📄 হাদীসের আলোকে আত্মসচেতনতা
আনাস ইবনু মালিক বর্ণনা করেছেন, 'এক ব্যক্তি রাসূল -এর সাথে বসে ছিলেন। এমন সময় আরেক ব্যক্তি সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। তখন বসে থাকা ব্যক্তি আগন্তুক ব্যক্তি সম্পর্কে রাসূল -কে বললেন, "আমি এই ব্যক্তিকে ভালোবাসি।" রাসূল ﷺ বললেন, "তুমি কি তাকে সেটা জানিয়েছো?” সে বলল, "না।” তখন রাসূল ﷺ বললেন, "তুমি তাকে জানাও যে, তাকে তুমি ভালোবাসো।" তখন লোকটি উঠে গিয়ে আগন্তুককে তার প্রতি ভালোবাসার কথা জানাল এবং বলল, "আমি তোমাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি।” জবাবে সেও বলল, "তুমি যার জন্য আমাকে ভালোবাসো, তিনিও তোমাকে ভালোবাসুন।"[৬৯]
এই হাদীসটি থেকে বোঝা যায়, রাসূল ﷺ কীভাবে তাঁর সাহাবিদেরকে নিজের ও অন্যের আবেগ নিয়ে সচেতন হতে শেখাতেন। আবেগের যথাযথ প্রকাশ করতে উৎসাহ দিতেন।
আরেকটি ঘটনা আমরা উল্লেখ করছি।
একদিন রাসূল ﷺ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় পথের ধারে এক বৃদ্ধা আহাজারি করছিল। তার সন্তান মারা গিয়েছিল এবং সন্তানের শোকেই সে বিলাপ করছিল। নবিজি তাকে বিলাপ করতে নিষেধ করলেন এবং সবর করতে বললেন। বৃদ্ধা জানত না যে, তিনিই আল্লাহর রাসূল। তাই সে কর্কশ ভাষায় বলল, “আপনার সন্তান তো মারা যায়নি, আপনি আমার কষ্ট কীভাবে বুঝবেন?” এ কথা শুনে নবিজি কথা না-বাড়িয়ে চলে গেলেন। সাহাবিগণ সেই বৃদ্ধাকে নবি-এর পরিচয় জানাল। বৃদ্ধা তখন দৌড়ে গিয়ে নবিজির কাছে ক্ষমা চাইল। নবিজি বললেন,
إِنَّمَا الصَّبْرُ عِنْدَ الصَّدْمَةِ الْأُولَى
"সবর তো প্রথম আঘাতেই।"[৭০]
সন্তানের শোকে কাতর বৃদ্ধার মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে, তা মরিত্রি বুঝতে পেরেছিলেন। সেজন্য তিনি বৃদ্ধার রুক্ষ আচরণের জবাবে তৎক্ষণাৎ কিছু বলা সমীচীন মনে করেননি। কারণ, বৃদ্ধা আবেগের আতিশয্যে যা বলার তা মনে ফেলেছে। এজন্য তিনি চুপচাপ নিজের পথ ধরলেন। অন্যের আবেগকে বুঝতে পারা ও সেই অনুসারে নিজের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করার চমৎকার একটি নবীয় উদাহরণ এটি।
টিকাঃ
[৬৯] সুনানু আবী দাউদ: ৫১২৫
[৭০] সহিহুল বুখারি: ১২৮৩; সহিহ মুসলিম: ৯২৬
📄 আত্মসচেতনতা ও রাসূল ﷺ-এর একটি অসাধারণ দুআ
নবিজি তায়েফে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষিতে একটি দুআ করেছিলেন। শোকের বছরে এই ঘটনাটি ঘটে। নবিজি তাঁর জীবনের বড় দুই অবলম্বন—চাচা আবু তালিব ও স্ত্রী খাদিজাকে হারিয়ে দুঃখ-ভারাক্রান্ত অবস্থায় দিন যাপন করছিলেন। এই সময়ে নবি তায়েফে যান দাওয়াতি কাজের জন্যে। সেখানে নবিজিকে কটুকথা বলা হয়, তাঁর দাওয়াতকে ব্যঙ্গ করা হয়, তাঁর গায়ে পাথর নিক্ষেপ করা হয় এবং তাঁকে শহর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর থেকে অপমানজনক এবং কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা আর কী হতে পারে! বিতাড়িত হয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় তিনি এক বাগানে এসে আশ্রয় নেন। বাগানে এসে তিনি দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মহান আল্লাহর কাছে এই দুআ করেন:
