📘 ঈমানের দুর্বলতা > 📄 কুরআন মাজীদ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা

📄 কুরআন মাজীদ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা


০১. কুরআন মাজীদ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা: কুরআনকে আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের বর্ণনাকারী এবং আলোকবর্তিকা হিসেবে অবতীর্ণ করেছেন; যেন তাঁর বান্দাগণ পথের দিশা লাভ করে।
এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এতে উত্তম ও কার্যকরী চিকিৎসা রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন-
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِين
“আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি, যা রোগের সুচিকিৎসা এবং মুমিনের জন্য রহমত।”
রাসূল ﷺ কুরআন নিয়ে গবেষণা করতেন। তিনি রাতে বেশি বেশি তিলাওয়াত করতেন। এমনকি এক রাতে একটি মাত্র আয়াতে কারীমা সকাল পর্যন্ত তিলাওয়াত করেছেন। আয়াতটি হলো-
إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَadكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
"যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন; তবে তারা আপনার বান্দা। আর যদি আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন; তবে আপনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”
নবী কারীম ﷺ কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতেন। তিনি এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মর্যাদায় পৌঁছেছিলেন। ইবনে হিব্বান সহীহ সনদে আতা রহ. থেকে বর্ণনা করেন, আমি এবং উবায়দুল্লাহ ইবনে উমায়ের হযরত আয়েশা রাযি. এর নিকট গেলাম। আব্দুল্লাহ ইবনে উমায়ের বললেন, “আপনি আমাদের নিকট এক আশ্চর্যজনক হাদীস বর্ণনা করুন, যা আপনি রাসূল ﷺ কে করতে দেখেছেন। তখন তিনি কেঁদে দিলেন এবং বললেন, এক রাতে তিনি আমাকে বললেন, হে আয়েশা তুমি আমাকে ছেড়ে দাও। আমি আমার রবের ইবাদত করব। আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! আমি আপনার সঙ্গ ভালোবাসি এবং আপনি যাতে খুশি হোন, তা পছন্দ করি। অতঃপর তিনি অযু করলেন এবং নামাজে দাঁড়ালেন। নামাজে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর কাপড় ভিজে গেল। এমনকি কাঁদতে কাঁদতে সামনের মাটি পর্যন্ত ভিজে গেল। ইত্যবসরে হযরত বিলাল রাযি. এসে ফজরের আযান দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। যখন তিনি তাঁকে কাঁদতে দেখলেন, তখন বললেন- হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কাঁদছেন? অথচ আল্লাহ তাআলা আপনার পূর্বের এবং পরের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। তিনি বললেন, আমি কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী বান্দা হব না! আজকে এ রাত্রিতে আমার ওপর এক আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, তার জন্য ধ্বংস, যে তা পাঠ করবে; অথচ তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে না।"
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِّأُولِي الْأَلْبَابِ - الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
“নিশ্চয়ই আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য। যাঁরা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা গবেষণা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষয়ে....”।
কুরআন মাজীদে রয়েছে তাওহীদ, ভালো কাজে পুরস্কারের ঘোষণা আর অন্যায় কাজে শাস্তির বিধান। বিভিন্ন ধরনের বিধি-বিধান। ঘটনা প্রবাহ ও চরিত্র মাধুর্য। যা মানুষের অন্তরে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তেমনিভাবে কিছু সূরা রয়েছে, যা মানুষের অন্তরকে উদ্বেগাকুল করে তোলে। নবী কারীম ﷺ এর এ কথাই তার প্রমাণ বহন করে। “সূরা হুদ এবং এ ধরনের সূরাগুলি আমাকে বৃদ্ধ হওয়ার আগেই বৃদ্ধ করে ফেলেছে।”
অন্য বর্ণনায় এসেছে, “সূরা হুদ, ওয়াকিয়া, মুরসালাত, নাবা এবং সূরা তাকভীর আমাকে বৃদ্ধ করে ফেলেছে।”
কেননা, এতে যে বিষয়বস্তু রয়েছে এবং যে মহান দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে, সেসব চিন্তা করতে গিয়ে রাসূল ﷺ এর চুল-দাড়ি পেকে যায়। “আপনি সুদৃঢ় ভাবে দাঁড়ান। যেভাবে আপনি আদিষ্ট হয়েছেন এবং যারা আপনার সাথে তাওবা করেছে।"
নবী কারীম ﷺ এর সাহাবাগণ কুরআন পড়তেন, কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতেন এবং কুরআন দ্বারা প্রভাবিত হতেন।
হযরত আবু বকর রাযি. একজন নরম দিলের মানুষ ছিলেন। তিনি যখন লোকদের নামাজ পড়াতে গিয়ে আল্লাহর কালাম পাঠ করতেন, তখন তিনি কান্না সংবরণ করতে পারতেন না।
