📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর

📄 ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর


ঈমানের সর্বোচ্চ স্তরটা বেশ শক্তিশালী। এর ফলে বান্দা আল্লাহর অনুগত হয়ে যায়। তাঁর আদেশ পালন করে। নিষেধ থেকে বেঁচে থাকে। বান্দার কলবে যখন ঈমান শক্তিশালী হয়ে যায়, এর ফলাফল অনেক সুন্দর হয়। ঈমানের এই সুফল হল নেক আমল। এ কারণেই কুরআনের প্রায় পঞ্চাশটি আয়াতে ঈমান ও নেক আমলকে একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّلِحْتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّتُ الْفِرْدَوْสِ نُزُلًا ﴿۱۰۲﴾ حَلِدِينَ فِيهَا لَا يَبْغُوْنَ عَنْهَا حِوَلًا .
যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে, তাদের আপ্যায়নের জন্য রয়েছে ফেরদাউসের উদ্যান। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে, তারা সেখান থেকে স্থানান্তর কামনা করবে না।'১
নেক আমল যে ঈমানে সুফল ও আমল যে ঈমানের অংশবিশেষ নয়, এর আরেকটি মজবুত যুক্তি হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা নেক আমল কবুল হওয়ার জন্য ঈমানকে শর্ত সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمَنْ يَعْمَلْ مِنَ الصَّلِحَتِ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَا يَخْفُ ظُلْمًا وَلَا هَضْبًا
যে মুমিন ভালো কাজ করে, তার জুলুম বা অন্য কোনো ক্ষয়-ক্ষতির ভয় নেই।২
নেক আমল কবুল হওয়ার জন্য ঈমানের শর্ত হওয়াটা প্রমাণ করে, নেক আমল আর ঈমান এক বিষয় নয়, নেক আমল ঈমানের অংশবিশেষও নয়। কারণ, শর্ত ও শর্তাধীন বিষয় একটি অপরটির থেকে ভিন্ন হয়।

টিকাঃ
১. সুরা কাহাফ, ১০৭-১০৮。
২. সুরা ত্বহা, ১১২।

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 ঈমানের সর্বনিম্ন স্তরের বিবরণ

📄 ঈমানের সর্বনিম্ন স্তরের বিবরণ


ঈমান যখন একেবারে নিম্ন স্তরে থাকে, তখন তা খুব বেশি ফলদায়ক হয় না, সে ঈমান হয় একেবারে দুর্বল। বান্দা আল্লাহর আদেশ পালনে অলসতা করে। আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নিষিদ্ধ কাজগুলো করতে থাকে। এর কারণে সে জাহান্নামের উপযুক্ত হয়ে পড়ে।
সাধারণত ঈমান যখন একেবারে সর্বনিম্ন স্তরে থাকে, তা কোনো নেক আমলে উদ্বুদ্ধ করে না। এই ঈমানের অধিকারী বান্দা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তায়ালা যত দিন চান, সেখানে অবস্থান করবে। এই সময়টা অনেক লম্বা হবে। অন্য মুমিনরা তাদের আগেই বেরিয়ে আসবে জাহান্নাম থেকে। সুপারিশের প্রথম তিন স্তরে তারা মুক্তি পাবে না। বরং তারা মুক্তি পাবে একেবারে সর্বশেষে, পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহে।

