা-ই করুন। সে চাইলে, তাকে নিজের মতো করে সামলিয়ে ওঠার সুযোগ দিন। তাদের প্রতিটি দেহভঙ্গি অনুকরণ করতে যাবেন না। বরং তাদের কন্ঠস্বর ও মানসিক অবস্থার সাথে নিজের আচরণকে মানিয়ে নিন।
📄 আলাপ শেষ করার জন্যে তাড়াহুড়া করবেন না
কেউ যখন নিজের সমস্যার কথা অন্যজনকে বলতে আসে, তখন তারা এক লাফে আলাপের ইতি টেনে দিতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। ধরুন, কেউ আপনাকে বলতে এসেছে যে, তাকে চাকরি থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। আর আপনি উত্তরে বলে বসলেন, "ও আচ্ছা, আশা করি, তুমি দ্রুত আরেকটা চাকরি পেয়ে যাবে"। আচ্ছা, এখন আসুন এই উত্তরে কী সমস্যা রয়েছে তা দেখা যাক। প্রথমত, মানুষটিকে মাত্রই এক জায়গা থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, সে কষ্ট পেয়েছে, হতাশ হয়েছে। তার অনুভূতিটা বোঝা এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, চাকরি বাজারের খারাপ অবস্থার কারণে যদি তাকে বহিষ্কার করা হয়ে থাকে তবে "আশা করি, তুমি দ্রুত আরেকটা চাকরি পেয়ে যাবে” কথাটি তার কাছে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো মনে হতে পারে। কেননা, এটি কেবল তাকে তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথাই বারংবার স্মরণ করিয়ে দিবে।
এ ক্ষেত্রে যা করা যেতে পারে তা হলো,
* তার বর্তমান মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করা,
* প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্ন করে তাকে তার মনে অবস্থা খুলে বলতে সাহায্য করা, যাতে সে কিছুটা হলেও হালকা অনুভব করে। বহিষ্কারের এমন ঘটনায় আলাপ চালিয়ে নেওয়ার ভালো উপায় হলো, তাকে এই কথাগুলো বলা - "খবরটা শুনে খুব খারাপ লাগছে। কী হয়েছিল?" বা, "তোমার এখন কী অবস্থা?" বা, "সামনে কী করবে, কিছু ভেবেছো?" সে যদি কোনো চাকরির সন্ধান করে থাকে তবে তাকে জিজ্ঞেস করুন, "তুমি কোন ধরনের চাকরি খুঁজছো?" - এভাবে পরিস্থিতি বুঝে তাঁর সাথে কথা চালিয়ে যান。
আরেকটি উদাহরণ: কারও বহু বছরের সংসার জীবনের ইতি ঘটেছে। এখন যদি তাকে বলা হয়, "আরে!, এতে মন খারাপের কী আছে, আগের কথা বাদ দিয়ে নতুনকিছু ভাবো"- এধরনের কথা বলার চেয়ে অসংবেদনশীল আচরণ আর কী হতে পারে! কেননা এই কথাগুলো কেবল তার কষ্টকে আরও বহুগুণে বাডিয়ে দেয়। বরং তাকে প্রশ্ন করুন, "তোমার মনের অবস্থা এমন কেমন?", "তুমি ঠিক আছো তো?", "তুমি কি ওই ব্যাপারে কিছু বলতে চাও?", "তোমাদের মাঝে আসলে কী হয়েছিল?”, “তুমি এখন কী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছো?”- এগুলো তাদের কষ্ট কিছুটা হলেও হ্রাস করবে।
অন্যদিকে, আপনি হয়তো ভালো নিয়্যাতেই তাকে কষ্ট ভুলে থাকতে বলবেন, কিন্তু কথাগুলো তাকে স্পর্শ করবে না। কেননা, আপনি তাঁর ব্যথাটা বোঝার চেষ্টা করছেন না। যেন, আপনি তাদের আবেগকে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না বরং বোঝানোর চেষ্টা করছেন, তাদের কষ্টটা অমূলক। নিজেকে সেই ব্যক্তির অবস্থায় বসিয়ে দেখুন কেমন লাগে! মানুষটির মানসিক অবস্থার সাথে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। টেনেটুনে আলাপকে নির্দিষ্ট কোনো উপসংহারে নিয়ে যাওয়াটা অবিবেচক আচরণ ছাড়া আর কিছু নয়।
রাসূল-এর সাথে তার সাহাবিদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ। সাহাবিরা তাদের মনে কথাগুলো খোলামেলাভাবে রাসূল-এর সাথে শেয়ার করত। একদিন একযুদ্ধে রাসূল তার সাহাবিদের নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছিলেন। জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ নামের এক সাহাবি এই যুদ্ধে যোগ দেন। সেসময় জাবির সদ্য টিনেজ শেষ করা এক যুবক এবং তিনি একটি উৎকৃষ্ট উটের পিঠে চড়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। সেসময় রাসূল-এর সাথে তার যে কথোপকথন হয় তার মধ্যে রাসূল-এর এম্পেথেটিক দিকটি প্রকাশ পায় সাথে সাথে উপরিউক্ত তিনটি বিষয় " বক্তাকে প্রশ্ন করা” Mirroring এবং আলাপ শেষ করার জন্যে তাড়াহুড়া না করার বিষয়টি খুব ভালভাবে বুঝতে পারি।
জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ একটি উৎকৃষ্ট উটের ওপর সাওয়ার হয়ে 'জাতুর রিকা' যুদ্ধে যোগ দেন। চলতে চলতে উটটি হঠাৎ থেমে যায়। জাবির তাকে উঠিয়ে চালাবার চেষ্টা করছেন, এমন সময় পেছন থেকে রাসূলুল্লাহর সা. এর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, জাবির কী হয়েছে?
জাবির বললেন, উট চলছে না।
রাসুল নিকটে এসে উটের গায়ে আঘাত করার সাথে সাথে উটটি দ্রুত চলতে থাকে। এসময় অন্যান্যরা সামনে চলে গিয়েছিল। রাসূল এবং জাবির পেছনে পাশাপাশি উটে চড়ে যাচ্ছিলেন। রাসূল তাঁর পরিবারের ব্যাপারে বিভিন্ন প্রশ্ন করলেন। জাবির রাসূল ﷺ-এর জানালো তার বাবা জিহাদে শহীদ হয়েছেন এবং কিছু ঋণ রেখে গেছেন। রাসূল সেই ঋণ শোধের ব্যাপারে কথা বলে এবং জাবিরকে হালকা করার জন্য বিয়ে করেছে কিনা জানতে চাইলেন। জাবির জানালেন এক বিধবা মেয়েকে বিয়ে করেছেন। এভাবে রাসূল দুঃখ এবং ঋণে জর্জরিত একজন কর্মীকে কীভাবে একজন যুবকের সাথে আলোচনার পছন্দের টপিক বিয়ে নিয়ে আলোচনা শুরু করেন。
এরপর রাসূল সা. জাবিরের নিকট থেকে উটটি খরীদ করার প্রস্তাব করেন। জাবির মূল্য ছাড়াই বিক্রি করতে রাজী হন। রাসূল সা. বললেন, না তা হবে না, মূল্য তোমাকে নিতে হবে। উট কেনা বেচার ঘটনাটি জাবির থেকে এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ রাসূল সা. বললেন, জাবির এই উটটি আমার নিকট বিক্রি করবে?
