📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 ঈমানের শাব্দিক অর্থ

📄 ঈমানের শাব্দিক অর্থ


ঈমান অর্থ বিশ্বাস, অন্তরের প্রত্যয়।
'তাসদিক' অর্থ সত্য বলে মেনে নেওয়া। উলামায়ে কেরাম ঈমানের সংজ্ঞায় শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। তাসদিক শব্দটি ঈমান অর্থে হাদিস শরিফেও এসেছে। হজরত আনাস ইবনে মালেক রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'জান্নাতের ব্যাপারে আমিই সর্বপ্রথম সুপারিশকারী হব। আমি যত মানুষের কাছে সত্য বলে স্বীকৃত হয়েছি, এতটা আর কোনো নবী হননি। নবীদের মাঝে এমনও নবী আছেন, যাকে তাঁর জাতির একজনমাত্র মানুষ সত্য বলে স্বীকার করেছে।'২

টিকাঃ
২. মুসলিম, ১৯৬; মুসনাদে আবু ইয়ালা, ৩৯৬৮; আত-তাওহিদ, ২/৬১৮।

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 ঈমানের পারিভাষিক অর্থ

📄 ঈমানের পারিভাষিক অর্থ


পরিভাষায়-আল্লাহ তায়ালা, ফেরেশতাগণ, আসমানি কিতাব, নবী-রাসুল ও পরকালকে সত্য বলে বিশ্বাস করাকে ঈমান বলে।

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 সংজ্ঞা বিশ্লেষণ

📄 সংজ্ঞা বিশ্লেষণ


ঈমানের জন্য শুধু বিশ্বাসই যথেষ্ট নয়, সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর উপর বিশ্বাসের বিপরীত সব কিছু থেকে নিজেকে মুক্ত করাও আবশ্যক। অর্থাৎ, ঈমানের রোকনগুলো' সত্য বলে মেনে নেওয়া ও সেগুলো মনে-প্রাণে গ্রহণ করার নাম ঈমান। ঈমানের বিষয়বস্তু মনে-প্রাণে গ্রহণ করা ছাড়া, শুধু সত্য বলে জানা 'ঈমান' বলে গণ্য হবে না।

টিকাঃ
১. রোকন অর্থ-স্তম্ভ, খুঁটি। যে সব উপাদানকে আশ্রয় করে কোনো বস্তু অস্তিত্বে আসে, যে সবের অনুপস্থিতিতে বস্তুর অস্তিত্ব বিনাশ হয়ে যায়- সেগুলোকেই সে বস্তুর রোকন বলা হয়।

