📄 ‘আত্মসচেতনতা’ কীভাবে অর্জন করা যায়?
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। কারণ, আত্মসচেতনতা কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়—যা কেবল মুখস্থের মাধ্যমে অর্জন করা যায়। বরং ক্রমাগত লেগে থাকা ও চর্চার মাধ্যমেই ব্যক্তি আত্মসচেতন হয়ে ওঠে। আত্মসচেতনতা অর্জনের এই দীর্ঘ প্রয়াসকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোতে নিয়ে আসার জন্য সমকালীন বিশেষজ্ঞগণ গবেষণা করে বিভিন্ন তত্ত্ব ও পদ্ধতি দিয়েছেন। আত্মসচেতনতা অর্জনের এমনই দুটি সমকালীন পদ্ধতি আমরা এখানে আলোচনা করব। এই দুটি পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে আত্মসচেতনতা অর্জন ও নিজের আত্মসচেতনতার স্তরকে বাড়ানো সম্ভব。
**'জো-হ্যারি' উইন্ডো মডেল ব্যবহার করে:**
'জোসেফ' এর 'জো' এবং 'হ্যারিংটন' এর 'হ্যারি' এর সমন্বয়ে 'জো-হ্যারি' উইন্ডো মডেলের নামকরণ। জো-হ্যারি উইন্ডো মডেলটি একটি দলের ব্যক্তিদের মধ্যে আত্মসচেতনতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া চিহ্নিত ও উন্নত করার জন্য একটি সহজ এবং দরকারি হাতিয়ার।
[সূত্র: https://www.selfawareness.org.uk/news/understanding-the-johari-window-model]
এই মডেলের প্রথম জানালাটি হলো 'উন্মুক্ত' (Open)। এই জানালায় আপনি আপনার ওই সমস্ত আবেগকে রাখুন, যেগুলো সম্পর্কে আপনার মতো অন্যরাও জানে।
দ্বিতীয় জানালাটিকে বলা হয় 'অন্ধকারাচ্ছন্ন' (Blind)। এখানে আপনার ওই সমস্ত আবেগকে রাখুন, যা অন্যেরা জানে; কিন্তু আপনি জানেন না। আপনার সম্পর্কে সচেতনতায় অন্যরা আপনার ব্যাপারে কী ভাবছে, সেই প্রতিক্রিয়া বা সমালোচনা আপনার সচেতনতাকে সমৃদ্ধ করবে। যেমন: হয়তো আপনি সচেতনভাবে কখনো ভাবেননি যে, আপনি অল্পতে রেগে যান। আপনার সহকর্মী বা কাছের মানুষ আপনাকে সততার সঙ্গে তা বলার পরই কেবল আপনি সেটা অনুধাবন করতে পারলেন। এজন্য নিজের সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে জানতে হলে আপনার সহকর্মী বা কাছের মানুষের সমালোচনা, প্রতিক্রিয়া ও ফিডব্যাক নিন。
Known by self Unknown by self
Known by others unknown by others 1 open/free area Feedback solicitation 2 blind area
Self-disclosure/exposure Shared discovery Others' Observation
hidden area unknown area
3 Self-discovery 4
তৃতীয় জানালায় আপনার ব্যাপারে ওই সমস্ত তথ্যগুলোকে রাখুন, যেগুলো শুধু আপনি জানেন, অন্যেরা জানে না। এটার নাম 'লুক্কায়িত' (Hidden)।
চতুর্থ জানালাটি হলো 'অজ্ঞাত' (Unknown)। এটি আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি করার আরেকটি চমৎকার জানালা। এই জানালায় আপনার ব্যাপারে ওই সমস্ত তথ্যগুলোকে রাখুন, যেগুলো আপনি এবং অন্যরা কেউ জানে না। আত্মসমালোচনা এবং নিজেকে নিয়ে গভীর ভাবনা এই অজ্ঞাত জানালাটা খুলে দিতে আপনাকে সাহায্য করবে।
