📄 ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর অবস্থান
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কবর ও মিম্বার স্পর্শ ও চুম্বনের মাধ্যমে বরকত গ্রহণ বৈধ মনে করতেন। বৈধ মনে করতেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চুল মোবারকের মাধ্যমে আরোগ্য লাভের প্রত্যাশাকেও।
আবদুল্লাহ ইবনে ইমাম আহমদ রহ. বলেন, 'আমি আমার পিতার কাছে জিজ্ঞেস করলাম, 'যে ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মিম্বার ও কবর স্পর্শ বা চুম্বনের মাধ্যমে বরকত লাভের প্রত্যাশা করে অথবা এ ধরনের কোনো কাজ করে প্রত্যাশা করে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের, তার ব্যাপারে আপনি কী বলেন?' তিনি বললেন, 'এতে কোনো সমস্যা নেই।"'৩
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর বক্তব্যের পর ইবনে তাইমিয়া রহ. বক্তব্যকে অদ্ভুত ছাড়া আর কী বলা যায়? তিনি বলেন, 'কবরে হাত রাখা, চুমু খাওয়া, কবরে চেহার ঘষা সর্বসম্মতভাবে নিষিদ্ধ, যদিও তা নবীদের কবর হোক না কেন। পূর্বসূরি আলেম ও ইমামদের কেউ এমনটি করেননি। এটা শিরক।"১
ইবনুল জাওজি রহ. মানাকিবুল ইমাম আহমদে বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবনে ইমাম আহমদ রহ. বলেন, 'আমি আমার পিতাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চুল মুখের উপর রেখে চুমু খেতে দেখেছি। মনে পড়ে, তাকে সেটি চোখের উপরও রাখতে দেখেছি। তিনি তা পানিতে ডুবিয়ে সেই পানি পান করে আরোগ্য প্রত্যাশা করতেন।'২
এখানে আমরা পাঠকের সামনে একটা প্রশ্ন রাখতে চাই! ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের একজন বড় ইমাম, বাস্তবেও তিনি অনেক বড়। আচ্ছা, তিনি যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মিম্বার ও কবর থেকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশ্বাস নিয়ে বরকত গ্রহণকে বৈধতা দিলেন, তিনি কি শিরক ও শিরকের মাধ্যম সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন? কীসে শিরক হয় আর কীসে হয় না, এটা না জেনেই কি তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চুল মোবারকের মাধ্যমে আরোগ্য কামনা করেছেন?৩
টিকাঃ
৩. আল-ইলাল ওয়া মারিফাতুর রিজাল, খ. ২, পৃ. ৪৯২。
১. মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ২৭, পৃ. ৯১-৯২।
২. মানাকিবুল ইমাম আহমদ, আবুল ফারাজ, আবদুর রহমান ইবনুল জাওজি, পৃ. ২৫৫।
৩. অবশ্য এগুলো দিয়ে ওলি-আওলিয়ার মাজারে গিয়ে তাদের কবরে চুমু খাওয়া বা মুখ ঘষার বৈধতা খোঁজার কোনো সুযোগ নেই। তাদেরকে সত্তাগতভাবে বরকতের মাধ্যম মনে করলে সেটা শিরক হবে। আর তা মনে না করলেও মাজার ও কবরে গিয়ে এমন ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ, এগুলো শিরকের দরজা খুলে দেয়। (অনুবাদক)
📄 অলসতাবশত নামাজ-ত্যাগকারী কাফের না হওয়ার দলিল
হাদিসে জিবরাইলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজকে ইসলামের রোকন বলেছেন, ঈমানের নয়। পূর্বে শাফায়াতের ব্যাপারে সহিহ হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে, তিনি বলেন, 'এরপর আমি চতুর্থবার সে সব প্রশংসাবাক্যে আল্লাহর প্রশংসা করব। আমি বলব, 'হে আমার রব, যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে, আমাকে তার ব্যাপারে অনুমতি দিন।' আল্লাহ তায়ালা বলবেন, 'আমার ইজ্জত, সম্মান ও বড়ত্বের শপথ, যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে, অবশ্যই আমি তাকে জাহান্নাম থেকে বের করব।