📄 ভালো কাজকে তুচ্ছজ্ঞান করা এবং ছোট ছোট নেকীর কাজকে গুরুত্ব না দেওয়া
হযরত ইবনে মাসউদ রাযি. মুমিন ও মুনাফিকের অবস্থা এভাবে বর্ণনা করেছেন-
إِنَّ الْمُؤْمِنَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَأَنَّهُ قَاعِدُ تَحْتَ جَبَلٍ يَخَافُ أَنْ يَقَعَ عَلَيْهِ، وَإِنَّ الْفَاجِرَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَذُبَابٍ مَرَّ عَلَى أَنْفِهِ فَقَالَ بِهِ هَكَذَا أَي دفعه بیده
“মুমিন ব্যক্তি তার গুনাহকে এভাবে দেখে, যেন সে পাহাড়ের নিচে বসে আছে আর সেটি তার ওপর পড়ে যাবে- এ আশঙ্কায় সে শঙ্কিত। আর পাপী ব্যক্তি তার গুনাহকে এভাবে দেখে, যেন তার নাকের ওপর একটি মাছি বসেছে, আর সে তা হাতের ইশারায় তাড়িয়ে দিল।”
১৪. ভালো কাজকে তুচ্ছজ্ঞান করা এবং ছোট ছোট নেকীর কাজকে গুরুত্ব না দেওয়া: নবী কারীম ﷺ শিক্ষা দিয়েছেন আমরা যেন এমন না হই। ইমাম আহমাদ হযরত আবু জরাই আল হুজাইমী রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন-
أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّا قَوْمٌ مِنْ أَهْلِ الْبَادِيَةِ فَعَلَّمْنَا شَيْئًا يَنْفَعُنَا اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى بِهِ قَالَ لَا تَحْقِرَنَّ مِنْ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا وَلَوْ أَنْ تُفْرِغَ مِنْ دَلْوِكَ فِي إِنَاءِ الْمُسْتَسْقِي وَلَوْ أَنْ تُكَلِّمَ أَخَاكَ وَوَجْهُكَ إِلَيْهِ مُنْبَسِطُ
"আমি রাসূল ﷺ এর নিকট গেলাম। অতঃপর বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা গ্রামের অধিবাসী। আমাদেরকে এমন কিছু শিক্ষা দিন, যা দ্বারা আল্লাহ তাআলা আমাদের কল্যাণ করেন। তখন তিনি বললেন, তুমি নেকীর কাজকে তুচ্ছজ্ঞান করবে না। যদিও তুমি তোমার ভাইয়ের পাত্রে বালতি থেকে একটু পানি ঢেলে দাও অথবা তোমার কোনো ভাইয়ের সাথে হাসি মুখে কথা বল।”
এ জন্যই কারো পাত্রে একটু পানি ঢেলে দেওয়া বা কারো সাথে হাসি মুখে কথা বলা এবং মাসজিদ থেকে ময়লা আবর্জনা দূর করা- এমন ছোট ছোট কাজও গুনাহ মাফের কারণ হবে। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে এসব কাজের জন্য তাকে ক্ষমা করে দেবেন। আপনি কি রাসূল ﷺ এর হাদীসটি জানেন না যে, তিনি বলেছেন-
مَرَّ رَجُلٌ بِغُصْنٍ شَجَرَةٍ عَلَى ظَهْرِ طَرِيقٍ، فَقَالَ: وَاللَّهِ لَأُنَحِّيَنَّ هَذَا عَنِ الْمُسْلِمِينَ لَا يُؤْذِيهِمْ فَأُدْخِلَ الْجَنَّةِ
“এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখল, এক গাছের একটি ডাল রাস্তার ওপর পড়ে আছে। সে ব্যক্তি বলল, আল্লাহর শপথ! আমি অবশ্যই এটিকে মুসলমানদের পথ থেকে সরিয়ে দেব; যেন তা তাদেরকে কষ্ট না দেয়। এ জন্য তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়।”
যে ব্যক্তি ছোট-খাটো নেকীর কাজকে অবজ্ঞা বা তুচ্ছজ্ঞান করবে, সে বিরাট প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হবে। কেননা নবী কারীম ﷺ বলেছেন-
مَنْ أَمَاطَ أَذًى عَنْ طَرِيقِ الْمُsلِمِينَ كُتِبَ لَهُ حَسَنَةٌ، وَمَنْ تُقُبِّلَتْ لَهُ حَسَنَةٌ دَخَلَ الْجَنَّةِ
“যে ব্যক্তি মুসলমানদের চলার পথ থেকে কষ্টদায়ক কিছু দূর করবে, তার জন্য একটি নেকী লেখা হবে। আর যার একটি নেকী কবুল হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
টিকাঃ
২৬. সহীহ বুখারী: ৬৩০৮; ফাতহুল বারী: ১১/১০২
২৭. মুসনাদে আহমাদ: ৫/৬৩
২৮. সহীহ মুসলিম: ১৯১৪
২৯. আদাবুল মুফরাদ: ৫৯৩
📄 মুসলমানদের সমস্যার ব্যাপারে গুরুত্ব না দেওয়া
হযরত মুআয ইবনে জাবাল রাযি. এর সাথে অপর এক ব্যক্তি হেঁটে যাচ্ছিল। পথে তিনি রাস্তা থেকে একটি পাথর সরিয়ে ফেললেন। সে ব্যক্তি বলল, এটি কি করলেন? তিনি বললেন, আমি রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি রাস্তা থেকে একটি পাথর সরিয়ে দেবে, যা মানুষকে কষ্ট দিত; তার জন্য একটি নেকী লেখা হবে। আর যার একটি নেকী থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।"
