📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 দুর্বল ঈমানদারদের পরিণতি

📄 দুর্বল ঈমানদারদের পরিণতি


যাদের ঈমান দুর্বল, সৎ কর্ম করে না, আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘন করে, তাদের মন্দ পরিণামের ব্যাপারে এখানে কিঞ্চিৎ আলোচনা করে নেওয়া প্রয়োজন। আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে আদম আলাইহিস সালামের পুত্রের জবানে তার ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলা কথা উল্লেখ করে এরশাদ করেন-
إِنِّي أُرِيدُ أَنْ تَبُوا بِاثْمِي وَ إِثْمِكَ فَتَكُوْنَ مِنْ أَصْحُبِ النَّارِ وَ ذَلِكَ جزوا الظَّلِمِينَ ﴿٢٩﴾
আমি চাই তুমি আমার ও তোমার গুনাহ নিয়ে ফিরে যাবে। এর প্রতিফলে তুমি হবে জাহান্নামের অধিবাসী। আর সেটাই অত্যাচারীদের পরিণাম।১
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
وَ الَّذِينَ كَسَبُوا السَّيِّاتِ جَزَاءُ سَيِّئَةٍ بِمِثْلِهَا وَتَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ مَّا لَهُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ عَاصِمٍ كَأَنَّمَا أُغْشِيَتْ وُجُوهُهُمْ قِطَعًا مِّنَ الَّيْلِ مُظْلِمًا ، أولئِكَ أَصْحَبُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خُلِدُوْنَ ﴿۲৭﴾
যারা মন্দ কাজ করে, তাদের প্রতিফলও অনুরূপ মন্দ। হীনতা তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলবে, আল্লাহর থেকে তাদের রক্ষা করার মতো কেউ নেই। তাদের মুখমণ্ডল যেন রাতের অন্ধকার আবরণে আচ্ছাদিত। তারাই জাহান্নামের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে।২
কুরআনে আরও এসেছে-
وَ جَزَؤُا سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَ أَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّلِمِينَ ﴿٤٠﴾
মন্দের পরিণাম অনুরূপ মন্দ। যে ক্ষমা করে দেয় ও আপস- নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। আল্লাহ জালেমদের পছন্দ করেন না।’

টিকাঃ
১. সুরা মায়েদা, ২৯।
২. সুরা ইউনুস, ২৭。
১. সুরা শুরা, ৪০।

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 তবুও তারা এক সময় মুক্তি পাবে

