📄 ইমাদুদ্দিন ইবনে কাসির রহ.
'আল্লাহ তায়ালা বলেন—
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُوْنَ وَ مَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوْقِنُونَ.
তবে কি ওরা জাহেলিয়াতের বিধান চায়? আর বিশ্বাসী লোকদের জন্য আল্লাহর চেয়ে উত্তম বিধানদাতা কে আছে?'
আল্লাহ তায়ালার সুদৃঢ় বিধান ছেড়ে শরিয়ত-অসমর্থিত নিজেদের মনগড়া আইনকে যারা গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদের এই কাজের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করছেন-যেমন জাহেলি যুগের মানুষ নিজেদের মনগড়া ভ্রষ্টতা ও মূখতাপূর্ণ আইনে শাসন করত। এর আরও একটি দৃষ্টান্ত তাতারিরা। তারা চেঙ্গিস খান থেকে প্রাপ্ত রাজতান্ত্রিক আইনে শাসন করত। তাদের সে সংবিধান 'ইয়াসাক' নামে পরিচিত। ইহুদি, খ্রিষ্টান, ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে এই সংবিধানের নীতিমালা। এতে এমন অনেক বিধান আছে, যা ছিল চেঙ্গিস খানের একান্ত ব্যক্তিগত মত ও প্রবৃত্তিজাত। এটিই তাদের মাঝে অনুসরণীয় শরিয়তরূপে গৃহীত হয়েছিল। শাসনের ক্ষেত্রে তারা এটাকে আল্লাহর কিতাব ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহর উপর অগ্রাধিকার দিত। এমনটি যে করবে, সে কাফের।'২
তিনি যে বললেন, 'শাসনের ক্ষেত্রে তারা এটাকে আল্লাহর কিতাব ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহর উপর অগ্রাধিকার দিত'-এর অর্থ হচ্ছে, তারা কুরআন-সুন্নাহর উপর এটার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করত। এটি নিঃসন্দেহে সুস্পষ্ট কুফরি।
টিকাঃ
১. সুরা মায়েদা, ৫০।
২. তাফসিরে ইবনে কাসির, খ. ৩, পৃ. ১১৯।
📄 পার্লামেন্ট নির্বাচন
যে দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান, কিন্তু তারা নিজেদের পছন্দনীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে গ্রহণ করে নিতে চায় না, এমন দেশে যদি কেউ অন্যায়-অনাচারকে যথাসাধ্য দমিত রাখা ও নিরুপায় অবস্থার বর্তমান করণীয় হিসেবে পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, এর অবকাশ আছে। অনেকে মনে করে, এটি আল্লাহর শাসন ব্যতীত অন্য কিছুকে সন্তুষ্টির সঙ্গে গ্রহণ করা। বিষয়টি এমন নয়। বরং এটি ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর সেই কথার অন্তর্ভুক্ত হবে, যা আমরা ইতিপূর্বে উদ্ধৃত করেছি।
ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর কথাটি আমরা একটু ভালোভাবে পাঠ করে দেখি। তিনি বলছেন, 'ইউসুফ আ. মিশরে ক্ষমতায় ছিলেন। তারা ছিল কাফের সম্প্রদায়। তিনি ইসলামের যে ন্যায়ের বিধান জানতেন, তার সব সেখানে প্রয়োগ সম্ভব হয়নি।'
তিনি আরও বলছেন, 'নাজাশি খ্রিষ্টানদের শাসক ছিলেন। তার জাতি ইসলাম গ্রহণে তার অনুসরণ করেনি। ইসলামের অধিকাংশ বিধানই সে দেশে প্রবেশ করেনি। কারণ, বাদশা নাজাশি এতে অক্ষম ছিলেন। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, সেখানে তার কুরআন অনুযায়ী শাসনের সক্ষমতা ছিল না। কারণ, তার জাতি এটা গ্রহণে সম্মত হত না। অনেক সময় এমন হয়, মুসলমান ও তাতারিদের মাঝে কাউকে বিচারক বানানো হয়। তার হৃদয়ে ইনসাফ কায়েমের দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা আছে। ইনসাফ কী, তাও সে জানে। কিন্তু কোনো প্রতিবন্ধকতার কারণে সেটি তার দ্বারা সম্ভব হয় না (তখন সে যতটুকু সম্ভব, ততটুকু করবে।)। কারণ, আল্লাহ তায়ালা সাধ্যের বাইরে কাউকে কিছু চাপিয়ে দেন না।'
কেউ বলতে পারেন, ইবনে তাইমিয়া রহ. যে সময়ের কথা বলছেন, সেটি ছিল মৌলিকভাবে যারা কাফের, তাদের দাওয়াত দেওয়ার সময়। তখন আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন অসম্ভব ছিল। অধিকাংশ মানুষ ইসলামই গ্রহণ করেনি। যারা মুসলমান দেশে বসবাস করে, যাদের অধিকাংশই মুসলমানের সন্তান, তার কথা তো এমন লোকদের সম্পর্কে নয়?
