📄 ঈমানের স্তরবিন্যাস ও সুফল
ঈমান অর্থ বিশ্বাস। বিশ্বাস হৃদয়জাত ক্রিয়া। তাই মূল ঈমানের স্থান হৃদয়। কুরআনের অনেক আয়াতে এ ব্যাপারে ইঙ্গিত রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
أُولَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيْمَانَ
তারাই এমন লোক, যাদের হৃদয়ে আল্লাহ ঈমান বদ্ধমূল করে দিয়েছেন।১
কুরআনে আরও এসেছে-
قَالَتِ الْأَعْرَابُ أَمَنَّا قُلْ لَّمْ تُؤْمِنُوا وَلَكِنْ قُوْلُوا أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ الْإِيْمَانُ فِي قُلُوْبِكُمْ
বেদুইনরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি। বলুন, তোমরা ঈমান আনোনি; বরং বলো, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি; এখনও তোমাদের হৃদয়ে ঈমান প্রবেশ করেনি।২
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيْمَانِهَ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنَّ بِالْإِيْمَانِ وَ لكِنْ مَنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللَّهِ ،
কেউ ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং কুফরির জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার উপর আল্লাহর গজব আপতিত হবে আর তার জন্য রয়েছে মহা শান্তি; তবে, তার জন্য নয়, যাকে কুফরির জন্য বাধ্য করা হয়, কিন্তু তার মন থাকে ঈমানে অবিচল।১
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَتِ
নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারীরা, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা।
এখানে মুমিনকে মুসলিমের উপর আতফ করা হয়েছে।
অনেক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সৎ কর্ম সম্পাদনকে ঈমান আনার উপর আতফ করেছেন। মাতুফ ও মাতুফ আলাইহি একটি আরেকটির বিপরীত হয়। অতএব, বোঝা গেল, ঈমান এক বিষয়, ইসলাম আরেক বিষয়। ঈমান অন্তরের বিশ্বাসের নাম আর ইসলাম বাহ্যিক ক্রিয়াকর্মের। দুটোর মাঝে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান।
মোদ্দাকথা, রোকনসমূহ ও ইসলামের যাবতীয় কর্মকাণ্ড ঈমানের অংশ নয়, তবে এগুলো দ্বীনের অংশ। ঈমান ও ইসলাম উভয়ের সমন্বিত রূপকে দ্বীন বলে।
টিকাঃ
১. সুরা মুজাদালা, ২২।
২. সুরা হুজুরাত, ১৪。
১. সুরা নাহল, ১০৬।
📄 হাদিস শরিফে ঈমান ও ইসলামের পার্থক্য
হাদিস থেকেও ঈমান ও ইসলামের পার্থক্যের বিষয়টি চিহ্নিত করা যায়। মুসনাদে আহমদ, সুনানে আবু দাউদ, মুসনাদে আবু ইয়ালা, সহিহ ইবনে হিব্বান ও মুজামুল কাবির লিত তাবারানিতে বেশ কয়েকজন সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-'হে ওই সকল লোক, যারা শুধু মুখে ঈমান এনেছ, কিন্তু অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি; তোমরা مسلمانوں দোষচর্চা করো না, তাদের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না। কারণ, যারা মুসলমানদের গোপন বিষয়ের পিছে লেগে থাকে, আল্লাহও তাদের গোপন বিষয় সন্ধান করেন। আর আল্লাহ যাদের গোপন বিষয় সন্ধান করেন, তাদের তিনি লাঞ্ছিত করে ছাড়েন, যদিও তারা নিজেদের গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করে।"১
আনাস ইবনে মালেক রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'ইসলাম বাহ্যিক বিষয়, ঈমান থাকে অন্তরে।'২ অবশ্য হাদিসটির সূত্র দুর্বল।
