📄 তৃতীয় মন্তব্যকারী পাঠক বলেন
'সালাহুদ্দিন বিন আহমদ ইদলিবি দাবি করেন, মৃতদের ডাকা ও তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া শিরক নয়।'
📄 আমাদের কথা
এটা মন্তব্যকারীর কল্পনাপ্রসূত বক্তব্য। সম্পূর্ণ বাস্তবতাবিরোধী। আমরা সরাসরি এমন বলিনি যে, মৃতদের ডাকা ও তাদের থেকে সাহায্য চাওয়া শিরক নয়। আমরা বলেছি, 'কেউ যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে এই বিশ্বাস নিয়ে ডাকে যে, সে নিজেই উপকার ও ক্ষতিসাধনের ক্ষমতা রাখে, সে শিরক করল। তবে কেউ যদি এই বিশ্বাস নিয়ে ডাকে যে, যাকে ডাকা হচ্ছে, সে নিজে কিছু করতে পারে না, আল্লাহ তায়ালা তাকে কিছু কাজ করার অনুমতি দিয়ে রেখেছেন, তাই কেবল তাকে ডাকা হচ্ছে—এটাকে শিরক বলার সুযোগ নেই। হ্যাঁ, কাজটির বৈধতা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে।' মনে হচ্ছে, মন্তব্যকারী দুটো কথার পার্থক্য ধরতে পারেননি।
📄 মন্তব্যকারী এরপর বলেন
'তারা দাবি করে, ওলি-আওলিয়া, পির-বুজর্গ বিপদগ্রস্তের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে। এভাবে তারা যা একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই পারেন, সৃষ্টির কাছে তার প্রার্থনা করে থাকে। এতে তো তাদের আল্লাহর সঙ্গে অন্য উপাস্য গ্রহণ করা হয়। এর চেয়ে বড় শিরক আর কী হতে পারে?'
📄 আমাদের কথা
এখানে অবস্থা দুটো। দুটো অবস্থার মাঝে বিধানগত পার্থক্য করতে হবে। যারা ওলি-আওলিয়া পির-বুজর্গের কাছে এই বিশ্বাস নিয়ে চায় যে, তারা নিজেরাই দিতে ও বঞ্চিত করতে পারে, তাদের ব্যাপার এক রকম।
আর যারা বিশ্বাস করে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা কিছুই করতে পারে না, তাদের ব্যাপারটা একটু ভিন্ন।
প্রথম প্রকারের লোকেরা মুশরিক। তাদের কাজগুলো জাহেলি যুগের মুশরিকদের মতো। জাহেলি যুগের মানুষ মূর্তিদের কাছে প্রার্থনা করত, বিশ্বাস করত মূর্তিরা দিতে ও বঞ্চিত করতে পারে, উপকার করতে পারে, ক্ষতিসাধন করতে পারে, আল্লাহ অনুমতি না দিলেও তারা নিজেরাই সুপারিশের ক্ষমতা রাখে। এই বিশ্বাস ভয়ংকর।
পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রকারে লোকদের আমরা মুশরিক বলতে পারি না। বলতে পারি না, তারা ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেছে। তারা যাদের ডাকে, তারা নিজেরা কিছু করতে পারে, এমন বিশ্বাস তাদের নয়। দেওয়া, বঞ্চিত করা, উপকার করা, ক্ষতি করা, এমনকি নিজ ক্ষমতাবলে সুপারিশ করা—এর কোনোটাই তারা করতে পারে না, এই-ই তাদের বিশ্বাস। তারা কেবল বিশ্বাস করে, আমরা যাদের ডাকি, আল্লাহর অনুমতি ও ক্ষমতা দিলে কিছু কাজ তারা করতে পারে। এমন যাদের বিশ্বাস, তাদের কী করে কাফের বলা যায়? হ্যাঁ, তাদের বিশ্বাসটা ভ্রান্ত হওয়ার কারণে গুনাহগার বলার যেতে পারে।
