📘 ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নববী দর্পণে সমকালীন ধারণা > 📄 কুরআন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ

📄 কুরআন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ


আল্লাহ কুরআনে অসংখ্য আয়াতে আত্মনিয়ন্ত্রণ তথা আত্মসংযমের কথা বলেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণের পরকালীন প্রতিদানের কথাও সাথে সাথে উল্লেখ করেছেন। কয়েকটি আয়াত দেখি আমরা:

وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأوى

"পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং খেয়াল-খুশী থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হবে জান্নাত। "[১১৬]

রাজা-বাদশাহ কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্যও আল্লাহ আত্মনিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। ক্ষমতা এমন জিনিষ, যা পেলে সহজেই লাগামছাড়া হয়ে যেতে পারে মানুষ। আল্লাহ তাঁর নবি দাউদ -কে ক্ষমতা দেওয়ার পর আত্মনিয়ন্ত্রিত হতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَدَاوُدُ إِنَّا جَعَلْنَكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّ الَّذِينَ يَضِلُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ

“হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, অতএব, তুমি মানুষের মাঝে ন্যায়সঙ্গতভাবে রাজত্ব কর এবং খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না। তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি, এ কারণে যে, তারা বিচারদিবসকে ভূলে যায়।”[১১৭]

আল্লাহ বিচারকার্যের ক্ষেত্রেও বিচারকদেরকে আত্মনিয়ন্ত্রিত হতে বলেছেন এবং নিজেদের চাওয়া-পাওয়াকে এক পাশে রেখে কেবলমাত্র ন্যায়সঙ্গত বিচার করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। বিচারকার্যের সময় শত প্রলোভন আসা স্বাভাবিক। সেই মুহূর্তে আত্মনিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত কঠিন কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন-

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوْمِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ إِنْ يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَنْ تَعْدِلُوا وَإِنْ تَلْوُا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চাইতে বেশি। অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ কর্ম সম্পর্কেই অবগত।" [১১৮]

আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্জনের একটি চাবিকাঠি হলো সবর। সবর বিষয়ক কুরআনের অসংখ্য আয়াত আছে। সবর সম্পর্কে কুরআনে আরও বলা হয়েছে,

وَاصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ

"আর ধৈর্যধারণ কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ পূণ্যবানদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।"[১১৯]

এমনকি কুরআনে আল্লাহ বিজয় বা সফলতার উল্লাস প্রকাশের ক্ষেত্রেও নম্র আচরণ করার এবং উদ্ধত আচরণ না করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাইলকে দেওয়া তাঁর আদেশের ব্যাপারে বলেন,

وَإِذْ قُلْنَا ادْخُلُوا هَذِهِ الْقَرْيَةَ فَكُلُوا مِنْهَا حَيْثُ شِئْتُمْ رَغَدًا وَادْخُلُوا الْبَابَ سُجَّدًا وَقُولُوا حِطَّةٌ تَغْفِرْ لَكُمْ خَطِيكُمْ وَسَنَزِيدُ الْمُحْسِنِينَ

"স্মরণ কর, যখন আমি বললাম, এ জনপদে প্রবেশ কর, আর তা থেকে তোমাদের ইচ্ছানুযায়ী আহার কর, দ্বার দিয়ে নতশিরে প্রবেশ কর এবং বল-'ক্ষমা চাই'। আমি তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করব এবং সৎকর্মশীলদের প্রতি আমার দান বৃদ্ধি করব।”[১২০]

একজন মানুষ আত্মনিয়ন্ত্রিত হলে তা তার আশেপাশের মানুষের জন্যও কল্যাণ বয়ে আনে। তবে আত্মনিয়ন্ত্রিত মানুষের সবচেয়ে বড় ফায়দা হলো এর দ্বারা সে নিজেই উপকৃত হয় দুনিয়ায় ও আখিরাতে। নিশ্চয়ই আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে এ আয়াতটি আমাদের সামনে আদর্শস্বরূপ।

وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَإِنْ تَدْعُ مُثْقَلَةٌ إِلَى حِمْلِهَا لَا يُعْمَلْ مِنْهُ شَيْءٌ وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى إِنَّمَا تُنْذِرُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَيْبِ وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَمَنْ تَرَكَّى فَإِنَّمَا يَتَزَكَّى لِنَفْسِهِ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ

"কোন বহনকারী অন্যের (পাপের) বোঝা বইবে না। কেউ যদি তার গুরুভার বয়ে দেয়ার জন্য অন্যকে ডাকে, তবে তার বোঝার কোন অংশই বহন করা হবে না—নিকটাত্মীয় হলেও। তুমি কেবল তাদেরকেই সতর্ক করতে পার, যারা না দেখেই তাদের প্রতিপালককে ভয় করে আর সালাত প্রতিষ্ঠা করে। যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে, সে তো পরিশুদ্ধ করে নিজের কল্যাণেই। আল্লাহর দিকেই (সকলের) প্রত্যাবর্তন।" [১২১]

এ ছাড়াও কুরআনে আত্মনিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা সংক্রান্ত অসংখ্য আয়াত রয়েছে。

টিকাঃ
[১১৬] সূরা নাযিয়াত, ৭৯:৪০-৪১
[১১৭] সূরা সদ, ৩৮:২৬
[১১৮] সূরা নিসা, ৪:১৩৫
[১১৯] সূরা হূদ, ১১:১১৫
[১২০] সূরা বাকারা, ২:৫৮
[১২১] সূরা ফাতির, ৩৫:১৮

📘 ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নববী দর্পণে সমকালীন ধারণা > 📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মশুদ্ধি

📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মশুদ্ধি


মানুষের কাছে নবি-রাসূল ও কিতাব পাঠানোর অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের নাফসকে পরিশুদ্ধ করা। এই পরিশুদ্ধিকরণের জন্যও প্রয়োজন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং তার ওপর অটল থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন,

هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَ يُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ

"তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তার আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।" [১২২]

لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ

“আল্লাহ ঈমানদারদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবি পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন। তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। যদিও তারা ইতিপূর্বে সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল।" [১২৩]

টিকাঃ
[১২২] সূরা জুম'আহ, ৬২:২
[১২৩] সূরা আলে ইমরান, ৩:১৬৪

📘 ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নববী দর্পণে সমকালীন ধারণা > 📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্জনে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দেখানো পথ

📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্জনে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দেখানো পথ


কোনো ভুল বা কুফরি কাজের কারণে নবিজি যদি কারও প্রতি রাগান্বিত হতেন, তবে মারধর বা কঠিন কথার মাধ্যমে তিনি নিজের রাগ প্রকাশ করতেন না। সাহাবিগণ তার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝে ফেলতেন যে তিনি রাগ করেছেন। রাগলে তার মুখ লালবর্ণ ধারণ করতো, কপালের শিরাগুলো দৃশ্যমান হত এবং তাঁর কপালে সামান্য ঘাম হতো। রাগের সেই মুহূর্তটুকু রাসূল ﷺ চুপ হয়ে যেতেন এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতেন。

অপর এক হাদীসে এসেছে, নবিজি তার সাহাবিদের বলেছেন, "কুস্তিতে কোনো পালোয়ানকে হারিয়ে দেওয়ার মানেই সে শক্তিশালী নয়। বরং প্রকৃত শক্তিশালী তো সেই ব্যক্তি যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।" [১২৪]

চলুন কিছু হাদীসের আলোকে নবি ﷺ-এর আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেখে আসা যাক।