আমরা বলি, যারা ইসলামে প্রবেশ করেনি আর যারা মুসলমান দেশে বাস করে, মুসলমানের সন্তান, কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধান সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণে অনাগ্রহী—উভয়ের জন্যই পরিপূর্ণরূপে ঈমান গ্রহণের দাওয়াতের প্রয়োজন রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَمِنُوا بِاللهِ وَ رَسُولِهِ وَ الْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَ الْكِتَبِ الَّذِي أَنْزَلَ مِنْ قَبْلُ وَ مَنْ يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَئِكَتِهِ وَ كُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلًا بَعِيدًا.
হে ঈমানদারগণ, ঈমান আনো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি এবং সেই কিতাবের প্রতি, যা তিনি তাঁর রাসুলের উপর নাজিল করেছেন এবং ওই কিতাবের প্রতি, যা তিনি পূর্বে নাজিল করেছিলেন। আর যে কেউ আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ ও কেয়ামত দিবসকে অস্বীকার করবে, সে চরম ভ্রষ্টতায় লিপ্ত হল।'১
ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর কথা বোঝার জন্য আমাদের পুরো কথাটা গুছিয়ে আনতে হবে। তিনি এখানে তিন ধরনের মানুষের ব্যাপারে বিধান আরোপ করেছেন। প্রত্যেকের বিধানের সঙ্গে তার কারণও উল্লেখ আছে।
এক. আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা না করলে কারা কাফের হবে?
এ ক্ষেত্রে তিনি বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা যা নাজিল করেছেন, সেটি বাদ দিয়ে নিজেরা যা ন্যায় মনে করে, সে অনুযায়ী শাসনকে যারা হালাল মনে করে, তারা কাফের।' এখানে মূল কারণ হালাল মনে করা।
দুই. কারা কাফের হবে না, কিন্তু গুনাহগার হবে?
তিনি বলেন, 'যারা বাহ্যিক ও আন্তরিকভাবে আল্লাহর বিধানকে নিজেদের জন্য আবশ্যক করে নিয়েছে, কিন্তু এরপর তার অবাধ্যতা করেছে, প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে—এরা গুনাহগারদের মতো।' এই দ্বিতীয় প্রকারকে কাফের না বলার কারণ হচ্ছে, তারা আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্য কিছু দ্বারা শাসনকে হালাল মনে করে না। তারা এটা করেছে অবাধ্যতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণে লিপ্ত হয়ে।
তিন. আরেক দল আছে, যারা কাফেরও হবে না, গুনাহগারও হবে না—তারা কারা?
