📄 ইতিবাচকতা (Positivity)
ইতিবাচকতা কোনো জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়; বরং মানুষ তা প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্জন করতে পারে। ইতিবাচকতার আরেক নাম হলো, Content Reframing অর্থাৎ যেকোনো নেতিবাচক বিষয় বা ঘটনাকে নতুন একটি ফ্রেমের মাধ্যমে দেখা。
ইতিবাচকতা অর্জনের কোনো ধরাবাঁধা সূত্র কিংবা অনুশীলন নেই। এজন্যই তা একদিনে অর্জন করা যায় না। সার্বক্ষণিক মনের মাঝে ইতিবাচক চিন্তা করার জ্বলন্ত প্রয়াসকে উজ্জীবিত রাখা এবং সময়মতো সেই ইচ্ছাকে ব্যবহার করাই হলো এটি অর্জনের মূল উপায়। রাসূল ﷺ সাহাবিদের প্রতি অনেক বেশি সহমর্মী ছিলেন এবং একইসাথে সব সময় তাঁদের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। নিচের ঘটনা থেকে তার একটা ধারণা পাওয়া যায়:
রাসূল-এর ছোট নাতি হুসাইন-এর মুখে জড়তা ছিল। কথা বলতে গেলে বাক্য ঠিকভাবে শেষ করতে পারতেন না। যখন তাঁর বয়স পাঁচ-ছয় বছর, একদিন মজলিসে তিনি তাঁর নানাজানকে কী যেন বলতে চাচ্ছিলেন। এ অবস্থায় তিনি যখন কথা বলতে শুরু করলেন, তাঁর মুখের জড়তার কারণে কোনো বাক্যই শেষ করতে পারছিলেন না। আশেপাশে যারা ছিল, তারা অবজ্ঞা নয়, বরং স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের চেহারার দিকে দৃষ্টি বিনিময় করছিলেন। কিন্তু রাসূল খুব মনোযোগের সাথে, ধৈর্য ধরে, প্রাণপ্রিয় নাতির কথা শুনছিলেন। হুসাইন -এর কথা শেষ হওয়ার পরে তিনি মানুষের মনোভাব কিছুটা বুঝতে পারছিলেন। সাথে সাথে নাতির মানসিক অবস্থাও তিনি উপলব্ধি করতে পারছিলেন। তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "আমার এ নাতি তার চাচা মূসার উত্তরাধিকারী।"[৭২]
মূসা -এর মুখের ভাষায়ও জড়তা ছিল। এভাবে রাসূল পুরো সিচুয়েশনটাকে পজিটিভ চিন্তার দিকে নিয়ে যান। নাতিকে মানসিক শক্তি দেন, সাথে সাথে উপস্থিত সবার মনের মধ্যে একটা পজিটিভ ধারণা দাঁড় করিয়ে দেন। এভাবে প্রাত্যহিক জীবনের প্রায় সব জিনিসের মধ্যেই আমরা ইতিবাচকতার চর্চা করতে পারি। একজন ইতিবাচক মানুষের চিন্তার কিছু নমুনা আমরা দেখি:
গতানুগতিক চিন্তা
* সে ইচ্ছা করেই আমার ফোনটা ধরল না।
* আগেই জানতাম, আমার ফোন সে কখনোই ধরবে না।
* চারপাশে সবাই শুধু আমার ভুল ধরে।
* বস আমাকে দেখতেই পারে না।
* এত বড় অফিসার আমি; অথচ সামান্য বাসের হেল্পার আমার সাথে এমন আচরণ করে! কত বড় সাহস!
* বাবা-মা আমাকে বোঝে না। আমি নিজের মতো কিছু করতে চাইলেই বাগড়া দেয়।
ইতিবাচক চিন্তা
* সে হয়তো কোনো কাজে ব্যস্ত আছে, তাই ফোনটা ধরতে পারেনি।
* আমার ভুল হয়েছে বলেই তাদের চোখে ধরা পড়েছে। এতে ভুল সংশোধন করা আমার জন্য সহজ হলো।
* বস মাঝে মাঝে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন, তবে ভালো কাজ করলে প্রশংসাও করেন।
* সারাদিন এত এত লোকের ভাড়া নিতে গিয়ে তার মাথা গরম হয়ে আছে। আমি তো তার চেয়ে ভালো আছি।
* বাবা-মা আমার ভালো চায় বলেই এমনটা করে। তাদের সাথে খোলামনে আলাপ করে বোঝাতে পারলেই বিষয়টার সমাধান করা সম্ভব।
টিকাঃ
[৭২] তাফসীরে রুহুল মা'আনি: খ. ৮, পৃ. ৪৯৭
📄 উন্নত মানসিকতা (Growth mindset)
যারা মনে করেন যে, কঠোর পরিশ্রম, সঠিক কৌশল এবং আশেপাশের মানুষের কাছ থেকে শিখে নিজেদের কর্মদক্ষতাকে আরও বাড়ানো সম্ভব, তারাই মূলত উন্নত মানসিকতার অধিকারী। অপরদিকে যারা মনে করেন, দক্ষতা জন্মগত বিষয়, একে বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ নেই—তাদের এই মানসিকতাকে বলা হয় Fixed mindset বা আবদ্ধ মানসিকতা। তারা সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন। গ্রোথ মাইন্ডসেটের অধিকারী মানুষদের মূল লক্ষ্য থাকে সর্বদাই নতুন কিছু শেখা। তারা তাদের শ্রম ও সময় শেখার পেছনে ব্যয় করেন। বাহ্যিকভাবে তাদেরকে কেমন দেখাচ্ছে, তা নিয়ে বিশেষ মাথাব্যথা থাকে না।
কর্মচারীদের মতে, যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে গ্রোথ মাইন্ডসেট বিষয়টির প্রচলন হয়ে যায়, তখন তারা কাজে অনেক বেশি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ অনুভব করেন। যেকোনো সমস্যা সমাধানে বা প্রতিষ্ঠানের কোনো নতুন আইডিয়া বাস্তবায়নে তারা অনেক বেশি সহায়তা পান। অথচ, কূপমণ্ডুক মানুষ দ্বারা পরিবেষ্টিত কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গেলে কর্মচারীদের মুখোমুখি হতে হয় হাজার রকমের বিব্রতকর পরিস্থিতির। কর্মচারীদের মাঝে প্রতারণা, ধোঁকাবাজির মতো ঘটনা যেন তাদের রোজকার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাই কর্মক্ষেত্রে গ্রোথ মাইন্ডসেটের গুরুত্ব ও ভূমিকা অনেক।
