📄 ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের উপাদানসমূহ
গোলম্যান (১৯৯৫) ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের পাঁচটি উপাদান প্রস্তাব করেন। যদি কারও মাঝে এই পাঁচটি গুণ থাকে, তবে বলা যেতে পারে, তিনি একজন Emotionally Intelligent মানুষ। অর্থাৎ, অনুভূতির দিক থেকে তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণ। উপাদানগুলো হলো:
* আত্মসচেতনতা (Self-awareness)
* আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-regulation)/ আত্মব্যবস্থাপনা (Self-management)
* আত্ম-অনুপ্রেরণা (Self-motivation)
* সহমর্মিতা (Empathy)
* সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতা (Social skill)
সাম্প্রতিক গবেষণায়, মেয়ার এবং স্যালোভেরী (১৯৯৭) নিজেদের মতো করে EI-এর পাঁচটি উপাদান প্রস্তাব করেন। যার মধ্যে Goleman এর প্রস্তাবিত উপাদানগুলোর তিনটি রয়েছে, এর সাথে তারা দুটি উপাদান নতুন করে সংযুক্ত করেছেন। Mayer and Salovey এর উপাদানগুলো হলো:
* আত্মসচেতনতা (Self-awareness)
* আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-regulation) / আত্মব্যবস্থাপনা (Self-management)
* আত্ম-অনুপ্রেরণা বা স্ব-প্রণোদনা (Self-motivation)
* অন্যের ইমোশনগুলো বোঝা (recognizing emotions in others)
* সম্পর্কগুলোকে সতেজ রাখা (handling relationships)
আমরা পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে এসকল উপাদান সম্পর্কে বিস্তারিত জানব। এখন শুধুমাত্র এই উপাদানগুলোর নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় জেনে রাখাই যথেষ্ট হবে।
» আত্মসচেতনতা: আত্মসচেতনতা হলো নিজের আবেগকে বুঝতে পারা, নিজের সক্ষমতা ও ব্যক্তিত্বের ধরন সম্পর্কে জানা। এই উপাদানটির সাথে আত্ম-মূল্যায়ন এবং আত্মবিশ্বাসের বিষয়াদিও জড়িত।
» আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আত্মব্যবস্থাপনা: নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা।
» আত্ম-অনুপ্রেরণা: কাজের জন্য নিজের ভেতর থেকে একটা তীব্র তাড়না বোধ করা এবং প্রতিটি কাজ করার সময় 'কার্যকারণ' সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা।
» সহমর্মিতা: অন্যের প্রতি সমব্যথী হওয়া। অন্যের স্থানে নিজেকে বসিয়ে তার অবস্থা অনুধাবন করা এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
» সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতা: মানুষ একটা দলের মধ্যে কীভাবে চিন্তা করে বা কাজ করে—তা বুঝতে পারা। আর এই বুঝকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক যোগাযোগ ও সামাজিক সম্পর্কগুলোকে ফলপ্রসূ করে তোলা।
» অন্যের আবেগগুলো বোঝা: অন্যদের কী প্রয়োজন কিংবা তারা কী চায়— এই ব্যাপারটির পূর্বাভাস বুঝে কাজ করার দক্ষতা। গোলম্যানের সামাজিক দক্ষতা অবশ্য এই উপাদানটির অনেকগুলো ধারণাকেই অন্তর্ভুক্ত করে ফেলে।
» সম্পর্কগুলোকে সতেজ রাখা: কার্যকরভাবে যোগাযোগ করার ক্ষমতা। সম্পর্ক তৈরি এবং টিকিয়ে রাখতে একজন ব্যক্তিকে দক্ষ হতে হবে। এই উপাদানটিও মূলত গোলম্যানের সহমর্মিতা এবং সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতার সাথে মিলে যায়। তাই আমরা মূলত গোলম্যানের পাঁচটি উপাদানকে সামনে রেখেই এগোব এবং সেটারই বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করব।
রাসূল -এর জীবনের উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা থেকে গোলম্যানের দেওয়া পাঁচটি উপাদান বোঝা যায়। এই ঘটনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারব, রাসূল কীভাবে বিচক্ষণ অনুভূতির উপাদানগুলো সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং তাঁর চরিত্রে ও ব্যক্তিত্বে কীভাবে তা ফুটিয়ে তুলেছেন।
