📄 দ্বিতীয় মন্তব্যকারী পাঠক আরও বলেন
'এই কিতাবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে শপথের ব্যাপারটি আনার কোনো যুক্তি নেই। আপনি বলেছেন, 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে শপথ করা ছোট পর্যায়ের শিরক, বড় পর্যায়ের শিরক নয়; এর মাধ্যমে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায় না।' অথচ এই মাসআলায় এমনটি কেউ বলেন না। পরিষ্কার হাদিস আছে এ ব্যাপারে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে শপথ করে, সে শিরক করল।' হাদিসের বাহ্যিক অর্থে এমন কাজ শিরক হওয়ার কথা বোঝা যায়। ইমাম তিরমিজি রহ. এই হাদিস উল্লেখ করে এর মান সম্পর্কে বলেন, 'এটি একটি হাসান পর্যায়ের হাদিস।' কিছু কিছু আলেমের কাছে এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, এখানে শিরক শব্দ ধমক ও কঠোরতা বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।'
📄 আমাদের কথা
ঈমান ভঙ্গের কারণের এই কিতাবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে শপথ করার বিষয়টি অবশ্যই প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, হাদিসে এসেছে, 'যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে শপথ করল, সে শিরক করল।' কেউ কেউ এই হাদিসের বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নিতে পারে। বলতে পারে, এখানে কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলবে না। ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণের উপযুক্ত প্রমাণ থাকলেও না। যদি এ কথা বলা হয়, তা হলে দুটো সম্ভবানার যে কোনো একটি গ্রহণ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে:
এক. যারাই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে শপথ করাকে বৈধ বলবে, তারাই কাফের। এরই ফলে কাফের বলতে হবে, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কেও (নাউজুবিল্লাহ)। কারণ, তিনিও কোনো কোনো অবস্থায় আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে শপথ বৈধ বলেন।
দুই. অথবা অবশেষে তারা বাধ্য হয়েই বলবেন, না বিশুদ্ধ কোনো প্রমাণ থাকলে এখানে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
অন্যকে কাফের বলায় তৎপর লোকেরা যদি প্রথম সম্ভাবনাকে গ্রহণ করে, তা হলে তারা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ও হাম্বলি মাজহাবের ফকিহদের কাফের সাব্যস্ত করে বসবে। এমনকি তাদের যারা কাফের মনে করবে না, তাদেরও কাফের সাব্যস্ত করতে হবে। কিন্তু এর থেকে বাঁচার জন্য তারা যদি দ্বিতীয় সম্ভবানাকে গ্রহণ করে, তা হলে তাদের বিরোধীরা বলবে, এখানে যেহেতু ব্যাখ্যা করা হচ্ছে—এমন যত আয়াত-হাদিস আছে, যেখানে বিশুদ্ধ প্রমাণের আলোকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অবকাশ আছে, সব জায়গায় ব্যাখ্যা করতে হবে, বাহ্যিক অবস্থার উপর বিধান আরোপ করা যাবে না।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনেক বড় ইমাম। তিনি নিজের কিতাবে এই হাদিস উল্লেখ করেছেন। হাদিসের বাহ্যিক অর্থের দিকে লক্ষ করলে অবশ্যই গাইরুল্লাহর নামে শপথকারীকে মুশরিক বলতে হয়। কিন্তু সেই তিনিই আবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে শপথ করাকে বৈধ বলেছেন। অতএব আমাদেরকে তার হাদিস বোঝাপড়ার ধরনটা বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। তার কথাকে আমাদের মাসআলার সমর্থনে নিয়ে আসতে হবে। যদিও আমরা জানি, তিনি ভুল থেকে নিরাপদ নন। মূলত দলিল কুরআন-সুন্নাহ এবং তা থেকে উন্মোচিত বিষয়াবলি।
আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে শপথ করার মাসআলা প্রাসঙ্গিক হওয়ার আরও একটি কারণ হচ্ছে, কিছু লোক অন্যকে কাফের বলায় খুব তৎপর। তারা হাদিসে কুফর-শিরক শব্দ পেয়েই মানুষকে কাফের বলে বসে, কোনো ধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ধার ধারে না। ঠিক তারাই আবার যখন দেখে, হাদিসের বাহ্যিক অর্থ নিলে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কেও কাফের সাব্যস্ত করতে হয়, তখন আবার ব্যাখ্যা খোঁজে! অতএব এখানে এই বিধান নিয়ে আলোচনা অবশ্যই জরুরি। এর প্রাসঙ্গিকতাও আছে।
মন্তব্যকারী উল্লেখ করেছেন, 'ইমাম তিরমিজি রহ. প্রথমে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, 'যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে শপথ করল, সে শিরক করল।' এরপর হাদিসের উপর মন্তব্য করেছেন এই বলে যে, হাদিসটি হাসান পর্যায়ের। অনেক আলেম এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, কাজটির ব্যাপারে কঠোরতা বোঝাতেই মূলত হাদিসে শিরক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।'
আমাদের কথা হল, ইমাম তিরমিজি রহ.-এর কথা লক্ষ করলেই তো সমাধান হয়ে যায়! তিনি যখন বলছেন, 'কঠোরতা বোঝাতেই শিরক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে', তার মানে, তিনি এখানে শিরক-কুফরের প্রকৃত অর্থ গ্রহণ করেননি। সব সময় যে কুফর-শিরক শব্দ দ্বারা এর প্রকৃত অর্থ উদ্দেশ্য হয় না, কখনও কোনো কাজের নিষিদ্ধতার গুরুত্ব বোঝাতেও এই শব্দ প্রয়োগ করা হয়ে থাকে—এই বাস্তবতা যদি তারা বুঝত!