- হাঁ, করব।
- কত দামে?
- এক দিরহামে।
- এক দিরহামে একটি উট কেনা যায়?
- তাহলে দুই দিরহামে।
- না, আমি চল্লিশ দিরহামে তোমার উটটি কিনলাম এবং আল্লাহর রাস্তায় তোমাকে আমি ওর পিঠে চড়াবো। এ ভাবে পথে উট কেনা বেচা হয়ে গেল।
মদীনা পৌঁছে জাবির উট নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. দরযায় হাজির হলেন। রাসূল সা. উটটি ঘুরে ঘুরে দেখলেন আর বললেনঃ খুব সুন্দর। তারপর বিলালকে ডেকে নির্দেশ দিলেন, এক উকিয়া (চল্লিশ দিরহাম) ওজন করে দাও এবং একটু বেশি দাও। অতঃপর রাসূল সা. জাবিরকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি উটের দাম পেয়েছেন কি না। জাবির বললেন, হাঁ, পেয়েছি। তখন রাসূল সা. জাবিরের হাতে উটটি তুলে দিয়ে বললেনঃ এই উট ও মূল্য দুইটিই নিয়ে যাও, সবই তোমার। জাবির খুব খুশী মনে উটসহ বাড়ী ফেরেন।
এই একটা ঘটনাই, আমাদের অনেকগুলো ব্যবহার শিক্ষা দেয়। আমাদের ফেলো সহযোগী, সঙ্গী, বন্ধুবান্ধবদের সাথে আমাদের আচরণ কেমন হবে তার চমৎকার উদাহরণ মজুদ আছে এই ঘটনাতে। একই সাথে আমরা বুঝতে পারি রাসূল ﷺ কীভাবে প্রতিনিয়ত ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের চর্চা করেছেন。
ঙ. আলাপ শেষ করার জন্যে তাড়াহুড়া করবেন না
কেউ যখন নিজের সমস্যার কথা অন্যজনকে বলতে আসে, তখন তারা এক লাফে আলাপের ইতি টেনে দিতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। ধরুন, কেউ আপনাকে বলতে এসেছে যে, তাকে চাকরি থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। আর আপনি উত্তরে বলে বসলেন, "ও আচ্ছা, আশা করি, তুমি দ্রুত আরেকটা চাকরি পেয়ে যাবে"। আচ্ছা, এখন আসুন এই উত্তরে কী সমস্যা রয়েছে তা দেখা যাক। প্রথমত, মানুষটিকে মাত্রই এক জায়গা থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, সে কষ্ট পেয়েছে, হতাশ হয়েছে। তার অনুভূতিটা বোঝা এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, চাকরি বাজারের খারাপ অবস্থার কারণে যদি তাকে বহিষ্কার করা হয়ে থাকে তবে "আশা করি, তুমি দ্রুত আরেকটা চাকরি পেয়ে যাবে” কথাটি তার কাছে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো মনে হতে পারে। কেননা, এটি কেবল তাকে তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথাই বারংবার স্মরণ করিয়ে দিবে।
এ ক্ষেত্রে যা করা যেতে পারে তা হলো,
* তার বর্তমান মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করা,
* প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্ন করে তাকে তার মনে অবস্থা খুলে বলতে সাহায্য করা, যাতে সে কিছুটা হলেও হালকা অনুভব করে।
বহিষ্কারের এমন ঘটনায় আলাপ চালিয়ে নেওয়ার ভালো উপায় হলো, তাকে এই কথাগুলো বলা - "খবরটা শুনে খুব খারাপ লাগছে। কী হয়েছিল?" বা, "তোমার এখন কী অবস্থা?" বা, "সামনে কী করবে, কিছু ভেবেছো?" সে যদি কোনো চাকরির সন্ধান করে থাকে তবে তাকে জিজ্ঞেস করুন, "তুমি কোন ধরনের চাকরি খুঁজছো?" - এভাবে পরিস্থিতি বুঝে তাঁর সাথে কথা চালিয়ে যান।
আরেকটি উদাহরণ: কারও বহু বছরের সংসার জীবনের ইতি ঘটেছে। এখন যদি তাকে বলা হয়, "আরে!, এতে মন খারাপের কী আছে, আগের কথা বাদ দিয়ে নতনকিছু ভাবো"- এধরনের কথা বলার চেয়ে অসংবেদনশীল আচরণ আর কী হতে পারে! কেননা এই কথাগুলো কেবল তার কষ্টকে আরও বহুগুণে বাডিয়ে দেয়। বরং তাকে প্রশ্ন করুন, "তোমার মনের অবস্থা এমন কেমন?", "তুমি ঠিক আছো তো?", "তুমি কি ওই ব্যাপারে কিছু বলতে চাও?", "তোমাদের মাঝে আসলে কী হয়েছিল?”, “তুমি এখন কী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছো?”- এগুলো তাদের কষ্ট কিছুটা হলেও হ্রাস করবে।
অন্যদিকে, আপনি হয়তো ভালো নিয়্যাতেই তাকে কষ্ট ভুলে থাকতে বলবেন, কিন্তু কথাগুলো তাকে স্পর্শ করবে না। কেননা, আপনি তাঁর ব্যথাটা বোঝার চেষ্টা করছেন না। যেন, আপনি তাদের আবেগকে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না বরং বোঝানোর চেষ্টা করছেন, তাদের কষ্টটা অমূলক। নিজেকে সেই ব্যক্তির অবস্থায় বসিয়ে দেখুন কেমন লাগে! মানুষটির মানসিক অবস্থার সাথে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। টেনেটুনে আলাপকে নির্দিষ্ট কোনো উপসংহারে নিয়ে যাওয়াটা অবিবেচক আচরণ ছাড়া আর কিছু নয়।
রাসূল-এর সাথে তার সাহাবিদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ। সাহাবিরা তাদের মনে কথাগুলো খোলামেলাভাবে রাসূল-এর সাথে শেয়ার করত। একদিন একযুদ্ধে রাসূল তার সাহাবিদের নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছিলেন। জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ নামের এক সাহাবি এই যুদ্ধে যোগ দেন। সেসময় জাবির সদ্য টিনেজ শেষ করা এক যুবক এবং তিনি একটি উৎকৃষ্ট উটের পিঠে চড়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। সেসময় রাসূল-এর সাথে তার যে কথোপকথন হয় তার মধ্যে রাসূল-এর এম্পেথেটিক দিকটি প্রকাশ পায় সাথে সাথে উপরিউক্ত তিনটি বিষয় " বক্তাকে প্রশ্ন করা” Mirroring এবং আলাপ শেষ করার জন্যে তাড়াহুড়া না করার বিষয়টি খুব ভালভাবে বুঝতে পারি।
জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ একটি উৎকৃষ্ট উটের ওপর সাওয়ার হয়ে 'জাতুর রিকা' যুদ্ধে যোগ দেন। চলতে চলতে উটটি হঠাৎ থেমে যায়। জাবির তাকে উঠিয়ে চালাবার চেষ্টা করছেন, এমন সময় পেছন থেকে রাসূলুল্লাহর সা. এর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, জাবির কী হয়েছে?
