📄 আত্মসচেতনতা ও আত্মশুদ্ধি
ইসলামে ব্যক্তির আত্মশুদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর ব্যক্তি নিজের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারার আগ পর্যন্ত তা অর্জিত হতে পারে না। কারণ, নিজের অবস্থা বুঝে উদ্যোগ গ্রহণ করাই হলো আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ। আর আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব এএ একটি আয়াত থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়-
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ * إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ }
"যে দিবসে ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি কোনো উপকারে আসবে না; কিন্তু যে সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে।"[৩৫]
আত্মশুদ্ধির বিষয়ে আল্লাহ আরও বলেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّهَا وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّهَا
"যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে, সেই সফলকাম হয়েছে। এবং যে নিজেকে কলুষিত করেছে, সে হয়েছে ব্যর্থ।”[৩৬]
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى
"নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে সে, যে পরিশুদ্ধ হয়।”[৩৭]
কুরআনের এই আয়াতগুলো থেকে বলা যায়, আত্মশুদ্ধির ওপরেই আমাদের চিরকালীন মুক্তি নির্ভর করছে। আর আত্মসচেতনতা ছাড়া প্রকৃত আত্মশুদ্ধি কখনোই সম্ভব নয়। তাই আত্মশুদ্ধিবিহীন আত্মসচেতনতা সাময়িক ফল দিতে পারে মাত্র; চিরস্থায়ী নয়。
একজন সত্যিকার আত্মসচেতন ব্যক্তি-মাত্রই আল্লাহ-সচেতন (মুত্তাকি)। তার প্রতিটি কাজ করার সময় সে মাথায় রাখে যে, আল্লাহ এর মাধ্যমে সন্তুষ্ট হবেন, নাকি অসন্তুষ্ট! আল্লাহ তাকে সার্বক্ষণিক দেখছেন-এই চিন্তাও তার মধে আত্মসচেতনতা গড়ে দেয়। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ ۚ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
"আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যে কুচিন্তা করে, সে সম্পর্কেও আমি অবগত আছি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনি থেকেও অধিক নিকটবর্তী।"[৩৮]
টিকাঃ
[৩৫] সূরা আশ শুআরা, ২৬:৮৮-৮৯
[৩৬] সূরা শামস, ১১:৯-১০
[৩৭] সূরা আ'লা, ৮৭:১৪
[৩৮] সূরা কাফ, ৫০:১৬
📄 কুরআন যেভাবে আত্মসচেতনতা শেখায়
কুরআনের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ মানুষের পরিচয় দিয়েছেন এবং মানুষের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য ও সত্তাগত আচরণ-অভ্যাস নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। এসবের উদ্দেশ্যই হলো মানুষকে নিজের সত্তা নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং আল্লাহ যেসকল নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, সেগুলো থেকে বের হয়ে আসা। আর ইতিবাচক গুণগুলো অর্জনের চেষ্টা করা। কুরআন মানুষের সত্তাগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে বলেছে,
يُرِيدُ اللَّهُ أَنْ يُخَفِّفَ عَنْكُمْ وَخُلِقَ الْإِنْسَانُ ضَعِيفًا )
"আল্লাহ তোমাদের বোঝা হালকা করতে চান। মানুষ দুর্বলরূপে সৃজিত হয়েছে।"[৩৯]
وَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ الضُّرُّ دَعَانَا لِجَنْبِةٍ أَوْ قَاعِدًا أَوْ قَائِمًا فَلَمَّا كَشَفْنَا عَنْهُ ضُرَّهُ مَرَّكَانَ لَمْ يَدْعُنَا إِلَى ضُرٍ مَّسَّهُ كَذَلِكَ زُيِّنَ لِلْمُسْرِفِينَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
"আর যখন মানুষকে বিপদ স্পর্শ করে, তখন সে শুয়ে, বসে বা দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে। অতঃপর আমি যখন তার বিপদ দূর করে দিই, তখন সে এমনভাবে চলতে থাকে, মনে হয় যেন তাকে কোনো বিপদ স্পর্শ করার কারণে সে আমাকে ডাকেইনি। এভাবেই যারা সীমালঙ্ঘন করে, তাদের জন্য তাদের কাজকর্মগুলো চাকচিক্যময় বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।"[৪০]
وَلَبِنْ أَذَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنَّا رَحْمَةً ثُمَّ نَزَعْنَهَا مِنْهُ إِنَّهُ لَيَوسٌ كَفُورٌ )
"আর যদি আমি মানুষকে আমার পক্ষ থেকে রহমত আস্বাদন করাই, এরপর তার থেকে তা কেড়ে নিই, তাহলে সে হতাশ ও অকৃতজ্ঞ হয়।”[৪১]
لَهُ مُعَقِّبْتٌ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُوْنَهُ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءًا فَلَا مَرَدَّ لَهُ وَ مَا لَهُمْ مِنْ دُونِهِ مِنْ قَالٍ )
"মানুষের সামনে ও পেছনে পাহারাদার নিযুক্ত আছে, যারা আল্লাহর হুকুম মোতাবেক তাকে রক্ষণাবেক্ষণ করে। আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরাই তাদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অকল্যাণ করতে চাইলে তা রদ করার কেউ নেই, আর তিনি ছাড়া তাদের কোনো অভিভাবক নেই।”[৪২]
وَأَتْكُمْ مِنْ كُلِّ مَا سَأَلْتُمُوهُ وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَتَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَظَلُومٌ كَفَّارٌ
“তিনি তোমাদেরকে সে সবকিছুই দিয়েছেন-যা তোমরা চেয়েছো। আর তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করতে চাইলে কক্ষনো তার সংখ্যা নির্ধারণ করতে পারবে না। মানুষ অবশ্যই বড়ই জালিম, বড়ই অকৃতজ্ঞ।”[৪৩]
خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ نُّطْفَةٍ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٌ مُّبِينٌ "তিনি মানবকে এক ফোঁটা বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছেন। অথচ সে প্রকাশ্য ঝগড়াটে সেজে বসল।”[৪৪]
وَيَدْعُ الْإِنْسَانُ بِالشَّرِّ دُعَاءَهُ بِالْخَيْرِ وَكَانَ الْإِنْسَانُ عَجُولًا )
“মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে, সেভাবেই অকল্যাণ কামনা করে। মানুষ তো খুবই তাড়াহুড়ো-প্রবণ।”[৪৫]
وَإِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فِي الْبَحْرِ ضَلَّ مَنْ تَدْعُوْنَ إِلَّا إِيَّاهُ فَلَمَّا نَجَّكُمْ إِلَى الْبَرِّ أَعْرَضْتُمْ وَكَانَ الْإِنْسَانُ كَفُورًا )
"যখন সমুদ্রে তোমাদের ওপর বিপদ আসে, তখন শুধু আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে তোমরা আহ্বান করে থাকো, তারা তোমাদের মন থেকে উধাও হয়ে যায়। অতঃপর তিনি যখন তোমাদেরকে স্থলে ভিড়িয়ে উদ্ধার করে নেন, তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ।”[৪৬]
وَإِذَا أَنْعَمْنَا عَلَى الْإِنْسَانِ أَعْرَضَ وَنَا بِجَانِبِهِ وَإِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ كَانَ يَوْسًا.