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 দুর্বল ঈমানদারদের পরিণতি

📄 দুর্বল ঈমানদারদের পরিণতি


যাদের ঈমান দুর্বল, সৎ কর্ম করে না, আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘন করে, তাদের মন্দ পরিণামের ব্যাপারে এখানে কিঞ্চিৎ আলোচনা করে নেওয়া প্রয়োজন। আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে আদম আলাইহিস সালামের পুত্রের জবানে তার ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলা কথা উল্লেখ করে এরশাদ করেন-
إِنِّي أُرِيدُ أَنْ تَبُوا بِاثْمِي وَ إِثْمِكَ فَتَكُوْنَ مِنْ أَصْحُبِ النَّارِ وَ ذَلِكَ جزوا الظَّلِمِينَ ﴿٢٩﴾
আমি চাই তুমি আমার ও তোমার গুনাহ নিয়ে ফিরে যাবে। এর প্রতিফলে তুমি হবে জাহান্নামের অধিবাসী। আর সেটাই অত্যাচারীদের পরিণাম।১
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
وَ الَّذِينَ كَسَبُوا السَّيِّاتِ جَزَاءُ سَيِّئَةٍ بِمِثْلِهَا وَتَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ مَّا لَهُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ عَاصِمٍ كَأَنَّمَا أُغْشِيَتْ وُجُوهُهُمْ قِطَعًا مِّنَ الَّيْلِ مُظْلِمًا ، أولئِكَ أَصْحَبُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خُلِدُوْنَ ﴿۲৭﴾
যারা মন্দ কাজ করে, তাদের প্রতিফলও অনুরূপ মন্দ। হীনতা তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলবে, আল্লাহর থেকে তাদের রক্ষা করার মতো কেউ নেই। তাদের মুখমণ্ডল যেন রাতের অন্ধকার আবরণে আচ্ছাদিত। তারাই জাহান্নামের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে।২
কুরআনে আরও এসেছে-
وَ جَزَؤُا سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَ أَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّلِمِينَ ﴿٤٠﴾
মন্দের পরিণাম অনুরূপ মন্দ। যে ক্ষমা করে দেয় ও আপস- নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। আল্লাহ জালেমদের পছন্দ করেন না।’

টিকাঃ
১. সুরা মায়েদা, ২৯।
২. সুরা ইউনুস, ২৭。
১. সুরা শুরা, ৪০।

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 তবুও তারা এক সময় মুক্তি পাবে

