📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারও সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না

📄 আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারও সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না


মুশরিকরা মৃত নেককারদের থেকে সুপারিশ প্রত্যাশা করে। তারা বিশ্বাস করে, নেককার পূর্বপুরুষেরা নিজেরাই সুপারিশের ক্ষমতা রাখে। কুরআনুল কারিমের অনেক আয়াতে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সুপারিশের মালিক নয়। তিনি যাকে ইচ্ছা সুপারিশ করার ক্ষমতা প্রদান করেন। বান্দারা তাঁরই অনুমতিক্রমে সুপারিশ করবে। বুজর্গ, ফেরেশতা বা অন্য কেউ আল্লাহ তায়ালার অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করতে পারবে না।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَلَا يَمْلِكُ الَّذِينَ يَدْعُوْنَ مِنْ دُونِهِ الشَّفَاعَةَ إِلَّا مَنْ شَهِدَ بِالْحَقِّ وَ هُمْ يَعْلَمُوْنَ ﴿٨٦﴾
আল্লাহ তায়ালাকে ছাড়া তারা যাদের ডাকে, তারা সুপারিশের মালিক নয়। তবে যারা সত্য উপলব্ধি করে সাক্ষ্য দেয় (আল্লাহর অনুমতিক্রমে তারা সুপারিশ করতে পারবে)।'
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
يَوْمَئِذٍ لَّا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِي لَهُ قَوْلًا .
দয়াময় যাকে অনুমতি দেবেন আর যার কথা তিনি পছন্দ করবেন, তাদের ছাড়া আর কারও সুপারিশ সে দিন কাজে আসবে না।১
কুরআনে আরও এরশাদ হচ্ছে-
وَلَا تَنْفَعُ الشَّفَاعَةُ عِنْدَةً إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ
তিনি যাকে অনুমতি দেবেন, তার সুপারিশ ছাড়া অন্য কারও সুপারিশ কাজে আসবে না।২
কিছু শায়খের বক্তব্যে যে অস্পষ্টতা দেখা যায়, এই আয়াতগুলোতেই তার সমাধান রয়েছে। যে বিশ্বাস করবে, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্য কেউ নিজেই সুপারিশের মালিক-সে মুশরিক, ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত। মুশরিকদের আকিদা এমনই ছিল। কিন্তু যে তাদের থেকে এই বিশ্বাস নিয়ে সুপারিশের প্রত্যাশা করবে যে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা না নিজেদের জন্য কিছু করতে পারে, না অন্যের জন্য-সে মুশরিক নয়।

টিকাঃ
১. সুরা জুখরুফ, ৮৬。
১. সুরা ত্বহা, ১০৯।
২. সুরা সাবা, ২৩。

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 মুসলমানদের ব্যাপারে আয়াত নাজিল হওয়ার বর্ণনা

📄 মুসলমানদের ব্যাপারে আয়াত নাজিল হওয়ার বর্ণনা


আমর ইবনে দিনার ইকরিমা থেকে ও তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি. থেকে বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি. বলেন, 'মক্কার কিছু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল। নিজেদের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি গোপন রেখেছিল তারা। বদরের যুদ্ধের সময় মুশরিকরা তাদের নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যায়। তাদের অনেকে জখম হয়, অনেক হয় নিহত। তখন মুসলমানরা বলে, আমাদের ওই সব সঙ্গীরা মুসলমান ছিল। আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য তাদেরকে জোর করা হয়েছে। অতএব তোমরা তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করো। এই প্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাজিল করেন।'১
এই হাদিসের সনদ জায়্যিদ-উত্তম। বক্তব্যটি ইবনে আব্বাস রাজি.-এর কি না, এই বিষয়টি শক্তভাবে প্রমাণিত নয়, ত্রুটিযুক্ত। বিশুদ্ধ হচ্ছে, এটি তার আজাদকৃত দাস ইকরিমা রহ.-এর বক্তব্য।

টিকাঃ
১. তাফসিরে তাবারি, খ. ৯, পৃ. ১০২, হাদিস-১০২৬০; তাফসিরে ইবনে আবু হাতিম, খ. ৩, পৃ. ১০৪৬, হাদিস-৫৮৬৩。

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 মুশরিক ও মুনাফিকের ব্যাপারে আয়াত নাজিল হওয়ার বর্ণনা

📄 মুশরিক ও মুনাফিকের ব্যাপারে আয়াত নাজিল হওয়ার বর্ণনা


এর বিপরীত বক্তব্য পাওয়া যায় মুজাহিদ ইবনে জাবর, জাহহাক, আবদুর রহমান ইবনে জায়েদ ইবনে আসলাম প্রমুখ বর্ণনাকারী থেকে।
তাদের মতে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে বদরে নিহত দুর্বল কুরাইশ কাফেরদের ব্যাপারে।১
সালাবি রহ. আল-কাশফু ওয়াল বয়ানে বলেন, 'এই আয়াত মক্কার এমন কিছু লোকের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, কিন্তু হিজরত করেনি। তারা ইসলাম বাইরে প্রকাশ করেছে, ভেতরে ছিল মুনাফিকি। বদরের যুদ্ধের সময় তারা কাফেরদের পক্ষে লড়াইয়ে বের হয়েছে। যখন উভয় পক্ষ মুখোমুখি হয়েছে, মুসলমানদের সংখ্যা কম দেখে তাদের নিয়ে এমনও মন্তব্য করেছে যে, 'এদের দ্বীন এদের প্রবঞ্চিত করেছে।' এরপর তারা বদরে নিহত হয়েছে। তাদের নিয়ে কুরআন বলছে, 'ফেরেশতারা তাদের চেহারা ও পশ্চাদ্দেশে প্রহার করেছে।"
মাক্কি ইবনে আবু তালিব আল-হিদায়া ইলা বুলুগিন নিহায়াতে বলেন, 'বর্ণিত আছে, এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে এমন কিছু লোকের ব্যাপারে, যারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় থাকতেই মুসলমান হয়েছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করলে তারা ইসলাম ত্যাগ করে। তাদের মাতা-পিতা, পরিবার-পরিজনের কারণে তারা এই ফেতনায় পড়ে যায়। তাদের কেউ কেউ এই অবস্থায় বহাল থাকে। ইতিমধ্যে বদর যুদ্ধের সময় আসে। মুশরিকরা তাদের বাণিজ্য-কাফেলার হেফাজতে বের হলে তারাও মুশরিকদের সঙ্গে বের হয়। তারা বলে, যদি দেখি, মুহাম্মদের দল ভারী, আমরা তার সঙ্গে যোগ দেব। আর তারা যদি সংখ্যায় স্বল্প হয়, আমরা থেকে যাব আমাদের দলের সঙ্গেই। বদরে যখন উভয় পক্ষ মুখোমুখি হল, তারা দেখল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দলে লোক কম। ফলে তারা মুশরিকদের সঙ্গেই থেকে গেল। তাদের অনেকে নিহত হল। এই উপলক্ষ্যেই বলা হয়েছে, ‘...নিজেদের উপর জুলুম করা অবস্থায় ফেরেশতারা যাদের জান কবজ করেছে...।"
ইবনে কাসির রহ. তাফসিরে ইবনে কাসিরে বলেন, ‘এই আয়াত মক্কায় মুশরিকদের মাঝে থেকে যাওয়া মানুষের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। আয়াতের ক্ষেত্র ব্যাপক। হিজরতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও যারা দ্বীনের ক্ষেত্রে দুর্বল হওয়ার কারণে হিজরত করেনি, তারা এর অন্তর্ভুক্ত। সর্বসম্মতিক্রমে তারা হারাম কাজ করে জুলুম করেছে।

টিকাঃ
১. তাফসিরে তাবারিতে মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'এই আয়াত বদর যুদ্ধে নিহত হওয়া দুর্বল কুরাইশ কাফেরদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।' জাহহাক রহ.-এর বর্ণনাটিও এসেছে তাফসিরে তাবারিতে, তিনি এই আয়াত সম্পর্কে বলেন, 'তারা ছিল কিছু মুনাফিক। রাসুল সা.-এর পিছনে থেকে গিয়েছিল। হিজরত করেনি মদিনায়। কুরাইশদের সঙ্গে বদর যুদ্ধে শরিক হয়েছে। এরপর বদরে যা হওয়ার তা হয়েছে।' আবদুর রহমান ইবনে জায়েদ বলেন, 'রাসুল সা. নবুওতপ্রাপ্ত হলে ইসলাম গ্রহণ যেমন বৃদ্ধি পেতে লাগল, অন্য দিকে কিছু মানুষের মাঝে মুনাফিকিও দেখা দিতে লাগল। তারা রাসুল সা.-এর কাছে এসে বলল, আমরা এই লোকদের (কুরাইশ) ভয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে পারছি না। ইসলাম গ্রহণ করলে তারা আমাদের শান্তি দেবে, এই করবে, সেই করবে। বদর যুদ্ধের সময় মুশরিকরা বলল, কেউ যদি আমাদের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়া থেকে বিরত থাকে, তার বাড়িঘর ভেঙে দেব, সম্পদ জব্দ করে নেব। তখন যারা রাসুল সা.-এর কাছে এসে এই কথা বলেছিল, তারাও কুরাইশদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। তাদের কিছু যুদ্ধে নিহত হয়, কিছু হয় বন্দি। যারা বন্দি হল, তারা বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি জানেন, আমরা আপনার কাছে এসেছিলাম। আমরা সাক্ষ্য দিই যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, আপনি আল্লাহর রাসুল। কিন্তু তাদের সঙ্গে আমরা বের হয়েছি ভয়ে। এরপর তাদের ব্যাপারে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (তাফসিরে তাবারি, খ. ৯, পৃ. ১০৬-১১০)

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 আয়াতের তাফসির

📄 আয়াতের তাফসির


তা হলে আয়াতের অর্থ কী? কুরআনের যে আয়াত (আর তোমাদের মধ্যে যে কেউ ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, সে ওদেরই মধ্যে গণ্য হবে), এর অর্থ হচ্ছে, যে তাদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক স্থাপন করবে। যদি কেউ বাহ্যিকভাবে তাদের সঙ্গে ওঠা-বসা করে, লেনদেন করে, কিন্তু আন্তরিক সম্পর্ক স্থাপন না করে, সে ঈমানের গণ্ডিতেই থাকবে। কিন্তু তার ঈমান হবে অনেক দুর্বল। হাদিসের ভাষায়, 'যদি তাও সক্ষম না হও, তা হলে হৃদয় দ্বারা (ঘৃণা করো)। এটা ঈমানের দুর্বলতম স্তর।'২
ইবনে জারির তাবারি রহ. সুদ্দি রহ. থেকে বর্ণনা করেন, 'উহুদ যুদ্ধের সাময়িক বিপর্যয় কিছু মানুষের কাছে খুব ভারী হয়ে দেখা দিল। তারা তাদের উপর কাফেরদের চেপে বসার ভয় পাচ্ছিল। তাদের একজন নিজের সঙ্গীকে বলল, আমি ইহুদিদের বসতিতে চলে যাব, তাদের থেকে নিরাপত্তা গ্রহণ করব ও ইহুদি হয়ে যাব। আমার ভয় হচ্ছে, ইহুদিরা আমাদের উপর চেপে বসবে। আরেকজন বলল, শাম দেশের অমুক খ্রিষ্টানের সঙ্গে মিলিত হব, তার থেকে নিরাপত্তা গ্রহণ করব আর তার সঙ্গে গ্রহণ করে নেব খ্রিষ্টান ধর্মকে। এরপর আল্লাহ তায়ালা তাদের এমন ক্রিয়াকলাপ নিষেধ করে আয়াত নাজিল করলেন-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُوْدَ وَ النَّصْرَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَ مَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ.
হে ঈমানদারগণ, তোমরা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। যে তাদের কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে, সে তাদেরই মধ্য থেকে গণ্য হবে। নিশ্চয় আল্লাহ জালেমদের হেদায়েত দান করেন না।"১
ইবনে তাইমিয়া রহ. কাফেরদের সঙ্গে সম্পর্কের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, 'কখনও কারও কোনো কাফেরের সঙ্গে ভালোবাসা থাকে আত্মীয়তা সম্পর্কের কারণে কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে, এটা গুনাহ, ঈমানে ঘাটতি আসে এর দ্বারা; কিন্তু এতটুকু ভালোবাসায় মানুষ কাফের হয়ে যায় না।' ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর বক্তব্য আর তার অনুসারী হিসেবে পরিচিতদের বক্তব্যের মাঝে কত ব্যবধান! তারা বলে, যার হৃদয়ে কাফেরদের প্রতি ভালোবাসা থাকবে, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে, আর এটা বলে সাধারণভাবে, কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই। এই বক্তব্য সঠিক নয়।

টিকাঃ
২. মুসলিম, ৭৮。
১. তাফসিরে তাবারি, খ. ১০, পৃ. ৩৯৭。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00