اللَّهُمَّ إِلَيْكَ أَشْكُو ضَعْفَ قُوَّتِي، وَقِلَّةَ حِيْلَتِي، وَهَوَانِي عَلَى النَّاسِ، أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ، أَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ، إِلَى مَنْ تَكِلُنِي، إِلَى عَدُوٍّ يَتَجَهَّمُنِي أَوْ إِلَى قَرِيبٍ مَلَكْتَهُ أَمْرِي إِنْ لَمْ تَكُنْ غَضْبَانَ عَلَى فَلَا أُبَالِي، غَيْرَ أَنَّ عَافِيَتَكَ أَوْسَعُ لِي ، أَعُوذُ بِنُورِ وَجْهِكَ الَّذِي أَشْرَقَتْ لَهُ الظُّلُمَاتُ، وَصَلُحَ عَلَيْهِ أَمْرُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، أَنْ تُنْزِلَ بِي غَضَبَكَ أَوْ تُحِلَّ عَلَى سَخَطَكَ، لَكَ الْعُتْبَى حَتَّى تَرْضَى، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ
“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে নিজের দুর্বলতা, (মানুষকে বোঝাতে) আমার কলাকৌশলের স্বল্পতা এবং মানুষের কাছে আমার মূল্যহীনতার অভিযোগ করছি। হে সর্বাধিক দয়ালু! আপনি দুর্বলদের প্রভু, আমারও প্রভু।
আপনি আমাকে কার কাছে ন্যস্ত করছেন? আপনি কি আমাকে দূরের এমন অচেনা কারও হাতে ন্যস্ত করছেন, যে আমার সাথে কঠোর ব্যবহার করবে? নাকি কোনো শত্রুর হাতে সোপর্দ করছেন, যাকে আপনি আমার যাবতীয় বিষয়ের মালিক করে দিয়েছেন? আপনি যদি আমার ওপর রাগান্বিত না হন, তাহলে আমি কোনো কিছুই পরোয়া করি না।
তবে নিঃসন্দেহে আপনার ক্ষমা আমার জন্য সর্বাধিক প্রশস্ত ও প্রসারিত। আমি আপনার সেই চেহারার আলোর আশ্রয় চাই, যার দ্বারা অন্ধকার দূরীভূত হয়ে যায়। এবং যা দ্বারা দুনিয়া ও আখিরাতের সকল বিষয় সংশোধন হয়। এই কথার মাধ্যমে আমার ওপর আপনার ক্রোধ নেমে আসা হতে অথবা আমার ওপর আপনার অসন্তুষ্টি নাযিল হওয়া থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই আমার সকল প্রচেষ্টা।
আপনার সাহায্য ব্যতীত অন্যায় কাজ থেকে বেঁচে থাকাও সম্ভব নয় এবং আপনার তাওফীক ও শক্তি ছাড়া আপনার আনুগত্য করাও সম্ভব নয়। "[৭১] এই দুআর মধ্যে আমরা দেখি:
> রাসূল ﷺ নিজের অবস্থা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তিনি তা মেনেও নিয়েছিলেন। এই মেনে নিতে পারার কারণেই তিনি তাঁর কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন, হতোদ্যম হয়ে ভেঙে পড়েননি。
> নিজের দুর্বলতা নিয়ে তিনি মানুষের কাছে অভিযোগ করেননি। একমাত্র আল্লাহর কাছে অভিযোগ করেছিলেন এবং আল্লাহর সাহায্য চেয়েছিলেন। আল্লাহর ওপর তাঁর পরম নির্ভরতার কথা জানিয়েছিলেন। সত্যিকার আত্মসচেতন একজন মানুষ এমনই হয়। নিজের দুর্বলতা বুঝতে পেরে তারা মানুষের কাছে ধরনা দেয় না। বরং সকল দুর্বলতা দূর করার মালিক যিনি, সেই আল্লাহর ওপরই ভরসা করে।
> রাসূল ﷺ এই দুআর মধ্যে একটিবারও বলেননি যে, এই দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব কিংবা এত কষ্ট তিনি আর নিতে পারছেন না। বরং স্পষ্টভাবে বলেছেন, "আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই আমার সকল প্রচেষ্টা।" অর্থাৎ আত্মসচেতন মানুষ কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই হাল ছেড়ে দেন না। তিনি যেমন তার নিজের কমতি ও শক্তিগুলো সম্পর্কে সচেতন, তেমনই তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কেও সমান ওয়াকিবহাল।
টিকাঃ
[৭১] আদদুআ লিততবারানি: ১০৩৬
📄 আত্মসচেতনতার চেকলিস্ট
