📄 ঈমান ও ইসলামের এই পার্থক্য : একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর
হাদিসে জিবরাইলে যে সব বিষয়ের মাধ্যমে ইসলামকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, বেশ কয়েকটি হাদিসে সেই সব বিষয় দ্বারা ঈমানেরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ঈমান-ইসলামের এই পার্থক্য তো তা হলে প্রশ্নমুক্ত নয়?
এর উত্তরে যেটা বলা যায়, তা হল, যে সব হাদিস উল্লেখ করে পার্থক্য নাকচ করা হয়েছে, সে সব হাদিস মূলত পার্থক্য নাকচের প্রমাণ বহন করে না। হাদিসগুলো থেকে পার্থক্য নাকচের প্রমাণ গ্রহণে দুর্বলতা রয়েছে। এ কারণে সে সব কথার উপর নির্ভর করা যায় না।
যে সব হাদিসের মাধ্যমে ঈমান-ইসলামের পার্থক্য নাকচ করা হয়, তার একটি 'আবদুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধিদের হাদিস' নামে প্রসিদ্ধ। হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি. থেকে। সেই হাদিসে হজরত ইবনে আব্বাস রাজি. বলেন, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের চারটি বিষয়ে আদেশ করেছেন ও চারটি বিষয় থেকে নিষেধ করেছেন।' এই হাদিসেই এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'তোমরা কি জানো, এক আল্লাহর উপর ঈমান আনার অর্থ কী? এর অর্থ হচ্ছে, এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কোনো মাবুদ নেই, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল এবং নামাজ কায়েম করা, জাকাত আদায় করা, রমজানে রোজা রাখা ও গনিমতের সম্পদ থেকে এক-পঞ্চমাংশ বায়তুল মালে জমা করা।"১ বাহ্যিকভাবে দেখা যায়, এই হাদিসে ঈমানের ব্যাখ্যায় বিভিন্ন আমলের কথা বর্ণনা করা হয়েছে।
কিন্তু ভালো করে লক্ষ করলে দেখব, বিষয়টি আসলে এমন নয়। কারণ, বাহ্যিকভাবে হাদিসটি থেকে বুঝে আসে যে, তাদের মূলত একটি বিষয়ে আদেশ করেছেন, এরপর তার ব্যাখ্যায় চারটি বিষয়ের উল্লেখ করেছেন। এতে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাজি.-এর বক্তব্য, 'তাদের চারটি বিষয়ে আদেশ করেছেন'-এর সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। বাস্তবতা হচ্ছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে তাদের ঈমানের আদেশ করেছেন। এরপর শাহাদাতাইনের (কালেমায়ে শাহাদাত) মাধ্যমে ঈমানের ব্যাখ্যা করেছেন। অতঃপর বাকি তিনটি বিষয় আদেশ করেছেন।
এমনই আরেকটি হাদিস আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাজি. থেকে বর্ণিত। তবে, হাদিসটি তার থেকে যে সনদে প্রসিদ্ধ সে সনদে নয়, বরং হাদিসটির বিশেষ একটি সনদে এই শব্দে বর্ণিত হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাজি, বলেন, 'ঈমানের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের উপর:-তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে, নামাজ কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে, বায়তুল্লাহ শরিফে গিয়ে হজ করবে ও রমজানে রোজা রাখবে। এভাবেই আমাদের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন।১ হাদিসটির এই বর্ণনায় ঈমানের ব্যাখ্যা করা হয়েছে এমন বিষয়ের মাধ্যমে, যেগুলো দ্বারা হাদিসে জিবরাইলে ইসলামের ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তবে, এখানেও লক্ষণীয় যে, এই বর্ণনাটি ('ঈমানের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের উপর') যে শব্দে করা হয়েছে, তা সহিহ নয়। বরং সহিহ হল, 'ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের উপর'-এই বর্ণনা।
