📄 কাউকে কাফের বলার ব্যাপারে সতর্কতা
কাউকে কাফের বলার বিষয়টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কেউ যখন কোনো মুসলমানকে বলে, 'হে কাফের', কথাটি সম্বোধিত ব্যক্তি বা বক্তা দুজনের যে কোনো একজনের উপর অবশ্যই আরোপিত হয়। যাকে কাফের বলা হয়েছে, তার যদি ঈমান না থাকে, তা হলে এই বক্তব্য তার উপর প্রয়োগ হবে। আর যদি সে ঈমানদার হয়, তা হলে বক্তব্যের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াবে খোদ বক্তাই!
অর্থাৎ, এক ব্যক্তি মুমিন—হোক তা একেবারে নিম্ন স্তরের; এই ঈমানকে ঈমান গণ্য না করে, ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে কেউ যদি কাফের বলে, তা হলে কাফের কে হবে? যাকে বলা হচ্ছে সে? না, বরং যে বলছে সে-ই হয়ে যাবে ঈমানহারা! তবে, কেউ যদি ভুল ধারণাবশত কাউকে কাফের বলে, তা হলে বক্তা কাফের হবে না ঠিকই, কিন্তু অন্যকে কাফের বলায় সতর্কতা অবলম্বন না করার কারণে ধ্বংসাত্মক কবিরা-গুনাহকারী সাব্যস্ত হবে।
যে সব কাজ ঈমানের কোনো রোকনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সেগুলো কুফরি। ইচ্ছা করে কেউ এমন কাজ করলে সেটি এ কথা প্রমাণ করে যে, তার হৃদয়ে নিম্নতম স্তরের ঈমানও নেই।
📄 ইবাদতের ক্ষেত্রে শিরক
কুফরি কর্মকাণ্ডের একটি হচ্ছে, ইবাদতে আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করা। ইবাদতের উপযুক্ত একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। তিনি ছাড়া আর কোনো সত্য উপাস্য নেই। এটি জরুরিয়্যাতে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত—দ্বীনের স্বতঃসিদ্ধ বিষয়।' তাওহিদুল উলুহিয়্যার আলোচনায় বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে। যে আল্লাহর ইবাদত করে, এরই সঙ্গে ইবাদত করে অন্য কারও অথবা মনে করে, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কারও ইবাদত করা বৈধ, সে শিরক করল এবং এমন পর্যায়ের কুফরি করল, যা তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেবে। এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত যেমন নেই, সন্দেহও নেই।
কিন্তু একটা কাজ কখন ইবাদত বলে গণ্য হবে? শুধু কাজটি করার দ্বারাই? না এর সঙ্গে কোনো বিশ্বাস যুক্ত থাকার প্রসঙ্গ রয়েছে? বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার অপেক্ষা রাখে। সামনে আমরা সে বিষয়েই কথা বলব।
টিকাঃ
১. 'জরুরিয়্যাতে দ্বীন' একটি পরিভাষা। দ্বীনের যে বিষয়টি এমন যে, সাধারণ-বিশেষ সব ধরনের মানুষ বিনা কষ্টে সেই বিষয়টি দ্বীনের অংশ হওয়ার ব্যাপারে অবগতি লাভ করতে পারে, সেটি জরুরিয়্যাতে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত। যে বিষয়টি এমন নয়, সেটি এই আওতায় আসবে না। এটি যে শুধু ফরজ পর্যায়ের আমল হবে, এমন নয়। জরুরিয়্যাতে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে কোনো সুন্নাত, মুস্তাহাব ও মুবাহ বিষয়ও। (উসুলে তাকফির, মুফতি উবায়দুর রহমান, ২৬৫)
📄 কর্ম কখন ইবাদত বলে গণ্য হয়?
