📄 প্রাকৃতিক কোনো কিছু দেখলে পরকালের চিন্তা করা
১০. যেসব বিষয় ঈমানকে তরতাজা করে তার মধ্যে একটি হলো, প্রাকৃতিক কোনো কিছু দেখলে পরকালের চিন্তা করা। যেমন, বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে, "রাসূল ﷺ যখন আকাশে কালো মেঘ দেখতে পেতেন, তখন তাঁর চেহারায় একটা শঙ্কার ভাব ফুটে ওঠত। হযরত আয়শা রাযি. বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! লোকজনকে দেখি, মেঘ দেখলে আনন্দিত হয় এ বলে যে, বৃষ্টি নামবে। আর আপনাকে দেখি, চিন্তিত; যা আপনার চেহারা দেখলেই বুঝা যায়। তখন তিনি বললেন, হে আয়েশা! আমাকে কে নিশ্চয়তা দেবে যে, এতে আল্লাহর আযাব নেই। এক সম্প্রদায়কে মেঘ-বাতাস দ্বারা শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। তারা মেঘ দেখে বলেছিল, এই তো বৃষ্টি আসছে। "
নবী কারীম ﷺ সূর্যগ্রহণ দেখলে ভয়ে ভীত হয়ে পড়তেন। হযরত আবু মূসা রাযি. হতে বর্ণিত, “যখন সূর্যগ্রহণ লাগত, তখন রাসূল ﷺ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। হয়তো বা কিয়ামত সংঘটিত হতে যাচ্ছে।”
রাসূল ﷺ চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণ লাগলে আমাদেরকে নামাজে দাঁড়াতে নির্দেশ দিতেন এবং জানাতেন যে, “এগুলো হলো, আল্লাহর নির্দেশ। যা দ্বারা তিনি তাঁর বান্দাদেরকে ভয়-ভীতি দেখান।”
এ কথা নিঃসন্দেহ সঠিক যে, এসব বাহ্যিক নিদর্শন দেখলে এবং এর দ্বারা ভয়-ভীতি আসলে ঈমান নবরূপ লাভ করে আল্লাহমুখী হয়। আল্লাহর শক্তি ও কুদরত, তাঁর শাস্তি ও আযাবের কথা স্মরণ হয়। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, "রাসূল ﷺ আমার হাত ধরে চাঁদের দিকে ইশারা করে বলেন, হে আয়েশা! এর অনিষ্ট থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাও। কেননা, এটাই কুরআনে বর্ণিত আয়াতের দৃষ্টান্ত। অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে যখন তা সমাগত হয়।”
তেমনিভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির আবাসস্থল এবং কাফের জালেমদের কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময়, তা দেখে মনে মনে চিন্তা করা এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। হযরত ইবনে উমর রাযি. হতে বর্ণিত, “রাসূল ﷺ যখন হিজরবাসীদের আবাসস্থল অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি তাঁর সাহাবাদের বলেছিলেন, তোমরা এ শাস্তিপ্রাপ্তদের এলাকায় প্রবেশ করবে ক্রন্দনরত অবস্থায়। তোমরা ক্রন্দনরত অবস্থা ব্যতিরেকে সেখানে প্রবেশ করলে, তাদের মতো আক্রান্ত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।”
আজকাল লোকজন সেখানে যায় ভ্রমণ করার উদ্দেশ্যে!! এরপর সেখানে গিয়ে ছবি তুলে!! মূলত বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করে দেখা প্রয়োজন।
টিকাঃ
১২০. সহীহ মুসলিম: ৮৯৯
১২১. ফাতহুল বারী: ২/৫৪৫
১২২. মুসনাদে আহমাদ: ৬/২৩৭
১২৩. সহীহ বুখারী: ৪২৩