আরও একটি হাদিস এ ক্ষেত্রে আলোচনায় এসে থাকে। আমর ইবনে আবাসা রাজি. বলেন, 'এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করল, '(হে আল্লাহর রাসুল,) কোন ইসলাম সর্বোত্তম?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'ঈমান।' সে জিজ্ঞেস করল, 'ঈমান কী?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'ঈমান হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা, তাঁর ফেরেশতাগণ, রাসুলগণ, কিতাবসমূহ ও মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের ব্যাপারে বিশ্বাস স্থাপন।”২
এই হাদিসে ঈমান ও তার ব্যাখ্যাকে ইসলামের শ্রেষ্ঠ আমল আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তা হলে ঈমান আর ইসলামের মাঝে বৈপরীত্য কোথায়? বাস্তবে ঈমান ও ইসলামের মাঝে ভিন্নতা রয়েছে। এই হাদিসের সনদ দুর্বল ও ত্রুটিযুক্ত।
আন্তরিক আনুগত্যের সঙ্গে কালেমায়ে শাহাদাতকে— তার উভয় অংশ—সত্য বলে মেনে নেওয়ার নাম ঈমান। কলিমায়ে শাহাদাত মুখে উচ্চারণ করা ইসলাম। ঈমান ও ইসলামের আবশ্যকীয় প্রভাবে কর্মগতভাবে আল্লাহর অনুগত হয়ে যাওয়া ইসলামের পূর্ণতা আর ইসলামের পূর্ণতাই ঈমানের সুফল।
ঈমান ও ইসলামের ব্যাপারে পুরো আলোচনার সারকথা হচ্ছে, ঈমান অর্থ সহিহ আকিদা, যা নেক আমল পর্যন্ত নিয়ে যায়। তবে ঈমানের সর্বনিম্ন স্তরটির কথা ভিন্ন, এটি কোনো নেক আমলে উদ্বুদ্ধ করে না। ইসলাম দ্বারা উদ্দেশ্য এমন নেক আমল, যার ভিত্তি সহিহ আকিদা ও বিশুদ্ধ বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল। ঈমান-আকিদা বিশুদ্ধ না হলে নেক আমল তথা ইসলাম গ্রহণীয় হয় না। আর এই ঈমান ও ইসলামের সমন্বিত রূপই হচ্ছে দ্বীন।
এখানে আরেকটি বিষয় বলে নেওয়া উচিত যে, ঈমান ও ইসলাম প্রকৃতিগতভাবে একটি আরেকটির চেয়ে ভিন্ন হলেও কুরআন-হাদিসের কোথাও কোথাও এর কোনো একটি দ্বারা এমন অর্থও নেওয়া হয়েছে, যার মাঝে উভয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। অনেক স্থানে 'ঈমান ও মুমিন' বলে 'বিশ্বাস, বক্তব্য ও আমল' সব একসঙ্গে উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ ايتُهُ زَادَتْهُمْ إِيْمَانًا وَ عَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ ﴿٢﴾ الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلوةَ وَ مِمَّا رَزَقْتُهُمْ يُنْفِقُوْنَ ﴿٣﴾
নিশ্চয় মুমিন তারা, আল্লাহর কথা স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে। যখন তাদের কাছে তাঁর আয়াত পাঠ করা হয়, তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। তারা কেবল তাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে। যারা নামাজ কায়েম করে, আমি যা দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে, তারাই প্রকৃত মুমিন।'১
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجُهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ أَوَوْا وَ نَصَرُوا أُولَئِكَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ
যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে, আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে আর যারা আশ্রয় দান করেছে, সাহায্য করেছে- তারাই পরস্পর পরস্পরের অভিভাবক।২
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, 'ঈমানের সত্তরের, অধিক শাখা রয়েছে। শ্রেষ্ঠ শাখা, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা। আর সবচেয়ে ছোট শাখা রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। লজ্জাও ঈমানের একটি শাখা।"১
