📘 ঈমানের দুর্বলতা > 📄 শরীয়তের জ্ঞান ও ঈমানী বইপত্র থেকে দূরে থাকা

📄 শরীয়তের জ্ঞান ও ঈমানী বইপত্র থেকে দূরে থাকা


০৩. শরীয়তের জ্ঞান ও ঈমানী বইপত্র থেকে দূরে থাকা: উল্লিখিত বিষয়গুলো তাদের অন্তঃকরণ জীবন্ত করে তুলবে। অনেক বইপত্র রয়েছে, যা পাঠ করলে পাঠক বুঝতে পারে যে, তার অন্তঃকরণে ঈমান নাড়া দিচ্ছে। এর মাঝে সর্বপ্রথম হলো, আল্লাহর পবিত্র কালাম কুরআন মাজীদ, হাদীসের গ্রন্থসমূহ এবং বিভিন্ন ইসলামী মনীষীদের লেখা বই, বিশেষভাবে আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এবং ইবনে রজব রহ. প্রভৃতি লেখকদের লেখা বই। কিছু বই রয়েছে যেমন, উদাহরণস্বরূপ ভাষাতত্ত্বের বই। এগুলো অন্তঃকরণে কাঠিন্যতা সৃষ্টি করে। এসব বই খারাপ, এ কথা বলা হচ্ছে না। এসব বইয়ের অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে; কিন্তু এর দ্বারা দুনিয়াবী স্বার্থ হাসিল হলেও ঈমান বৃদ্ধি পাবে না। পক্ষান্তরে, উদাহরণস্বরূপ আপনি বুখারী, মুসলিম শরীফের হাদীস পাঠ করলে মনে হবে যেন রাসূল ﷺ এর যুগে রয়েছেন। সাহাবায়ে কেরামদের সাথে রয়েছেন এবং এমন ঈমানী প্রবাহ অনুভব করছেন, যা তাঁদের যুগে সংঘটিত হয়েছে।
أهل الحديث هم أهل الرسول وإن لم يصحبوا نفسه، أنفاسه صحبوا.
'হাদীসের অনুসারীগণ রাসূল (ﷺ)-এর অনুসারী। যদিও তারা তাঁর দৈহিক সাহচর্য পায়নি; কিন্তু তাঁর নিশ্বাসের (বাণীর) সাহচর্য পাচ্ছে।'
এ কারণেই যারা শরীয়তের জ্ঞান থেকে দূরে যেমন, দর্শন, সমাজ প্রভৃতি এমন জ্ঞান নিয়ে মগ্ন- যার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই; তাদের ওপর এর প্রভাব স্পষ্ট। তেমনিভাবে যারা নভেল, নাটক ও ভালোবাসার গাল-গল্প নিয়ে ব্যস্ত এবং বিভিন্ন সংবাদ ও সংবাদপত্র নিয়ে ব্যস্ত, যাতে কোনো কল্যাণ নেই; তাদের ঈমানের দুর্বলতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

📘 ঈমানের দুর্বলতা > 📄 গুনাহগারদের মাঝে অবস্থান করা

📄 গুনাহগারদের মাঝে অবস্থান করা


০৪. গুনাহগারদের মাঝে অবস্থান করা: যেমন একজন গুনাহ করে তা গর্বভরে বর্ণনা করছে, দ্বিতীয়জন হয়তো গান ধরছে বা শুনছে, তৃতীয়জন ধূমপান করছে, চতুর্থজন হয়তো অশ্লীল পত্রিকা উল্টাচ্ছে, পঞ্চমজন কাউকে গাল-মন্দ করছে, এভাবেই গুনাহ আর গীবতের আসর জমিয়েছে। কেউ হয়তো ভিন্ন খেলার আসর নিয়ে মগ্ন, যেখানে গুনাহ আর অশ্লীলতার সীমা নেই। কিংবা তাদের মাঝে অবস্থান করা, যারা দুনিয়া ছাড়া আর কিছুর আলোচনা করে না। যারা কেবল ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়েই মগ্ন, বিনিয়োগ কিংবা চাকরি-বাকরির পদোন্নতি, উপরি পাওনা নিয়ে ব্যস্ত। তার বাড়ির কথা কি বলব? বাড়িতে যেসব অন্যায়-অশ্লীল কাজ ঘটছে, তা দেখে একজন মুমিনের অন্তর ব্যথিত না হয়ে পারে না। গানের ক্যাসেট, সিনেমার ফিল্ম চলছে, পুরুষ-মহিলার সাথে দেখা করছে, পর্দার কোনো ধার ধারছে না। এসব যদি কোনো মুসলমানের ঘরে সংঘটিত হয়; তাহলে তো অন্তঃকরণ অসুস্থ না হয়ে পারে না। এর ফলে যে (অন্তরে) কোমলতা দূর হয়ে কাঠিন্যতা সৃষ্টি হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