📄 সর্বদা আল্লাহর যিকির বা তাঁর স্মরণ করা
১১. ঈমানী দুর্বলতার জন্য সর্বোত্তম চিকিৎসা হলো, সর্বদা আল্লাহর যিকির বা তাঁর স্মরণ করা। মহান আল্লাহ এ ব্যাপারে নির্দেশ দিয়ে বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর। "
যারা তাঁকে বেশি বেশি স্মরণ করবে, তাদের সফলতার ব্যাপারে ঘোষণা দিয়ে তিনি ইরশাদ করেন-
وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“এবং তোমরা আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর; তাহলে আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।”
আল্লাহর স্মরণ ও যিকির সবচেয়ে বড় জিনিস। মহান আল্লাহ বলেন, “এবং আল্লাহর স্মরণ, এটা সবচেয়ে বড়।” রাসূল ﷺ ঐ ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বলেন, (যার নিকট ইসলামী শরীয়তের বিধি-বিধান অধিক (প্রিয়/ কার্যকর) বলে মনে হয়ে থাকে) তোমার জিহ্বা যেন সর্বদা আল্লাহর যিকিরে সিক্ত থাকে। "
ঈমানকে মজবুত করতে হলে অবশ্যই সদা-সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, যখন ভুলে যাবে তখন তোমার প্রভুকে স্মরণ কর। আল্লাহর স্মরণে যে, অন্তরে সুপ্রতিক্রিয়া ঘটে তা বর্ণনা করে মহান প্রভু বলেন-
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
“জেনে রেখ! প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ শান্তি পায়। "
অনেকেই বিভিন্ন আমল যেমন, নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতে কষ্ট অনুভব করে, তাদের জন্য সহজ হলো, সর্বদা দুআ-দরুদ এবং যিকির-আযকারে মশগুল থাকা। এখানে কিছু দুআর কথা উল্লেখ করা হলো-
لا إله إلا الله لا شريك له ، له الملك وله الحمد، وهو على كل شيء قدير
“আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তাঁর কোনো শরীক নেই। তাঁর জন্যই রাজত্ব এবং তাঁর জন্যই প্রশংসা। আর তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।”
سبحان الله وبحمده، وسبحان الله العظيم
“আল্লাহ পবিত্র এবং সমস্ত প্রশংসা একমাত্র তাঁরই জন্য। আল্লাহ পবিত্র, সুমহান মর্যাদাশীল।”
لا حول ولا قوة إلا بالله
“আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া পাপ থেকে বিরত থাকা এবং নেক কাজ করা যায় না।”
টিকাঃ
১২৪. সূরা আহযাব: ৪১
১২৫. সূরা জুমুআ: ১০
১২৬. সুনানে তিরমিযী: ৩৩৭৫
১২৭. সূরা রা'দ: ২৭
📄 মুনাজাত বা একান্তভাবে আল্লাহ তাআলাকে ডাকা
১২. যেসব বিষয় ঈমানকে তরতাজা করে তার মধ্যে অন্যতম হলো, মুনাজাত বা একান্তভাবে আল্লাহ তাআলাকে ডাকা। বান্দা যত বেশি আল্লাহর একান্ত বাধ্যগত হবে, যত বেশি তাঁর কাছে অবনত হয়ে থাকবে; ততই তাঁর নিকটবর্তী হবে।
রাসূল ﷺ বলেন-
أقرب ما يكون العبد من ربه وهو ساجد فأكثروا الدعاء
“বান্দা সিজাদবনত অবস্থায় তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়। সুতরাং তোমরা বেশি বেশি দুআ কর। "
