📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 উল্লেখিত মাসআলার ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের কিছু বক্তব্য

📄 উল্লেখিত মাসআলার ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের কিছু বক্তব্য


জাবির রাজি.-এর হাদিস থেকে যারা নামাজ-ত্যাগকারীর ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত কাফের হওয়া বুঝেছে, তাদের ব্যাপারে ইমাম তহাবি রহ. বলেন, 'এ ব্যাপারে আমাদের পক্ষ থেকে তাদের কথার উত্তর হচ্ছে, উল্লিখিত হাদিসে কুফর দ্বারা আল্লাহকে অস্বীকার করা বোঝায় এমন কুফর উদ্দেশ্য নয়। কুফর দ্বারা এখানে এর আভিধানিক অর্থ উদ্দেশ্য, তা হচ্ছে, ঢেকে দেওয়া। সে হিসেবে হাদিসে অর্থ হবে, এই কুফর নামাজ-তরককারীর ঈমানকে আচ্ছাদিত করে দেয়, গায়েব করে দেয়, এমনকি কুফর তার উপর প্রবল হয়ে তার ঈমানকে ঢেকে ফেলে।"১
ইবনে হিব্বান রহ. বুরাইদা রাজি.-এর হাদিসের উপর এই বিয়ষটি নিয়ে আলাদা একটি শিরোনাম করেছেন। তিনি বলেন, 'এই অধ্যায় এমন একটি শব্দের আলোচনা সম্পর্কে, হাদিস সম্পর্কে অগভীর জ্ঞানের অধিকারীরা যার কারণে নামাজ-ত্যাগকারীকে (যার সামনে নামাজের ওয়াক্ত এল, সে আদায় করল না, ওয়াক্ত চলে গেল) আল্লাহ তায়ালাকে অস্বীকারকারী সাব্যস্ত করেছে। এরপর তিনি হাদিস বর্ণনা করে, তার ব্যাখ্যায় বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে নামাজ-ত্যাগকারীর উপর কুফর শব্দ প্রয়োগ করেছেন। কারণ, নামাজ ত্যাগের মাধ্যমে মূলত কুফরের সূচনা ঘটে। মানুষ যখন নামাজ ত্যাগ করে ও তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন তার অবস্থা খারাপ হতে হতে অন্যান্য ফরজ ত্যাগের দিকে চলে যায়। এভাবে ত্যাগ করতে করতে এক সময় ফরজগুলো অস্বীকার পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছয়। এ জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুফরের সর্বশেষ পর্যায়, যা ফরজ অস্বীকারের মাধ্যমে অস্তিত্বে আসে, সেটি বোঝাতে গিয়ে কুফরের প্রথম পর্যায় অর্থাৎ নামাজ ত্যাগ করাকে উল্লেখ করেছেন। ২
হাম্বলি মাজহাবের বিশিষ্ট ফকিহ ইবনে কুদামা রহ. বলেন, 'নামাজ-ত্যাগকারীকে কাফের হয়ে যাওয়ার কারণে হত্যা করা হবে, না নামাজ ত্যাগের হদ৩ হত্যা হওয়ার কারণে হত্যা করা হবে, বিভিন্ন ধরনের বর্ণনা এসেছে এ ব্যাপারে। একটি বর্ণনা হচ্ছে, তাকে কাফের হওয়ার কারণে হত্যা করা হবে, যেমন মুরতাদকে হত্যা করা হয়। তাকে গোসল দেওয়া হবে না, কাফন পরানো হবে না, مسلمانوں কবরস্থানে দাফন করা হবে না, তার থেকে কেউ ওয়ারিস হবে না, সেও কারও ওয়ারিস হবে না। এই মত গ্রহণ করেছেন আবু ইসহাক ইবনে শাকলা ও ইবনে হামিদ। দ্বিতীয় বর্ণনা হচ্ছে, সে মুসলমান ঠিকই, কিন্তু নামাজ ত্যাগের নির্ধারিত শান্তি হত্যা, সেই কারণে তাকে হত্যা করা হবে—যেমন বিবাহিত জিনাকারীকে জিনার কারণে হত্যা করা হয়ে থাকে। এই বর্ণনা গ্রহণ করেছেন আবু আবদুল্লাহ ইবনে বাত্তা। তিনি নামাজ-ত্যাগকারীর কাফের হওয়ার বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন, এটাই মাজহাবের (হাম্বলি) নির্ভরযোগ্য মত। এ ব্যাপারে মাজহাবে কোনো মতভিন্নতা নেই। এ ছাড়া ব্যাপারটির উপর مسلمانوں ইজমা (ঐকমত্য) পাওয়া গেছে। কারণ, আমরা কোনো যুগেই এমন দেখিনি যে, একজন নামাজ-ত্যাগকারীরও গোসল বাদ দেওয়া হয়েছে, তার জানাজার নামাজ পড়া হয়নি, তাকে দাফন করা হয়নি, তার ওয়ারিসদের মিরাস থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বা তাকে ওয়ারিস হতে বাধা দেওয়া হয়েছে। নামাজ ত্যাগের কারণে স্বামী-স্ত্রীকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে, এমনটিও কোথাও পাওয়া যায়নি; অথচ নামাজ-ত্যাগকারীর সংখ্যা তো ভূরিভূরি। সে যদি কাফেরই হত, তার উপর এই সব বিধান অবশ্যই আরোপিত হত। বাকি এ ব্যাপারে যে হাদিসগুলো রয়েছে, তা ধমকি ও কাফেরদের সঙ্গে সাদৃশ্যের অর্থে ব্যবহার করা হবে। বাহ্যিক বাস্তবিক অর্থে নয়। দুটো মতের মাঝে এটাই সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত। আল্লাহ তায়ালাই সবচেয়ে ভালো জানেন।১