হযরত উমর রাযি. আল্লাহর এ আয়াত- إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِعُ - مَا لَهُ مِنْ دَافِعٍ “আপনার পালনকর্তার শাস্তি অবশ্যম্ভাবী, তা কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না।”
এই আয়াত পাঠ করার পর আল্লাহর ভয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পরেন। এমনকি নামাজে যখন কুরআন তেলাওয়াত করা হত এবং আল্লাহর আযাব ও জাহান্নাম সংক্রান্ত আয়াত আসতো তখন তিনি ভয়ে কাঁদতে থাকতেন। একেবারে পিছনের কাতারে অবস্থানকারী লোকেরাও তাঁর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেত।"
হযরত উসমান রাযি. বলেন, “আমাদের অন্তর যদি পুতঃপবিত্র থাকে; তাহলে আল্লাহর কালামে আমরা কখনো পরিতুষ্ট হব না।” তাঁকে অন্যায়ভাবে শহীদ করা হয়েছিল, তখন তাঁর রক্ত কুরআন মাজীদে গিয়ে পড়ে। এ ব্যাপারে সাহাবাগণের অনেক ঘটনা রয়েছে। হযরত আইয়ুব রহ. থেকে বর্ণিত হয়েছে, সাঈদ ইবনে যুবাইরকে একই নামাজের ভিতর এই আয়াতটি বিশ বারেরও অধিক পাঠ করতে শুনেছি।
وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ
“তোমরা ঐ দিনকে ভয় কর, যেদিন তোমরা আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।”
এটি হচ্ছে কুরআনের সর্বশেষ নাযিলকৃত আয়াত। আয়াতটির পূর্ণতা হলো-
وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
"তোমরা ঐ দিনকে ভয় কর, যেদিন তোমরা আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে। অতঃপর প্রত্যেকেই তার কর্মের ফল পুরোপুরি পাবে এবং তাদের প্রতি কোনোরূপ অবিচার করা হবে না।”
হযরত ইবরাহীম ইবনে বাশার বলেন, যে আয়াত পাঠ করতে গিয়ে হযরত আলী ইবনে ফুজাইল ইন্তিকাল করেন তা হলো-
وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى النَّارِ فَقَالُوا يَا لَيْتَنَا نُرَدُّ
“আর আপনি যদি দেখেন, যখন তাদেরকে দোযখের ওপর দাঁড় করানো হবে! তারা বলবে, কতই না ভালো হত, যদি আমরা পুনঃপ্রেরিত হতাম।”
এখানে এসে তিনি থমকে দাঁড়ান এবং মৃত্যুবরণ করেন। আমি তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করেছিলাম।
তিলাওয়াতে সেজদার ব্যাপারেও তাঁদের অনেক ঘটনা রয়েছে। তন্মধ্যে সেই ব্যক্তির ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; যিনি আল্লাহর এ বাণী-
وَيَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعًا
“তাঁরা ক্রন্দন করতে করতে নত মস্তকে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয়ভাব আরও বৃদ্ধি পায়।”
পাঠ করার পর তিলাওয়াতে সেজদা করেন, অতঃপর নিজেকে ভর্ৎসনা করে বলেন, এত সেজদা করলাম; কিন্তু কান্না কোথায়?
কুরআনের উপর চিন্তা-ভাবনা করার সর্বোত্তম বিষয় হলো, কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন উদাহরণ নিয়ে গবেষণা করা। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য উদাহরণ পেশ করে থাকেন; যেন তারা তাকে স্মরণ করে। তিনি আরও বলেন, আমি এসব উদাহরণ মানুষের জন্য এ জন্যই পেশ করে থাকি যে, যেন তারা চিন্তা-ভাবনা করে।
সালাফে সালেহীনের একজন একবার কুরআনের একটি উদাহরণ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছিলেন। কিন্তু সেটি তাঁর নিকট স্পষ্ট হচ্ছিল না। তখন তিনি কাঁদতে লাগলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কেন কাঁদছেন? তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ وَمَا يَعْقِلُهَا إِلَّا الْعَالِمُونَ
“আমি মানুষের জন্য এসব উদাহরণ দিয়ে থাকি; কিন্তু জ্ঞানীগণই তা বোঝে। "
আমি এই উদাহরণটি বুঝতে পারছি না। সুতরাং আমি আলেম নই। আমার নিকট থেকে ইলম চলে যাওয়ার কারণে আমি কাঁদছি।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে আমাদের জন্য অনেক উদাহরণ পেশ করেছেন। যেমন, ঐ ব্যক্তির উদাহরণ- যে আগুন জ্বালিয়েছে, ঐ ব্যক্তির উদাহরণ- যে চিৎকার করছে, কারণ সে শুনে না। ঐ শষ্য-দানার উদাহরণ- যা সাতটি শীষ বের করেছে। ঐ কুকুরের উদাহরণ- যা ঘেউ ঘেউ করছে। ঐ গাধার উদাহরণ- যা বইপত্র বহন করছে। মাছির উদাহরণ, মাকড়সার উদাহরণ, বধির, মূক, চক্ষুষ্মান ও শ্রবণশক্তিসম্পন্ন মানুষের উদাহরণ, বালুকণার উদাহরণ- যাকে ঝড়ে উড়িয়ে নিচ্ছে, উত্তম বৃক্ষ, খারাপ বৃক্ষ, আকাশ হতে বৃষ্টিবর্ষণ, চেরাগদানির মাঝে চেরাগের উদাহরণ, সেই গোলামের উদাহরণ- যে কোনোই ক্ষমতা রাখে না। সেই ব্যক্তির উদাহরণ- যার সাথে অনেক শরীকদার রয়েছে। এ ধরনের অনেক উদাহরণ পেশ করা হয়েছে; যেন বিশেষভাবে এসব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা হয়।