📄 তবুও তারা এক সময় মুক্তি পাবে


জালেম ও গুনাহগারদের জন্য পৃথিবীতে তাদের কৃতকর্মের প্রতিফলস্বরূপ পরকালে জাহান্নাম অপেক্ষা করছে। তারা সেখানে বহু কাল অবস্থান করবে। আগুনে পুড়ে পুড়ে গুনাহ থেকে পবিত্র হবে। যদি ঈমান নিয়ে মারা গিয়ে থাকে, তারা শাফায়াত (চতুর্থ স্তর) লাভ করবে। শাস্তি ভোগের পর যারা শাফায়াত লাভ করবে, তাদের জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। তারা সেখানে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে না।
ইমাম বুখারি রহ. আনাস ইবনে মালেক রাজি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (শাফায়াতের হাদিসে) বলেন, ‘এরপর আমি আপন রবের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করব। আমাকে অনুমতি দেওয়া হবে। এরপর তিনি আমার হৃদয়ে ঢেলে দেবেন কিছু স্তুতিবাক্য, যা ইতিপূর্বে আমার মনে আসেনি যে, আমি সেগুলোর সাহায্যে তাঁর প্রশংসা করব। আমি বলব, হে আমার রব, আমার উম্মতকে মুক্তি দিন! আমার উম্মতকে মুক্তি দিন! তখন বলা হবে, যাও, যার হৃদয়ে যব-পরিমাণ ঈমান আছে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনো। আমি যাব। আল্লাহ তায়ালা যা বলেছেন, তা করব। এরপর আবার আমি সেই বাক্যগুলো দ্বারা রবের প্রশংসা করব। আবার বলা হবে, যাও, যার হৃদয়ে বিন্দু-পরিমাণ- অন্য বর্ণনায় আছে সরিষা-পরিমাণ-ঈমান আছে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনো। আমি যাব। তা করব। এরপর আবার সে সব স্তুতিবাক্যে আল্লাহর প্রশংসা করব। আবার আল্লাহ তায়ালা বলবেন, যাও, যার মনে
সবচেয়ে ছোট সরিষা দানা-পরিমাণ ঈমান আছে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনো। আমি যাব। সেরূপ করব। এরপর চতুর্থবার আবার সে সব বাক্যে প্রশংসা করব। আমি বলব, হে আমার রব, যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে, আমাকে তার ব্যাপারে অনুমতি দিন। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আমার সম্মান বড়ত্ব ও মর্যাদার শপথ, অবশ্যই যে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে তাকে আমি জাহান্নাম থেকে বের করব।"১
হাদিসে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ দ্বারা তার অপর অংশ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ-সহ উদ্দেশ্য।
শাফায়াতের এই চতুর্থ স্তরের প্রকৃত বর্ণনা পাওয়া যায় বুখারি ও মুসলিমের অন্য একটি হাদিসের মাধ্যমে। হাদিসটির বর্ণনাকারী আবু সাঈদ খুদরি রাজি.। বুখারি শরিফে এসেছে, 'পরাক্রমশালী আল্লাহ বলবেন, এখনও আমার সুপারিশ অবশিষ্ট আছে। এরপর তিনি নিজের কুদরতি থাবার একটা থাবা জাহান্নামে মারবেন। এর মাধ্যমে তিনি এক দল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন। তখন জান্নাতিরা বলবে, এরা হল দয়াময়ের পক্ষ থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত দল। তিনি তাদের কোনো আমল করা বা কোনো কল্যাণ অগ্রে প্রেরণ ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন।'২
এই হাদিসেরই মুসলিম শরিফের বর্ণনায় এসেছে, 'আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ফেরেশতারা সুপারিশ করেছে, নবীরা সুপারিশ করেছে, সুপারিশ করেছে মুমিনরাও; এখন কেবল বাকি আছেন পরম করুণাময়! এরপর তিনি জাহান্নাম থেকে (কুদরতি মুষ্ঠির) এক মুষ্ঠি-পরিমাণ তুলে আনবেন। এর মাধ্যমে তিনি এমন কিছু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন, যারা কখনও কোনো ভালো কাজ করেনি।'৩
আল্লাহর রহমত অপার, অসীম। যার বিন্দু থেকে বিন্দু-পরিমাণ ঈমান থাকবে, সেই সামান্য নিষ্প্রভ ঈমান যদি তাকে কোনো নেক আমলে উদ্বুদ্ধ নাও করে, তারপরও রাব্বুল আলামিন তাকে একেবারে শেষ পর্যায়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন। হাদিসে সে সব লোকের কথা বলা হয়েছে এই ভাষায় যে, 'তারা কখনও কোনো ভালো কাজ করেনি', যুগ যুগ তারা শাস্তি ভোগ করবে। তবে অবশেষে তারা চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে অবস্থান থেকে মুক্তি লাভ করবে। প্রবেশ করবে শান্তি-সুখের মনোরম উদ্যানে।
যে হৃদয়ে সত্য বিশ্বাসসহ শুধু কালেমা পড়েছে, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ' কালেমা বলা ও তার বিষয়বস্তু বিশ্বাস করা ছাড়া আর কোনো আমল করেনি, শাস্তি ভোগ করে হলেও সেও এক দিন জান্নাতে যাবে, সে চিরস্থায়ী জাহান্নামি হবে না। বেশ কিছু হাদিস দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত। একটি হাদিস জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যে আল্লাহর সঙ্গে কোনো ধরনের শিরক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।"১
তাদের পর কাফের, মুশরিক ও মুনাফিক ছাড়া আর কেউ জাহান্নামে থাকবে না। এরা কখনও জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে না। কোনো সুপারিশ তাদের কাজে আসবে না। অবশ্যই আমাদের কুফর, শিরক ও মুনাফিকি থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

টিকাঃ
১. বুখারি, ৭৫১০।
২. বুখারি, ৭৪৩৯।
৩. মুসলিম, ৩০২。
১. মুসলিম, ১৫১।

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 একটি বিশেষ প্রবণতা ও তা থেকে সতর্কতা

