📄 খারাপ পরিণতির আশঙ্কা করা
০৭. ঈমানের দুর্বলতার চিকিৎসার অন্যতম হলো, খারাপ পরিণতির আশঙ্কা করা। কেননা এটি একজন মুসলমানকে আনুগত্যের পানে উদ্বুদ্ধ করে এবং অন্তরে ঈমানকে তরতাজা করে। খারাপ পরিণতির আশঙ্কা করা হয় অনেক কারণে। যেমন, ঈমানের দুর্বলতা, গুনাহে লিপ্ত থাকা। রাসূল ﷺ এর অনেক চিত্র উল্লেখ করেছেন। যেমন, তিনি বলেন-
“যে ব্যক্তি নিজেকে কোনো লৌহখণ্ড দ্বারা হত্যা করল, সেই লৌহখণ্ড তার হাতে থাকবে এবং জাহান্নামের ভিতর সে তা দ্বারা তার পেটে আঘাত করতে থাকবে, সে চিরদিন জাহান্নামে থাকবে। যে ব্যক্তি কোনো পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে নিজেকে হত্যা করবে, সে জাহান্নামের আগুনে ঝাঁপ দিতে থাকবে এবং সে চিরদিন সেখানে থাকবে। আর যে ব্যক্তি বিষপান করে আত্মহত্যা করবে, তাকে জাহান্নামে বিষপান করতে দেওয়া হবে। সে তা অব্যাহতভাবে পান করতে থাকবে এবং সে চিরদিন জাহান্নামে থাকবে। "
রাসূল ﷺ এর যুগে এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। যেমন সেই ব্যক্তির ঘটনা, যে মুসলমান সৈন্যদের মাঝে ছিল এবং বীর বিক্রমে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করছিল। তার মতো এত বীর বিক্রমে আর কেউ যুদ্ধ করছিল না। রাসূল ﷺ বললেন, “সে নিশ্চয়ই জাহান্নামী (প্রকৃতপক্ষে, সে আল্লাহর জন্য লড়াই করছিল না)।” তখন একজন মুসলমান তাকে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছিল। দেখা গেল, ঔ ব্যক্তি মারাত্মক আহত হয়ে পড়ে। এ জন্য সে দ্রুত মৃত্যুবরণ করার মানসে তার তরবারিকে বুকের মাঝে ঠুকিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করে।
খারাপ পরিণতির বহু ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন গ্রন্থে এ ব্যাপারে অনেক ঘটনাই উল্লেখ রয়েছে। হযরত ইবনুল কাইয়্যিম রহ. 'আদ-দা' ওয়াদ-দাওয়া' নামক গ্রন্থে [পৃ: ১৭০] উল্লেখ করেছেন যে, কোনো এক ব্যক্তিকে তার মৃত্যুর সময় বলা হলো, আপনি 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলুন। সে বলল, আমি তা বলতে পারছি না। আরেকজনকে বলা হলো, আপনি বলুন, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তখন সে মাথা দুলিয়ে গান গাইতে লাগল। আরেকজন ব্যবসায়ীকে বলা হলো, 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বুলন। সে যেহেতু সব সময় ব্যবসা নিয়ে মশগুল থাকত; তাই সে বলতে লাগল, আপনার মতো লোেকই তো এটা কিনতে পারে, এর দামও খুব সস্তা। এরপর সে মৃত্যুবরণ করল। প্রসিদ্ধ আছে যে, বাদশাহ নাসেরের কয়েকজন সৈন্যের মৃত্যু ঘনিয়ে এলে তাদেরকে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে বলা হলো। তখন তারা 'আমাদের বাদশাহ নাসের' এ কথা বলতে বলতে মারা গেল। আরেকজনকে বলা হলো- বলুন, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তখন সে বলল, ঐ ঘরটাকে ঠিক করিও। ওর মাঝে এই এই সম্পদ আছে। অমুক বাগানে এই এই কাজ করিও। একজন সুদখোরকে বলা হলো- বলুন, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তখন সে 'শতকরা দশভাগ দিতে হবে' এটা বলতে বলতে মারা গেল।
টিকাঃ
১১০. সহীহ মুসলিম: ১০৯
১১১. সহীহ বুখারী
📄 বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করা
০৮. বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করা: রাসূল ﷺ বলেন- “তোমারা স্বাদ বিনষ্টকারী বস্তুকে বেশি বেশি স্মরণ কর। যার নাম হলো, মৃত্যু।”
মৃত্যুকে স্মরণ করলে তা মানুষকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে এবং কঠিন অন্তঃকরণকে নরম করে দেয়। কেউ যদি সংকট অবস্থায় মৃত্যুকে স্মরণ করে; তাহলে তার জন্য সবকিছু প্রশস্ত হয়ে যায়। মৃত্যুকে স্মরণ করার সহজ পন্থা হলো, কবর যিয়ারত করা। কবর যিয়ারত করতে রাসূল ﷺ নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা কবর যিয়ারত করতে পার। কেননা, তা অন্তরকে নরম করে দেয়। চক্ষুকে অশ্রুসিক্ত করে এবং পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তোমরা কবর যিয়ারত করা ত্যাগ করিও না।”