"আর আমি যখন মানুষের ওপর নিয়ামত দান করি, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও দূরে সরে যায়। আর যখন তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে খুব হতাশ হয়ে পড়ে।"[৪৭]
قُلْ لَّوْ أَنْتُمْ تَمْلِكُونَ خَزَابِنَ رَّحْمَةِ رَبِّي إِذًا لَّأَمْسَكْتُمْ خَشْيَةَ الْإِنْفَاقِ وَ كَانَ الْإِنْسَانُ قَتُورًا
"বলো, যদি তোমরা আমার রবের রহমতের ভাণ্ডারসমূহের মালিক হতে, তবুও খরচ হয়ে যাওয়ার ভয়ে তোমরা তা আটকে রাখতে। আর মানুষ তো অতি কৃপণ।”[৪৮]
وَلَقَدْ صَرَّفْنَا فِي هَذَا الْقُرْآنِ لِلنَّاسِ مِنْ كُلِّ مَثَلٍ وَكَانَ الْإِنْسَانُ أَكْثَرَ شَيْءٍ جَدَلًا
"...মানুষ সব থেকে অধিক তর্কপ্রিয়।”[৪৯]
خُلِقَ الْإِنْسَانُ مِنْ عَجَلٍ سَأُورِيكُمْ أَيْتِي فَلَا تَسْتَعْجِلُونِ 3
"মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাড়াহুড়ার প্রবণতা দিয়ে। অচিরেই আমি তোমাদেরকে দেখাব আমার নিদর্শনাবলি। সুতরাং তোমরা তাড়াহুড়া কোরো না।"[৫০]
وَهُوَ الَّذِي أَحْيَاكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ إِنَّ الْإِنْسَانَ تَكَفُورٌ
"তিনিই তোমাদেরকে জীবিত করেছেন, অতঃপর তিনিই তোমাদেরকে মৃত্যুদান করবেন ও পুনরায় জীবিত করবেন। নিশ্চয়ই মানুষ বড় অকৃতজ্ঞ।”[৫১]
إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَنْ يَحْمِلْنَهَا وَ أَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنْسَانُ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا
"আমি আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে এই আমানত পেশ করেছিলাম, অতঃপর তারা একে বহন করতে অস্বীকার করল এবং এতে ভীত হলো। কিন্তু মানুষ তা বহন করল। নিশ্চয়ই সে জালিম, অজ্ঞ।[৫২]
وَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ ضُرًّا دَعَا رَبَّهُ مُنِيبًا إِلَيْهِ ثُمَّ إِذَا خَوَّلَهُ نِعْمَةً مِنْهُ نَسِيَ مَا كَانَ يَدْعُوا إِلَيْهِ مِنْ قَبْلُ وَجَعَلَ لِلَّهِ أَنْدَادًا لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيْلِهِ قُلْ تَمَتَّعُ بِكُفْرِكَ قَلِيلًا إِنَّكَ مِنْ أَصْحُبِ النَّارِ (প)
“আর যখন মানুষকে স্পর্শ করে দুঃখ-দুর্দশা, তখন সে একাগ্রচিত্তে তার রবকে ডাকে। তারপর তিনি যখন তাকে নিজের পক্ষ থেকে নিয়ামত দান করেন, তখন সে ভুলে যায়- ইতিপূর্বে কী কারণে তাঁর কাছে দুআ করেছিল, আর আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করে, তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য। বলো, তোমার কুফরি উপভোগ করো ক্ষণকাল; নিশ্চয়ই তুমি জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত।”[৫৩]
فَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ ضُرِّ دَعَانَا ثُمَّ إِذَا خَوَّلْنَهُ نِعْمَةٌ مِنَّا قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ بَلْ هِيَ فِتْنَةٌ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ (১)