জাবির বললেন, উট চলছে না।
রাসুল নিকটে এসে উটের গায়ে আঘাত করার সাথে সাথে উটটি দ্রুত চলতে থাকে। এসময় অন্যান্যরা সামনে চলে গিয়েছিল। রাসূল এবং জাবির পেছনে পাশাপাশি উটে চড়ে যাচ্ছিলেন। রাসূল তাঁর পরিবারের ব্যাপারে বিভিন্ন প্রশ্ন করলেন। জাবির রাসূল ﷺ-এর জানালো তার বাবা জিহাদে শহীদ হয়েছেন এবং কিছু ঋণ রেখে গেছেন। রাসূল সেই ঋণ শোধের ব্যাপারে কথা বলে এবং জাবিরকে হালকা করার জন্য বিয়ে করেছে কিনা জানতে চাইলেন। জাবির জানালেন এক বিধবা মেয়েকে বিয়ে করেছেন। এভাবে রাসূল দুঃখ এবং ঋণে জর্জরিত একজন কর্মীকে কীভাবে একজন যুবকের সাথে আলোচনার পছন্দের টপিক বিয়ে নিয়ে আলোচনা শুরু করেন।
এরপর রাসূল সা. জাবিরের নিকট থেকে উটটি খরীদ করার প্রস্তাব করেন। জাবির মূল্য ছাড়াই বিক্রি করতে রাজী হন। রাসূল সা. বললেন, না তা হবে না, মূল্য তোমাকে নিতে হবে। উট কেনা বেচার ঘটনাটি জাবির থেকে এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ রাসূল সা. বললেন, জাবির এই উটটি আমার নিকট বিক্রি করবে?
- হাঁ, করব।
- কত দামে?
- এক দিরহামে।
- এক দিরহামে একটি উট কেনা যায়?
- তাহলে দুই দিরহামে।
- না, আমি চল্লিশ দিরহামে তোমার উটটি কিনলাম এবং আল্লাহর রাস্তায় তোমাকে আমি ওর পিঠে চড়াবো। এ ভাবে পথে উট কেনা বেচা হয়ে গেল।
মদীনা পৌঁছে জাবির উট নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. দরযায় হাজির হলেন। রাসূল সা. উটটি ঘুরে ঘুরে দেখলেন আর বললেনঃ খুব সুন্দর। তারপর বিলালকে ডেকে নির্দেশ দিলেন, এক উকিয়া (চল্লিশ দিরহাম) ওজন করে দাও এবং একটু বেশি দাও। অতঃপর রাসূল সা. জাবিরকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি উটের দাম পেয়েছেন কি না। জাবির বললেন, হাঁ, পেয়েছি। তখন রাসূল সা. জাবিরের হাতে উটটি তুলে দিয়ে বললেনঃ এই উট ও মূল্য দুইটিই নিয়ে যাও, সবই তোমার। জাবির খুব খুশী মনে উটসহ বাড়ী ফেরেন।
এই একটা ঘটনাই, আমাদের অনেকগুলো ব্যবহার শিক্ষা দেয়। আমাদের ফেলো সহযোগী, সঙ্গী, বন্ধুবান্ধবদের সাথে আমাদের আচরণ কেমন হবে তার চমৎকার উদাহরণ মজুদ আছে এই ঘটনাতে। একই সাথে আমরা বুঝতে পারি রাসূল কীভাবে প্রতিনিয়ত ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের চর্চা করেছেন।
📄 মানুষের অনুভূতির মূল্যায়ন করুন
সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে বড় সমস্যাটা হলো, মানুষ অন্যের আবেগ-অনুভূতিকে মূল্যায়ন করে না। মূল্যায়ন করা অর্থ- কোনোকিছুর গুরুত্ব অনুধাবন করা। উদাহরণস্বরূপ, কেউ বলল, "আমি অমুকের ব্যাপারে একেবারে হতাশ"। অনুভূতির মূল্যায়ন করতে পারলে তার জবাব হবে, "কেন, কী হয়েছে?" বা, "মন খারাপ করোনা, কী হয়েছে বলো আমাকে”। অপরদিকে কেউ যদি একবারে বলে ওঠে, “এতো হতাশ হওয়ার মতো কী হয়েছে?” অথবা, অপর ব্যক্তির কথাকে গুরুত্ব না দিয়ে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক কোনো কথা বলে ওঠে – তবে আসলে সে অনুভূতির মূল্যায়ন করলো না। অপরপক্ষের কথার প্রতিউত্তর কীভাবে দিচ্ছেন তার ওপর নির্ভর করে, অপরজন আপনার কাছে বাকি কথা বলবে না কি সেখানেই থেমে যাবে। কেউ যখন বলে, 'আমার মন খারাপ', 'আমার ভীষন রাগ হচ্ছে' বা, 'আমি খুব হতাশ'-তখন তাদের মনের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করুন। 'তোমার ব্যাপারটা শুনে আসলেই খারাপ লাগলো', “এটা আসলেই খুব হতাশাজনক' বা, 'কী হয়েছে?' জবাবে এই কথাগুলো বলুন।
বস্তুত, অন্যের আবেগকে বোঝা ও সেই অনুযায়ী আচরণ করতে না পারলে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের সকল তাত্ত্বিক জ্ঞান বৃথা। তাই আমাদের উচিত মানুষের সাথে কথা বলা ও মেলামেশার সময় সূক্ষ্মভাবে তার আবেগের প্রতি খেয়াল রাখা, তার পছন্দ-অপছন্দ, আনন্দ-বিস্ময়-রাগ-ভয় সুচারুরূপে পর্যবেক্ষণ করা। কাজটা আপাতভাবে কঠিন মনে হতে পারে, তবে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনের দিকে তাকালে ভিন্নটাই মনে হয়।
অন্যের আবেগকে বুঝতে পারার ক্ষেত্রে রাসূল ﷺ এর দক্ষতা ছিল অপরিসীম। তিনি স্থান-কাল-পাত্রভেদে মানুষের আবেগ বুঝতেন ও মূল্যায়ন করতেন। সীরাতের মধ্যে এমন অসংখ্য ঘটনা আমরা দেখতে পাই। এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হচ্ছে:
এক. সাফওয়ান বিন উমাইয়া বলেন, হুনাইন যুদ্ধের আগ পর্যন্ত মুহাম্মাদ ছিল আমার কাছে সর্বাধিক ঘৃণিত ব্যক্তি। হুনাইন যুদ্ধে বিপুল গণিমত আসলে রাসূল আমার চোখে সম্পদের লোভ দেখতে পান। তিনি আমাকে ১০০টি উট দিলেন। আমি আরও নেওয়ার জন্য লোভাতুর চোখে তাকিয়ে রইলাম। তিনি আমাকে আরও ১০০ উট দিলেন। আমি তখনো লোভাতুর দৃষ্টি দিলে তিনি আমাকে আরও ১০০ উট দিলেন। তখন আমি নিজেই পুনরায় লোভাতুর হয়ে তাকাতে লজ্জা বোধ করলাম। সেদিন থেকে মুহাম্মাদ আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিল।
রাসূল সাফওয়ান বিন উমাইয়া-র সম্পদের প্রতি আকর্ষণ টের পেয়েছিলেন এবং তিনি বুঝেছিলেন প্রাচুর্য দিয়েই সাফওয়ানের মন জয় করা যেতে পারে। এই ঘটনার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সাফওয়ান ইসলাম গ্রহণ করে।
দুই, রাসূল আয়িশা কে বললেন, “হে আয়িশ! আমি বুঝতে পারি কখন তুমি আমার ওপর রাগান্বিত থাকো আর কখন সন্তুষ্ট থাকো। যখন তুমি বলো, "ইবরাহীমের রবের কসম" তখন তুমি আমার ওপর অসন্তুষ্ট আর যখন বলো, "মুহাম্মাদের রবের কসম” তখন তুমি আমার ওপর সন্তুষ্ট থাকো। আয়িশা বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমার মুখ দিয়ে যাই বের হোক না কেন, অন্তর তো আপনার প্রতি ভালোবাসায় পরিপূর্ণই থাকে।”[১৪০]
এই হাদীসেও আমরা দেখি, রাসূল কত গভীরভাবে আয়িশা এর আবেগকে পর্যালোচনা করেছেন। বর্তমান সময়ে স্বামী-স্ত্রীগণ যদি এভাবে পরস্পরের আবেগকে বুঝত তাহলে দাম্পত্য সম্পর্কগুলো কতই না মসৃণ হত!
