📄 ইবনে তাইমিয়া রহ.
ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, 'যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করবে না- 'তারাই কাফের', 'তারাই জালেম', 'তারাই ফাসেক'। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি.-সহ আরও অনেক সালাফের থেকে এ সব আয়াতের তাফসিরে বর্ণিত হয়েছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য বড় পর্যায়ের কুফর নয়, বরং ছোট কুফর উদ্দেশ্য। তদ্রূপ বড় পাপাচার নয়, ছোট পাপাচার; বড় জুলুম নয়, ছোট জুলুম। এই একই বক্তব্য এসেছে ইমাম বুখারি ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. থেকেও।'২
তিনি আরও বলেন, 'যে ওয়াজিব পর্যায়ের ঈমান আনবে, সে সওয়াবের উপযুক্ত হবে। কখনও একজন মানুষ মুসলমান হওয়ার পরও তার সঙ্গে ছোট পর্যায়ের কোনো কুফর যুক্ত থাকতে পারে, যা তাকে পুরোপুরি ইসলাম থেকে বের করে দেয় না, যেমনটি ইবনে আব্বাস রাজি.-সহ আরও অনেক সাহাবায়ে কেরাম বলেছেন। অধিকাংশ সালাফের বক্তব্যও এমন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বিষয়টি স্পষ্টাকারে উল্লেখ করেছেন। এর একটি উদাহরণ হতে পারে, কুরআনের আয়াত 'যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের'-এই প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি.-এর মন্তব্য। তিনি বলেন, 'এটি এমন কুফর, যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না।"১
টিকাঃ
২. মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ৫২২。
১. প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ৩৫০।
📄 ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর নামে চালানো কথা ও বাস্তবতা
যারা বলে, 'ইবনে তাইমিয়া রহ. আল্লাহর আইন ব্যতীত শাসন করলেই অবস্থা বিবেচনা না করে, সাধারণভাবে কাফের সাব্যস্ত করেন'-উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি তাদের মতের বিপরীত। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী শাসন করার আবশ্যকীয়তা যে অবিশ্বাস করবে, নিঃসন্দেহে সে কাফের। আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, তার অনুসরণ না করে, নিজে যেটা ন্যায় মনে করে, সেই অনুযায়ী শাসন করাকে যে হালাল মনে করবে, সেও কাফের। অধিকাংশ নামধারী মুসলিমের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমনই হয়। তারা আল্লাহর নাজিলকৃত আইন বাদ দিয়ে নিজেদের দেশাচার ও সংস্কৃতি অনুযায়ী শাসন করে-যেমন প্রান্তিক বেদুইন জনগোষ্ঠীর সম্রাজ্ঞীগণ। ২ বেদুইনরা তাদের আনুগত্য করে। সম্রাজ্ঞীরা সেখানে নিজেদের মতো করে শাসন করে আর মনে করে, কুরআন-সুন্নাহ নয়, নিজেদের এই আইনেই শাসন করা উচিত। এটি কুফরি। তাদের বোঝাতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালা যা নাজিল করেছেন, তা ব্যতীত শাসন করা বৈধ নয়। এরপরও যদি তারা সেটা না মানে, বরং আল্লাহর আইনের বিপরীত শাসন করাকে হালাল মনে করে, তারা কাফের বলে গণ্য হবে। অন্যথায় তাদের মূর্খ হিসেবে ধরে নেওয়া হবে।
মুসলমানরা যখন কোনো বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হবে, তাদের উপর আদেশ হচ্ছে, এর ফয়সালা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর ছেড়ে দেবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'অতএব আপনার রবের কসম, ওরা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না ওরা নিজেদের মাঝে সংঘটিত বিবাদের ক্ষেত্রে আপনাকেই বিচারক বানাবে। অতঃপর আপনার ফয়সালা সম্বন্ধে নিজেদের মনে কোনো সংকীর্ণতা বোধ করবে না এবং তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেবে।"১ নিজেদের মধ্যকার বিবাদে যারা আল্লাহ ও তার রাসুলকে ফয়সালাকারী না বানাবে, খোদ আল্লাহ তায়ালা শপথ করছেন যে, তারা ঈমান আনেনি। তবে, যারা আল্লাহর বিধানকে আন্তরিক ও বাহ্যিকভাবে নিজেদের জন্য আবশ্যক করে নেয়, কিন্তু তা পালন করে না, প্রবৃত্তির তাড়নায় আল্লাহর অবাধ্যতা করে, তারা গুনাহগারদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এই আয়াত দিয়ে খারেজিরা, যে সব শাসক আল্লাহর নাজিলকৃত আইন অনুযায়ী শাসন করে না, তাদের কাফের সাব্যস্ত করে। আর তারা বলে যে, তাদের এই বিশ্বাসটা (এমন শাসকদের কাফের বলা) আল্লাহরই আদেশ।'২
ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর বক্তব্যে একটি কথা এসেছে-'যারা বাহ্যিক ও আন্তরিকভাবে আল্লাহর বিধান মেনে নেওয়া আবশ্যক করে নিয়েছে, কিন্তু প্রবৃত্তির অনুসরণের কারণে অবাধ্যতা করে'; এটা তো স্পষ্ট যে, এর দ্বারা কার্যতভাবে আবশ্যক করে নেওয়া উদ্দেশ্য নয়। কারণ, এমনটি হলে তো তারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসন করছেই, তা হলে তাদের প্রবৃত্তির অনুসারী ও অবাধ্য হওয়ার প্রশ্ন আসে না। বাহ্যিক ও আন্তরিকভাবে মেনে নেওয়ার দ্বারা শায়খের উদ্দেশ্য মূলত এই মেনে নেওয়াটা শুধু মৌখিক দাবিই নয়, বরং মৌখিক ও আন্তরিক উভয়ভাবেই সে আল্লাহর বিধানকে মেনে নিয়েছে; এরপর প্রবৃত্তির অনুসরণের কারণে অবাধ্যতা করেছে। শায়খের কথাকে এভাবে বুঝতে হবে। অন্যথায় কথার পূর্বাপর মিল থাকবে না। এক কথার সঙ্গে অন্য কথার বৈপরীত্য দেখা দেবে।
ইবনে তাইমিয়া রহ. অন্যত্র বলেন, 'কেউ কাফেরদের রাষ্ট্রে থাকে, ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে তার কাছে। সে জেনেছে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল। ঈমান এনেছে তাঁর উপর। ঈমান এনেছে তাঁর উপর যা নাজিল হয়েছে, সে সবের উপরও।
যথাসম্ভব আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে চলছে—যেমনটি হাবশার বাদশা নাজাশি করেছিলেন। তার ইসলামি রাষ্ট্রে হিজরত করার সুযোগ হয়নি, শরিয়তের সকল বিধান পালন করতে পারেননি। কারণ, তার জন্য হিজরত অসম্ভব ছিল। দ্বীনকে প্রকাশের মতো পরিবেশ ছিল না। তার এমন কোনো সুযোগও ছিল না যে, দ্বীনের সকল বিধান কেউ তাকে জানিয়ে দেবে। এমন ব্যক্তি মুমিন। ইনশাআল্লাহ, সে জান্নাতে যাবে।
এর একটি উত্তম দৃষ্টান্ত হজরত ইউসুফ আ.। তিনি মিশরে ছিলেন। সেখানকার অধিবাসীরা কাফের ছিল। দ্বীনের যে সব বিধান তিনি জানতেন, সব প্রয়োগ করা সম্ভব ছিল না। তিনি তাদের ঈমান ও একত্ববাদের দাওয়াত দিয়েছেন। তারা সবাই কবুল করেনি। এরপরও তিনি তাদের শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ফেরাউন-পরিবারের মুমিনদের সম্পর্কে বলেন—
وَ لَقَدْ جَاءَكُمْ يُوسُفُ مِنْ قَبْلُ بِالْبَيِّنَتِ فَمَا زِلْتُمْ فِي شَكٍّ مِّمَّا جَاءَكُمْ بِهِ حَتَّى إِذَا هَلَكَ قُلْتُمْ لَنْ يَبْعَثَ اللَّهُ مِنْ بَعْدِهِ رَسُوْلًا
আর নিশ্চয় ইতিপূর্বে তোমাদের নিকট ইউসুফ আগমন করেছিলেন সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি নিয়ে। তা সত্ত্বেও তিনি যা নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছিলেন, তার বিষয়ে তোমরা সন্দেহেরই মাঝে রইলে। অবশেষে তিনি যখন মৃত্যুবরণ করলেন, তখন তোমরা বলতে শুরু করলে, আল্লাহ তার পরে আর কোনো রাসুল পাঠাবেন না।'১
এমনই আরেকজন বাদশা নাজাশি। তিনি ছিলেন খ্রিষ্টানদের বাদশা। কিন্তু তার সমগ্র জাতি তার সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেনি। ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন সামান্য কয়েকজন। ইসলামি শরীয়তের অনেক আইন, বলা চলে অধিকাংশই, সেখানে প্রবেশ করেনি। কারণ, তিনি এতে অক্ষম ছিলেন। তিনি হিজরত করেননি। জিহাদ করেননি। হজও করেননি। আমরা নিশ্চিত জানি, তার জন্য কুরআন অনুযায়ী শাসন করা সম্ভব ছিল না। এ দিকে আল্লাহ তায়ালা মদিনায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর এটা ফরজ করেছেন যে, আহলে কিতাবের কেউ এলে তার জন্যও আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী ফয়সালা করতে হবে। কিন্তু নাজাশি কুরআন অনুযায়ী শাসন করতে পারেননি। কারণ, তার জাতি এ ব্যাপারে তাকে সমর্থন করত না। অনেক সময় এমনও হয় যে, একটি সমাজে তাতারিরা আছে, মুসলমানও আছে। সেখানে একজন মুসলিম কাজি নিযুক্ত করা হল। কাজি সাহেব জানেন, ইনসাফ কোনটি! তার হৃদয়ে তা বাস্তবায়নের আকাঙ্ক্ষাও আছে, কিন্তু তার জন্য সেটি সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। অনেক প্রতিবন্ধকতা এসে পড়ে তার সামনে। আর আল্লাহ তায়ালা সামর্থ্যের বাইরে কাউকে কিছু চাপিয়ে দেন না। নাজাশি এবং তার মতো যারা আছেন, তারা সৌভাগ্যবান জান্নাতি-যদিও তারা পরিপূর্ণভাবে ইসলামি শরিয়ত বাস্তবায়ন করতে পারেননি, বরং শাসন করেছেন তাদের দেশে বাস্তবায়ন-সম্ভব এমন আইনের অনুসরণ করে।"১
টিকাঃ
২. অনেক আদিবাসী বেদুইন সমাজে নারীর শাসন চলে। সেখানে তারা নিজেদের মতো করে শাসনকার্য পরিচালনা করে। রানির বিধানই সেখানে আসল বিধান। (অনুবাদক)
১. সুরা নিসা, ৬৫।
২. মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাওয়িয়্যা, খ. ৫, পৃ. ১৩০-১৩১。
১. সুরা মুমিন, ৩৪。
১. মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাওয়িয়্যাহ, খ. ৫, পৃ. ১১১-১১৪।
📄 ইবনুল কায়্যিম রহ.
ইবনুল কাইয়িম রহ. কিতাবুস সালাতে বলেন, 'যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন সে অনুযায়ী ফয়সালা করবে না, তারাই কাফের'- এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি. বলেন, 'উদ্দেশ্য এর দ্বারা সেই কুফর নয়, যা তোমরা মনে করে থাক।"
তাউস রহ. বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি.-কে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, 'তার মাঝে এক ধরনের কুফরি আছে। কিন্তু এটি আল্লাহ তায়ালা, তাঁর রাসুলগণ, আল্লাহর কিতাবসমূহ ও ফেরেশতাদের অস্বীকার করার মতো কুফরি নয়।' তিনি আরও বলেন, 'এটি এমন কুফর নয়, যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়।' আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি. বলেছেন, 'এটি এমন কুফর নয়, যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়। হ্যাঁ, এমনটি করলে তার মাঝে এক ধরনের কুফর পাওয়া যাবে। কিন্তু এটি আল্লাহ তায়ালা, তাঁর রাসুলগণ, ফেরেশতা ও পরকাল অস্বীকার করার মতো নয়।"১
টিকাঃ
১. কিতাবুস সালাত, খ. ১, পৃ. ৬৯; মাদারিজুস সালিকিন, খ. ১, পৃ. ৩৪৫।
📄 ইবনে আবিল ইজ্জ আল-হানাফি রহ.
ইবনে আবিল ইজ্জ আল-হানাফি আকিদাতুত তহাবিয়্যার ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন, 'এখানে একটা বিষয় খুব ভালো করে বোঝার আছে। আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী শাসন না করা কখনও ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার মতো কুফরি হয়, কখনও এমন হয় না। কিন্তু তাকে মারাত্মক পর্যায়ের গুনাহ গণ্য করা হয়। এটি হয় শাসকের অবস্থা বিবেচনায়। শাসক যখন বিশ্বাস করে, আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী ফয়সালা করা ওয়াজিব নয় বা কোনো বিধানকে আল্লাহর বিধান জেনেও তা নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এটি বড় পর্যায়ের কুফরি। আর যদি আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করা ওয়াজিব বলে বিশ্বাস করে, এরপর পরকালে শান্তির উপযুক্ত হবে এটা স্বীকার করেও আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে অন্য আইনে শাসন করে, সে গুনাহগার। তাকে কাফের বলা হলেও সেটি রূপকার্থে বলা হবে অথবা বলা হবে, সে ছোট কুফর করেছে।'২
টিকাঃ
২. দশরহুল আকিদাতিত তহাবিয়্যা, ইবনে আবিল ইজ্জ আল-হানাফি, খ. ২, পৃ. ৪৪৬।