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'এরপর আল্লাহ তায়ালা বলবেন-'ফেরেশতারা সুপারিশ করেছে, নবীরা সুপারিশ করেছে, সুপারিশ করেছে মুমিনরাও, এখন শুধু বাকি আছে পরম করুণাময়।' এরপর আল্লাহ তায়ালা তার কুদরতি থাবার এক থাবা-পরিমাণ মানুষ জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন। তাতে এমন সব মানুষ মুক্তি পাবে, যারা কখনও কোনো ভালো কাজ করেনি।' তিনি বলেন, 'তখন জান্নাতিরা বলবে-'এরা হল দয়াময় কর্তৃক মুক্তিপ্রাপ্ত দল।' আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে কোনো নেক আমল ও কল্যাণকর কাজ পরকালের জন্য সঞ্চিত না থাকাসত্ত্বেও মুক্তি দিয়েছেন।"১
বুখারি শরিফে আবু জর গিফারি রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'জিবরাইল আমার কাছে এসে বললেন, 'আপনার উম্মতকে সুসংবাদ দিন, যে আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক না করে ইন্তেকাল করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।"
মুসলিম শরিফে উসমান ইবনে আফফান রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যে আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, এই জ্ঞান নিয়ে (বিশ্বাস নিয়ে) মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।'২
মুসলিম শরিফে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যে আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক না করে ইন্তেকাল করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।'৩
হজরত আবু হুরায়রা রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'প্রত্যেক নবীর একটি দোয়ার সুযোগ রয়েছে, যা কবুল করা হবে। সব নবীই নিজের দোয়াটি দ্রুত করে ফেলবেন। আমি নিজের দোয়াটি গোপন রেখেছি। আমার দোয়া হবে, কেয়ামতের দিন উম্মতের সুপারিশের জন্য। আমার উম্মতের মাঝে যে আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক না করে ইন্তেকাল করবে, সে এই দোয়াটি লাভ করবে।"১
এর অর্থ হচ্ছে, যে শুধু কালেমায়ে তাওহিদ নিয়ে আল্লাহর দরবারে আসবে, যদিও সে কখনও কোনো নেক আমল না করে থাকে, সর্বশেষ সে এই শাফায়াত লাভ করবে এবং সে চিরস্থায়ী জাহান্নামি হবে না।
নামাজ ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আরও কিছু গুনাহকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুফর বলেছেন। সামনে ইবনে আবিল ইজ্জ রহ.- এর বক্তব্য উল্লেখ করার সময় সেটি আসবে। উম্মতের সকলে একমত যে, সে সব হাদিসে কুফর দ্বারা উদ্দেশ্য কর্মগত কুফর, যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয় না।
নামাজ তরক ছাড়া সাহাবায়ে কেরাম আর কোনো গুনাহের কারণে, সে গুনাহ যত বড়ই হোক না কেন, কোনো মুসলমানকে কাফের বলতেন না। নামাজ তরকের কারণে কাফের বলতেন; নামাজের সীমাহীন গুরুত্ব ও নামাজ ইসলামের রোকন হওয়া বোঝানোর জন্য তারা এই মারাত্মক গুনাহের জন্য সেই শব্দটিই প্রয়োগ করতেন, যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু এর দ্বারা এটা উদ্দেশ্য নয় যে, নামাজ-ত্যাগকারী ওই মুসলিম মুরতাদ হয়ে গেছে, ফলে তার জানাজার নামাজ পড়া হবে না এবং মুসলমানদের করবস্থানে তাকে দাফনও করা যাবে না।
টিকাঃ
১. বুখারি, ৬৪৪৩; মুসলিম, ৩৩।
২. মুসলিম, ৪৩।
