📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 ইমাম আহমদ রহ.-এর অভিমত

📄 ইমাম আহমদ রহ.-এর অভিমত


ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন—‘একবার আমি হজে যাচ্ছিলাম। পদব্রজে। চলতে চলতে পথ হারিয়ে ফেললাম। তখন আমি বলতে লাগলাম, ‘হে আল্লাহর বান্দারা, আমাকে পথ দেখিয়ে দাও।’ বারবার বলছিলাম এ কথা, এরই মধ্যে আমি পথ খুঁজে পেলাম।’১ ঘটনার বর্ণনাকারী আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর নিজ পুত্র আবদুল্লাহ।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. মূলত একটি হাদিসের উপর আমল করেছেন। হাদিসটি মাওকুফ। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘বনি আদমের হেফাজতকারী ফেরেশতা ছাড়াও আল্লাহর কিছু অতিরিক্ত ফেরেশতা আছে। তারা গাছের পাতাপল্লবের হিসাব রাখে। সফরে চলতি পথে তোমাদের কারও কোনো সমস্যা হলে, সে যেন বলে, ‘(হে ফেরেশতারা,) তোমরা আল্লাহর বান্দাদের সাহায্য করো। আল্লাহ তোমাদের উপর দয়া করুন।’২
এই বর্ণনার সনদে সমস্যা রয়েছে। হাদিসটি মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাতেও এসেছে। সেখানকার বর্ণনাটি মুরসাল ও মারফু; ইবনে আব্বাস রাজি. সরাসরি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিকে সম্পৃক্ত করে কথাটি বলেছেন। তিনি কার থেকে শুনেছেন, সেটি উল্লেখ করেননি।
তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘জনমানবহীন প্রান্তরে তোমাদের কারও বাহনজন্তু হারিয়ে গেলে, সে যেন বলে, ‘হে আল্লাহর বান্দারা, সাহায্য করো। নিশ্চয় সত্বর তাকে সাহায্য করা হবে।’৩ বিশুদ্ধ হচ্ছে, হাদিসটি মাওকুফ। বক্তব্যটি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর।
ইমাম বায়হাকি রহ. হাদিসটি বর্ণনা করার পর বলেন, ‘হাদিসটি মাওকুফ; আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি.-এর বক্তব্য। তবে, নেককার উলামায়ে কেরাম এর উপর আমল করেছেন। তাদের অভিজ্ঞতায় এটি সত্য প্রমাণিত হয়েছে।"১
মুহাদ্দিসগণ এর বিষয়বস্তু অস্বীকার করা ছাড়াই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। কেউ হাদিসের উপর আপত্তি তুলেছেন বলে নজরে পড়েনি। কাউকে এই হাদিসের বিষয়বস্তুও অস্বীকার করতে দেখা যায়নি। অতএব, হাদিসে বর্ণিত কাজটি যে শিরক নয়, এটা স্পষ্ট।
এখানে এ কথা বলা অবান্তর যে, ইমাম আহমদ রহ. আল্লাহকে না ডেকে তার বান্দাদের কেন ডাকলেন? কারণ, আল্লাহকে ডাকা আর বান্দাকে ডাকার মাঝে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য থাকে। আল্লাহকে ডাকা হয় রব হিসেবে, উপায়-উপকরণের মালিক বিশ্বাস করে; পক্ষান্তরে বান্দাকে ডাকা হয়, শুধু উপায়-উপকরণ গ্রহণের মানসিকতা থেকে। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. যেন আল্লাহকেই ডাকছিলেন। যেন তিনি বলছিলেন—হে আমার রব, আপনি যে সব বান্দাদের বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করার জন্য নিয়োজিত করে রেখেছেন, যাদের অনুমতি দিয়ে রেখেছেন নিজের পক্ষ থেকে—তাদের সাহায্যে আমার বিপদ দূর করে দিন।

টিকাঃ
১. শুয়াবুল ঈমান, বায়হাকি, ৭৬৯৭।
২. শুয়াবুল ঈমান, বায়হাকি, ১৬৭।
৩. মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, ২৯৮১৯。
১. আল-আদাব, বায়হাকি, ৬৫৭।

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 এ ইমামগণ কি শিরকের যাথার্থ্যসমূহ সম্পর্কে অনবগত ছিলেন?

📄 এ ইমামগণ কি শিরকের যাথার্থ্যসমূহ সম্পর্কে অনবগত ছিলেন?


ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. হাদিসের উপর আমল করেছেন। বর্ণনা করেছেন তার পুত্র আবদুল্লাহ। বায়হাকি রহ. বলেছেন, ‘এটি বুজুর্গদের কাছে পরীক্ষিত।’ আবু বকর ইবনে আবি শায়বা, বাজ্জার, আবু ইয়ালা, তাবারানি, ইবনুস সুন্নি, দারাকুতনি, বায়হাকি রহিমাহুমুল্লাহ-সহ আরও অনেকে হাদিসটি নিজেদের কিতাবে নিয়ে এসেছেন। তারা অবশ্যই শিরক ও শিরকের মাধ্যম সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এই হাদিসে শিরকের কিছু থাকলে উলামায়ে কেরাম অবশ্যই বর্ণনা করতেন।
উপর্যুক্ত হাদিসের আলোকে ফেরেশতাদের কাছে সাহায্য চাওয়ার বৈধতা পাওয়া গেল। মুসলমানদের একটা দল, হোক না তারা ভ্রান্ত ও বাতিলপন্থি, ফেরেশতা ছাড়াও ওলি-আওলিয়াদের কাছে সাহায্য চাওয়া জায়েজ মনে করে; যদিও তাদের এই জায়েজ মনে করাটা ঠিক নয়। যাদের কাছে সাহায্য চায়, তাদেরকে স্বতন্ত্র ক্ষমতাসম্পন্ন মনে করলে স্পষ্ট শিরক হবে। কিন্তু স্বতন্ত্র ক্ষমতাসম্পন্ন মনে না করলে কাজটি ইসলাম থেকে বের করে দেওয়ার মতো বড় পর্যায়ের শিরক হবে না।
আমরা আবারও বলছি, আমাদের আলোচ্য বিষয়ের বৈধতা প্রমাণ করা নয়, আমাদের কথা—এ ধরনের কাজ বড় পর্যায়ের শিরক কি না, সেটা নিয়ে। তবে এই ধরনের কাজ যে গুনাহের ও নিষিদ্ধ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
কেউ আল্লাহ তায়ালার কোনো নবীকে ডাকল, বা তার কোনো ওলিকে ‘ইয়া সাইয়েদি, মদদ, মদদ’ বলে ডাকল। তার বিশ্বাস, তারা নিজেরাই কোনো কিছু দেওয়া বা না-দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, তারা নিজেরাই উপকার বা ক্ষতিসাধন করতে পারে—তবে সে মুশরিক।
কেউ যদি এই বিশ্বাস নিয়ে ডাকে যে, তারা নিজেরা কিছু করতে পারে না, তবে তাদের আত্মা রুহের জগতে সন্তরণ করে, আল্লাহর অনুমতিসাপেক্ষে বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করে—এর উপর বড় পর্যায়ের শিরকের বিধান আরোপ করা সম্ভব নয়। কারণ, সে এই বক্তব্যের মাধ্যমে পালনকর্তা ও উপাস্যরূপে কাউকে আল্লাহর শরিক সাব্যস্ত করেনি।'১
ইমাম আজুররি রহ. আলি রাজি. সম্পর্কে বলেন, 'তিনি ছিলেন আরবের দক্ষ অশ্বারোহী ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিপদ-দূরকারী।"১
আরবি বাগধারা ও রূপকের ব্যবহার সম্পর্কে অজ্ঞ লোকদের আজুররি রহ.-কে কাফের না বলে পারবে না। অথচ ইমাম জাহাবি রহ. তার সম্পর্কে বলেন, 'তিনি ইমাম, মুহাদ্দিস, অনুসরণীয়।'২
আজুররি রহ. যদি আলি রা.-কে স্বতন্ত্রভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিপদ-দূরকারী বিশ্বাস করেন, এটা যে শিরক, তা কারও কাছে অস্পষ্ট হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এটা কি কল্পনা করাও সম্ভব? নিঃসন্দেহে তিনি বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ তায়ালা আলি রা.-কে শক্তি ও বীরত্ব দান করেছিলেন, তিনি কাফেরদের বিরুদ্ধে বীর- বিক্রমে যুদ্ধ করতেন, তাদের অনিষ্ট প্রতিরোধ করতেন; এতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সংকট দূর হত। আল্লাহ তায়ালা সংকট দূরীকরণে আলি রা. কে মাধ্যম বানিয়েছিলেন মাত্র।

