📄 আত্মসচেতনতার ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
আত্মসচেতনতার প্রথম এবং প্রধান ধাপ হলো নিজের জীবনের উদ্দেশ্য বোঝা। আমি কে, কোথা থেকে এলাম, আর কোথায় যাব। সৃষ্টির শুরু হতে মানুষের মনে ঘুরপাক খাওয়া এই প্রশ্নগুলোর সঠিক এবং যথার্থ উত্তরের মধ্যে আত্মসচেতনতার বীজ লুকিয়ে আছে। আধ্যাত্মিক এ প্রশ্নগুলোর উত্তরের মধ্যে আত্মসচেতনতাকে প্রাথমিকভাবে উপলব্ধি করতে হবে। তারপর তার আদলে জীবনের অন্য বিষয়গুলোকে ঢেলে সাজানোর মধ্যে দিয়ে এটি বিকাশ লাভ করবে।
নবি-রাসূলরা সব সময় তাঁদের দাওয়াতের শুরুতেই এ প্রশ্নগুলোর সোজাসাপটা ব্যাখ্যা দিয়ে পরবর্তী কার্যক্রমে গিয়েছেন। নববি ধারাবাহিকতায় রাসূলুল্লাহ ﷺ ব্যতিক্রম ছিলেন না। আত্মসচেতনতার মাধ্যমে স্রষ্টার প্রতি সচেতনতার সূত্রপাত করাই নববি কর্মনীতি।
আরবি প্রবাদে আছে, "যে নিজেকে জানে, সে তার রবকে জানে।" আল্লাহ তাআলা বলেন, "অতঃপর তিনি তাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছেন, আর তার ভেতরে স্বীয় রুহ হতে ফুঁক দিয়েছেন।” [২৬]
মানবসত্তা যে একটা সুন্দর এবং সম্মানিত সৃষ্টি-তা এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায়। আল্লাহর রুহের উপস্থিতি মানব-জন্মকে সম্মানিত করেছে। এজন্যই নিজেকে জানার মধ্যে স্রষ্টার রহস্য ভেদের চাবি আছে। ইমাম গাযালি তাঁর ইহইয়া উলুমুদ্দিন-এ বলেছেন:
আত্মার রহস্য যে জানে, সে নিজেকে জানে। যদি সে নিজেকে চেনে, তবে সে তার প্রভুকে জানে। যদি সে নিজেকে এবং তার প্রভুকে জানে, তবে সে জানে যে, তার ব্যাপারটি তার প্রকৃতি এবং প্রবৃত্তিতে আসমানি গুণে গুণান্বিত।
"আর তোমরা তাদের মতো হোয়ো না—যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন। তারাই তো ফাসিক।”[২৭]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় এসেছে: “আল্লাহ শাস্তিস্বরূপ তাদেরকে এমন করে দিলেন যে, তারা এমন সব কাজ করা থেকে উদাসীন হয়ে গেল—যাতে ছিল তাদের উপকার এবং যার দ্বারা তারা নিজেদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাতে পারত। এইভাবে মানুষ আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার দ্বারা আসলে নিজেকেই ভুলে যায়। তার জ্ঞান-বুদ্ধি তাকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দেয় না। চোখ দুটি তাকে সঠিক পথ দেখায় না এবং তার কান সত্য কথা শুনতে বধির হয়ে যায়। ফলে তার দ্বারা এমন কাজ হয়ে যায়, যাতে থাকে তার নিজেরই ধ্বংস ও বিনাশ।”[২৮]
যারা নিজ অস্তিত্বের সূচনাকে ভুলে পার্থিব জীবনের মোহে ডুবে থাকে, নিঃসন্দেহে তারা চূড়ান্ত মাত্রার অসচেতন, গাফিল। কারণ, রবের সান্নিধ্য লাভের মাধ্যমে মানুষ হতে পারে সর্বোচ্চ পর্যায়ের আত্মসচেতন। সঠিক আর ভুলের মধ্যকার পার্থক্য বোঝার মতো সাধারণ নির্দেশনাগুলো মানুষ রবের সান্নিধ্যের প্রভাবেই পেয়ে থাকে। আর মানুষ যখন তার সৃষ্টিকর্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন ভালো-মন্দের জ্ঞানও হারিয়ে ফেলে।