“মানুষকে বিপদাপদ স্পর্শ করলে আমাকে ডাকে। অতঃপর আমি যখন তাকে আমার পক্ষ থেকে নিয়ামত দিয়ে ধন্য করি, তখন সে বলে ওঠে- 'আমার জ্ঞান-গরিমার বদৌলতেই আমাকে তা দেওয়া হয়েছে।' না, তা নয়। এটা একটা পরীক্ষা। কিন্তু তাদের অধিকাংশই বুঝে না।”[৫৪]
لَا يَسْتَمُ الْإِنْسَانُ مِنْ دُعَاءِ الْخَيْرِ وَإِنْ مَّسَّهُ الشَّرُّ فَيَتُوسٌ قَنُوطٌ (এ)
“মানুষ উন্নতি কামনায় ক্লান্ত হয় না।”[৫৫]
وَإِذَا أَنْعَمْنَا عَلَى الْإِنْسَانِ أَعْرَضَ وَنَ بِجَانِبِهِ وَإِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ فَذُو دُعَاءِ عَرِيض (৫)
"আমি যখন মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করি, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং পার্শ্ব পরিবর্তন করে। আর যখন তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সুদীর্ঘ দুআ করতে থাকে।”[৫৬]
فَإِنْ أَعْرَضُوا فَمَا أَرْسَلْنَكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا إِنْ عَلَيْكَ إِلَّا الْبَلْغُ وَإِنَّا إِذَا اذَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنَّا رَحْمَةً فَرِحَ بِهَا وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ فَإِنَّ الْإِنْسَانَ كَفُورٌ
“যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আপনাকে আমি তাদের রক্ষক করে পাঠাইনি। আপনার কর্তব্য কেবল প্রচার করা। আমি যখন মানুষকে আমার রহমত আস্বাদন করাই, তখন সে উল্লসিত হয়। আর যখন তাদের কৃতকর্মের কারণে তাদের কোনো অনিষ্ট ঘটে, তখন মানুষ খুব অকৃতজ্ঞ হয়ে যায়।”[৫৭]
وَجَعَلُوا لَهُ مِنْ عِبَادِهِ جُزْءًا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَكَفُورٌ مُّبِينٌ )
"তারা আল্লাহর বান্দাদের মধ্য থেকে আল্লাহর শরিক স্থির করেছে। বাস্তবিকই মানুষ স্পষ্ট অকৃতজ্ঞ।”[৫৮]
وَجَعَلُوا لَهُ مِنْ عِبَادِهِ جُزْءًا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَكَفُورٌ مُّبِينٌ
“মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে খুবই অস্থিরমনা করে।”[৫৯]
بَلْ يُرِيدُ الْإِنسَانُ لِيَفْجُرَ أَمَامَهُ
"বরং মানুষ তার ভবিষ্যৎ জীবনেও ধৃষ্টতা করতে চায়।”[৬০]
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي كَبَدٍ
"নিশ্চয়ই আমি মানুষকে শ্রমনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি।”[৬১]
كَلَّا إِنَّ الْإِنسَانَ لَيَطْغَى الله
"সত্যি সত্যি মানুষ সীমালঙ্ঘন করে।”[৬২]
إِنَّ الْإِنسَانَ لِرَبِّهِ لَكَنُودٌ
"নিশ্চয়ই মানুষ তার পালনকর্তার প্রতি অকৃতজ্ঞ।”[৬৩]
এ ছাড়াও কুরআনের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ বিশ্বজগৎ ও আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে বলেছেন। এর উদ্দেশ্য হলো, সৃষ্টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করার মাধ্যমে নিজেদের ক্ষুদ্রতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া। বিশ্বজগতের যে একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন, তাঁর নির্দেশ মেনে চলতে যে আমরা বাধ্য – এই বোধ নিজের মধ্যে নিয়ে আসা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَتَخْرَ لَكُمْ مَّا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مِنْهُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَايَتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