মাক্কি জীবনেই রাসূল তাঁর তিন পুত্রসন্তানকে শিশু থাকতেই হারিয়েছেন। মদীনার জীবনে এসে তাঁর পুত্র ইবরাহীম হিজরতের দশম বছরে মারা যান। তার বয়স ছিল ষোলো মাস (কোথাও এসেছে আঠারো মাস) এবং তিনি মারা যাওয়ার সময় একজন সেবিকার তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তাঁর ছেলের কী ঘটেছে শুনে নবি মুহাম্মাদ ﷺ অবিলম্বে সেবিকার বাড়িতে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি ইবরাহীমকে তাঁর হাতে তুলে ধরেছিলেন এবং তাঁর চোখ থেকে অনবরত অশ্রু প্রবাহিত হয়েছিল। তখন আবদুর রহমান ইবনু আওফ (ভিন্ন বর্ণনায় অন্য এক সাহাবি) অবাক হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও কাঁদেন?' তখন রাসূল ﷺ বললেন, 'এটা হলো রহমত। চোখ অশ্রু-সজল হবে এবং হৃদয় বিষন্ন হবে। কিন্তু মুখ দিয়ে শুধু তা-ই বের হবে, যা আল্লাহ পছন্দ করেন-হে ইবরাহীম, তোমার বিদায়ে আমরা শোকাহত।' অতঃপর তিনি তাঁর সামনের পাহাড়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন,
'হে পাহাড়! তুমি যদি আমার মতো দুঃখী হতে, তুমি অবশ্যই টুকরো টুকরো হয়ে যেতে! কিন্তু আমরা তা বলি, যা আল্লাহ আমাদেরকে আদেশ করেছেন: (আমরা আল্লাহর বান্দা এবং আমরা তাঁর কাছে ফিরে যাব; আমরা বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করি)।'
কোনো কোনো সীরাতের বর্ণনায় রয়েছে, নবি -এর কান্না দেখে উসামা বিন যায়িদ-সহ অন্যান্য সাহাবিরাও কেঁদেছিলেন। যেদিন নবি -এর পুত্র ইবরাহীম ইন্তেকাল করেন, সেদিন সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। কিছু লোক-যারা প্রকৃতির নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল, তারা মনে করেছিল যে, ইবরাহীমের মৃত্যুর কারণে সূর্যগ্রহণ হয়েছে। যদিও এই চিন্তা একেবারেই ভিত্তিহীন ছিল, তবুও এটা আপাতদৃষ্টিতে নবিজির জন্য উপকারী হতে পারত। সে ক্ষেত্রে, যদি তিনি একজন সাধারণ এবং একজন জাগতিক নেতা হতেন, তবে তিনি এই দৃষ্টিভঙ্গিটি খুব ভালোভাবে নিতে পারতেন এবং এইভাবে নিজের মহিমা ও মহত্ত্ব সকলের কাছে প্রমাণ করতে পারতেন।
কিন্তু তিনি সেটা করলেন না। মানুষকে ভুলের মধ্যে রেখে নিজের ফায়দা নেওয়ার মতো নেতা তিনি ছিলেন না। সোজা মসজিদে গেলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও শোকরিয়া আদায় করার পর সাহাবিদের উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত কথাগুলো বললেন:
'হে লোকসকল! তোমরা জেনে রাখো যে, সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন। তারা একটি নির্দিষ্ট গতিপথে চলাফেরা করে, যা আল্লাহ তাদের জন্য প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারণ করেছেন। কারও মৃত্যু বা জন্মের কারণে তাদের গ্রহণ লাগে না। সূর্যগ্রহণের সময় নামাজ পড়া তোমাদের কর্তব্য।'
রাসূল-এর জীবনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা থেকে আমরা কীভাবে তাঁর ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের ধারণা পাই, সেটা নিয়ে এখন আলোচনা করব।
আত্মসচেতনতা: রাসূল ﷺ বুঝতে পেরেছিলেন যে, সন্তানের মৃত্যুতে কান্না আসাটাই স্বাভাবিক এবং একজন পিতার পক্ষে তা রোধ করা অসম্ভব ব্যাপার। কাছের মানুষের মৃত্যুতে যে ব্যক্তি বিচলিত হয় না, যার হৃদয় নড়ে না, যার চোখ থেকে অশ্রু ঝরে না, সে তো পাথর ছাড়া কিছু নয়। আল্লাহর রাসূল ﷺ মানবজাতিরই একজন ছিলেন। কুরআনেও স্পষ্টভাবে দুই বার তাঁকে মানুষ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সীরাত এবং বিভিন্ন হাদীস থেকে বোঝা যায়, তিনি তাঁর মানবসত্তা সম্বন্ধে খুব ভালোভাবে ওয়াকিবহাল ছিলেন। একদিন নামাজে ভুল করার পর সাহাবিরা তাঁকে অবগত করলে তিনি বলেন, 'আমি তোমাদের মতোই মানুষ। আমি স্মরণ রাখি, যেমন তোমরা স্মরণ রাখো। আবার আমি ভুলে যাই, যেমন তোমরা ভুলে যাও।'
আত্মনিয়ন্ত্রণ: 'চোখ অশ্রু-সজল হবে এবং হৃদয় বিষন্ন হবে। কিন্তু মুখ দিয়ে শুধু তা-ই বের হবে, যা আল্লাহ পছন্দ করেন।' রাসূল ﷺ হাদীসের মধ্যেও কারও মৃত্যুতে বিলাপ করতে নিষেধ করেছেন। এভাবে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা তিনি দিয়েছেন।
আত্ম-অনুপ্রেরণা: 'মুখ দিয়ে শুধু তা-ই বের হবে, যা আল্লাহ পছন্দ করেন'-এই কথা থেকে বোঝা যায়, রাসূল ﷺ জানতেন, তিনি কেন নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। স্পষ্টভাবে তিনি সেটা বলেও গেছেন। এর কারণ হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি।