টিকাঃ
৬০. সূরা বনী ইসরাইল: ৮২
৬১. সূরা মায়েদা: ১১৮
৬২. সূরা আলে ইমরান: ১৯০-১৯১
৬৩. আস-সিলসিলাতুস সহীহাহ: ১/১০৬
৬৪. সূরা তূর: ৭-৮
৬৫. মানাকিবে উমর- ইবনে জাওযী: ১৬৭
৬৬. সূরা বাকারা: ২৮১
৬৭. সূরা আনআম: ২৭
৬৮. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৮/৪৪৬
৬৯. সূরা বনী ইসরাঈল: ১০৯
৭০. সূরা আনকাবূত: ৪৩

📘 ঈমানের দুর্বলতা > 📄 মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর বড়ত্ব অনুভব করা

📄 মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর বড়ত্ব অনুভব করা


২. মহান পরাক্রমশালী আল্লাহর বড়ত্ব অনুভব করা: তাঁর নাম ও গুণাবলি জানা এবং এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা। এর অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা এবং এ অনুভূতি অন্তর থেকে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে দিতে হবে। কারণ, অন্তঃকরণ হলো রাজা। আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হলো তার সৈন্য-সামন্ত। অন্তর যদি ভালো থাকে; তাহলে সব ভালো থাকবে। আর তা যদি নষ্ট হয়ে যায়; তাহলে সবই বিনষ্ট হয়ে যাবে।
কুরআন ও হাদীসে আল্লাহর বড়ত্বের ব্যাপারে অনেক দলীল-প্রমাণ রয়েছে। যদি কোনো মুসলমান তা গভীর দৃষ্টিতে দেখে; তাহলে তার অন্তঃকরণ কেঁপে ওঠবে এবং তার সত্তা মহান প্রতিপালকের সামনে অবনত হবে। তাঁর প্রতি বিনয়ীভাব আরও বৃদ্ধি পাবে।
তাঁর কয়েকটি নাম ও গুণাবলি এখানে উল্লেখ করছি। যেমন, তিনি মহান পরাক্রমশালী, অহংকারী, বান্দাদের ওপর প্রতাপশালী, বিদ্যুৎ এবং ফেরেশতাকুল তাঁর ভয়ে তাসবীহ পাঠ করছে। তিনি প্রতিশোধ গ্রহণকারী, তিনি সর্বদা জাগ্রত, কখনো ঘুমান না। তার জ্ঞান সর্বত্র ব্যাপ্ত। চক্ষুর খেয়ানত ও অন্তঃকরণে কী লুকানো আছে? তিনি তা জানেন। তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানের কথা এভাবে বলেছেন-
وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُبِينٍ
“আর তাঁর কাছেই অদৃশ্য জগতের চাবি রয়েছে। এগুলো তিনি ব্যতীত কেউ জানে না। স্থলে ও জলে যা আছে, তিনিই জানেন। তাঁর অজ্ঞাতসারে কোনো পাতাই ঝরে পড়ে না। মৃত্তিকার অন্ধকারে কোনো শস্য কণা অথবা কোনো আর্দ্র বা শুষ্ক এমন কোনো জিনিস নেই; যা এক প্রকাশ্য গ্রন্থে লিপিবদ্ধ নেই।”
তিনি তাঁর এ বাণীতে নিজের বড়ত্বের কথা জানিয়েছেন-
وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتُ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ
“তারা আল্লাহকে যথার্থরূপে বোঝেনি। কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোতে এবং আসমানসমূহ ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে। তিনি পবিত্র। আর এরা যাকে শরীক করে, তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে।”
রাসূল ﷺ বলেন-
يَقْبِضُ اللهُ الأَرْضَ، وَيَطْوِي السَّمَوَاتِ بِيَمِينِهِ، ثُمَّ يَقُولُ: أَنَا المَلِكُ، أَيْنَ مُلُوكُ الْأَرْضِ