ইবনে আবিল ইজ্জ আল-হানাফি আকিদাতুত তহাবিয়্যার ব্যাখ্যাগ্রন্থে কবিরা-গুনাহকারীদের (নামাজ-ত্যাগকারীও যাদের একজন) সম্পর্কে বলেন, 'শরিয়তপ্রণেতা কখনও কোনো কোনো গুনাহকে কুফর বলেছেন। যেমন, আল্লাহ তায়ালা বলেন—
إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَنَةَ فِيْهَا هُدًى وَ نُوْرٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُوا لِلَّذِينَ هَادُوا وَالرَّيْنِيُّونَ وَالْأَحْبَارُ بِمَا اسْتُحْفِظُوْا مِنْ كِتَبِ اللَّهِ وَكَانُوا عَلَيْهِ شُهَدَاءَ فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ وَ لَا تَشْتَرُوا بِأَيْتِي ثَمَنًا قَلِيْلًا وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا اَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَفِرُوْنَ ﴿۲۲﴾
'আর যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, সে অনুযায়ী ফয়সালা না করে, তারা কাফের।'১ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'মুসলমানকে গালি দেওয়া পাপ আর হত্যা করা কুফর।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, 'যার মাঝে চারটি বিষয় পাওয়া যাবে, সে বাস্তবিক মুনাফিক; আর যার মাঝে চারটির কোনো একটি পাওয়া যাবে, তার মাঝে মুনাফিকির কোনো একটি নিদর্শন পাওয়া গেল, যতক্ষণ সে তা ত্যাগ না করে। (সেই চারটি বিষয় হচ্ছে,) যখন সে কথা বলে, মিথ্যা বলে; যখন ওয়াদা করে, তা ভঙ্গ করে; যখন চুক্তি করে, তাতে গাদ্দারি করে আর যখন ঝগড়া করে, তখন পাপাচার করে (অশিষ্ট কথা বলে)।' হাদিসে এসেছে, 'কোনো জিনাকারী জিনা করা অবস্থায় মুমিন থাকে না। কোনো চোর চুরি করা অবস্থায় মুমিন থাকে না। কোনো শরাবি শরার পান করা অবস্থায় মুমিন থাকে না।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'মুসলমান ও কুফরের মাঝে ব্যবধান হচ্ছে, নামাজ ত্যাগ করা।' তিনি আরও বলেন, 'আমার উম্মতের মাঝে দুটো খাসলত যার মাঝে থাকবে, এই দুই খাসলত থাকার কারণে তাদের কাফের বলে গণ্য করা হবে। একটি হচ্ছে, বংশ নিয়ে তিরস্কার করা; আরেকটি মৃত নিয়ে বিলাপ করা।'
আহলে সুন্নাতের সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, কবিরা- গুনাহকারীকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বহিষ্কৃত কাফের বলা যাবে না। তারা এ ব্যাপারেও একমত যে, সে ঈমান-ইসলাম থেকে বের হয়ে কুফরে পতিত হয় না এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামেরও উপযুক্ত হয় না। তারা একমত যে, সে এই গুনাহের কারণে কুরআন-হাদিসে বর্ণিত শান্তির উপযুক্ত হবে। এই সব ঐকমত্যের পর আহলে সুন্নতের মাঝে এ ব্যাপারে যে মতভেদ দেখা যায়, তা মূলত বিষয়টির ক্ষেত্রে প্রকাশগত (লফজি) মতভেদ, এটি বাস্তবে কোনো মতভেদ নয়। তাদের কেউ বলেন, এটি হচ্ছে কার্যগত কুফর, বিশ্বাসগত নয়। আবার কেউ বলেন, কুফর এখানে রূপকার্থে, প্রকৃত অর্থে নয়। কারণ, প্রকৃত বা বাস্তবিক অর্থের যেটা কুফর, তা তো তাকে ধর্ম থেকেই বের করে দেয়! উম্মতের ফকিহদের মাঝে এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই যে, গুনাহগার যদি আন্তরিক ও বাহ্যিক উভয়ভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তা স্বীকারকারী হয় সে কাফের নয়।'১
আমরা বলি, উপরে বর্ণিত কাজগুলো যদিও ইসলাম থেকে বের করে দেওয়ার মতো কুফর নয়, তাই বলে, এগুলোতে শিথিলতারও সুযোগ নেই; এগুলো ধ্বংসাত্মক কবিরা গুনাহ। যে সব কাজ শিরকের মাধ্যম হয় বা মুশরিকদের কাজের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে, সে সব কাজের ব্যাপারেও শিথিলতার সুযোগ নেই। শিরক ও শিরকের মাধ্যম থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।২

