📘 ঈমানের দুর্বলতা > 📄 নিয়মিত ইসলামী আলোচনা সভায় উপস্থিত হওয়া এবং আল্লাহকে স্মরণকারী দুআ-দরুদ শিক্ষা করা

📄 নিয়মিত ইসলামী আলোচনা সভায় উপস্থিত হওয়া এবং আল্লাহকে স্মরণকারী দুআ-দরুদ শিক্ষা করা


০৪. নিয়মিত ইসলামী আলোচনা সভায় উপস্থিত হওয়া এবং আল্লাহকে স্মরণকারী দুআ-দরুদ শিক্ষা করা: কারণ, এসব সভাকে আল্লাহর ফেরেশতাগণ ডানা দিয়ে ঢেকে দেন এবং এর ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হতে থাকে। ফেরেশতাগণ তাঁদের জন্য দুআ করতে থাকেন । সহীহ হাদীসে রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত হয়েছে—
لَا يَقْعُدُ قَوْمٌ يَذْكُرُونَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ إِلَّا حَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ، وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ، وَنَزَلَتْ عَلَيْهِمِ السَّكِينَةُ، وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ
"কোনো সম্প্রদায় যদি কোথাও আল্লাহর যিকির বা স্মরণ করে ফেরেশতাগণ তাঁদেরকে ঢেকে নেন এবং তাঁদের ওপর রহমত বর্ষিত হয়। তাঁদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করা হয় এবং আল্লাহ তাঁদের কথা তাঁর নিকটবর্তী ফেরেশতাগণের নিকট উল্লেখ করেন।"
হযরত সাহল ইবনে হানযালিয়াহ রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেছেন-
مَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ عَلَى ذِكْرٍ فَتَفَرَّقُوا عَنْهُ إِلَّا قِيلَ لَهُمْ قُومُوا مَغْفُورًا لَكُمْ
“কোনো সম্প্রদায় যদি একত্রিত হয়ে আল্লাহ তাআলা'র স্মরণ করে, অতঃপর যখন তাঁরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তাঁদেরকে বলা হয়, তোমরা ওঠ তোমাদেরকে ক্ষমা করা হলো।”
ইবনে হাজার রহ. বলেন, এখানে আল্লাহর স্মরণ বলতে কোনো কাজের প্রতি সর্বদা লেগে থাকা বুঝায়। যেমন, কুরআন তিলাওয়াত, হাদীস পাঠ, ইসলামী জ্ঞান চর্চা ইত্যাদি।
ইসলামী আলোচনা সভা, যিকিরের মজলিস ঈমানকে বৃদ্ধি করে; যা মুসলিম শরীফে বর্ণিত হানযালা আল উসাইদী রাযি. এর হাদীস হতে বুঝা যায়। তিনি বলেন, “হযরত আবু বকর রাযি. আমাকে পথে দেখতে পেয়ে বললেন, হে হানযালা! আপনি কেমন আছেন? আমি বললাম, হানযালা মুনাফিক হয়ে গিয়েছে। তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! আপনি এ কি বলছেন? আমি বললাম, যখন আমরা রাসূল ﷺ এর নিকট থাকি, তখন তিনি আমাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের কথা বলেন; তখন মনে হয় যেন আমরা তা চাক্ষুস দেখছি। এরপর যখন আমরা রাসূল ﷺ এর মজলিস হতে বের হয়ে সন্তান-সন্ততি, স্ত্রীর নিকটে আসি অর্থাৎ ঘর-সংসারে এসে এসবের বেশির ভাগই ভুলে যাই। আবু বকর রাযি. বলেন, আল্লাহর শপথ! আমারও তো এরকমই হয়। এরপর আমি এবং আবু বকর রাযি. সামনে চললাম এবং রাসূল ﷺ এর দরবারে প্রবেশ করলাম। তিনি বললেন, কী ব্যাপার? বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার নিকট থাকলে আপনি জান্নাত-জাহান্নামের কথা বলেন, তখন মনে হয় যেন আমরা তা নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করছি। এরপর যখন আপনার নিকট থেকে ঘর-সংসারে স্ত্রী-সন্তানদের নিকট যাই, তখন এসবের বেশিরভাগই ভুলে যাই। তখন রাসূল ﷺ বললেন-
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنْ لَوْ تَدُومُونَ عَلَى مَا تَكُونُونَ عِنْدِي، وَفِي الذِّكْرِ، لَصَافَحَتْكُمُ الْمَلَائِكَةُ عَلَى فُرُشِكُمْ وَفِي طُرُقِكُمْ، وَلَكِنْ يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً وَسَاعَةً ثَلَاثَ مَرَّاتٍ
“সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার জীবন নিবদ্ধ, তোমরা যদি আমার এখানে যে অবস্থায় থাক, তা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হতে; তাহলে ফেরেশতাগণ তোমাদের বিছানায় এবং তোমাদের (চলার) পথে তোমাদের সাথে মুসাফাহা করত। কিন্তু হে হানযালা! এটি এক সময় আর ওটি আরেক সময়। (তিনবার)।”