📄 একটি বিশেষ প্রবণতা ও তা থেকে সতর্কতা


ঈমান নিয়ে লেখালেখির সময় একটি বিশেষ প্রবণতা দেখা যায়, যে বিষয়ে সতর্কতা জরুরি। ঈমান সম্পর্কে যারা লেখালেখি করেন, তাদের অধিকাংশ কথাই হয়ে থাকে ঈমানের সর্বোচ্চ স্তরকে সামনে রেখে। যেই স্তরটা আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি দান করবে; যে ধরনের ঈমানের অধিকারী জাহান্নামে যাবেই না। কুরআন-হাদিসে অনেক স্থানেই এই ঈমানের আলোচনা এসেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ ايتُهُ زَادَتْهُمْ إِيْمَانًا وَ عَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ ﴿٢﴾ الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلوةَ وَ مِمَّا رَزَقْنَهُمْ يُنْفِقُوْنَ ﴿۳﴾
নিশ্চয় মুমিন তারা, আল্লাহর কথা স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে, যখন তাদের কাছে তাঁর আয়াত পাঠ করা হয়, তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। তারা কেবল তাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে। যারা নামাজ কায়েম করে, আমি যা দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে, তারাই প্রকৃত মুমিন।'১
রাসুল সা. বলেন, 'ঈমানের সাতাত্তরটি শাখা রয়েছে। সর্বশ্রেষ্ঠ শাখা, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা আর সবচেয়ে ছোট শাখা রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। লজ্জাও ঈমানের একটি শাখা।"২
ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। সর্বনিম্ন স্তরটি থেকে যায় অনালোচিত বা স্বল্পালোচিত। এতে মানুষের মনে সংশয় সৃষ্টি হয়। তারা ভ্রমে পড়ে যায়। মনে হয়—ঈমান দ্বারা উদ্দেশ্য বুঝি তার এই সর্বোচ্চ স্তরই।
ঈমানের সর্বনিম্ন স্তরটি বিস্মৃত হওয়ার সুযোগ নেই। এটাও ঈমানের একটা পর্যায়। এই পর্যায়ের ঈমানের কারণে প্রাথমিকভাবে জাহান্নাম থেকে মুক্তি মিলবে না। তবে, এটি চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে অবস্থান থেকে নিষ্কৃতি দান করবে। তারা প্রথমে জাহান্নামে যাবে। এরপর আল্লাহর বিশেষ দয়া ও সুপারিশে সব শেষে জাহান্নাম থেকে বের হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে। বিষয়টি হাদিসে বিস্তৃত আকারে বর্ণিত হয়েছে। আগেও আলোচনা করা হয়েছে যে, গুনাহগার মুমিনরা পর্যায়ক্রমে চারবার সুপারিশের মাধ্যমে চার স্তরে মুক্তি লাভ করবে ও জান্নাতে প্রবেশ করবে। ঈমানের সর্বনিম্ন এই স্তরটির ব্যাপারে বিস্মৃতি অনেকের মস্তিষ্কে বদ্ধমূল হয়ে আছে। তারা এমন অনেক মানুষকে কাফের সাব্যস্ত করে ও চিরস্থায়ী জাহান্নামি বলে, যারা অন্তত ঈমানের এই সর্বনিম্ন স্তরের অধিকারী। নিশ্চয় তারা মুমিন। মুমিনকে কাফের বলা চরম নিকৃষ্ট কাজ।
মুসলিম জাতি আজ মজলুম। পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে তারা নির্যাতিত, নিপীড়িত। ইসলামের শত্রুরা দেশে দেশে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে, সম্পদ লুণ্ঠন করছে, করছে মুসলিম নারীদের ইজ্জতহরণ। এরই মধ্যে যদি আমরা নিজেরা একে-অপরকে কাফের বলায় বাড়াবাড়ি করি, বিশৃঙ্খলা বাড়বে বৈ কমবে কি? কাফের-মুশরিকদের নির্যাতন-নিপীড়ন কি আমাদের যথেষ্ট মনে হচ্ছে না? আমরা কি নানাবিধ দ্বন্দ্ব উসকে দিয়ে ভিতর থেকেই মুসলিম উম্মাহর শক্তিকে একেবারে নিঃশেষ করে দিতে চাই? শত নির্যাতন-নিপীড়নের পরও, যতটুকু যা অবশিষ্ট আছে—তাও কি আমাদের অসহ্য মনে হচ্ছে? এমন প্রবণতা কারও থাকলে, রবের কাছেই বিচার দিলাম!'১

টিকাঃ
১. সুরা আনফাল, ২-৩।
২. মুসলিম, ৫৮。
১. কে কাফের কে মুসলিম, এটা পরিষ্কার থাকা উচিত। কোনো মুমিনকে কাফের বলা যেমন অন্যায়, কোনো কাফেরকে মুমিন বলা তারচেয়ে কম অন্যায় নয়। তাই বিষয়টি নিয়ে মধ্যপন্থি একটা চর্চা দরকার। দরকার এ সংক্রান্ত দলিল-প্রমাণের নির্মোহ-নিরাবেগ পর্যালোচনা। আল্লাহ তায়ালা আামদের সত্যে পৌঁছার তাওফিক দান করুন। (অনুবাদক)