টিকাঃ
১. শরহু মুশকিলিল আসার, খ. ৮, পৃ. ২০০।
২. সহিহ ইবনে হিব্বান, খ. ৪, পৃ. ৩০৫, ৩২৪।
৩. শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত দণ্ডবিধি, যা কোনো শাসকের পরিবর্তনের অধিকার নেই। যেমন: চুরির জন্য হাত কাটা, মদ পানের জন্য আশিটি বেত্রাঘাত করা ইত্যাদি। (অনুবাদক)
১. আল-মুগনি, ইবনে কুদামা মাকদিসি, খ. ৩, পৃ. ৩৫৪-৩৫৯。
১. সুরা মায়েদা, ৪৪。
১. শরহুল আকিদাতিত তহাবিয়্যা, ইবনে আবিল ইজ্জ আল-হানাফি, খ. ২, পৃ. ৪০৯-৪৪৫।
২. অলসতাবশত নামাজ-ত্যাগকারী কাফের কি না, ব্যাপারটি নিয়ে লেখক আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। বিশেষত ইবনুল কাইয়িম রহ. এ ব্যাপারে যে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন, দলিল-প্রমাণের বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি সে আলোচনা খণ্ডনের চেষ্টা করেছেন। যেহেতু অলসতাবশত নামাজ-ত্যাগকারীর কাফের হওয়াটা শুধু হাম্বলি মাজহাবের একক মত এবং হাম্বলি মাজহাবেও এই মাসআলায় ভিন্নমত আছে, তাই বিষয়টি নিয়ে আমরা আর দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন মনে করিনি। নামাজের সর্বোচ্চ গুরুত্ব স্বীকার করেও তা অলসতাবশত ত্যাগ করলে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে, এই মত উম্মতের অধিকাংশ আলেম গ্রহণ করেননি। ওয়াল্লাহু আলাম। (অনুবাদক)

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.

📄 ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.