ইসলামি আকীদা অনুসারে, সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। আবার আল্লাহর পক্ষ থেকে আসবে—এই ভেবে বেকার বসে থাকাও ইসলামি শিক্ষা পরিপন্থি। আল্লাহর ওপর যথাযথ ভরসা করে নিজ কাজে এগিয়ে যাওয়া রাসূল ﷺ-এর শিক্ষা। এক হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন,
"তোমরা যদি আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করার মতো ভরসা করতে, তাহলে তিনি তোমাদেরকে ওইরূপ রিযিক দিতেন, যেমনভাবে পাখিদেরকে দিয়ে থাকেন। পাখিগুলো সকালবেলা বাসা থেকে খালি পেটে বের হয় এবং বিকেলে পেট পূর্ণ করে ফিরে আসে।”[৭৩]
পাখিরা আল্লাহর ওপর ভরসা করে বাসায় বসে থাকে না। বরং তারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। এটাও প্রাণীদের মধ্যে গ্রোথ মাইন্ডসেটের একটা উদাহরণ।
আবার রাসূল ﷺ প্রতিনিয়ত সাহাবিদের ঈমান, আমল ও আখলাক উন্নত করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এসবকিছুই গ্রোথ মাইন্ডসেটের আওতায় পড়বে। আপনি চিন্তা করুন, কোন টেইনিংয়ের ফলে উমরের মতো একজন রাখাল অর্ধপৃথিবী শাসনের উপযুক্ত হয়ে গেলেন?
উন্নত মানসিকতা ও আবদ্ধ মানসিকতার মৌলিক পার্থক্যগুলো হলো:
**আবদ্ধ মানসিকতা**
* দক্ষ হওয়ার বিষয়টি জন্মগত।
* চেষ্টার কোনো মূল্য নেই, জন্মগত প্রতিভাই সব।
* নিজেকে ঝুঁকির মাঝে ফেলার কোনো মানে হয় না। ঝুঁকি নেওয়া মানে ব্যর্থতাকে নিজের জন্যে অবধারিত করে ফেলা।
* ব্যর্থ হওয়া মানেই হলো আপনাকে দিয়ে ক্রিয়েটিভ কিছু সম্ভব নয়।
* অন্যের ফিডব্যাক নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছু নেই। বরং এটা নিজের জন্যে একপ্রকার হুমকি।
**উন্নত মানসিকতা**
* দক্ষ হতে হলে কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন।
* আল্লাহর ওপর ভরসা করে চেষ্টা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
* নিজেকে সমৃদ্ধ করতে চাইলে ঝুঁকি নেওয়ার বিকল্প নেই।
* ব্যর্থতা মানে নতুন কিছু শেখার প্রথম ধাপ।
* অন্যের ফিডব্যাক আপনাকে আরও দক্ষ হয়ে উঠতে সাহায্য করে।
**উন্নত মানসিকতা গড়ে তুলব কীভাবে?**
১. নিজের ও অন্যের অসম্পূর্ণতাগুলো সম্পর্কে জানুন এবং এগুলো মেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন। নিজের কোনো অসম্পূর্ণতার কারণে হীনম্মন্যতায় ভোগা উচিত নয়। বরং বিষয়টা এভাবে ভাবা উচিত যে, "আমার মাঝে এই দুই-একটি বিষয়ে অসম্পূর্ণতা থাকলেও আরও অনেক দক্ষতা রয়েছে, যা হয়তো অন্যদের নেই।” তা ছাড়া সকল মানুষকে আল্লাহ তাআলা একরকম যোগ্যতা দিয়ে তৈরি করেন না। এটিও আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। তিনি দেখতে চান-কে অক্ষমতা নিয়ে সবর করে, আর কে দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর নিয়ামতের হক আদায় করে।
২. নিজের সমস্যাগুলো সাহসিকতার সাথে মোকাবিলা করতে শিখুন। যদি দেখেন, কোনো ভয়াবহ বিপদের মুখোমুখি এসে আপনি আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন, তবে পুরো পরিস্থিতিকে আপনার মাথায় নতুন করে ঢেলে সাজান। বিপদের এই মুহূর্তটিকে সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করুন। দৃষ্টিভঙ্গিকে এভাবে সামান্য পরিবর্তন করে নেওয়ার মাধ্যমে আপনি নিজেকে যেকোনো পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করাতে পারবেন।
৩. নিজের কথা ও কাজের দিকে লক্ষ রাখুন। আপনি কী বলছেন, এমনকি কী ভাবছেন—সেটাও লক্ষ করুন। আপনার কথাবার্তা যদি কর্কশ বা আঘাত করার মতো হয়, তবে তার ফলাফলও সেরকমই হবে। এমনকি কর্কশতা থেকে আল্লাহও তাঁর রাসূল -কে সতর্ক করেছেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ )
“অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণে তুমি তাদের জন্য নম্র হয়েছিলে। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের, কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা করো এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করো। অতঃপর যখন সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালোবাসেন।”[৭৪]