তাদের চিহ্নিত করার জন্য তিনি বেশ কয়েকটি কারণ বর্ণনা করেছেন। যেমন:
* দ্বীনের যে বিধান জানা আছে, নিজ দেশে তা বাস্তবায়ন সম্ভবপর না থাকা।
* শরিয়তের অনেক বিধান বা অধিকাংশই দেশে প্রবেশ করাতে না পারা। কারণ, এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীনরা অক্ষম।
* ইসলামের ন্যায়ানুগ বিধান বাস্তবায়নের আন্তরিক ইচ্ছা রয়েছে। কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন সম্ভবপর নয়।
* আল্লাহ যতটুকু সামর্থ্য দিয়েছেন, বান্দা ততটুকু তাকওয়া অবলম্বন করেছে।
ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর এ সব মন্তব্যের মাধ্যমে বোঝা যায়, তৃতীয় প্রকার মানুষের গুনাহ না হওয়ার কারণ হচ্ছে, তাদের অক্ষমতা ও সে দেশে ইসলামি আইন বাস্তবায়ন সম্ভব না হওয়া।
এরপর তিনি বলছেন, 'নাজাশির জন্য কুরআনের বিধান বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না। কারণ, তার জাতি এ ব্যাপারে তাকে মেনে নিত না।' দেশের অধিকাংশ মানুষের অবস্থা যে লক্ষ করতে হবে, এই কথা দ্বারা সে দিকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কারণ, মানুষ যে বিষয়ে ঈমান রাখে না, তাদের উপর সেটি চাপিয়ে দেওয়া অনেক সময় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।'১
লক্ষ করলে দেখব, জনগণের পক্ষ থেকে নির্বাচিত সাংসদদের ব্যাপারটাও এমনই। তারা অনেক সময় গণ-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে কিছু করতে পারে না। এ সময়ে তারা যথাসাধ্য হক প্রতিষ্ঠা ও বাতিল প্রতিরোধের চেষ্টা করবে।২
ইবনে তাইমিয়া রহ. আল্লাহর আইন অনুযায়ী শাসন না করাসত্ত্বেও কিছু মানুষকে কাফের বলছেন না। কারণ, তারা বিষয়টিক হালাল মনে করে করছে না। অন্য দিকে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে বলছেন যে, তারা এর কারণে গুনাহগারও হবে না। তাদের ক্ষেত্রে তিনি লক্ষ রাখছেন অসম্ভাব্যতার দিকটি।
তিনি প্রতিটি বিধানের ক্ষেত্রে তার কারণের দিকেও ইঙ্গিত দিয়েছেন। কারণের দিকে ইঙ্গিত না দিলে বলা যেত যে, এই বিধান কেবল তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যারা এখনও দ্বীনে প্রবেশ করেনি। যারা আগে থেকেই ইসলামে প্রবেশ করেছে, তাদের বিধান ভিন্ন। কিন্তু তিনি যেহেতু কারণসহ বিধান বর্ণনা করেছেন, তার বক্তব্যকে কারণসহই বুঝতে হবে। যেখানে যে কারণ পাওয়া যাবে, সেখানে সে অনুযায়ী বিধান প্রয়োগ করতে হবে।
টিকাঃ
১. সুরা নিসা, ১৩৬。
১. লেখক এখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছেন। গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক বিষয়। রাজনীতির অবস্থাদি ক্রমশ পরিবর্তন হতে থাকে। এ ব্যাপারে স্থির বিধান বাতলে দেওয়া তাই খুবই মুশকিল। এরপরও উলামায়ে কেরামের কিতাবাদি অধ্যয়ন করে মধ্যপন্থি মত যেটি মনে হচ্ছে, তা হল, মতবাদ ও রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি হিসেবে গণতন্ত্র ইসলামসম্মত নয়। এর অনেক ধারা-উপধারা ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নির্বাচন-প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের একটি অংশ। ইসলামের