মুহাম্মদ ইবনে নাসর ইসমাইল বিন সাইদ শালানজি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে বারবার কবিরা-
গুনাহকারী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। ইমাম সাহেব তার উত্তর দিলেন। তার উত্তরে একটি কথা এমন ছিল যে, "কোনো ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না'-এই হাদিসের যে ব্যাখ্যা, ঠিক একই ধরনের ব্যাখ্যা এসেছে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি. থেকে 'যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের'-এই আয়াতের প্রসঙ্গেও।' শালানজি রহ. বলেন, 'আমি জিজ্ঞেস করলাম, তা হলে এটি কী ধরনের কুফর?' তিনি বললেন, 'এই কুফর ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। যেমন ঈমানের স্তরগুলো একটা আরেকটার চেয়ে ছোট-বড় হয়, তেমনটি কুফরের ক্ষেত্রেও হয়। ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে বলে গণ্য তখন করা হবে, যখন তার থেকে এমন বিষয় পাওয়া যাবে, যাতে আর কোনো মতভেদ না থাকে।"১

টিকাঃ
১. তাজিমু কদরিস সালাহ, মুহাম্মাদ ইবনে নাসর আল-মারওয়াজি, খ. ২, পৃ. ৫২৬।

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 ইবনে তাইমিয়া রহ.

📄 ইবনে তাইমিয়া রহ.


ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, 'যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করবে না- 'তারাই কাফের', 'তারাই জালেম', 'তারাই ফাসেক'। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি.-সহ আরও অনেক সালাফের থেকে এ সব আয়াতের তাফসিরে বর্ণিত হয়েছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য বড় পর্যায়ের কুফর নয়, বরং ছোট কুফর উদ্দেশ্য। তদ্রূপ বড় পাপাচার নয়, ছোট পাপাচার; বড় জুলুম নয়, ছোট জুলুম। এই একই বক্তব্য এসেছে ইমাম বুখারি ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. থেকেও।'২
তিনি আরও বলেন, 'যে ওয়াজিব পর্যায়ের ঈমান আনবে, সে সওয়াবের উপযুক্ত হবে। কখনও একজন মানুষ মুসলমান হওয়ার পরও তার সঙ্গে ছোট পর্যায়ের কোনো কুফর যুক্ত থাকতে পারে, যা তাকে পুরোপুরি ইসলাম থেকে বের করে দেয় না, যেমনটি ইবনে আব্বাস রাজি.-সহ আরও অনেক সাহাবায়ে কেরাম বলেছেন। অধিকাংশ সালাফের বক্তব্যও এমন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বিষয়টি স্পষ্টাকারে উল্লেখ করেছেন। এর একটি উদাহরণ হতে পারে, কুরআনের আয়াত 'যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের'-এই প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি.-এর মন্তব্য। তিনি বলেন, 'এটি এমন কুফর, যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না।"১

টিকাঃ
২. মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৭, পৃ. ৫২২。
১. প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ৩৫০।

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর নামে চালানো কথা ও বাস্তবতা

📄 ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর নামে চালানো কথা ও বাস্তবতা