উন্নত মানসিকতা গড়ে তুলতে চাইলে মনের নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে আরও ভালো কোনো চিন্তা দিয়ে স্থানান্তরিত করুন। কারও সম্পর্কে হুট করে নেতিবাচক সিদ্ধান্তে না গিয়ে বরং তার ভালো দিকগুলো নিয়ে চিন্তা করুন। ঘৃণার বদলে ভালোবাসুন। আপনি যদি নিজের নৈতিক অবস্থান সম্পর্কে নেতিবাচক বা অপমানজনক ধারণা পোষণ করে থাকেন, তবে আপনার সিদ্ধান্তেও এর বহিঃপ্রকাশ ঘটবে।
৪. অন্যের স্বীকৃতির আশায় থাকা বন্ধ করুন। উন্নত মানসিকতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মানুষের স্বীকৃতি বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারে। অন্যকে নয়, সর্বদা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করুন। এতে আপনি নিজেও আত্ম-তুষ্টি পাবেন। আর মানুষকে সন্তুষ্ট করার আশায় দৌড়ালে শুধু হতাশই হতে হবে।
৫. স্বকীয়তাকে আরেকটু গভীরভাবে উপলব্ধি করুন। আপনি যা নন—তা হওয়ার ভান করার অর্থ হলো মূলত নিজেই নিজেকে অপমান করা। এ ধরনের চেষ্টা মানুষকে কৃত্রিম করে তোলে। এটি আপনার ব্যক্তিত্বকে ধ্বংস করে দেবে। নিজের সমস্ত অকত্রিমতাকে ঝেড়ে ফেলতে সময় ও অনেক বেশি আত্মোপলব্ধির প্রয়োজন। আপনি যখন এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবেন এবং নিজের প্রকৃত সত্তাকে মূল্যায়ন করা শিখবেন, তখন লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ আপনার কাছে আয়নার মতো স্বচ্ছ মনে হবে। উন্নত মেজাজ গড়ে তোলার জন্য এই বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
৬. নিজের দক্ষতাগুলো খুঁজে বের করুন, তার সঠিক মূল্যায়ন করুন। দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে থাকুন। এই প্রচেষ্টাগুলো আপনাকে উন্নত মানসিকতা- সম্পন্ন মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করবে।
৭. আপনাকে ঘিরে চলতে থাকা সমালোচনা-পর্যালোচনাকে উপহার হিসেবে গ্রহণ করুন। আপনি যা করছেন—তা আপনার চেয়ে আপনার আশেপাশের অন্যান্য ব্যক্তিরা ভালোভাবে পর্যালোচনা করতে পারবে। কেননা একেক জনের দৃষ্টিভঙ্গি একেক রকম। ভিন্নভাবে চিন্তা করতে পারার কারণে তারা হয়তো আপনার কাজের কৌশলে উপকারী কিছু পরামর্শ যোগ করতে পারবে। এ কারণে, যেকোনো পরামর্শ খোলামনে গ্রহণ করুন। এতে করে আপনি সহজেই নিজের মাঝে উন্নত মেজাজ তৈরি করতে পারবেন।
৮. ফলাফলের চেয়ে কাজের প্রক্রিয়াকে বেশি মূল্যায়ন দিন। মনে রাখবেন, কোনো কাজ সফল করার পেছনে আপনার প্রচেষ্টাটুকুই বড় বিষয়, সবক্ষেত্রে সফল হওয়াটা মূল নয়।
৯. অন্যের ভুল থেকে শিক্ষাগ্রহণ করুন। আপনি যদি অন্যদের ভুল থেকে শিখতে পারেন, তবে নিজের ক্ষেত্রে হয়তো ভুল কিছুটা কম হবে। নতুন কিছু করার সময় আপনার ভয়ের মাত্রাও তখন অনেকাংশে কমে যাবে। একে উন্নত মানসিকতা গড়ে তোলার মূল চাবিকাঠি বললেও ভুল হবে না।
১০. এখনই সফল হতে না পারাতে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। মনে রাখবেন, কেউই শুরুতেই সব বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে না। তবে আপনি যদি লেগে থাকেন, তবে সময় ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজের মাঝে অনেক উন্নতি আনতে পারবেন।
১১. কাজে ঝুঁকিগ্রহণ করুন। এ কাজে যদি আপনি নতুন হয়ে থাকেন, তবে খুব বেশি সফলতা আশা করবেন না। বাকিদের সামনে কোনো ভুল হয়ে গেলে, তা সহজভাবে মেনে নিন। যখন আপনি শিখছেন, তখন ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক। তা ছাড়া, অন্যদের সামনে ভুল করতে করতেই একসময় আপনি এ বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠবেন।
১২. বাস্তববাদী হোন। এর জন্যে সময়ের প্রয়োজন। কখনো কখনো কোনো নতুন কিছু শিখতে, নতুন কোনো দক্ষতা অর্জন করতে অনেক বেশি সময় লেগে যেতে পারে। এই বিষয়টি মেনে নিলে আপনার জন্যে কাজ করা সহজ হয়ে উঠবে। নতুন কিছু শিখতে কিংবা প্রথমবারের মতো কোনো কাজ করতে হলে, সাময়িক ব্যর্থতা যেন আপনাকে দমিয়ে রাখতে না পারে।
