📄 ইবনে আবিল ইজ্জ আল-হানাফি রহ.
ইবনে আবিল ইজ্জ আল-হানাফি আকিদাতুত তহাবিয়্যার ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন, 'এখানে একটা বিষয় খুব ভালো করে বোঝার আছে। আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী শাসন না করা কখনও ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার মতো কুফরি হয়, কখনও এমন হয় না। কিন্তু তাকে মারাত্মক পর্যায়ের গুনাহ গণ্য করা হয়। এটি হয় শাসকের অবস্থা বিবেচনায়। শাসক যখন বিশ্বাস করে, আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী ফয়সালা করা ওয়াজিব নয় বা কোনো বিধানকে আল্লাহর বিধান জেনেও তা নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এটি বড় পর্যায়ের কুফরি। আর যদি আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করা ওয়াজিব বলে বিশ্বাস করে, এরপর পরকালে শান্তির উপযুক্ত হবে এটা স্বীকার করেও আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে অন্য আইনে শাসন করে, সে গুনাহগার। তাকে কাফের বলা হলেও সেটি রূপকার্থে বলা হবে অথবা বলা হবে, সে ছোট কুফর করেছে।'২
টিকাঃ
২. দশরহুল আকিদাতিত তহাবিয়্যা, ইবনে আবিল ইজ্জ আল-হানাফি, খ. ২, পৃ. ৪৪৬।
📄 ইমাদুদ্দিন ইবনে কাসির রহ.
'আল্লাহ তায়ালা বলেন—
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُوْنَ وَ مَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوْقِنُونَ.
তবে কি ওরা জাহেলিয়াতের বিধান চায়? আর বিশ্বাসী লোকদের জন্য আল্লাহর চেয়ে উত্তম বিধানদাতা কে আছে?'
আল্লাহ তায়ালার সুদৃঢ় বিধান ছেড়ে শরিয়ত-অসমর্থিত নিজেদের মনগড়া আইনকে যারা গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদের এই কাজের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করছেন-যেমন জাহেলি যুগের মানুষ নিজেদের মনগড়া ভ্রষ্টতা ও মূখতাপূর্ণ আইনে শাসন করত। এর আরও একটি দৃষ্টান্ত তাতারিরা। তারা চেঙ্গিস খান থেকে প্রাপ্ত রাজতান্ত্রিক আইনে শাসন করত। তাদের সে সংবিধান 'ইয়াসাক' নামে পরিচিত। ইহুদি, খ্রিষ্টান, ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে এই সংবিধানের নীতিমালা। এতে এমন অনেক বিধান আছে, যা ছিল চেঙ্গিস খানের একান্ত ব্যক্তিগত মত ও প্রবৃত্তিজাত। এটিই তাদের মাঝে অনুসরণীয় শরিয়তরূপে গৃহীত হয়েছিল। শাসনের ক্ষেত্রে তারা এটাকে আল্লাহর কিতাব ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহর উপর অগ্রাধিকার দিত। এমনটি যে করবে, সে কাফের।'২
তিনি যে বললেন, 'শাসনের ক্ষেত্রে তারা এটাকে আল্লাহর কিতাব ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহর উপর অগ্রাধিকার দিত'-এর অর্থ হচ্ছে, তারা কুরআন-সুন্নাহর উপর এটার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করত। এটি নিঃসন্দেহে সুস্পষ্ট কুফরি।
টিকাঃ
১. সুরা মায়েদা, ৫০।
২. তাফসিরে ইবনে কাসির, খ. ৩, পৃ. ১১৯।
📄 পার্লামেন্ট নির্বাচন
