📘 ঈমান-কুফর ও তাকফীর > 📄 পাকিস্তান দারুল ইসলাম, না দারুল হরব?

📄 পাকিস্তান দারুল ইসলাম, না দারুল হরব?


হজরত মুফতি মুহাম্মদ শফি রাহিমাহুল্লাহ ও তাঁর মতো আলেমগণ নিঃসন্দেহে 'দারুল ইসলাম' প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন লালন করেই পাকিস্তান গঠন করেছেন। তাঁদের কারো নেক নিয়তের ব্যাপারে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এর জন্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতি গ্রহণ করার ফলে কার্যত কী হয়েছে? পাকিস্তান দারুল ইসলাম হয়েছে, না দারুল হরবই রয়ে গেছে? প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করার জন্য নিম্নে কিছু বাস্তবতা তুলে ধরা হবে ইনশাআল্লাহ ।
তার আগে প্রসিদ্ধ 'আহসানুল ফাতাওয়া' কিতাবের লেখক আল্লামা মুফতি রশিদ আহমদ লুধিয়ানবি রাহিমাহুল্লাহর কিছু অভিজ্ঞতা ও অভিব্যক্তি উল্লেখ করছি। তিনি লিখেছেন, '... যখন তাদেরকে [গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাকিস্তানকে দারুল ইসলাম বানানোর উদ্দেশ্যে আন্দোলনকারী আকাবিরগণের অনুসারীদেরকে] বলা হয়, আপনারা তো ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার দাবিদার। কিন্তু আপনারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজেরা যে কর্মপন্থা [গণতন্ত্র] অবলম্বন করছেন, তা তো অনৈসলামিক ও নাজায়েজ।
তখন তারা প্রত্যুত্তরে বলে, 'যদিও এ পদ্ধতি নাজায়েজ, কিন্তু তা ব্যতীত ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এ জন্য এখন জায়েজ- নাজায়েজের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করা আবশ্যক। ক্ষমতা অর্জিত হলে পরিপূর্ণভাবে ইসলাম বাস্তবায়ন করব।'
এটি ধোঁকা ছাড়া কিছুই নয়। তাঁদের নিয়তের ব্যাপারে আমরা সন্দেহ করছি না; কিন্তু তাঁদের কর্মপদ্ধতি এমন, যার মাধ্যমে কখনোই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশা করা যায় না। কেননা অনৈসলামিক পদ্ধতিতে দীনহীনদের জন্য তো সফলতা অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু দীনদারদের জন্য প্রথমত সফলতা অর্জন করাই সম্ভব নয়। আর যদি বাহ্যত সফল হয়েও যায়, তবু তার পরিণামে ইসলাম আসবে না। বরং ইসলামের নামে অন্য কিছু হবে।
এ বইয়ের ১৯৪-১৯৬ নং পৃষ্ঠায় জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরের দারুল ইফতার প্রধান মুফতি হামিদুল্লাহ জান ও জামিয়া ফারুকিয়ার শায়খুল হাদিস মাওলানা সালিমুল্লাহ খান রাহিমাহুমাল্লাহর দুটি বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে, তা এখন পুনরায় দেখে নিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে।
পাকিস্তান দারুল ইসলাম, না দারুল হরব? এ বিষয়ে প্রকৃত অবস্থা অনুভব করার জন্য উদাহরণস্বরূপ কিছু বাস্তবতা তুলে ধরার যে ওয়াদা শুরুতে করা হয়েছে, এখন তা আরম্ভ হচ্ছে-
মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহ রচিত 'সুদ পর তারিখি ফায়সালা' কিতাবের শুরুতে লিখিত মুফতি মুহাম্মদ রাফি উসমানি হাফিজাহুল্লাহর ভূমিকা থেকে আমরা জানতে পেরেছি, সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার মতো একটি রায়ও পাকিস্তানে আজ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। এ বিষয়ে জনৈক লেখকের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ নিম্নে উল্লেখ করা হচ্ছে-
১. যে দেশটি শুধু ইসলামের জন্য ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে দেশে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে একটি মাসআলা নিয়েও কথা বলার সুযোগ, দেশটি অস্তিত্ব লাভের ৩২ বছর পর ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত হয়নি।
২. ৩২ বছর পর একটি বিশেষ মাসআলা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ হয়েছে। ইসলামি শরিয়ার সকল মাসআলা নিয়ে কথা বলার সুযোগ হয়নি। কতিপয় আলেমের ভাষায় এটি أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ -এর স্তর।
৩. সুদের যে মাসআলা নিয়ে ৩২ বছর পর আলোচনা করার সুযোগ হয়েছে, তা এমন এক মাসআলা যা দেশের সকল মুসলমানের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। তা প্রতিদিনের প্রতি লোকমার হালাল-হারামের সাথে সম্পৃক্ত মাসআলা।
৪. তারও ১২ বছর পর অর্থাৎ দেশটি প্রতিষ্ঠার ৪৪ বছর পর আদালতের একটি বেঞ্চ সুদ হারাম হওয়ার রায় দিয়েছে। ৪৪ বছর পর্যন্ত দেশটির পরিবেশ এমন রায় দেওয়ার উপযোগী ছিল না।
৫. দেশটির সরকার কর্তৃক অনুমোদিত বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সুদ হারাম হওয়ার বিরুদ্ধে আপিল করেছে। ইসলাম প্রেমিকগণ আল্লাহর দ্ব্যর্থহীন হুকুমের বিরুদ্ধে আপিলকারীদেরকে কোনো ধরনের শিক্ষা দিতে সক্ষম হয়নি।
৬. আপিলের শুনানি শুরু হয়েছে তারও ৮ বছর পর। দেশটির বয়স তখন ৫২ বছর। উল্লেখ্য, আপিল শুনানির বৈঠকের গণ্যমান্য মেহমান হচ্ছে ঐসকল ব্যাংকার, যারা যুগের পর যুগ সুদের মহাজনি করেছে, সুদের ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিরাট 'অবদান' রেখেছে।
৭. ৫৩ বছর পর ১৯৯৯ সনের শেষ মাথায় সুদ হারাম হওয়া প্রমাণিত করার জন্য আলেমসমাজ হাজার হাজার পৃষ্ঠা খরচ করেও সুদ হারাম হওয়ার রায় কার্যকর করতে পারেননি।
৮. সর্বশেষ অবস্থা : পুরো পাকিস্তানে সুদের কারবার সেভাবেই চলছে যেভাবে ছিল। বৃটিশ ভারতে যেভাবে ছিল সেভাবেই আছে। বর্তমান ভারতে যেভাবে আছে সেভাবে আছে। আমেরিকা ও বৃটেনে যেভাবে আছে সেভাবেই আছে। বিশ্বের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশে যেভাবে আছে, সেভাবেই আছে। সারাবিশ্বে তাগুতের আইনে অর্থনীতি যেভাবে চলছে, সেভাবেই পাকিস্তানে চলছে। ব্যবধান হচ্ছে, সারাবিশ্বের মুসলমানরা যে পরিমাণ ধোঁকা খেয়ে চলেছে, সে তুলনায় পাকিস্তানের মুসলমানরা একটু বেশি খেয়ে চলেছে। অবশ্য যারা খাচ্ছে, তাদের ব্যাপারে বলা হচ্ছে। আল্লাহর এমন বহু বান্দাও আছে, যারা এসব ধোঁকা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে চলছে।
তাই ১৫ নং পৃষ্ঠায় বর্ণিত হজরত মাদানি রাহিমাহুল্লাহর উক্তিটিও এখানে স্মরণযোগ্য- 'সেখানকার [পাকিস্তানের] সরকার ইউরোপীয় পদ্ধতির গণতান্ত্রিক সরকার। তাতে জনসংখ্যা অনুপাতে মুসলিম- অমুসলিম সকলেই অংশীদার। তাকে ইসলামি সরকার বলা ভুল।
হজরত লুধিয়ানবি রাহিমাহুল্লাহর এ উক্তিটি পুনরায় উল্লেখ করে লেখাটি শেষ করছি- 'অনৈসলামিক পদ্ধতিতে দীনহীনদের জন্য তো সফলতা অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু দীনদারদের জন্য প্রথমত সফলতা অর্জন করাই সম্ভব নয়। আর যদি বাহ্যত সফল হয়েও যায়, তবু তার পরিণামে ইসলাম আসবে না। বরং ইসলামের নামে অন্য কিছু হবে।'
এই হলো 'পাকিস্তান দারুল ইসলাম, না দারুল হরব'-এর আলোচনা, যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিতই হয়েছে ইসলামের জন্য। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলাম বাংলাদেশের জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও প্রাণোৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করেনি; বরং জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- চেতনাগুলো তাদেরকে মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও প্রাণোৎসর্গ করতে উৎসাহিত করেছে। প্রমাণস্বরূপ বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা অংশের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদটি দ্রষ্টব্য-
'আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।'

টিকাঃ
১. বরং আকাবির-আসলাফের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তমতে কুফর।
২. এর অর্থ তো এটাই হচ্ছে, আল্লাহ এমন একটি আদেশ করেছেন, যা পালন করার জন্য আল্লাহ ও রাসুল কোনো জায়েজ পদ্ধতি প্রবর্তন করেননি। কিন্তু এই বাচনভঙ্গিতে আল্লাহ ও রাসুলের উপর অপবাদ আরোপের দুর্গন্ধ আছে কি-না, শুঁকে দেখা প্রয়োজন।
৩. نا أَحْسَنُ الفَتَاوَى، كتاب الجهاد ..
১. মাকতুবাতে শায়খুল ইসলাম, ২: ২৪২
২. احسن الفتاوى، كتاب الجهاد : ٨٠

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00