**SWOT Analysis:**
SWOT Analysis পদ্ধতি প্রথম অ্যালবার্ট হামফ্রে প্রস্তাব করেছিলেন। এই বিশ্লেষণের দুটো দিক-আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক। আভ্যন্তরীণ দিকটি সক্ষমতা (Strength) এবং দুর্বলতা (Weakness) বিষয়ক। বাহ্যিক দিকটি সুযোগ (Opportunity) এবং ঝুঁকি (Threat) সংক্রান্ত। যেকোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বা প্রজেক্টের সফলতার সম্ভাবনা ও করণীয় নির্ণয়ে SWOT বিশ্বব্যাপী বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি। সক্ষমতা ও সুযোগ হচ্ছে যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সহায়ক বিষয়াদির পর্যালোচনা। অপরদিকে দুর্বলতা ও ঝুঁকি হচ্ছে ক্ষতিকর বিষয়াদির পর্যালোচনা। এই চারটি বিষয়ে যে যত বেশি এবং যথাযথভাবে ওয়াকিবহাল থাকতে পারবে, তার আত্ম-পর্যালোচনা তত ভালো হবে, আত্মসচেতনতা তত নিখুঁত হবে। এখানে আমরা একটি প্রতিষ্ঠানের SWOT Analysis এর নমুনা দেখি। একইভাবে ব্যক্তিপর্যায়েও এর মাধ্যমে নিজের সম্পর্কে চমৎকার ধারণা পাওয়া সম্ভব。
| Strength (সক্ষমতা) | Weakness (দুর্বলতা) | Opportunity (সুযোগ) | Threat (ঝুঁকি) |
|---|---|---|---|
| ১। যে কাজগুলো আপনার প্রতিষ্ঠান দারুণভাবে করতে পারে, সেগুলোই প্রতিষ্ঠানের শক্তি। | ১। যে বিষয়গুলোতে প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি রয়েছে, সেগুলোই দুর্বলতা। | ১। বাজারে নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের অপর্যাপ্ততা, যা নিয়ে এসে বাজারে ভালো অবস্থান দখল করা যায়। | ১। প্রতিযোগী বাড়তে থাকা। |
| ২। এমন বৈশিষ্ট্য, যা আপনাকে বাকি দশজন প্রতিযোগী থেকে সম্পূর্ণ অনন্য করে তোলে। | ২। যে কাজগুলোতে আপনার প্রতিযোগীরা আপনার তুলনায় অনেক এগিয়ে। | ২। নিজস্ব এলাকায় প্রতিযোগীর পরিমাণ কম হওয়া। | ২। অনুকূল পরিবেশের পরিবর্তন। |
| ৩। বুদ্ধিমান ও দক্ষ ৩। সম্পদের ৩। কোম্পানির পণ্য ৩। কর্মী প্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতা। বা সেবার চাহিদা নেতিবাচক প্রচারণা শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। বাড়তে থাকা। |
| ৪। চটপটে ৪। বিশেষ কোনো ৪। মিডিয়াতে ৪। কর্মী লোকজন, লক্ষ্য না থাকা। কোম্পানির প্রচারণা। প্রতিষ্ঠানের প্রতি কাস্টমারের প্রয়োজনীয় মূলধন, আস্থা কমে আসা। আধুনিক প্রযুক্তিগত বিদ্যা-এগুলো প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান সম্পদ ও শক্তি। | | | |
📄 আত্মসচেতনতার ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
আত্মসচেতনতার প্রথম এবং প্রধান ধাপ হলো নিজের জীবনের উদ্দেশ্য বোঝা। আমি কে, কোথা থেকে এলাম, আর কোথায় যাব। সৃষ্টির শুরু হতে মানুষের মনে ঘুরপাক খাওয়া এই প্রশ্নগুলোর সঠিক এবং যথার্থ উত্তরের মধ্যে আত্মসচেতনতার বীজ লুকিয়ে আছে। আধ্যাত্মিক এ প্রশ্নগুলোর উত্তরের মধ্যে আত্মসচেতনতাকে প্রাথমিকভাবে উপলব্ধি করতে হবে। তারপর তার আদলে জীবনের অন্য বিষয়গুলোকে ঢেলে সাজানোর মধ্যে দিয়ে এটি বিকাশ লাভ করবে।
নবি-রাসূলরা সব সময় তাঁদের দাওয়াতের শুরুতেই এ প্রশ্নগুলোর সোজাসাপটা ব্যাখ্যা দিয়ে পরবর্তী কার্যক্রমে গিয়েছেন। নববি ধারাবাহিকতায় রাসূলুল্লাহ ﷺ ব্যতিক্রম ছিলেন না। আত্মসচেতনতার মাধ্যমে স্রষ্টার প্রতি সচেতনতার সূত্রপাত করাই নববি কর্মনীতি।