কেউ কেউ মনে করে, অনেক কাজ মৌলিকভাবেই ইবাদত। তারা মনে করে, রুকু করা, সেজদা করা, দরিদ্রদের কিছু দান করা, রোজা রাখা, আরাফার ময়দানে বা মসজিদে অবস্থান করা, তাওয়াফ করা, কারও উদ্দেশ্যে জন্তু জবাই করা, কুরআন মাজিদ তেলাওয়াত করা— ইবাদতের উদ্দেশ্যে না করা হলেও এগুলো ইবাদত বলে গণ্য হবে।
এখানে একটু চিন্তা করতে হবে, একেবারে মানবিক কারণে কেউ কাউকে সাহায্য করল, চিকিৎসা বা ডায়েট কন্ট্রোলের জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি না খেয়ে রইল, উস্তাদের প্রতি তীব্র ভালোবাসার কারণে তার ঘরের চারপাশে ঘুরতে লাগল, খুঁটিতে চুম্বন করতে লাগল ক্রমাগত, কোনো সম্মানিত মেহমান এলেন বাড়ি—তার উদ্দেশ্যে কিছু জবাই করা হল, কুরআনের ভাষালঙ্কারে মুগ্ধ হয়ে বা স্মরণ করার উদ্দেশ্যে কিছু আয়াত বারবার মুখে আওড়ানো হল—ইবাদতের নিয়ত ছাড়া যদি করা হয় এই কাজগুলো, সেটা কি ইবাদত বলে গণ্য হবে? উত্তর স্পষ্ট—না।
বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো কাজ ইবাদত হতে হলে, যার উদ্দেশ্যে কাজটি করা হচ্ছে, তার নৈকট্য অর্জন উদ্দেশ্য হতে হবে, তার প্রতি বিনীত হওয়ার ইচ্ছা থাকতে হবে। সর্বোপরি যার উপাসনা করা হয়, তাঁর প্রতি পালনকর্তা ও উপাস্য (রব ও ইলাহ) হওয়ার বিশ্বাস রাখতে হবে। এগুলো ছাড়া কোনো কাজ ইবাদত বলে গণ্য হবে না। ইবাদতের মাঝে নিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিয়তের মাধ্যমেই কোনটি ইবাদত আর কোনটি ইবাদত নয়, তার পার্থক্য নির্ণীত হয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘নিশ্চয় সকল আমলের ভিত্তি নিয়তের উপর।’
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোজা ভঙ্গের কারণ থেকে বিরত থাকা, আরাফার দিনে আরাফার ময়দানে অবস্থান করা, কাবা শরিফ তাওয়াফ করা, পশু কুরবানি করা, মসজিদে অবস্থান করা বা কুরআন মাজিদ তেলাওয়াত করা ততক্ষণ পর্যন্ত ইবাদত গণ্য হবে না— যতক্ষণ পর্যন্ত এগুলো আল্লাহর আদেশ পালনার্থে, তাঁর প্রতি সম্মানবোধ নিয়ে, তাঁর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে করা না হবে; সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পালনকর্তা ও উপাস্য হওয়ার আকিদা তো থাকতেই হবে।
কোনো কাজের মাধ্যমে কারও প্রতি সম্মান প্রদর্শিত হলেই সেটি সত্তাগতভাবে ইবাদত হয়ে যায় না। কোনো কাজ ইবাদত হওয়ার জন্য, যার ইবাদত করা হচ্ছে, তাঁর রব অথবা ইলাহ হওয়া কিংবা রব অথবা ইলাহের বিশেষ কোনো গুণে তার গুণান্বিত হওয়ার বিশ্বাস রাখতে হবে।
বিধান বলা হল, কিন্তু এর দলিল কী? দলিল কুরআনুল কারিমেই আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَئِكَةِ اسْجُدُوا لِأَدَمَ
স্মরণ করো সেই সময়ের কথা, যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, তোমরা আদমকে সেজদা করো।'১
সেজদা শ্রেষ্ঠতম ইবাদত। সেজদার মাধমে যতটা বড়ত্ব প্রদর্শিত হয়, অন্য কোনো ইবাদতের মাধ্যমে তা হয় না। যার সেজদা করা হয়, সেজদাকারী তার প্রতি বিনয়াবনত থাকে। শুধু সেজদা করাই যদি ইবাদত গণ্য করা হয়, তা হলে ধরে নিতে হয়, আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের তার কোনো মাখলুকের ইবাদতের নির্দেশ দিচ্ছেন। এটা বড় ধরনের শিরক! আল্লাহ তায়ালা থেকে শিরকের আদেশ প্রদান কীভাবে কল্পনা করা যায়?
