📘 ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নববী দর্পণে সমকালীন ধারণা > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


আল্লাহর রাসূল একবার তাঁর সাহাবিদের সাথে এক মজলিসে বসে ছিলেন এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করছিলেন। এসময় কৃষ্ণকায় ও বাহ্যিকভাবে অসুন্দর একজন লোক এসে রাসূল-এর কাছে প্রশ্ন করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! যেমন আপনি দেখছেন, আমি একজন বিশ্রী এবং কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ। লোকজন আমাকে দেখে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। আমার মতো কুৎসিত কালো মানুষও কি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে?'

ভাবা যায়, হীনম্মন্যতার জটিলতা কোন লেভেলে আচ্ছন্ন করলে কোনো মানুষ এভাবে চিন্তা করতে পারে!

আল্লাহর রাসূল তার অন্তরের ব্যথা বুঝতে পারলেন। তার কষ্টটাকে উপলব্ধি করতে পারলেন। তিনি তার এ প্রশ্নকে কটাক্ষ করেননি। উপহাস করে উড়িয়ে দেননি। কিংবা কথাচ্ছলে তাকে এড়িয়েও যাননি। রাসূল তার দিকে ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকালেন। দয়ার নবির দয়ার সাগরে প্রবল ঢেউ খেলে গেল। অত্যন্ত ভালোবাসা নিয়ে তিনি বললেন, 'যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে-সেই সত্তার শপথ করে বলছি, তোমাকে এই চেহারা এবং কৃষ্ণ শরীর অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশে বাধা দেবে না। জান্নাতের জন্য একমাত্র শর্ত হলো আল্লাহকে ভয় করা এবং আমার রিসালাতের ওপর ঈমান আনা।' আল্লাহর রাসূল-এর কথা শুনে ওই লোকটি এত্ত খুশি হলেন যে, সাথে সাথে কালেমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করে নিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর রাসূল-কে প্রশ্ন করলেন, 'আমার কী কী অধিকার আছে?'

রাসূল উত্তরে বললেন, 'অন্য মুসলিমের যে যে অধিকার আছে, সেই সেই অধিকার তোমারও রয়েছে এবং তোমার ওপর সেই সকল দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে, যা অন্যান্য মুসলিমের আছে এবং তুমি তাদের ভাই।

একজন মানুষের সাইকোলজি চিন্তা করে তার সাথে আচরণ করা, ভাবের আদান-প্রদান করা এবং একটা সম্পর্ক তৈরি করা ছিল রাসূল -এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অন্যতম অংশ। আরেকটি উদাহরণ দিই। এ ঘটনাটি বহুল প্রচারিত। মানুষের মানবিক সংস্কারের পন্থা এবং উদাহরণ হিসেবে এই ঘটনাটি মাইলফলক হয়ে আছে।

একদিন রাসূলুল্লাহ-এর কাছে এক কুরাইশ যুবক ব্যভিচারের অনুমতি প্রার্থনা করে। সামনে উপস্থিত সাহাবিরা রাসূল-এর সামনে এমন অশোভন উক্তি ভালোভাবে নিতে পারেননি। তাঁরা রেগেমেগে সে যুবককে শাস্তি দিতে উদ্যত হলেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ -এর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি শান্তচিত্তে যুবকটিকে তাঁর কাছে আসতে বললেন। অতঃপর তাকে পরম মমতায় একজন শুভাকাঙ্ক্ষী শিক্ষকসুলভ কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন।

'তুমি কি তোমার মায়ের জন্যে এটা (ব্যভিচার) মেনে নেবে?' যুবক জবাব দিলো, 'না।'

তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তাহলে তুমি কীভাবে আশা করো, অন্য লোকেরাও এটা তাদের জন্য অনুমোদন করবে!'

অতঃপর তিনি আবার যুবককে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কি এটা (ব্যভিচার) তোমার কন্যা, বোন ও চাচির জন্য অনুমোদন করবে?' এবারও যুবক জবাব দিলো, 'না।' রাসূলুল্লাহ তখন বললেন, 'তাহলে তুমি কীভাবে আশা করো, অন্য লোকেরাও এটা তাদের জন্য অনুমোদন করবে!'

