📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 কোনো এক শায়েখের অভিমত

📄 কোনো এক শায়েখের অভিমত


'জেনে-বুঝে কোনো মুসলমান যদি কুরআন-সুন্নাহর আইন ছাড়া অন্য কোনো আইনে বিচারপ্রার্থী হয়-সে কাফের। আল্লাহ বলেন-
أَفَغَيْرَ دِيْنِ اللَّهِ يَبْغُوْنَ
তবে কি ওরা আল্লাহর দ্বীন ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন অন্বেষণ করে?১
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ أَمَنُوْا بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوْتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوْا بِهِ
আপনি কি ওদের দেখেননি, যারা দাবি করে যে, আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, ওরা তার প্রতি ঈমান এনেছে? ওরা নিজেদের মামলা তাগুতের কাছে নিয়ে যেতে চায়, অথচ ওদের আদেশ করা হয়েছিল, যেন সুস্পষ্টভাবে তাকে অস্বীকার করে।৩
কুরআনে আরও এরশাদ হচ্ছে-
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُوْلًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوْتَ
নিশ্চয় আমি প্রত্যেক জাতির মাঝে রাসুল পাঠিয়েছি এ বার্তা দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে দূরে থাকো।৪

টিকাঃ
১. সুরা আলে ইমরান, ৮৩।
২. 'তাগুত'-এর শাব্দিক অর্থ-ঘোর অবাধ্য। কিন্তু এ শব্দটি শয়তানের জন্যেও ব্যবহৃত হয় এবং বাতিল ও মিথ্যার জন্যও। এ স্থলে শব্দটি দ্বারা এমন বিচারক ও শাসককে বোঝানো হয়েছে, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধানাবলির বিপরীত নিজ খেয়াল-খুশিমতো ফয়সালা দেয়। (তাওজিহুল কুরআন)
৩. সুরা নিসা, ৬০।
৪. সুরা নাহল, ৩৬।