তিন. আনাস থেকে বর্ণিত, নবিজি এক স্ত্রীর (আয়েশার) ঘরে ছিলেন। তখন অন্য এক উম্মুল মুমিনীন একপাত্রে করে তার জন্য খাবার পাঠালেন। যে স্ত্রীর ঘরে নবিজি ছিলেন তিনি ঈর্ষাবশত তার হাত দাসের হাতে ধাক্কা দিলেন এতে পাত্র পড়ে ভেঙে গেল। নবিজি ভাঙ্গা টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিয়ে তাতে পড়ে যাওয়া খাবারগুলো তুলতে লাগলেন আর হাসতে হাসতে বললেন, "তোমাদের মা ঈর্ষা করেছে"। এরপর তিনি খাদেমকে ডাকলেন এবং যে স্ত্রীর ঘরে ছিলেন তার থেকে আরেকটি পাত্রী নিয়ে যার পাত্র ভেঙে গিয়েছে তাকে ফেরত দেওয়ার জন্য দিলেন"।[১৪১]
এখানে দেখা যাচ্ছে, রাসূল কত সুচারুরূপে আয়িশা এর আবেগকে বুঝেছেন ও তা সামলে নিয়েছেন।
চার. একজন নবি, রাসূল কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেই শুধু নয় বরং পারিবারিক পরিমণ্ডলে আদর্শ স্বামী, নানা ও শ্বশুর হিসেবেও রাসূলুল্লাহ ছিলেন একজন আদর্শ ইমোশনালি ইন্টেলিজেন্ট ব্যক্তিত্ব। কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক- স্বামী হিসেবে-
একদিন রাসূল আয়িশা এর ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ তাঁর ঘুম ভেঙ্গে যায়। তিনি আয়িশা কে জিজ্ঞেস করলেন- "তুমি কি আমাকে আমার রবের সাথে কথা বলার (সালাত আদায়ের) অনুমতি দেবে?"
• সত্য কথা বলতে, সালাতে দাঁড়ানোর জন্য আয়িশা এর অনুমতি নেওয়ার কোনো শার'ঈ প্রয়োজন রাসূল এর ছিল না। কিন্তু তিনি স্ত্রীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং তাঁর প্রতি স্ত্রীর হকের কথা মাথায় রেখেই অনুমতি চেয়েছেন। ভাবা যায়, রাসূল যখন এভাবে আয়িশা এর কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন তখন আয়িশা কতটা সম্মানিতবোধ করেছিলেন? কতটা আপ্লুত হয়েছিলেন স্বামীর এমন আচরণে?
আয়েশা বলেন, একদিন রাসূল ﷺ আমার সঙ্গে বসে ছিলেন। এমন সময় উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ শুনতে পেয়ে দেখতে গেলেন কী হচ্ছে। তিনি দেখলেন, কিছু আবিসিনিয়ান বালক বল্লম নিয়ে খেলা করছে। তিনি আমাকে বললেন, “আয়েশা! তুমি আসবে তাদের খেলা দেখতে?” আমি উঠে গিয়ে তার কাঁধে থুতনি রেখে খেলা দেখতে লাগলাম। কিছু সময় পর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার দেখা শেষ হলো?” তার কাছে আমার অবস্থান জানার জন্য (কতক্ষন এভাবে থাকেন) প্রত্যেকবার আমি 'না' বলতে লাগলাম। অন্য এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, "আমি তাদের খেলা দেখছিলাম এবং আমি শেষে খেলা দেখা বন্ধ করে সরে এলাম”। [১৪২]
স্বামী হিসেবে স্ত্রীর বিনোদন ও মানসিক চাহিদার প্রতি রাসূল এর এই সতর্ক দৃষ্টি আমাদেরকে জানিয়ে দেয় তিনি স্ত্রীর আবেগের প্রতি কেমন সতর্ক ছিলেন।
নানা হিসেবে রাসূল যখন সালাতের সিজদায় যেতেন তখন প্রায়ই হাসান-হুসাইন তাঁর পিঠে গিয়ে উঠত। যতক্ষণ না তাদের খেলা শেষ হত এবং তারা রাসুল এর পিঠ থেকে নামত ততক্ষণ তিনি সিজদা থেকে মাথা উঠাতেন না। একজন বাচ্চা শিশুর খেলার আবেগ ও ইচ্ছাকেও তিনি কতটা মূল্যায়িত করেছেন যে, তার জন্য সালাতে সিজদা পর্যন্ত বিলম্বিত করেছেন। [১৪৩]
শ্বশুর হিসেবে একদিন রাসূল ফাতিমা এর ঘরে ঢুকে দেখেন আলী নেই। তিনি আলী এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে ফাতিমা জানালেন- আলী রাগ করে ঘর থেকে বের হয়ে গেছে। রাসূল আলীকে খুঁজতে গিয়ে দেখলেন- তিনি মসজিদে নববিতে ধূলি ধূসরিত হয়ে শুয়ে আছেন। তিনি আলী এক কে ভালোবেসে ডাক দিলেন- "আবু তুরাব! উঠো!" [১৪৪]
তিনি আলীকে নিয়ে ঘরের ভেতর গেলেন এবং তাদের দাম্পত্য কলহের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র কোনো প্রশ্ন না করে তাদের মধ্যে মিটমাট করে দিলেন। একজন শ্বশুর হিসেবে মেয়ে-জামাইয়ের আবেগকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। আর আমরা কী করি? আমাদের সমাজে অনেক সংসার এখন ভেঙে যাচ্ছে কনে/বরের বাবা-মায়ের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে। নিঃসন্দেহে শ্বশুর হিসেবেও রাসূল ﷺ ছিলেন একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব। তিনি সবার আবেগ বুঝতে পারতেন।
পাঁচ. রাসূল এর খাদেম ছিল বালক আনাস আনাস তখনো তার কৈশোরে পৌঁছায়নি। একদিন রাসূল তাকে ঘরের বাইরে একটি কাজ করতে বলল। আনাস কাজটি করার জন্যই ঘর থেকে বের হলেন, কিন্তু বাইরে গিয়ে তার মতো আরও কিছু বালককে খেলা করতে দেখলেন। বয়সের তাড়নায় খেলা দেখতে দেখতে তিনি কাজটির কথা বেমালুম ভুলে গেলেন। দীর্ঘক্ষণ পর তার কাজের কথা মনে হল। আর তখনই দেখলেন- দূরে দাঁড়িয়ে রাসূল তাকে দেখছেন। তিনি ভড়কে গেলেন এবং কিছুটা ভয়ই পেলেন। কিন্তু রাসূল আনাসকে বকা দেওয়া তো দূরের কথা, তিনি কোনো কৈফিয়তও চাইলেন না এজন্য। বরং দূর থেকে আনাসের খেলা দেখে তিনি মুচকি হাসি দিচ্ছিলেন। [১৪৫] চিন্তা করুন- ওই মুহূর্তে রাসূল এর মুখে আসি দেখে বালক আনাসের মনে কেমন প্রশান্তির পরশ বয়ে গেছিল!
