📄 কুফরের পরিচয়
কুফর ঈমানের বিপরীত। এটাও বিশ্বাসগত বিষয়। যার ঈমান আলোচ্য বর্ণনার' কোনো স্তরেই পড়ে না অথবা যে নিজের ঈমানকে শিরকের সঙ্গে সংমিশ্রিত করে বিনষ্ট করেছে—সে কাফের।
কুফরকে বিশ্বাসগত ব্যাপার সাব্যস্ত করার উপর একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। কিছু বক্তব্য কিছু কাজ এমন আছে, যার হৃদয়ে সামান্যতম ঈমান আছে, তার থেকে সেটি কিছুতেই প্রকাশ পেতে পারে না। তা হলে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো কাজ বা কথার কারণেও কেউ কাফের সাব্যস্ত হচ্ছে!
হ্যাঁ, যার হৃদয়ে সামান্য ঈমান রয়েছে, তার থেকে সে সব কাজ প্রকাশ পেতে পারে না। এর অর্থ হচ্ছে, যার থেকে সেগুলো প্রকাশ পাবে, সে কিছুতেই মুমিন নয়। তবে, এই কাজগুলোই যে তার কাফের হওয়ার কারণ বিষয়টি এমন নয়। এই কাজগুলো মূলত তার ভিতরে থাকা কুফরির প্রমাণ। তার হৃদয় ঈমান থেকে খালি ছিল বিধায়ই এই কাজগুলো তার দ্বারা প্রকাশ পেয়েছে। বাস্তবে এই কাজগুলোর কারণেই সে কাফের হল, এমন নয়। কারণ, কুফর বিশ্বাসগত ব্যাপার, কর্মগত নয়।
টিকাঃ
১. 'ঈমানের স্তরবিন্যাস ও সুফল' শীর্ষক শিরোনামের আলোচনা।
২. এ বিষয়ে পূর্বে একটি টীকায় আলোচনা হয়েছে।
📄 সম্পূরক সংযোজন
কিছুক্ষণ পূর্বে আমরা একটি কথা বলেছি, ঈমানের জন্য ঈমানের বিষয়াবলি শুধু সত্য বলে বিশ্বাস করাই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে বিশ্বাসের বিপরীত সব কিছু থেকেও নিজেকে মুক্ত করতে হবে। বিষয়টি আরেকটু বিস্তারিত আকারে উপস্থাপন করলে পাঠকের বুঝতে সুবিধা হবে। এ জন্য আমরা ঈমান সবার আগে কিতাব থেকে বিষয়টি উদ্ধৃত করছি।
মাওলানা আবদুল মালেক সাহেব দা. বা. বলেন-ঈমান শুধু গ্রহণ নয়, বর্জনও। সত্যকে গ্রহণ আর বাতিলকে বর্জন। কোনো আকিদা মেনে নেওয়ার পাশাপাশি তার বিপরীত বিষয়কেও সঠিক মনে করা স্ববিরোধিতা। মানবের সুস্থ বুদ্ধি তা গ্রহণ করতে পারে না। ইসলামেও তা অগ্রহণীয়। ঈমান তখনই সাব্যস্ত হবে, যখন বিপরীত সব কিছু বাতিল ও মিথ্যা মনে করবে এবং তা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। সকল প্রকার কুফর ও শিরক থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা সরাসরি ঈমানেরই অংশ। যেমন ঈমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাওহিদ। তাওহিদ কি শুধু আল্লাহ তায়ালাকে মাবুদ মানা? না, তা নয়। তাওহিদ অর্থ, একমাত্র আল্লাহ তায়ালাকে সত্য মাবুদ বলে বিশ্বাস করা এবং আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে বা কোনো কিছুকে মাবুদ বলে স্বীকার না করা।
তাওহিদ অর্থ-আল্লাহ তায়ালারই ইবাদত করা, আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত না করা। তাওহিদ অর্থ-উপায়-উপকরণের ঊর্ধ্বে র বিষয়ে শুধু আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাওয়া, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে সাহায্য না চাওয়া। তাওহিদের অর্থ-একমাত্র আল্লাহকেই কল্যাণ-অকল্যাণের, হায়াত-মওতের মালিক মনে করা, অন্য কাউকে এ সব বিষয়ে ক্ষমতাশীল মনে না করা। তাওহিদ অর্থ- শুধু আল্লাহকে আহকামুল হাকিমিন মনে করা, আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে কারও হুকুম স্বীকার না করা। তাওহিদ অর্থ-শুধু শরিয়তে মুহাম্মদিয়ার আনুগত্যকেই অপরিহার্য মনে করা, অন্য কোনো শরিয়তের আনুগত্য বৈধ মনে না করা। তাওহিদ অর্থ-শুধু ইসলামকেই হক ও সত্য মনে করা, অন্য কোনো দ্বীনকে হক ও সত্য মনে না করা।
