📄 সৎ ও অনুকরণযোগ্য ব্যক্তি থেকে দূরে থাকা
০২. সৎ ও অনুকরণযোগ্য ব্যক্তি থেকে দূরে থাকা: যে ব্যক্তি নেককার ব্যক্তির নিকট শিক্ষা লাভ করে, সে একদিকে যেমন জ্ঞান লাভ করে, অন্যদিকে তেমন সৎ ও অনুকরণীয় ব্যক্তির চরিত্র থেকে ভালো গুণাবলি অর্জন করতে পারে। সে ঐ ব্যক্তির ঈমানী ও রূহানী প্রভাবে প্রভাবিত হয় এবং তাঁর উত্তম চরিত্রে অনুপ্রাণিত হয়। যদি সে কিছু সময় তাঁর থেকে দূরে থাকে; তবে সে অন্তরে কাঠিন্যতা অনুভব করে। এ জন্য যখন নবী কারীম ﷺ ইন্তেকাল করেন এবং তাঁকে দাফন করা হয়, এরপর সাহাবায়ে কেরাম বলেন, 'আমরা অন্তরে অবাঞ্ছিত ভাব অনুভব করলাম।' তাঁদের নিকট একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতা অনুভব হচ্ছিল। কেননা, তাঁদের মুরব্বী ও প্রশিক্ষক রাসূল ﷺ ইন্তেকাল করেছেন। তাঁদের অবস্থার কথা অন্য বর্ণনায় এভাবে চিত্রিত হয়েছে যে, (তাঁরা তখন এমনই হয়ে পড়েছিলেন, যেন) 'বৃষ্টিভেজা অন্ধকার রাতের পালহারা ছাগলের মতো'। কিন্তু রাসূল ﷺ তাঁদেরকে এমনভাবে ছেড়ে বিদায় নিয়েছিলেন যে, তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন এক একজন (ঈমানের ওপর অটলতার দিক থেকে) পাহাড়সম, এবং প্রত্যেকেই খেলাফত লাভের যোগ্য। আজকের দিনে মুসলমানরা সবচেয়ে মুখাপেক্ষী হয়ে রয়েছে যোগ্য অনুকরণীয়-অনুসরণীয় নেতার জন্য।
📄 শরীয়তের জ্ঞান ও ঈমানী বইপত্র থেকে দূরে থাকা
০৩. শরীয়তের জ্ঞান ও ঈমানী বইপত্র থেকে দূরে থাকা: উল্লিখিত বিষয়গুলো তাদের অন্তঃকরণ জীবন্ত করে তুলবে। অনেক বইপত্র রয়েছে, যা পাঠ করলে পাঠক বুঝতে পারে যে, তার অন্তঃকরণে ঈমান নাড়া দিচ্ছে। এর মাঝে সর্বপ্রথম হলো, আল্লাহর পবিত্র কালাম কুরআন মাজীদ, হাদীসের গ্রন্থসমূহ এবং বিভিন্ন ইসলামী মনীষীদের লেখা বই, বিশেষভাবে আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এবং ইবনে রজব রহ. প্রভৃতি লেখকদের লেখা বই। কিছু বই রয়েছে যেমন, উদাহরণস্বরূপ ভাষাতত্ত্বের বই। এগুলো অন্তঃকরণে কাঠিন্যতা সৃষ্টি করে। এসব বই খারাপ, এ কথা বলা হচ্ছে না। এসব বইয়ের অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে; কিন্তু এর দ্বারা দুনিয়াবী স্বার্থ হাসিল হলেও ঈমান বৃদ্ধি পাবে না। পক্ষান্তরে, উদাহরণস্বরূপ আপনি বুখারী, মুসলিম শরীফের হাদীস পাঠ করলে মনে হবে যেন রাসূল ﷺ এর যুগে রয়েছেন। সাহাবায়ে কেরামদের সাথে রয়েছেন এবং এমন ঈমানী প্রবাহ অনুভব করছেন, যা তাঁদের যুগে সংঘটিত হয়েছে।
أهل الحديث هم أهل الرسول وإن لم يصحبوا نفسه، أنفاسه صحبوا.