"আর যা কিছু রয়েছে আসমানে এবং যা কিছু রয়েছে জমিনে, তার সবই তিনি তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। চিন্তাশীল কওমের জন্য নিশ্চয়ই এতে নিদর্শন রয়েছে।”[৬৪]
وَفِي الْأَرْضِ أَيَتٌ لِلْمُوْقِنِينَ وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ
"বিশ্বাসকারীদের জন্যে পৃথিবীতে নিদর্শনাবলি রয়েছে এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও; তোমরা কি অনুধাবন করবে না?”[৬৫]
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لِعِبِينَ مَا خَلَقْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
"আমি আকাশ, জমিন আর এদের মাঝে যা আছে—সেসব খেল-তামাশার ফলে সৃষ্টি করিনি। আমি এ দুটোকে যথাযথভাবেই সৃষ্টি করেছি। কিন্তু তাদের অধিকাংশেই তা জানে না।”[৬৬]
وَخَلَقَ اللَّهُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ وَلِتُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ )
"আর আল্লাহ আসমান ও জমিনকে যথার্থভাবে সৃষ্টি করেছেন। যাতে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কৃতকর্ম অনুযায়ী প্রতিফল দেওয়া যেতে পারে, আর তাদের প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না।”[৬৭]
فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِأَيْتِهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْمُجْرِمُونَ
"কাজেই, যে আল্লাহর ওপর মিথ্যা রটনা করে অথবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে, তার চেয়ে বড় জালিম আর কে? নিশ্চয়ই অপরাধীরা সফল হবে না।”[৬৮]
আরও অসংখ্য আয়াতে এভাবেই মহান আল্লাহ আমাদেরকে সচেতন হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন。
টিকাঃ
[৩৯] সূরা নিসা, ৪:২৮
[৪০] সূরা ইউনূস, ১০:১২
[৪১] সূরা হূদ, ১১:০৯
[৪২] সূরা রাদ, ১৩: ১১
[৪৩] সূরা ইবরাহীম, ১৪:৩৪
[৪৪] সূরা নাহল, ১৬:৪
[৪৫] সূরা ইসরা, ১৭:১১
[৪৬] সূরা ইসরা, ১৭:৬৭
[৪৭] সূরা ইসরা, ১৭:৮৩
[৪৮] সূরা ইসরা, ১৭:১০০
[৪৯] সূরা কাহফ, ১৮:৫৪
[৫০] সূরা আম্বিয়া, ২১:৩৭
[৫১] সূরা হাজ্জ, ২২:৬৬
[৫২] সূরা আহযাব, ৩৩:৭২
[৫৩] সূরা যুমার, ৩৯:৮
[৫৪] সূরা যুমার, ৩৯:৪৯
[৫৫] সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৪৯
[৫৬] সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৫১
[৫৭] সূরা শুরা, ৪২:৪৮
[৫৮] সূরা যুখরুফ, ৪৩:১৫
[৫৯] সূরা মা'আরিজ, ৭০:১৯
[৬০] সূরা কিয়ামাহ, ৭৫:৫
[৬১] সূরা বালাদ, ৯০:৪
[৬২] সূরা আলাক, ৯৬:৬
[৬৩] সূরা আদিয়াত, ১০০:৬
[৬৪] সূরা জাসিয়া, ৪৫:১৩
[৬৫] সূরা যারিয়াত, ৫১:২০-২১
[৬৬] সূরা দুখান, ৪৪: ৩৮-৩৯
[৬৭] সূরা জাসিয়া, ৪৫:২২
[৬৮] সূরা ইউনুস, ১০:১৭
📄 হাদীসের আলোকে আত্মসচেতনতা