অতঃপর প্রিয়নবি যুবকটির হাত ধরে আল্লাহর দরবারে পাপ মোচনের দুআ করলেন। আল্লাহর কাছে আরও ফরিয়াদ করলেন, 'হে আল্লাহ! আপনি তার অন্তর পবিত্র করুন এবং (এই অবৈধ কামনার বিরুদ্ধে) তাকে সহিষ্ণু করুন।'

সাহাবিগণ বলেন, 'এরপর থেকে ওই যুবক কোনোদিন অন্যায়ের দিকে পা বাড়ায়নি।'

সীরাত থেকে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করি-যা আপনাকে সবকিছু বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবতে বাধ্য করবে। অতঃপর বুঝতে পারবেন, মানুষের সাথে রাসূল -এর আচরণ আসলে কেমন ছিল।

সম্পর্কে আবু লাহাব ছিল রাসূল-এর চাচা এবং চরম মাত্রায় ইসলাম-বিরোধী। তাকে এবং তার স্ত্রীকে ভর্ৎসনা করে কুরআনে সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। সেই আবু লাহাবের মেয়ে, রাসূল-এর চাচাতো বোন দুররা ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় হিজরত করেন। দাহিয়াতুল কালবী নামের প্রখ্যাত সাহাবির সাথে তাঁর বিয়ে হয়। দাহিয়াতুল কালবী সম্পদশালী ও সুদর্শন সাহাবি ছিলেন। জিবরীল বেশির ভাগ সময় তাঁর সুরত ধরেই রাসূল-এর কাছে ওহি নিয়ে আসেন।

যা-ই হোক, মদীনায় কিছু জ্ঞানহীন দুররা-কে কথায় কথায় খোঁচা দেওয়া শুরু করল। কেউ কেউ তাঁকে এমনও বলত যে, 'তোমার হিজরতের আর কী মূল্য আছে! তুমি না আবু লাহাবের মেয়ে!' মহিলারা তো বলতই; একবার এক পুরুষও তাঁকে এমন ধরনের কথা বলল। আপনি চিন্তা করতে পারেন-একজন সন্তানের জন্য এটা কত বেশি মানসিক পীড়াদায়ক! সন্তান যে রবের একনিষ্ঠ ইবাদতকারী, সেই রব আপন জন্মদাতা পিতাকে সমালোচনা করে এবং শাসিয়ে বক্তব্য পাঠিয়েছেন এবং সেই বক্তব্যের অনুসারী মুসলিমরা সেটা সকাল-বিকাল পাঠ করে। 'একের বোঝা অন্যে বহন করবে না'-কুরআনের এমন বক্তব্য দুররা-এর ক্ষতে মলমের মতো কাজ করলেও, মানুষের আড়কথা তাঁকে বেশ মানসিক যন্ত্রণায় ভোগাতে শুরু করল।

বিষয়টি রাসূল-এর কাছে গেলে তিনি মসজিদে এসে এটার জন্য বিশেষভাবে একটা বক্তব্য দেন। তিনি কাফির আত্মীয়-স্বজনদের জন্য মুসলিমদেরকে কষ্ট দিতে নিষেধ করেন। (আল-ইসাবাহ, পৃষ্ঠা: ১২৭)

একদিন দুররা রাসূল-এর বাড়িতে এসে উম্মুল মুমিনীন আয়িশা-এর সাথে গল্প করছিলেন। এ সময় রাসূল বাহির থেকে এসে ওজু করার জন্য পানি চাইলেন। দুজনেই তড়িঘড়ি করে রাসূল-কে পানি দেওয়ার জন্য এগিয়ে গেলেন। দুররা আগে পানির পাত্র রাসূল-এর দিকে এগিয়ে দিলেন। তাঁকে দেখে মানুষের সমালোচনার কথা নবিজির মনে পড়ে গেল। নবিজি তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বললেন, 'তুমি আমার অংশ এবং আমি তোমার অংশ।'

আরবিতে এ কথার মানে দাঁড়ায়- 'তোমার-আমার শরীরে একই রক্তধারা বইছে।' রাসূল জনসমক্ষে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে দুররা-কে কীভাবে সহমর্মিতা দেখিয়েছেন-সেটার পার্থক্য সম্পর্কে একটু চিন্তা করুন। এরই সাথে এ থেকে রাসূল তাঁর অনুসারীদের আবেগ (Emotion) কত গভীরভাবে বুঝতেন-তার ধারণা পাওয়া যায়।

আরেকটি ঘটনা এখানে না বললেই নয়। উম্মুল মুমিনীন সাফিয়্যা ছিলেন একজন ইহুদি রাজার মেয়ে। নবি -এর ঘরে স্ত্রী হয়ে আসার পর কোনো একজন উম্মুল মুমিনীন তাঁকে 'ইহুদির মেয়ে' বলে তিরস্কার করেছিলেন। নবিজি ঘরে এসে দেখলেন, সাফিয়্যা -এর মন খারাপ। তিনি এর কারণ জানতে পেরে বললেন, 'তাকে বলে দিয়ো, তোমার বাবা (এখানে বাবা বলতে মূসা -কে বোঝানো হয়েছে, যেহেতু সাফিয়্যা বনী ইসরাইল বংশোদ্ভূত ছিলেন) একজন নবি, তোমার চাচা (হারুন) একজন নবি এবং তোমার স্বামীও একজন নবি।' এ কথা শুনে সাফিয়্যা খুশিতে আটখানা হয়ে গেলেন। (সুনানুত তিরমিযী: ৩৮৯২)