১৩. কোনো কাজ দ্রুত শেষ করতে পারাটাই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। উন্নত মানসিকতার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, ফলাফলকেই সফলতা নির্ণয়ের একমাত্র মাপকাঠি মনে না করা। আপনি আপনার সমস্ত শ্রম, প্রচেষ্টা দিয়ে যাবেন। কত সময় লাগছে—সেটা বড় বিষয় নয়। বরং, আপনি যেহেতু আপনার পূর্ণ প্রচেষ্টা এ কাজের পেছনে দিয়ে যাচ্ছেন, সেহেতু আশাতীত কোনো ফলাফল পেয়ে যেতেই পারেন। না পেলেও সমস্যা নেই। আপনি বরং নিজের কাছে সৎ থাকলেন। কারণ, আপনি সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকুই করেছেন।
১৪. সর্বদা শেখার মেজাজে থাকুন। প্রতিটি ছোট-বড় অভিজ্ঞতা থেকে শিখুন। যেকোনো নেতিবাচক পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার পর প্রয়োজনে নোটবুকে লিখে রাখুন—এখান থেকে কী কী শিখলেন। কর্মক্ষেত্রে কিংবা ব্যবসার প্রতিটি খুঁটিনাটি থেকে শেখার চেষ্টা করুন। শিখুন অভিজ্ঞতা থেকে, অন্যের থেকে, বই থেকে ও নেট দুনিয়া থেকে।
সময়ের সাথে চলমান স্কিলগুলো জানা ও শেখার চেষ্টা করুন। এমন নয় যে, সব বিষয়েই আপনাকে মাস্টার হতে হবে। আপনি মাস্টার হবেন আপনার কাজের ক্ষেত্রেই, কিন্তু কাজের সাথে জড়িত পরোক্ষ অন্যান্য বিষয়েও আপনার জ্ঞান থাকতে হবে। জানাশোনার পরিধি যত বাড়বে, নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতাও তত বাড়বে।
সংক্ষেপে এগুলোই হলো উঁচু মানসিকতা গড়ে তোলার প্রধান হাতিয়ার।
**নবি-রাসূল এবং সাহাবিদের জীবনে উন্নত মানসিকতা**
উন্নত মানসিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এটি পুকুর কিংবা ডোবার মতো স্থির নয়; বরং উত্তাল সমুদ্রের মতো সদা বহমান। এরকম মানুষজন নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বেঁধে রাখে না। বরং নিজেকে মেলে ধরা এবং বিকশিত করার জন্য যা যা করণীয়—সবই করে। যেমন ধরুন, সূরা আল-কাহফে মুসা এবং খাযির-এর জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আমরা দেখতে পাই। মূসা সেই সময়কার আল্লাহর প্রেরিত নবি হওয়ার সুবাদে তাঁর মধ্যে এই ধারণা জন্মে যে, তিনি এই পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে জানান যে, প্রত্যেক জ্ঞানীর ওপর জ্ঞানী আছে। মূসা যখন তাঁর চেয়ে জ্ঞানী পিযির সম্পর্কে জানতে পারেন, তখন তিনি তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান আহরণের জন্য ব্যাকুল হয়ে যান। তাঁকে রাজি করিয়ে তাঁর সফরসঙ্গী হন। এতে মূসা-এর উচ্চ মনোবলের পরিচয় পাওয়া যায়।
অপরদিকে সাহাবিদেরকে রাসূল উচ্চ মনোবলের প্রশিক্ষণ দিতেন। আবু হুরায়রা জ্ঞান অর্জনের জন্য মসজিদে নববির বারান্দায় পড়ে থাকতেন। কিছু সাহাবিকে রাসূল বিদেশি যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষার জন্য দূরদেশে পাঠান। রাসূল নিজেও সালমান ফারিসি-এর পারস্য যুদ্ধকৌশলের কদর করেন এবং আহযাবের যুদ্ধে সেটা কার্যকর করেন। এসবই বিচক্ষণতার চমৎকার উদাহরণ।
টিকাঃ
[৭৩] তিরমিযী: ২৩৪৪, সহিহ
[৭৪] সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫৯
📄 সকল ঝঞ্ঝা কাটিয়ে ওঠা (Stress Management)
বর্তমানে সমগ্র দুনিয়াজুড়ে যে কয়টা সমস্যা মানুষকে ভয়াবহ বিপদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোর একটা হলো ধকল। বলা যেতে পারে অনিয়ন্ত্রিত ধকল। তাই ধকল কাটানোর নানাবিধ তত্ত্ব দিন দিন উদ্ভাবিত হচ্ছে এবং হবে। তবে মুসলিম হিসেবে আমাদের সৌভাগ্য বলতেই হবে। কারণ, মানসিক চাপ সামলিয়ে ওঠার বেশ কিছু টিপস আমাদের নবিজি আমাদেরকে দিয়ে গিয়েছেন। আমরা যদি সেগুলো যত্নের সাথে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে আল্লাহর অনুগ্রহে কোনো স্ট্রেস আমাদেরকে কাবু করতে পারবে না। আর এতকিছুর পরেও যদি প্রয়োজন হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতেও সমস্যা নেই। কারণ, চিকিৎসা নেওয়াও নবিজির শিক্ষা।
একজন মুসলিম হিসেবে আমরা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখার সাথে সাথে রুহের দেখভালের গুরুত্বও অস্বীকার করতে পারি না। ধকল কাটানোর সমকালীন তত্ত্বগুলো শুধুমাত্র শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে করণীয়গুলো বাতলে দেয়। আর ইসলাম শারীরিক ও মানসিকের পাশাপাশি আত্মিক বা আধ্যাত্মিক দিক থেকে করণীয়গুলোও বলে দেয়। অর্থাৎ ধকল কাটানোর সার্বিক শিক্ষা ইসলামের মধ্যেই রয়েছে।