📘 ঈমানের দুর্বলতা > 📄 দুনিয়ার মোহে মগ্ন হওয়া

📄 দুনিয়ার মোহে মগ্ন হওয়া


০৫. দুনিয়ার মোহে মগ্ন হওয়া: রাসূল ﷺ বলেন-
تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ، وَالدِّرْهَم “দিনার ও দিরহামের (টাকা-পয়সার) গোলাম ধ্বংস হোক।"
তিনি আরও বলেন-
إِنَّمَا يَكْفِي أَحَدَكُمْ مَا كَانَ فِي الدُّنْيَا مِثْلُ زَادِ الرَّاكِبِ
“এ দুনিয়ায় তোমাদের কারো জন্য এতটুকুই যথেষ্ট, যা একজন মুসাফিরের যাত্রার পথের জন্য প্রয়োজন।"
অর্থাৎ, যৎসামান্য সম্পদই প্রয়োজন, যা তাকে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।
আজকে দুনিয়ার মোহে মানুষকে অন্ধের মতো ছুটতে দেখা যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য, কল-কারখানা ইত্যাদি নিয়ে মশগুল দেখা যায়। এ অবস্থার কথা রাসূল ﷺ এর হাদীসে এভাবে ব্যক্ত হয়েছে।
إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ قَالَ: إِنَّا أَنْزَلْنَا الْمَالَ لِإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ وَلَوْ كَانَ لِابْنِ آدَمَ وَادٍ لَأَحَبَّ أَنْ يَكُونَ إِلَيْهِ ثَانٍ وَلَوْ كَانَ لَهُ وَادِيَانِ لَأَحَبَّ أَنْ يَكُونَ إِلَيْهِمَا ثَالِثُ وَلَا يَمْلَأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلَّا التَّرَابُ ثُمَّ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ تَابَ
“মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি ধন-সম্পদ দিয়েছি নামাজ প্রতিষ্ঠা এবং যাকাত আদায় করার জন্য। যদি আদম সন্তানের এক মাঠ ভর্তি টাকা-পয়সা থাকে; তাহলে দুই মাঠ ভর্তি টাকা-পয়সা হোক, এটা কামনা করে। আর দুই মাঠ ভর্তি টাকা-পয়সা পেলে তিন মাঠ ভর্তি টাকা-পয়সা হোক, এটা চাইবে। আদম সন্তানের পেট একমাত্র মাটি দ্বারাই পরিপূর্ণতা লাভ করবে। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার তাওবা কবুল করবেন।"

টিকাঃ
৩৮. সহীহ বুখারী: ২৮৮৬
৩৯. তাবারানী-কাবীর: ৩৬৯৫ (৪/৭৮)
৪০. মুসনাদে আহমাদ: ২১৯৫৬ (৫/২১৯)

📘 ঈমানের দুর্বলতা > 📄 ধন-সম্পদ ও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মেতে থাকা