📘 ঈমান ভঙ্গের কারণ ও তাকফিরের ভুলনীতি > 📄 একটি সংশয় নিরসন

📄 একটি সংশয় নিরসন


কিছু মানুষ মনে করে, প্রথম তিন যুগৎ-হাদিসের ভাষায় যাকে সোনালি যুগ বলে অভিহিত করা হয়েছে-অতিবাহিত হওয়ার পর অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম শুধু তাওহিদুর রবুবিয়্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাওহিদ বলতে তারা কেবল তাওহিদুর রবুবিয়্যাই বুঝতেন। তাওহিদুল উলুহিয়্যা সম্পর্কে তারা ছিলেন একেবারেই উদাসীন। এই ধারণা শুদ্ধ নয়। এমন ধারণা জ্ঞান-স্বল্পতার পরিচায়ক। বস্তুত উলামায়ে কেরাম অবিচ্ছিন্ন ধারায় উভয় প্রকার তাওহিদ নিয়েই সমান আলোচনা করেছেন। তাদের মধ্য থেকে উদাহরণস্বরূপ আমরা অল্প কয়েকজন আলেমের বক্তব্য উল্লেখ করছি।
ইমাম আবু মানসুর মাতুরিদি রহ.
ইমাম আবু মানসুর মাতুরিদি (মৃত্যু: ৩৩৩ হি.)। মাতুরিদি মাজহাবের ইমাম। আকিদার একটি প্রসিদ্ধ মাজহাব এটি। তিনি নিজের কিতাব তাওয়িলাতু আহলিস সুন্নাহতে বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন—
قَالَ يُقَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِّنْ إِلَهِ غَيْرُهُ إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا مُفْتَرُوْنَ.
সে বলল, হে আমার জাতি, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো উপাস্য নেই।'
আমরা উল্লেখ করেছি, রাসুলগণ একমাত্র আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বানের জন্যই প্রেরিত হয়েছেন। ইবাদত একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য। তিনি ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত আর কোনো মাবুদ নেই। এটাই রাসুলদের দাওয়াতের মূল প্রতিপাদ্য। এই দিকে আহ্বানের জন্যই তারা প্রেরিত হয়েছেন।'
তিনি কুরআনের আয়াত—
وهُوَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ الهُ وَ فِي الْأَرْضِ إِلهُ
'তিনি আসমানেও প্রভু, জমিনেও প্রভু'-এর ব্যাখ্যায় বলেন, "ইলাহ' শব্দের আভিধানিক অর্থ মাবুদ, উপাস্য। যেন আল্লাহ তায়ালা বলছেন, তোমরা জানো যে, আল্লাহ তায়ালা যেমন নভোমণ্ডলে উপাস্য, তেমন উপাস্য তিনি ভূমণ্ডলেও।'
আরেকটি আয়াত—
رَبِّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا إِنْ كُنْتُمْ مُّوْقِنِينَ ﴿4﴾ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ
তিনি নভোমণ্ডল ভূমণ্ডল ও এর মধ্যস্থিত সব কিছুর প্রতিপালক। যদি তোমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে, (তা হলে বুঝতে যে, তিনিই প্রতিপালক।) তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নাই।১
এ আয়াতের ব্যাখায় তিনি বলেন, 'এরপর আল্লাহ তায়ালা নিজের বিশেষণ উল্লেখ করছেন এই বলে যে, 'তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই'; যেন তিনি বলছেন, তিনি ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত আর কোনো মাবুদ নেই। কারণ, আরবদের কাছে ইলাহ অর্থ উপাস্য। তিনি বলছেন, তারা যে সব জিনিসের উপাসনা করে, তার কোনোটাই উপাস্য হওয়ার উপযুক্ত নয়। উপাস্য হওয়ার একমাত্র উপযুক্ত আল্লাহ তায়ালা, যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।'
আবু বকর বাকিল্লানি আল-আশআরি রহ. ইমাম আবু বকর মুহাম্মদ ইবনুত তাইয়েব আল-বাকিল্লানি আল-আশআরি (মৃত্যু: ৪০৩ হি.) বলেন, 'আমাদের জানতে হবে, পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা একজনই। তিনি একক। অর্থাৎ, তিনি ছাড়া এতে আর কেউ অংশীদার নেই, ইবাদতের উপযুক্ত একমাত্র তিনিই।'২
ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি রহ. ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি আল-আশআরি (মৃত্যু: ৬০৬) রহ. বলেন, 'আল্লাহর বাণী: 'আমরা তোমারই ইবাদত করি' প্রমাণ করে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই। আল্লাহ তায়ালা ছাড়া যেহেতু কোনো মাবুদ নেই, তিনি ছাড়া কোনো প্রভুও নেই। 'আমরা তোমারই ইবাদত করি, তোমারই কাছে সাহায্য চাই'-কুরআনের এই বাণী বিশুদ্ধ তাওহিদের অনন্য দলিল।"৩
কুরআনের আয়াত: 'তারা যা কিছু তার সঙ্গে শরিক করে, তা থেকে তিনি পবিত্র'-এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, 'আদেশ করা ও বিধান আরোপে কোনো অংশীদারের বিদ্যমানতা থেকে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র। সেজদা, উপাসনা ও সর্বোচ্চ সম্মানপ্রাপ্তির অধিকারী হওয়ার ক্ষেত্রেও তার কোনো শরিক নেই।"১
তিনি আরও বলেন, 'আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করাই শিরক। '২
ইমাম ইজুদ্দিন আবদুস সালাম রহ. ইমাম ইজুদ্দিন আবদুল আজিজ বিন আবদুস সালাম (মৃত্যু: ৬৬০ হি.) বলেন, 'কারও প্রভু হওয়ার ভিত্তি তার উপাস্য হওয়ার অধিকারী হওয়ার উপর। কেবল সে-ই উপাস্য হওয়ার অধিকারী, যে উল্লিখিত গুণসমূহে গুণান্বিত।' অন্যত্র তিনি বলেন, 'প্রভুত্বের অধিকারী কেবল সে-ই হবে, যে আমাদের বর্ণিত গুণসমূহে গুণান্বিত হবে।"৩
ইমাম নববি রহ. ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে শারাফ আন-নববি রহ. (মৃত্যু: ৬৭৬ হি.) বলেন, 'কুরআন তেলাওয়াতের পর সবচেয়ে উত্তম জিকির, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর জিকির করা। এর অর্থ, আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কোনো সত্য উপাস্য অস্তিত্বে নেই।'
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ.
শায়খ আহমদ ইবনে আবদুল হালিম ইবনে তাইমিয়া রহ. (মৃত্যু: ৭২৮) বলেন, 'মুসলমানরা বলে, 'সৃষ্টি ও আদেশ তাঁরই'১ তিনি ছাড়া যেমন কেউ সৃষ্টি করে না, তেমনি তিনি ছাড়া কেউ আদেশও করতে পারে না। তিনিই উপাস্য। আনুগত্যও একমাত্র তাঁরই। তিনি ছাড়া আর কেউ ইবাদতের উপযুক্ত নয়।'২
'কে আল্লাহকে যথাযথভাবে চেনে' - এটি উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি কোনো মাখলুকের জন্য প্রভুত্বের লেশমাত্র থাকারও সাক্ষ্য দেয় না। সে সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো স্রষ্টা নেই, তিনি ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত আর কেউ নেই এবং যার মাঝে পাওয়া যায় 'আমরা তোমারই ইবাদত করি, তোমারই কাছে সাহায্য চাই'-আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন।৩
শায়খ মুহাম্মদ বিন ইউসুফ তিলিমসানি রহ.
শায়খ মুহাম্মদ বিন ইউসুফ বিন উমার তিলিমসানি আস-সানুসি রহ. (মৃত্যু: ৭৯৫) বলেন, 'ইলাহ অর্থ অবধারিত অস্তিত্বের অধিকারী ইবাদতের উপযুক্ত সত্তা। এটাই ইলাহ শব্দের বাস্তব মর্ম। এর অর্থ দাঁড়ায় এই যে, সেই একক সত্তা, যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত আর কারও অস্তিত্ব নেই। কারণ, ইবাদতের উপযুক্ত একমাত্র তিনিই হতে পারেন, যিনি চির-অমুখাপেক্ষী এবং তিনি ছাড়া আর সবই যাঁর কাছে মুখাপেক্ষী।৪ ও
মুকাদ্দিমাতের ব্যাখ্যাগ্রন্থে তিনি আরও বলেন, 'শিরক ছয় প্রকার:
এক. শিরকে ইস্তেকলাল - একাধিক স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রভুর অস্তিত্ব মানা। যেমন, অগ্নিপূজারিদের শিরক।
দুই. শিরকে তাবয়িজ-কয়েকজন প্রভুর সমষ্টিকে একজন প্রভু বলা। যেমন, খ্রিষ্টানদের শিরক।
তিন. শিরকে তাকরিব-আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ব্যাপারে এই বিশ্বাস রাখা যে, তার ইবাদত করলে সে আল্লাহর কাছে ইবাদতকারীর মর্যাদা বৃদ্ধি করার সক্ষমতা রাখে। জাহেলি যুগে এ ধরনের শিরকের প্রমাণ পাওয়া যায়।'
এরপর তিনি শিরকের অন্যান্য প্রকারেরও উল্লেখ করেন।'১
শায়খ ইবরাহিম বিন মুহাম্মদ বাজুরি রহ. শায়খ ইবরাহিম বিন মুহাম্মদ আল-বাজুরি রহ. (মৃত্যু: ১২৮৬) বলেন, 'ইলাহ অর্থ সত্য উপাস্য। যেহেতু ইলাহ অর্থ সত্য উপাস্য, তাই 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' অর্থ 'আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কোনো সত্য মাবুদ নেই'।'২