৬। রাসূল যখন জোরেশোরে মক্কার অলিগলিতে তাওহীদের দাওয়াত পেশ করলেন তখন কুরাইশেরা তাঁর দাওয়াতকে বাঁধা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিল। এক পর্যায়ে কুরাইশগণ আবু তালিবকে বলল, “হে আবূ তালিব! আমাদের মধ্যে মান-মর্যাদার যে আসনে আপনি রয়েছেন তা আপনি জানেন এবং বর্তমানে যে অবস্থার মধ্যে দিয়ে দিন যাপন করছেন তাও আপনার জানা। আমাদের ভয় হচ্ছে আপনি আপনার জীবনের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছেন। এদিকে আপনার ভাতিজা এবং আমাদের মধ্যে যে সংঘাত চলে আসছে তাও আপনার জানা। আমরা চাচ্ছি যে আপনি তাকে ডেকে আমাদের নিকট এবং আমাদের সম্পর্কে তার নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করবেন। সে আমাদের ধর্মের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ করবে না এবং আমরাও তার ধর্মে হস্তক্ষেপ করব না।" আবু তালিব রাসূল কে ডেকে কুরাইশদের প্রস্তাবটি জানালেন। জবাবে রাসূল বললেন, "আমি যদি এমন একটি প্রস্তাব পেশ করি যা মেনে নিলে গোটা আরবের সম্রাট হওয়া যাবে এবং আজম অধীনস্থ হয়ে যাবে, তাহলে আপনাদের মতামত কি?"
রাসূল -এর মুখ থেকে এ কথা শুনে তারা নিস্তব্ধ নির্বাক হয়ে গেল। রাসূল -এর কথা যেন তাদের মন বিগলিত করে ফেলল। কারণ যে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির জন্যই তারা এত শত্রুতা করেছে, এখন মুহাম্মাদই তাদেরকে সেই ক্ষমতা ও প্রতিপattiর উপায়-উপকরণ বলে দিচ্ছে। রাসূল বললেন, "আপনারা বলুন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত পরিহার করুন।”
এখানে রাসূল বুঝতে পেরেছিলেন যে কুরাইশদের আবেগ উচ্ছ্বাস সবকিছুই বাদশাহীকে কেন্দ্র করে। তাই তাদেরকে সেই ক্ষমতার মোহই ইসলামের ছায়াতলে আনতে পারে।
৭। জা'ফর ও আবিসিনিয়ার অন্যান্য মুহাজির সাহাবিগণ খায়বার যুদ্ধে অংশ নেননি। ওপরন্তু খায়বার যুদ্ধের গণীমত শুধুমাত্র বাইয়াতুর রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারীদের জন্য নির্ধারিত ছিল। তথাপি রাসূল জা'ফর ও তাঁর সাথীদের খায়বারের গণিমতের ভাগ দিয়েছিলেন।
কারণ, তাঁরা আবিসিনিয়ার নতুন পরিবেশ ও সমাজের মাঝে ব্যাপক অনিশ্চয়তায় দিন কাটিয়েছিল, সাথে ছিল গৃহযুদ্ধ ও সে দেশ থেকে বহিষ্কারের ভয়। প্রিয় রাসূল ও প্রিয় দেশ থেকে দূরে দীর্ঘ ১৪ বছর তাঁরা অতিবাহিত করেছেন দারুণ মনঃকষ্ট নিয়ে। তাঁদের এই কষ্ট ও ত্যাগের কারণেই রাসূল তাঁদেরকে খায়বারের গণিমত থেকে ভাগ দিয়ে যথার্থ সহমর্মিতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
৮। মৃতার যুদ্ধে জাফর শহীদ হন। যুদ্ধের পর রাসুল জাফর এর ঘরে গেলেন। সেখানে তার সন্তানদের দেখে মাথায় আদর করে হাত বুলিয়ে দিলেন। তখন তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু বয়ে যাচ্ছিল। জাফরের স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস ব্যাপারটা আঁচ করে ফেললেন এবং বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতামাতা আপনার প্রতি কুরবান হোক। আপনি কেন কাঁদছেন? জাফর এবং তার সঙ্গীদের ব্যাপারে আপনি কি কোনো সংবাদ পেয়েছেন?" রাসূল বললেন, "হ্যাঁ, আজ জাফর শহীদ হয়েছে”। আসমা বিনতে উমাইস বলেন, "একথা শোনামাত্র আমার মুখ দিয়ে চিৎকার বের হয়ে গেল এবং মহিলারা আমার পাশে জমা হয়ে গেল আর রাসূল আপন গৃহে চলে গেলেন”। রাসূল ঘরে ফিরে বললেন, "জাফরের পরিবারের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করে পাঠাও। আজ তারা তাদের দুঃখে কাতর হয়ে পড়েছে”।
রাসূল জাফর এ এর বড় ছেলে আব্দুল্লাহকে ডেকে বললেন, "আব্দুল্লাহ একেবারে আমার মতো দেখতে!” তিনি আব্দুল্লাহ-র হাত উঁচু করে তুলে ধরে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! আপনি জাফরের বংশধারা (-র বরকত) অব্যাহত রাখুন। হে আল্লাহ! আপনি আব্দুল্লাহ-র সকল কাজে বরকত দান করুন"। এরপর তিনি জাফর এ এর সন্তানদেরকে বললেন, "আল্লাহ তোমাদের বাবাকে জান্নাতে দুটি পাখা দান করেছেন। জান্নাতের মধ্যে তিনি যেখানে ইচ্ছা সেখানেই উড়ে বেড়াচ্ছেন"।
এভাবে রাসূল আল্লাহ জাফর এর পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কারণ, তিনি জাফর এর স্ত্রী-সন্তানদের বুকফাটা আর্তনাদ ও আবেগের মর্ম বুঝতে পেরেছিলেন。
টিকাঃ
[১৪০] সহিহুল বুখারি: ৬০৭৮
[১৪১] সহিহুল বুখারি: ৫২২৫
[১৪২] বুখারী: ৪৫৪, মুসলিম: ৮৯২,
[১৪৩] নাসায়ি: ১১৪১
[১৪৪] বুখারি: ৪৪১
[১৪৫] আবু দাউদ: ৪৭৭৩
চ. মানুষের অনুভূতির মূল্যায়ন করুন
সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে বড় সমস্যাটা হলো, মানুষ অন্যের আবেগ-অনুভূতিকে মূল্যায়ন করে না। মূল্যায়ন করা অর্থ- কোনোকিছুর গুরুত্ব অনুধাবন করা। উদাহরণস্বরূপ, কেউ বলল, "আমি অমুকের ব্যাপারে একেবারে হতাশ"। অনুভূতির মূল্যায়ন করতে পারলে তার জবাব হবে, "কেন, কী হয়েছে?" বা, "মন খারাপ করোনা, কী হয়েছে বলো আমাকে”। অপরদিকে কেউ যদি একবারে বলে ওঠে, “এতো হতাশ হওয়ার মতো কী হয়েছে?” অথবা, অপর ব্যক্তির কথাকে গুরুত্ব না দিয়ে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক কোনো কথা বলে ওঠে – তবে আসলে সে অনুভূতির মূল্যায়ন করলো না। অপরপক্ষের কথার প্রতিউত্তর কীভাবে দিচ্ছেন তার ওপর নির্ভর করে, অপরজন আপনার কাছে বাকি কথা বলবে না কি সেখানেই থেমে যাবে। কেউ যখন বলে, 'আমার মন খারাপ', 'আমার ভীষন রাগ হচ্ছে' বা, 'আমি খুব হতাশ'-তখন তাদের মনের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করুন। 'তোমার ব্যাপারটা শুনে আসলেই খারাপ লাগলো', “এটা আসলেই খুব হতাশাজনক' বা, 'কী হয়েছে?' জবাবে এই কথাগুলো বলুন।
বস্তুত, অন্যের আবেগকে বোঝা ও সেই অনুযায়ী আচরণ করতে না পারলে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের সকল তাত্ত্বিক জ্ঞান বৃথা। তাই আমাদের উচিত মানুষের সাথে কথা বলা ও মেলামেশার সময় সূক্ষ্মভাবে তার আবেগের প্রতি খেয়াল রাখা, তার পছন্দ-অপছন্দ, আনন্দ-বিস্ময়-রাগ-ভয় সুচারুরূপে পর্যবেক্ষণ করা। কাজটা আপাতভাবে কঠিন মনে হতে পারে, তবে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনের দিকে তাকালে ভিন্নটাই মনে হয়।
অন্যের আবেগকে বুঝতে পারার ক্ষেত্রে রাসূল ﷺ এর দক্ষতা ছিল অপরিসীম। তিনি স্থান-কাল-পাত্রভেদে মানুষের আবেগ বুঝতেন ও মূল্যায়ন করতেন। সীরাতের মধ্যে এমন অসংখ্য ঘটনা আমরা দেখতে পাই। এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হচ্ছে:
এক. সাফওয়ান বিন উমাইয়া বলেন, হুনাইন যুদ্ধের আগ পর্যন্ত মুহাম্মাদ ছিল আমার কাছে সর্বাধিক ঘৃণিত ব্যক্তি। হুনাইন যুদ্ধে বিপুল গণিমত আসলে রাসূল আমার চোখে সম্পদের লোভ দেখতে পান। তিনি আমাকে ১০০টি উট দিলেন। আমি আরও নেওয়ার জন্য লোভাতুর চোখে তাকিয়ে রইলাম। তিনি আমাকে আরও ১০০ উট দিলেন। আমি তখনো লোভাতুর দৃষ্টি দিলে তিনি আমাকে আরও ১০০ উট দিলেন। তখন আমি নিজেই পুনরায় লোভাতুর হয়ে তাকাতে লজ্জা বোধ করলাম। সেদিন থেকে মুহাম্মাদ আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিল।
রাসূল সাফওয়ান বিন উমাইয়া-র সম্পদের প্রতি আকর্ষণ টের পেয়েছিলেন এবং তিনি বুঝেছিলেন প্রাচুর্য দিয়েই সাফওয়ানের মন জয় করা যেতে পারে। এই ঘটনার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সাফওয়ান ইসলাম গ্রহণ করে।
দুই, রাসূল আয়িশা কে বললেন, “হে আয়িশ! আমি বুঝতে পারি কখন তুমি আমার ওপর রাগান্বিত থাকো আর কখন সন্তুষ্ট থাকো। যখন তুমি বলো, "ইবরাহীমের রবের কসম" তখন তুমি আমার ওপর অসন্তুষ্ট আর যখন বলো, "মুহাম্মাদের রবের কসম” তখন তুমি আমার ওপর সন্তুষ্ট থাকো। আয়িশা বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমার মুখ দিয়ে যাই বের হোক না কেন, অন্তর তো আপনার প্রতি ভালোবাসায় পরিপূর্ণই থাকে।”[140]
এই হাদীসেও আমরা দেখি, রাসূল কত গভীরভাবে আয়িশা এর আবেগকে পর্যালোচনা করেছেন। বর্তমান সময়ে স্বামী-স্ত্রীগণ যদি এভাবে পরস্পরের আবেগকে বুঝত তাহলে দাম্পত্য সম্পর্কগুলো কতই না মসৃণ হত!
তিন. আনাস থেকে বর্ণিত, নবিজি এক স্ত্রীর (আয়েশার) ঘরে ছিলেন। তখন অন্য এক উম্মুল মুমিনীন একপাত্রে করে তার জন্য খাবার পাঠালেন। যে স্ত্রীর ঘরে নবিজি ছিলেন তিনি ঈর্ষাবশত তার হাত দাসের হাতে ধাক্কা দিলেন এতে পাত্র পড়ে ভেঙে গেল। নবিজি ভাঙ্গা টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিয়ে তাতে পড়ে যাওয়া খাবারগুলো তুলতে লাগলেন আর হাসতে হাসতে বললেন, "তোমাদের মা ঈর্ষা করেছে"। এরপর তিনি খাদেমকে ডাকলেন এবং যে স্ত্রীর ঘরে ছিলেন তার থেকে আরেকটি পাত্রী নিয়ে যার পাত্র ভেঙে গিয়েছে তাকে ফেরত দেওয়ার জন্য দিলেন"।[141]
এখানে দেখা যাচ্ছে, রাসূল কত সুচারুরূপে আয়িশা এর আবেগকে বুঝেছেন ও তা সামলে নিয়েছেন।
চার. একজন নবি, রাসূল কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেই শুধু নয় বরং পারিবারিক পরিমণ্ডলে আদর্শ স্বামী, নানা ও শ্বশুর হিসেবেও রাসূলুল্লাহ ছিলেন একজন আদর্শ ইমোশনালি ইন্টেলিজেন্ট ব্যক্তিত্ব। কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক-
স্বামী হিসেবে-
একদিন রাসূল আয়িশা এর ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ তাঁর ঘুম ভেঙ্গে যায়। তিনি আয়িশা কে জিজ্ঞেস করলেন- "তুমি কি আমাকে আমার রবের সাথে কথা বলার (সালাত আদায়ের) অনুমতি দেবে?"