• হুনাইনের যুদ্ধের পর রাসূল ﷺ গণিমতের মাল যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে বণ্টন করে দিচ্ছিলেন। সর্বপ্রথম তিনি সেসব কুরাইশদের মাঝে সম্পদ বন্টন করলেন, যাদের কেউ কেউ সদ্য ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং কেউ কেউ তখনো দ্বীনে প্রবেশ করেনি। তাদের মন জয় করার জন্যেই মূলত তিনি এ কাজটি করেন। আবু সুফিয়ান ও তার দুই পুত্রকে ১০০টি করে উট প্রদান করা হয়। জি'ররানাহ উপত্যকায় অতিক্রমের সময় সাফওয়ান বিন উমাইয়া নবি ﷺ-এর পাশে ছিলেন। রাসূল ﷺ-এর মুক্তহাতে দান করার ব্যাপারটি নিয়ে সাফওয়ান বেশ কৌতুহলী ছিল। বিষয়টি বুঝতে পেরে নবিজি তাকে উট, ভেড়া, ছাগলের এক বিশাল চারণভূমি দিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করলেন। নবি -এর মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে নিলেন।[১২৫] এই দানশীলতার পেছনে কোনো স্বার্থ ছিলো না। রাসূল ﷺ চেয়েছিলেন, তাদের অন্তরকে ইসলামের প্রতি নরম করতে। হয়েছেও তাই। নবিজির মহানুভবতায় তাদের হৃদয় ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল।

সম্পদের লোভে এই সময় অনেক বেদুইন রাসূল এর চারপাশে ভীড় করেছিল, এমনকি সম্পদের জন্য রাসূল এর চাদর ধরে তারা টানাটানিও শুরু করেছিল। কিন্তু রাসূল ﷺ তাঁদেরকে কিছুই বললেন না। বরং তিনি তাদের থেকে একদিকে সরে গেলেন। এই সময় এক নবাগত লোক (সে সাহাবি ছিল না) বলে ওঠে যে, "মুহাম্মাদ! সম্পদ বণ্টণের ক্ষেত্রে তুমি আল্লাহকে ভয় করো!" নবিজির কাছে কথাটি পৌঁছালে তাঁর মুখ রক্তিমবর্ণ ধারণ করে এবং তিনি বলেন, “যদি আল্লাহ আর তার রাসূল সুবিচার না করেন, তবে এমন কে আছে যে সুবিচার করতে পারবে?” তিনি আরও বলেন, “আল্লাহ তাআলা মুসা -এর ওপর রহম করুন। কেননা, তাকে এরচেয়েও বেশি কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। তারপরও তিনি সবর করেছিলেন”। [১২৬]

মাল বণ্টন সম্পর্কে সাহাবিদের মন্তব্য শুনে নবিজি রেগে গিয়েছিলেন; যা তার পরিবর্তিত মুখবর্ণ দেখে বোঝা গিয়েছিল। অথচ, তিনি তার এই আবেগকে অন্যদের মতো করে প্রকাশ পেতে দেননি। তিনি প্রথমে আল্লাহ ও তার রাসূলের সুবিচারের কথা বলেছেন। এরপর সবর সংক্রান্ত অতীতের এক দৃষ্টান্তের কথা উল্লেখ করে নিজ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। রাগ ও তা সংবরণের কৌশল সংক্রান্ত এমন অসংখ্য হাদীস থেকেই আত্মসচেতনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা পাওয়া যায়।

এই হাদীস থেকে আমরা রাসূল ﷺ এর আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল জানতে পারি:

✓ আমাদের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তি হবে শারঈ মাপকাঠি। যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া প্রকাশের আগে আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে যে, ঘটনাটি শারঈ দিক থেকে কতটা অসঙ্গতিপূর্ণ। যদি আমাদের মনের বাসনার সাথে খুব একটা সাংঘর্ষিক না হয় কিন্তু শারঈভাবে তা গুরুতর হয়, তবে আমাদের প্রতিক্রিয়া হতে হবে সংশোধনমূলক। আর যদি ঘটনাটি শারঈভাবে গুরুতর না হয় কিন্তু আমাদের মনের বাসনার সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে আমাদের উচিত হবে বিষয়টিকে উপেক্ষা করা। এ ক্ষেত্রে অযাচিত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা রাসূল ﷺ এর শিক্ষা নয়। বেদুইনেরা নবিজির চাদর ধরে টানাটানির মতো বেয়াদবি করলেও তাদের কাজটি কুফরির পর্যায়ে যায়নি। কিন্তু ওই লোকটি রাসূল ﷺ এর ইনসাফ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল যা মূলত তাঁর রিসালাতকে নিয়েই প্রশ্ন করা। এজন্য রাসূল ﷺ বেদুইনদের ক্ষেত্রে বিরক্তির মৌখিক প্রকাশেই সীমাবদ্ধ ছিলেন কিন্তু ওই লোকটির কথায় রাগান্বিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন।