যারা বলে, 'ইবনে তাইমিয়া রহ. আল্লাহর আইন ব্যতীত শাসন করলেই অবস্থা বিবেচনা না করে, সাধারণভাবে কাফের সাব্যস্ত করেন'-উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি তাদের মতের বিপরীত। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী শাসন করার আবশ্যকীয়তা যে অবিশ্বাস করবে, নিঃসন্দেহে সে কাফের। আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, তার অনুসরণ না করে, নিজে যেটা ন্যায় মনে করে, সেই অনুযায়ী শাসন করাকে যে হালাল মনে করবে, সেও কাফের। অধিকাংশ নামধারী মুসলিমের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমনই হয়। তারা আল্লাহর নাজিলকৃত আইন বাদ দিয়ে নিজেদের দেশাচার ও সংস্কৃতি অনুযায়ী শাসন করে-যেমন প্রান্তিক বেদুইন জনগোষ্ঠীর সম্রাজ্ঞীগণ। ২ বেদুইনরা তাদের আনুগত্য করে। সম্রাজ্ঞীরা সেখানে নিজেদের মতো করে শাসন করে আর মনে করে, কুরআন-সুন্নাহ নয়, নিজেদের এই আইনেই শাসন করা উচিত। এটি কুফরি। তাদের বোঝাতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালা যা নাজিল করেছেন, তা ব্যতীত শাসন করা বৈধ নয়। এরপরও যদি তারা সেটা না মানে, বরং আল্লাহর আইনের বিপরীত শাসন করাকে হালাল মনে করে, তারা কাফের বলে গণ্য হবে। অন্যথায় তাদের মূর্খ হিসেবে ধরে নেওয়া হবে।
মুসলমানরা যখন কোনো বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হবে, তাদের উপর আদেশ হচ্ছে, এর ফয়সালা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর ছেড়ে দেবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'অতএব আপনার রবের কসম, ওরা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না ওরা নিজেদের মাঝে সংঘটিত বিবাদের ক্ষেত্রে আপনাকেই বিচারক বানাবে। অতঃপর আপনার ফয়সালা সম্বন্ধে নিজেদের মনে কোনো সংকীর্ণতা বোধ করবে না এবং তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেবে।"১ নিজেদের মধ্যকার বিবাদে যারা আল্লাহ ও তার রাসুলকে ফয়সালাকারী না বানাবে, খোদ আল্লাহ তায়ালা শপথ করছেন যে, তারা ঈমান আনেনি। তবে, যারা আল্লাহর বিধানকে আন্তরিক ও বাহ্যিকভাবে নিজেদের জন্য আবশ্যক করে নেয়, কিন্তু তা পালন করে না, প্রবৃত্তির তাড়নায় আল্লাহর অবাধ্যতা করে, তারা গুনাহগারদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এই আয়াত দিয়ে খারেজিরা, যে সব শাসক আল্লাহর নাজিলকৃত আইন অনুযায়ী শাসন করে না, তাদের কাফের সাব্যস্ত করে। আর তারা বলে যে, তাদের এই বিশ্বাসটা (এমন শাসকদের কাফের বলা) আল্লাহরই আদেশ।'২
ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর বক্তব্যে একটি কথা এসেছে-'যারা বাহ্যিক ও আন্তরিকভাবে আল্লাহর বিধান মেনে নেওয়া আবশ্যক করে নিয়েছে, কিন্তু প্রবৃত্তির অনুসরণের কারণে অবাধ্যতা করে'; এটা তো স্পষ্ট যে, এর দ্বারা কার্যতভাবে আবশ্যক করে নেওয়া উদ্দেশ্য নয়। কারণ, এমনটি হলে তো তারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসন করছেই, তা হলে তাদের প্রবৃত্তির অনুসারী ও অবাধ্য হওয়ার প্রশ্ন আসে না। বাহ্যিক ও আন্তরিকভাবে মেনে নেওয়ার দ্বারা শায়খের উদ্দেশ্য মূলত এই মেনে নেওয়াটা শুধু মৌখিক দাবিই নয়, বরং মৌখিক ও আন্তরিক উভয়ভাবেই সে আল্লাহর বিধানকে মেনে নিয়েছে; এরপর প্রবৃত্তির অনুসরণের কারণে অবাধ্যতা করেছে। শায়খের কথাকে এভাবে বুঝতে হবে। অন্যথায় কথার পূর্বাপর মিল থাকবে না। এক কথার সঙ্গে অন্য কথার বৈপরীত্য দেখা দেবে।
ইবনে তাইমিয়া রহ. অন্যত্র বলেন, 'কেউ কাফেরদের রাষ্ট্রে থাকে, ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছে তার কাছে। সে জেনেছে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল। ঈমান এনেছে তাঁর উপর। ঈমান এনেছে তাঁর উপর যা নাজিল হয়েছে, সে সবের উপরও।