শাসনকর্তা নির্ধারণের স্বতন্ত্র পদ্ধতি রয়েছে। مسلمانوں তা-ই গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু কোনো দেশে যদি সেটি বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণে অসম্ভব মনে হয়, তা হলে উলামায়ে কেরাম রাষ্ট্রীয় বিষয়ে অংশগ্রহণ ত্যাগ করে তা একেবারে পাপাচারী, বেদ্বীন, দুর্নীতিবাজদের হাতে ছেড়ে দেবেন, এটিও প্রজ্ঞোচিত নয়। এ জন্য ইসলামের শাসনতান্ত্রিক বয়ানকে হাজির রেখে, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ জারি রেখে এবং ইসলামি শাসন বাস্তবায়নের আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা সামনে নিয়ে যদি কেউ গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, পার্লামেন্ট সদস্য হয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের খেদমত করে, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তায়ালা তাকে নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান দেবেন। মুফতিয়ে আজম মুফতি কেফায়েতুল্লাহ দেহলভি রহ. ব্রিটিশদের শাসনামলে ব্রিটিশদেরকে উৎখাত ও বিতাড়িত করার আন্দোলন করার পাশাপাশি অপরাগতাবশত ব্রিটিশ অ্যাসেম্বলিতে যোগদান করে مسلمانوں খেদমত করাকে বৈধ ও উত্তম বলেছেন। (কেফায়াতুল মুফতি, খ. ৩, পৃ. ১৬৪)
২. এখানে একজন সাংসদের কাজ হবে দাওয়াত দেওয়া। মানুষের মানসিকতা পরিবর্তনের চেষ্টা করা। কুরআনের শাসনের প্রতি আস্তে আস্তে অভ্যন্ত করে তোলা, যাতে এক সময় তাদের ঈমানও পরিপূর্ণ হয় এবং পরিপূর্ণভাবে কুরআনের শাসনও মেনে নেয়।
📄 শরিয়তের বিধান প্রয়োগে পর্যায়ক্রম অবলম্বনের বিধান
কেউ বলতে পারেন, সংসদ সদস্যরা একযোগে শরিয়তের সকল বিধান প্রয়োগে সক্ষম হয় না। অথচ শরিয়তের কিছুই তো বাদ দেওয়া চলে না!
কথা সঠিক। কিন্তু পরিস্থিতির মোকাবেলায় কখনও ভিন্ন পন্থা গ্রহণও জরুরি হয়ে পড়ে। দেশে শরিয়ত প্রতিষ্ঠিত নেই। মানুষ শরিয়তের বিধান মানছে না। এ সময় মুসলিম শাসকের জন্য বিধান প্রয়োগে পর্যায়ক্রম অবলম্বনের বিকল্প নেই। এটাই ওয়াজিব তার জন্য। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর বিধান নাজিলের ক্ষেত্রে এটাই ছিল আল্লাহ তায়ালার তরিকা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিধান বাস্তবায়নেও এই পন্থা গ্রহণ করেছেন।
এখানে একটা কথা তবুও থেকে যায়। বিধান প্রয়োগে পর্যায়ক্রম অবলম্বন, যখন শরিয়ত অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হচ্ছিল, সেই সময়ের কথা। এটি শুধু নবুওতের যুগেই সম্ভব। কিন্তু এ কথা বলার সময় এই দিকটা নজরে থাকে না যে, শরিয়ত পূর্ণতা লাভের পরও কাউকে দাওয়াত দেওয়া ও কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিধান প্রয়োগে আস্তে-ধীরে অগ্রসর হওয়ারও প্রয়োজন পড়তে পারে।