নবুওয়াতের ১০ম বছরে রাসূল ﷺ তায়িফে গিয়েছিলেন সেখানকার মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকতে। সেখানে রাসূল ﷺ এর ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয় এবং তাঁকে রক্তাক্ত করে দেওয়া হয়। তায়েফ থেকে ফেরার পথে জিবরীল পাহাড়ের দায়িত্বশীল ফেরেশতা দিয়ে তায়েফবাসীকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিলেন। তখন রাসূল ﷺ নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে বলেছিলেন—

'না, বরং আমার আশা মহান আল্লাহ এদের থেকে এমন বংশধর সৃষ্টি করবেন যারা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে। অন্য কাউকে তাঁর অংশীদার করবে না।'[১২৭]

রাসূল ﷺ এর এই আশা সত্যি হয়েছিল। ৯ম হিজরিতে তায়িফের নেতৃত্বশীল বনু সাকীফ গোত্রের প্রতিনিধিদল ইসলাম গ্রহণ করে। প্রায় ১৩ বছর আগে রাসূল ﷺ এর আত্মনিয়ন্ত্রণের বাস্তব প্রতিফলন ছিল এটি।

এই হাদীস থেকে আমরা রাসূল এর আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল জানতে পারি-

✓ আত্মনিয়ন্ত্রণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলো সবর ও আশাবাদ। একজন আশাবাদী ও ধৈর্যশীল মানুষ অনেক পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে নিতে পারে, যা কোনো হতাশাবাদী মানুষ পারে না।

বনু মুস্তালিক যুদ্ধের পর রাসূল তখনো মুরায়সী ঝর্ণার নিকটে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় কিছু লোক পানি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সেখানে আসে। আগমনকারীদের মধ্যে উমর এর একজন শ্রমিকও ছিল। তার নাম ছিল যাহজা গিফারী। আরেকজন ছিল যার নাম ছিল সিনান ইবনু ওয়াবার জুহানী। কোনো কারণে দুজনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়ে শেষ পর্যন্ত ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যায়। এক পর্যায়ে জুহানী চিৎকার শুরু করে দেয়-"ওহে আনসাররা! সাহায্যের জন্য দ্রুত এগিয়ে এসো!” ওদিকে যাহজাও ডাকতে তাকে- "মুহাজিরদের দল! আমাকে সাহায্য করার জন্য দ্রুত এগিয়ে এসো!” রাসূল * এই খবর পেয়ে সেখানে সাথে সাথে উপস্থিত হলেন এবং বললেন, "আমি তোমাদের মাঝে বিদ্যমান আছি অথচ তোমরা জাহেলি যুগের মতো আচরণ করছ? এসব হচ্ছে দুর্গন্ধযুক্ত (কাজ)। তোমরা এসব ছেড়ে দাও।" [১২৮]

• এই ঘটনার দিকে সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিলে আমরা দেখি: এখানে সাহাবিদের মাঝে দ্বন্দ মেটাতে গিয়ে রাসূল ﷺ কোনো পক্ষকেই কোনো প্রশ্ন করেন নি। তিনি বলেননি- “কে এই কথা বলেছে?”, “কে প্রথমে শুরু করেছে?” কারণ, তিনি জানতেন এসব ক্ষেত্রে তদন্তমূলক প্রশ্ন কেবল বিবাদকেই উস্কে দেয় এবং দুই পক্ষই আপোষের পরিবর্তে আরও মারমুখী হয়ে ওঠে। তাই তিনি এসব নিয়ে আর একটাও কথা না বলে সরাসরি বিষয়টা এখানেই বন্ধ করে দিলেন।

• ঝগড়ায় লিপ্ত উভয় পক্ষকে তিনি স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, এগুলো জাহেলি যুগের কাজ। ইসলামি ভ্রাতৃত্বে এসবের স্থান নেই। যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের বিবাদ শুরু না হয় সেজন্যই তিনি এই স্মরণিকা দিলেন।