যে দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান, কিন্তু তারা নিজেদের পছন্দনীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে গ্রহণ করে নিতে চায় না, এমন দেশে যদি কেউ অন্যায়-অনাচারকে যথাসাধ্য দমিত রাখা ও নিরুপায় অবস্থার বর্তমান করণীয় হিসেবে পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, এর অবকাশ আছে। অনেকে মনে করে, এটি আল্লাহর শাসন ব্যতীত অন্য কিছুকে সন্তুষ্টির সঙ্গে গ্রহণ করা। বিষয়টি এমন নয়। বরং এটি ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর সেই কথার অন্তর্ভুক্ত হবে, যা আমরা ইতিপূর্বে উদ্ধৃত করেছি।
ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর কথাটি আমরা একটু ভালোভাবে পাঠ করে দেখি। তিনি বলছেন, 'ইউসুফ আ. মিশরে ক্ষমতায় ছিলেন। তারা ছিল কাফের সম্প্রদায়। তিনি ইসলামের যে ন্যায়ের বিধান জানতেন, তার সব সেখানে প্রয়োগ সম্ভব হয়নি।'
তিনি আরও বলছেন, 'নাজাশি খ্রিষ্টানদের শাসক ছিলেন। তার জাতি ইসলাম গ্রহণে তার অনুসরণ করেনি। ইসলামের অধিকাংশ বিধানই সে দেশে প্রবেশ করেনি। কারণ, বাদশা নাজাশি এতে অক্ষম ছিলেন। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, সেখানে তার কুরআন অনুযায়ী শাসনের সক্ষমতা ছিল না। কারণ, তার জাতি এটা গ্রহণে সম্মত হত না। অনেক সময় এমন হয়, মুসলমান ও তাতারিদের মাঝে কাউকে বিচারক বানানো হয়। তার হৃদয়ে ইনসাফ কায়েমের দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা আছে। ইনসাফ কী, তাও সে জানে। কিন্তু কোনো প্রতিবন্ধকতার কারণে সেটি তার দ্বারা সম্ভব হয় না (তখন সে যতটুকু সম্ভব, ততটুকু করবে।)। কারণ, আল্লাহ তায়ালা সাধ্যের বাইরে কাউকে কিছু চাপিয়ে দেন না।'
কেউ বলতে পারেন, ইবনে তাইমিয়া রহ. যে সময়ের কথা বলছেন, সেটি ছিল মৌলিকভাবে যারা কাফের, তাদের দাওয়াত দেওয়ার সময়। তখন আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন অসম্ভব ছিল। অধিকাংশ মানুষ ইসলামই গ্রহণ করেনি। যারা মুসলমান দেশে বসবাস করে, যাদের অধিকাংশই মুসলমানের সন্তান, তার কথা তো এমন লোকদের সম্পর্কে নয়?
আমরা বলি, যারা ইসলামে প্রবেশ করেনি আর যারা মুসলমান দেশে বাস করে, মুসলমানের সন্তান, কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধান সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণে অনাগ্রহী—উভয়ের জন্যই পরিপূর্ণরূপে ঈমান গ্রহণের দাওয়াতের প্রয়োজন রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَمِنُوا بِاللهِ وَ رَسُولِهِ وَ الْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَ الْكِتَبِ الَّذِي أَنْزَلَ مِنْ قَبْلُ وَ مَنْ يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَئِكَتِهِ وَ كُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلًا بَعِيدًا.
হে ঈমানদারগণ, ঈমান আনো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি এবং সেই কিতাবের প্রতি, যা তিনি তাঁর রাসুলের উপর নাজিল করেছেন এবং ওই কিতাবের প্রতি, যা তিনি পূর্বে নাজিল করেছিলেন। আর যে কেউ আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ ও কেয়ামত দিবসকে অস্বীকার করবে, সে চরম ভ্রষ্টতায় লিপ্ত হল।'১
ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর কথা বোঝার জন্য আমাদের পুরো কথাটা গুছিয়ে আনতে হবে। তিনি এখানে তিন ধরনের মানুষের ব্যাপারে বিধান আরোপ করেছেন। প্রত্যেকের বিধানের সঙ্গে তার কারণও উল্লেখ আছে।
এক. আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা না করলে কারা কাফের হবে?