“কিয়ামতের দিন আল্লাহ পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় নিয়ে নেবেন এবং আসমানসমূহ ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে। অতঃপর তিনি বলবেন, আমিই বাদশাহ। আজ দুনিয়ার বাদশাহরা কোথায়?”
কেউ যদি মূসা আ. এর ঘটনা গভীর দৃষ্টিতে দেখে; তাহলে তার অন্তর কেঁপে ওঠবে। যখন তিনি বলেছিলেন-
“হে রব! আপনি আমাকে দেখা দিন। আমি আপনাকে দেখব। তখন আল্লাহ বলেন, তুমি আমাকে কখনোই দেখতে পাবে না; তবে তুমি পাহাড়ের দিকে দেখতে থাক। সেটি যদি যথাস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে; তাহলে তুমিও আমাকে দেখতে পাবে। তারপর যখন তাঁর পরওয়ারদেগার পাহাড়ের ওপর আপন জ্যোতির বিকিরণ ঘটালেন, সেটিকে বিধ্বস্ত করে দিলেন এবং মূসা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।”
নবী কারীম ﷺ যখন এ আয়াত ব্যাখ্যা করলেন, তখন তিনি হাত দ্বারা ইশারা করে বললেন-
حِجَابُهُ النُّورُ، لَوْ كَشَفَهُ لَأَحْرَقَتْ سُبُحَاتُ وَجْهِهِ مَا انْتَهَى إِلَيْهِ بَصَرُهُ مِنْ خَلْقِهِ
“আল্লাহর রয়েছে নূরের পর্দা। যদি তিনি তা খুলে ফেলেন; তাহলে তাঁর চেহারার আলো যতদূর দৃষ্টি যায়, ততদূর পর্যন্ত যা সৃষ্টি রয়েছে সবই পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।”
আল্লাহ তাআলা'র বড়ত্বের কথা বর্ণনা করে রাসূল ﷺ বলেন-
إِذَا قَضَى اللَّهُ الْأَمْرَ فِي السَّمَاءِ ضَرَبَتْ الْمَلَائِكَةُ بِأَجْنِحَتِهَا خُضْعَانًا لِقَوْلِهِ كَأَنَّهُ سِلْسِلَةٌ عَلَى صَفْوَانٍ فَإِذَا فُزِّعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا لِلَّذِي قَالَ الْحَقَّ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ
“যখন আল্লাহ আসমানে কোনো নির্দেশ জারি করেন, তখন ফেরেশতাকুল আল্লাহর ভয়ে বিনয়ী হয়ে পাখা নাড়াতে থাকেন; যেন তাঁরা লোহার শিকলের পাথরে বাঁধা রয়েছেন। যখন তাঁদের অন্তঃকরণ থেকে ভয় বিদূরিত হয়, তখন তাঁরা বলেন- তোমাদের রব কি বলেছেন? তাঁরা বলেন, তিনি অবশ্যই সত্য বলেছেন। তিনি সর্বোচ্চ ও সুমহান।"
এ ব্যাপারে অনেক দলীল-প্রমাণ রয়েছে। এখানে এসবের কতিপয় উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো, এসব চিন্তা-গবেষণা করে যেন ঈমানের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য চেষ্টা করা হয়।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় মহান রবের বড়ত্বের কথা এভাবে তুলে ধরেছেন, 'তিনিই সব রাজত্বের কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করছেন, নির্দেশ দিচ্ছেন, মৃত্যু দিচ্ছেন এবং জীবিত করছেন। তিনিই মর্যাদা দিচ্ছেন এবং অপমানিত করছেন। দিন-রাত্রির আবর্তন ঘটাচ্ছেন। মানুষের মাঝে (সুখ-দুঃখের) দিন ঘুরাচ্ছেন। রাজ্যসমূহ পরিবর্তন করছেন; ফলে কোনো রাষ্ট্র ঠিক রাখছেন, আবার কোনোটাকে ধ্বংস করে আরেকটি গড়ছেন। তাঁর নির্দেশ আকাশে, বাতাসে, সমুদ্রে সর্বত্র বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি সবকিছুকে তাঁর জ্ঞান দ্বারা পরিবেষ্টিত করে রেখেছেন। তাঁর শ্রবণশক্তি সকল কণ্ঠকে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে। তাঁর কাছে এক কণ্ঠস্বর অন্য কণ্ঠস্বরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ঠেকে না। বরং সব ভাষায় সব কথাই তিনি একসাথে শুনতে পাচ্ছেন। তাঁকে অধিক প্রার্থনা ও যাচনা ভ্রান্তিতে ফেলতে পারে না এবং আকুতি-মিনতীকারীদের কাতর কণ্ঠ তাঁকে বিরক্ত করতে পারে না। তাঁর দৃষ্টিশক্তি সবকিছুকেই অবলোকন করছে। এমনকি অন্ধকারে কালো পাথরের ওপর দিয়ে কালো পিপীলিকার দল গেলেও, তা থেকে তাঁর দৃষ্টি এড়ায় না। সুতরাং অদৃশ্য তাঁর নিকট প্রকাশ্য এবং গোপনীয় বিষয় তাঁর নিকট স্পষ্ট। আসমানসমূহ এবং জমিনে যারা রয়েছে, তারা তাঁর নিকট প্রার্থনা-যাচনা করছে। তিনি গুনাহ মাফ করেন। বিপদগ্রস্তকে উদ্ধার করছেন। দুঃখীকে মুক্ত করছেন। রিক্তহস্তকে দান করছেন। পথ ভ্রষ্টকে পথের দিশা দিচ্ছেন। ক্ষুধার্তকে খাবার দিচ্ছেন। বিবস্ত্রকে বস্ত্র দান করছেন। পীড়িতকে আরোগ্য দান করছেন। তাওবাকারীর তাওবা কবুল করছেন। সৎকাজকারীকে প্রতিদান দিচ্ছেন এবং মাজলুমকে সাহায্য করছেন। অত্যাচারীকে পদানত করছেন। সম্মানীর সম্মান রক্ষা করছেন এবং আশ্রয়হীনকে নিরাপত্তা দান করছেন। তিনিই বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর উত্থান ঘটাচ্ছেন আবার কিছু কিছু জাতিকে ধ্বংস করছেন। যদি আকাশ ও জমিনের পূর্বের ও পরের, মানুষ এবং জ্বীন সকলেই তাঁর অনুগত বান্দা হয়ে যায়; তাহলে তাঁর রাজত্ব সামান্যতম বৃদ্ধি পাবে না। আর যদি পূর্বের ও পরের সকল মানব-দানব তাঁর অবাধ্য হয়ে যায়; তাহলেও তাঁর রাজত্বে সামান্যতম ঘাটতি হবে না। দুনিয়া ও আকাশের সমস্ত মানুষ ও জিন, জীবিত ও মৃত সকলেই যদি কোথাও একত্রিত হয়ে তাঁর নিকট প্রার্থনা করে এবং তিনি প্রত্যেককে তার প্রার্থিত বস্তু দান করেন; তাহলে তাঁর ভাণ্ডার থেকে সামান্যতম জিনিসও কমবে না। তিনিই প্রথম, যাঁর পূর্বে আর কেউ নেই এবং তিনিই সর্বশেষ, তাঁর পরে আর কেউ নেই। তিনিই প্রকাশ্য, যাঁর ওপরে আর কেউ নেই এবং তিনিই অপ্রকাশ্য, যাঁর পিছনে আর কেউ নেই। তিনিই বরকতময়, যাঁর ভাণ্ডার হতে কোনো কিছু ঘাটতি হবে না। তাঁর কোনো শরীক নেই। নেই কোনো প্রতিপক্ষ। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। সৃষ্টিকুলে তাঁর কোনো তুলনা হয় না। সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে একমাত্র তাঁর রাজত্ব ব্যতীত। তাঁর অনুমতি ব্যতীত কারো আনুগত্য নেই। কেউ তাঁর জ্ঞানের বাহিরে অন্যায় করতে পারে না। কেউ আনুগত্য করলে তিনি খুশি হোন, পাপ করলে (যাকে ইচ্ছা) ক্ষমা করে দেন। তাঁর পক্ষ থেকে প্রতিশোধ হলো ইনসাফস্বরূপ। তাঁর প্রতিটি নেয়ামত রহমতস্বরূপ। তিনি সবার হিফাজতকারী। তিনি যা ইচ্ছা তা করেন। তিনি কোনো কিছু ইচ্ছা করলে বলেন- হয়ে যাও, তখনই তা হয়ে যায়।