সহমর্মিতা: রাসূল-এর এই অবস্থা দেখে উসামা বিন যায়িদ-সহ অন্যান্য সাহাবিরা কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁর আশেপাশের মানুষজন তাঁর বেদনায় ব্যথিত হয়েছেন। এতে সাহাবিদের সহমর্মী হওয়ার বিষয় চোখে পড়ে। অনেক সীরাতের ঘটনায় আমরা দেখতে পাই যে, কোনো কোনো সাহাবির মৃত্যুতে রাসূল ﷺ নিজেও অঝোরে কেঁদেছেন। সাহাবির লাশ নিজ হাতে কবরস্থ করেছেন। সাহাবিদের পরিবার-পরিজনকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। মুতার যুদ্ধের পর জাফর ইবনু আবি তালিব-এর পরিবারের প্রতি নবি-এর সান্ত্বনা দেওয়ার ঘটনাটি এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সীরাতের এরকম অসংখ্য ঘটনায় রাসূল ﷺ -এর সহমর্মিতার গুণটি ধরা পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা: একজন ব্যক্তির দুঃখে আরেকজন মানুষ কতটা সমব্যথী হচ্ছে, তা ওই ব্যক্তির সামাজিক সম্পর্কগুলোর ওপর নির্ভর করে। রাসূল ﷺ -এর পুত্রের মৃত্যুতে সাহাবিরা সমান দুঃখে দুঃখিত হয়ে কান্না কবলেন। এই দুঃখ এবং রাসূল ﷺ -এর প্রতি সম্মান তাঁদেরকে প্রশ্ন করা থেকে বিরত রাখেনি। তাঁরা জানতেন কারও মৃত্যুতে রাসূল ﷺ কান্না করতে নিষেধ করেছেন, আবার এখন তিনি নিজেই কাঁদছেন! কেন এই বৈপরীত্য?
অসময়ে এমন প্রশ্ন রাসূল -কে বিচলিত করেনি। বরং তিনি ঠান্ডা মেজাজে জবাব দিলেন, 'এটা হলো রহমত। চোখ অশ্রু-সজল হবে...'
রাসূল ﷺ তাঁদের সামনে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করলেন। প্রাকৃতিকভাবে চোখে পানি আসবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিলাপ করা যাবে না। এমন কিছু বলা যাবে না, যা আল্লাহর ব্যাপারে অভিযোগ হিসেবে শোনায়; বরং ধৈর্যের সাথে পুরো পরিস্থিতি শামাল দিতে হবে।
আমরা সীরাত থেকে একটি ঘটনা উল্লেখ করে বোঝানোর চেষ্টা করলাম—রাসূল ﷺ কীভাবে অনুভূতির ক্ষেত্রে ধীশক্তির পরিচয় দিয়েছেন।
টিকাঃ
[১] Ibn Sa'd. ibid. Vol. 1, p. 142; Muslim, ibid, Vol. 2, p. 630.
📄 আবেগ ও বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা
ইসলাম আবেগ এবং বুদ্ধিমত্তা-উভয়কেই যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে এবং মানুষকে তার ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের সর্বোচ্চ প্রয়োগে উৎসাহিত করেছে। এই বিচক্ষণতার যে ৫টি প্রধান উপাদান রয়েছে, সেগুলোর প্রত্যেকটির ব্যাপারে রয়েছে ইসলামের পৃথক নির্দেশনা এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনে রয়েছে তার বাস্তব প্রয়োগ। তবে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের সমকালীন থিওরিগুলোর সাথে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা মানুষের মাঝে আবেগ সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আধ্যাত্মিকভাবে আরও উন্নত স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আবেগের যথাযথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই সম্ভব আধ্যাত্মিকতার উন্নত স্তরে উপনীত হওয়া।
সমকালীন পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীদের কাছে Intelligence বা বুদ্ধিমত্তা নিছক উপস্থিত বুদ্ধি, আবেগ ও অন্যান্য দক্ষতার একটি মাপকাঠি এবং পরিচায়ক। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এর সংজ্ঞা আরও ব্যাপক। এর ব্যাপারে ইসলামের রয়েছে নিজস্ব মতামত। এই মতামত উপলব্ধি করতে হলে আমাদেরকে মাথায় রাখতে হবে কুরআনের একটি আয়াত,
“আর যখন তোমার পালনকর্তা বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করলেন তাদের সন্তানদেরকে এবং নিজের ওপর তাদেরকে প্রতিজ্ঞা করালেন, “আমি কি তোমাদের রব নই?” তারা বলল, “অবশ্যই, আমরা অঙ্গীকার করছি।” আবার না কিয়ামতের দিন বলতে শুরু করো যে, “এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না।” [১৬]