এখন, যে প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবে মাথায় চলে আসবে—তা হলো, মানুষ কীভাবে তাদের দুর্বলতাগুলো জানতে পারে এবং ভুলগুলো মেনে নিয়ে সংশোধনের পথে পা বাড়াতে পারে। ওয়াবিসা ইবনু মাবদ থেকে বর্ণিত, 'আমি আল্লাহর রাসূল-এর কাছে গেলাম। তিনি বললেন, "তুমি নেক আমল সম্পর্কে জানতে এসেছো?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন, "নিজেকে নিজে এই প্রশ্ন করো। নেক আমল আমাদের রূহে প্রশান্তি এনে দেয়, আর গুনাহের কাজ এনে দেয় অস্থিরতা। মানুষ যতই সেই গুনাহকে মহিমান্বিত করে কথা বলুক না কেন, কাজটা না ছাড়া পর্যন্ত আমাদের রুহ অস্থিরভাবে বুকের এপাশ থেকে ওপাশে ছুটোছুটি করতে থাকে।"[২৯]
মানুষ যখন সত্যিকার অর্থেই আল্লাহর নিকটবর্তী হতে চেষ্টা করে, তখন অন্তত মানুষকে তাঁর নিজের ব্যাপারেও আত্মসচেতন করে দেয়। এই ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“হে মুমিনগণ! তোমাদের দায়িত্ব তোমাদের ওপর। যদি তোমরা সঠিক পথে থাকো, তাহলে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে, সে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহর দিকেই তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যা করছিলে, সে সম্পর্কে তোমাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হবে।"[৩০]
অর্থাৎ মানুষ যদি নিজেদেরকে নিয়ে চিন্তা করে বা আত্মসচেতন হয়, তবে অন্যদের ভ্রান্তি তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এভাবে আত্মসচেতনতা আমাদেরকে অন্যের পক্ষ থেকে আসা বিপদাপদ, যাবতীয় ভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতা থেকেও রক্ষা করে এবং একমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভরকারী বান্দা হিসেবে আমাদেরকে প্রস্তুত করে।
সাহিল ইবনু আবদুল্লাহ বলেছেন, "যদি কেউ নিজেকে চেনে, তবে সে তার রবের কাছে তার মর্যাদা জানে। যদি কেউ তার মনকে জানে, তবে সে তার এবং তার রবের মধ্যকার অবস্থা সম্পর্কে অবগত।"[৩১]
ইমাম গাযালি বলেন, “হে সত্যানুসন্ধানী, আপনি কখনোই সর্বশক্তিমান আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না, যদি-না আপনি আপনার হৃদয়, আপনার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, আপনার প্রতিটি মুহূর্ত এবং আপনার প্রতিটি নিঃশ্বাসের প্রতি সচেতন না হন।"[৩২]
আহনাফ বিন কায়িস -কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: 'আপনি কীভাবে পবিত্র জ্ঞান আহরণ করেন?'
জবাবে তিনি বলেন, 'আমি নিজের কাছেই মূলত শিখি।'
'সেটা কীভাবে?'