আরবি প্রবাদে আছে, "যে নিজেকে জানে, সে তার রবকে জানে।" আল্লাহ তাআলা বলেন, "অতঃপর তিনি তাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছেন, আর তার ভেতরে স্বীয় রুহ হতে ফুঁক দিয়েছেন।” [২৬]
মানবসত্তা যে একটা সুন্দর এবং সম্মানিত সৃষ্টি-তা এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায়। আল্লাহর রুহের উপস্থিতি মানব-জন্মকে সম্মানিত করেছে। এজন্যই নিজেকে জানার মধ্যে স্রষ্টার রহস্য ভেদের চাবি আছে। ইমাম গাযালি তাঁর ইহইয়া উলুমুদ্দিন-এ বলেছেন:
আত্মার রহস্য যে জানে, সে নিজেকে জানে। যদি সে নিজেকে চেনে, তবে সে তার প্রভুকে জানে। যদি সে নিজেকে এবং তার প্রভুকে জানে, তবে সে জানে যে, তার ব্যাপারটি তার প্রকৃতি এবং প্রবৃত্তিতে আসমানি গুণে গুণান্বিত।
"আর তোমরা তাদের মতো হোয়ো না—যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন। তারাই তো ফাসিক।”[২৭]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় এসেছে: “আল্লাহ শাস্তিস্বরূপ তাদেরকে এমন করে দিলেন যে, তারা এমন সব কাজ করা থেকে উদাসীন হয়ে গেল—যাতে ছিল তাদের উপকার এবং যার দ্বারা তারা নিজেদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাতে পারত। এইভাবে মানুষ আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার দ্বারা আসলে নিজেকেই ভুলে যায়। তার জ্ঞান-বুদ্ধি তাকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দেয় না। চোখ দুটি তাকে সঠিক পথ দেখায় না এবং তার কান সত্য কথা শুনতে বধির হয়ে যায়। ফলে তার দ্বারা এমন কাজ হয়ে যায়, যাতে থাকে তার নিজেরই ধ্বংস ও বিনাশ।”[২৮]
যারা নিজ অস্তিত্বের সূচনাকে ভুলে পার্থিব জীবনের মোহে ডুবে থাকে, নিঃসন্দেহে তারা চূড়ান্ত মাত্রার অসচেতন, গাফিল। কারণ, রবের সান্নিধ্য লাভের মাধ্যমে মানুষ হতে পারে সর্বোচ্চ পর্যায়ের আত্মসচেতন। সঠিক আর ভুলের মধ্যকার পার্থক্য বোঝার মতো সাধারণ নির্দেশনাগুলো মানুষ রবের সান্নিধ্যের প্রভাবেই পেয়ে থাকে। আর মানুষ যখন তার সৃষ্টিকর্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন ভালো-মন্দের জ্ঞানও হারিয়ে ফেলে।
এখন, যে প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবে মাথায় চলে আসবে—তা হলো, মানুষ কীভাবে তাদের দুর্বলতাগুলো জানতে পারে এবং ভুলগুলো মেনে নিয়ে সংশোধনের পথে পা বাড়াতে পারে। ওয়াবিসা ইবনু মাবদ থেকে বর্ণিত, 'আমি আল্লাহর রাসূল-এর কাছে গেলাম। তিনি বললেন, "তুমি নেক আমল সম্পর্কে জানতে এসেছো?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন, "নিজেকে নিজে এই প্রশ্ন করো। নেক আমল আমাদের রূহে প্রশান্তি এনে দেয়, আর গুনাহের কাজ এনে দেয় অস্থিরতা। মানুষ যতই সেই গুনাহকে মহিমান্বিত করে কথা বলুক না কেন, কাজটা না ছাড়া পর্যন্ত আমাদের রুহ অস্থিরভাবে বুকের এপাশ থেকে ওপাশে ছুটোছুটি করতে থাকে।"[২৯]
মানুষ যখন সত্যিকার অর্থেই আল্লাহর নিকটবর্তী হতে চেষ্টা করে, তখন অন্তত মানুষকে তাঁর নিজের ব্যাপারেও আত্মসচেতন করে দেয়। এই ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“হে মুমিনগণ! তোমাদের দায়িত্ব তোমাদের ওপর। যদি তোমরা সঠিক পথে থাকো, তাহলে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে, সে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহর দিকেই তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যা করছিলে, সে সম্পর্কে তোমাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হবে।"[৩০]