টিকাঃ
৭১. অহংকার একমাত্র মহান আল্লাহরই গুণ।
৭২. সূরা আনআম: ৫৯
৭৩. সূরা যুমার: ৬৭
৭৪. সহীহ বুখারী: ৪৮১২; সহীহ মুসলিম: ২৭৮৭
৭৫. সূরা আ'রাফ: ১৪৩
৭৬. সহীহ মুসলিম: ১৭৯
৭৭. সহীহ বুখারী: ৪৮০০

📘 ঈমানের দুর্বলতা > 📄 শরীয়তের জ্ঞান অর্জন করা

📄 শরীয়তের জ্ঞান অর্জন করা


০৩. শরীয়তের জ্ঞান অর্জন করা: শরীয়তের সেই জ্ঞান অর্জন করা জরুরি, যা মানুষের মাঝে খোদাভীতি এবং ঈমান বৃদ্ধিতে সহায়ক। যেমন মহান আল্লাহ বলেন-
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
“আল্লাহর বান্দাগণের মধ্যে আলেমরাই কেবল আল্লাহকে ভয় করে।”
ঈমানদারদের ক্ষেত্রে যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা একই মর্যাদার হতে পারে না। কীভাবে তারা একই মর্যাদার হতে পারে? যে শরীয়তের বিস্তারিত জ্ঞানের অধিকারী, শাহাদাতাইনের অর্থ এবং দাবি জানে, মৃত্যুর পরের জীবনের কথা, শাস্তি বা নেয়ামতের কথা জানে, সে আর যে এসব সম্পর্কে অজ্ঞ সে কি একই মর্যাদার অধিকারী হতে পারে? আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ
“বলুন! যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?”

টিকাঃ
৭৮. সূরা ফাতির: ২৮
৭৯. সূরা যুমার: ০৯

📘 ঈমানের দুর্বলতা > 📄 নিয়মিত ইসলামী আলোচনা সভায় উপস্থিত হওয়া এবং আল্লাহকে স্মরণকারী দুআ-দরুদ শিক্ষা করা

📄 নিয়মিত ইসলামী আলোচনা সভায় উপস্থিত হওয়া এবং আল্লাহকে স্মরণকারী দুআ-দরুদ শিক্ষা করা