আদম থেকে শুরু করে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ দুনিয়ায় আসবে, তাদের প্রত্যেককে রুহের জগতে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল রব সম্পর্কে। প্রতিটি মানুষ তখন এই সাক্ষ্য দিয়েছিল যে, 'আমাদের রব আল্লাহ।' আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের বিষয়টি আমাদের রুহের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই মানুষ হিসেবে আমাদের যে 'বিশুদ্ধ বুদ্ধিমত্তা' বা 'ফিতরাত' রয়েছে, তা অবশ্যই আল্লাহর বিধি-নিষেধের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে চলবে। বিষয়টি উদাহরণ দিয়ে এভাবে বলা যায়, কোনো কোম্পানি যে ডিভাইস তৈরি করবে, তারা তাদের নিজেদের পছন্দমতো ফিচারই ওই ডিভাইসে রাখবে এবং ডিভাইসটি সেই মোতাবেক চলবে। একইভাবে, আল্লাহ যেহেতু মানুষ এবং মানুষের বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি করেছেন, তাই মানুষজন কেবল আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ীই স্বাভাবিক নিয়মে চলতে পারবে। ইসলামের বিধিবিধানের সাথে বিশুদ্ধ বুদ্ধিমত্তা বা ফিতরাতের কোনোরূপ সংঘর্ষ সে খুঁজে পাবে না।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমানে অনেকেই ইসলামের কিছু বিধিবিধানের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে। এদের মধ্যে অমুসলিম যেমন আছে, মুসলিমও আছে। এর কারণ হলো 'ফিতরাত' বিনষ্ট হয়ে যাওয়া। পারিপার্শ্বিক বহুবিধ নিয়ামকের কারণে ফিতরাত বিগড়ে গেছে। তাই আল্লাহ-প্রদত্ত বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আমরা এখন আল্লাহর সাথেই বিরোধে জড়িয়ে পড়ছি।
এজন্য মুসলিম হিসেবে আমাদেরকে মাথায় রাখতে হবে, বুদ্ধিমত্তা বা আকলের স্বার্থক প্রয়োগ তখনই করা যাবে, যখন তা আল্লাহর আনুগত্যের পথে ব্যয়িত হবে। আল্লাহর দেওয়া যাবতীয় বিধান মাথা পেতে নিয়ে, নিজেকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলেই আকলের সফল বাস্তবায়ন ঘটবে।
আসমানি বার্তাগুলো কীভাবে মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে, কীভাবে উপস্থাপন করতে হবে, কীভাবে সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে, কীভাবে প্রতিক্রিয়াকে যথাযথ খাতে প্রবাহিত করতে হবে-এগুলো নবিদের জানা ছিল। আল্লাহ তাআলাই তাঁদেরকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। 'রাসূল -এর চরিত্র ছিল কুরআন'-আম্মাজান আয়িশা এ-এর এই বর্ণনার মতোই ছিল নবি -এর জীবন। কুরআনের ছাঁচে গড়া ছিল তাঁর চরিত্রের প্রত্যেকটি দিক। সাহাবিদের সাথে রাসূল কেমন ছিলেন- তার একটা চিত্র কুরআনে তুলে ধরা হয়েছে:
'সুতরাং আল্লাহর পরম অনুগ্রহ যে, তুমি তাদের ওপর দয়ার্দ্র রয়েছো: এবং যদি তুমি রূঢ় মেজাজ ও কঠিন হৃদয়ের হতে, তবে অবশ্যই তারা তোমার নিকট হতে সরে যেত।
বিভিন্ন হাদীসে রাসূল-এর সাথে সাহাবিদের পারস্পরিক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হয়েছে। এ বইয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে সেসবের অসংখ্য উদাহরণ আসবে। তবে এখানে কথাপ্রসঙ্গে দুই-একটা হাদীস তুলে ধরা যেতে পারে-যার মাধ্যমে রাসূল-এর ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের চমৎকার চিত্র পাওয়া যায়।
আবু উমামা বাহিলি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ আমার হাত ধরে বললেন, 'হে আবু উমামা! মুমিনদের মাঝে কারও কারও জন্য আমার অন্তর নরম হয়ে যায়।[১৮]
রাসূল আরও বলেছেন, 'দুই ব্যক্তি পরস্পরকে মহব্বত করলে, তাদের মধ্যে যে অপরজনকে বেশি মহব্বত করে-সে-ই উত্তম।[১৯]
অন্যত্র তিনি বলেন, 'তোমাদের কেউ তার অপর (মুসলিম) ভাইকে মহব্বত করলে, সে যেন তাকে (মহব্বতের ব্যাপারটি) জানিয়ে দেয়।[২০]
দাওয়াত মূলত অন্তর থেকে অন্তরে হয়। রাসূল সাহাবিদের সাথে অন্তরের যোগাযোগকে আগে প্রাধান্য দিয়েছেন। তারপর তিনি তাদেরকে বাহ্যিক দিকে আহ্বান করেন। এই অন্তরের সাথে অন্তর বাঁধার প্রক্রিয়া যে দক্ষতার ওপর নির্ভর করে, সেটাই ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স। নিজেদের মধ্যকার যে দেয়াল-সেটাকে ভেঙেই অন্তরের বন্ধন করতে হয়। সে দেয়াল হতে পারে সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা মনস্তাত্ত্বিক। যাদের সাথে সম্পর্ক গড়তে হবে, তাদেরকে বার্তা পৌঁছানোর জন্য কোনো অযাচিত দেয়ালই তাদের মধ্যে রাখা যাবে না। রাসূল প্রথম যখন ওহির দাওয়াত দেন, তখন তাঁর এবং কুরাইশদের মধ্যে কোনো অবিশ্বাসের দেয়াল আছে কি না-তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেন। তিনি বলেন, 'আমি যদি তোমাদেরকে বলি, এই পাহাড়ের অপর পাশে শত্রুরা তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, তোমরা বিশ্বাস করবে?' সবাই সমস্বরে জবাব দিলো, 'হ্যাঁ, আমরা বিশ্বাস করি। কারণ আপনি আস-সাদিক।' তারপর তিনি ইসলামের দাওয়াত দেন।