৩. মুসলিম, ১৫০。
১. মুসলিম, ৩৩৮。
📄 উল্লেখিত মাসআলার ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের কিছু বক্তব্য
জাবির রাজি.-এর হাদিস থেকে যারা নামাজ-ত্যাগকারীর ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত কাফের হওয়া বুঝেছে, তাদের ব্যাপারে ইমাম তহাবি রহ. বলেন, 'এ ব্যাপারে আমাদের পক্ষ থেকে তাদের কথার উত্তর হচ্ছে, উল্লিখিত হাদিসে কুফর দ্বারা আল্লাহকে অস্বীকার করা বোঝায় এমন কুফর উদ্দেশ্য নয়। কুফর দ্বারা এখানে এর আভিধানিক অর্থ উদ্দেশ্য, তা হচ্ছে, ঢেকে দেওয়া। সে হিসেবে হাদিসে অর্থ হবে, এই কুফর নামাজ-তরককারীর ঈমানকে আচ্ছাদিত করে দেয়, গায়েব করে দেয়, এমনকি কুফর তার উপর প্রবল হয়ে তার ঈমানকে ঢেকে ফেলে।"১
ইবনে হিব্বান রহ. বুরাইদা রাজি.-এর হাদিসের উপর এই বিয়ষটি নিয়ে আলাদা একটি শিরোনাম করেছেন। তিনি বলেন, 'এই অধ্যায় এমন একটি শব্দের আলোচনা সম্পর্কে, হাদিস সম্পর্কে অগভীর জ্ঞানের অধিকারীরা যার কারণে নামাজ-ত্যাগকারীকে (যার সামনে নামাজের ওয়াক্ত এল, সে আদায় করল না, ওয়াক্ত চলে গেল) আল্লাহ তায়ালাকে অস্বীকারকারী সাব্যস্ত করেছে। এরপর তিনি হাদিস বর্ণনা করে, তার ব্যাখ্যায় বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে নামাজ-ত্যাগকারীর উপর কুফর শব্দ প্রয়োগ করেছেন। কারণ, নামাজ ত্যাগের মাধ্যমে মূলত কুফরের সূচনা ঘটে। মানুষ যখন নামাজ ত্যাগ করে ও তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন তার অবস্থা খারাপ হতে হতে অন্যান্য ফরজ ত্যাগের দিকে চলে যায়। এভাবে ত্যাগ করতে করতে এক সময় ফরজগুলো অস্বীকার পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছয়। এ জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুফরের সর্বশেষ পর্যায়, যা ফরজ অস্বীকারের মাধ্যমে অস্তিত্বে আসে, সেটি বোঝাতে গিয়ে কুফরের প্রথম পর্যায় অর্থাৎ নামাজ ত্যাগ করাকে উল্লেখ করেছেন। ২
হাম্বলি মাজহাবের বিশিষ্ট ফকিহ ইবনে কুদামা রহ. বলেন, 'নামাজ-ত্যাগকারীকে কাফের হয়ে যাওয়ার কারণে হত্যা করা হবে, না নামাজ ত্যাগের হদ৩ হত্যা হওয়ার কারণে হত্যা করা হবে, বিভিন্ন ধরনের বর্ণনা এসেছে এ ব্যাপারে। একটি বর্ণনা হচ্ছে, তাকে কাফের হওয়ার কারণে হত্যা করা হবে, যেমন মুরতাদকে হত্যা করা হয়। তাকে গোসল দেওয়া হবে না, কাফন পরানো হবে না, مسلمانوں কবরস্থানে দাফন করা হবে না, তার থেকে কেউ ওয়ারিস হবে না, সেও কারও ওয়ারিস হবে না। এই মত গ্রহণ করেছেন আবু ইসহাক ইবনে শাকলা ও ইবনে হামিদ। দ্বিতীয় বর্ণনা হচ্ছে, সে মুসলমান ঠিকই, কিন্তু নামাজ ত্যাগের নির্ধারিত শান্তি হত্যা, সেই কারণে তাকে হত্যা করা হবে—যেমন বিবাহিত জিনাকারীকে জিনার কারণে হত্যা করা হয়ে থাকে। এই বর্ণনা গ্রহণ করেছেন আবু আবদুল্লাহ ইবনে বাত্তা। তিনি নামাজ-ত্যাগকারীর কাফের হওয়ার বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন, এটাই মাজহাবের (হাম্বলি) নির্ভরযোগ্য মত। এ ব্যাপারে মাজহাবে কোনো মতভিন্নতা নেই। এ ছাড়া ব্যাপারটির উপর مسلمانوں ইজমা (ঐকমত্য) পাওয়া গেছে। কারণ, আমরা কোনো যুগেই এমন দেখিনি যে, একজন নামাজ-ত্যাগকারীরও গোসল বাদ দেওয়া হয়েছে, তার জানাজার নামাজ পড়া হয়নি, তাকে দাফন করা হয়নি, তার ওয়ারিসদের মিরাস থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বা তাকে ওয়ারিস হতে বাধা দেওয়া হয়েছে। নামাজ ত্যাগের