📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 সম্পূরক সংযোজন

📄 সম্পূরক সংযোজন


কিছুক্ষণ পূর্বে আমরা একটি কথা বলেছি, ঈমানের জন্য ঈমানের বিষয়াবলি শুধু সত্য বলে বিশ্বাস করাই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে বিশ্বাসের বিপরীত সব কিছু থেকেও নিজেকে মুক্ত করতে হবে। বিষয়টি আরেকটু বিস্তারিত আকারে উপস্থাপন করলে পাঠকের বুঝতে সুবিধা হবে। এ জন্য আমরা ঈমান সবার আগে কিতাব থেকে বিষয়টি উদ্ধৃত করছি।
মাওলানা আবদুল মালেক সাহেব দা. বা. বলেন-ঈমান শুধু গ্রহণ নয়, বর্জনও। সত্যকে গ্রহণ আর বাতিলকে বর্জন। কোনো আকিদা মেনে নেওয়ার পাশাপাশি তার বিপরীত বিষয়কেও সঠিক মনে করা স্ববিরোধিতা। মানবের সুস্থ বুদ্ধি তা গ্রহণ করতে পারে না। ইসলামেও তা অগ্রহণীয়। ঈমান তখনই সাব্যস্ত হবে, যখন বিপরীত সব কিছু বাতিল ও মিথ্যা মনে করবে এবং তা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। সকল প্রকার কুফর ও শিরক থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা সরাসরি ঈমানেরই অংশ। যেমন ঈমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাওহিদ। তাওহিদ কি শুধু আল্লাহ তায়ালাকে মাবুদ মানা? না, তা নয়। তাওহিদ অর্থ, একমাত্র আল্লাহ তায়ালাকে সত্য মাবুদ বলে বিশ্বাস করা এবং আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে বা কোনো কিছুকে মাবুদ বলে স্বীকার না করা।
তাওহিদ অর্থ-আল্লাহ তায়ালারই ইবাদত করা, আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত না করা। তাওহিদ অর্থ-উপায়-উপকরণের ঊর্ধ্বে র বিষয়ে শুধু আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাওয়া, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে সাহায্য না চাওয়া। তাওহিদের অর্থ-একমাত্র আল্লাহকেই কল্যাণ-অকল্যাণের, হায়াত-মওতের মালিক মনে করা, অন্য কাউকে এ সব বিষয়ে ক্ষমতাশীল মনে না করা। তাওহিদ অর্থ- শুধু আল্লাহকে আহকামুল হাকিমিন মনে করা, আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে কারও হুকুম স্বীকার না করা। তাওহিদ অর্থ-শুধু শরিয়তে মুহাম্মদিয়ার আনুগত্যকেই অপরিহার্য মনে করা, অন্য কোনো শরিয়তের আনুগত্য বৈধ মনে না করা। তাওহিদ অর্থ-শুধু ইসলামকেই হক ও সত্য মনে করা, অন্য কোনো দ্বীনকে হক ও সত্য মনে না করা।
মোটকথা, সব জরুরিয়তে দ্বীন (দ্বীনের সর্বজনবিদিত বিষয়) এবং অকাট্য আকিদা ও আহকাম এই প্রকারেরই অন্তর্ভুক্ত। এ সব বিষয় ঈমান তখনই সাব্যস্ত হবে, যখন তার বিপরীত বিষয়কে বাতিল ও মিথ্যা বলে বিশ্বাস করা হবে। আর তা থেকে তাবাররি (সম্পর্কহীনতা) অবলম্বন করা হবে। এ সব তো 'মুজতাহাদ ফি' (যাতে শরিয়তের দলিলের ভিত্তিতে একাধিক মত হতে পারে) বা 'তানাওউয়ে সুন্নত' (যাতে একাধিক সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি রয়েছে)-এর ক্ষেত্র নয় যে, বিপরীত দিকটিকেও গ্রহণযোগ্য বা নীরবতার যোগ্য মনে করা যায়।"১

টিকাঃ
১. ঈমান সবার আগে, মাওলানা আবদুল মালেক, পৃ. ১৫।

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 ‘তাকফির’ বিষয়ে কতিপয় শায়েখের বক্তব্য ও তার পর্যালোচনা

📄 ‘তাকফির’ বিষয়ে কতিপয় শায়েখের বক্তব্য ও তার পর্যালোচনা


কিতাবটি পর্যালোচনামূলক। ‘তাকফির’ বিষয়ে প্রচলিত আছে নানা জনের নানা মত। বাড়াবাড়ি যেমন আছে, আছে শিথিলতাও। লেখক এখান থেকে এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন শায়খের বক্তব্য উল্লেখ করে সেগুলোর ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পর্যালোচনা উপস্থাপন করবেন। কারও বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করবেন, কারও বক্তব্য খণ্ডন করবেন। তবে, একেবারে নির্মোহ ভাষায়, কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের উক্তির আলোকে। আশা করা যায়, পাঠ শেষে তাকফির বিষয়ে পাঠক নানা প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত থাকার রসদ খুঁজে পাবেন। আল্লাহই সর্বোত্তম তাওফিকদাতা। (অনুবাদক)