মুসলমানের জন্য কাফেরের কবর যিয়ারত করাও জায়েয। এর প্রমাণ সহীহ হাদীসে উল্লেখ হয়েছে। রাসূল ﷺ তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করেছিলেন। অতঃপর তিনি কাঁদতে শুরু করেন এবং আশপাশের সবাইকে কাঁদিয়েছিলেন (অর্থাৎ তাঁর কান্নায় সকলেই কেঁদেছেন)। অতঃপর তিনি বললেন, “আমি আল্লাহর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেছিলাম যে, আমার মায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি। কিন্তু আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। এরপর আমি তাঁর কবর যিয়ারত করার অনুমতি চেয়েছিলাম। তখন আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়। সুতরাং তোমরা কবর যিয়ারত কর। কেননা, তা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়।”
কবর যিয়ারত হলো অন্তঃকরণকে নরম করার বিরাট মাধ্যম। এর দ্বারা যিয়ারতকারী যেমন উপকৃত হোন, তেমনিভাবে কবরবাসীও উপকার লাভ করে থাকেন। কেননা, কবরবাসীর জন্য সেখানে দুআ করা হয়। রাসূল ﷺ কবরস্থানে গেলে এ দুআ পাঠ করতেন-
السلام عليكم أهل الديار من المؤمنين والمسلمين ويرحم الله المستقدمين منا والمستأخرين وإنا إن شاء الله بكم للاحقون
“মুমিন মুসলমান কবরবাসী! তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ আমাদের পূর্বে এবং পরে আগমণকারীদের প্রতি রহম করুন। আল্লাহ চাহেন তো আমরা অচিরেই তোমাদের সাথে মিলিত হব।”
যে ব্যক্তি কবর যিয়ারতের ইচ্ছা পোষণ করবে, তাকে অবশ্যই এর আদব-কায়দা রক্ষা করতে হবে। অন্তঃকরণকে এ জন্য পরকালমুখী করতে হবে এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে বের হতে হবে। মাটির নিচে যারা চলে গেছে, তাদের কথা চিন্তা করতে হবে। তারা পরিবার-পরিজন ছেড়ে আজ কোথায় চলে গেছে! টাকা-পয়সা ধন-সম্পদ সব ফেলে রেখে গেছে! তাদের আরও কত আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা কোথায় চলে গেছে! কবরের মাটি আজ তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে ইয়াতীম করে দিয়েছে! স্ত্রীকে বিধবা করেছে... এসব চিন্তা করতে হবে। চিন্তা করতে হবে, কিভাবে মৃত ব্যক্তির পা অচল হয়ে গিয়েছে! চোখ দৃষ্টিহীন হয়ে গেছে, পোকা-মাকড় জিহ্বা ও শরীরকে খেয়ে ফেলেছে! মাটি তার সবকিছুকে মলিন করে দিয়েছে! যে ব্যক্তি বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করবে, সে ব্যক্তি তিনটি জিনিস লাভে ধন্য হবে। ০১. দ্রুত তাওবা করা। ০২. অন্তরকে অল্পে তুষ্ট করা। ০৩. ইবাদতে আগ্রহী হওয়া। আর যে ব্যক্তি মৃত্যুকে ভুলে যাবে, সে তিনটি বস্তু দ্বারা নিগৃহীত হবে। ০১. তাওবা করতে শৈথিল্যতা। ০২. তাকদীরে যা মিলে তাতে সন্তুষ্ট না হওয়া। ০৩. ইবাদতে অলসতা পয়দা হওয়া।
টিকাঃ
১১২. সুনানে তিরমিযী
১১৩. মুস্তাদরাকে হাকিম: ১/৩৭৬
১১৪. সহীহ মুসলিম: ৩/৬৫
১১৫. সহীহ মুসলিম: ৯৭৪
📄 পরকালের মনজিলের কথা স্মরণ করা
০৯. পরকালের মনজিলের কথা স্মরণ করা: ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, কারো যদি চিন্তাধারা সঠিক হয়; তাহলে তার দূরদৃষ্টি খুলে যাবে। এটি অন্তরের আলোকবর্তিকা। এর দ্বারা সে অনুধাবন করতে পারবে- জান্নাত-জাহান্নাম, আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য কী তৈরি করে রেখেছেন এবং তাঁর অবাধ্য বান্দাদের জন্য কী শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন? সে অনুধাবন করবে- মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কবর থেকে বের হচ্ছে, ফেরেশতাগণ তাদেরকে চারদিকে ঘিরে রেখেছে। মহান আল্লাহ তাআলা এসে উপস্থিত। তাঁর জন্য সিংহাসন