এই যে রাসূল মানুষের মন, মনন, মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা চিন্তা করে কথা বলছেন, তাদেরকে কাছে টেনে নিচ্ছেন, তাদের সাথে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করছেন—এই গুণটিকে আমরা আসলে কীভাবে চিহ্নিত করতে পারি? আপনি যদি সীরাত-গ্রন্থের মনোযোগী পাঠক হন, আমি নিশ্চিত, এই মুহূর্তে এমন ঘটনার অসংখ্য উদাহরণ আপনার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আধুনিক দুনিয়ায় এ গুণটিকেই 'ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স' নামে ডাকা হয়। বাংলায় একে 'অনুভূতির ক্ষেত্রে বিচক্ষণতা' বা 'বিচক্ষণ অনুভূতি' বলা যায়। চলুন, এর বিস্তারিত পরিচয় ও ইতিবৃত্ত জেনে আসা যাক।

টিকাঃ
[১] উসদুল গাবাহ: ২/৪১৮
[২] মুসনাদে আহমাদ: ২২২১১
[৩] মুসনাদে আহমাদ: ২৪৩৮৭

📘 ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নববী দর্পণে সমকালীন ধারণা > 📄 শেষ কথা

📄 শেষ কথা


ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স তামাম দুনিয়ায় উল্লেখযোগ্যভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। একজন ব্যক্তির নিজের আবেগ পরিচালনা এবং অন্য লোকেদের পরিচালনা করার ক্ষেত্রে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স এর গুরুত্ব সীমাহীন। এটি বিশ্বাস করা হয় যে উচ্চ বুদ্ধিমত্তাবান লোকেরা কেবল নিজেদের জানা এবং বোঝার ক্ষেত্রেই ভাল নয়, অন্য মানুষের আবেগকে উপলব্ধি করতে এবং সম্মান করতেও তারা সমানভাবে দক্ষ এবং সক্ষম। এটাকে এমন একটা মিসিং লিংক হিসেবে ধরা যায় যা ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন এবং পেশাগত জীবনকে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

আমরা সবাই আল্লাহর রাসূল সঃ এর সাথে গভীরভাবে ব্যক্তিগত কানেকশন অনুভব করি। বিশেষ করে যখন আমরা সীরাত অধ্যয়ন করি। আমরা বিশ্বের যেখানেই থাকি না কেন এবং বিভিন্ন বর্ণ, জাতিগত এবং সাংস্কৃতিক পটভূমি নির্বিশেষে সবার কাছে তিনি “আমার নবি”, এমনকি যে পাপী শয়তানের প্ররোচনায় পাপ করে ফেলে তার কাছেও তিনি “আমার নবি”, “প্রিয় নবি”!

একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের অবশ্যই আমাদের প্রিয় নবি -এর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁকে মানবজাতির কাছে পাঠিয়েছেন এবং নীতি ও আচার-আচরণে সর্বোত্তম হতে শিখিয়েছেন যাতে আমরা তাঁর মধ্যে সবচেয়ে সম্পূর্ণ এবং সর্বোত্তম উদাহরণ খুঁজে পাই।

নবি -এর পরে আমাদের জীবনকে গঠন এবং পরিচালনা করার ক্ষেত্রে, অবশ্যই আমাদের সতর্ক হতে হবে। বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের যে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে জ্ঞান নেওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহ এবং রাসূল -এর কষ্টিপাথরে যাচাই করে দেখে নিতে হবে। ভালো এবং মানবতার জন্য কল্যাণকর যে কোনো কিছু নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। আধুনিক বিশ্বের বিভিন্ন তত্ত্ব এবং গবেষণা মানবজাতির জন্য অনেকক্ষেত্রে আশীর্বাদ এবং অনেকক্ষেত্রে অভিশাপও বয়ে নিয়ে আসছে। নববি ফিল্টার যদি আমরা যথাযথভাবে এবং যথাযথ জায়গায় প্রয়োগ করতে পারি তাহলে মানবজাতি সত্যিকার অর্থেই উপকৃত হবে।

রাসূল -এর সীরাতের মধ্যে আমরা বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা, সৎগুণ, আবেগের যথাযোগ্য প্রয়োগ এবং আধ্যাত্মিক সুখানুভূতির এক অসাধারণ মিশ্রণ পাই। সফলতার একেকটি সোপান হয়ে এগুলো আমাদের সামনে ধরা দেয়। পাশাপাশি ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের আধুনিক তত্ত্ব এবং গতিধারাগুলোর সাথে যদি আমরা নববি শিক্ষার যথাযথ সংমিশ্রণ ঘটাতে পারি, তাহলে চমৎকার কিছু দিক-নির্দেশনা আমরা পাই। এগুলো আমাদের মাঝে ব্যক্তিগতভাবে আধ্যাত্মিকতার এক নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চার করবে, পাশাপাশি পুরো সমাজকেও প্রভাবিত এবং গতিশীল করবে, ইনশাআল্লাহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00