মূসা দাওয়াত দেওয়ার প্রাক্কালে জানতেন যে, তাঁর ভাষার জড়তা আছে। এটা হয়তো দাওয়াতের পথে অন্তরায় হতে পারে। তাই তিনি ভাষার জড়তা দূরীকরণ চেয়েছিলেন রাব্বুল আলামীনের কাছে। তিনি তাঁর ভাইকে সাহায্যকারী হিসেবে চেয়েছিলেন; যেন সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে তিনি শক্তিশালী হতে পারেন। আল্লাহর নবিরা জানতেন, দাওয়াতি কার্যক্রম অনেকগুলো বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভরশীল। তাই তাঁরা দাওয়াতের ময়দানে যাওয়ার আগে সকল অন্তরায়গুলো দূর করার চেষ্টা করতেন।
ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের বিভিন্ন তত্ত্ব এবং উপাদানের গভীরে যাওয়ার আগে ওপরিউক্ত ঘটনার সূত্র ধরে আরেকটি নতুন আইডিয়ার আলোচনা রাখতে চাই- Spiritual Intelligence বা আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তা। বর্তমান দুনিয়ায় কর্পোরেট সেক্টরে যারা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কথা বলেন, ট্রেনিং দিয়ে থাকেন ও এই বিষয়ে কনসালটেন্সি করেন, তারা হয় এই ব্যাপারটি বুঝেন না কিংবা বুঝলেও এড়িয়ে যান। এতে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ইন্টেলিজেন্সের (IQ) সাথে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের (EQ) ব্লেন্ড হলেও এই আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তার (SQ) কনসেপ্টটির আলোচনা না হওয়ায় পুরো বিষয়টাতেই কিছু শূন্যতা থেকে যায়। তাই বইয়ের এই পর্যায়ে 'Spiritual Intelligence' নামের নতুন আরেকটি তত্ত্ব নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করতে চাই।
টিকাঃ
[১৬] সূরা আ'রাফ, ৭: ১৭২
[১৭] সূরা আলে ইমরান-১৫৯
[১৮] মুসনাদে আহমাদঃ ৫/২১৭
[১৯] হাকিম, ইবনে হিব্বান
[২০] আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, হাকিম ইরান বিসসান
📄 স্পিরিচুয়াল ইন্টেলিজেন্স বা আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তা
ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে অনেক গবেষণা-আলোচনা হলেও এই স্পিরিচুয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে আলোচনা একদমই অপ্রতুল। গার্ডনার (১৯৮৩) তার বইয়ে প্রথম 'existential intelligence' নামে একটা টার্ম নিয়ে আসেন। পরবর্তীকালে অনেকে সেটিকে 'Spiritual intelligence' নাম দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই শব্দটি 'spirituality' এবং 'intelligence' শব্দ থেকে এসেছে। 'spirituality' শব্দটি মূলত 'spirit' শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ 'রুহ' বা আত্মা। ইসলামে আধ্যাত্মিকতা 'রুহানিয়াত'-এর প্রতিনিধিত্ব করে, যার অর্থ সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে আধ্যাত্মিক বা রুহানি বুদ্ধিমত্তার মানে হচ্ছে, বান্দা এবং আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ককে উপলব্ধি করা। এই ইন্টেলিজেন্স মানে এক অতিন্দ্রীয় সত্তাকে ভয় করে চলা। যাকে ইসলামিক পরিভাষায় আমরা 'তাকওয়া' বলে থাকি।
মানুষের ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সকে প্রভাবিত করার জন্য, স্পিরিচুয়াল ইন্টেলিজেন্সের উন্নতি দরকার। একটা সংগঠন কিংবা প্রতিষ্ঠান যদি তার সদস্য কিংবা কর্মীদের জীবনের অর্থ খুঁজতে এবং বুঝতে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে এটি প্রত্যেক সদস্যদের ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সে যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