অর্থাৎ মানুষ যদি নিজেদেরকে নিয়ে চিন্তা করে বা আত্মসচেতন হয়, তবে অন্যদের ভ্রান্তি তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এভাবে আত্মসচেতনতা আমাদেরকে অন্যের পক্ষ থেকে আসা বিপদাপদ, যাবতীয় ভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতা থেকেও রক্ষা করে এবং একমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভরকারী বান্দা হিসেবে আমাদেরকে প্রস্তুত করে।
সাহিল ইবনু আবদুল্লাহ বলেছেন, "যদি কেউ নিজেকে চেনে, তবে সে তার রবের কাছে তার মর্যাদা জানে। যদি কেউ তার মনকে জানে, তবে সে তার এবং তার রবের মধ্যকার অবস্থা সম্পর্কে অবগত।"[৩১]
ইমাম গাযালি বলেন, “হে সত্যানুসন্ধানী, আপনি কখনোই সর্বশক্তিমান আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না, যদি-না আপনি আপনার হৃদয়, আপনার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, আপনার প্রতিটি মুহূর্ত এবং আপনার প্রতিটি নিঃশ্বাসের প্রতি সচেতন না হন।"[৩২]
আহনাফ বিন কায়িস -কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: 'আপনি কীভাবে পবিত্র জ্ঞান আহরণ করেন?'
জবাবে তিনি বলেন, 'আমি নিজের কাছেই মূলত শিখি।'
'সেটা কীভাবে?'
তিনি বলেন, 'যদি আমি অন্যের কোনো কাজকে ঘৃণা করি, তবে আমি কখনোই কারও সাথে ওই ধরনের কাজ করব না। যে নিজেকে জানে, সে তার সর্বশক্তিমান রবকে জানে। আর এটাই অহংকার দূর করার জন্য যথেষ্ট। সে নিজের সম্পর্কে সত্যিকার অর্থে যা-ই জানুক না কেন, সে জানবে, সে সব দিক থেকে ছোট। নম্র, ভদ্র এবং বিনয়ী হওয়া ব্যতীত তার জন্য উপযুক্ত আর কিছুই নেই। যদি সে তার রবকে চেনে, তবে সে জানবে যে, গৌরব ও মহিমা আল্লাহ ছাড়া আর কারও জন্য মানানসই নয়।'[৩৩]
সংক্ষেপে বলা যায়, মানুষের নিজের সত্তা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান তাকে আল্লাহ সম্পর্কে আরও আগ্রহী এবং জ্ঞানী করে তোলে। যে ব্যক্তি তাদের আত্মার অন্তর্নিহিত আসমানি প্রকৃতিকে জানে, সে এর সৃষ্টিকর্তার গুণাবলি জানতে পারবে। প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে আল্লাহর সৃষ্ট রুহ রয়েছে। নবি-রাসূলদের দ্বারা প্রদর্শিত আত্মশুদ্ধির পথ অনুসরণের মাধ্যমে মানুষ এই রুহকে আল্লাহর আনুগত্যের পথে সক্রিয় করতে পারে।
টিকাঃ
[২৬] সূরা সাজদা-৮
[২৭] সূরা হাশর-১৯
[২৮] তাফসীরে আহসানুল বায়ান পৃষ্ঠা নং: ৯৭৪
[২৯] সহিহ মুসলিম: ২৫৫৩
[৩০] সূরা মায়িদা, ৫:১০
[৩১] Hilyat al-Awliya' 10/201
[৩২] ইমাম গাযযালী বিদয়াত আল-হিদায়াহ ১/২৮
[৩৩] ইহইয়া উলূম আল-দীন ৩/৩৫৮
📄 মুসা-এর আত্মসচেতনতা
মূসা ছিলেন বনী ইসরাইলের মাঝে আল্লাহর প্রেরিত নবি। আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ফিরাউনের কাছে আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত পৌঁছে দিতে। মূসা কিছুটা তোতলা ছিলেন এবং তাঁর কথায় জড়তা ছিল। তিনি নিজের এই দুর্বলতা সম্পর্কে জানতেন এবং সময়মতো তা ধরতেও পেরেছিলেন। তাই ফিরাউনের কাছে যাওয়ার আগে তিনি আল্লাহর কাছে এই বলে দুআ করেছিলেন- “হে আমার পালনকর্তা, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। এবং আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করে দিন। যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।” [৩৪]