একবার আল্লাহর রাসূল সাদ বিন উবাদার অসুস্থতার কথা জানতে পেয়ে তাঁকে দেখতে গেলেন। রাসূল -এর সাথে আবদুর রহমান বিন আউফ, সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস এবং আবদুল্লাহ বিন মাসউদ ছিলেন। আল্লাহর রাসূল কাঁদতে শুরু করলেন। এই দৃশ্য দেখে সাহাবিগণের চোখ থেকেও পানি পড়তে শুরু করল। রাসূল বললেন,
أَلا تَسْمَعُونَ إِنَّ اللَّهَ لَا يُعَذِّبُ بِدَمْعِ العَيْنِ، وَلَا بِحُزْنِ القَلْبِ، وَلَكِنْ يُعَذِّبُ بِهَذَا وَأَشَارَ إِلَى لِسَانِهِ أَوْ يَرْحَمُ
"তোমরা কি শোনোনি যে, আল্লাহ তাআলা চোখের অশ্রু এবং অন্তরের দুঃখের কারণে শাস্তি দেন না?" এরপর তিনি নিজের জিভের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, "কিন্তু তিনি এটার কারণে শাস্তি দেন অথবা দয়া করেন।”[৭৫]
কাজেই, সঠিক আকীদা ও দৃঢ় ঈমান আমাদের মানসিক চাপ সামলানোর ব্যাপারে অমূল্য সম্পদ হিসেবে কাজ করতে পারে।
টিকাঃ
[৭৫] সহিহুল বুখারি: ১৩০৪; সহিহ মুসলিম: ৯২৪
📄 সকল কঠিনোর ইসলামি নির্দেশনা
আল্লাহ ও তাকদিরের ওপর ঈমান
নিজ রবের প্রতি বিশ্বাসী ব্যক্তি খুব ভালোভাবেই জানে—দুনিয়ার জীবন পরীক্ষা ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, আল্লাহ তাআলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন,
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَ الثَّمَرَتِ وَبَشِّرِ الصَّبِرِينَ
"আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। তবে, তুমি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দাও।"[৭৬]
অর্থাৎ জাগতিক সকল বিপদাপদের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হবে—এগুলো আল্লাহর তরফ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ, অথবা আমাদের পাপের শাস্তি ও সংশোধনের বার্তা। আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ সবকিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। এই বিষয়টি একজন মুমিন ব্যক্তির জন্যে একধরনের নিয়ামত-স্বরূপ। আমরা কেবল নিজেদের প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি!
আল্লাহ আরও বলেন,
وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يُرِدُكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
"আল্লাহ যদি তোমাকে কষ্ট দিতে চান, তাহলে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই, আর আল্লাহ যদি তোমার কল্যাণ করতে চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে চান অনুগ্রহ দিয়ে ধন্য করেন। তিনি বড়ই ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু।"[৭৭]
তাই দুনিয়ার জীবন ও দুনিয়াবি বিপদাপদের ব্যাপারে সঠিক জীবনদর্শনই হতে পারে ধকল কাটানোর প্রথম ও প্রধান হাতিয়ার。
• আল্লাহর নিয়ামত উপলব্ধি এবং এর জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ
"যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য (আমার নিয়ামত) বৃদ্ধি করে দেবো...।"[৭৮]
ইতিবাচক সবকিছুর শুরুটা হয় একটি কৃতজ্ঞ অন্তর আর পজিটিভ মস্তিষ্ক থেকে। বারবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার বিষয়টি আমাদের মনকে হালকা রাখে, মনের চাপ দূর করে। এই কৃতজ্ঞতা শুধু আল্লাহর প্রতি নয়; বরং আমাদের প্রতি মানুষের সাহায্য ও অনুগ্রহের জন্যও আমাদেরকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। রাসূল বলেছেন, “যে ব্যক্তি মানুষের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ নয়।” রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ، صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
“মুমিনের ব্যাপারগুলো ভারি অদ্ভুত। সমস্ত কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ব্যতীত অন্য কারও জন্য এ কল্যাণ লাভের ব্যবস্থা নেই। সে আনন্দ লাভ করলে শোকরিয়া জ্ঞাপন করে, তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আবার দুঃখকষ্টে আক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ করে, এটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।”[৭৯]
তুলনা করার মানসিকতা খুব সহজে মানুষের ইতিবাচক মনোভাবকে ধ্বংস করে দেয়। নিজের জীবন, ধনসম্পদ, সন্তান, জীবনসঙ্গী, বন্ধু-বান্ধব, সফলতা, শিক্ষা-সবকিছুতেই আমাদের তুলনা করার মানসিকতা!