টিকাঃ
২. আতফ আরবি ব্যাকরণের একটি পরিভাষা। আরবি ভাষায় 'ওয়াও' 'ফা' 'সুম্মা' বা এ জাতীয় অব্যয়-সহযোগে কোনো বাক্যকে বাক্যের সঙ্গে বা শব্দকে শব্দের সঙ্গে সমন্ধযুক্ত করাকে আতফ বলে। অব্যয়-পূর্ববর্তী শব্দ বা বাক্যকে মাতুফ আলাইহি এবং পরবর্তীতে যা থাকে তাকে মাতুফ বলে। (অনুবাদক)
১. মুসনাদে আহমদ, ১৯৭৭৬; সুনানে আবু দাউদ, ৪৮৮০; মুসানদে আবু ইয়ালা, ৭৪২৩; সহিহ ইবনে হিব্বান, ১৮৭৪; মুজামুল কাবির লিত তাবারানি, ১১৪৪৪。
২. মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, ৩০০১৯; মুসনাদে আহমদ, ১২৩৮১; মুসনাদে আবু ইয়ালা, ২৯২৩; আল-ইবানাতুল কুবরা, ১০৭৬। উল্লিখিত হদিসের সনদে আলি ইবনে মাসয়াদা বসরি দুর্বল বর্ণনাকারী।
📄 ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর
ঈমানের সর্বোচ্চ স্তরটা বেশ শক্তিশালী। এর ফলে বান্দা আল্লাহর অনুগত হয়ে যায়। তাঁর আদেশ পালন করে। নিষেধ থেকে বেঁচে থাকে। বান্দার কলবে যখন ঈমান শক্তিশালী হয়ে যায়, এর ফলাফল অনেক সুন্দর হয়। ঈমানের এই সুফল হল নেক আমল। এ কারণেই কুরআনের প্রায় পঞ্চাশটি আয়াতে ঈমান ও নেক আমলকে একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّلِحْتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّتُ الْفِرْدَوْสِ نُزُلًا ﴿۱۰۲﴾ حَلِدِينَ فِيهَا لَا يَبْغُوْنَ عَنْهَا حِوَلًا .
যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে, তাদের আপ্যায়নের জন্য রয়েছে ফেরদাউসের উদ্যান। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে, তারা সেখান থেকে স্থানান্তর কামনা করবে না।'১
নেক আমল যে ঈমানে সুফল ও আমল যে ঈমানের অংশবিশেষ নয়, এর আরেকটি মজবুত যুক্তি হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা নেক আমল কবুল হওয়ার জন্য ঈমানকে শর্ত সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمَنْ يَعْمَلْ مِنَ الصَّلِحَتِ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَا يَخْفُ ظُلْمًا وَلَا هَضْبًا
যে মুমিন ভালো কাজ করে, তার জুলুম বা অন্য কোনো ক্ষয়-ক্ষতির ভয় নেই।২
নেক আমল কবুল হওয়ার জন্য ঈমানের শর্ত হওয়াটা প্রমাণ করে, নেক আমল আর ঈমান এক বিষয় নয়, নেক আমল ঈমানের অংশবিশেষও নয়। কারণ, শর্ত ও শর্তাধীন বিষয় একটি অপরটির থেকে ভিন্ন হয়।
টিকাঃ
১. সুরা কাহাফ, ১০৭-১০৮。
২. সুরা ত্বহা, ১১২।
📄 ঈমানের সর্বনিম্ন স্তরের বিবরণ
ঈমান যখন একেবারে নিম্ন স্তরে থাকে, তখন তা খুব বেশি ফলদায়ক হয় না, সে ঈমান হয় একেবারে দুর্বল। বান্দা আল্লাহর আদেশ পালনে অলসতা করে। আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নিষিদ্ধ কাজগুলো করতে থাকে। এর কারণে সে জাহান্নামের উপযুক্ত হয়ে পড়ে।
সাধারণত ঈমান যখন একেবারে সর্বনিম্ন স্তরে থাকে, তা কোনো নেক আমলে উদ্বুদ্ধ করে না। এই ঈমানের অধিকারী বান্দা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তায়ালা যত দিন চান, সেখানে অবস্থান করবে। এই সময়টা অনেক লম্বা হবে। অন্য মুমিনরা তাদের আগেই বেরিয়ে আসবে জাহান্নাম থেকে। সুপারিশের প্রথম তিন স্তরে তারা মুক্তি পাবে না। বরং তারা মুক্তি পাবে একেবারে সর্বশেষে, পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহে।