📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 কোনো এক শায়েখের অভিমত

📄 কোনো এক শায়েখের অভিমত


'আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, 'এমন হলে নিশ্চয় তোমরা তাদের মতো।' এখানে আয়াতের বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য। কেউ যদি শোনে যে, আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করা হচ্ছে, তা নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করা হচ্ছে, এরপরও সে ঠাট্টাকারী কাফেরদের মজলিসে বসে থাকে; না তাকে বসে থাকতে কোনো প্রকার বাধ্য করা হয়েছে, না সে কোনো অসন্তোষ প্রকাশ করেছে, না সে এই আলোচনা চলাকালীন মজলিস বয়কট করে অন্য প্রসঙ্গে আলোচনা শুরুর পর বসেছে—এই ব্যক্তি তাদেরই মতো কাফের। যদিও সে নিজে ঠাট্টা-মশকরা করেনি, তবুও। কারণ, তার এই কাজ কুফরির প্রতি সন্তুষ্টি পোষণ প্রমাণ করে। কুফরির প্রতি সন্তুষ্টি পোষণও কুফরি।'

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 পর্যালোচনা

📄 পর্যালোচনা


কুফরির প্রতি সন্তুষ্টি পোষণ কুফরি। কোনো সন্দেহ নেই এতে। কিন্তু বাধ্য করা, অসন্তোষ প্রকাশ করা বা অন্য প্রসঙ্গে আলোচনা শুরুর আগ পর্যন্ত উঠে যাওয়া ছাড়া সেখানে বসে থাকার কারণে, সেও তাদের মতো কাফের হয়ে যাবে—সব সময় এমনটি হয় না। কারণ, শুধু বসে থাকার দ্বারা কুফরির প্রতি সন্তুষ্টি প্রমাণ হয় না। কুফরির প্রতি সন্তুষ্টি পোষণসহ বসে থাকা আর অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বসে থাকার মাঝে অনেক পার্থক্য রয়েছে। যদিও যে উদ্দেশ্যে উঠে না গিয়ে বসে থাকল, উদ্দেশ্যটা পাপ কাজের হোক না কেন!
পাপ কাজের উদ্দেশ্যে বসে থাকলে তো কাজটা জায়েজ নেই, স্পষ্ট; কিন্তু পাপ কাজের উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে যদি বসে থাকে, সেটা কি জায়েজ হবে? নাকি যে কোনো উদ্দেশ্যেই হোক, বাধ্যকরণ ও অসন্তোষ প্রকাশ ছাড়া সাধারণভাবে সেখানে বসে থাকাটাই নাজায়েজ? এখানে সে প্রসঙ্গ আলোচ্য বিষয় নয়। আলোচ্য বিষয় বিষয়টি ইসলাম থেকে বের করে দেওয়ার মতো কুফরি কি না?
এখানে মূলত আয়াতের পূর্বাপর এড়িয়ে গিয়ে কথা বলা হয়েছে। কুরআনে পূর্বে আলোচনা চলছিল মুনাফিকদের নিয়ে। কোনো কথার বিশেষ একটা অংশকে পূর্বাপর সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে বুঝতে যাওয়া সঠিক নয়। না এটা আরবি ভাষায় বৈধ, না অন্য কোনো ভাষায়। আগে আমরা পুরো আয়াতটি দেখে নেব, এরপর মুফাসসিরগণ কী বলেছেন, তাও উল্লেখ করব।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَ قَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتٰبِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ أَيْتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَ يُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنْفِقِينَ وَالْكُفِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا ﴿۱۴۰﴾ *
আর তিনি তো কিতাবে তোমাদের প্রতি এ হুকুম অবতীর্ণ করেছেন যে, যখন তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহ সম্পর্কে শুনবে যে, তা অস্বীকার করা হচ্ছে, তখন তোমরা ওদের সঙ্গে বসবে না, যতক্ষণ না ওরা অন্য কোনো কথায় মশগুল হয়। যদি বসো, তবে সে ক্ষেত্রে তোমরাও ওদেরই মতো হয়ে যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ মুনাফিক ও কাফেরদের সকলকে জাহান্নামে একত্র করবেন।'১
অধিকাংশ তাফসিরবিদ এ আয়াত থেকে কী বুঝেছেন? তারা বলছেন, এখানে উদ্দেশ-তাদের কুফর ও কুরআনের আয়াত নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপের প্রতি সন্তুষ্টি নিয়ে বসে থাকা। অসন্তুষ্টিসহ বসে থাকা আয়াতের উদ্দেশ্য নয়।
ইবনে আবি হাতিম বলেন, মুকাতিল ইবনে হাইয়ান বলেছেন, 'যদি তোমরা বসে থাক ও তাদের কুরআন নিয়ে ঠাট্টা-মশকারায় সন্তুষ্ট হও- তা হলে তোমরা তাদের মতো।"১ মুকাতিল ইবনে হাইয়ান নির্ভরযোগ্য তাবেয়িদের একজন।
ইবনে জারির তাবারি রহ. এই আয়াতের তাফসিরে বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা বলছেন, যখন শুনবে যে, আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করা হচ্ছে, তা নিয়ে হাসি-তামাশা করা হচ্ছে, তখন তোমরা সেখানে বসো না; তবে অন্য প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু হলে বসতে সমস্যা নেই। যে সব মুনাফিকরা এই অবস্থায়ও সেখানে বসে থাকবে, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। এবং আল্লাহ তায়ালার বাণী-(যদি বসো,) তা হলে তোমরাও তাদেরই মতো'-এর অর্থ হল, যদি তোমরা সেই অবস্থায় না উঠে যাও, তা হলে তোমাদের কাজটাও তাদেরই মতো হল। কারণ, তোমরা তাদের সঙ্গে সেখানে বসে থেকে আল্লাহর অবাধ্যতা করেছ, যেমন তারা অবাধ্যতা করেছে আল্লাহর আয়াত নিয়ে হাসি-তামাশা করে। তারা যেভাবে আল্লাহর অবাধ্যতা করেছে, তোমরাও সেভাবে আল্লাহর অবাধ্যতা করলে। এমনটি হলে আল্লাহর অবাধ্যতা ও তাঁর নিষেধ করা কাজ করার ক্ষেত্রে তোমরাও তাদেরই মতো।'২
ওয়াহিদি রহ. বলেন, 'আল্লাহ তায়ালার বাণী-(যদি বসো,) সে ক্ষেত্রে তোমরাও ওদেরই মতো হয়ে যাবে।
অর্থাৎ, তাদের কুফরি কাজ ও কুরআনের প্রতি ঠাট্টা-মশকরার প্রতি হৃদয়ে সন্তুষ্টি পোষণসহ যদি তোমরা বসে থাক, (তা হলে তোমরাও তাদের মতো)।'৩
ইবনুল জাওজি রহ. জাদুল মাসিরে বলেন, 'এখানে সাদৃশ্যটা আসলে কোন ক্ষেত্রে? দুটি বক্তব্য রয়েছে এ ব্যাপারে। একটি হচ্ছে, অবাধ্যতার ক্ষেত্রে সাদৃশ্য। দ্বিতীয় বক্তব্য, সাদৃশ্য হচ্ছে তাদের অবস্থার প্রতি সন্তুষ্টি পোষণের ক্ষেত্রে। কারণ, কাফেরের সঙ্গে বসলেই সে কাফের নয়।"১
ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি রহ. মাফাতিহুল গাইবে বলেন, 'মুফাসসিরগণ বলেন, মুশরিকরা তাদের বিভিন্ন বৈঠকে কুরআন নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করত, আল্লাহ তায়ালা তখন আয়াত নাজিল করেন
وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي ايْتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ
তুমি যখন তাদের দেখবে, যারা আমার আয়াতসমূহ সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলে, তখন ওদের কাছ থেকে দূরে সরে যাবে-যে পর্যন্ত না ওরা অন্য কোনো কথায় মশগুল হয়।২
এ আয়াত নাজিল হয়েছে মক্কায়। এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরত করেছেন। এখানকার ইহুদি পণ্ডিতরাও মক্কার মুশরিকদের মতো একই কাজ করত। তাদের সঙ্গে যারা বসত, সহমত প্রকাশ করত, তারা ছিল মুনাফিক। আল্লাহ তায়ালা সেই মুনাফিকদের সম্বোধন করে বলছেন-
وَ قَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتٰبِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ أَيْتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَ يُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنْفِقِينَ وَالْكُفِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيْعًا ﴿١٢٠﴾ *
আর তিনি তো কুরআনে তোমাদের প্রতি এ হুকুম অবতীর্ণ করেছেন যে, যখন তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহ সম্পর্কে শুনবে যে, তা অস্বীকার করা হচ্ছে এবং তাকে উপহাস করা হচ্ছে, তখন তোমরা ওদের সঙ্গে বসবে না, যতক্ষণ না ওরা কুফর ও উপহাস ছাড়া অন্য কথায় মশগুল না হয়।
এরপর আল্লাহ তায়ালা বলেন—
إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ (যদি বসো,) সে ক্ষেত্রে তোমরাও ওদেরই মতো হয়ে যাবে।
এর অর্থ হচ্ছে, হে মুনাফিকরা, তোমরাও কুফরির ক্ষেত্রে ওই ইহুদি পাদরিদের মতো। উলামায়ে কেরام বলেন, এর দ্বারা প্রমাণ হয়, যে কুফরির প্রতি সন্তুষ্টি পোষণ করবে, সে কাফের। এই বিধান তখন আরোপিত হবে, যখন তাদের সঙ্গে সন্তুষ্টচিত্তে বসে থাকবে। তবে, তাদের বক্তব্যের প্রতি অসন্তোষসহ যদি বসে থাকে কিংবা কোনো ভয়-ভীতির কারণে বসে থাকে—তখন কুফরের বিধান আরোপিত হবে না।'১

টিকাঃ
১. সুরা নিসা, ১৪০。
১. তাফসিরে ইবনে আবি হাতিম, খ. ৪, পৃ. ১০৯৩।
২. তাফসিরে তাবারি, খ. ৯, পৃ. ৩২০।
৩. আল-ওয়াজিজ, আবুল হাসান আলি ইবনে আহমদ আল-ওয়াহিদি, পৃ. ২৯৬。
১. জাদুল মাসির, খ. ১, পৃ. ৪৮৮।
২. সুরা আনআম, ৬৮。
১. মাফাতিহুল গাইব (তাফসিরে কাবির), ইমাম আবু বকর আর-রাজি, খ. ১১, পৃ. ২৪৭ [সংক্ষেপিত]।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00