এ ক্ষেত্রে তিনি বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা যা নাজিল করেছেন, সেটি বাদ দিয়ে নিজেরা যা ন্যায় মনে করে, সে অনুযায়ী শাসনকে যারা হালাল মনে করে, তারা কাফের।' এখানে মূল কারণ হালাল মনে করা।
দুই. কারা কাফের হবে না, কিন্তু গুনাহগার হবে?
তিনি বলেন, 'যারা বাহ্যিক ও আন্তরিকভাবে আল্লাহর বিধানকে নিজেদের জন্য আবশ্যক করে নিয়েছে, কিন্তু এরপর তার অবাধ্যতা করেছে, প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে—এরা গুনাহগারদের মতো।' এই দ্বিতীয় প্রকারকে কাফের না বলার কারণ হচ্ছে, তারা আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্য কিছু দ্বারা শাসনকে হালাল মনে করে না। তারা এটা করেছে অবাধ্যতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণে লিপ্ত হয়ে।
তিন. আরেক দল আছে, যারা কাফেরও হবে না, গুনাহগারও হবে না—তারা কারা?
তাদের চিহ্নিত করার জন্য তিনি বেশ কয়েকটি কারণ বর্ণনা করেছেন। যেমন:
* দ্বীনের যে বিধান জানা আছে, নিজ দেশে তা বাস্তবায়ন সম্ভবপর না থাকা।
* শরিয়তের অনেক বিধান বা অধিকাংশই দেশে প্রবেশ করাতে না পারা। কারণ, এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীনরা অক্ষম।
* ইসলামের ন্যায়ানুগ বিধান বাস্তবায়নের আন্তরিক ইচ্ছা রয়েছে। কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন সম্ভবপর নয়।
* আল্লাহ যতটুকু সামর্থ্য দিয়েছেন, বান্দা ততটুকু তাকওয়া অবলম্বন করেছে।
ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর এ সব মন্তব্যের মাধ্যমে বোঝা যায়, তৃতীয় প্রকার মানুষের গুনাহ না হওয়ার কারণ হচ্ছে, তাদের অক্ষমতা ও সে দেশে ইসলামি আইন বাস্তবায়ন সম্ভব না হওয়া।
এরপর তিনি বলছেন, 'নাজাশির জন্য কুরআনের বিধান বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না। কারণ, তার জাতি এ ব্যাপারে তাকে মেনে নিত না।' দেশের অধিকাংশ মানুষের অবস্থা যে লক্ষ করতে হবে, এই কথা দ্বারা সে দিকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কারণ, মানুষ যে বিষয়ে ঈমান রাখে না, তাদের উপর সেটি চাপিয়ে দেওয়া অনেক সময় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।'১
লক্ষ করলে দেখব, জনগণের পক্ষ থেকে নির্বাচিত সাংসদদের ব্যাপারটাও এমনই। তারা অনেক সময় গণ-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে কিছু করতে পারে না। এ সময়ে তারা যথাসাধ্য হক প্রতিষ্ঠা ও বাতিল প্রতিরোধের চেষ্টা করবে।২
ইবনে তাইমিয়া রহ. আল্লাহর আইন অনুযায়ী শাসন না করাসত্ত্বেও কিছু মানুষকে কাফের বলছেন না। কারণ, তারা বিষয়টিক হালাল মনে করে করছে না। অন্য দিকে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে বলছেন যে, তারা এর কারণে গুনাহগারও হবে না। তাদের ক্ষেত্রে তিনি লক্ষ রাখছেন অসম্ভাব্যতার দিকটি।