মুসলমান বিপদে পড়লে তাকে আল্লাহর কাছেই বিপদমুক্তির প্রার্থনা করতে হবে। আল্লাহর দিকেই ধাবিত রাখতে হবে নিজের অন্তরকে। একমাত্র তিনিই বিপদ থেকে মুক্তি দিতে পারেন। আল্লাহ বলেন—
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمْ مِنْ دُوْنِهِ فَلَا يَمْلِكُونَ كَشْفَ الضُّرِّ عَنْكُمْ وَ لَا تَحْوِيلًا ﴿٥٦﴾
আপনি বলুন, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে উপাস্য মনে কর, তাদের ডাকো, দেখবে, তারা না তোমাদের থেকে কোনো কষ্ট দূর করার ক্ষমতা রাখে, না ক্ষমতা রাখে কোনো কিছু পরিবর্তন করার।১
যেহেতু আল্লাহ তায়ালাই বিপদ দূর করেন, আর কারও বিপদ দূর করার ক্ষমতা নেই, তাই সামান্য বিবেক থাকলেও কেউ আল্লাহর সঙ্গে না উপাস্য বানানোর ক্ষেত্রে শরিক করতে পারে, না পালনকর্তা বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন—
قُلْ مَنْ تُنَجِّيْكُمْ مِنْ ظُلُمَتِ الْبَرِّ وَ الْبَحْرِ تَدْعُوْنَهُ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً ، لَئِنْ أَنْجُنَا مِنْ هَذِهِ لَنَكُونَنَّ مِنَ الشَّكِرِينَ ﴿۲۳﴾ قُلِ اللَّهُ يُنَجِّيْكُمْ مِنْهَا وَ مِنْ كُلِّ كَرْبٍ ثُمَّ أَنْتُمْ تُشْرِكُوْنَ ﴿۲۲﴾
আপনি বলুন, কে তোমাদেরকে জল-স্থলের সমূহ বিপদ থেকে উদ্ধার করেন? ঘন বিপদের অন্ধকার মুহূর্তে কার কাছে গোপনে কাতর স্বরে প্রার্থনা কর? তাকে বলো, এ বিপদ থেকে উদ্ধার করলে আমরা অবশ্যই শোকরগুজার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হব। হে নবী, বলুন, শুধু আল্লাহই তোমাদের এ বিপদ ও যে কোনো দুঃখ-কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। এরপরও তোমরা তার সঙ্গে শরিক কর!২
বিপদে পড়লে আল্লাহই উদ্ধার করেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সন্দেহ করার কোনো অবকাশও নেই।
কিন্তু বান্দা যখন বিপদমুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে আর সেটি করতে গিয়ে আল্লাহর কোনো নেককার বান্দার অভিমুখী হয়, যাতে তিনি আল্লাহর কাছে সুপারিশ করেন, আল্লাহর কাছে তার বিপদমুক্তির প্রার্থনা করেন—এটা শিরক নয়। কারণ, এখানে আল্লাহর সঙ্গে কোনো মাখলুককে না উপাস্য বানানোর ক্ষেত্রে শরিক করা হয়েছে, না পালনকর্তা বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে।
অবশ্যই প্রার্থনা ও দোয়া আল্লাহর কাছে করতে হবে। শব্দে ও আকার-ইঙ্গিতে যেন এটা বোঝা না যায় যে, আল্লাহর থেকে মুখ ফিরিয়ে এনে বান্দার কাছেই প্রার্থনা করাটা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ, মৃত্যুর পর কবরে, কেউ কারও জন্য সুপারিশ করতে বসে নেই। এ ধরনের আকিদা ঈমানের জন্য ক্ষতিকর।
টিকাঃ
১. সুরা বনি ইসরাইল, ৫৬।
২. সুরা আনআম, ৬৩-৬৪।