টিকাঃ
৮০. সহীহ মুসলিম: ২৭০০
৮১. সহীহুল জামে': ৫৫০৭
৮২. সহীহ মুসলিম: ২৭৫০

📘 ঈমানের দুর্বলতা > 📄 বেশি বেশি নেক আমল করা এবং এর দ্বারা সময়কে ভরিয়ে ফেলা

📄 বেশি বেশি নেক আমল করা এবং এর দ্বারা সময়কে ভরিয়ে ফেলা


০۵. বেশি বেশি নেক আমল করা এবং এর দ্বারা সময়কে ভরিয়ে ফেলা: এটি চিকিৎসার একটি মোক্ষম দাওয়া এবং ঈমানের ওপর এর প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট। এক্ষেত্রে হযরত আবু বকর রাযি. এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। রাসূল ﷺ একদিন তাঁর সাহাবাদের প্রশ্ন করলেন, "আজকে তোমাদের মাঝে কে রোযা রেখেছে? আবু বকর রাযি. বললেন, আমি। তিনি বললেন, আজকে তোমাদের মাঝে কে জানাযায় শরীক হয়েছে? আবু বকর রাযি. বললেন, আমি। তিনি প্রশ্ন করলেন, তোমাদের মাঝে আজকে কে মিসকীনকে খাবার খাওয়ায়েছে? আবু বকর রাযি. বললেন, আমি। তিনি প্রশ্ন করলেন, তোমাদের মাঝে কে আজকে পীড়িতদের সেবা করেছে? আবু বকর রাযি. বললেন, আমি। তখন রাসূল ﷺ বললেন, কোনো মানুষের মাঝে এসব কাজের সমাবেশ ঘটলে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
এ ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. সময়কে কাজে লাগাতেন। নবী কারীম ﷺ থেকে যখন হঠাৎ বিভিন্ন ধরনের ইবাদতের প্রশ্ন আসছিল, তখন দেখা গেল হযরত আবু বকর রাযি. ছিলেন আনুগত্যে পরিপূর্ণ।
তিনি সব ধরনের নেকীর সুযোগকেই কাজে লাগিয়েছেন। আমাদের সালাফে সালেহীনের অনেকের জীবনেই এ ধরনের আমল লক্ষ্য করা গেছে। হাম্মাদ ইবনে সালামা রহ. এর ব্যাপারে ইমাম আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী বলেন, যদি হাম্মাদকে বলা হয়- আপনি আগামীকাল মৃত্যুবরণ করবেন; তাহলেও তাঁর কোনো আমল বৃদ্ধি করার প্রয়োজন পড়বে না।

টিকাঃ
৮৩. আরবাউ মাসাইল ফিল ঈমান: ৭২
৮৪. সহীহ মুসলিম
৮৫. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৭/৪৪৭

📘 ঈমানের দুর্বলতা > 📄 বিভিন্ন ধরনের ইবাদতে আত্মনিয়োগ

📄 বিভিন্ন ধরনের ইবাদতে আত্মনিয়োগ


০৬. বিভিন্ন ধরনের ইবাদতে আত্মনিয়োগ: মহান আল্লাহর অনুগ্রহ যে, তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ইবাদত করার সুযোগ রেখেছেন। এর মাঝে কিছু ইবাদত রয়েছে শারীরিক, যেমন: নামাজ। আবার কিছু রয়েছে আর্থিক, যেমন: যাকাত, সদাকা। আবার কিছু রয়েছে উভয়টির সংমিশ্রণে, যেমন: হাজ্ব ও উমরা। কিছু রয়েছে জিহ্বার, যেমন: যিকির, দুআ। একই ইবাদত আবার ভাগ হয়েছে ফরয, সুন্নাত, মুস্তাহাব ইত্যাদি ভাগে। সুন্নাত নামাজ কিছু রয়েছে বারো রাকাত, আবার কিছু রয়েছে চার রাকাত ইত্যাদি। মানুষের প্রবৃত্তিও বিভিন্ন রকমের রয়েছে। কেউ কিছু আমল করতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আবার অনেকে বিভিন্ন ধরনের আমল করে আনন্দ পায়। মহান আল্লাহ জান্নাতে বিভিন্ন ধরনের আমলের জন্য বিভিন্ন গেট (ফটক) তৈরি করে রেখেছেন। যেন তাঁর বান্দাগণ সেগুলো দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। হযরত আবু হুরায়রা রাযي. হতে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল ﷺ বলেছেন-
من أنفق زوجين في سبيل الله نودي من أبواب الجنة: يا عبد الله هذا خير فمن كان من أهل الصلاة دعي من باب الصلاة ومن كان من أهل الجهاد دعي من باب الجهاد ومن كان من أهل الصيام دعي من باب الريان ومن كان من أهل الصدقة دعي من باب الصدقة
"যে ব্যক্তি জোড়া জোড়া আল্লাহর পথে দান করল, জান্নাতের দরজা থেকে ডাকা হবে। হে আল্লাহর বান্দা! এটা খুবই উত্তম। তোমাদের মাঝে যে নামাজী, সে নামাজের ফটক দিয়ে প্রবেশ কর। হে জিহাদকারী! জিহাদের তোরণ দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ কর। হে রোযাদার রাইয়ান গেট দিয়ে প্রবেশ কর। হে দানকারী! সদাকার দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ কর।”
এর উদ্দেশ্য হলো, বেশি বেশি নফল ইবাদত কর। আর ফরয তো অবশ্যই আদায় করতে হবে। নবী কারীম ﷺ বলেন, “পিতা হলো জান্নাতের মধ্যম দরজা। "
অর্থাৎ, পিতার খেদমত করলে জান্নাতে প্রবেশের পথ প্রশস্ত হবে।
এভাবে বিভিন্ন ইবাদত হতে ফায়দা নেওয়া সম্ভব- ঈমানের দুর্বলতার চিকিৎসায়। বেশি বেশি আমল করতে হবে, যা করতে সাধারণত অন্তরে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। সাথে সাথে ফরয-ওয়াজিবের ওপর আমল অবশ্যই জারি রাখতে হবে। আমরা এ ব্যাপারে একটি উদাহরণ পেশ করছি। এক ব্যক্তি এসে রাসূল ﷺ এর কাছে তার আত্মার কাঠিন্যতার ব্যাপারে অভিযোগ পেশ করলে রাসূল ﷺ তাকে বললেন, “তুমি কি চাও যে, তোমার অন্তর নরম হোক এবং তোমার প্রয়োজন পূরণ হোক? তুমি ইয়াতীমের প্রতি দয়া কর। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও এবং তাকে তোমার খাবার থেকে খাওয়াও। তোমার অন্তর নরম হবে এবং তোমার প্রয়োজন পূরণ হবে। "
এটা দুর্বল ঈমানের চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ প্রমাণ। এটাকে আমরা কাজে লাগাতে পারি।