কারণে স্বামী-স্ত্রীকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে, এমনটিও কোথাও পাওয়া যায়নি; অথচ নামাজ-ত্যাগকারীর সংখ্যা তো ভূরিভূরি। সে যদি কাফেরই হত, তার উপর এই সব বিধান অবশ্যই আরোপিত হত। বাকি এ ব্যাপারে যে হাদিসগুলো রয়েছে, তা ধমকি ও কাফেরদের সঙ্গে সাদৃশ্যের অর্থে ব্যবহার করা হবে। বাহ্যিক বাস্তবিক অর্থে নয়। দুটো মতের মাঝে এটাই সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত। আল্লাহ তায়ালাই সবচেয়ে ভালো জানেন।১
ইবনে আবিল ইজ্জ আল-হানাফি আকিদাতুত তহাবিয়্যার ব্যাখ্যাগ্রন্থে কবিরা-গুনাহকারীদের (নামাজ-ত্যাগকারীও যাদের একজন) সম্পর্কে বলেন, 'শরিয়তপ্রণেতা কখনও কোনো কোনো গুনাহকে কুফর বলেছেন। যেমন, আল্লাহ তায়ালা বলেন—
إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَنَةَ فِيْهَا هُدًى وَ نُوْرٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُوا لِلَّذِينَ هَادُوا وَالرَّيْنِيُّونَ وَالْأَحْبَارُ بِمَا اسْتُحْفِظُوْا مِنْ كِتَبِ اللَّهِ وَكَانُوا عَلَيْهِ شُهَدَاءَ فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ وَ لَا تَشْتَرُوا بِأَيْتِي ثَمَنًا قَلِيْلًا وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا اَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَفِرُوْنَ ﴿۲۲﴾
'আর যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, সে অনুযায়ী ফয়সালা না করে, তারা কাফের।'১ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'মুসলমানকে গালি দেওয়া পাপ আর হত্যা করা কুফর।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, 'যার মাঝে চারটি বিষয় পাওয়া যাবে, সে বাস্তবিক মুনাফিক; আর যার মাঝে চারটির কোনো একটি পাওয়া যাবে, তার মাঝে মুনাফিকির কোনো একটি নিদর্শন পাওয়া গেল, যতক্ষণ সে তা ত্যাগ না করে। (সেই চারটি বিষয় হচ্ছে,) যখন সে কথা বলে, মিথ্যা বলে; যখন ওয়াদা করে, তা ভঙ্গ করে; যখন চুক্তি করে, তাতে গাদ্দারি করে আর যখন ঝগড়া করে, তখন পাপাচার করে (অশিষ্ট কথা বলে)।' হাদিসে এসেছে, 'কোনো জিনাকারী জিনা করা অবস্থায় মুমিন থাকে না। কোনো চোর চুরি করা অবস্থায় মুমিন থাকে না। কোনো শরাবি শরার পান করা অবস্থায় মুমিন থাকে না।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'মুসলমান ও কুফরের মাঝে ব্যবধান হচ্ছে, নামাজ ত্যাগ করা।' তিনি আরও বলেন, 'আমার উম্মতের মাঝে দুটো খাসলত যার মাঝে থাকবে, এই দুই খাসলত থাকার কারণে তাদের কাফের বলে গণ্য করা হবে। একটি হচ্ছে, বংশ নিয়ে তিরস্কার করা; আরেকটি মৃত নিয়ে বিলাপ করা।'
আহলে সুন্নাতের সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, কবিরা- গুনাহকারীকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বহিষ্কৃত কাফের বলা যাবে না। তারা এ ব্যাপারেও একমত যে, সে ঈমান-ইসলাম থেকে বের হয়ে কুফরে পতিত হয় না এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামেরও উপযুক্ত হয় না। তারা একমত যে, সে এই গুনাহের কারণে কুরআন-হাদিসে বর্ণিত শান্তির উপযুক্ত হবে। এই সব ঐকমত্যের পর আহলে সুন্নতের মাঝে এ ব্যাপারে যে মতভেদ দেখা যায়, তা মূলত বিষয়টির ক্ষেত্রে প্রকাশগত (লফজি) মতভেদ, এটি বাস্তবে কোনো মতভেদ নয়। তাদের কেউ বলেন, এটি হচ্ছে কার্যগত কুফর, বিশ্বাসগত নয়। আবার কেউ বলেন, কুফর এখানে রূপকার্থে, প্রকৃত অর্থে নয়। কারণ, প্রকৃত বা বাস্তবিক অর্থের যেটা কুফর, তা তো তাকে ধর্ম থেকেই বের করে দেয়! উম্মতের ফকিহদের মাঝে এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই যে, গুনাহগার যদি আন্তরিক ও বাহ্যিক উভয়ভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তা স্বীকারকারী হয় সে কাফের নয়।'১
আমরা বলি, উপরে বর্ণিত কাজগুলো যদিও ইসলাম থেকে বের করে দেওয়ার মতো কুফর নয়, তাই বলে, এগুলোতে শিথিলতারও সুযোগ নেই; এগুলো ধ্বংসাত্মক কবিরা গুনাহ। যে সব কাজ শিরকের মাধ্যম হয় বা মুশরিকদের কাজের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে, সে সব কাজের ব্যাপারেও শিথিলতার সুযোগ নেই। শিরক ও শিরকের মাধ্যম থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।২
টিকাঃ
১. শরহু মুশকিলিল আসার, খ. ৮, পৃ. ২০০।
২. সহিহ ইবনে হিব্বান, খ. ৪, পৃ. ৩০৫, ৩২৪।
৩. শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত দণ্ডবিধি, যা কোনো শাসকের পরিবর্তনের অধিকার নেই। যেমন: চুরির জন্য হাত কাটা, মদ পানের জন্য আশিটি বেত্রাঘাত করা ইত্যাদি। (অনুবাদক)
১. আল-মুগনি, ইবনে কুদামা মাকদিসি, খ. ৩, পৃ. ৩৫৪-৩৫৯。
১. সুরা মায়েদা, ৪৪。
১. শরহুল আকিদাতিত তহাবিয়্যা, ইবনে আবিল ইজ্জ আল-হানাফি, খ. ২, পৃ. ৪০৯-৪৪৫।
২. অলসতাবশত নামাজ-ত্যাগকারী কাফের কি না, ব্যাপারটি নিয়ে লেখক আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। বিশেষত ইবনুল কাইয়িম রহ. এ ব্যাপারে যে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন, দলিল-প্রমাণের বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি সে আলোচনা খণ্ডনের চেষ্টা করেছেন। যেহেতু অলসতাবশত নামাজ-ত্যাগকারীর কাফের হওয়াটা শুধু হাম্বলি মাজহাবের একক মত এবং হাম্বলি মাজহাবেও এই মাসআলায় ভিন্নমত আছে, তাই বিষয়টি নিয়ে আমরা আর দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন মনে করিনি। নামাজের সর্বোচ্চ গুরুত্ব স্বীকার করেও তা অলসতাবশত ত্যাগ করলে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে, এই মত উম্মতের অধিকাংশ আলেম গ্রহণ করেননি। ওয়াল্লাহু আলাম। (অনুবাদক)
📄 ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.
মুহাম্মদ ইবনে নাসর ইসমাইল বিন সাইদ শালানজি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে বারবার কবিরা-
গুনাহকারী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। ইমাম সাহেব তার উত্তর দিলেন। তার উত্তরে একটি কথা এমন ছিল যে, "কোনো ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না'-এই হাদিসের যে ব্যাখ্যা, ঠিক একই ধরনের ব্যাখ্যা এসেছে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি. থেকে 'যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের'-এই আয়াতের প্রসঙ্গেও।' শালানজি রহ. বলেন, 'আমি জিজ্ঞেস করলাম, তা হলে এটি কী ধরনের কুফর?' তিনি বললেন, 'এই কুফর ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। যেমন ঈমানের স্তরগুলো একটা আরেকটার চেয়ে ছোট-বড় হয়, তেমনটি কুফরের ক্ষেত্রেও হয়। ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে বলে গণ্য তখন করা হবে, যখন তার থেকে এমন বিষয় পাওয়া যাবে, যাতে আর কোনো মতভেদ না থাকে।"১
টিকাঃ
১. তাজিমু কদরিস সালাহ, মুহাম্মাদ ইবনে নাসর আল-মারওয়াজি, খ. ২, পৃ. ৫২৬।