তিনি বলেন, 'যদি আমি অন্যের কোনো কাজকে ঘৃণা করি, তবে আমি কখনোই কারও সাথে ওই ধরনের কাজ করব না। যে নিজেকে জানে, সে তার সর্বশক্তিমান রবকে জানে। আর এটাই অহংকার দূর করার জন্য যথেষ্ট। সে নিজের সম্পর্কে সত্যিকার অর্থে যা-ই জানুক না কেন, সে জানবে, সে সব দিক থেকে ছোট। নম্র, ভদ্র এবং বিনয়ী হওয়া ব্যতীত তার জন্য উপযুক্ত আর কিছুই নেই। যদি সে তার রবকে চেনে, তবে সে জানবে যে, গৌরব ও মহিমা আল্লাহ ছাড়া আর কারও জন্য মানানসই নয়।'[৩৩]
সংক্ষেপে বলা যায়, মানুষের নিজের সত্তা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান তাকে আল্লাহ সম্পর্কে আরও আগ্রহী এবং জ্ঞানী করে তোলে। যে ব্যক্তি তাদের আত্মার অন্তর্নিহিত আসমানি প্রকৃতিকে জানে, সে এর সৃষ্টিকর্তার গুণাবলি জানতে পারবে। প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে আল্লাহর সৃষ্ট রুহ রয়েছে। নবি-রাসূলদের দ্বারা প্রদর্শিত আত্মশুদ্ধির পথ অনুসরণের মাধ্যমে মানুষ এই রুহকে আল্লাহর আনুগত্যের পথে সক্রিয় করতে পারে।
টিকাঃ
[২৬] সূরা সাজদা-৮
[২৭] সূরা হাশর-১৯
[২৮] তাফসীরে আহসানুল বায়ান পৃষ্ঠা নং: ৯৭৪
[২৯] সহিহ মুসলিম: ২৫৫৩
[৩০] সূরা মায়িদা, ৫:১০
[৩১] Hilyat al-Awliya' 10/201
[৩২] ইমাম গাযযালী বিদয়াত আল-হিদায়াহ ১/২৮
[৩৩] ইহইয়া উলূম আল-দীন ৩/৩৫৮
📄 মুসা-এর আত্মসচেতনতা
মূসা ছিলেন বনী ইসরাইলের মাঝে আল্লাহর প্রেরিত নবি। আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ফিরাউনের কাছে আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত পৌঁছে দিতে। মূসা কিছুটা তোতলা ছিলেন এবং তাঁর কথায় জড়তা ছিল। তিনি নিজের এই দুর্বলতা সম্পর্কে জানতেন এবং সময়মতো তা ধরতেও পেরেছিলেন। তাই ফিরাউনের কাছে যাওয়ার আগে তিনি আল্লাহর কাছে এই বলে দুআ করেছিলেন- “হে আমার পালনকর্তা, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। এবং আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করে দিন। যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।” [৩৪]
মূসা শুধু নিজের এই দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। এ ছাড়া তাঁর এই দুর্বলতা যে দাওয়াতি প্রচেষ্টার পথে কিছুটা বিঘ্নতা সৃষ্টি করতে পারে, তাও বুঝেছিলেন।
এভাবেই আমাদের নিজেদের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো কীভাবে আমাদের লক্ষ্য অর্জনে বাধা হতে পারে, তা বুঝতে পারা অত্যন্ত জরুরি।
টিকাঃ
[৩৪] সূরা ত্বহা, ২০:২৫-২৮
📄 আত্মসচেতনতা ও আত্মশুদ্ধি
ইসলামে ব্যক্তির আত্মশুদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর ব্যক্তি নিজের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারার আগ পর্যন্ত তা অর্জিত হতে পারে না। কারণ, নিজের অবস্থা বুঝে উদ্যোগ গ্রহণ করাই হলো আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ। আর আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব এএ একটি আয়াত থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়-
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ * إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ }
"যে দিবসে ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি কোনো উপকারে আসবে না; কিন্তু যে সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে।"[৩৫]
আত্মশুদ্ধির বিষয়ে আল্লাহ আরও বলেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّهَا وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّهَا
"যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে, সেই সফলকাম হয়েছে। এবং যে নিজেকে কলুষিত করেছে, সে হয়েছে ব্যর্থ।”[৩৬]