এখানে আমরা কুরআন-হাদীসের আলোকে একটি চেকলিস্ট দিচ্ছি। কুরআন ও হাদীসের মধ্যে আল্লাহ আমাদের আত্মসচেতনতার যেসকল গুণ অর্জন করতে বলেছেন, সেগুলো আমরা অর্জন করতে পেরেছি কি না; অথবা পারলেও তাতে ঠিক কতটা সফল হয়েছি, তা সম্পর্কে ধারণা পেতে এই চেকলিস্টটি আমাদেরকে সাহায্য করবে。
| ক্রমিক নং | আত্মসচেতনতামূলক কাজ | কুরআনের আলোর | হাদীসের আলোকে |
|---|---|---|---|
| ১ | বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আমি আমার অনুভূতিগুলো (রাগ, কষ্ট, আনন্দ) চিনতে পারি। | সূরা আশ-শামস, ৯১:৯ | মুসনাদ আহমদ, ২১৬১২ |
| ২ | আমার জীবনের প্রথম অগ্রাধিকার হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। | সূরা আল-হাশর, ৫৯:১৮ | সহিহ মুসলিম, ২৭৫১ |
| ৫ | কাজের চাপে বা ব্যক্তিগত সমস্যায় আমি বিষণ্ণন না হয়ে নতুন উদ্দীপনায় সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করি। | সূরা আয-যারিয়াত, ৫১ :৫৬ সূরা আত-তাওবা, ৯:৪০ সূরা হা-মীম আস-সাজদা, ৪১ :৩০ সূরা ইনশিরাহ, ৯৪:৫ | সহিহ বুখারি, ৫৬৪৪ |
| ৪ | যেকোনো কাজে পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়ার যতটা সম্ভব চেষ্টা করি। | সূরা আল-জুমুআ, ৬২:১০ | তিবিরানী, ২৫১৭ |
| ৬ | পরীক্ষায় হেরে যাওয়ার ভয়ে পিছু না হটে তাওয়াক্কুল ও আত্মবিশ্বাসের সাথে অংশগ্রহণ করি। | সুরা আল- আনফাল, ৮: ৩০ সূরা আত-তালাক, ৬৫:৩ সুরা আল-মায়িদা, ৫:২৩ সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৫৯ | সহিহ মুসলিম, ২৮৬৪ |
| | আমি ইতিবাচকভাবে সমালোচনা গ্রহণ করি এবং নিজের ভুল শোধরানোর চেষ্টা করি। | সূরা আল-আ'লা, ৮৭:১৪ সূরা ফাতির, ৩৫ : ১৮ সূরা আশ-শামস, ৯১:৯ | সহিহ মুসলিম, ৯১ |
| | ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আমি তাওবা করে পুনরায় না করার চেষ্টা করি। | সূরা হূদ, ১১:৩ সূরা আল-বাকারা, ২:১৬০ সূরা আল-বাকারা, ২:২২২ সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩ | রিয়াদুস সালিহীন, ১৫, ১৬; সহিহ মুসলিম, ২৭৪৪-২৭৪৭ |
| | নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে যেকোনো কাজের লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করি। | সূরা আন-নাজম, ৫৩:৩৯ | সহিহ বুখারি, ৬৪১২ |
| | কোনো বিষয় না-বুঝলে আমি লজ্জা না পেয়ে জানার চেষ্টা করি। | সূরা আল-মুজাদালা, ৫৮ :১১ | সহিহ মুসলিম, ৩৩২ |
| | আমি জানি, কোন পরিস্থিতি বা বিষয় আমাকে রাগান্বিত করে বা কষ্ট দেয়। | সূরা মুযযামমিল, ৭৩:১০ সূরা আল-আনফাল, ৮:২২ | আল-আদাবুল মুফরাদ, ১৩২০ |
| | আমি সহজে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি। | সূরা ইউসুফ, ১২ : ৮৬ | সুনান আবি দাউদ, ৫১২৫ |
| | আশপাশের মানুষের বা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারি। | সূরা আল-বাকারা, ২:২১৬ | সুনান ইবনু মাজাহ, ৪০৩২ |
| ১৩ | কেউ উপদেশ দিলে তা সহজভাবে গ্রহণ করি। | সূরা আল- আম্বিয়া, ২১:৭ | রিয়াদুস সালিহীন, ৬১১ |
ওপরের চেকলিস্টের ১৩টি গুণাবলির ওপর,
* কেউ যদি গড়ে ৪-৫ পায়, তখন ধারণা করা যায়, তার আত্মসচেতনতার লেভেল খুব ভালো。
* কেউ যদি গড়ে ৩ পায়, তখন ধারণা করা যায়, তার আত্মসচেতনতার বিষয়ে কিছুটা অগ্রগতি প্রয়োজন。
* কেউ যদি গড়ে ১-২ পায়, তখন ধারণা করা যায়, তার আত্মসচেতনতার লেভেল ভালো নয় এবং তার অনেক বেশি অগ্রগতি প্রয়োজন।