০৪. নিয়মিত ইসলামী আলোচনা সভায় উপস্থিত হওয়া এবং আল্লাহকে স্মরণকারী দুআ-দরুদ শিক্ষা করা: কারণ, এসব সভাকে আল্লাহর ফেরেশতাগণ ডানা দিয়ে ঢেকে দেন এবং এর ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হতে থাকে। ফেরেশতাগণ তাঁদের জন্য দুআ করতে থাকেন । সহীহ হাদীসে রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত হয়েছে—
لَا يَقْعُدُ قَوْمٌ يَذْكُرُونَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ إِلَّا حَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ، وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ، وَنَزَلَتْ عَلَيْهِمِ السَّكِينَةُ، وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ
"কোনো সম্প্রদায় যদি কোথাও আল্লাহর যিকির বা স্মরণ করে ফেরেশতাগণ তাঁদেরকে ঢেকে নেন এবং তাঁদের ওপর রহমত বর্ষিত হয়। তাঁদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করা হয় এবং আল্লাহ তাঁদের কথা তাঁর নিকটবর্তী ফেরেশতাগণের নিকট উল্লেখ করেন।"
হযরত সাহল ইবনে হানযালিয়াহ রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেছেন-
مَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ عَلَى ذِكْرٍ فَتَفَرَّقُوا عَنْهُ إِلَّا قِيلَ لَهُمْ قُومُوا مَغْفُورًا لَكُمْ
“কোনো সম্প্রদায় যদি একত্রিত হয়ে আল্লাহ তাআলা'র স্মরণ করে, অতঃপর যখন তাঁরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তাঁদেরকে বলা হয়, তোমরা ওঠ তোমাদেরকে ক্ষমা করা হলো।”
ইবনে হাজার রহ. বলেন, এখানে আল্লাহর স্মরণ বলতে কোনো কাজের প্রতি সর্বদা লেগে থাকা বুঝায়। যেমন, কুরআন তিলাওয়াত, হাদীস পাঠ, ইসলামী জ্ঞান চর্চা ইত্যাদি।
ইসলামী আলোচনা সভা, যিকিরের মজলিস ঈমানকে বৃদ্ধি করে; যা মুসলিম শরীফে বর্ণিত হানযালা আল উসাইদী রাযি. এর হাদীস হতে বুঝা যায়। তিনি বলেন, “হযরত আবু বকর রাযি. আমাকে পথে দেখতে পেয়ে বললেন, হে হানযালা! আপনি কেমন আছেন? আমি বললাম, হানযালা মুনাফিক হয়ে গিয়েছে। তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! আপনি এ কি বলছেন? আমি বললাম, যখন আমরা রাসূল ﷺ এর নিকট থাকি, তখন তিনি আমাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের কথা বলেন; তখন মনে হয় যেন আমরা তা চাক্ষুস দেখছি। এরপর যখন আমরা রাসূল ﷺ এর মজলিস হতে বের হয়ে সন্তান-সন্ততি, স্ত্রীর নিকটে আসি অর্থাৎ ঘর-সংসারে এসে এসবের বেশির ভাগই ভুলে যাই। আবু বকর রাযি. বলেন, আল্লাহর শপথ! আমারও তো এরকমই হয়। এরপর আমি এবং আবু বকর রাযি. সামনে চললাম এবং রাসূল ﷺ এর দরবারে প্রবেশ করলাম। তিনি বললেন, কী ব্যাপার? বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার নিকট থাকলে আপনি জান্নাত-জাহান্নামের কথা বলেন, তখন মনে হয় যেন আমরা তা নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করছি। এরপর যখন আপনার নিকট থেকে ঘর-সংসারে স্ত্রী-সন্তানদের নিকট যাই, তখন এসবের বেশিরভাগই ভুলে যাই। তখন রাসূল ﷺ বললেন-
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنْ لَوْ تَدُومُونَ عَلَى مَا تَكُونُونَ عِنْدِي، وَفِي الذِّكْرِ، لَصَافَحَتْكُمُ الْمَلَائِكَةُ عَلَى فُرُشِكُمْ وَفِي طُرُقِكُمْ، وَلَكِنْ يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً وَسَاعَةً ثَلَاثَ مَرَّاتٍ
“সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার জীবন নিবদ্ধ, তোমরা যদি আমার এখানে যে অবস্থায় থাক, তা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হতে; তাহলে ফেরেশতাগণ তোমাদের বিছানায় এবং তোমাদের (চলার) পথে তোমাদের সাথে মুসাফাহা করত। কিন্তু হে হানযালা! এটি এক সময় আর ওটি আরেক সময়। (তিনবার)।”

টিকাঃ
৮০. সহীহ মুসলিম: ২৭০০
৮১. সহীহুল জামে': ৫৫০৭
৮২. সহীহ মুসলিম: ২৭৫০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00