টিকাঃ
১. এটি আরবি ক্রিয়ামূলের একটি অধ্যায় ‘বাবে তাফয়িল’-এর মাসদার। অর্থ, কাউকে কাফের সাব্যস্ত করা। সংক্ষিপ্ততার জন্য আমরা শব্দটির বাংলা না করে, মূল শব্দটিই অনুবাদে ব্যবহার করব। (অনুবাদক)

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 মাখলুকের নামে শপথ করা

📄 মাখলুকের নামে শপথ করা


মাখলুককে ডাকার প্রায় কাছাকাছি মাসআলা, মাখলুকের নামে শপথ করা। কারণ, শপথের মাধ্যমে, যার নামে শপথ করা হয়, তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়।২
ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, 'মুসলমান মাখলুকের নামে শপথ করতে পারে না-এটা শিরক। মাখলুকের নামে শপথ, যেমন-কাবা শরিফ, ফেরেশতা, পির-মাশায়েখ, রাজা-বাদশা ও এমন কারও নামে শপথ করা।৩
তিনি আরও বলেন, 'শপথ দুই প্রকার: এক. মুসলিমদের শপথ। দুই. অমুসলিমদের শপথ।
মাখলুকের নামে শপথ করা, যেমন-ফেরেশতা, পির-মাশায়েখ, কাবা শরিফ ইত্যাদির নামে শপথ মুশিরকদের শপথ। এটা মুসলমানদের শপথ নয়।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নামে শপথ করল, সে কুফরি করল।l'৪ ইমাম তিরমিজি রহ. হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। বুখারি ও মুসলিম শরিফে এসেছে, 'শপথ যদি করতেই হয়, আল্লাহর নামে করবে, না হয় চুপ থাকবে।১ মাখলুকের নামে শপথ করলে সেটি শপথ হিসেবে গণ্য হবে না। তা ভঙ্গ করলে, কাফফারাও দিতে হবে না।'

টিকাঃ
১. মাখলুক মানে সৃষ্ট বস্তু। আল্লাহ ছাড়া আর সবই মাখলুক। মাখলুকের নামে শপথ করা দ্বারা উদ্দেশ্য, আল্লাহ ছাড়া অন্য যে কোনো কিছুর নাম নিয়ে কসম খাওয়া বা কিরা কাটা। (অনুবাদক)
২. কেউ কোনো কাজ বা বক্তব্যকে গুরুত্ববহ করে তোলার জন্য সম্মানিত কারও নামে শপথ করে বক্তব্যটি উপস্থাপন করে। যেমন কেউ বলল, 'আল্লাহর কসম, কিছুতেই আমি এমনটি করব না বা আল্লাহর কসম, এমনটি আমি করবই।' এখানে আমাদের আলোচ্য বিষয়, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্য কারও নাম নিয়ে এ ধরনের কসম খাওয়া বা শপথ করা। (অনুবাদক)
৩. মাজমুউল ফাতাওয়া, খ. ৩৪, পৃ. ২০৮。
৪. সুনানে তিরমিজি, ১৫৩৫。
১. বুখারি, ২৬৭৯; মুসলিম, ১৬৪৬।