মুসলিম জনগণ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ﷺ-এর উপদেশের অনুসারী। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত সকল কাজের জন্য পবিত্র কুরআন ও হাদীস হলো মুসলিমদের গাইডলাইন। ইসলামি ধারণা এবং আদর্শ—উভয়ই সমস্ত মুসলিম উম্মতের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। ইসলামের বিভিন্ন নীতি-আদর্শ, আচার-আচরণ এবং আল্লাহভীতি—তাদের মাঝে একটি দৃঢ় চেতনা সৃষ্টি করে এবং আরও ভালো কাজে জন্য উৎসাহ যোগায়। ইসলামি মূল্যবোধ এবং অনুভূতি কীভাবে তাদের জীবনের আধ্যাত্মিক এবং মানসিকভাবে চালিত করে, সে বিষয়টি সাইকোলজিক্যাল এক সাংগঠনিক আচরণ অধ্যয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝা অত্যাবশ্যক। তাই মুসলিম পরিচালকদের আধ্যাত্মিকভাবে উদ্বুদ্ধ করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মনোবিজ্ঞান এবং সামাজিক বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের গবেষণায়, কর্মক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তা এবং EI এর গুরুত্ব নিশ্চিত হয়েছে।
ইসলামি স্পিরিচুয়ালিটি সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপস্থিতি উপলব্ধি করতে সহায়তা করে—যাকে আমরা 'তাকওয়া' বলে থাকি। তাকওয়া ব্যক্তির অভ্যন্তরীন আত্মসচেতনতা, চিন্তাভাবনা, অনুভূতি এবং প্রতিক্রিয়াকে উন্নত করতে সহায়তা করে। 'তাকওয়া' মানে আল্লাহর প্রতি অনুগত ও নিষ্ঠাবান হওয়া। আল্লাহর ভয়ে হারাম জিনিস থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
IQ Intellectual intelligence serial processing left brain
SQ spiritual intelligence synchronous processing whole brain
EQ emotional intelligence parallel processing right brain
[picture]
আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তা EQ এবং IQ—উভয়ের সাথেই কাজ করে। আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তা মস্তিষ্কের একটি শারীরিক প্রক্রিয়া, যার সাথে দুটি ভিন্ন দিক সংযুক্ত—বুদ্ধি এবং আবেগ। আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তা মূলত মন এবং শরীর, যুক্তি এবং আবেগের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ। রাসূল ﷺ-এর জীবনে এ তিন বুদ্ধিমত্তার অসংখ্য উদাহরণ আমরা পাই। যেমন, হিজরি অষ্টম সনের একটি ঘটনাই ধরুন।
সেসময় মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়। বিষয়টি যাতে প্রতিপক্ষ কুরাইশরা জানতে না পারে, সেজন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ সকলকে সতর্ক করে দেন। হযরত হাতিব মক্কায় বসবাস না করলেও কুরাইশদের সাথে পুরাতন বন্ধুত্ব ছিল। তিনি মদীনাবাসীদের এই গোপন প্রস্তুতির খবরসম্বলিত একটি পত্র-সহ এক মহিলাকে মক্কার দিকে পাঠান। এর বিনিময়ে মহিলাটিকে তিনি নির্ধারিত মজুরি দেবেন বলে চুক্তি হয়। পত্রখানি মাথার চুলের বেণির মধ্যে লুকিয়ে মহিলাটি মক্কার দিকে যাত্রা করে। এদিকে ওহির মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ সব খবর অবগত হলেন। সাথে সাথে তিনি মহিলাটির পিছু ধাওয়া করে পত্রটি উদ্ধারের জন্য আলি, যুবাইর ও মিকদাদকে নির্দেশ দিলেন। তাঁরা তিনজন খুব দ্রুত সাওয়ারি দাবড়িয়ে 'খালীকা' মতান্তরে 'রাওদাতু খাক' নামক স্থানে মহিলাটিকে ধরে ফেলেন।
প্রথমে তাঁরা তার বাহনে সন্ধান করে কিছুই পেলেন না। তারপর হযরত আলি মহিলাকে বললেন, 'আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, রাসূলুল্লাহ-কে মিথ্যা খবর দেওয়া হয়নি এবং আমাদেরকেও মিথ্যা বলা হয়নি। হয় তুমি নিজেই পত্রটি বের করে দাও, নয়তো আমরা তোমাকে উলঙ্গ করে তালাশ করব।' তাঁদের এ কঠোরতা দেখে মহিলা বলল, 'তোমরা একটু সরে যাও।' তাঁরা সরে দাঁড়ালেন। সে তার মাথার বেণি খুলে তা থেকে পত্রটি বের করে দিলো। তাঁরা তিনজন পত্রটি নিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খিদমতে হাজির হলেন।
পত্রটি পড়ে রাসূলুল্লাহ বিস্ময়ের সাথে প্রশ্ন করেন, 'ওহে হাতিব, তুমি এমন কাজ কেন করলে?' হাতিব বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার ব্যাপারে তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নেবেন না। যদিও আমি কুরাইশ বংশের কেউ নই, তবুও জাহিলি যুগে তাদের সাথে আমার গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। যেহেতু মুহাজিরদের সকলে তাদের মক্কাস্থ আত্মীয়-বন্ধুদের সাহায্য সহায়তা করে থাকেন, এজন্য আমার ইচ্ছে হলো, আমার আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কুরাইশরা যে সদ্ব্যবহার করে থাকে—তার কিছু প্রতিদান কমপক্ষে আমি তাদেরকে দান করি। এ কাজ আমি মুরতাদ হয়ে বা ইসলাম ত্যাগ করে অথবা কুফরকে ইসলামের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার কারণে করিনি।'