এ সব আয়াত ও হাদিসের কারণে পূর্বসুরি আলেমদের এক দল বলেন, 'যে ঈমান বান্দাকে আল্লাহর আজাব থেকে মুক্তি দেবে তা হচ্ছে, মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে আমল করা।
পূর্বের আলোচনা থেকে আমরা আমল সম্পর্কে দুটো দৃষ্টিভঙ্গি পেলাম:
এক. আমল হচ্ছে ঈমানের সুফল।
দুই. আমল ঈমানের পরিপূরক অংশ।
দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গিটিও সঠিক। এই মত-পোষণকারী উলামায়ে কেরাম তাদের বক্তব্য দ্বারা এই অর্থই উদ্দেশ্য নিতেন।
তবে, আমরা যদি দ্বিতীয় মতটিকে এভাবে বুঝতে চাই যে, আমল হচ্ছে ঈমানের রোকন' (স্তম্ভ); যেমন: চেহারা ধৌত করা উজুর রোকন, রুকু করা নামাজের রোকন, আরাফায় অবস্থান করা হজের রোকন—এই বুঝ শুদ্ধ হবে না। কারণ, যে সব ইবাদতের উল্লেখ করা হল, উল্লিখিত রোকনের অনুপস্থিতিতে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। এই অর্থে আমলকে ঈমানের রোকন সাব্যস্ত করলে যদি কেউ কোনো ফরজ আমল বাদ দেয় বা কোনো কবিরা গুনাহ করে—তার ঈমান বাতিল হয়ে যাবে, সে পুরোপুরি ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে, অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে বড় শিরককারী মুশরিকদের দলে। এটা খারেজিদের বক্তব্য। চূড়ান্ত ফলাফলে এটা মুতাজিলাদেরও বক্তব্য। তারা যদিও, যে ফরজ ছেড়ে দেয় বা কবিরা গুনাহ করে, তাকে কাফের বলে না; কিন্তু তাকে মুমিন হিসেবেও স্বীকার করে না। তারা ঈমান ও কুফরের মাঝে ভিন্ন আরেকটি অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। তারা বলে, তওবা ছাড়া যদি এই ব্যক্তি ইন্তেকাল করে, তা হলে সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে অবস্থান করবে।
দুটোই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত কুরআন-সুন্নাহর ভাষ্যের মাঝে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করে, এক অংশ দিয়ে আরেক অংশকে বাতিল করার চেষ্টা করে না। যে খাঁটি মনে আল্লাহ তায়ালা, তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, রাসুলগণ ও পরকালে বিশ্বাস করে, আল্লাহর বড়ত্বে বিশ্বাস রাখে, তাঁর আদেশ-নিষেধের ব্যাপারে সম্মানবোধ লালন করে, সে যদি কোনো ফরজ ছেড়ে দেয়, কবিরা গুনাহ করে—আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের উলামায়ে কেরাম তাকে কাফের আখ্যায়িত করেন না।
টিকাঃ
২. ঈমান-ইসলামের মাঝে এরূপ পার্থক্যকরণ, এ বিষয়ের একটি মত। মতটি শক্তিশালী সন্দেহ নেই। কিন্তু এখানে আরও দুটো মত আছে। কারও কারও মতে ঈমান আর ইসলাম একই বিষয়। দুটো মতের সমন্বয়ে আরেকটি মতও এখানে আলোচনা হয়, তা হচ্ছে, কখনও ঈমান শব্দ দ্বারা ঈসলাম এবং ইসলাম দ্বারা ঈমান বোঝানো হয়ে থাকে। (অনুবাদক)
১. মুসলিম, ২৩。
১. আল-মুসান্নাফ, ইবনে আবি শায়বা, ৩০৩১১।
২. মুসনাদে আহমদ, ১৭০২৭。
১. সুরা আনফাল, ২-৩।
২. সুরা আনফাল, ৭২。
১. মুসলিম, ৫৮।
২. রোকন শব্দের অর্থ—স্তম্ভ, খুঁটি। কোনো বস্তুর অস্তিত্বের জন্য যেসব বিষয় না হলেই নয়, সেগুলোকে বস্তুর রোকন বলা হয়।
📄 কুফরের পরিচয়
কুফর ঈমানের বিপরীত। এটাও বিশ্বাসগত বিষয়। যার ঈমান আলোচ্য বর্ণনার' কোনো স্তরেই পড়ে না অথবা যে নিজের ঈমানকে শিরকের সঙ্গে সংমিশ্রিত করে বিনষ্ট করেছে—সে কাফের।
কুফরকে বিশ্বাসগত ব্যাপার সাব্যস্ত করার উপর একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। কিছু বক্তব্য কিছু কাজ এমন আছে, যার হৃদয়ে সামান্যতম ঈমান আছে, তার থেকে সেটি কিছুতেই প্রকাশ পেতে পারে না। তা হলে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো কাজ বা কথার কারণেও কেউ কাফের সাব্যস্ত হচ্ছে!