সত্য কথা বলতে, সালাতে দাঁড়ানোর জন্য আয়িশা এর অনুমতি নেওয়ার কোনো শার'ঈ প্রয়োজন রাসূল এর ছিল না। কিন্তু তিনি স্ত্রীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং তাঁর প্রতি স্ত্রীর হকের কথা মাথায় রেখেই অনুমতি চেয়েছেন। ভাবা যায়, রাসূল যখন এভাবে আয়িশা এর কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন তখন আয়িশা কতটা সম্মানিতবোধ করেছিলেন? কতটা আপ্লুত হয়েছিলেন স্বামীর এমন আচরণে?
আয়েশা বলেন, একদিন রাসূল ﷺ আমার সঙ্গে বসে ছিলেন। এমন সময় উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ শুনতে পেয়ে দেখতে গেলেন কী হচ্ছে। তিনি দেখলেন, কিছু আবিসিনিয়ান বালক বল্লম নিয়ে খেলা করছে। তিনি আমাকে বললেন, “আয়েশা! তুমি আসবে তাদের খেলা দেখতে?” আমি উঠে গিয়ে তার কাঁধে থুতনি রেখে খেলা দেখতে লাগলাম। কিছু সময় পর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার দেখা শেষ হলো?” তার কাছে আমার অবস্থান জানার জন্য (কতক্ষন এভাবে থাকেন) প্রত্যেকবার আমি 'না' বলতে লাগলাম। অন্য এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, "আমি তাদের খেলা দেখছিলাম এবং আমি শেষে খেলা দেখা বন্ধ করে সরে এলাম”। [142]
স্বামী হিসেবে স্ত্রীর বিনোদন ও মানসিক চাহিদার প্রতি রাসূল এর এই সতর্ক দৃষ্টি আমাদেরকে জানিয়ে দেয় তিনি স্ত্রীর আবেগের প্রতি কেমন সতর্ক ছিলেন।
নানা হিসেবে রাসূল যখন সালাতের সিজদায় যেতেন তখন প্রায়ই হাসান-হুসাইন তাঁর পিঠে গিয়ে উঠত। যতক্ষণ না তাদের খেলা শেষ হত এবং তারা রাসুল এর পিঠ থেকে নামত ততক্ষণ তিনি সিজদা থেকে মাথা উঠাতেন না। একজন বাচ্চা শিশুর খেলার আবেগ ও ইচ্ছাকেও তিনি কতটা মূল্যায়িত করেছেন যে, তার জন্য সালাতে সিজদা পর্যন্ত বিলম্বিত করেছেন। [143]
শ্বশুর হিসেবে একদিন রাসূল ফাতিমা এর ঘরে ঢুকে দেখেন আলী নেই। তিনি আলী এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে ফাতিমা জানালেন- আলী রাগ করে ঘর থেকে বের হয়ে গেছে। রাসূল আলীকে খুঁজতে গিয়ে দেখলেন-
তিনি মসজিদে নববিতে ধূলি ধূসরিত হয়ে শুয়ে আছেন। তিনি আলী এক কে ভালোবেসে ডাক দিলেন- "আবু তুরাব! উঠো!" [144]
তিনি আলীকে নিয়ে ঘরের ভেতর গেলেন এবং তাদের দাম্পত্য কলহের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র কোনো প্রশ্ন না করে তাদের মধ্যে মিটমাট করে দিলেন। একজন শ্বশুর হিসেবে মেয়ে-জামাইয়ের আবেগকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। আর আমরা কী করি? আমাদের সমাজে অনেক সংসার এখন ভেঙে যাচ্ছে কনে/বরের বাবা-মায়ের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে। নিঃসন্দেহে শ্বশুর হিসেবেও রাসূল ﷺ ছিলেন একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব। তিনি সবার আবেগ বুঝতে পারতেন।
পাঁচ. রাসূল এর খাদেম ছিল বালক আনাস আনাস তখনো তার কৈশোরে পৌঁছায়নি। একদিন রাসূল তাকে ঘরের বাইরে একটি কাজ করতে বলল। আনাস কাজটি করার জন্যই ঘর থেকে বের হলেন, কিন্তু বাইরে গিয়ে তার মতো আরও কিছু বালককে খেলা করতে দেখলেন। বয়সের তাড়নায় খেলা দেখতে দেখতে তিনি কাজটির কথা বেমালুম ভুলে গেলেন। দীর্ঘক্ষণ পর তার কাজের কথা মনে হল। আর তখনই দেখলেন- দূরে দাঁড়িয়ে রাসূল তাকে দেখছেন। তিনি ভড়কে গেলেন এবং কিছুটা ভয়ই পেলেন। কিন্তু রাসূল আনাসকে বকা দেওয়া তো দূরের কথা, তিনি কোনো কৈফিয়তও চাইলেন না এজন্য। বরং দূর থেকে আনাসের খেলা দেখে তিনি মুচকি হাসি দিচ্ছিলেন। [145]
চিন্তা করুন- ওই মুহূর্তে রাসূল এর মুখে আসি দেখে বালক আনাসের মনে কেমন প্রশান্তির পরশ বয়ে গেছিল!
৬। রাসূল যখন জোরেশোরে মক্কার অলিগলিতে তাওহীদের দাওয়াত পেশ করলেন তখন কুরাইশেরা তাঁর দাওয়াতকে বাঁধা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিল। এক পর্যায়ে কুরাইশগণ আবু তালিবকে বলল, “হে আবূ তালিব! আমাদের মধ্যে মান-মর্যাদার যে আসনে আপনি রয়েছেন তা আপনি জানেন এবং বর্তমানে যে অবস্থার মধ্যে দিয়ে দিন যাপন করছেন তাও আপনার জানা। আমাদের ভয় হচ্ছে আপনি আপনার জীবনের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছেন। এদিকে আপনার ভাতিজা এবং আমাদের মধ্যে যে সংঘাত চলে আসছে তাও আপনার জানা। আমরা চাচ্ছি যে আপনি তাকে ডেকে আমাদের নিকট এবং আমাদের সম্পর্কে তার নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করবেন। সে আমাদের ধর্মের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ করবে না এবং আমরাও তার ধর্মে হস্তক্ষেপ করব না।" আবু তালিব রাসূল কে ডেকে কুরাইশদের প্রস্তাবটি জানালেন। জবাবে রাসূল বললেন, "আমি যদি এমন একটি প্রস্তাব পেশ করি যা মেনে নিলে গোটা আরবের সম্রাট হওয়া যাবে এবং আজম অধীনস্থ হয়ে যাবে, তাহলে আপনাদের মতামত কি?"