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 পর্যালোচনা

📄 পর্যালোচনা


শায়খ দলিল হিসেবে তিনটি আয়াত এনেছেন। একটি আয়াতও এই প্রসঙ্গের নয়। প্রথম আয়াত, 'ওরা কি আল্লাহর দ্বীন ছাড়া অন্য দ্বীন অন্বেষণ করে?'-এটি অবতীর্ণ হয়েছে তাদের উদ্দেশ্যে, যাদের আল্লাহর রাসুলের প্রতি ঈমানই নেই। পূর্ণাঙ্গ আয়াতের পাঠ এই-
وَ إِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيْثَاقَ النَّبِيِّنَ لَمَا أَتَيْتُكُمْ مِّنْ كِتَبٍ وَ حِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُوْلٌ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَ لَتَنْصُرَنَّهُ قَالَ وَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَلِكُمْ اِصْرِى قَالُوا أَقْرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُمْ مِنَ الشُّهِدِينَ ﴿١﴾ فَمَنْ تَوَلَّى بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفُسِقُوْنَ ﴿۸۲﴾ أَفَغَيْرَ دِيْنِ اللَّهِ يَبْغُوْنَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَ الْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُوْنَ ﴿۸۳
স্মরণ করো, যখন আল্লাহ নবীদের থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, আমি তোমাদের যে কিতাব ও হেকমত দিয়েছি, এরপর যদি তোমাদের কাছে এমন কোনো রাসুল আসেন, যিনি তোমাদের কাছে যে কিতাব রয়েছে তার সত্যায়নকারী, তবে তোমরা অবশ্যই ওই রাসুলের প্রতি ঈমান আনবে, অবশ্যই তাকে সাহায্য করবে। আল্লাহ বলেন, তোমরা কি স্বীকার করলে, আমার অঙ্গীকার গ্রহণ করলে এ বিষয়ে? তারা বললেন, আমরা স্বীকার করলাম। তিনি বললেন, তবে তোমরা সাক্ষী থাকো, আমিও তোমাদের সঙ্গে সাক্ষী আছি। এরপরও যারা ফিরে যাবে, তারাই হল নাফরমান। তবে কি ওরা আল্লাহর দ্বীন ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন অন্বেষণ করে? অথচ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাঁরই আজ্ঞাবহ এবং তাঁরই কাছে তারা প্রত্যাবর্তিত হবে।'১
দ্বিতীয় আয়াতও এ বিষয়ে প্রমাণ হতে পারে না। কারণ, এই আয়াত নাজিল হয়েছে মুনাফিকদের ব্যাপারে। আল্লাহ বলেন-
اَلَمْ تَرَ اِلَى الَّذِيْنَ يَزْعُمُوْنَ اَنَّهُمْ اٰمَنُوْا بِمَا اُنْزِلَ اِلَيْكَ وَمَا اُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيْدُوْنَ اَنْ يَّتَحَاكَمُوْا اِلَى الطَّاغُوْتِ وَقَدْ اُمِرُوْا اَنْ يَّكْفُرُوْا بِهٖ * وَيُرِيْدُ الشَّيْطٰنُ اَنْ يُّضِلَّهُمْ ضَلٰلًا بَعِيْدًا ﴿٦٠﴾ وَاِذَا قِيْلَ لَهُمْ تَعَالَوْا اِلٰى مَا اَنْزَلَ اللّٰهُ وَ اِلَى الرَّسُوْلِ رَاَيْتَ الْمُنْفِقِيْنَ يَصُدُّوْنَ عَنْكَ صُدُوْدًا ﴿٦١﴾
আপনি কি ওদের দেখেননি, যারা দাবি করে যে, আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, ওরা তার প্রতি ঈমান এনেছে? ওরা নিজেদের মামলা তাগুতের কাছে নিয়ে যেতে চায়, অথচ ওদের আদেশ করা হয়েছে, যেন (সুস্পষ্টভাবে) তাকে অস্বীকার করে। শয়তান চায়, ওদের চরম গোমরাহিতে লিপ্ত করবে। যখন ওদের বলা হয়, আল্লাহ যে বিধান অবতীর্ণ করেছেন, তার দিকে ও রাসুলের দিকে আসো, তখন আপনি মুনাফিকদের দেখবেন, ওরা আপনার দিক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।১
তৃতীয় আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে মুশরিকদের সম্পর্কে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَقَالَ الَّذِيْنَ اَشْرَكُوْا لَوْ شَاءَ اللّٰهُ مَا عَبَدْنَا مِنْ دُوْنِهٖ مِنْ شَيْءٍ نَّحْنُ وَ لَا اٰبَآؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِنْ دُوْنِهٖ مِنْ شَيْءٍ كَذٰلِكَ فَعَلَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَهَلْ عَلَى الرُّسُلِ اِلَّا الْبَلٰغُ الْمُبِيْنُ ﴿٣٥﴾ وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِيْ كُلِّ اُمَّةٍ رَّسُوْلًا اَنِ اعْبُدُوا اللّٰهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوْتَ فَمِنْهُمْ مَّنْ هَدَى اللّٰهُ وَ مِنْهُمْ مَّنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلَلَةُ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ ﴿٣٦﴾
মুশরিকরা বলে, যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে তিনি ছাড়া অন্য কিছুর ইবাদত আমরাও করতাম না, আমাদের বাপ-দাদারাও না। আমরা তার নির্দেশ ছাড়া কোনো কিছু হারামও সাব্যস্ত করতাম না। এমনই করেছিল ওদের পূর্ববর্তীরা। বস্তুত রাসুলদের দায়িত্ব কেবল স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া। নিশ্চয় আমি প্রত্যেক জাতির মাঝে রাসুল পাঠিয়েছি এ বার্তা দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে দূরে থাকো। অতঃপর তাদের মাঝে কতক এমন, যাদের আল্লাহ হেদায়েত দান করেছেন আর কতক এমন, যাদের জন্য পথভ্রষ্টতা অবধারিত হয়ে গেছে। অতএব তোমরা জমিনের বুকে সফর করো, তারপর দেখো, কেমন হয়েছে অস্বীকারকারীদের পরিণাম!?
এ প্রসঙ্গেই খেটে যায় ধিকৃত হারুরিয়া খাওয়ারিজদের নিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাজি.-এর মন্তব্যটি। তিনি বলেন, 'তারা কাফেরদের প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হওয়া কিছু আয়াত নিয়ে তা মুমিনদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছে।'২
আর যদি মেনেও নিই যে, উল্লিখিত আয়াতগুলো মুমিনদের ব্যাপারে প্রয়োগ করা যায়, তা হলে সেই সর্বজনস্বীকৃত বক্তব্য তো রয়েছেই যে, এখানে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে তখন, যখন তারা এটাকে হালাল মনে করে করবে। কিন্তু এটাকে অবৈধ ও অন্যায় জেনে যদি করে, এর কারণে গুনাহগার হতে পারে, ইসলাম থেকে বের হওয়ার বিধান আরোপ করা যায় না।

টিকাঃ
১. সুরা আলে ইমরান, ৮১-৮৩。
১. সুরা নিসা, ৬০-৬১。
১. সুরা নাহল, ৩৫-৩৬।
২. বুখারি, প্রমাণ সাব্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর খাওয়ারিজ ও মুলহিদদের হত্যা অধ্যায়, খ. ৯, পৃ. ১৬。