আল্লাহর রাসূল বলেন,
انْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ أَسْفَلَ مِنْكُمْ، وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ، فَإِنَّهُ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللهِ
“তোমরা পার্থিব ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে কম সমৃদ্ধশালী লোকেদের প্রতি দৃষ্টি দাও এবং তোমাদের চেয়ে অধিক সমৃদ্ধিশালী লোকেদের প্রতি তাকিয়ো না। তাহলে তোমাদেরকে দেওয়া আল্লাহর নিয়ামত তোমাদের নিকট তুচ্ছ মনে হবে।”
• আল্লাহর ফয়সালার ব্যাপারে আশা ও ভালো ধারণা পোষণ
জাবির বিন আবদুল্লাহ কর্তৃক বর্ণিত, 'আমি রাসূল -কে তাঁর মৃত্যুর তিনদিন আগেও বলতে শুনেছি,
لَا يَمُوتَنَّ أَحَدُكُمْ إِلَّا وَهُوَ يُحْسِنُ الظَّنَّ بِاللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
“তোমরা আল্লাহর সম্পর্কে সুধারণা না নিয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না।”
আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন,
أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي
আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমি আমার বান্দার কাছে ঠিক তেমন, যেমনটা সে আমাকে মনে করে।' অর্থাৎ, সে আমার কাছে যা পাওয়ার আশা রাখে, আমি তাকে তা দেওয়ার ক্ষমতা রাখি。
আপনার ওপর যে বিপদই আসুক না কেন, তার কারণে আপনার ভেতরে মানসিক চাপের সৃষ্টি হবে। মনে রাখবেন, আল্লাহ হয় আপনাকে শক্ত বানাচ্ছেন, নতুবা তিনি চাচ্ছেন এই বিপদের মাধ্যমে আপনার গুনাহগুলো মাফ হয়ে যাক। আর মুমিন হিসেবে আপনার অবস্থান আরও উন্নীত হোক। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ .
“আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের ভার দেন না। সে তা-ই পায়, যা সে উপার্জন করে এবং তা-ই তার ওপর বর্তায়, যা সে করে।"[৮২]
আপনার আশেপাশের সবকিছু যখন তছনছ হয়ে যেতে থাকবে, তখন শুধু মনে রাখবেন, কল্যাণের আশাই পারে আপনাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে। আমরা আল্লাহ সম্পর্কে যেমনটা ধারণা রাখি, আল্লাহ তেমনভাবেই আমাদেরকে অনুগ্রহ করবেন। কাজেই, কল্যাণের সর্বোচ্চ ধারণা রাখুন। আল্লাহই সব পূরণ করে দেবেন। দৃঢ় বিশ্বাস আপনার ইচ্ছাশক্তির জন্যে এক শক্তিশালী বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
قُلْ يَعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ .
"হে আমার বান্দাগণ, তোমরা যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছো, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হোয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"[৮৩]
ভালো ধারণা পোষণ আমাদের অন্তরে কেবল আমাদের রব সম্পর্কেই ইতিবাচক ধারণার জন্ম দেয়—তা নয়; বরং আমাদের আশেপাশের মানুষদের ব্যাপারেও এ চিন্তা করার অবকাশ এনে দেয়।
আল্লাহ চান, আমরা ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রিত উম্মত হই। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ :
"ভালো কাজ এবং মন্দ কাজ সমান হতে পারে না। মন্দকে প্রতিহত করো উৎকৃষ্ট দ্বারা। ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতন।"[৮৪]
কুরআন আমাদেরকে শেখায় মন্দকে ভালো দিয়ে প্রতিহত করার মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে। মন্দকে মন্দ দিয়ে প্রতিহত করা আল্লাহর আদেশ নয়, ইসলামের শিক্ষাও নয়。
- দুআর সাহায্য নিন
একজন মুমিনের জন্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো দুআ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ يَسُرُّهُ أَنْ يَسْتَجِيبَ اللهُ لَهُ عِنْدَ الشَّدَائِدِ وَالكَرْبِ فَلْيُكْثِرِ الدُّعَاءَ فِي الرَّخَاءِ
“কেউ যদি চায় যে, বিপদ-আপদ ও দুঃখের সময়ে আল্লাহ তার দুআ কবুল করবেন, তবে যেন সে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় বেশি করে দুআ করে।”[৮৬]
নিচে কিছু দুআর তালিকা দেওয়া হলো, যেগুলো বিপদাপদ, দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা, নেতিবাচকতা ও মানসিক চাপের মুহূর্তগুলোর জন্যে অত্যন্ত উপকারী।
এখানে বিশুদ্ধ হাদীস থেকে প্রাপ্ত কয়েকটি দুআ দেওয়া হলো—যেগুলো ধকল চলাকালীন সময়ে রাসূল আমাদেরকে পড়তে বলেছেন।
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبِّ السَّمَوَاتِ وَرَبُّ الْأَرْضِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ
অর্থ : আল্লাহ, যিনি আল আযিম ও আল হালিম, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। মহান আরশের রব আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আসমান, জমিন ও সম্মানিত আরশের রব আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।
اللَّهُمَّ رَحْمَتَكَ أَرْجُو فَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ، وَأَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ
হে আল্লাহ! আমি আপনার রহমতের প্রত্যাশী। আমাকে এক পলকের জন্যও আমার দায়িত্বে ছেড়ে দেবেন না। এবং আমার সকল অবস্থা সংশোধন করে দিন। আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনি মহা পবিত্র এবং আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম।[৮৯]
اللهُ اللهُ رَبِّي لَا أُشْرِكْ بِهِ شَيْئًا
আল্লাহ, আল্লাহ আমার রব, আমি তাঁর সাথে কিছুই শরিক করি না।[৯০]
• নামাজের দিকে ফিরে আসুন
বিপদ ও চাপের মুখে নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلُوةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَشِعِينَ
“আর তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই তা বিনয়ী ছাড়া অন্যদের ওপর কঠিন...।” [৯১]
বিপদে পড়ার পর অধিকাংশ মানুষ আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যায়, অনর্থক হা- হুতাশ করে। এই বিচ্ছিন্নতা মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে হতাশার অতল গহ্বরে তলিয়ে দিতে পারে। বিপদের সময়গুলোতে নামাজ পড়তে ইচ্ছা না করলেও নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ুন। হাদীসে এসেছে, যখনই কোনো কারণে রাসূল কষ্ট পেতেন, তিনি নামাজ পড়তেন。
যদি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আপনি মানসিক চাপ অনুভব করেন, তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইস্তিখারার নামাজ পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। যে স্থানগুলোতে গেলে আল্লাহর কথা বেশি স্মরণ হয়, সেসব জায়গায় যাওয়ার অভ্যাস করুন। এ ক্ষেত্রে মসজিদে বেশি বেশি অবস্থানের অভ্যাস করতে পারেন। সেখানে দেখবেন, কেউ কেউ আল্লাহর ইবাদত করছে, তাঁর কাছে কান্নাকাটি করে দুআ করছে, ইমামের খুতবা শুনছে। এই দৃশ্যগুলো স্রষ্টার সাথে আপনার সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে ইনশাআল্লাহ।
রাসূল -এর ওপর দরুদ পাঠ
উবাই ইবনু কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, 'আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি (আমার দুআতে) আপনার ওপর দরুদ বেশি পড়ি। অতএব আমি আপনার প্রতি দরুদ পড়ার জন্য (দুআর) কতটা সময় নির্দিষ্ট করব?” তিনি বললেন, “তুমি যতটা ইচ্ছা করো." আমি বললাম, "এক চতুর্থাংশ?” তিনি বললেন, "যতটা চাও। যদি তুমি বেশি করো, তবে তা তোমার জন্য উত্তম হবে।" আমি বললাম, "অর্ধেক (সময়)?” তিনি বললেন, "তুমি যা চাও; যদি বেশি করো, তাহলে তা ভালো হবে।” আমি বললাম, "দুই তৃতীয়াংশ?” তিনি বললেন, "তুমি যা চাও (তা-ই করো)। যদি বেশি করো, তবে তা তোমার জন্য উত্তম।" আমি বললাম, "আমি আমার (দুআর) সম্পূর্ণ সময় দরুদের জন্য নির্দিষ্ট করব!” তিনি বললেন, "তাহলে তো (এ কাজ) তোমার দুশ্চিন্তা (দূর করার) জন্য যথেষ্ট হবে এবং তোমার পাপকে মোচন করা হবে।" [৯২] এজন্য দুশ্চিন্তার মুহূর্তে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে হবে। ইনশাআল্লাহ এতে মানসিক চাপ থেকে আমরা রক্ষা পাব。
• ইস্তিগফার ও আল্লাহর স্মরণ বাড়িয়ে দিন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّهُ لَيْغَانُ عَلَى قَلْبِي، وَإِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللهَ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ
'আমার অন্তর আল্লাহর স্মরণ থেকে অনেক সময় বাধাপ্রাপ্ত হয়। এ কারণে আমি দিনে একশ বার আল্লাহর নিকট ক্ষমা ভিক্ষা চাই। [৯৩]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন,
مَنْ لَزِمَ الِاسْتِغْفَارَ ، جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا، وَمِنْ كُلِّ هَمْ فَرَجًا، وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
'যে ব্যক্তি সব সময় গুনাহের জন্যে মাফ চাইতে থাকে (আস্তাগফিরুল্লাহ পড়তে থাকে), আল্লাহ তাকে প্রতিটি সংকীর্ণতা অথবা কষ্টকর অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দেন, প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে তাকে মুক্ত করেন এবং তিনি তাকে এমনসব উৎস থেকে রিযিক দেন-যা সে কল্পনাও করতে পারে না।'