📄 মন্তব্যকারী লেখককে উদ্দেশ্য করে বলেন
'লেখক কাদেরকে অন্যকে কাফের বলায় তৎপর বলছেন? শায়খ বিন বাজ রহ.-সহ অন্যান্য সালাফি শায়খদেরই তো! তিনি প্রমাণ করে দেখান যে, সালাফি শায়খদের কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে শপথ করলে সর্বক্ষেত্রেই তাকে কাফের সাব্যস্ত করেন। লেখক কোথায় পাবে এমন বক্তব্য? তারা কেউ বলেননি এমন কথা!'
মন্তব্যকারী আরও বলেন, 'শায়খুল ইসলাম তাকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া (আল্লাহ তার আত্মা আলোকিত করুন, তার কবরকে পবিত্র করুন) বলেন, 'সকল মুসলমান এ ব্যাপারে একমত, যে ব্যক্তি কোনো সম্মানিত সৃষ্টির নামে শপথ করবে অথবা নিজে যাকে সম্মানিত মনে করে, তার নামে শপথ করবে, তার সে শপথ সংঘটিত হবে না। তা ভঙ্গ করলে কোনো কাফফারাও দিতে হবে না। সৃষ্টির কোনো কিছুর নামে শপথ করা অধিকাংশ আলেমের কাছে হারাম।" (অর্থাৎ ইবনে তাইমিয়া রহ. থেকেও কাফের শব্দের উল্লেখ নেই।)
📄 আমাদের কথা
পুরো আলোচনায় আমরা কারও নাম নিইনি। কারও দিকে ইঙ্গিতও করিনি। না সমকালীন কারও নাম নিয়েছি, না পূর্ববর্তী কারও। বর্তমান সময়ে 'তাকফির' বিষয়ে আলোচনা অত্যন্ত জরুরি। مسلمانوں মাঝে এ ব্যাপারে স্বচ্ছ ও স্পষ্ট ধারণার প্রচার সীমাহীন গুরুত্ব রাখে। দিন দিন গোঁড়ামি বেড়েই চলছে। মানুষের মেধা ও মনন হয়ে পড়ছে বিক্ষিপ্ত।
আমরা কখনও কারও নাম নিইনি। আমাদের মনে উদয়ও হয়নি নির্দিষ্ট কারও কথা যে, তিনি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে শপথ করলে তাকে সর্বক্ষেত্রেই কাফের ও ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত বলে দেন। এটা বক্তার বিভ্রমমাত্র। মানুষের মনে কী আছে, তা আল্লাহ ছাড়া আর কে বলতে পারে? মনের কথা ধরে এমন মন্তব্য কীভাবে সঠিক হতে পারে? যার হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি সম্মানবোধ আছে, যে জানে, আল্লাহ তায়ালাই একমাত্র অদৃশ্যের সংবাদ রাখেন এবং এও জানে যে, আল্লাহ আমার এই কাজ দেখছেন, জানছেন—তার জন্য এ ধরনের কাজ সমীচীন নয়।
এখানে ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর কথা উল্লেখ করে লাভ কী? ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর উপর্যুক্ত বক্তব্যের ('সকল মুসলমান এ ব্যাপারে একমত, যে কোনো সম্মানিত সৃষ্টির নামে শপথ করবে অথবা নিজে যাকে সম্মানিত মনে করে তার নামে শপথ করবে, তার সে শপথ সংঘটিত হবে না। তা ভঙ্গ করলে কোনো কাফফারাও দিতে হবে না।') দ্বারা বোঝা যায়, এই মাসআলায় মুসলমানদের ঐকমত্য রয়েছে। মন্তব্যকারীও সেটা উল্লেখ করলেন। এই দাবি কি শুদ্ধ? এটা তো বাস্তবতার বিপরীত দাবি। যেখানে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. ও হাম্বলি মাজহাবের অনেক ফকিহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে শপথ করাকে বৈধ বলেন এবং এও বলেন যে, এমন শপথ ভঙ্গ করলে কাফফারা দিতে হবে—সেখানে এই মাসআলায় ঐকমত্যের দাবি কীভাবে সঠিক হতে পারে? তা হলে কি তারা দাবি করতে চান, হাম্বলিরা মুসলমান নয়! ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর এমন স্পষ্ট বক্তব্য কি কোনো হাম্বলি ফকিহ না জেনে পারেন?