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 কোনো এক শায়েখের অভিমত

📄 কোনো এক শায়েখের অভিমত


'আল্লাহর নাজিলকৃত আইন ব্যতীত অন্য আইনে শাসন করা কুফরি। এর কারণে মানুষ ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'বিধান একমাত্র আল্লাহরই।' তিনি আরও বলেন-'আর যারা আল্লাহর নাজিলকৃত আইনে ফয়সালা করে না, তারাই কাফের।' মানবরচিত আইনের প্রতি সন্তুষ্টি পোষণ এবং আইন প্রণয়ণের অধিকার দেয় এমন পার্লামেন্ট নির্বাচনকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেওয়াটাও কুফরির অন্তর্ভুক্ত।'

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 পর্যালোচনা

📄 পর্যালোচনা


আল্লাহর নাজিলকৃত আইন ব্যতীত অন্য কোনো আইনের শাসন আন্তরিক সন্তুষ্টির সঙ্গে গ্রহণ করে নেওয়া কুফরি। এর কারণে মানুষ ইসলামের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যায়। কোনো সন্দেহ নেই এতে। কিন্তু আন্তরিক সন্তুষ্টি ছাড়া মানবরচিত আইনে শাসন করা নিয়ে কথা আছে।
বুখারি ও মুসলিমে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'কোনো ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না। কোনো মদ্যপায়ী মুমিন অবস্থায় মদ পান করে না। কোনো চোর মুমিন অবস্থায় চুরি করে না।"১
এই হাদিসের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত একমত যে, যে ব্যক্তি এ ধরনের কাজ হালাল মনে করে কিংবা আল্লাহর হারামকৃত বিষয়কে ঠাট্টা করে বা হালকা মনে করে, সে নিঃসন্দেহে কাফের। কিন্তু যে বিশ্বাস করে, কাজগুলো হারাম, ভয়াবহ গুনাহ, কিন্তু প্রবৃত্তির তাড়নায় ও হারাম কাজ না করার ধৈর্যে ঘাটতি থাকায় এর যে কোনো কাজ করে ফেলে, সে গুনাহগার, কাফের নয়। হাদিসের ব্যাখ্যায় তখন বলা হয়, এ ধরনের কাজ করা অবস্থায় তার ঈমান সেই পর্যায়ের থাকে না, যা তাকে আল্লাহর শান্তি থেকে মুক্তি দিতে পারে।
আমাদের আলোচিত মাসআলায়ও সাধারণভাবে ধরেই বিধান আরোপ করে দেওয়া অনুচিত। বিষয়টি অবশ্যই ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। যে বিশ্বাস করে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শের চেয়ে অন্য কোনো আদর্শ অধিক পরিপূর্ণ, মানবকল্যাণের অধিক উপযোগী অথবা যে এ ধরনের বিধানকে আন্তরিক সন্তুষ্টিসহ গ্রহণ করে, সে কাফের। কিন্তু যার মাঝে এ ধরনের বিশ্বাস থাকে না, দুর্বলতাবশত বা প্রবৃত্তির তাড়নায় আল্লাহর আইন ছাড়া অন্য কোনো আইনে শাসন করে, সে কাফের নয়, এর কারণে তাকে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত গণ্য করাও অসম্ভব।
আল্লাহর আইন ব্যতীত অন্য আইনে শাসন কুফরি হওয়ার ব্যাপারে একটি হাদিস দিয়েও দলিল দেওয়া হয়। মাসরুক ইবনুল আজদা বলেন, 'এক লোক আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজি.-কে 'সুহত' সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তিনি বললেন, 'এটি হল ঘুষ।' লোকটি বলল, 'শাসনকার্যে জুলুমের বিধান কী?' তিনি বললেন, 'সেটি কুফর।' হাদিসটির সনদ সহিহ। এই হাদিসের কোনো এক সনদে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজি. এ কথা বলার পর এই আয়াত তেলাওয়াত করেন, 'যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের।'১ তাবারানি শরিফে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজি. থেকে অন্য এক সনদে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'শাসনকার্যে ঘুষগ্রহণ কুফরি। আর এই ঘুষটাই মানুষের মাঝে 'সুহত' নামে পরিচিত।'২
হাদিসে কুফর শব্দের ব্যবহার অনেক গুনাহের ব্যাপারে এসেছে। সাহাবায়ে কেরাম থেকে অলসতাবশত নামাজ-তকরকারীর ব্যাপারেও কাফের শব্দের প্রয়োগ হয়েছে। নামাজ তরকের অধ্যায়ে এ সংক্রান্ত আলোচনা চলে গেছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য বড় পর্যায়ের কুফরি নয়, ছোট পর্যায়ের কুফরি।
আল্লাহর আইন ব্যতীত শাসন করা যে বড় পর্যায়ের কুফরি নয়, বরং ছোট পর্যায়ের কুফরি, এ ব্যাপারে সামনে সালাফের কিছু বক্তব্য তুলে ধরা হচ্ছে:
'যারা আল্লাহর নাজিলকৃত আইনে ফয়সালা করে না, তারাই কাফের।'-এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি. বলেন, 'এর দ্বারা উদ্দেশ্য সেই কুফর নয়, যা তোমরা মনে করো।"১
সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ ইবনে আব্বাস রাজি.-এর কথার ব্যাখ্যায় বলেন, 'অর্থাৎ এর দ্বারা এমন কুফর উদ্দেশ্য নয়, যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।'
এক লোক আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি.-কে জিজ্ঞেস করল, 'যারা আল্লাহর আইন অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের'-কুরআনে তো এ সংক্রান্ত আয়াত আছে, তা হলে যারা এমনটি করবে, তারা কি কাফের হয়ে যাবে? ইবনে আব্বাস রাজি. বললেন, 'যখন কেউ এমনটি করবে, তার সঙ্গে এক ধরনের কুফর যুক্ত হবে; কিন্তু সে তার মতো নয়, যে আল্লাহ তায়ালা ও পরকালকে অস্বীকার করে।'
সারকথা, এই আয়াতের উপর্যুক্ত ব্যাখ্যা আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি. থেকে অনেকগুলো সনদে বর্ণিত। সনদের আধিক্যের কারণে বিষয়টির প্রমাণ্যতা সুদৃঢ় সাব্যস্ত হবে।
ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি. ও তার সঙ্গীরা 'যারা আল্লাহর নাজিলকৃত আইন অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের'-এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, 'এর দ্বারা উদ্দেশ্য এমন কুফর নয়, যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। তার এই বক্তব্য ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-সহ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অন্যান্য ইমামও গ্রহণ করেছেন।' এরপর ইবনে তাইমিয়া রহ. ইবনে আব্বাস রাজি.-এর এই তাফসিরের বেশ কয়েকটি সনদ উল্লেখ করেন।২
আতা ইবনে আবু রাবাহ রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'এর দ্বারা উদ্দেশ্য বড় পর্যায়ের কুফরি নয়, বরং ছোট কুফর। বড় পর্যায়ের জুলুম (শিরক) নয়, ছোট জুলুম (শিরক); বড় পর্যায়ের পাপাচার নয়, ছোট পাপাচার।'১
তাউস রহ. বলেন, 'এর দ্বারা উদ্দেশ্য এমন কুফর নয়, যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়।'২
উবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উতবা ইবনে মাসউদ রহ. বলেন, 'অনেক মানুষ এই আয়াতের এমন অপ্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা করে, যে ব্যাপারে আয়াত অবতীর্ণ হয়নি। এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে ইহুদিদের দুটি গোত্র বনু কুরায়জা ও বনু নাজির সম্পর্কে।'৩
আবদুর রহমান ইবনে জায়েদ ইবনে আসলাম, 'যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারা কাফের'–এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'যে আল্লাহর আইন ত্যাগ করে, স্বহস্তে রচিত আইন অনুযায়ী ফয়সালা করে, আর বলে যে, এটাই আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, সে অবশ্যই কুফরি করল।'৪
ইবনে আব্বাস রাজি. থেকে বর্ণিত প্রথম বর্ণনাটি সনদের দিক দিয়ে দুর্বল হলেও পরবর্তী আরও কয়েকটি দুর্বল বর্ণনা দ্বারা সেটি শক্তিশালী হিসেবে প্রমাণিত হয় এবং সেটি আরও শক্তিশালী হয় তার ছাত্র আতা, তাউস, উবায়দুল্লাহ ইবনে উতবা ইবনে মাসউদ রহ. প্রমুখের বর্ণনার মাধ্যমে।

টিকাঃ
১. বুখারি, ৫৫৭৮; মুসলিম, ১০০。
১. মুজামুল কাবির, তাবারানি, হাদিস-৯০৯৮; তাফসিরে ইবনে আবি হাতিম, হাদিস-৬৩৮১; মুসনাদে আবু ইয়ালা মাওসিলি, হাদিস-৫২৬৬।
২. আল-মুজামুল কাবির, হাদিস-৯১০০。
১. আত-তাফসির মিন সুনানি সাইদ ইবনে মানসুর, হাদিস-৭৪৯; ইবনে আবি হাতিম, ৬৪২৬; তাজিমু কাদরিস সালাহ, মুহাম্মাদ ইবনে নাসর আল-মারওয়াজি, ৫৬৯।
২. মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ৩১২。
১. তাফসিরে তাবারি, খ. ৮, পৃ. ৪৬৪; আখবারুল কুজাত, খ. ১, পৃ. ৪০।
২. তাফসিরে তাবারি, খ. ৮, পৃ. ৬৬।
৩. তাফসিরে তাবারি, খ. ৮, পৃ. ৪৫৭।
৪. তাফসিরে ইবনে আবু হাতিম, খ. ৪, পৃ. ১১৪২。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00