এখানে তিনি কোনো পক্ষের সাহাবিদেরকেই ভর্ৎসনা করেননি কিংবা দোষারোপ করেননি। কারণ, এতে অপর পক্ষের প্রতি স্থায়ী ক্ষোভ জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

এই হাদীস থেকে রাসূল ﷺ এর আত্মনিয়ন্ত্রণের কিছু কৌশল শেখা যায় :

✓ আত্মনিয়ন্ত্রণের অন্যতম কৌশল হলো- নির্দিষ্ট ঘটনার মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার সম্ভাব্য ফলাফল চিন্তা করা। নিয়ন্ত্রণহীনতার পরিণতি জানা থাকলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ হয়ে যায়।

✓ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অন্যদের আবেগ ও অনুভূতিকে আঘাত করা সমীচীন নয়। অন্যথায় ক্ষণিকের জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলেও অন্যদের লাগামহীন প্রতিক্রিয়ায় নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে।

✓ ভদ্রতা ও নম্রতার চর্চা করা হলো আত্মনিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায়। ভদ্রতা ও নম্রতা যার স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হবে, তিনি সহজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

• ইফকের ঘটনায় রাসূল ﷺ আয়িশা এর ব্যাপারে অপবাদ শুনে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় তা সামলে নেন। তিনি যেহেতু ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে প্রাথমিক অবস্থায় পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন না, তাই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে তিনি পুরো বিষয়টা সম্পর্কে তিনি সকল পক্ষের মতো শোনেন এবং প্রায় ১ মাস সময় নিয়ে বিবেচনা করেন। অবশেষে ১ মাস পর আল্লাহ ওহী নাযিল করে সত্য উন্মোচন করে দেন। এই ১ মাসে রাসূল ﷺ তাঁর প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর নামে এমন জঘন্য অপবাদ শুনে কীভাবে স্থির ছিলেন তাই অবাক হওয়ার মতো বিষয়।

এখান থেকে আমরা রাসূল ﷺ এর আত্মনিয়ন্ত্রণের কিছু কৌশল জানতে পারি:

✓ যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে উভয় পক্ষের মতামত শুনে যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

✓ কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসার জন্য নিরপেক্ষ ও বিশ্বস্ত উৎস থেকে খোঁজ নিতে হবে।

✓ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার আগে অবশ্যই অভিযুক্ত/সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাথে আলাপ করতে হবে।

✓ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে এমন আচরণ করতে হবে যা ব্যক্তির ভবিষ্যৎ পরিশুদ্ধির জন্য সহায়ক হয়।

৬ষ্ঠ হিজরিতে রাসূল ﷺ সাহাবিদের নিয়ে মক্কায় যাচ্ছিলেন উমরাহ করার জন্য। কুরাইশরা একে নিজেদের আত্ম-সম্মানের বিষয় ভেবে মুসলিমদেরকে মক্কায় প্রবেশ করতে বাধা দেয়। দুই পক্ষের দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর রাসূল ﷺ কুরাইশদের সকল শর্ত মেনে নেন। এসকল শর্তের মধ্যে কিছু শর্ত আপাতভাবে/বাহ্যিকভাবে মুসলিমদের জন্য অবমাননাকর ছিল। কিন্তু রাসূল ﷺ অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা ছিলেন। তাই তিনি এই সকল শর্তের মাঝে লুকিয়ে থাকা মুসলিমদের আপাত বিজয় দেখতে পেয়েছিলেন এবং সাহাবিদের অমতেই কুরাইশদের সাথে চুক্তি করে ফেললেন। ইতিহাসে তা 'হুদাইবিয়ার সন্ধি' নামে খ্যাত।

এখান থেকে আমরা রাসূল ﷺ এর আত্মনিয়ন্ত্রণের যে কৌশল জানতে পারি:

✓ আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্জনের জন্য দূরদৃষ্টি থাকা জরুরি। যেকোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া দেখানো থেকে বেঁচে থাকার জন্য ওই ঘটনাটির ফলাফল ও পরিণতি সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা থাকতে হবে। অন্যথায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কেবলমাত্র আফসোসই বয়ে আনবে।