যথাসম্ভব আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে চলছে—যেমনটি হাবশার বাদশা নাজাশি করেছিলেন। তার ইসলামি রাষ্ট্রে হিজরত করার সুযোগ হয়নি, শরিয়তের সকল বিধান পালন করতে পারেননি। কারণ, তার জন্য হিজরত অসম্ভব ছিল। দ্বীনকে প্রকাশের মতো পরিবেশ ছিল না। তার এমন কোনো সুযোগও ছিল না যে, দ্বীনের সকল বিধান কেউ তাকে জানিয়ে দেবে। এমন ব্যক্তি মুমিন। ইনশাআল্লাহ, সে জান্নাতে যাবে।
এর একটি উত্তম দৃষ্টান্ত হজরত ইউসুফ আ.। তিনি মিশরে ছিলেন। সেখানকার অধিবাসীরা কাফের ছিল। দ্বীনের যে সব বিধান তিনি জানতেন, সব প্রয়োগ করা সম্ভব ছিল না। তিনি তাদের ঈমান ও একত্ববাদের দাওয়াত দিয়েছেন। তারা সবাই কবুল করেনি। এরপরও তিনি তাদের শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ফেরাউন-পরিবারের মুমিনদের সম্পর্কে বলেন—
وَ لَقَدْ جَاءَكُمْ يُوسُفُ مِنْ قَبْلُ بِالْبَيِّنَتِ فَمَا زِلْتُمْ فِي شَكٍّ مِّمَّا جَاءَكُمْ بِهِ حَتَّى إِذَا هَلَكَ قُلْتُمْ لَنْ يَبْعَثَ اللَّهُ مِنْ بَعْدِهِ رَسُوْلًا
আর নিশ্চয় ইতিপূর্বে তোমাদের নিকট ইউসুফ আগমন করেছিলেন সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি নিয়ে। তা সত্ত্বেও তিনি যা নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছিলেন, তার বিষয়ে তোমরা সন্দেহেরই মাঝে রইলে। অবশেষে তিনি যখন মৃত্যুবরণ করলেন, তখন তোমরা বলতে শুরু করলে, আল্লাহ তার পরে আর কোনো রাসুল পাঠাবেন না।'১
এমনই আরেকজন বাদশা নাজাশি। তিনি ছিলেন খ্রিষ্টানদের বাদশা। কিন্তু তার সমগ্র জাতি তার সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেনি। ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন সামান্য কয়েকজন। ইসলামি শরীয়তের অনেক আইন, বলা চলে অধিকাংশই, সেখানে প্রবেশ করেনি। কারণ, তিনি এতে অক্ষম ছিলেন। তিনি হিজরত করেননি। জিহাদ করেননি। হজও করেননি। আমরা নিশ্চিত জানি, তার জন্য কুরআন অনুযায়ী শাসন করা সম্ভব ছিল না। এ দিকে আল্লাহ তায়ালা মদিনায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর এটা ফরজ করেছেন যে, আহলে কিতাবের কেউ এলে তার জন্যও আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী ফয়সালা করতে হবে। কিন্তু নাজাশি কুরআন অনুযায়ী শাসন করতে পারেননি। কারণ, তার জাতি এ ব্যাপারে তাকে সমর্থন করত না। অনেক সময় এমনও হয় যে, একটি সমাজে তাতারিরা আছে, মুসলমানও আছে। সেখানে একজন মুসলিম কাজি নিযুক্ত করা হল। কাজি সাহেব জানেন, ইনসাফ কোনটি! তার হৃদয়ে তা বাস্তবায়নের আকাঙ্ক্ষাও আছে, কিন্তু তার জন্য সেটি সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। অনেক প্রতিবন্ধকতা এসে পড়ে তার সামনে। আর আল্লাহ তায়ালা সামর্থ্যের বাইরে কাউকে কিছু চাপিয়ে দেন না। নাজাশি এবং তার মতো যারা আছেন, তারা সৌভাগ্যবান জান্নাতি-যদিও তারা পরিপূর্ণভাবে ইসলামি শরিয়ত বাস্তবায়ন করতে পারেননি, বরং শাসন করেছেন তাদের দেশে বাস্তবায়ন-সম্ভব এমন আইনের অনুসরণ করে।"১

টিকাঃ
২. অনেক আদিবাসী বেদুইন সমাজে নারীর শাসন চলে। সেখানে তারা নিজেদের মতো করে শাসনকার্য পরিচালনা করে। রানির বিধানই সেখানে আসল বিধান। (অনুবাদক)
১. সুরা নিসা, ৬৫।
২. মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাওয়িয়‍্যা, খ. ৫, পৃ. ১৩০-১৩১。
১. সুরা মুমিন, ৩৪。
১. মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাওয়িয়্যাহ, খ. ৫, পৃ. ১১১-১১৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00