আরও একটি প্রমাণ আছে। ইউসুফ আ.-এর ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলছেন—
وَرَفَعَ أَبَوَيْهِ عَلَى الْعَرْشِ وَخَرُّوا لَهُ سُجَّدًا
সে নিজের মাতা-পিতাকে উচ্চাসনে উপবেশন করাল। এরপর তারা সকলে তার (ইউসুফের) সম্মানে সেজদাবনত হল।২
শুধু সেজদা করা যদি বড় শিরক হত, আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই এই কাজের ব্যাপারে নিজের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতেন।
কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থাকে। উল্লিখিত সেজদা ছিল অভিবাদন বা সম্মান প্রদর্শনের সেজদা। পূর্ববর্তী নবীদের শরিয়তে এটি বৈধ ছিল। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শরিয়তে রহিত করা হয়েছে। আয়াত দুটোর মাধ্যমে তা হলে উপর্যুক্ত কথার প্রমাণ সাব্যস্ত হচ্ছে না!
এর উত্তর হচ্ছে, তাওহিদ-শিরকের বিধি-বিধান সকল শরিয়তে এক। এর মধ্যে কোনো রহিতকরণ পাওয়া যায় না। হতে পারে, একটা কাজ কোনো শরিয়তে বৈধ থাকবে, অন্য শরিয়তে সে বিধান রহিত করা হবে। এমনকি কাজটাকে হারামও করা হতে পারে। কিন্তু এক শরিয়তের বৈধ কাজ, অন্য শরিয়তে এসে বড় পর্যায়ের শিরক হয়ে যাবে, এটা সম্ভব নয়। অতএব অভিবাদনের সেজদা ইউসুফ আ.-এর শরিয়তে বৈধ ছিল, এখন বড় পর্যায়ের শিরক হয়ে গেছে, এ কথা বলার সুযোগ নেই।
উপর্যুক্ত আয়াতদ্বয় ও 'ইন্নামাল আমালু বিন্নিয়াত' হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হল, কোনো কাজ-যদিও তার মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শন উদ্দেশ্য হয়ে থাকে- ততক্ষণ পর্যন্ত ইবাদত বলে গণ্য হবে না, যতক্ষণ তার সঙ্গে সেই কাজটি ইবাদত হওয়ার মতো আকিদা, অর্থাৎ রব ও ইলাহ হওয়ার আকিদা সংযুক্ত না হবে। এরই ফলশ্রুতিতে এ কথাও বলা যায় যে, যতক্ষণ অন্তরে কুফরি আকিদা না থাকবে, এই কাজের কর্তা ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত ও কাফের বলেও সাব্যস্ত হবে না।'১
তবে কি আমরা কাজটাকে সমর্থন করছি? মোটেই না! ইবাদতের নিয়ত ছাড়া, অর্থাৎ যাকে সেজদা করা হচ্ছে, তাকে প্রয়োজন-পূরণকারী, সমস্যা-সমাধানকারী মনে করা ছাড়া কাউকে সম্মানসূচক সেজদা করলে মানুষ ইসলামের গণ্ডি থেকে একেবারে বের হয়ে যায় না; কিন্তু তাই বলে একে শিথিল দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। অবশ্যই এটা শিরকের মাধ্যম। এ ধরনের কাজ শিরকের দিকে ধাবিত করে। ক্ষেত্রবিশেষ এ ধরনের কাজ তো মুশরিকদের কাজের মতোই! মুমিনদের অবশ্যই এর থেকে বিরত থাকতে হবে।
টিকাঃ
১. বুখারি, ১。
১. সুরা বাকারা, ৩৪।
২. সুরা ইউসুফ, ১০০。
১. তবে, সেজদা বা সম্মান প্রদর্শন যদি এমন প্রকারের হয়, কুফরি ছাড়া যার অন্য কোনো ব্যাখ্যা সম্ভব হয় না, যেমন: কেউ মূর্তিকে সেজদা করল, মন্দিরে গিয়ে মূর্তির উদ্দেশ্যে সম্মান প্রদর্শন করল, তা হলে দুনিয়ার বিচারে তাকে কাফের বলা হবে। তার উপর কুফরির যাবতীয় বিধান আরোপিত হবে। অন্তরের অবস্থা আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন, সেটা তার ও আল্লাহর তায়ালার মধ্যকার ব্যাপার। (জওয়াহিরুল ফিকহ, মুফতি শফি রহ., পৃ. ৫৬৭)