আনাস ইবনু মালিক বর্ণনা করেছেন, 'এক ব্যক্তি রাসূল -এর সাথে বসে ছিলেন। এমন সময় আরেক ব্যক্তি সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। তখন বসে থাকা ব্যক্তি আগন্তুক ব্যক্তি সম্পর্কে রাসূল -কে বললেন, "আমি এই ব্যক্তিকে ভালোবাসি।" রাসূল ﷺ বললেন, "তুমি কি তাকে সেটা জানিয়েছো?” সে বলল, "না।” তখন রাসূল ﷺ বললেন, "তুমি তাকে জানাও যে, তাকে তুমি ভালোবাসো।" তখন লোকটি উঠে গিয়ে আগন্তুককে তার প্রতি ভালোবাসার কথা জানাল এবং বলল, "আমি তোমাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি।” জবাবে সেও বলল, "তুমি যার জন্য আমাকে ভালোবাসো, তিনিও তোমাকে ভালোবাসুন।"[৬৯]
এই হাদীসটি থেকে বোঝা যায়, রাসূল ﷺ কীভাবে তাঁর সাহাবিদেরকে নিজের ও অন্যের আবেগ নিয়ে সচেতন হতে শেখাতেন। আবেগের যথাযথ প্রকাশ করতে উৎসাহ দিতেন।
আরেকটি ঘটনা আমরা উল্লেখ করছি।
একদিন রাসূল ﷺ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় পথের ধারে এক বৃদ্ধা আহাজারি করছিল। তার সন্তান মারা গিয়েছিল এবং সন্তানের শোকেই সে বিলাপ করছিল। নবিজি তাকে বিলাপ করতে নিষেধ করলেন এবং সবর করতে বললেন। বৃদ্ধা জানত না যে, তিনিই আল্লাহর রাসূল। তাই সে কর্কশ ভাষায় বলল, “আপনার সন্তান তো মারা যায়নি, আপনি আমার কষ্ট কীভাবে বুঝবেন?” এ কথা শুনে নবিজি কথা না-বাড়িয়ে চলে গেলেন। সাহাবিগণ সেই বৃদ্ধাকে নবি-এর পরিচয় জানাল। বৃদ্ধা তখন দৌড়ে গিয়ে নবিজির কাছে ক্ষমা চাইল। নবিজি বললেন,
إِنَّمَا الصَّبْرُ عِنْدَ الصَّدْمَةِ الْأُولَى
"সবর তো প্রথম আঘাতেই।"[৭০]
সন্তানের শোকে কাতর বৃদ্ধার মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে, তা মরিত্রি বুঝতে পেরেছিলেন। সেজন্য তিনি বৃদ্ধার রুক্ষ আচরণের জবাবে তৎক্ষণাৎ কিছু বলা সমীচীন মনে করেননি। কারণ, বৃদ্ধা আবেগের আতিশয্যে যা বলার তা মনে ফেলেছে। এজন্য তিনি চুপচাপ নিজের পথ ধরলেন। অন্যের আবেগকে বুঝতে পারা ও সেই অনুসারে নিজের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করার চমৎকার একটি নবীয় উদাহরণ এটি।
টিকাঃ
[৬৯] সুনানু আবী দাউদ: ৫১২৫
[৭০] সহিহুল বুখারি: ১২৮৩; সহিহ মুসলিম: ৯২৬
📄 আত্মসচেতনতা ও রাসূল ﷺ-এর একটি অসাধারণ দুআ
নবিজি তায়েফে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষিতে একটি দুআ করেছিলেন। শোকের বছরে এই ঘটনাটি ঘটে। নবিজি তাঁর জীবনের বড় দুই অবলম্বন—চাচা আবু তালিব ও স্ত্রী খাদিজাকে হারিয়ে দুঃখ-ভারাক্রান্ত অবস্থায় দিন যাপন করছিলেন। এই সময়ে নবি তায়েফে যান দাওয়াতি কাজের জন্যে। সেখানে নবিজিকে কটুকথা বলা হয়, তাঁর দাওয়াতকে ব্যঙ্গ করা হয়, তাঁর গায়ে পাথর নিক্ষেপ করা হয় এবং তাঁকে শহর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর থেকে অপমানজনক এবং কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা আর কী হতে পারে! বিতাড়িত হয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় তিনি এক বাগানে এসে আশ্রয় নেন। বাগানে এসে তিনি দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মহান আল্লাহর কাছে এই দুআ করেন:
اللَّهُمَّ إِلَيْكَ أَشْكُو ضَعْفَ قُوَّتِي، وَقِلَّةَ حِيْلَتِي، وَهَوَانِي عَلَى النَّاسِ، أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ، أَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ، إِلَى مَنْ تَكِلُنِي، إِلَى عَدُوٍّ يَتَجَهَّمُنِي أَوْ إِلَى قَرِيبٍ مَلَكْتَهُ أَمْرِي إِنْ لَمْ تَكُنْ غَضْبَانَ عَلَى فَلَا أُبَالِي، غَيْرَ أَنَّ عَافِيَتَكَ أَوْسَعُ لِي ، أَعُوذُ بِنُورِ وَجْهِكَ الَّذِي أَشْرَقَتْ لَهُ الظُّلُمَاتُ، وَصَلُحَ عَلَيْهِ أَمْرُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، أَنْ تُنْزِلَ بِي غَضَبَكَ أَوْ تُحِلَّ عَلَى سَخَطَكَ، لَكَ الْعُتْبَى حَتَّى تَرْضَى، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ
“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে নিজের দুর্বলতা, (মানুষকে বোঝাতে) আমার কলাকৌশলের স্বল্পতা এবং মানুষের কাছে আমার মূল্যহীনতার অভিযোগ করছি। হে সর্বাধিক দয়ালু! আপনি দুর্বলদের প্রভু, আমারও প্রভু।
আপনি আমাকে কার কাছে ন্যস্ত করছেন? আপনি কি আমাকে দূরের এমন অচেনা কারও হাতে ন্যস্ত করছেন, যে আমার সাথে কঠোর ব্যবহার করবে? নাকি কোনো শত্রুর হাতে সোপর্দ করছেন, যাকে আপনি আমার যাবতীয় বিষয়ের মালিক করে দিয়েছেন? আপনি যদি আমার ওপর রাগান্বিত না হন, তাহলে আমি কোনো কিছুই পরোয়া করি না।
তবে নিঃসন্দেহে আপনার ক্ষমা আমার জন্য সর্বাধিক প্রশস্ত ও প্রসারিত। আমি আপনার সেই চেহারার আলোর আশ্রয় চাই, যার দ্বারা অন্ধকার দূরীভূত হয়ে যায়। এবং যা দ্বারা দুনিয়া ও আখিরাতের সকল বিষয় সংশোধন হয়। এই কথার মাধ্যমে আমার ওপর আপনার ক্রোধ নেমে আসা হতে অথবা আমার ওপর আপনার অসন্তুষ্টি নাযিল হওয়া থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই আমার সকল প্রচেষ্টা।
আপনার সাহায্য ব্যতীত অন্যায় কাজ থেকে বেঁচে থাকাও সম্ভব নয় এবং আপনার তাওফীক ও শক্তি ছাড়া আপনার আনুগত্য করাও সম্ভব নয়। "[৭১] এই দুআর মধ্যে আমরা দেখি:
> রাসূল ﷺ নিজের অবস্থা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তিনি তা মেনেও নিয়েছিলেন। এই মেনে নিতে পারার কারণেই তিনি তাঁর কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন, হতোদ্যম হয়ে ভেঙে পড়েননি。
> নিজের দুর্বলতা নিয়ে তিনি মানুষের কাছে অভিযোগ করেননি। একমাত্র আল্লাহর কাছে অভিযোগ করেছিলেন এবং আল্লাহর সাহায্য চেয়েছিলেন। আল্লাহর ওপর তাঁর পরম নির্ভরতার কথা জানিয়েছিলেন। সত্যিকার আত্মসচেতন একজন মানুষ এমনই হয়। নিজের দুর্বলতা বুঝতে পেরে তারা মানুষের কাছে ধরনা দেয় না। বরং সকল দুর্বলতা দূর করার মালিক যিনি, সেই আল্লাহর ওপরই ভরসা করে।
> রাসূল ﷺ এই দুআর মধ্যে একটিবারও বলেননি যে, এই দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব কিংবা এত কষ্ট তিনি আর নিতে পারছেন না। বরং স্পষ্টভাবে বলেছেন, "আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই আমার সকল প্রচেষ্টা।" অর্থাৎ আত্মসচেতন মানুষ কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই হাল ছেড়ে দেন না। তিনি যেমন তার নিজের কমতি ও শক্তিগুলো সম্পর্কে সচেতন, তেমনই তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কেও সমান ওয়াকিবহাল।
টিকাঃ
[৭১] আদদুআ লিততবারানি: ১০৩৬