📄 পঞ্চম মন্তব্যকারী পাঠক বলেন
'যখন আমরা বলি, কোনো কুফরি কথা বা কুফরি কাজ ব্যক্তিকে কাফের বানিয়ে দেয় (যদি তাকফিরের শর্ত পাওয়া যায় ও কোনো প্রতিবন্ধক না থাকে), অথবা যখন বলি, কথা বা কাজের কারণে কাফের হয় না; কাফের হয় এর সঙ্গে সম্পর্কিত বিশ্বাসের কারণে— ফলাফল কি দুটো কথার একই দাঁড়ায় না?'
📄 আমাদের কথা
কেউ যদি এমন কিছু বলে ও করে, যা স্পষ্ট কুফরি, কুফরির অর্থ ছাড়া সে কথার অন্য কোনো অর্থের সম্ভাবনাই নেই—নিঃসন্দেহে সে কাফের।
আমরা এই ব্যক্তির উপর, যখন তার থেকে কাজটা প্রকাশ পায়, তখন থেকেই কাফের হওয়ার বিধান আরোপ করি। কিন্তু বাস্তবে সে কাফের হয় সেই সময় থেকে, যখন তার হৃদয় থেকে ঈমান নিঃশেষ হয়ে যায়। অর্থাৎ, যখন তার হৃদয় থেকে ঈমানের রোকনগুলোকে সত্য বলে মেনে নেওয়া ও এর দাবি অনুসারে আল্লাহর প্রতি ও আল্লাহ যে সব জিনিসকে সম্মানিত করেছেন, সে সবের প্রতি সম্মানবোধ হারিয়ে যায়, তখন থেকেই সে প্রকৃতার্থে কাফের হয়ে যায়। যে সব কথা ও কাজ অকাট্যরূপে কুফরি, যার হৃদয়ে ঈমান আছে, তার থেকে এ সব প্রকাশ পেতে পারে না। কারণ, ঈমান ও কুফর একটি আরেকটির বিপরীত।
আমরা যখন বলি, সে এই সব কথা ও কাজের মাধ্যমে কাফের হয়েছে, এটা বাহ্যিক দিক দিয়ে সঠিক। এর উপর ভিত্তি করেই শরিয়তের বিধান আরোপিত হবে। কিন্তু অন্তরের দিক দিয়ে সে তখনই কাফের হয়ে গেছে, যখন তার মন থেকে ঈমান বেরিয়ে গেছে। একটা হচ্ছে, কুফরের বহিঃপ্রকাশ, আরেকটা হচ্ছে প্রকৃত বা অন্তরের কুফর। তা তখন থেকেই সাব্যস্ত হয়, যখন থেকে হৃদয় ঈমানশূন্য হয়। এটা এ ধরনের কথা ও কাজের পূর্বে হয়ে থাকে, যার প্রভাবে কুফরি কথা ও কাজ তার দ্বারা প্রকাশ পায়। প্রত্যেকটি জিনিসকে তার আপন জায়গায় রেখে বিচার করতে হবে।
📄 এরপর মন্তব্যকারী পাঠক বলেন
'ইসলামে প্রবেশ ও মুসলমান হিসেবে স্বীকৃত হওয়াটা শব্দের উপর নির্ভর করে। বক্তা যদি মুনাফিকও হয়, তাতেও সে মুসলমান হিসেবে স্বীকৃত হয়। মদিনার মুনাফিকদের ব্যাপারটা এমনই ছিল। তারা বাস্তবে কাফের ছিল। কিন্তু তাদের সঙ্গেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের মতো আচরণ করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'মানুষ যেন বলতে না পারে যে, মুহাম্মদ তার সঙ্গীদের হত্যা করে।' এর দ্বারা বোঝা যায়, ইসলামে প্রবেশ করা ও ইসলাম থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে শব্দই মূল। এ ছাড়াও শরিয়তের অনেক বিধান প্রাথমিকভাবে বাহ্যিক অবস্থার বিচারে ধার্য করা হয়, নিয়তের দিকে লক্ষ করা হয় না। এখানেও কুফরি কথা ও কাজের ক্ষেত্রে বাহ্যিক অবস্থার বিচারেই কথা বলতে হবে, নিয়তের দিকে লক্ষ করা হবে না।'
📄 আমাদের কথা
শরিয়তের বিধান দুই ধরনের। কিছু আছে ফিকহি বিধান, কিছু এতেকাদি বা বিশ্বাসগত বিধান। যেগুলো কর্মগত বা ফিকহি বিধান, তাতে একটা দিক আছে, যা বান্দা ও রবের মধ্যকার বিষয়। আরেকটা দিক আছে বিচারিক। এই যে দিয়ানত বা বান্দা ও রবের মধ্যকার ব্যাপারগুলো—অনেক মাসআলায় এর ভিত্তি মুকাল্লাফের' নিয়ত। কিন্তু বিচারিক বিষয়গুলো নিয়তের উপর নির্ভর করে না। সেখানে সম্পূর্ণ বাহ্যিক দলিল-প্রমাণ দেখা হয়।
বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য আমরা কয়েকটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছি! অনেক সময় মানুষ কথায় কথায় বলে, 'অবশ্যই, আল্লাহর কসম!' 'না, আল্লাহর কসম!' সত্যিকার কসম খাওয়া তার উদ্দেশ্য থাকে না। অধিকাংশ ফকিহের কাছে এ ধরনের শপথ নিরর্থক। আল্লাহ তায়ালা এর কারণে বান্দাকে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না। এ কারণে সত্যিকার কসমের নিয়ত না থাকলে এ ধরনের কসম ভঙ্গ করলে কাফফারও দিতে হয় না। অথচ বক্তার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট আল্লাহর নামে শপথ করা বুঝে আসছে।
কখনও মানুষ তীব্র ক্রোধের সময় বলে, 'অমুকের সঙ্গে যদি কথা বলি, খোদার কসম, আমি তিন দিন রোজা রাখব।' তার উদ্দেশ্য রোজার মানত করা নয়। সে শুধু কাউকে কোনো কাজে উদ্বুদ্ধ করা, কোনো কাজ থেকে নিষেধ করা, কোনো সংবাদের গুরুত্ব বোঝানো অথবা কোনো না-বাচক বিষয়ের গুরুত্বারোপের জন্য এভাবে বলেছে। অনেক আলেম এখানে মানত পূরণ না করলেও চলবে বলে মত দিয়েছেন। তার জন্য শুধু কসমের কাফফারা দিলেই হবে। অথচ এ ধরনের কথা দ্বারা স্পষ্ট মানত বুঝে আসে।
কেউ যদি তার স্ত্রীকে বলে, 'তুমি তালাক', এর দ্বারা তার বিবাহ- বন্ধন ছিন্ন করা উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য ধরুন, জালেমদের বন্ধন থেকে মুক্তি। তালাক শব্দের প্রচলিত অর্থ উদ্দেশ্য না নেওয়ার কারণে স্বামী- স্ত্রীর বিচ্ছেদ করে দেয় যে তালাক, তা এখানে প্রযোজ্য হবে না। অনেক আলেমই এই মত পোষণ করেন। অথচ 'তুমি তালাক'-এই কথাটি তালাকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পষ্ট বক্তব্য।'১
তার নিয়তের ব্যাপারটি সে ও আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। নিজের ব্যাপারে যদি নিশ্চিত থাকে, তার বক্তব্য দ্বারা সে তালাক উদ্দেশ্য নেয়নি, উদ্দেশ্য নিয়েছে জালেমদের বন্ধন থেকে মুক্তির, তা হলে সে স্ত্রীর সঙ্গে সংসার চালিয়ে যেতে পারবে। স্বামীর কথার প্রতি প্রবল বিশ্বাস থাকলে স্ত্রীও পারবে এই স্বামীর সঙ্গে ঘর করে যেতে।
হ্যাঁ, স্ত্রী যদি বিষয়টি আদালতে উত্থাপন করে আর বিচারকের সামনে স্বামী যা বলেছে, তা প্রমাণিত হয়-অবশ্যই বিচারক তালাক সংঘটিত হওয়ার বিধান দেবেন। এটা হল বিচারিক বিধান।
অতএব মন্তব্যকারী পাঠক যেটা বলেছেন-শরিয়তের বিধান ব্যক্তির বক্তব্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, তার কথা এক দিক দিয়ে সঠিক। অর্থাৎ, কর্মগত ফিকহি বিধি-বিধান বাহ্যিক অবস্থার বিচারে নির্ধারিত হয়। তাই যে শুধু মুখে কালেমায়ে শাহাদাত পড়বে, মনে তার যা-ই থাকুক, বাহ্যিক বিচারে সে মুসলমান। কিন্তু মনে মনে যদি কালেমার কথা বিশ্বাস না করে, অন্তরে সে কাফেরই। আর তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না।
কারও থেকে যদি এমন কোনো কথা ও কাজ প্রকাশ পায়, কুফরি ছাড়া যার আর কোনো ব্যাখ্যা অসম্ভব, সে অবশ্যই কাফের। কোনো সন্দেহ নেই এতে। কিন্তু কাজটি যদি অকাট্যভাবে কুফর না বোঝায়, তখন দুটি দিকই লক্ষ করতে হবে।
একটা হল, আল্লাহর কাছে তার কাফের হওয়া বা না হওয়া। এটা গোপন বিষয়। সে আর আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কেউ জানে না। এর হিসাব আল্লাহ তায়ালাই নেবেন।
কিন্তু দুনিয়ার হিসেবে তাকে কী বলা হবে? এটা বের করার জন্য ব্যক্তির কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে, সে বক্তব্য দ্বারা কী উদ্দেশ্য নিয়েছে? যদি বক্তব্যের এমন ব্যাখ্যা দেয়, যা কুফরি অর্থ প্রকাশ করে, তা হলে তাকে কাফের বলা হবে। আর তার ব্যাখ্যার দ্বারা যদি বোঝা যায়, ইসলাম ত্যাগ করা তার উদ্দেশ্য ছিল না, তা হলে অবশ্যই তার বিধান ভিন্ন হবে। প্রত্যেক অবস্থার আলাদা আলাদা বিধান। অবশ্যই বিধান প্রয়োগের আগে দলিল-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা যাচাই করে নিতে হবে। বাকি বিশ্বাসগত যে সব ব্যাপার, তা অবশ্যই অন্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। দুনিয়ার আদালত তার প্রকৃত ফয়সালা করতে অক্ষম।
টিকাঃ
১. বুদ্ধিমান ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যার উপর শরিয়তের বিধান প্রয়োগ হয়。
১. মুখতাসারুল মুজানি, খ. ৮, পৃ. ২৯৬; মাওয়ারদি রহ.-এর হাওয়ি কাবির, খ. ১০ পৃ. ১৫৩।