হ্যাঁ, যার হৃদয়ে সামান্য ঈমান রয়েছে, তার থেকে সে সব কাজ প্রকাশ পেতে পারে না। এর অর্থ হচ্ছে, যার থেকে সেগুলো প্রকাশ পাবে, সে কিছুতেই মুমিন নয়। তবে, এই কাজগুলোই যে তার কাফের হওয়ার কারণ বিষয়টি এমন নয়। এই কাজগুলো মূলত তার ভিতরে থাকা কুফরির প্রমাণ। তার হৃদয় ঈমান থেকে খালি ছিল বিধায়ই এই কাজগুলো তার দ্বারা প্রকাশ পেয়েছে। বাস্তবে এই কাজগুলোর কারণেই সে কাফের হল, এমন নয়। কারণ, কুফর বিশ্বাসগত ব্যাপার, কর্মগত নয়।
টিকাঃ
১. 'ঈমানের স্তরবিন্যাস ও সুফল' শীর্ষক শিরোনামের আলোচনা।
২. এ বিষয়ে পূর্বে একটি টীকায় আলোচনা হয়েছে।
📄 সম্পূরক সংযোজন
কিছুক্ষণ পূর্বে আমরা একটি কথা বলেছি, ঈমানের জন্য ঈমানের বিষয়াবলি শুধু সত্য বলে বিশ্বাস করাই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে বিশ্বাসের বিপরীত সব কিছু থেকেও নিজেকে মুক্ত করতে হবে। বিষয়টি আরেকটু বিস্তারিত আকারে উপস্থাপন করলে পাঠকের বুঝতে সুবিধা হবে। এ জন্য আমরা ঈমান সবার আগে কিতাব থেকে বিষয়টি উদ্ধৃত করছি।
মাওলানা আবদুল মালেক সাহেব দা. বা. বলেন-ঈমান শুধু গ্রহণ নয়, বর্জনও। সত্যকে গ্রহণ আর বাতিলকে বর্জন। কোনো আকিদা মেনে নেওয়ার পাশাপাশি তার বিপরীত বিষয়কেও সঠিক মনে করা স্ববিরোধিতা। মানবের সুস্থ বুদ্ধি তা গ্রহণ করতে পারে না। ইসলামেও তা অগ্রহণীয়। ঈমান তখনই সাব্যস্ত হবে, যখন বিপরীত সব কিছু বাতিল ও মিথ্যা মনে করবে এবং তা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। সকল প্রকার কুফর ও শিরক থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা সরাসরি ঈমানেরই অংশ। যেমন ঈমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাওহিদ। তাওহিদ কি শুধু আল্লাহ তায়ালাকে মাবুদ মানা? না, তা নয়। তাওহিদ অর্থ, একমাত্র আল্লাহ তায়ালাকে সত্য মাবুদ বলে বিশ্বাস করা এবং আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে বা কোনো কিছুকে মাবুদ বলে স্বীকার না করা।
তাওহিদ অর্থ-আল্লাহ তায়ালারই ইবাদত করা, আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত না করা। তাওহিদ অর্থ-উপায়-উপকরণের ঊর্ধ্বে র বিষয়ে শুধু আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাওয়া, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে সাহায্য না চাওয়া। তাওহিদের অর্থ-একমাত্র আল্লাহকেই কল্যাণ-অকল্যাণের, হায়াত-মওতের