শরিয়ত অবতরণের সময় পর্যায়ক্রম অবলম্বনের ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। এটি সর্বসম্মত ও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত বিষয়। কারণ, ইসলামের প্রথম যুগে আগে ঈমান ও ঈমানি বিষয়াবলির প্রতিই প্রথমে গুরুত্বারোপের প্রয়োজন বেশি ছিল। এটি সাধিত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে শরিয়তের আদেশ-নিষেধ অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু শরিয়ত যখন পূর্ণতা পেয়ে গেছে, তখন কোনো সম্প্রদায়ের উপর একযোগে সকল বিধান প্রয়োগ না করে এখানে পর্যায়ক্রম অবলম্বনের প্রমাণ কী? এরও প্রমাণ আছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনের প্রায় শেষের দিকের ঘটনা। শরিয়তের বিধান প্রায় সবই তখন নাজিল হয়ে গেছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়াজ ইবনে জাবাল রাজি.-কে ইয়েমেনের গভর্নর করে প্রেরণ করবেন। সেখানকার কিছু মানুষ নতুন ইসলাম গ্রহণ করেছে। অধিকাংশ মানুষ খ্রিষ্টান। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়াজ ইবনে জাবাল রাজি.-কে প্রেরণের সময় বললেন, 'তাদের এই সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আহ্বান করো যে, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসুল। এটি যখন তারা মেনে নেবে, তখন তাদের জানিয়ে দাও, আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। এটি মেনে নিলে এরপর তাদের অবগত করো, আল্লাহ তায়ালা তাদের সম্পদে জাকাত ফরজ করেছেন, যা তাদের ধনীদের থেকে গ্রহণ করে, দরিদ্রদের দিয়ে দেওয়া হবে।"১
তাকে পাঠালেন। কালেমার দাওয়াত দিতে বললেন। কালেমার দাওয়াত গ্রহণ করার পরপর আল্লাহ তায়ালা যত আদেশ-নিষেধ নাজিল করেছেন, তার সবই কিন্তু একসঙ্গে জানিয়ে দেওয়ার আদেশ করেননি। প্রথমে আল্লাহর আদেশসমূহ জানাতে বলা হচ্ছে। এরপর গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞাসমূহ। এরপর দেখা যায়, প্রথমে শুধু একটি বিষয় অবগত করার কথা বলা হচ্ছে—নামাজ ফরজ হওয়ার কথা। কারণ, এটি বান্দা ও রবের মাঝে সম্পর্ক তৈরির অনন্য মাধ্যম। নামাজের পর আদেশ করতে বলা হচ্ছে জাকাতের। কারণ, এর মাধ্যমে ধনী কর্তৃক দরিদ্রের দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি সম্পন্ন হয়। এ দুটি প্রয়োগের আগে কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়াজ ইবনে জাবাল রাজি.-কে আর কোনো বিষয় বলার কথা বলছেন না। না কোনো আজ্ঞা, না কোনো নিষেধাজ্ঞা। লক্ষণীয় ব্যাপার এখানে এই যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়াজ ইবনে জাবাল রা.-কে যখন প্রেরণ করেছেন, তখন শরিয়তের অবতরণ প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে।
টিকাঃ
১. বুখারি, মুসলিম।
📄 খেলাফতে রাশেদার যুগে বিধান প্রয়োগে পর্যায়ক্রমের অনুসরণ
অনেকে মনে করে, বিধান প্রয়োগে পর্যায়ক্রম অনুসরণের ব্যাপারটি খোলাফায়ে রাশেদার যুগে ছিল না।
ব্যাপারটি আসলে পুরো সঠিক নয়। পঞ্চম খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর সময়ে এই পন্থা অবলম্বন করতে দেখা যায়। উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর পুত্র আবদুল মালিক বলেন, 'আমার পিতাকে রাজপরিবারের আত্মসাৎকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দিতে ইতস্তত করতে দেখে এর কারণ জিজ্ঞেস করলাম।' তিনি বললেন, 'হে বৎস, নিশ্চয় মানুষকে অধীনে আনা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। অবশ্যই