কেননা সিজদাবনত অবস্থায় বান্দা বেশি অনুগত থাকে। যখনই বান্দা মস্তককে মাটিতে বিছিয়ে রাখে, তখনই তার রবের বেশি নিকটবর্তী হয়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় এক দুআর কথা উল্লেখ করেছেন-
أسألك بعزك وذلي إلا رحمتني، أسألك بقوتك وضعفي، وبغناك عني وفقري إليك، هذه ناصيتي الكاذبة الخاطئة بين يديك، عبيدك سواي كثير، لا ملجأ ولا منجا منك إلا إليك، أسألك مسألة المساكين، وأبتهل إليك ابتهال الخاضع الذليل، وأدعوك دعاء الخائف الضرير، سؤال من خضعت لك رقبته ورغم لك أنفه، وفاضت لك عيناه، وذل لك قلبه
“আপনার ইজ্জতের মাধ্যমে আমি আপনার নিকট প্রার্থনা করছি। আপনার রহমত ব্যতীত আমার অপমান থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই । আমি আপনার শক্তি দ্বারা আমার দুর্বলতা দূর করতে চাই । আপনার আধিপত্যের মাধ্যমে আমার দারিদ্রতা দূর করতে চাই। আমার এই হতভাগা কপাল আপনার সামনে লুণ্ঠিত। আমি ছাড়া আপনার বান্দা অনেক রয়েছে। কিন্তু আপনি ছাড়া আমার আর কোনো আশ্রয়স্থল ও পরিত্রাণ নেই। আমি আপনার নিকট মিসকীনের মতো ভিক্ষা চাচ্ছি। অনুগতের মতো কাতর প্রার্থনা করছি। ভীতসন্ত্রস্তের মতো ডাকছি। যে আপনার ভয়ে তার পা নিচু করেছে, নাক ধুলোয় ধূসরিত করেছে। যার চক্ষু দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে এবং আপনার ভয়ে যার অন্তর কেঁপে ওঠছে।”
যখন বান্দা এ ধরনের বাক্য দ্বারা মুনাজাত করবে, তখন তার অন্তরে ঈমান অবশ্যই অনেকগুণে বৃদ্ধি পাবে।
টিকাঃ
১২৮. এসব মাসনূন দুআ শেখার জন্য আমরা 'হিসনুল মুসলিম' নামক কিতাবখানা পড়তে পারি।
১২৯. সহীহ মুসলিম: ৪৮২
📄 কামনা-বাসনা কম করা
১৩. কামনা-বাসনা কম করা: ঈমানকে তাজা করতে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, এ আয়াতের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে-
أَفَرَأَيْتَ إِن مَّتَّعْنَاهُمْ سِنِينَ - ثُمَّ جَاءَهُم مَّا كَانُوا يُوعَدُونَ - مَا أَغْنَى عَنْهُم مَّا كَانُوا يُمَتَّعُونَ
"আপনি ভেবে দেখুন তো, যদি আমি তাদেরকে বছরের পর বছর ভোগ-বিলাস করতে দেই, অতঃপর যে বিষয়ে তাদেরকে ওয়াদা দেওয়া হত, তা তাদের কাছে এসে পড়ে। তখন তাদের ভোগ-বিলাস তাদের কি কোনো উপকারে আসবে?”
كَأَنْ لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا سَاعَةٌ مِنَ النَّهَارِ
“মনে হচ্ছে যে, তারা দিনের এক মুহূর্ত সময় অবস্থান করেছে।”
এ হচ্ছে দুনিয়ার অবস্থা। তাই মানুষের উচিত বেশি আকাঙ্ক্ষা না করা যে, আমি আরও বাঁচবো, আরও বেশ কিছুদিন বেঁচে থাকব। সালাফে সালেহীনের কয়েকজন এক ব্যক্তিকে বলেন, আমাদেরকে যোহরের নামাজ পড়ান। তখন সে ব্যক্তি বললেন, আমি যদি যোহরের নামাজ পড়াই; তাহলে আসরের নামাজে ইমামতি করতে পারব না। তখন তিনি তাকে বলেন, মনে হয় আপনি আশা করছেন যে, আপনি আসর পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন। আমরা বেশি আশা-আকাঙ্ক্ষা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।
টিকাঃ
১৩০. সূরা ফাতির: ১৫
১৩১. সূরা শুআরা: ২০৫-২০৭
১৩২. সূরা ইউনুস: ৪৫