মালিক মনে করা, অন্য কাউকে এ সব বিষয়ে ক্ষমতাশীল মনে না করা। তাওহিদ অর্থ- শুধু আল্লাহকে আহকামুল হাকিমিন মনে করা, আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে কারও হুকুম স্বীকার না করা। তাওহিদ অর্থ-শুধু শরিয়তে মুহাম্মদিয়ার আনুগত্যকেই অপরিহার্য মনে করা, অন্য কোনো শরিয়তের আনুগত্য বৈধ মনে না করা। তাওহিদ অর্থ-শুধু ইসলামকেই হক ও সত্য মনে করা, অন্য কোনো দ্বীনকে হক ও সত্য মনে না করা।
মোটকথা, সব জরুরিয়তে দ্বীন (দ্বীনের সর্বজনবিদিত বিষয়) এবং অকাট্য আকিদা ও আহকাম এই প্রকারেরই অন্তর্ভুক্ত। এ সব বিষয় ঈমান তখনই সাব্যস্ত হবে, যখন তার বিপরীত বিষয়কে বাতিল ও মিথ্যা বলে বিশ্বাস করা হবে। আর তা থেকে তাবাররি (সম্পর্কহীনতা) অবলম্বন করা হবে। এ সব তো 'মুজতাহাদ ফি' (যাতে শরিয়তের দলিলের ভিত্তিতে একাধিক মত হতে পারে) বা 'তানাওউয়ে সুন্নত' (যাতে একাধিক সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি রয়েছে)-এর ক্ষেত্র নয় যে, বিপরীত দিকটিকেও গ্রহণযোগ্য বা নীরবতার যোগ্য মনে করা যায়।"১
টিকাঃ
১. ঈমান সবার আগে, মাওলানা আবদুল মালেক, পৃ. ১৫।
📄 কাউকে কাফের বলার ব্যাপারে সতর্কতা
কাউকে কাফের বলার বিষয়টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কেউ যখন কোনো মুসলমানকে বলে, 'হে কাফের', কথাটি সম্বোধিত ব্যক্তি বা বক্তা দুজনের যে কোনো একজনের উপর অবশ্যই আরোপিত হয়। যাকে কাফের বলা হয়েছে, তার যদি ঈমান না থাকে, তা হলে এই বক্তব্য তার উপর প্রয়োগ হবে। আর যদি সে ঈমানদার হয়, তা হলে বক্তব্যের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াবে খোদ বক্তাই!
অর্থাৎ, এক ব্যক্তি মুমিন—হোক তা একেবারে নিম্ন স্তরের; এই ঈমানকে ঈমান গণ্য না করে, ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে কেউ যদি কাফের বলে, তা হলে কাফের কে হবে? যাকে বলা হচ্ছে সে? না, বরং যে বলছে সে-ই হয়ে যাবে ঈমানহারা! তবে, কেউ যদি ভুল ধারণাবশত কাউকে কাফের বলে, তা হলে বক্তা কাফের হবে না ঠিকই, কিন্তু অন্যকে কাফের বলায় সতর্কতা অবলম্বন না করার কারণে ধ্বংসাত্মক কবিরা-গুনাহকারী সাব্যস্ত হবে।
যে সব কাজ ঈমানের কোনো রোকনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সেগুলো কুফরি। ইচ্ছা করে কেউ এমন কাজ করলে সেটি এ কথা প্রমাণ করে যে, তার হৃদয়ে নিম্নতম স্তরের ঈমানও নেই।