'হাদীসের অনুসারীগণ রাসূল (ﷺ)-এর অনুসারী। যদিও তারা তাঁর দৈহিক সাহচর্য পায়নি; কিন্তু তাঁর নিশ্বাসের (বাণীর) সাহচর্য পাচ্ছে।'
এ কারণেই যারা শরীয়তের জ্ঞান থেকে দূরে যেমন, দর্শন, সমাজ প্রভৃতি এমন জ্ঞান নিয়ে মগ্ন- যার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই; তাদের ওপর এর প্রভাব স্পষ্ট। তেমনিভাবে যারা নভেল, নাটক ও ভালোবাসার গাল-গল্প নিয়ে ব্যস্ত এবং বিভিন্ন সংবাদ ও সংবাদপত্র নিয়ে ব্যস্ত, যাতে কোনো কল্যাণ নেই; তাদের ঈমানের দুর্বলতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
📄 গুনাহগারদের মাঝে অবস্থান করা
০৪. গুনাহগারদের মাঝে অবস্থান করা: যেমন একজন গুনাহ করে তা গর্বভরে বর্ণনা করছে, দ্বিতীয়জন হয়তো গান ধরছে বা শুনছে, তৃতীয়জন ধূমপান করছে, চতুর্থজন হয়তো অশ্লীল পত্রিকা উল্টাচ্ছে, পঞ্চমজন কাউকে গাল-মন্দ করছে, এভাবেই গুনাহ আর গীবতের আসর জমিয়েছে। কেউ হয়তো ভিন্ন খেলার আসর নিয়ে মগ্ন, যেখানে গুনাহ আর অশ্লীলতার সীমা নেই। কিংবা তাদের মাঝে অবস্থান করা, যারা দুনিয়া ছাড়া আর কিছুর আলোচনা করে না। যারা কেবল ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়েই মগ্ন, বিনিয়োগ কিংবা চাকরি-বাকরির পদোন্নতি, উপরি পাওনা নিয়ে ব্যস্ত। তার বাড়ির কথা কি বলব? বাড়িতে যেসব অন্যায়-অশ্লীল কাজ ঘটছে, তা দেখে একজন মুমিনের অন্তর ব্যথিত না হয়ে পারে না। গানের ক্যাসেট, সিনেমার ফিল্ম চলছে, পুরুষ-মহিলার সাথে দেখা করছে, পর্দার কোনো ধার ধারছে না। এসব যদি কোনো মুসলমানের ঘরে সংঘটিত হয়; তাহলে তো অন্তঃকরণ অসুস্থ না হয়ে পারে না। এর ফলে যে (অন্তরে) কোমলতা দূর হয়ে কাঠিন্যতা সৃষ্টি হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
📄 দুনিয়ার মোহে মগ্ন হওয়া
০৫. দুনিয়ার মোহে মগ্ন হওয়া: রাসূল ﷺ বলেন-
تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ، وَالدِّرْهَم “দিনার ও দিরহামের (টাকা-পয়সার) গোলাম ধ্বংস হোক।"
তিনি আরও বলেন-
إِنَّمَا يَكْفِي أَحَدَكُمْ مَا كَانَ فِي الدُّنْيَا مِثْلُ زَادِ الرَّاكِبِ
“এ দুনিয়ায় তোমাদের কারো জন্য এতটুকুই যথেষ্ট, যা একজন মুসাফিরের যাত্রার পথের জন্য প্রয়োজন।"
অর্থাৎ, যৎসামান্য সম্পদই প্রয়োজন, যা তাকে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।
আজকে দুনিয়ার মোহে মানুষকে অন্ধের মতো ছুটতে দেখা যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য, কল-কারখানা ইত্যাদি নিয়ে মশগুল দেখা যায়। এ অবস্থার কথা রাসূল ﷺ এর হাদীসে এভাবে ব্যক্ত হয়েছে।
إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ قَالَ: إِنَّا أَنْزَلْنَا الْمَالَ لِإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ وَلَوْ كَانَ لِابْنِ آدَمَ وَادٍ لَأَحَبَّ أَنْ يَكُونَ إِلَيْهِ ثَانٍ وَلَوْ كَانَ لَهُ وَادِيَانِ لَأَحَبَّ أَنْ يَكُونَ إِلَيْهِمَا ثَالِثُ وَلَا يَمْلَأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلَّا التَّرَابُ ثُمَّ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ تَابَ
“মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি ধন-সম্পদ দিয়েছি নামাজ প্রতিষ্ঠা এবং যাকাত আদায় করার জন্য। যদি আদম সন্তানের এক মাঠ ভর্তি টাকা-পয়সা থাকে; তাহলে দুই মাঠ ভর্তি টাকা-পয়সা হোক, এটা কামনা করে। আর দুই মাঠ ভর্তি টাকা-পয়সা পেলে তিন মাঠ ভর্তি টাকা-পয়সা হোক, এটা চাইবে। আদম সন্তানের পেট একমাত্র মাটি দ্বারাই পরিপূর্ণতা লাভ করবে। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার তাওবা কবুল করবেন।"
টিকাঃ
৩৮. সহীহ বুখারী: ২৮৮৬
৩৯. তাবারানী-কাবীর: ৩৬৯৫ (৪/৭৮)
৪০. মুসনাদে আহমাদ: ২১৯৫৬ (৫/২১৯)