তিনি প্রতিটি বিধানের ক্ষেত্রে তার কারণের দিকেও ইঙ্গিত দিয়েছেন। কারণের দিকে ইঙ্গিত না দিলে বলা যেত যে, এই বিধান কেবল তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যারা এখনও দ্বীনে প্রবেশ করেনি। যারা আগে থেকেই ইসলামে প্রবেশ করেছে, তাদের বিধান ভিন্ন। কিন্তু তিনি যেহেতু কারণসহ বিধান বর্ণনা করেছেন, তার বক্তব্যকে কারণসহই বুঝতে হবে। যেখানে যে কারণ পাওয়া যাবে, সেখানে সে অনুযায়ী বিধান প্রয়োগ করতে হবে।
টিকাঃ
১. সুরা নিসা, ১৩৬。
১. লেখক এখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছেন। গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক বিষয়। রাজনীতির অবস্থাদি ক্রমশ পরিবর্তন হতে থাকে। এ ব্যাপারে স্থির বিধান বাতলে দেওয়া তাই খুবই মুশকিল। এরপরও উলামায়ে কেরামের কিতাবাদি অধ্যয়ন করে মধ্যপন্থি মত যেটি মনে হচ্ছে, তা হল, মতবাদ ও রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি হিসেবে গণতন্ত্র ইসলামসম্মত নয়। এর অনেক ধারা-উপধারা ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নির্বাচন-প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের একটি অংশ। ইসলামের শাসনকর্তা নির্ধারণের স্বতন্ত্র পদ্ধতি রয়েছে। مسلمانوں তা-ই গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু কোনো দেশে যদি সেটি বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণে অসম্ভব মনে হয়, তা হলে উলামায়ে কেরাম রাষ্ট্রীয় বিষয়ে অংশগ্রহণ ত্যাগ করে তা একেবারে পাপাচারী, বেদ্বীন, দুর্নীতিবাজদের হাতে ছেড়ে দেবেন, এটিও প্রজ্ঞোচিত নয়। এ জন্য ইসলামের শাসনতান্ত্রিক বয়ানকে হাজির রেখে, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ জারি রেখে এবং ইসলামি শাসন বাস্তবায়নের আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা সামনে নিয়ে যদি কেউ গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, পার্লামেন্ট সদস্য হয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের খেদমত করে, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তায়ালা তাকে নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান দেবেন। মুফতিয়ে আজম মুফতি কেফায়েতুল্লাহ দেহলভি রহ. ব্রিটিশদের শাসনামলে ব্রিটিশদেরকে উৎখাত ও বিতাড়িত করার আন্দোলন করার পাশাপাশি অপরাগতাবশত ব্রিটিশ অ্যাসেম্বলিতে যোগদান করে مسلمانوں খেদমত করাকে বৈধ ও উত্তম বলেছেন। (কেফায়াতুল মুফতি, খ. ৩, পৃ. ১৬৪)
২. এখানে একজন সাংসদের কাজ হবে দাওয়াত দেওয়া। মানুষের মানসিকতা পরিবর্তনের চেষ্টা করা। কুরআনের শাসনের প্রতি আস্তে আস্তে অভ্যন্ত করে তোলা, যাতে এক সময় তাদের ঈমানও পরিপূর্ণ হয় এবং পরিপূর্ণভাবে কুরআনের শাসনও মেনে নেয়।
📄 শরিয়তের বিধান প্রয়োগে পর্যায়ক্রম অবলম্বনের বিধান
কেউ বলতে পারেন, সংসদ সদস্যরা একযোগে শরিয়তের সকল বিধান প্রয়োগে সক্ষম হয় না। অথচ শরিয়তের কিছুই তো বাদ দেওয়া চলে না!