📄 ধন-সম্পদ ও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মেতে থাকা


০৬. ধন-সম্পদ ও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মেতে থাকা: মহান আল্লাহ বলেন-
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ
"আর তোমরা জেনে রাখ, তোমাদের ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি হলো ফিতনাস্বরূপ। "
তিনি অন্যত্র বলেন-
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَآبِ
“মানবকুলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তান-সন্ততি, রাশিকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি এবং ক্ষেত-খামারের মতো আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আল্লাহর নিকটই হলো উত্তম আশ্রয়। "
এ আয়াতের অর্থ হলো, যদি স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্যের ওপর প্রাধান্য পায়, তাহলে তা হবে গর্হিত ও ঘৃণিত। আর যদি এসব বস্তুর ভালোবাসা শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে হয়; তাহলে তা হবে পছন্দনীয়।
রাসূল ﷺ বলেন-
حُبِّبَ إِلَيَّ مِنَ الدُّنْيَا النِّسَاءُ وَالطَّيبُ، وَجُعِلَ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلَاةِ
“এ দুনিয়ার মাঝে আমার নিকট পছন্দনীয় বস্তু হলো, স্ত্রী ও সুগন্ধি। আর নামাজকে আমার চক্ষুশীতলকারী করা হয়েছে।”
অনেক লোকই স্ত্রীর পিছনে সন্তান-সন্ততির পিছনে ব্যস্ত হয়ে হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরে যায়। রাসূল ﷺ বলেছেন, “সন্তান হলো চিন্তা, কাপুরুষতা, অজ্ঞতা এবং কৃপণতার কারণ।"
কৃপণতার কারণ হচ্ছে, দান করতে গেলে শয়তান এসে বলে, তোমার সন্তানের জন্য কিছু রেখে দাও সেটাই উত্তম। তখন সে কৃপণতা অবলম্বন করে। কাপুরুষতার কারণ এ জন্য যে, শয়তান এসে বলে, তুমি মরতে যাচ্ছ? তোমার ছেলে-মেয়ে ইয়াতীম হয়ে যাবে, তখন আর সে জিহাদে বের হতে পারে না।
অজ্ঞতার অর্থ হলো, পিতা তার সন্তানের লেখাপড়া ও বই পড়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাকে স্কুলে পৌঁছানো, নিয়ে আসা ইত্যাদির কারণে নিজের জ্ঞানের পথ বন্ধ হয়ে যায়। আর চিন্তার কারণ হলো, সন্তান রোগাক্রান্ত হলে পিতা চিন্তিত হয়ে পড়ে। তার ঠিক মতো চিকিৎসা করাতে না পারলে চিন্তা আরও বহুগুণে বেড়ে যায়। আর সন্তান বড় হয়ে পিতার অবাধ্য হলে সর্বদা তা (পিতার জন্য) চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে এর অর্থ এ নয় যে, স্ত্রী, সন্তান-জন্মদান পরিত্যাগ করতে হবে। প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো, এদের কারণে যেন হারামের সাথে জড়িয়ে না পড়ে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
সম্পদের ফিতনার ব্যাপারে রাসূল ﷺ বলেন-
إِنَّ لِكُلِّ أُمَّةٍ فِتْنَةٌ وَفِتْنَةُ أُمَّتِي الْمَالُ
“প্রত্যেক উম্মতের জন্য ফিতনা রয়েছে। আর আমার উম্মতের জন্য ফিতনা হলো- ধন-সম্পদ। "
ধন-সম্পদের প্রতি অত্যধিক লোভ দ্বীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। (এ ক্ষতিগ্রস্ততা) নেকড়ের ছাগলের পালের ওপর আক্রমণের চেয়েও বেশি। এ অর্থেই রাসূল ﷺ এর এই বানী-
مَا ذِئْبَانِ جَائِعَانِ أُرْسِلاً فِي غَنَمٍ بِأَفْسَدَ لَهَا مِنْ حِرْصِ الْمَرْءِ عَلَى الْمَالِ وَالشَّرَفِ لِدِينِهِ
“দু'টি ক্ষুধার্ত বাঘ কোনো ছাগলের পালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে যে ক্ষতি করে, তার চেয়েও ক্ষতিকারক হলো, কোনো ব্যক্তির ধন-সম্পদের প্রতি এবং প্রতাপ-প্রতিপত্তির প্রতি অত্যধিক মোহ।"
এ জন্যই রাসূল ﷺ অল্পে তুষ্ট থাকতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন-
إِنَّمَا يَكْفِيكَ مِنْ جَمْعِ الْمَالِ خَادِمُ وَمَرْكَبُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য সেই সম্পদ জমা করাই যথেষ্ট, যার দ্বারা একটি খাদেম এবং আল্লাহর পথে যানবাহন ক্রয় করতে পার।”
রাসূল ﷺ অধিক সম্পদ সংগ্রহকারীকে সতর্ক করে দিয়েছেন একমাত্র সদাকাকারী ব্যতীত। তিনি বলেন-
وَيْلٌ لِلْمُكْثِرِينَ، إِلَّا مَنْ قَالَ بِالْمَالِ هَكَذَا، وَهَكَذَا، وَهَكَذَا، وَهَكَذَا أَرْبَعُ: عَنْ يَمِينِهِ، وَعَنْ شِمَالِهِ، وَمِنْ قُدَّامِهِ، وَمِنْ وَرَائِهِ
“অধিক সম্পদ গচ্ছিতকারীদের জন্য ধ্বংস, সে ব্যক্তি ব্যতীত যে তার সম্পদকে এভাবে (৪ বার) খরচ করে। ডানে বামে এবং সামনে পশ্চাতে খরচ করে। "

টিকাঃ
৪১. সূরা আনফাল: ২৮
৪২. সূরা আলে ইমরান: ১৪
৪৩. মুসনাদে আহমাদ: ৩/১২৮; সুনানে নাসাঈ: ৩৯৩৯
৪৪. তাবারানী-কাবীর: ২৪/২৪১
৪৫. সুনানে তিরমিযী: ২৩৩৬
৪৬. সুনানে তিরমিযী: ২৩৭৬
৪৭. মুসনাদে আহমাদ: ৫/২৯০
৪৮. সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১২৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00