রাসূল -এর মুখ থেকে এ কথা শুনে তারা নিস্তব্ধ নির্বাক হয়ে গেল। রাসূল -এর কথা যেন তাদের মন বিগলিত করে ফেলল। কারণ যে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির জন্যই তারা এত শত্রুতা করেছে, এখন মুহাম্মাদই তাদেরকে সেই ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির উপায়-উপকরণ বলে দিচ্ছে। রাসূল বললেন, "আপনারা বলুন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত পরিহার করুন।”
এখানে রাসূল বুঝতে পেরেছিলেন যে কুরাইশদের আবেগ উচ্ছ্বাস সবকিছুই বাদশাহীকে কেন্দ্র করে। তাই তাদেরকে সেই ক্ষমতার মোহই ইসলামের ছায়াতলে আনতে পারে।
৭। জা'ফর ও আবিসিনিয়ার অন্যান্য মুহাজির সাহাবিগণ খায়বার যুদ্ধে অংশ নেননি। ওপরন্তু খায়বার যুদ্ধের গণীমত শুধুমাত্র বাইয়াতুর রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারীদের জন্য নির্ধারিত ছিল। তথাপি রাসূল জা'ফর ও তাঁর সাথীদের খায়বারের গণিমতের ভাগ দিয়েছিলেন।
কারণ, তাঁরা আবিসিনিয়ার নতুন পরিবেশ ও সমাজের মাঝে ব্যাপক অনিশ্চয়তায় দিন কাটিয়েছিল, সাথে ছিল গৃহযুদ্ধ ও সে দেশ থেকে বহিষ্কারের ভয়। প্রিয় রাসূল ও প্রিয় দেশ থেকে দূরে দীর্ঘ ১৪ বছর তাঁরা অতিবাহিত করেছেন দারুণ মনঃকষ্ট নিয়ে। তাঁদের এই কষ্ট ও ত্যাগের কারণেই রাসূল তাঁদেরকে খায়বারের গণিমত থেকে ভাগ দিয়ে যথার্থ সহমর্মিতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
৮। মৃতার যুদ্ধে জাফর শহীদ হন। যুদ্ধের পর রাসুল জাফর এর ঘরে গেলেন। সেখানে তার সন্তানদের দেখে মাথায় আদর করে হাত বুলিয়ে দিলেন। তখন তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু বয়ে যাচ্ছিল। জাফরের স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস ব্যাপারটা আঁচ করে ফেললেন এবং বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতামাতা আপনার প্রতি কুরবান হোক। আপনি কেন কাঁদছেন? জাফর এবং তার সঙ্গীদের ব্যাপারে আপনি কি কোনো সংবাদ পেয়েছেন?" রাসূল বললেন, "হ্যাঁ, আজ জাফর শহীদ হয়েছে"। আসমা বিনতে উমাইস বলেন, "একথা শোনামাত্র আমার মুখ দিয়ে চিৎকার বের হয়ে গেল এবং মহিলারা আমার পাশে জমা হয়ে গেল আর রাসূল আপন গৃহে চলে গেলেন"। রাসূল ঘরে ফিরে বললেন, "জাফরের পরিবারের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করে পাঠাও। আজ তারা তাদের দুঃখে কাতর হয়ে পড়েছে”।
রাসূল জাফর এ এর বড় ছেলে আব্দুল্লাহকে ডেকে বললেন, "আব্দুল্লাহ একেবারে আমার মতো দেখতে!” তিনি আব্দুল্লাহ-র হাত উঁচু করে তুলে ধরে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! আপনি জাফরের বংশধারা (-র বরকত) অব্যাহত রাখুন। হে আল্লাহ! আপনি আব্দুল্লাহ-র সকল কাজে বরকত দান করুন"। এরপর তিনি জাফর এ এর সন্তানদেরকে বললেন, "আল্লাহ তোমাদের বাবাকে জান্নাতে দুটি পাখা দান করেছেন। জান্নাতের মধ্যে তিনি যেখানে ইচ্ছা সেখানেই উড়ে বেড়াচ্ছেন"।
এভাবে রাসূল আল্লাহ জাফর এর পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কারণ, তিনি জাফর এর স্ত্রী-সন্তানদের বুকফাটা আর্তনাদ ও আবেগের মর্ম বুঝতে পেরেছিলেন。
টিকাঃ
[140] সহিহুল বুখারি: ৬০৭৮
[141] সহিহুল বুখারি: ৫২২৫
[142] বুখারী: ৪৫৪, মুসলিম: ৮৯২,
[143] নাসায়ি: ১১৪১
[144] বুখারি: ৪৪১
[145] আবু দাউদ: ৪৭৭৩
📄 দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাবেন না
দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়ার মনোভাব যেকোনো কথোপকথনকে মুহূর্তেই শেষ করে দিতে পারে। কোনো বিষয়ে ভালোভাবে না জেনেই সে সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়াটাও বড় একটি ভুল। ধরুন, আপনার বন্ধুর সাথে তাঁর অফিসের বসের কোনো বিষয় নিয়ে তর্ক হয়েছে। এখন আপনি ধারণা করছেন, দোষটা আপনার বন্ধুর। যেহেতু, তাঁর বস একজন ম্যানেজার পর্যায়ের মানুষ, তাই হয়তো ভুলটা তাঁর নয়। অথবা, আপনার বন্ধু হয়তো পরীক্ষায় খুব কম নম্বর পেয়েছে। আপনি ধারণা করে বসলেন, সে হয়তো পড়াশুনা করেনি। অথচ, হতেই পারে সে কোনো পারিবারিক সমস্যার কারণে ভালোভাবে পরীক্ষা দিতে পারে নি। এ কারণে, সবচেয়ে উত্তম সমাধান হলো, কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়ার মনোভাব না রাখা। প্রত্যেকেই নিজ নিজ জীবনে ভালোকিছু করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। শুধু শুধু কেন অযাচিত মন্তব্য করে তাদের অপদস্থ করতে যাবেন?
ছ. দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাবেন না
দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়ার মনোভাব যেকোনো কথোপকথনকে মুহূর্তেই শেষ করে দিতে পারে। কোনো বিষয়ে ভালোভাবে না জেনেই সে সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়াটাও বড় একটি ভুল। ধরুন, আপনার বন্ধুর সাথে তাঁর অফিসের বসের কোনো বিষয় নিয়ে তর্ক হয়েছে। এখন আপনি ধারণা করছেন, দোষটা আপনার বন্ধুর। যেহেতু, তাঁর বস একজন ম্যানেজার পর্যায়ের মানুষ, তাই হয়তো ভুলটা তাঁর নয়। অথবা, আপনার বন্ধু হয়তো পরীক্ষায় খুব কম নম্বর পেয়েছে। আপনি ধারণা করে বসলেন, সে হয়তো পড়াশুনা করেনি। অথচ, হতেই পারে সে কোনো পারিবারিক সমস্যার কারণে ভালোভাবে পরীক্ষা দিতে পারে নি। এ কারণে, সবচেয়ে উত্তম সমাধান হলো, কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়ার মনোভাব না রাখা। প্রত্যেকেই নিজ নিজ জীবনে ভালোকিছু করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। শুধু শুধু কেন অযাচিত মন্তব্য করে তাদের অপদস্থ করতে যাবেন?