ইবনে তাইমিয়া রহ. হাম্বলি মাজহাবের বিশিষ্ট ফকিহ। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন। তিনি এমন কথা জানবেন না, এটা আমরা মনে করি না। কখনও একজন মানুষ কিছু লেখেন। কিছু সম্পূরক মন্তব্য বা উল্লিখিত বিধানে ব্যতিক্রম কিছু থাকলে তা তার মাথায় থাকে, লেখার ক্ষেত্রে সেটা হয়তো ছুটে গিয়ে থাকবে। (আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন।)
তাকফিরিরা' যখনই কোনো আয়াত-হাদিসে শিরক-কুফর শব্দ দেখে, খুশিতে আটখানা হয়ে পড়ে! অধিকাংশ مسلمانوں উপরই তারা এর দ্বারা কুফরের বিধান আরোপ করে বসে। আবার তাদের অধিকাংশই আবার বাহ্যিকভাবে ভালোবাসে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. ও তার অনুসারীদের।
তো আমরা যখন একটা হাদিস পেলাম, যেখানে কোনো একটা কাজ করার কারণে তার উপর শিরক শব্দের প্রয়োগ এসেছে, আবার ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে দেখছি, তিনি এই হাদিসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করছেন না—তখনই আমাদের মনে হল, এখানে এই আলোচনাটা অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। হয়তো এর মাধ্যমে সে সব তাকফিরিরা নিজেদের কুরআন-হাদিস বোঝাপড়ার পদ্ধতি পরিবর্তন করবেন। হয়তো তারা যখন দেখবে যে, কোনো মানুষ কোনো আয়াত-হাদিস বুঝতে ভুল করেছে, তার সম্পর্কে তারা বলবে, 'সে বুঝতে ভুল করেছে।' তাকে ধরেই কাফের, মুশরিক ও ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত বলে বসবে না।
মন্তব্যকারী ইবনে তাইমিয়া রহ. সম্পর্কে বলেন, 'আল্লাহ তার আত্মাকে আলোকিত করুন, তার কবরকে পবিত্র করুন'—এ তো এক আশ্চর্য ব্যাপার! এ ধরনের দোয়া সালাফের থেকে প্রমাণিত নয়। এগুলো আশআরি ও সুফিরা' তাদের উলামায়ে কেরাম থেকে বর্ণনা করে থাকে। কিছু মানুষ আবার খুব সহজেই তাদের বেদআতি বলে থাকেন! ইবনে তাইমিয়া রহ. সম্পর্কে এ ধরনের দোয়া কিন্তু তাদের কাছে শিরক বা শিরকে মাধ্যম বলে মনে হয় না!
টিকাঃ
১. যাদের অধিকাংশ চিন্তাই আবর্তিত হয় مسلمانوں মাঝে কে কাফের হয়ে গেল, সেটা নিয়ে। নিজেদের আমলের দিকে তাদের খুব কমই লক্ষ থাকে। (অনুবাদ)
১. এখানে আশআরি ও সুফিদের হেয় করা উদ্দেশ্য নয়। মূলত মন্তব্যকারীর দৃষ্টিভঙ্গিতে নেমে গিয়ে লেখক এই ভাষা ব্যবহার করেছেন। (অনুবাদক)