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, হাতিব বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পরিবার-পরিজন তাদের মধ্যে রয়েছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর জন্য ক্ষতিকর হবে না-এমনটি মনে করেই আমি চিঠিটি লিখেছি। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আল্লাহ সম্পর্কে আমার মনে কোনো সন্দেহ দেখা দেয়নি। কিন্তু মক্কায় আমি ছিলাম একজন বহিরাগত এবং সেখানে আমার মা, ভাই ও ছেলেরা রয়েছে।
হাতিবের বক্তব্য শোনার পর রাসূলে কারীম উপস্থিত সাহাবিদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, 'সে সত্য কথাটি প্রকাশ করে দিয়েছে। এ কারণে কেউ যেন তাকে গালমন্দ না করে।'
উমর আরজ করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে আল্লাহ, রাসূল ও মুসলিমদের প্রতি আস্থাহীনতার কাজ করেছে। অনুমতি দিন, আমি এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই।' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'সে কি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি? আল্লাহ বদরের যোদ্ধাদের অনুমতি দিয়েছেন, "তোমরা যা খুশি করো, জান্নাত তোমাদের জন্য অবধারিত।” রহমাতুল লিল আলামীন দয়ার নবির এ অপূর্ব উদারতায় উমরের দুচোখ সজল হয়ে ওঠে।
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই পবিত্র কুরআনের এ আয়াত নাযিল হয়, 'ওহে, তোমরা যারা ঈমান এনেছো, আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কোরো না। তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্বের আচরণ করো, অথচ তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে, তা তারা অস্বীকার করেছে।
এ ঘটনা থেকে হাতিব-এর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখব, তাঁর পরিবারের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ইমোশন। সাথে সাথে বুদ্ধি খাটিয়ে মহিলার চুলের বেণির ভেতরে চিঠি পাঠানো। কিন্তু তিনি বুঝতেও পারেননি, কত বড় ভুল মুসলিম কমিউনিটির সাথে হতে যাচ্ছিল।
অপরদিকে রাসূল ﷺ-এর প্রতি আমরা লক্ষ্য করলে দেখব, হযরত আলি, মিকদাদ এবং যুবাইরের মতো সাহাবিকে এই কাজের জন্য নিয়োগ এবং তৎক্ষণাৎ মক্কার অভিমুখে পাঠানো তাঁর প্রজ্ঞা এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। সাথে একজন বদরি সাহাবির প্রতি তাঁর দয়াও চোখে পড়ার মতো। আবার এত বড় অপরাধ করার পরও বদরি সাহাবিদের ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশনাকে মাথা পেতে নিয়ে এবং তাঁর পূর্ববর্তী কাজের স্বীকৃতি হিসেবে রাসূল ﷺ তাঁকে বেকসুর খালাস দিয়ে দেন। এখানে রাসূল ﷺ ইন্টেলেকচুয়াল, ইমোশনাল এবং স্পিরিচুয়াল ইন্টেলিজেন্সের মিলিত প্রকাশ দেখিয়েছেন।
টিকাঃ
[২১] https://sqi.co/definition-of-spiritual-intelligence/
[২২] সহিহুল বুখারি, কিতাবুল মাগাযী: ৪২৭৪।
[২৩] আল ইসাবা-১/৩০০ হায়াতুস সাহাবা-২/৪২৫
[২৪] সহিহুল বুখারী, ফদলু মান শাহেদা বদরান: ৩৯৮৩
[২৫] সূরা মুমতাহিনা-১
📄 ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের নেতিবাচকতা
"যেকোনো দক্ষতার মতো, মানুষকে বুঝতে এবং পড়তে পারার ক্ষমতাও একসাথে ভালো বা মন্দের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।" - এডাম গ্র্যান্ট
নতুন নতুন গবেষণাগুলো আমাদেরকে বলে, মানুষরা যখন তাদের মানসিক দক্ষতাকে উন্নত করে, তখন তারা অন্যদেরকে নিপুণভাবে পরিচালনা (Manipulate) করার ক্ষেত্রেও আরও চৌকশ হয়ে ওঠে। আপনি যখন নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন, আপনি তখন আপনার সত্যিকারের অনুভূতিগুলোকে মুখোশের আড়ালে ঢাকার কারুকার্য শিখে যাবেন। যখন আপনি জানেন যে, অন্যরা কী অনুভব করছে, কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, আপনি তাদেরকে হৃদয়ের টানে টানতে পারেন এবং তাদের নিজেদেরকে নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করতে পারেন। ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের অন্ধকার দিকটি মানুষের মধ্যে ইমোশনাল ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