১৫. মুসলমানদের সমস্যার ব্যাপারে গুরুত্ব না দেওয়া: এর জন্য কোনো অনুদান বা নিজের পক্ষ থেকে দুআ না করা। সে একেবারে ঠাণ্ডা অনুভূতির লোক। বিশ্বের মুসলমানদের ওপর কোথায় আক্রমণ হচ্ছে বা কোথায় তারা প্রাকৃতিক বিপদে পড়ছে- এ ব্যাপারে তার মাঝে সামান্য অনুভূতিও নেই। সে শুধু নিজের নিরাপত্তা নিয়েই সন্তুষ্ট। এর কারণ হচ্ছে তার ঈমান দুর্বল। কেননা, একজন মুমিন অবশ্যই এমন স্বভাবের বিপরীত হবে। রাসূল ﷺ বলেছেন-
إِنَّ الْمُؤْمِنَ مِنْ أَهْلِ الإِيمَانِ بِمَنْزِلَةِ الرَّأْسِ مِنَ الْجَسَدِ، يَأْلَمُ الْمُؤْمِنُ لِأَهْلِ الإِيمَانِ، كَمَا يَأْلَمُ الْجَسَدُ لِمَا فِي الرَّأْسِ
“নিশ্চয়ই মুমিন হলো মুমিনের শরীরের মাথার মতো। একজন মুমিন অপর মুমিনের দুঃখে দুঃখিত হবে, যেমন মাথায় ব্যথা হলে সারা শরীর ব্যথা অনুভব করে।"
টিকাঃ
৩০. আল মু'জামুল কাবীর: ২০/১০১
৩১. মুসনাদে আহমাদ: ৫/৩৪০
📄 ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন করা
১৬. ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন করা: নবী কারীম ﷺ বলেন-
مَا تَوَادَّ اثْنَانِ فِي اللهِ جَلَّ وَعَزَّ أَوْ فِي الْإِسْلَامِ، فَيُفَرِّقُ بَيْنَهُمَا إِلَّا بِذَنْبٍ يُحْدِثُهُ أَحَدُهُمَا
“যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে বা ইসলামের স্বার্থে তার অপর ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক গড়ে, তাহলে তা একমাত্র ছিন্ন হতে পারে, যদি তাদের কেউ কোনো গুনাহ করে কেবল তখনই।”
এটিই প্রমাণ যে গুনাহের কারণে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। গুনাহের কারণে ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং তার ব্যাপারে দেওয়া আল্লাহ তাআলা'র প্রতিরোধ ভেঙে যায়। অথচ, আল্লাহ তাআলা মুমিনদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করে থাকেন।
টিকাঃ
৩২. আদাবুল মুফরাদ: ৪০১
📄 দ্বীনের কাজে দায়িত্ব পালনের প্রতি অনুভূতি না থাকা
১৭. দ্বীনের কাজে দায়িত্ব পালনের প্রতি অনুভূতি না থাকাও দুর্বল ঈমানের বহিঃপ্রকাশ: এমন লোকেরা দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের জন্য এগিয়ে আসে না। এটা রাসূল ﷺ এর সাহাবীদের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁরা ইসলামে প্রবেশ করার সাথে সাথেই দ্বীন প্রচারকে নিজেদের দায়িত্ব বলে মনে করতেন। তুফাইল ইবনে আমর রাযি. এর ঘটনাই দেখুন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পরপরই রাসূল ﷺ এর নিকট অনুমতি চেয়েছিলেন, নিজ সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে গিয়ে দ্বীন প্রচারের জন্য। আজ আমরা অনেকেই দাওয়াতের কাজ শুরু করতে বেশ দেরি করি।
নবী কারীম ﷺ এর সাহাবাগণ ইসলাম গ্রহণের পর দাওয়াতের কাজে সহায়ক কাজকর্ম শুরু করে দিতেন। কাফেরদের সাথে বন্ধুত্বের অবসান ঘটাতেন। তাদেরকে দ্বীনের ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলতে সচেষ্ট হতেন। দেখুন, ছুমামা ইবনে উছাল রাযি. এর ঘটনা প্রবাহের দিকে। তিনি ছিলেন ইয়ামামার গোত্রপতি। তাকে যখন বন্দী করে নিয়ে আসা হয় এবং মাসজিদে নববীর খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হয়, নবী কারীম ﷺ তখন তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তার অন্তঃকরণকে ইসলামের আলো দ্বারা আলোকিত করেন। ফলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর উমরাহ করতে মক্কায় যান। মক্কায় পৌঁছে তিনি কুরাইশ সরদারদের বললেন-
وَلا وَاللَّهِ لا يَأْتِيكُمْ مِنَ الْيَمَامَةِ حِنْطَةُ حَتَّى يَأْذَنَ فِيهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
“না, আল্লাহর কসম! এখন থেকে রাসূল ﷺ এর অনুমতি ব্যতীত ইয়ামামা থেকে একটি গমের দানাও তোমাদের নিকট পৌঁছবে না।”
তিনি কাফেরদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেন এবং তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেন। যেন তারা দাওয়াতের প্রতি এগিয়ে আসতে বাধ্য হয়। আর এটি ছিল তাৎক্ষণিক। তাঁর বলিষ্ঠ ঈমান তাঁকে এ কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে।
টিকাঃ
৩৩. সহীহ বুখারী, ফাতহুল বারী: ৮/৮৭