তৈরি করে রাখা হয়েছে। সবার হাতে আমলনামা দেওয়া হবে। সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির, মিযান স্থাপন করা হয়েছে। বাদী-বিবাদী উপস্থিত। পাওনাদার উপস্থিত তার দাবি নিয়ে। পিপাসার্ত হয়ে সবাই দিশেহারা, হাউজে কাওছারে উপস্থিত। পুলসিরাত স্থাপন করা হয়েছে। আলো বণ্টন করা হয়েছে। কেউ কেউ তো অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছে। কত লোক পুলসিরাত থেকে জাহান্নামে ছিটকে পড়ছে। সে দেখতে পাবে- ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার চিত্র আর চিরস্থায়ী পরকালের অবস্থা।
কুরআন মাজীদে পরকালের বিভিন্ন চিত্র বর্ণিত হয়েছে। যেমন সূরা ক্বফ, ওয়াকিয়া, নাবা, মুতাফফিফীন ইত্যাদি সূরাসমূহের মধ্যে। এ ব্যাপারে অনেক কিতাবও রচিত হয়েছে। সেসব পাঠ করা উচিত।
টিকাঃ
১১৯. মাদারেজুস সালেকীন: ১/১২৩
📄 প্রাকৃতিক কোনো কিছু দেখলে পরকালের চিন্তা করা
১০. যেসব বিষয় ঈমানকে তরতাজা করে তার মধ্যে একটি হলো, প্রাকৃতিক কোনো কিছু দেখলে পরকালের চিন্তা করা। যেমন, বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে, "রাসূল ﷺ যখন আকাশে কালো মেঘ দেখতে পেতেন, তখন তাঁর চেহারায় একটা শঙ্কার ভাব ফুটে ওঠত। হযরত আয়শা রাযি. বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! লোকজনকে দেখি, মেঘ দেখলে আনন্দিত হয় এ বলে যে, বৃষ্টি নামবে। আর আপনাকে দেখি, চিন্তিত; যা আপনার চেহারা দেখলেই বুঝা যায়। তখন তিনি বললেন, হে আয়েশা! আমাকে কে নিশ্চয়তা দেবে যে, এতে আল্লাহর আযাব নেই। এক সম্প্রদায়কে মেঘ-বাতাস দ্বারা শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। তারা মেঘ দেখে বলেছিল, এই তো বৃষ্টি আসছে। "
নবী কারীম ﷺ সূর্যগ্রহণ দেখলে ভয়ে ভীত হয়ে পড়তেন। হযরত আবু মূসা রাযি. হতে বর্ণিত, “যখন সূর্যগ্রহণ লাগত, তখন রাসূল ﷺ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। হয়তো বা কিয়ামত সংঘটিত হতে যাচ্ছে।”
রাসূল ﷺ চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণ লাগলে আমাদেরকে নামাজে দাঁড়াতে নির্দেশ দিতেন এবং জানাতেন যে, “এগুলো হলো, আল্লাহর নির্দেশ। যা দ্বারা তিনি তাঁর বান্দাদেরকে ভয়-ভীতি দেখান।”
এ কথা নিঃসন্দেহ সঠিক যে, এসব বাহ্যিক নিদর্শন দেখলে এবং এর দ্বারা ভয়-ভীতি আসলে ঈমান নবরূপ লাভ করে আল্লাহমুখী হয়। আল্লাহর শক্তি ও কুদরত, তাঁর শাস্তি ও আযাবের কথা স্মরণ হয়। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, "রাসূল ﷺ আমার হাত ধরে চাঁদের দিকে ইশারা করে বলেন, হে আয়েশা! এর অনিষ্ট থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাও। কেননা, এটাই কুরআনে বর্ণিত আয়াতের দৃষ্টান্ত। অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে যখন তা সমাগত হয়।”
তেমনিভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির আবাসস্থল এবং কাফের জালেমদের কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময়, তা দেখে মনে মনে চিন্তা করা এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। হযরত ইবনে উমর রাযি. হতে বর্ণিত, “রাসূল ﷺ যখন হিজরবাসীদের আবাসস্থল অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি তাঁর সাহাবাদের বলেছিলেন, তোমরা এ শাস্তিপ্রাপ্তদের এলাকায় প্রবেশ করবে ক্রন্দনরত অবস্থায়। তোমরা ক্রন্দনরত অবস্থা ব্যতিরেকে সেখানে প্রবেশ করলে, তাদের মতো আক্রান্ত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।”
আজকাল লোকজন সেখানে যায় ভ্রমণ করার উদ্দেশ্যে!! এরপর সেখানে গিয়ে ছবি তুলে!! মূলত বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করে দেখা প্রয়োজন।
টিকাঃ
১২০. সহীহ মুসলিম: ৮৯৯
১২১. ফাতহুল বারী: ২/৫৪৫
১২২. মুসনাদে আহমাদ: ৬/২৩৭
১২৩. সহীহ বুখারী: ৪২৩