টিকাঃ
১. রব ও ইলাহ হিসেবে আল্লাহকে এক ও একক বিশ্বাস করা।
২. উদ্দেশ্য খাইরুল কুরুন, অর্থাৎ রাসুল সা., সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িদের যুগ।
১. সুরা হুদ, ৫০।
২. সুরা, ৮৪।
১. সুরা দুখান, ৭।
২. আল-ইনসাফ, পৃ. ৯।
৩. মাফাতিহুল গাইব, খ. ১, পৃ. ২১০।
১. প্রাগুক্ত, খ. ১৬, পৃ. ৩১।
২. প্রাগুক্ত, খ. ১৬, পৃ. ১৬।
৩. বর্ণিত গুণসমূহ দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য, আশআরি উলামায়ে কেরাম কর্তৃক আল্লাহর নিরানব্বইটি গুণবাচক নামকে চারটি ব্যাপকার্থবোধক বাক্যের মাধ্যমে বোঝার প্রচেষ্টা। তারা বলেন, 'আল্লাহর সকল গুণবাচক নাম 'সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'- এই চারটি মৌলিক বাক্যের মাঝে পাওয়া যায়। 'সুবহানাল্লাহ' দ্বারা উদ্দেশ্য, আল্লাহর সকল ত্রুটি থেকে পবিত্র হওয়া। 'আলহামদলিল্লাহ' দ্বারা উদ্দেশ্য, তাঁর সকল পরিপূর্ণতার গুণের ধারক হওয়া। 'আল্লাহু আকবার' দ্বারা উদ্দেশ্য, উচ্চতা ও মর্যাদার যত বড় স্তর আমরা কল্পনা করতে পারি, তিনি তাঁর সব কিছুর ঊর্ধ্বে। আর যিনি সকল ত্রুটি থেকে পবিত্র, সকল গুণের আধার, বড়ত্বে যার সমকক্ষ কেউ নেই, তিনি ছাড়া আর কেউ প্রভু বা উপাস্য হওয়ার উপযুক্ত নয়। (তাবাকাতুশ শাফিয়িয়্যাতুল কুবরা [সংক্ষেপিত), খ. ৮, পৃ. ২২০-২২১)
১. সুরা আরাফ, ৫৪।
২. আল-জাওয়াবুস সহিহ লিমান বাদ্দালা দিনাল মাসিহ, খ. ৩, পৃ. ১০৩।
৩. আর-রদ্দু আলাল মানতিকিয়্যিন, পৃ. ৫২।
৪. শরহুল উম্মিল বারাহিন লিস সানুসি।
১. শরুহল মুকাদ্দিমাত লিস সানুসি।
২. হাশিয়াতুল বাজুরি আলা মতনিস সানুসিয়্যা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00