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 ঈমান ও ইসলামে পার্থক্য

📄 ঈমান ও ইসলামে পার্থক্য


ঈমান বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়। ইসলাম বাহ্যিক আমলের নাম। হাদিসে জিবরাইলে বিষয়টি এভাবেই বর্ণিত হয়েছে। বুখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিস। হজরত আবু হুরায়রা রাজি. বর্ণনা করেন, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক দিন মানুষের সামনে বসা। হঠাৎ এক লোক হেঁটে এল। জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রাসুল, ঈমান কী?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'ঈমান হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা, তাঁর ফেরেশতাগণ, রাসুলগণ, কিতাবসমূহ ও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের বিশ্বাস করা এবং বিশ্বাস করা পরকালের পুনরুত্থানে।' এরপর সে জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রাসুল, ইসলাম কী?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'ইসলাম হচ্ছে, আল্লাহর ইবাদত করা, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা, নামাজ কায়েম করা, ফরজ জাকাত আদায় করা ও রমজানে রোজা রাখা।' এরপর সে ইহসান ও কেয়ামত সম্পর্কেও প্রশ্ন করে।১
মুসলিম শরিফে হজরত উমর রাজি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমরা এক দিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে বসে আছি। হঠাৎ এক লোকের উদয় হল। শ্বেত-শুভ্র পোশাক। ঘন কৃষ্ণ কেশ। সে বলল, 'হে মুহাম্মদ, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে অবগত করুন।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'ইসলাম হচ্ছে, তোমার এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া যে, 'আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কোনো মাবুদ নেই, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল', নামাজ কায়েম করা, জাকাত আদায় করা, রমজানে রোজা রাখা ও সক্ষম হলে হজ করা।' এরপর সে বলল, 'আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবগত করুন।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'ঈমান হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা, তাঁর ফেরেশতাগণ, রাসুলগণ, কিতাবসমূহ ও পরকালে বিশ্বাস স্থাপন এবং ভালো-মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত হওয়ার ব্যাপারে বিশ্বাস স্থাপন।"১
এই উভয় হাদিসেরই শেষে একটি বাক্য এসেছে। এটি খুব ভালো করে লক্ষ করার মতো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'ইনি ছিলেন জিবরাইল। তিনি মানুষদের দ্বীন শেখানোর জন্য এসেছিলেন।'
'ইসলাম শুধু বাহ্যিক আমলের নাম'-এই বিষয়টি বুখারি ও মুসলিম শরিফের অন্য একটি বর্ণনা থেকেও প্রমাণিত হয়।
তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ রাজি. বর্ণনা করেন, 'নজদের এক লোক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এল। তার চুলগুলো ছিল এলোমেলো (বিড়বিড় করে কী যেন বলছিল)। তার গুঞ্জন কানে আসছিল। কিন্তু কী বলছিল, বোঝা যাচ্ছিল না। সে কাছে এল। ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'ইসলাম হচ্ছে, দিবারাত্রি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা।' এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান মাসে রোজা রাখা ও জাকাত আদায় করার কথা বললেন। প্রতিবারই লোকটি বলছিল, 'আমার কি আর কিছু করতে হবে?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছিলেন, 'না, তবে তুমি যদি নফল কিছু কর, সেটা ভিন্ন কথা।' এরপর লোকটি এ কথা বলতে বলতে চলে গেল যে, 'খোদার শপথ, না আমি এর সঙ্গে কিছু বৃদ্ধি করব, না এর থেকে কিছু কমাব।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা শুনে বললেন, 'যদি সত্য বলে থাকে, অবশ্যই সে সফল হবে।"২
হাদিসে জিবরাইল অনেক গুরুত্ববহ একটি হাদিস। এর শিক্ষা অনেক ব্যাপক। তবে, হাদিসটি থেকে অন্যতম সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি বুঝে আসে, তা হল-ঈমান ও ইসলামের পার্থক্যের সারকথা এবং এ দুটোর মর্মগত সীমা-পরিসীমা। কারণ, ঈমান ও ইসলামের বিস্তারিত বিধি-বিধান সাহাবায়ে কেরাম আগে থেকেই সম্যকরূপে অবগত ছিলেন।
ইবনে রজব হাম্বলি রহ. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম কিতাবে এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামের ব্যাখ্যা করেছেন বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজকর্ম দ্বারা। তার কিছু কর্মগত, কিছু মৌখিক। যেগুলোর প্রথমটি হল, এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কোনো মাবুদ নেই, হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল। অন্য দিকে এই হাদিসেই ঈমানের ব্যাখ্যা করা হয়েছে অন্তরে বিশ্বাস রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ের দ্বারা। ১০২

টিকাঃ
১. বুখারি, ৫০; মুসলিম, ৫。
১. মুসলিম, ১।
২. বুখারি, ৪৬; মুসলিম, ৮。
১. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম, ১/৯৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00