মোটকথা, সব জরুরিয়তে দ্বীন (দ্বীনের সর্বজনবিদিত বিষয়) এবং অকাট্য আকিদা ও আহকাম এই প্রকারেরই অন্তর্ভুক্ত। এ সব বিষয় ঈমান তখনই সাব্যস্ত হবে, যখন তার বিপরীত বিষয়কে বাতিল ও মিথ্যা বলে বিশ্বাস করা হবে। আর তা থেকে তাবাররি (সম্পর্কহীনতা) অবলম্বন করা হবে। এ সব তো 'মুজতাহাদ ফি' (যাতে শরিয়তের দলিলের ভিত্তিতে একাধিক মত হতে পারে) বা 'তানাওউয়ে সুন্নত' (যাতে একাধিক সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি রয়েছে)-এর ক্ষেত্র নয় যে, বিপরীত দিকটিকেও গ্রহণযোগ্য বা নীরবতার যোগ্য মনে করা যায়।"১
টিকাঃ
১. ঈমান সবার আগে, মাওলানা আবদুল মালেক, পৃ. ১৫।
📄 কাউকে কাফের বলার ব্যাপারে সতর্কতা
কাউকে কাফের বলার বিষয়টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কেউ যখন কোনো মুসলমানকে বলে, 'হে কাফের', কথাটি সম্বোধিত ব্যক্তি বা বক্তা দুজনের যে কোনো একজনের উপর অবশ্যই আরোপিত হয়। যাকে কাফের বলা হয়েছে, তার যদি ঈমান না থাকে, তা হলে এই বক্তব্য তার উপর প্রয়োগ হবে। আর যদি সে ঈমানদার হয়, তা হলে বক্তব্যের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াবে খোদ বক্তাই!
অর্থাৎ, এক ব্যক্তি মুমিন—হোক তা একেবারে নিম্ন স্তরের; এই ঈমানকে ঈমান গণ্য না করে, ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে কেউ যদি কাফের বলে, তা হলে কাফের কে হবে? যাকে বলা হচ্ছে সে? না, বরং যে বলছে সে-ই হয়ে যাবে ঈমানহারা! তবে, কেউ যদি ভুল ধারণাবশত কাউকে কাফের বলে, তা হলে বক্তা কাফের হবে না ঠিকই, কিন্তু অন্যকে কাফের বলায় সতর্কতা অবলম্বন না করার কারণে ধ্বংসাত্মক কবিরা-গুনাহকারী সাব্যস্ত হবে।
যে সব কাজ ঈমানের কোনো রোকনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সেগুলো কুফরি। ইচ্ছা করে কেউ এমন কাজ করলে সেটি এ কথা প্রমাণ করে যে, তার হৃদয়ে নিম্নতম স্তরের ঈমানও নেই।
📄 ইবাদতের ক্ষেত্রে শিরক
কুফরি কর্মকাণ্ডের একটি হচ্ছে, ইবাদতে আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করা। ইবাদতের উপযুক্ত একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। তিনি ছাড়া আর কোনো সত্য উপাস্য নেই। এটি জরুরিয়্যাতে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত—দ্বীনের স্বতঃসিদ্ধ বিষয়।' তাওহিদুল উলুহিয়্যার আলোচনায় বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে। যে আল্লাহর ইবাদত করে, এরই সঙ্গে ইবাদত করে অন্য কারও অথবা মনে করে, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কারও ইবাদত করা বৈধ, সে শিরক করল এবং এমন পর্যায়ের কুফরি করল, যা তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেবে। এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত যেমন নেই, সন্দেহও নেই।
কিন্তু একটা কাজ কখন ইবাদত বলে গণ্য হবে? শুধু কাজটি করার দ্বারাই? না এর সঙ্গে কোনো বিশ্বাস যুক্ত থাকার প্রসঙ্গ রয়েছে? বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার অপেক্ষা রাখে। সামনে আমরা সে বিষয়েই কথা বলব।
টিকাঃ
১. 'জরুরিয়্যাতে দ্বীন' একটি পরিভাষা। দ্বীনের যে বিষয়টি এমন যে, সাধারণ-বিশেষ সব ধরনের মানুষ বিনা কষ্টে সেই বিষয়টি দ্বীনের অংশ হওয়ার ব্যাপারে অবগতি লাভ করতে পারে, সেটি জরুরিয়্যাতে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত। যে বিষয়টি এমন নয়, সেটি এই আওতায় আসবে না। এটি যে শুধু ফরজ পর্যায়ের আমল হবে, এমন নয়। জরুরিয়্যাতে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে কোনো সুন্নাত, মুস্তাহাব ও মুবাহ বিষয়ও। (উসুলে তাকফির, মুফতি উবায়দুর রহমান, ২৬৫)