📄 সম্পূরক সংযোজন
কিছুক্ষণ পূর্বে আমরা একটি কথা বলেছি, ঈমানের জন্য ঈমানের বিষয়াবলি শুধু সত্য বলে বিশ্বাস করাই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে বিশ্বাসের বিপরীত সব কিছু থেকেও নিজেকে মুক্ত করতে হবে। বিষয়টি আরেকটু বিস্তারিত আকারে উপস্থাপন করলে পাঠকের বুঝতে সুবিধা হবে। এ জন্য আমরা ঈমান সবার আগে কিতাব থেকে বিষয়টি উদ্ধৃত করছি।
মাওলানা আবদুল মালেক সাহেব দা. বা. বলেন-ঈমান শুধু গ্রহণ নয়, বর্জনও। সত্যকে গ্রহণ আর বাতিলকে বর্জন। কোনো আকিদা মেনে নেওয়ার পাশাপাশি তার বিপরীত বিষয়কেও সঠিক মনে করা স্ববিরোধিতা। মানবের সুস্থ বুদ্ধি তা গ্রহণ করতে পারে না। ইসলামেও তা অগ্রহণীয়। ঈমান তখনই সাব্যস্ত হবে, যখন বিপরীত সব কিছু বাতিল ও মিথ্যা মনে করবে এবং তা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। সকল প্রকার কুফর ও শিরক থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা সরাসরি ঈমানেরই অংশ। যেমন ঈমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাওহিদ। তাওহিদ কি শুধু আল্লাহ তায়ালাকে মাবুদ মানা? না, তা নয়। তাওহিদ অর্থ, একমাত্র আল্লাহ তায়ালাকে সত্য মাবুদ বলে বিশ্বাস করা এবং আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে বা কোনো কিছুকে মাবুদ বলে স্বীকার না করা।
তাওহিদ অর্থ-আল্লাহ তায়ালারই ইবাদত করা, আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত না করা। তাওহিদ অর্থ-উপায়-উপকরণের ঊর্ধ্বে র বিষয়ে শুধু আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাওয়া, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে সাহায্য না চাওয়া। তাওহিদের অর্থ-একমাত্র আল্লাহকেই কল্যাণ-অকল্যাণের, হায়াত-মওতের মালিক মনে করা, অন্য কাউকে এ সব বিষয়ে ক্ষমতাশীল মনে না করা। তাওহিদ অর্থ- শুধু আল্লাহকে আহকামুল হাকিমিন মনে করা, আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে কারও হুকুম স্বীকার না করা। তাওহিদ অর্থ-শুধু শরিয়তে মুহাম্মদিয়ার আনুগত্যকেই অপরিহার্য মনে করা, অন্য কোনো শরিয়তের আনুগত্য বৈধ মনে না করা। তাওহিদ অর্থ-শুধু ইসলামকেই হক ও সত্য মনে করা, অন্য কোনো দ্বীনকে হক ও সত্য মনে না করা।
মোটকথা, সব জরুরিয়তে দ্বীন (দ্বীনের সর্বজনবিদিত বিষয়) এবং অকাট্য আকিদা ও আহকাম এই প্রকারেরই অন্তর্ভুক্ত। এ সব বিষয় ঈমান তখনই সাব্যস্ত হবে, যখন তার বিপরীত বিষয়কে বাতিল ও মিথ্যা বলে বিশ্বাস করা হবে। আর তা থেকে তাবাররি (সম্পর্কহীনতা) অবলম্বন করা হবে। এ সব তো 'মুজতাহাদ ফি' (যাতে শরিয়তের দলিলের ভিত্তিতে একাধিক মত হতে পারে) বা 'তানাওউয়ে সুন্নত' (যাতে একাধিক সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি রয়েছে)-এর ক্ষেত্র নয় যে, বিপরীত দিকটিকেও গ্রহণযোগ্য বা নীরবতার যোগ্য মনে করা যায়।"১
টিকাঃ
১. ঈমান সবার আগে, মাওলানা আবদুল মালেক, পৃ. ১৫।