📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 এরপর মন্তব্যকারী পাঠক বলেন

📄 এরপর মন্তব্যকারী পাঠক বলেন


'ইসলামে প্রবেশ ও মুসলমান হিসেবে স্বীকৃত হওয়াটা শব্দের উপর নির্ভর করে। বক্তা যদি মুনাফিকও হয়, তাতেও সে মুসলমান হিসেবে স্বীকৃত হয়। মদিনার মুনাফিকদের ব্যাপারটা এমনই ছিল। তারা বাস্তবে কাফের ছিল। কিন্তু তাদের সঙ্গেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের মতো আচরণ করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'মানুষ যেন বলতে না পারে যে, মুহাম্মদ তার সঙ্গীদের হত্যা করে।' এর দ্বারা বোঝা যায়, ইসলামে প্রবেশ করা ও ইসলাম থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে শব্দই মূল। এ ছাড়াও শরিয়তের অনেক বিধান প্রাথমিকভাবে বাহ্যিক অবস্থার বিচারে ধার্য করা হয়, নিয়তের দিকে লক্ষ করা হয় না। এখানেও কুফরি কথা ও কাজের ক্ষেত্রে বাহ্যিক অবস্থার বিচারেই কথা বলতে হবে, নিয়তের দিকে লক্ষ করা হবে না।'

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 আমাদের কথা

📄 আমাদের কথা


শরিয়তের বিধান দুই ধরনের। কিছু আছে ফিকহি বিধান, কিছু এতেকাদি বা বিশ্বাসগত বিধান। যেগুলো কর্মগত বা ফিকহি বিধান, তাতে একটা দিক আছে, যা বান্দা ও রবের মধ্যকার বিষয়। আরেকটা দিক আছে বিচারিক। এই যে দিয়ানত বা বান্দা ও রবের মধ্যকার ব্যাপারগুলো—অনেক মাসআলায় এর ভিত্তি মুকাল্লাফের' নিয়ত। কিন্তু বিচারিক বিষয়গুলো নিয়তের উপর নির্ভর করে না। সেখানে সম্পূর্ণ বাহ্যিক দলিল-প্রমাণ দেখা হয়।
বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য আমরা কয়েকটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছি! অনেক সময় মানুষ কথায় কথায় বলে, 'অবশ্যই, আল্লাহর কসম!' 'না, আল্লাহর কসম!' সত্যিকার কসম খাওয়া তার উদ্দেশ্য থাকে না। অধিকাংশ ফকিহের কাছে এ ধরনের শপথ নিরর্থক। আল্লাহ তায়ালা এর কারণে বান্দাকে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না। এ কারণে সত্যিকার কসমের নিয়ত না থাকলে এ ধরনের কসম ভঙ্গ করলে কাফফারও দিতে হয় না। অথচ বক্তার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট আল্লাহর নামে শপথ করা বুঝে আসছে।
কখনও মানুষ তীব্র ক্রোধের সময় বলে, 'অমুকের সঙ্গে যদি কথা বলি, খোদার কসম, আমি তিন দিন রোজা রাখব।' তার উদ্দেশ্য রোজার মানত করা নয়। সে শুধু কাউকে কোনো কাজে উদ্বুদ্ধ করা, কোনো কাজ থেকে নিষেধ করা, কোনো সংবাদের গুরুত্ব বোঝানো অথবা কোনো না-বাচক বিষয়ের গুরুত্বারোপের জন্য এভাবে বলেছে। অনেক আলেম এখানে মানত পূরণ না করলেও চলবে বলে মত দিয়েছেন। তার জন্য শুধু কসমের কাফফারা দিলেই হবে। অথচ এ ধরনের কথা দ্বারা স্পষ্ট মানত বুঝে আসে।
কেউ যদি তার স্ত্রীকে বলে, 'তুমি তালাক', এর দ্বারা তার বিবাহ- বন্ধন ছিন্ন করা উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য ধরুন, জালেমদের বন্ধন থেকে মুক্তি। তালাক শব্দের প্রচলিত অর্থ উদ্দেশ্য না নেওয়ার কারণে স্বামী- স্ত্রীর বিচ্ছেদ করে দেয় যে তালাক, তা এখানে প্রযোজ্য হবে না। অনেক আলেমই এই মত পোষণ করেন। অথচ 'তুমি তালাক'-এই কথাটি তালাকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পষ্ট বক্তব্য।'১
তার নিয়তের ব্যাপারটি সে ও আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। নিজের ব্যাপারে যদি নিশ্চিত থাকে, তার বক্তব্য দ্বারা সে তালাক উদ্দেশ্য নেয়নি, উদ্দেশ্য নিয়েছে জালেমদের বন্ধন থেকে মুক্তির, তা হলে সে স্ত্রীর সঙ্গে সংসার চালিয়ে যেতে পারবে। স্বামীর কথার প্রতি প্রবল বিশ্বাস থাকলে স্ত্রীও পারবে এই স্বামীর সঙ্গে ঘর করে যেতে।
হ্যাঁ, স্ত্রী যদি বিষয়টি আদালতে উত্থাপন করে আর বিচারকের সামনে স্বামী যা বলেছে, তা প্রমাণিত হয়-অবশ্যই বিচারক তালাক সংঘটিত হওয়ার বিধান দেবেন। এটা হল বিচারিক বিধান।
অতএব মন্তব্যকারী পাঠক যেটা বলেছেন-শরিয়তের বিধান ব্যক্তির বক্তব্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, তার কথা এক দিক দিয়ে সঠিক। অর্থাৎ, কর্মগত ফিকহি বিধি-বিধান বাহ্যিক অবস্থার বিচারে নির্ধারিত হয়। তাই যে শুধু মুখে কালেমায়ে শাহাদাত পড়বে, মনে তার যা-ই থাকুক, বাহ্যিক বিচারে সে মুসলমান। কিন্তু মনে মনে যদি কালেমার কথা বিশ্বাস না করে, অন্তরে সে কাফেরই। আর তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না।
কারও থেকে যদি এমন কোনো কথা ও কাজ প্রকাশ পায়, কুফরি ছাড়া যার আর কোনো ব্যাখ্যা অসম্ভব, সে অবশ্যই কাফের। কোনো সন্দেহ নেই এতে। কিন্তু কাজটি যদি অকাট্যভাবে কুফর না বোঝায়, তখন দুটি দিকই লক্ষ করতে হবে।
একটা হল, আল্লাহর কাছে তার কাফের হওয়া বা না হওয়া। এটা গোপন বিষয়। সে আর আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কেউ জানে না। এর হিসাব আল্লাহ তায়ালাই নেবেন।
কিন্তু দুনিয়ার হিসেবে তাকে কী বলা হবে? এটা বের করার জন্য ব্যক্তির কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে, সে বক্তব্য দ্বারা কী উদ্দেশ্য নিয়েছে? যদি বক্তব্যের এমন ব্যাখ্যা দেয়, যা কুফরি অর্থ প্রকাশ করে, তা হলে তাকে কাফের বলা হবে। আর তার ব্যাখ্যার দ্বারা যদি বোঝা যায়, ইসলাম ত্যাগ করা তার উদ্দেশ্য ছিল না, তা হলে অবশ্যই তার বিধান ভিন্ন হবে। প্রত্যেক অবস্থার আলাদা আলাদা বিধান। অবশ্যই বিধান প্রয়োগের আগে দলিল-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা যাচাই করে নিতে হবে। বাকি বিশ্বাসগত যে সব ব্যাপার, তা অবশ্যই অন্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। দুনিয়ার আদালত তার প্রকৃত ফয়সালা করতে অক্ষম।

টিকাঃ
১. বুদ্ধিমান ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যার উপর শরিয়তের বিধান প্রয়োগ হয়。
১. মুখতাসারুল মুজানি, খ. ৮, পৃ. ২৯৬; মাওয়ারদি রহ.-এর হাওয়ি কাবির, খ. ১০ পৃ. ১৫৩।

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 মন্তব্যকারী পাঠক এরপর বলেন

📄 মন্তব্যকারী পাঠক এরপর বলেন


'আমরা সব সময় মানুষের নিয়ত তালাশ করে দেখতে সক্ষম হই না। অবস্থার প্রেক্ষিতে অনেক সময় নিয়ত ফুটে ওঠে না। ফলে উপরের কথাগুলো অনেক জিন্দিকের' জন্য ধর্মবিরোধী কথা বলার দ্বার উন্মোচন করে দেবে। তারা প্রথমে ইসলামের সুপ্রমাণিত কোনো বিষয় নিয়ে মন্তব্য করবে। এরপর মানুষ জিজ্ঞেস করলে বলবে, 'আমি এর দ্বারা কুফরি অর্থ উদ্দেশ্য নিইনি।' আমরা যদি কাফের হওয়ার বিষয়টি অন্তরের উপর ন্যস্ত করি, তা হলে জিন্দিক ও ধর্মবিদ্বেষীরা সুযোগ পেয়ে যাবে। তারা ইসলামের বিরুদ্ধে যা ইচ্ছে বলবে, পরে নিয়তের কথা বলে শাস্তি থেকে পার পাওয়ার চেষ্টা করবে।'

টিকাঃ
১. আরবরা অধিক কৃপণ ব্যক্তিকে জান্দাক বা জান্দাকি বলে থাকে। কারও কারও মতে জিন্দিক রাসুল সা.-কে স্বীকার করে, কিন্তু অন্তরে কুফরি আকিদা লালন করে। ফিকহের পরিভাষায় শব্দটির ব্যবহার এমন ভ্রান্ত আকিদার বেদআতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, যার চিন্তাধারা সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়। জিন্দিক হওয়া মারাত্মক অপরাধ। দুনিয়াতে এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, আখেরাতে জাহান্নাম। মালেকি মাজহাবে এমন অপরাধীকে তওবা করতে বলাও অনর্থক। জিন্দিক আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস রাখে না। কখনও বাহ্যিকভাবে ঈমান প্রকাশ করলেও অন্তরে কুফরকেই লালন করে থাকে। (মুকালামা বাইনাল মাজাহিব, ওয়ালি খান আল-মুজাফফার, ৫৪)

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 আমাদের কথা

📄 আমাদের কথা


ইসলাম থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বাসগত বিষয় এক রকম আর ফিকহি ও বিচারিক বিষয়গুলো আরেক রকম।
আমরা যখন বিশ্বাসগত ব্যাপার সন্ধান করব, তখন আমাদের জানতে হবে, ঈমান কী, কুফর কী? কীভাবে মানুষ ইসলামে প্রবেশ করে? কী কী কারণে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো বান্দা ও আল্লাহ তায়ালার মধ্যকার বিষয়।
কিন্তু আলোচনা যখন হবে ফিকহ-ফতোয়া ও আইন নিয়ে, তখন আমাদের শব্দের ফিকহি বিধান খুঁজে দেখতে হবে। যাচাই করতে হবে, কোন কোন কথা ও কাজ ইসলামে প্রবেশের ও ইসলাম থেকে বের হওয়ার কারণ। এটি অবশ্যই ব্যক্তি ও তার চারপাশের মানুষের মধ্যকার বিষয়। কারণ, এর উপর অনেক ফিকহি মাসআলার ভিত্তি। যেমন: বিয়ে শুদ্ধ হওয়া, বিয়ে বহাল থাকা, ভঙ্গ হয়ে যাওয়া, ইসলামকে হেয় করে কথা বললে তার জন্য শাস্তি আরোপিত হওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।
বিচারিক বিষয়গুলো এরই সঙ্গে সম্পৃক্ত। কারও থেকে কোনো কুফরি কথা ও কাজ প্রকাশ পেল, কুফর ছাড়া যার ভিন্ন কোনো ব্যাখ্যা সম্ভব নয় অথবা এমন কথা ও কাজ প্রকাশ পেল, স্পষ্ট কুফরি না হলেও ব্যক্তির ব্যাখ্যার মাধ্যমে তার কুফরি হওয়া প্রমাণিত হল অথবা তার ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রমাণ হল, কাজটি কুফরি ছিল না—এ সব বিষয়ের বিধান ফিকহের কিতাবে দণ্ডবিধি ও মুরতাদ হওয়ার অধ্যায়গুলোতে খুঁজতে হবে।
অন্য দিকে ঈমান-আকিদার বিষয় এর থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। তার সম্পর্ক অন্তরের সঙ্গে, অন্তরের ইচ্ছার সঙ্গে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—'বেদুইনরা বলে আমরা ঈমান এনেছি। আপনি বলুন, তোমরা ঈমান আননি; কিন্তু বলো, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। এখনও তোমাদের অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'নিশ্চয় সকল আমলের ভিত্তি নিয়তের উপর।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00