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى
"নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে সে, যে পরিশুদ্ধ হয়।”[৩৭]
কুরআনের এই আয়াতগুলো থেকে বলা যায়, আত্মশুদ্ধির ওপরেই আমাদের চিরকালীন মুক্তি নির্ভর করছে। আর আত্মসচেতনতা ছাড়া প্রকৃত আত্মশুদ্ধি কখনোই সম্ভব নয়। তাই আত্মশুদ্ধিবিহীন আত্মসচেতনতা সাময়িক ফল দিতে পারে মাত্র; চিরস্থায়ী নয়。
একজন সত্যিকার আত্মসচেতন ব্যক্তি-মাত্রই আল্লাহ-সচেতন (মুত্তাকি)। তার প্রতিটি কাজ করার সময় সে মাথায় রাখে যে, আল্লাহ এর মাধ্যমে সন্তুষ্ট হবেন, নাকি অসন্তুষ্ট! আল্লাহ তাকে সার্বক্ষণিক দেখছেন-এই চিন্তাও তার মধে আত্মসচেতনতা গড়ে দেয়। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ ۚ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
"আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যে কুচিন্তা করে, সে সম্পর্কেও আমি অবগত আছি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনি থেকেও অধিক নিকটবর্তী।"[৩৮]
টিকাঃ
[৩৫] সূরা আশ শুআরা, ২৬:৮৮-৮৯
[৩৬] সূরা শামস, ১১:৯-১০
[৩৭] সূরা আ'লা, ৮৭:১৪
[৩৮] সূরা কাফ, ৫০:১৬
📄 কুরআন যেভাবে আত্মসচেতনতা শেখায়
কুরআনের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ মানুষের পরিচয় দিয়েছেন এবং মানুষের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য ও সত্তাগত আচরণ-অভ্যাস নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। এসবের উদ্দেশ্যই হলো মানুষকে নিজের সত্তা নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং আল্লাহ যেসকল নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, সেগুলো থেকে বের হয়ে আসা। আর ইতিবাচক গুণগুলো অর্জনের চেষ্টা করা। কুরআন মানুষের সত্তাগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে বলেছে,
يُرِيدُ اللَّهُ أَنْ يُخَفِّفَ عَنْكُمْ وَخُلِقَ الْإِنْسَانُ ضَعِيفًا )
"আল্লাহ তোমাদের বোঝা হালকা করতে চান। মানুষ দুর্বলরূপে সৃজিত হয়েছে।"[৩৯]
وَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ الضُّرُّ دَعَانَا لِجَنْبِةٍ أَوْ قَاعِدًا أَوْ قَائِمًا فَلَمَّا كَشَفْنَا عَنْهُ ضُرَّهُ مَرَّكَانَ لَمْ يَدْعُنَا إِلَى ضُرٍ مَّسَّهُ كَذَلِكَ زُيِّنَ لِلْمُسْرِفِينَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
"আর যখন মানুষকে বিপদ স্পর্শ করে, তখন সে শুয়ে, বসে বা দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে। অতঃপর আমি যখন তার বিপদ দূর করে দিই, তখন সে এমনভাবে চলতে থাকে, মনে হয় যেন তাকে কোনো বিপদ স্পর্শ করার কারণে সে আমাকে ডাকেইনি। এভাবেই যারা সীমালঙ্ঘন করে, তাদের জন্য তাদের কাজকর্মগুলো চাকচিক্যময় বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।"[৪০]
وَلَبِنْ أَذَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنَّا رَحْمَةً ثُمَّ نَزَعْنَهَا مِنْهُ إِنَّهُ لَيَوسٌ كَفُورٌ )
"আর যদি আমি মানুষকে আমার পক্ষ থেকে রহমত আস্বাদন করাই, এরপর তার থেকে তা কেড়ে নিই, তাহলে সে হতাশ ও অকৃতজ্ঞ হয়।”[৪১]
لَهُ مُعَقِّبْتٌ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُوْنَهُ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءًا فَلَا مَرَدَّ لَهُ وَ مَا لَهُمْ مِنْ دُونِهِ مِنْ قَالٍ )
"মানুষের সামনে ও পেছনে পাহারাদার নিযুক্ত আছে, যারা আল্লাহর হুকুম মোতাবেক তাকে রক্ষণাবেক্ষণ করে। আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরাই তাদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অকল্যাণ করতে চাইলে তা রদ করার কেউ নেই, আর তিনি ছাড়া তাদের কোনো অভিভাবক নেই।”[৪২]
