📄 ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের নেতিবাচকতা
"যেকোনো দক্ষতার মতো, মানুষকে বুঝতে এবং পড়তে পারার ক্ষমতাও একসাথে ভালো বা মন্দের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।" - এডাম গ্র্যান্ট
নতুন নতুন গবেষণাগুলো আমাদেরকে বলে, মানুষরা যখন তাদের মানসিক দক্ষতাকে উন্নত করে, তখন তারা অন্যদেরকে নিপুণভাবে পরিচালনা (Manipulate) করার ক্ষেত্রেও আরও চৌকশ হয়ে ওঠে। আপনি যখন নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন, আপনি তখন আপনার সত্যিকারের অনুভূতিগুলোকে মুখোশের আড়ালে ঢাকার কারুকার্য শিখে যাবেন। যখন আপনি জানেন যে, অন্যরা কী অনুভব করছে, কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, আপনি তাদেরকে হৃদয়ের টানে টানতে পারেন এবং তাদের নিজেদেরকে নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করতে পারেন। ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের অন্ধকার দিকটি মানুষের মধ্যে ইমোশনাল ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
এই ইমোশনাল ম্যানিপুলেশনের আচরণটি বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে। কারও আত্মবিশ্বাস, আত্ম-মূল্যায়ন, আত্ম-দক্ষতাকে নিজের সাময়িক ফায়দা হাসিলের জন্য নষ্ট করে দেওয়াও এক ধরনের ইমোশনাল ম্যানিপুলেশন। অনেক সময় কারও ইগোকে জাগিয়ে দিয়ে তার মধ্যে অহংবোধের জন্ম দিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধিও ইমোশনাল ম্যানিপুলেশনের মধ্যেই পড়ে। আবার কাউকে অতিরিক্ত প্রশংসা এবং তোষামোদ করে তার মধ্য থেকে নিজের গোপন স্বার্থ হাসিল করাও এ ধরনের ম্যানিপুলেশনের ক্যাটাগরিতে পড়ে।
একটি কোম্পানিতে এই ইমোশনাল ম্যানিপুলেশনের বিষয়টি এভাবে কাজ করে যে, মানুষ যখন আরেকজনের আবেগ-অনুভূতি বুঝতে পারে এবং নিজের আবেগ প্রকাশ এবং নিয়ন্ত্রণে দক্ষ হয়—তখন সে কৌশলী পদক্ষেপে যেকোনো পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত লাভ হাসিলের পাঁয়তারা করে।
গবেষকরা কিংবা বিজ্ঞানীরা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে অনেক কথা এবং গবেষণা প্রকাশ করলেও এর অন্ধকার দিকটি নিয়ে খুব একটা কাজ করেন না। আস্তে আস্তে যদিও এই ট্রেন্ড পরিবর্তন হচ্ছে এবং এখন অনেকে এর অন্ধকার দিক নিয়েও কথা বলা শুরু করেছেন।
সমাজবিজ্ঞানীরাও ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের এই অন্ধকার দিকটি নিয়ে কাজ করতে শুরু করেছেন। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোচেন মেন্সেসের নেতৃত্বে একদল তরুণ উদীয়মান গবেষক দল দেখিয়েছেন, যখন একজন নেতা আবেগে ভরা একটি মোটিভেশনাল বক্তৃতা দেন, তখন শ্রোতাদের মূল বক্তব্যটি যাচাই করার সম্ভাবনা একদমই কম থাকে। বক্তব্যের বিষয়বস্তুও কম মনে রাখে তারা। শ্রোতারা বক্তৃতা দ্বারা এতটাই অনুপ্রাণিত হয় যে, বক্তৃতার সত্য-মিথ্যার প্রতি খুব একটা মনোযোগ না দিয়ে বক্তৃতাটাই বেশি মনে রাখে।
আবেগের শক্তিকে স্বীকৃতি দিয়ে এক গবেষক বিশ শতকের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার বডি ল্যাংগুয়েজের প্রভাবগুলো অধ্যয়ন করতে গিয়ে কয়েক বছর কাটিয়েছেন। তিনি হিটলারের হাতের অঙ্গভঙ্গি অনুশীলন করা এবং তার নড়াচড়ার চিত্র বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে আসেন—এই জগদ্বিখ্যাত ব্যক্তিটি একজন জাদুকরী গুণসম্পন্ন পাবলিক স্পিকার। তিনি বক্তব্যে অন্যদের মধ্যে এক জাদুকরী আবহের সৃষ্টি করতেন। আর এই গুণটি এমন এক বিষয়—যা তিনি কঠোর সাধনা এবং অধ্যবসায় দ্বারা রপ্ত করতে পেরেছিলেন।
চৌকশ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ব্যক্তিরা তাদের চারপাশের লোকদের সম্পর্কে এতটাই সচেতন যে, তারা অনেক সময় তাদের খারাপ আচরণগুলোকে সংশোধন করতে—এমনকি বলতেও অনীহা বোধ করে। তারা জানে যে, এমন কথা বলে তারা নিজেদের জনপ্রিয়তা হারাবে। এজন্য তারা এসব থেকে দূরে থাকে। একটা প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের ঊর্ধ্বতন কেউ যদি বেশি বুদ্ধিমত্তাগিরি দেখিয়ে তার অধীনস্থদেরকে শুধরে না দেয়, তাহলে যথাযথ কর্মী তৈরি হবে না। এই যে "Bad guy" না হওয়ার প্রবণতা—এটা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের একটা অন্ধকার দিক।
অপরদিকে নবি-রাসূলরা ছিলেন ভারসাম্যপূর্ণ ইন্টেলিজেন্সের অধিকারী। এই দুনিয়াতে নবিগণের আগমনের একটা মুখ্য মিশন হচ্ছে, সৎকাজের আদেশ করা এবং অসৎকাজে নিষেধ করা। 'কারও কাছে ভালো/খারাপ হব'—এই বিবেচনায় নবি-রাসূলরা কখনও দাওয়াত দেননি। তাঁরা সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজে নিষেধ করে গেছেন। কাউকে খুশি করা কিংবা দুঃখিত করা তাঁদের ধর্তব্যে ছিল না। স্থান, কাল, পাত্রভেদে দাওয়াতি বক্তব্য মানুষের মধ্যে কীরূপ প্রভাব ফেলবে—এটা নিয়ে তাঁরা সচেতন ছিলেন।