টিকাঃ
১. এখানে সুফি শায়খ আহমদ রিফায়ি (মৃত্যু: ৫৭৮) রহ.-এর কিছু কথা আলোচনা করে নেওয়া প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, 'আত্মা-জগতের কেউ কোনো মাখলুকের জন্য স্বাধীনভাবে কিছু করতে পারে না।' (কালাইদুজ জাবারজাদ, পৃ. ২০, হেকমত নং ৮۳)
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, 'কিছু মানুষ পির-মাশায়েখদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করে। মনে করে, পির-মাশায়েখরা নিষ্পাপ। তাদের থেকে এমন কিছু প্রত্যাশা করে, যা কেবল আল্লাহর কাছেই প্রত্যাশা করা যায়। তোমরা এমন করো না। আল্লাহ তায়ালা আত্মমর্যাদাশীল। তাঁর সত্তাগত কোনো ব্যাপারে বান্দাকে প্রবেশ করানো তিনি পছন্দ করেন না। হ্যাঁ, বুজুর্গরা পথপ্রদর্শক। তারা আল্লাহর দিকে পথ দেখিয়ে থাকেন। আল্লাহর পথে চলার ক্ষেত্রে মাধ্যম তারা। রাসুল সা. ও সাহাবাদের অবস্থা কেমন ছিল, আমরা তাদের দেখে সেটা শিখতে পারি। আল্লাহ তায়ালা যেহেতু তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তাই এর উসিলা দিয়ে আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। আল্লাহ যাদের ভালোবাসেন, তাদের তিনি লাঞ্ছিত করেন না। তিনি পরম করুণাময়।' (হালাতু আহলিল হাকিকাতি মাআল্লাহ)
তিনি আরও বলেন, 'তোমরা যখন আল্লাহর কোনো বান্দা বা ওলির কাছে সাহায্য চাইবে, সরাসরি তাদের থেকে সাহায্য পাওয়ার বিষয়টি মনে স্থান দেবে না। এটা শিরক। তবে, আল্লাহ তায়ালা যেহেতু তাদের ভালোবাসেন, তাদের উসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে পারো। কারণ, অনেক বিক্ষিপ্ত চুলওয়ালা, ফাটা-পুরনো লেবাসওয়ালা, মানুষের দরজা থেকে প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তি এমন আছেন, যারা আল্লাহর নামে কোনো শপথ করলে আল্লাহ তায়ালা সেটা পূরণ করেন।' (আল-বুরহানুল মুয়াইয়াদ) (লেখক)
এই টীকা আত্মাদের সাহায্য করার কোনো বিশুদ্ধ দলিল হতে পারে না। এর দ্বারা শুধু এতটুকুই প্রমাণ করা চলে যে, কেউ না কেউ এই মতটি ব্যক্ত করেছেন। (অনুবাদক)
১. আশ-শরিয়াহ, আজুররি, খ. ৪, পৃ. ১৭৫৬, আলি রা.-এর খেলাফত অধ্যায়।
২. সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৬, পৃ. ১৩৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00