وَأَتْكُمْ مِنْ كُلِّ مَا سَأَلْتُمُوهُ وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَتَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَظَلُومٌ كَفَّارٌ
“তিনি তোমাদেরকে সে সবকিছুই দিয়েছেন-যা তোমরা চেয়েছো। আর তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করতে চাইলে কক্ষনো তার সংখ্যা নির্ধারণ করতে পারবে না। মানুষ অবশ্যই বড়ই জালিম, বড়ই অকৃতজ্ঞ।”[৪৩]
خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ نُّطْفَةٍ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٌ مُّبِينٌ "তিনি মানবকে এক ফোঁটা বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছেন। অথচ সে প্রকাশ্য ঝগড়াটে সেজে বসল।”[৪৪]
وَيَدْعُ الْإِنْسَانُ بِالشَّرِّ دُعَاءَهُ بِالْخَيْرِ وَكَانَ الْإِنْسَانُ عَجُولًا )
“মানুষ যেভাবে কল্যাণ কামনা করে, সেভাবেই অকল্যাণ কামনা করে। মানুষ তো খুবই তাড়াহুড়ো-প্রবণ।”[৪৫]
وَإِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فِي الْبَحْرِ ضَلَّ مَنْ تَدْعُوْنَ إِلَّا إِيَّاهُ فَلَمَّا نَجَّكُمْ إِلَى الْبَرِّ أَعْرَضْتُمْ وَكَانَ الْإِنْسَانُ كَفُورًا )
"যখন সমুদ্রে তোমাদের ওপর বিপদ আসে, তখন শুধু আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে তোমরা আহ্বান করে থাকো, তারা তোমাদের মন থেকে উধাও হয়ে যায়। অতঃপর তিনি যখন তোমাদেরকে স্থলে ভিড়িয়ে উদ্ধার করে নেন, তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ।”[৪৬]
وَإِذَا أَنْعَمْنَا عَلَى الْإِنْسَانِ أَعْرَضَ وَنَا بِجَانِبِهِ وَإِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ كَانَ يَوْسًا.
"আর আমি যখন মানুষের ওপর নিয়ামত দান করি, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও দূরে সরে যায়। আর যখন তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে খুব হতাশ হয়ে পড়ে।"[৪৭]
قُلْ لَّوْ أَنْتُمْ تَمْلِكُونَ خَزَابِنَ رَّحْمَةِ رَبِّي إِذًا لَّأَمْسَكْتُمْ خَشْيَةَ الْإِنْفَاقِ وَ كَانَ الْإِنْسَانُ قَتُورًا
"বলো, যদি তোমরা আমার রবের রহমতের ভাণ্ডারসমূহের মালিক হতে, তবুও খরচ হয়ে যাওয়ার ভয়ে তোমরা তা আটকে রাখতে। আর মানুষ তো অতি কৃপণ।”[৪৮]
وَلَقَدْ صَرَّفْنَا فِي هَذَا الْقُرْآنِ لِلنَّاسِ مِنْ كُلِّ مَثَلٍ وَكَانَ الْإِنْسَانُ أَكْثَرَ شَيْءٍ جَدَلًا
"...মানুষ সব থেকে অধিক তর্কপ্রিয়।”[৪৯]
خُلِقَ الْإِنْسَانُ مِنْ عَجَلٍ سَأُورِيكُمْ أَيْتِي فَلَا تَسْتَعْجِلُونِ 3
"মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাড়াহুড়ার প্রবণতা দিয়ে। অচিরেই আমি তোমাদেরকে দেখাব আমার নিদর্শনাবলি। সুতরাং তোমরা তাড়াহুড়া কোরো না।"[৫০]
وَهُوَ الَّذِي أَحْيَاكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ إِنَّ الْإِنْسَانَ تَكَفُورٌ
"তিনিই তোমাদেরকে জীবিত করেছেন, অতঃপর তিনিই তোমাদেরকে মৃত্যুদান করবেন ও পুনরায় জীবিত করবেন। নিশ্চয়ই মানুষ বড় অকৃতজ্ঞ।”[৫১]
إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَنْ يَحْمِلْنَهَا وَ أَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنْسَانُ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا
"আমি আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে এই আমানত পেশ করেছিলাম, অতঃপর তারা একে বহন করতে অস্বীকার করল এবং এতে ভীত হলো। কিন্তু মানুষ তা বহন করল। নিশ্চয়ই সে জালিম, অজ্ঞ।[৫২]
وَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ ضُرًّا دَعَا رَبَّهُ مُنِيبًا إِلَيْهِ ثُمَّ إِذَا خَوَّلَهُ نِعْمَةً مِنْهُ نَسِيَ مَا كَانَ يَدْعُوا إِلَيْهِ مِنْ قَبْلُ وَجَعَلَ لِلَّهِ أَنْدَادًا لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيْلِهِ قُلْ تَمَتَّعُ بِكُفْرِكَ قَلِيلًا إِنَّكَ مِنْ أَصْحُبِ النَّارِ (প)
“আর যখন মানুষকে স্পর্শ করে দুঃখ-দুর্দশা, তখন সে একাগ্রচিত্তে তার রবকে ডাকে। তারপর তিনি যখন তাকে নিজের পক্ষ থেকে নিয়ামত দান করেন, তখন সে ভুলে যায়- ইতিপূর্বে কী কারণে তাঁর কাছে দুআ করেছিল, আর আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করে, তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য। বলো, তোমার কুফরি উপভোগ করো ক্ষণকাল; নিশ্চয়ই তুমি জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত।”[৫৩]
فَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ ضُرِّ دَعَانَا ثُمَّ إِذَا خَوَّلْنَهُ نِعْمَةٌ مِنَّا قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ بَلْ هِيَ فِتْنَةٌ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ (১)
“মানুষকে বিপদাপদ স্পর্শ করলে আমাকে ডাকে। অতঃপর আমি যখন তাকে আমার পক্ষ থেকে নিয়ামত দিয়ে ধন্য করি, তখন সে বলে ওঠে- 'আমার জ্ঞান-গরিমার বদৌলতেই আমাকে তা দেওয়া হয়েছে।' না, তা নয়। এটা একটা পরীক্ষা। কিন্তু তাদের অধিকাংশই বুঝে না।”[৫৪]
لَا يَسْتَمُ الْإِنْسَانُ مِنْ دُعَاءِ الْخَيْرِ وَإِنْ مَّسَّهُ الشَّرُّ فَيَتُوسٌ قَنُوطٌ (এ)
“মানুষ উন্নতি কামনায় ক্লান্ত হয় না।”[৫৫]
وَإِذَا أَنْعَمْنَا عَلَى الْإِنْسَانِ أَعْرَضَ وَنَ بِجَانِبِهِ وَإِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ فَذُو دُعَاءِ عَرِيض (৫)
"আমি যখন মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করি, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং পার্শ্ব পরিবর্তন করে। আর যখন তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সুদীর্ঘ দুআ করতে থাকে।”[৫৬]
فَإِنْ أَعْرَضُوا فَمَا أَرْسَلْنَكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا إِنْ عَلَيْكَ إِلَّا الْبَلْغُ وَإِنَّا إِذَا اذَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنَّا رَحْمَةً فَرِحَ بِهَا وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ فَإِنَّ الْإِنْسَانَ كَفُورٌ
“যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আপনাকে আমি তাদের রক্ষক করে পাঠাইনি। আপনার কর্তব্য কেবল প্রচার করা। আমি যখন মানুষকে আমার রহমত আস্বাদন করাই, তখন সে উল্লসিত হয়। আর যখন তাদের কৃতকর্মের কারণে তাদের কোনো অনিষ্ট ঘটে, তখন মানুষ খুব অকৃতজ্ঞ হয়ে যায়।”[৫৭]
وَجَعَلُوا لَهُ مِنْ عِبَادِهِ جُزْءًا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَكَفُورٌ مُّبِينٌ )
"তারা আল্লাহর বান্দাদের মধ্য থেকে আল্লাহর শরিক স্থির করেছে। বাস্তবিকই মানুষ স্পষ্ট অকৃতজ্ঞ।”[৫৮]
وَجَعَلُوا لَهُ مِنْ عِبَادِهِ جُزْءًا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَكَفُورٌ مُّبِينٌ
“মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে খুবই অস্থিরমনা করে।”[৫৯]
بَلْ يُرِيدُ الْإِنسَانُ لِيَفْجُرَ أَمَامَهُ
"বরং মানুষ তার ভবিষ্যৎ জীবনেও ধৃষ্টতা করতে চায়।”[৬০]
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي كَبَدٍ
"নিশ্চয়ই আমি মানুষকে শ্রমনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি।”[৬১]
كَلَّا إِنَّ الْإِنسَانَ لَيَطْغَى الله
"সত্যি সত্যি মানুষ সীমালঙ্ঘন করে।”[৬২]