সুবহানাল্লাহ! তাই আমাদেরকে বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফারের মধ্যে থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ إِلَّا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
"যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তর প্রশান্ত হয়।[৯৪]
তবে এই অন্তরের শান্তি পাওয়ার পূর্বশর্ত হলো—আল্লাহর প্রতি ঈমান, যা আল্লাহ এই আয়াতের শুরুতেই বলে দিয়েছেন。
অতিরিক্ত পার্থিব ভাবনা থেকে সরে আসুন
অতিরিক্ত দুনিয়াবি চিন্তায় মগ্ন হয়ে থাকার কুফল সম্পর্কে রাসূল ﷺ বলেন,
مَنْ كَانَتِ الدُّنْيَا هَمَّهُ، فَرَّقَ اللهُ عَلَيْهِ أَمْرَهُ، وَجَعَلَ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ، وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا مَا كُتِبَ لَهُ، وَمَنْ كَانَتِ الْآخِرَةُ نِيَّتَهُ، جَمَعَ اللهُ لَهُ أَمْرَهُ، وَجَعَلَ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ، وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ
"পার্থিব চিন্তা যাকে মোহগ্রস্ত করবে, আল্লাহ তার কাজকর্মে অস্থিরতা সৃষ্টি করবেন, দরিদ্রতা তার নিত্যসঙ্গী হবে। আর সে পার্থিব স্বার্থ ততটুকুই লাভ করতে পারবে, যতটুকু তার তাকদিরে লিপিবদ্ধ আছে। অপরদিকে যার উদ্দেশ্য হবে আখিরাত, আল্লাহ তার সবকিছু সুষ্ঠু করে দেবেন, তার অন্তরকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করবেন এবং দুনিয়া স্বয়ং তার সামনে এসে হাজির হবে।"[৯৫]
আখিরাতকে উদ্দেশ্য বানানোর অর্থ দুনিয়াকে পরিত্যাগ করে বৈরাগ্য বেছে নেওয়া নয়। বরং হালাল জীবিকা উপার্জন ও পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কাজ করে যাওয়া ইসলামে একটি প্রশংসনীয় ও মহান ইবাদত। কিন্তু এটি করতে গিয়ে আখিরাতকে ভুলে হালাল-হারাম বাছবিচার না করে বল্গাহীন জীবনযাপন করা ইসলামে চরমভাবে নিন্দিত। কাজেই একজন মুমিন তার পরকালীন লক্ষ্যকে স্থির রেখে দুনিয়ায় সাধ্যমতো দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করে যাবে। কোনো কারণে সে লক্ষ্যচ্যুত হলেও এ কথা নিশ্চিত জানবে যে, এই না পাওয়াটুকু তাকে আল্লাহর নির্দেশনা ও নূরের দিকেই অকপটে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আর আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন。
• মনে রাখুন, পৃথিবীর সবকিছুই অস্থায়ী
আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন,
'আল্লাহর বিধানসমূহের খেয়াল রাখবে, তাহলে তাঁকে তোমার সম্মুখে পাবে। সুখের সময় আল্লাহকে স্মরণ করবে, তবে তিনি দুঃখ ও কষ্টের সময় তোমাকে মনে রাখবেন। আর জেনে রাখো, যে সুখ-দুঃখ তোমার তাকদিরে নেই, তা তোমার নিকট পৌঁছবে না। আর যা তোমার তাকদিরে লেখা আছে, তা পৌঁছতে একমুহূর্ত দেরি হবে না। মনে রাখো, বিজয় বা সাহায্য আছে ধৈর্যের সাথে, মুক্তির উপায় আছে কষ্টের সাথে এবং কঠিনের সঙ্গে সহজ জড়িত আছে।[৯৬]
দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেখুন, মৃত্যুর মতো শোকাবৃত এক শব্দকেও আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের অসাধারণ এক সুযোগ বলে মনে হবে। আপনি বা এই পৃথিবীর কোনোকিছুই চিরস্থায়ী নয়। এমনকি আপনার দুঃখকষ্ট, হতাশাগুলোও নয়। এই চিন্তাটাই আপনার অন্তরে স্বস্তি এনে দেবে। দুশ্চিন্তার যে কালোছায়া আপনাকে এতদিন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল, তা নিমিষেই ধুলোর সাথে উড়ে যাবে।
আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।
টিকাঃ
[৭৬] কুরআন, ২: ১৫৫
[৭৭] সূরা ইউনুস, ১০: ১০৭
[৭৮] সূরা ইবরাহীম, ১৪: ৭
[৭৯] সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯
[৮০] সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১৪২
[৮১] সহিহ মুসলিম: ২৮৭৭
[৮২] সহিহুল বুখারি: ৭৪০৫
[৮৩] সূরা বাকারা, ২: ২৮৬
[৮৪] সূরা যুমার, ৩৯: ৫৩
[৮৫] সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩৪
[৮৬] সুনানুত তিরমিযী: ৩৩৮২
[৮৭] সহিহুল বুখারি: ৬৩৪৫; সহিহ মুসলিম: ২৭৩০
[৮৮] সুনানু আবি দাউদ: ৫০৯০; সহিহ ইবনু হিব্বান : ৯৭০
[৮৯] সুনানুত তিরমিযী: ৩৫০৫
[৯০] আবু দাউদ: ১৫২৫, ইবনু মাজাহ : ৩৮৮২
[৯১] সূরা বাকারা, ২: ৪৫
[৯২] সুনানুত তিরমিযী: ২৪৫৭
[৯৩] সহিহ মুসলিম: ২৭০২
[৯৪] সূরা রা'দ, ১৩:২৮
[৯৫] ইবনু মাজাহ: ৪১০৫
[৯৬] সুনানুত তিরমিযী: ২৫১৬; মুসনাদে আহমাদ: ২৮০৩