মূসা শুধু নিজের এই দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। এ ছাড়া তাঁর এই দুর্বলতা যে দাওয়াতি প্রচেষ্টার পথে কিছুটা বিঘ্নতা সৃষ্টি করতে পারে, তাও বুঝেছিলেন।
এভাবেই আমাদের নিজেদের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো কীভাবে আমাদের লক্ষ্য অর্জনে বাধা হতে পারে, তা বুঝতে পারা অত্যন্ত জরুরি।
টিকাঃ
[৩৪] সূরা ত্বহা, ২০:২৫-২৮
📄 আত্মসচেতনতা ও আত্মশুদ্ধি
ইসলামে ব্যক্তির আত্মশুদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর ব্যক্তি নিজের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারার আগ পর্যন্ত তা অর্জিত হতে পারে না। কারণ, নিজের অবস্থা বুঝে উদ্যোগ গ্রহণ করাই হলো আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ। আর আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব এএ একটি আয়াত থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়-
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ * إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ }
"যে দিবসে ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি কোনো উপকারে আসবে না; কিন্তু যে সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে।"[৩৫]
আত্মশুদ্ধির বিষয়ে আল্লাহ আরও বলেন,
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّهَا وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّهَا
"যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে, সেই সফলকাম হয়েছে। এবং যে নিজেকে কলুষিত করেছে, সে হয়েছে ব্যর্থ।”[৩৬]
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى
"নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে সে, যে পরিশুদ্ধ হয়।”[৩৭]
কুরআনের এই আয়াতগুলো থেকে বলা যায়, আত্মশুদ্ধির ওপরেই আমাদের চিরকালীন মুক্তি নির্ভর করছে। আর আত্মসচেতনতা ছাড়া প্রকৃত আত্মশুদ্ধি কখনোই সম্ভব নয়। তাই আত্মশুদ্ধিবিহীন আত্মসচেতনতা সাময়িক ফল দিতে পারে মাত্র; চিরস্থায়ী নয়。
একজন সত্যিকার আত্মসচেতন ব্যক্তি-মাত্রই আল্লাহ-সচেতন (মুত্তাকি)। তার প্রতিটি কাজ করার সময় সে মাথায় রাখে যে, আল্লাহ এর মাধ্যমে সন্তুষ্ট হবেন, নাকি অসন্তুষ্ট! আল্লাহ তাকে সার্বক্ষণিক দেখছেন-এই চিন্তাও তার মধে আত্মসচেতনতা গড়ে দেয়। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ ۚ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
"আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যে কুচিন্তা করে, সে সম্পর্কেও আমি অবগত আছি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনি থেকেও অধিক নিকটবর্তী।"[৩৮]
টিকাঃ
[৩৫] সূরা আশ শুআরা, ২৬:৮৮-৮৯
[৩৬] সূরা শামস, ১১:৯-১০
[৩৭] সূরা আ'লা, ৮৭:১৪
[৩৮] সূরা কাফ, ৫০:১৬