রাসূল ﷺ কে একদল ইহুদী এসে ঘরের বাহির থেকে সালাম দিল- “আসসামু আলাইকুম।” এর অর্থ 'তোমার মৃত্যু হোক'। রাসূল ﷺ শান্তভাবে জবাব দিলেন- "ওয়া আলাইকুম”, 'তোমাদেরও'। আয়িশা ইহুদীদের ধৃষ্টতা দেখে তাদের নিয়ে কটুকথা বলে ফেললেন। কিন্তু রাসূল ﷺ তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, মুসলিমদেরকে রুক্ষতার জন্য পাঠানো হয়নি। বরং কোমল ও বিনয়ী আচরণের জন্য পাঠানো হয়েছে। [১২৯]

উপরিউক্ত হাদীসগুলো থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অর্জনে রাসূল ﷺ এর শেখানো শিক্ষাগুলোকে একত্র করলে আমরা পাই-

> আমাদের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তি হবে শারঈ মাপকাঠি। যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া প্রকাশের আগে আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে যে, ঘটনাটি শারঈ দিক থেকে কতটা অসঙ্গতিপূর্ণ। যদি আমাদের মনের বাসনার সাথে খুব একটা সাংঘর্ষিক না হয় কিন্তু শারঈভাবে তা গুরুতর হয়, তবে আমাদের প্রতিক্রিয়া হতে হবে সংশোধনমূলক। আর যদি ঘটনাটি শারঈভাবে গুরুতর না হয় কিন্তু আমাদের মনের বাসনার সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে আমাদের উচিত হবে বিষয়টিকে উপেক্ষা করা। এ ক্ষেত্রে অযাচিত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা রাসূল ﷺ এর শিক্ষা নয়।
> আত্মনিয়ন্ত্রণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলো সবর ও আশাবাদ। একজন আশাবাদী ও ধৈর্যশীল মানুষ অনেক পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে নিতে পারে যা কোনো হতাশাবাদী মানুষ পারে না。
> আত্মনিয়ন্ত্রণের অন্যতম কৌশল হলো, নির্দিষ্ট ঘটনার মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার সম্ভাব্য ফলাফল চিন্তা করা। নিয়ন্ত্রণহীনতার পরিণতি জানা থাকলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
> নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অন্যদের আবেগ ও অনুভূতিকে আঘাত করা সমীচীন নয়। অন্যথায় ক্ষণিকের জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলেও অন্যদের লাগামহীন প্রতিক্রিয়ায় নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে।
> ভদ্রতা ও নম্রতার চর্চা করা হলো আত্মনিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায়। ভদ্রতা ও নম্রতা যার স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হবে, তিনি সহজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
> যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে উভয় পক্ষের মতামত শুনে যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
> কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসার জন্য নিরপেক্ষ ও বিশ্বস্ত উৎস থেকে খোঁজ নিতে হবে।
> চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার আগে অবশ্যই অভিযুক্ত/সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাথে আলাপ করতে হবে।
> সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে এমন আচরণ করতে হবে যা ব্যক্তির ভবিষ্যৎ পরিশুদ্ধির জন্য সহায়ক হয়।
> আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্জনের জন্য দূরদৃষ্টি থাকা জরুরি। যেকোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া দেখানো থেকে বেঁচে থাকার জন্য ওই ঘটনাটির ফলাফল ও পরিণতি সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা থাকতে হবে। অন্যথায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কেবলমাত্র আফসোসই বয়ে আনবে।
> মানুষের অহেতুক নেতিবাচক মন্তব্যকে উপেক্ষা করা আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

টিকাঃ
[১২৪] সহিহুল বুখারি: ৬১১৪
[১২৫] আলইসাবাহ: ৫/১৪৫
[১২৬] সহিহুল বুখারি: ৩১৫০, ৪৩৩৫; সহিহ মুসলিম: ১০৬৩
[১২৭] সহিহুল বুখারি : ২৮২১
[১২৮] সহিহুল বুখারি: ৪৯০৭
[১২৯] সহিহুল বুখারি: ৬৪০১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00