আমি হক প্রতিষ্ঠার একটি পরিকল্পনা করব; কিন্তু ভয় হচ্ছে, যতক্ষণ না তার সঙ্গে কিছু সম্পদের প্রত্যাশা যুক্ত না করি, তা হয়তো মানুষ প্রত্যাখ্যান করবে। যদি তারা এই পরিকল্পনা বিনষ্টের চেষ্টা করে, তো সম্পদের আশা থাকার কারণে তারা এর থেকে দূরে থাকতে পারবে না। যদি আমি বেঁচে থাকি, যা চাই তা বাস্তবায়ন করব, ইনশাআল্লাহ। আর যদি ইন্তেকাল করি, তা হলে আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই আমার নিয়ত জানেন।"১
হিলইয়াতুল আওলিয়ায় আবু নুয়াইম ইস্পাহানি রহ. একই ঘটনা অন্য সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য হচ্ছে, উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর পুত্র আবদুল মালিক বলেন, 'আমি পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন বিষয়টি আপনাকে কাঙ্ক্ষিত ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে ঠেকিয়ে রেখেছে?' তিনি বললেন, 'বৎস, মানুষকে অধীনে আনা অনেক কঠিন। আমি চাই, ন্যায়ের একটি বিষয় বাস্তবায়ন করে একটু বিরতি নেব এবং এর সঙ্গে পার্থিব কিছু লাভের বিষয়ও জুড়ে দেব। যদি তারা ন্যায় থেকে ফিরতে চায়, পার্থিব লাভ থাকায় এতে আগ্রহী হয়ে ফিরতে পারবে না, বরং ন্যায় গ্রহণ করে নেবে।”১
আবু নুয়াইম ইস্পাহানি রহ. অন্য আরেকটি সূত্রে বর্ণনা করেন, আবদুল মালিক ইবনে আবদুল আজিজ তার পিতাকে বলছেন, 'হে আমিরুল মুমিনিন, কাল যখন আপনার রব আপনাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি অনেক বেদআত দেখেছ, তা মিটিয়ে দাওনি, অনেক সুন্নত মিটে যেতে দেখেছ, তা জিন্দা করনি, তখন আপনি কী জবাব দেবেন?' তিনি বললেন, 'বৎস, তোমার জাতি এই বিষয়গুলোর পথ ধীরে ধীরে রুদ্ধ করেছে। একেকটা করে তারা এ সব আমদানি করেছে। যখনই আমি তাদের কাছে যা আছে, তা হস্তগত করার উদ্যোগ নেব, তখন তারা আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে না, এর নিশ্চয়তা কী? তখন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হবে। খোদার শপথ, আমার কারণে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার চেয়ে পার্থিব ক্ষতি সহ্য করে নেওয়া আমার জন্য অধিকতর সহজ। তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমার পিতা একেকটি দিন অতিবাহিত করবে, আর সেই দিনটিতে সে একটি বেদআত মিটিয়ে দেবে ও একটি সুন্নত জিন্দা করবে! এভাবে এমন এক দিন এসে যাবে, যে দিন আমাদের ও আমাদের জাতির মাঝে আল্লাহ তায়ালা হকের ফয়সালা করবেন। তিনিই উত্তম ফয়সালাকারী।'
ইবনে আসাকির তার সনদে খালিদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আবদুল মালিক ইবনে উমর ইবনে আবদুল আজিজ তার পিতার কাছে এসে বললেন, 'আপনি যে ক্ষমতা গ্রহণের পর, বাতিল দেখেও তার প্রতিরোধ করেননি, হক দেখেও তা প্রতিষ্ঠা করেননি-কী জবাব দেবেন রবের কাছে?' তিনি বললেন, 'বৎস, বসো। তোমার বাপ-দাদারা মানুষকে হকের নামে ধোঁকা দিয়েছে। সর্বশেষ বিষয়গুলো আমার উপর এসে পড়েছে। অকল্যাণ ধেয়ে এসেছে। কল্যাণ পিছে সরে গেছে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এটাই কি সুন্দর নয় যে, একেকটা সূর্য উদিত হবে, আর সেই দিনটিতে আমি একটি হক জিন্দা করব ও একটি বাতিল মিটিয়ে দেব আর এভাবেই একদিন আমার মৃত্যু এসে উপস্থিত হবে।"১
উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.। খোলাফায়ে রাশেদার পঞ্চম ব্যক্তিত্ব। বড় মাপের তাবেয়ি। তার খেলাফত লাভের পূর্বে রাজপরিবারের লোকেরা বায়তুল মাল থেকে অনেক সম্পদ আত্মসাৎ করে রেখেছিল। তিনি কিন্তু খলিফা হয়েই সেগুলো ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। তিনি অনেক বেদআত দেখেছেন। বাতিল বিষয় দেখেছেন। একসঙ্গে সব কিন্তু মিটিয়ে দিতে যাননি। অনেক সুন্নত অবহেলিত হতে দেখেছেন। সব একসঙ্গে জিন্দা করতে যাননি। এর জন্য তিনি পর্যায়ক্রমে পন্থা অবলম্বন করেছেন। একেক দিন একেকটা বেদআত দূর করেছেন। একেকটা সুন্নত জিন্দা করেছেন। বাতিল মিটিয়ে দেওয়া ও হককে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে এই ছিল তার কর্মপন্থা।
যদি বেঁচে থাকেন, কাজ চালিয়ে যাবেন। ইন্তেকাল করলে আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই মনের অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত। এবং এখানে এই অবকাশও তার সামনে রয়েছে যে, মৃত্যুকালে এমন কাউকে খেলাফতের দায়িত্ব দিয়ে যাবেন, যে তারই পথ ধরে অবশিষ্ট কাজ শেষ করবে। এটাই ছিল পঞ্চম খলিফার ফিকহ ও দৃষ্টিভঙ্গি। আল্লাহ তায়ালা তার উপর করুণা বর্ষণ করুন।
শরিয়তের বিধান বাস্তবায়নে পর্যায়ক্রম অবলম্বনের ব্যাপারে একটা হাদিসেও কিছুটা ইশারা পাওয়া যায়। অবশ্য এই বিষয়ের সঙ্গে তার একটু ভিন্নতা আছে। বিষয়টি হচ্ছে, উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ার কারণে কোনো কাজ বাস্তবায়নে দেরি করা। বুখারি শরিফে হজরত আয়েশা রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'যদি তোমার কওমের যুগ জাহেলিয়াতের নিকটবর্তী না হত, তা হলে আমি কাবাঘর সম্পর্কে নির্দেশ দিতাম এবং তা ভেঙে ফেলা হত। তারপর বাদ দেওয়া অংশটুকু আমি ঘরের অন্তর্ভুক্ত করে দিতাম ও পূর্ব পশ্চিমে এর দুটি করে দরজা দিতাম। এভাবে কাবাকে ইবরাহিম আ.-এর নির্মিত ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনতাম।"১
আমাদের আলোচিত বিধানের সঙ্গে এর ভিন্নতাটুকু হচ্ছে, কাবাকে ইবরাহিম আ.-এর নির্মিত ভিত্তির উপর ফিরিয়ে দেওয়া অথবা যে অবস্থায় আছে, সেভাবে রেখে দেওয়া একটি ইতিহাস-আশ্রিত সংশোধনের বিষয়, এটি কোনো শরয়ি বিধানের বিষয় নয়। তবুও এর মধ্য দিয়ে আমাদের আলোচিত মাসআলার কারণের দিকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তা হচ্ছে, কিছু করার পূর্বে তার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হওয়া বা করে নেওয়াটা ভালো।২
টিকাঃ
১. তারিখে দিমাশক, ইবনে আসাকির, খ. ৩৭, পৃ. ৪৭。
১. হিলইয়াতুল আওলিয়া, আবু নুয়াইম ইস্পাহানি, খ. ৫, পৃ. ৩৫৪。
১. বুখারি, ১৫৮৬।
২. পর্যায়ক্রম অবলম্বন বাস্তবে কার্যকর করার ক্ষেত্রে হতে পারে। কিন্তু এর নাম নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের স্বতঃসিদ্ধ কোনো বিশ্বাস বা আমল ঢেকে রাখা বা অগুরুত্বপূর্ণ মনে করার সুযোগ নেই। (অনুবাদক)