إِنَّ الْإِنسَانَ لِرَبِّهِ لَكَنُودٌ
"নিশ্চয়ই মানুষ তার পালনকর্তার প্রতি অকৃতজ্ঞ।”[৬৩]
এ ছাড়াও কুরআনের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ বিশ্বজগৎ ও আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে বলেছেন। এর উদ্দেশ্য হলো, সৃষ্টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করার মাধ্যমে নিজেদের ক্ষুদ্রতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া। বিশ্বজগতের যে একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন, তাঁর নির্দেশ মেনে চলতে যে আমরা বাধ্য – এই বোধ নিজের মধ্যে নিয়ে আসা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَتَخْرَ لَكُمْ مَّا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مِنْهُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَايَتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
"আর যা কিছু রয়েছে আসমানে এবং যা কিছু রয়েছে জমিনে, তার সবই তিনি তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। চিন্তাশীল কওমের জন্য নিশ্চয়ই এতে নিদর্শন রয়েছে।”[৬৪]
وَفِي الْأَرْضِ أَيَتٌ لِلْمُوْقِنِينَ وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ
"বিশ্বাসকারীদের জন্যে পৃথিবীতে নিদর্শনাবলি রয়েছে এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও; তোমরা কি অনুধাবন করবে না?”[৬৫]
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لِعِبِينَ مَا خَلَقْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
"আমি আকাশ, জমিন আর এদের মাঝে যা আছে—সেসব খেল-তামাশার ফলে সৃষ্টি করিনি। আমি এ দুটোকে যথাযথভাবেই সৃষ্টি করেছি। কিন্তু তাদের অধিকাংশেই তা জানে না।”[৬৬]
وَخَلَقَ اللَّهُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ وَلِتُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ )
"আর আল্লাহ আসমান ও জমিনকে যথার্থভাবে সৃষ্টি করেছেন। যাতে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কৃতকর্ম অনুযায়ী প্রতিফল দেওয়া যেতে পারে, আর তাদের প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না।”[৬৭]
فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِأَيْتِهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْمُجْرِمُونَ
"কাজেই, যে আল্লাহর ওপর মিথ্যা রটনা করে অথবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে, তার চেয়ে বড় জালিম আর কে? নিশ্চয়ই অপরাধীরা সফল হবে না।”[৬৮]
আরও অসংখ্য আয়াতে এভাবেই মহান আল্লাহ আমাদেরকে সচেতন হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন。
টিকাঃ
[৩৯] সূরা নিসা, ৪:২৮
[৪০] সূরা ইউনূস, ১০:১২
[৪১] সূরা হূদ, ১১:০৯
[৪২] সূরা রাদ, ১৩: ১১
[৪৩] সূরা ইবরাহীম, ১৪:৩৪
[৪৪] সূরা নাহল, ১৬:৪
[৪৫] সূরা ইসরা, ১৭:১১
[৪৬] সূরা ইসরা, ১৭:৬৭
[৪৭] সূরা ইসরা, ১৭:৮৩
[৪৮] সূরা ইসরা, ১৭:১০০
[৪৯] সূরা কাহফ, ১৮:৫৪
[৫০] সূরা আম্বিয়া, ২১:৩৭
[৫১] সূরা হাজ্জ, ২২:৬৬
[৫২] সূরা আহযাব, ৩৩:৭২
[৫৩] সূরা যুমার, ৩৯:৮
[৫৪] সূরা যুমার, ৩৯:৪৯
[৫৫] সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৪৯
[৫৬] সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৫১
[৫৭] সূরা শুরা, ৪২:৪৮
[৫৮] সূরা যুখরুফ, ৪৩:১৫
[৫৯] সূরা মা'আরিজ, ৭০:১৯
[৬০] সূরা কিয়ামাহ, ৭৫:৫
[৬১] সূরা বালাদ, ৯০:৪
[৬২] সূরা আলাক, ৯৬:৬
[৬৩] সূরা আদিয়াত, ১০০:৬
[৬৪] সূরা জাসিয়া, ৪৫:১৩
[৬৫] সূরা যারিয়াত, ৫১:২০-২১
[৬৬] সূরা দুখান, ৪৪: ৩৮-৩৯
[৬৭] সূরা জাসিয়া, ৪৫:২২
[৬৮] সূরা ইউনুস, ১০:১৭