কথা সঠিক। কিন্তু পরিস্থিতির মোকাবেলায় কখনও ভিন্ন পন্থা গ্রহণও জরুরি হয়ে পড়ে। দেশে শরিয়ত প্রতিষ্ঠিত নেই। মানুষ শরিয়তের বিধান মানছে না। এ সময় মুসলিম শাসকের জন্য বিধান প্রয়োগে পর্যায়ক্রম অবলম্বনের বিকল্প নেই। এটাই ওয়াজিব তার জন্য। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর বিধান নাজিলের ক্ষেত্রে এটাই ছিল আল্লাহ তায়ালার তরিকা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিধান বাস্তবায়নেও এই পন্থা গ্রহণ করেছেন।
এখানে একটা কথা তবুও থেকে যায়। বিধান প্রয়োগে পর্যায়ক্রম অবলম্বন, যখন শরিয়ত অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হচ্ছিল, সেই সময়ের কথা। এটি শুধু নবুওতের যুগেই সম্ভব। কিন্তু এ কথা বলার সময় এই দিকটা নজরে থাকে না যে, শরিয়ত পূর্ণতা লাভের পরও কাউকে দাওয়াত দেওয়া ও কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিধান প্রয়োগে আস্তে-ধীরে অগ্রসর হওয়ারও প্রয়োজন পড়তে পারে।
শরিয়ত অবতরণের সময় পর্যায়ক্রম অবলম্বনের ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। এটি সর্বসম্মত ও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত বিষয়। কারণ, ইসলামের প্রথম যুগে আগে ঈমান ও ঈমানি বিষয়াবলির প্রতিই প্রথমে গুরুত্বারোপের প্রয়োজন বেশি ছিল। এটি সাধিত হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে শরিয়তের আদেশ-নিষেধ অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু শরিয়ত যখন পূর্ণতা পেয়ে গেছে, তখন কোনো সম্প্রদায়ের উপর একযোগে সকল বিধান প্রয়োগ না করে এখানে পর্যায়ক্রম অবলম্বনের প্রমাণ কী? এরও প্রমাণ আছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনের প্রায় শেষের দিকের ঘটনা। শরিয়তের বিধান প্রায় সবই তখন নাজিল হয়ে গেছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়াজ ইবনে জাবাল রাজি.-কে ইয়েমেনের গভর্নর করে প্রেরণ করবেন। সেখানকার কিছু মানুষ নতুন ইসলাম গ্রহণ করেছে। অধিকাংশ মানুষ খ্রিষ্টান। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়াজ ইবনে জাবাল রাজি.-কে প্রেরণের সময় বললেন, 'তাদের এই সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আহ্বান করো যে, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসুল। এটি যখন তারা মেনে নেবে, তখন তাদের জানিয়ে দাও, আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর দিনে-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। এটি মেনে নিলে এরপর তাদের অবগত করো, আল্লাহ তায়ালা তাদের সম্পদে জাকাত ফরজ করেছেন, যা তাদের ধনীদের থেকে গ্রহণ করে, দরিদ্রদের দিয়ে দেওয়া হবে।"১
তাকে পাঠালেন। কালেমার দাওয়াত দিতে বললেন। কালেমার দাওয়াত গ্রহণ করার পরপর আল্লাহ তায়ালা যত আদেশ-নিষেধ নাজিল করেছেন, তার সবই কিন্তু একসঙ্গে জানিয়ে দেওয়ার আদেশ করেননি। প্রথমে আল্লাহর আদেশসমূহ জানাতে বলা হচ্ছে। এরপর গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞাসমূহ। এরপর দেখা যায়, প্রথমে শুধু একটি বিষয় অবগত করার কথা বলা হচ্ছে—নামাজ ফরজ হওয়ার কথা। কারণ, এটি বান্দা ও রবের মাঝে সম্পর্ক তৈরির অনন্য মাধ্যম। নামাজের পর আদেশ করতে বলা হচ্ছে জাকাতের। কারণ, এর মাধ্যমে ধনী কর্তৃক দরিদ্রের দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি সম্পন্ন হয়। এ দুটি প্রয়োগের আগে কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়াজ ইবনে জাবাল রাজি.-কে আর কোনো বিষয় বলার কথা বলছেন না। না কোনো আজ্ঞা, না কোনো নিষেধাজ্ঞা। লক্ষণীয় ব্যাপার এখানে এই যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়াজ ইবনে জাবাল রা.-কে যখন প্রেরণ করেছেন, তখন শরিয়তের অবতরণ প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে।
টিকাঃ
১. বুখারি, মুসলিম।