টিকাঃ
১০৭. সহীহ বুখারী: ১৭৯৮
১০৮. সুনানে তিরমিযী: ১৯০০
১০৯. তাবারানী

📘 ঈমানের দুর্বলতা > 📄 খারাপ পরিণতির আশঙ্কা করা

📄 খারাপ পরিণতির আশঙ্কা করা


০৭. ঈমানের দুর্বলতার চিকিৎসার অন্যতম হলো, খারাপ পরিণতির আশঙ্কা করা। কেননা এটি একজন মুসলমানকে আনুগত্যের পানে উদ্বুদ্ধ করে এবং অন্তরে ঈমানকে তরতাজা করে। খারাপ পরিণতির আশঙ্কা করা হয় অনেক কারণে। যেমন, ঈমানের দুর্বলতা, গুনাহে লিপ্ত থাকা। রাসূল ﷺ এর অনেক চিত্র উল্লেখ করেছেন। যেমন, তিনি বলেন-
“যে ব্যক্তি নিজেকে কোনো লৌহখণ্ড দ্বারা হত্যা করল, সেই লৌহখণ্ড তার হাতে থাকবে এবং জাহান্নামের ভিতর সে তা দ্বারা তার পেটে আঘাত করতে থাকবে, সে চিরদিন জাহান্নামে থাকবে। যে ব্যক্তি কোনো পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে নিজেকে হত্যা করবে, সে জাহান্নামের আগুনে ঝাঁপ দিতে থাকবে এবং সে চিরদিন সেখানে থাকবে। আর যে ব্যক্তি বিষপান করে আত্মহত্যা করবে, তাকে জাহান্নামে বিষপান করতে দেওয়া হবে। সে তা অব্যাহতভাবে পান করতে থাকবে এবং সে চিরদিন জাহান্নামে থাকবে। "
রাসূল ﷺ এর যুগে এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। যেমন সেই ব্যক্তির ঘটনা, যে মুসলমান সৈন্যদের মাঝে ছিল এবং বীর বিক্রমে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করছিল। তার মতো এত বীর বিক্রমে আর কেউ যুদ্ধ করছিল না। রাসূল ﷺ বললেন, “সে নিশ্চয়ই জাহান্নামী (প্রকৃতপক্ষে, সে আল্লাহর জন্য লড়াই করছিল না)।” তখন একজন মুসলমান তাকে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছিল। দেখা গেল, ঔ ব্যক্তি মারাত্মক আহত হয়ে পড়ে। এ জন্য সে দ্রুত মৃত্যুবরণ করার মানসে তার তরবারিকে বুকের মাঝে ঠুকিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করে।
খারাপ পরিণতির বহু ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন গ্রন্থে এ ব্যাপারে অনেক ঘটনাই উল্লেখ রয়েছে। হযরত ইবনুল কাইয়্যিম রহ. 'আদ-দা' ওয়াদ-দাওয়া' নামক গ্রন্থে [পৃ: ১৭০] উল্লেখ করেছেন যে, কোনো এক ব্যক্তিকে তার মৃত্যুর সময় বলা হলো, আপনি 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলুন। সে বলল, আমি তা বলতে পারছি না। আরেকজনকে বলা হলো, আপনি বলুন, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তখন সে মাথা দুলিয়ে গান গাইতে লাগল। আরেকজন ব্যবসায়ীকে বলা হলো, 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বুলন। সে যেহেতু সব সময় ব্যবসা নিয়ে মশগুল থাকত; তাই সে বলতে লাগল, আপনার মতো লোেকই তো এটা কিনতে পারে, এর দামও খুব সস্তা। এরপর সে মৃত্যুবরণ করল। প্রসিদ্ধ আছে যে, বাদশাহ নাসেরের কয়েকজন সৈন্যের মৃত্যু ঘনিয়ে এলে তাদেরকে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে বলা হলো। তখন তারা 'আমাদের বাদশাহ নাসের' এ কথা বলতে বলতে মারা গেল। আরেকজনকে বলা হলো- বলুন, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তখন সে বলল, ঐ ঘরটাকে ঠিক করিও। ওর মাঝে এই এই সম্পদ আছে। অমুক বাগানে এই এই কাজ করিও। একজন সুদখোরকে বলা হলো- বলুন, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তখন সে 'শতকরা দশভাগ দিতে হবে' এটা বলতে বলতে মারা গেল।

টিকাঃ
১১০. সহীহ মুসলিম: ১০৯
১১১. সহীহ বুখারী

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00