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর কথার পর্যালোচনা

📄 ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর কথার পর্যালোচনা


কিন্তু কখনও এমন হয় যে, কোনো শপথকারী নেককার কোনো মাখলুকের নামে শপথ করে। তার উদ্দেশ্য হয়, আল্লাহ তায়ালা এই বান্দাকে যে বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন, সেটা উপলক্ষ্য করে শপথ করা। এটা কুফর নয়। কারণ, এই মানসিকতায় শপথ করলে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা সাব্যস্ত হয় না। তবে এটা জায়েজ আছে কি না, সেটা ভিন্ন মাসআলা।
দুটো ক্ষেত্রে ব্যক্তির বিশ্বাসের মাঝে অবশ্যই পার্থক্য করতে হবে। কোন ব্যক্তিকে খোদার স্তরে রেখে শপথ করল আর কোন ব্যক্তির প্রতি খোদার অনুগ্রহ স্মরণ করে শপথ করল, সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। কাউকে কাফের বলার ব্যাপারটি যেন গোলমেলে না হয়ে যায়। অন্যকে কাফের সাব্যস্তকরণে অতি তৎপর হওয়া বিপদজনক।
আমরা যা বলেছি, এমন কথা ইবনে তাইমিয়া রহ.-ও বলেছেন। তিনি বলেন, 'আমার জানামতে সাহাবা, তাবেইন ও আইম্মায়ে মুজতাহিদিন' গাইরুল্লাহর নামে শপথ মাকরুহ হওয়া ও তা থেকে নিষেধ করার ব্যাপারে একমত। যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে শপথ করে, সে আল্লাহর সঙ্গে শরিক সাব্যস্ত করে। ইবাদতের উদ্দেশ্যে কারও নামে শপথ করলে ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে। ইবাদতের বিশ্বাস না থাকলে শপথের কথাটি কুফরি কথা হবে। কিন্তু সেটা বড় পর্যায়ের শিরক হবে না, যাতে মানুষ ইসলাম থেকেই বেরিয়ে যায়। এ ধরনের কুফর বোঝাতে উলামায়ে কেরাম বলেন, এগুলো হচ্ছে, 'বড় শিরকের চেয়ে হালকা পর্যায়ের শিরক (শিরকুন দুনা শিরক)'।"১
যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে শপথ করে, সে যদি বিশ্বাস করে, যার নামে শপথ করা হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার মতো সেও এমন সম্মানের উপযোগী, যার কারণে তার নামে শপথ করা যায়—এই ব্যক্তি নিঃসন্দেহে কাফের। তবে, হৃদয়ে যদি এমন বিশ্বাস না থাকে, তা হলে কাফের হবে না।
হাম্বলি মাজহাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে শপথ করার বৈধতা প্রমাণ করে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে শপথ করলেই সেটা কুফর-শিরক হয়ে যায় না।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. ও হাম্বলি মাজহাবের ফকিহগণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে শপথ করা বৈধ মনে করেন। এই বিশ্বাস নিয়ে যদি কেউ শপথ করে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন সম্মান ও অবস্থানের অধিকারী, যার কারণে আল্লাহর মতো তাঁর নামেও শপথ করা যায়—তা হলে সে কাফের হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে সবাই একমত। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. ও হাম্বলি মাজহাবের ফকিহগণ এ ধরনের শপথকে বৈধ বলবেন, এটা অকল্পনীয়।
তবে, এ ধরনের বিশ্বাস ছাড়া যদি শপথ করে, তা হলে তাকে এই শপথের কারণে কাফের বলা হবে না। সে নিজের শপথের মাধ্যমে যেন বলছে—হে আল্লাহ, আমি শপথ করছি আপনার ওই দয়া ও অনুগ্রহের, যা আপনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর করেছেন; তাঁকে দান করেছেন নবুওত, উঁচু মর্যাদা ও মাকামে মাহমুদ।
এখানে বিশ্বাসগত পার্থক্যটা আমলে নেওয়া উচিত। কারণ, এ ধরনের মাসআলায় বিশ্বাসগত পার্থক্য বিবেচনায় না নিলে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, হাম্বলি মাজহাবের ফকিহগণ ও যারা এই মাসআলাকে অস্বীকৃতি ছাড়া নিজেদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন, তাদের সকলকে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত কাফের গণ্য করতে হয়। কত মারাত্মক ধারণা এটা! আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই বিভ্রান্তি থেকে হেফাজত করুন।

টিকাঃ
২. মুজতাহিদ ইমামগণ। যারা কুরআন-হাদিস গবেষণা করে শরিয়তের বিধি-বিধান মানুষের কাছে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল-এ চারজন ফিকহের বড় বড় ইমাম। তারা ছাড়া আরও অনেকেই ছিলেন। কালের বিবর্তনে কারও নাম উচ্চারিত হয়, কারও নাম থেকে যায় অনুচ্চারিত, কেবল কিতাবের পাতাতেই যাদের মতগুলোর দেখা মেলে। (অনুবাদক)
১. এটি উলামায়ে কেরামের ব্যবহৃত একটি পরিভাষা। কোনো কথা বা কাজের ক্ষেত্রে হাদিসে যদি শিরক বা কুফর শব্দ ব্যবহার হয় আর সামগ্রিকভাবে কুরআন-হাদিস পর্যালোচনায় কাজটিকে বড় পর্যায়ের কুফর বলার অবকাশ না থাকে, তখন উলামায়ে কেরাম এই পরিভাষাটি ব্যবহার করে থাকেন। অর্থাৎ, কাজটি বড় পর্যায়ের কুফর নয়; কুফর, তবে ছোট কুফর; শিরক, তবে ছোট শিরক। এর কারণে ব্যক্তি ইসলাম থেকে একেবারে বেরিয়ে যায় না। (অনুবাদক)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00