এই ইমোশনাল ম্যানিপুলেশনের আচরণটি বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে। কারও আত্মবিশ্বাস, আত্ম-মূল্যায়ন, আত্ম-দক্ষতাকে নিজের সাময়িক ফায়দা হাসিলের জন্য নষ্ট করে দেওয়াও এক ধরনের ইমোশনাল ম্যানিপুলেশন। অনেক সময় কারও ইগোকে জাগিয়ে দিয়ে তার মধ্যে অহংবোধের জন্ম দিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধিও ইমোশনাল ম্যানিপুলেশনের মধ্যেই পড়ে। আবার কাউকে অতিরিক্ত প্রশংসা এবং তোষামোদ করে তার মধ্য থেকে নিজের গোপন স্বার্থ হাসিল করাও এ ধরনের ম্যানিপুলেশনের ক্যাটাগরিতে পড়ে।
একটি কোম্পানিতে এই ইমোশনাল ম্যানিপুলেশনের বিষয়টি এভাবে কাজ করে যে, মানুষ যখন আরেকজনের আবেগ-অনুভূতি বুঝতে পারে এবং নিজের আবেগ প্রকাশ এবং নিয়ন্ত্রণে দক্ষ হয়—তখন সে কৌশলী পদক্ষেপে যেকোনো পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত লাভ হাসিলের পাঁয়তারা করে।
গবেষকরা কিংবা বিজ্ঞানীরা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে অনেক কথা এবং গবেষণা প্রকাশ করলেও এর অন্ধকার দিকটি নিয়ে খুব একটা কাজ করেন না। আস্তে আস্তে যদিও এই ট্রেন্ড পরিবর্তন হচ্ছে এবং এখন অনেকে এর অন্ধকার দিক নিয়েও কথা বলা শুরু করেছেন।
সমাজবিজ্ঞানীরাও ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের এই অন্ধকার দিকটি নিয়ে কাজ করতে শুরু করেছেন। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোচেন মেন্সেসের নেতৃত্বে একদল তরুণ উদীয়মান গবেষক দল দেখিয়েছেন, যখন একজন নেতা আবেগে ভরা একটি মোটিভেশনাল বক্তৃতা দেন, তখন শ্রোতাদের মূল বক্তব্যটি যাচাই করার সম্ভাবনা একদমই কম থাকে। বক্তব্যের বিষয়বস্তুও কম মনে রাখে তারা। শ্রোতারা বক্তৃতা দ্বারা এতটাই অনুপ্রাণিত হয় যে, বক্তৃতার সত্য-মিথ্যার প্রতি খুব একটা মনোযোগ না দিয়ে বক্তৃতাটাই বেশি মনে রাখে।
আবেগের শক্তিকে স্বীকৃতি দিয়ে এক গবেষক বিশ শতকের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার বডি ল্যাংগুয়েজের প্রভাবগুলো অধ্যয়ন করতে গিয়ে কয়েক বছর কাটিয়েছেন। তিনি হিটলারের হাতের অঙ্গভঙ্গি অনুশীলন করা এবং তার নড়াচড়ার চিত্র বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে আসেন—এই জগদ্বিখ্যাত ব্যক্তিটি একজন জাদুকরী গুণসম্পন্ন পাবলিক স্পিকার। তিনি বক্তব্যে অন্যদের মধ্যে এক জাদুকরী আবহের সৃষ্টি করতেন। আর এই গুণটি এমন এক বিষয়—যা তিনি কঠোর সাধনা এবং অধ্যবসায় দ্বারা রপ্ত করতে পেরেছিলেন।
চৌকশ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ব্যক্তিরা তাদের চারপাশের লোকদের সম্পর্কে এতটাই সচেতন যে, তারা অনেক সময় তাদের খারাপ আচরণগুলোকে সংশোধন করতে—এমনকি বলতেও অনীহা বোধ করে। তারা জানে যে, এমন কথা বলে তারা নিজেদের জনপ্রিয়তা হারাবে। এজন্য তারা এসব থেকে দূরে থাকে। একটা প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের ঊর্ধ্বতন কেউ যদি বেশি বুদ্ধিমত্তাগিরি দেখিয়ে তার অধীনস্থদেরকে শুধরে না দেয়, তাহলে যথাযথ কর্মী তৈরি হবে না। এই যে "Bad guy" না হওয়ার প্রবণতা—এটা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের একটা অন্ধকার দিক।
অপরদিকে নবি-রাসূলরা ছিলেন ভারসাম্যপূর্ণ ইন্টেলিজেন্সের অধিকারী। এই দুনিয়াতে নবিগণের আগমনের একটা মুখ্য মিশন হচ্ছে, সৎকাজের আদেশ করা এবং অসৎকাজে নিষেধ করা। 'কারও কাছে ভালো/খারাপ হব'—এই বিবেচনায় নবি-রাসূলরা কখনও দাওয়াত দেননি। তাঁরা সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজে নিষেধ করে গেছেন। কাউকে খুশি করা কিংবা দুঃখিত করা তাঁদের ধর্তব্যে ছিল না। স্থান, কাল, পাত্রভেদে দাওয়াতি বক্তব্য মানুষের মধ্যে কীরূপ প্রভাব ফেলবে—এটা নিয়ে তাঁরা সচেতন ছিলেন।