📄 তবুও তারা এক সময় মুক্তি পাবে


জালেম ও গুনাহগারদের জন্য পৃথিবীতে তাদের কৃতকর্মের প্রতিফলস্বরূপ পরকালে জাহান্নাম অপেক্ষা করছে। তারা সেখানে বহু কাল অবস্থান করবে। আগুনে পুড়ে পুড়ে গুনাহ থেকে পবিত্র হবে। যদি ঈমান নিয়ে মারা গিয়ে থাকে, তারা শাফায়াত (চতুর্থ স্তর) লাভ করবে। শাস্তি ভোগের পর যারা শাফায়াত লাভ করবে, তাদের জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। তারা সেখানে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে না।
ইমাম বুখারি রহ. আনাস ইবনে মালেক রাজি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (শাফায়াতের হাদিসে) বলেন, ‘এরপর আমি আপন রবের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করব। আমাকে অনুমতি দেওয়া হবে। এরপর তিনি আমার হৃদয়ে ঢেলে দেবেন কিছু স্তুতিবাক্য, যা ইতিপূর্বে আমার মনে আসেনি যে, আমি সেগুলোর সাহায্যে তাঁর প্রশংসা করব। আমি বলব, হে আমার রব, আমার উম্মতকে মুক্তি দিন! আমার উম্মতকে মুক্তি দিন! তখন বলা হবে, যাও, যার হৃদয়ে যব-পরিমাণ ঈমান আছে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনো। আমি যাব। আল্লাহ তায়ালা যা বলেছেন, তা করব। এরপর আবার আমি সেই বাক্যগুলো দ্বারা রবের প্রশংসা করব। আবার বলা হবে, যাও, যার হৃদয়ে বিন্দু-পরিমাণ- অন্য বর্ণনায় আছে সরিষা-পরিমাণ-ঈমান আছে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনো। আমি যাব। তা করব। এরপর আবার সে সব স্তুতিবাক্যে আল্লাহর প্রশংসা করব। আবার আল্লাহ তায়ালা বলবেন, যাও, যার মনে
সবচেয়ে ছোট সরিষা দানা-পরিমাণ ঈমান আছে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনো। আমি যাব। সেরূপ করব। এরপর চতুর্থবার আবার সে সব বাক্যে প্রশংসা করব। আমি বলব, হে আমার রব, যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে, আমাকে তার ব্যাপারে অনুমতি দিন। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আমার সম্মান বড়ত্ব ও মর্যাদার শপথ, অবশ্যই যে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে তাকে আমি জাহান্নাম থেকে বের করব।"১
হাদিসে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ দ্বারা তার অপর অংশ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ-সহ উদ্দেশ্য।
শাফায়াতের এই চতুর্থ স্তরের প্রকৃত বর্ণনা পাওয়া যায় বুখারি ও মুসলিমের অন্য একটি হাদিসের মাধ্যমে। হাদিসটির বর্ণনাকারী আবু সাঈদ খুদরি রাজি.। বুখারি শরিফে এসেছে, 'পরাক্রমশালী আল্লাহ বলবেন, এখনও আমার সুপারিশ অবশিষ্ট আছে। এরপর তিনি নিজের কুদরতি থাবার একটা থাবা জাহান্নামে মারবেন। এর মাধ্যমে তিনি এক দল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন। তখন জান্নাতিরা বলবে, এরা হল দয়াময়ের পক্ষ থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত দল। তিনি তাদের কোনো আমল করা বা কোনো কল্যাণ অগ্রে প্রেরণ ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন।'২
এই হাদিসেরই মুসলিম শরিফের বর্ণনায় এসেছে, 'আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ফেরেশতারা সুপারিশ করেছে, নবীরা সুপারিশ করেছে, সুপারিশ করেছে মুমিনরাও; এখন কেবল বাকি আছেন পরম করুণাময়! এরপর তিনি জাহান্নাম থেকে (কুদরতি মুষ্ঠির) এক মুষ্ঠি-পরিমাণ তুলে আনবেন। এর মাধ্যমে তিনি এমন কিছু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন, যারা কখনও কোনো ভালো কাজ করেনি।'৩
আল্লাহর রহমত অপার, অসীম। যার বিন্দু থেকে বিন্দু-পরিমাণ ঈমান থাকবে, সেই সামান্য নিষ্প্রভ ঈমান যদি তাকে কোনো নেক আমলে উদ্বুদ্ধ নাও করে, তারপরও রাব্বুল আলামিন তাকে একেবারে শেষ পর্যায়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন। হাদিসে সে সব লোকের কথা বলা হয়েছে এই ভাষায় যে, 'তারা কখনও কোনো ভালো কাজ করেনি', যুগ যুগ তারা শাস্তি ভোগ করবে। তবে অবশেষে তারা চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে অবস্থান থেকে মুক্তি লাভ করবে। প্রবেশ করবে শান্তি-সুখের মনোরম উদ্যানে।
যে হৃদয়ে সত্য বিশ্বাসসহ শুধু কালেমা পড়েছে, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ' কালেমা বলা ও তার বিষয়বস্তু বিশ্বাস করা ছাড়া আর কোনো আমল করেনি, শাস্তি ভোগ করে হলেও সেও এক দিন জান্নাতে যাবে, সে চিরস্থায়ী জাহান্নামি হবে না। বেশ কিছু হাদিস দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত। একটি হাদিস জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'যে আল্লাহর সঙ্গে কোনো ধরনের শিরক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।"১
তাদের পর কাফের, মুশরিক ও মুনাফিক ছাড়া আর কেউ জাহান্নামে থাকবে না। এরা কখনও জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে না। কোনো সুপারিশ তাদের কাজে আসবে না। অবশ্যই আমাদের কুফর, শিরক ও মুনাফিকি থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

টিকাঃ
১. বুখারি, ৭৫১০।
২. বুখারি, ৭৪৩৯।
৩. মুসলিম, ৩০২。
১. মুসলিম, ১৫১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00